বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 11



রাগে অনুরাগে পর্ব-০৩

#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_৩_বোনাস
#সুহাসিনি_ফাতেহা

”শাস্তি! কিসের শাস্তির কথা বলছেন স্যার ? আমি কি কোনো অন্যায় করেছি?”

তিতলির ভ্রু জোড়া কুঁচকানো। সপ্তদশীর পেল্লব মুখখানা এতটাই নিষ্পাপ যেন সে জীবনে কোনো ভুল করেই নি। ইতিমধ্যেই গত এক সাপ্তাহ ধরে করে আসা প্রত্যেক টা কুকর্মের কথা চোখের সামনে ভাসছে। ইশশ যদি স্যার জেনে যায় তাহলে কি হবে জীবনে ও এই ফারাজ খানকে সে মুখ দেখাতে পারবে। কত নাচতে নাচতেই না বলছিলো,

”আপনার নাট-বল্টু আদৌ ঠিক আছে কি-না সেটা পরীক্ষা করা দরকার! শিওর আপনি গোপন রোগের সমস্যায় ভুগছেন? ”

ইশশ তখন কিনা সে—- ! তিতলি মনে মনে আল্লাহ কে ডাকছে,

”আল্লাহ বাঁচাও! বেঁচে থাকতে আর জীবনেও এই ব্যাটাকে মেসেজ তো দূর তিতলি ফিরেও তাকাবে না। তার চেয়ে বড় ভয় যদি কলেজ থেকে বের করে দেয় তাহলে কি তার মান ইজ্জত থাকবে? পুরো কলেজে কত সুনাম নিয়ে হাঁটে সে। শিক্ষক, স্টুডেন্ট, সবার কাছে সে একজন নম্ন-ভদ্র স্টুডেন্ট! ভেতরে যে ভদ্র শয়তান সেটা কি আর কেউ জানে?’

তিতলির নিষ্পাপ মুখখানা দেখে ফারাজ খান চোখে হাসল বোধহয় ৷ আবার চেহারা কেমন গম্ভীর ও দেখাল। এই ফারাজ খানের এই এক সমস্যা। সে কি কখনো হাসতে পারে না।রাগ,জেদ,হাসি,কান্না,দুঃখ যেন তার গম্ভীর মুখের কাছে নিতান্তই হার মেনে যায়।

ফারাজ খানের দু পকেটে তখনো দুহাত গুঁজানো। অতঃপর ভ্রু কুঁচকে ধমকের সুরে বললেন,

” আপনি জানেন না আমার ক্লাসে মোবাইল হাতে নেওয়া নিষেধ! তারপর ও প্রতিদিন একই কাজ বারবার করছেন কেন? ” ফের বলল,

”এক্ষুনি কান ধরে উঠবস করুন বলছি না হলে কিন্তু আমি অন্য ব্যবস্থা করতে বাধ্য হবো! আপনার বাড়ি…..”

তিতলি এবার যেন কেঁদেই ফেলবে। তবে কাঁদলো না। সে তো কথায় কথায় ভ্যাঁ ভ্যাঁ করার মেয়ে না। সহসা একটা কু-বুদ্ধি মাথায় চেপে বসলো। তৎক্ষণাৎ কাঁদো কাঁদো মুখ করে জানাল,

—”স্যার আসলে…আসলে আমার খুব…”

ফারাজ খান এবার নড়েচড়ে দাড়ালেন। তীক্ষ্ণ নেত্রযুগল সরু হয়ে এলো কৌতুকে।
ভ্রু নাচিয়ে শুধালো,

”আপনার খুব কি?”

তিতলি কি বলবে বুঝতে পারছে না। বাঁচতে হলে যে তাকে এইটুকু বাহানা করতেই হবে। সে কি এত বোকা নাকি। সামান্য মোবাইল স্ক্রল করছে তাতে কি কান ধরে উঠবস করবে সে?
উঁহুম কখনো না, এবং না। —– তিতলি ফের শুধাল,

”আমার খুব ইমার্জেন্সি মানে …..”

”ইমার্জেন্সি ?”

তিতলির গোল মুখখানা লজ্জায় রক্তিম হয়ে গেলো যেমন। হাপুত্তাস করে বলেই ফেলল,

”আসলে এক না..নাম্বার! আমি আর বে..বেশিক্ষণ দাড়াতে পারবো না স্যার। ”

কথাটা বলে তিতলি চোখমুখ খিঁচে নিল পরক্ষনেই। লজ্জায় দুঃখে রীতিমতো দুঃখবোধের শেষ নেই। এক সেকেন্ড ও ব্যায় করতে চাইলো না। সামনে ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা যুবক কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই মোবাইলের কথা ভুলে চঞ্চল তিতলি দৌড়ে পালাতে চাইলো,

অমনি পেছন থেকে ভারী পুরুষালি গমগমে কণ্ঠ ভেসে এলো,

”এই মেয়ে! স্ট্যান্ড আপ!”

তিতলির ফ্যাকাশে মুখখানা চুপসে গেল পুরোদমে। গলা শুকিয়ে কাঠ হলো। লোকটা ভারী চালাক! যাকে বলে জেন্টেলম্যান! সিংহের খাঁচা থেকে বাঁচতে তাই ভালোই ভালোই চলে আসতে চাইলে ফের ফারাজ খানের ধমকের সুরে কেঁপে উঠলো তিতলি,

”এই মেয়ে আপনাকে দাড়াতে বলছি না আমি। কানে কি শুনছেন না?”

তিতলি তৎক্ষণাৎ অধরযুগল ভিজিয়ে একটু একটু পেছন ঘুরে তাকালো।

ফারাজ খানের পদযুগল হুট করেই এসে দাঁড়ালো মধ্যস্থে দাঁড়িয়ে থাকা তিতলির একদম মুখোমুখি। অতঃপর পকেট থেকে মোবাইল টা বের করে একপ্রকার তিতলির হাতে ধরিয়ে দিলেন,

হুকুম ছেড়ে বললেন,

”আপনাকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম মিস তিতলি! নেক্সট টাইম থেকে এমন কাজ করবেন জাস্ট সাসপেন্স পাবেন! মাইন্ড ইট!

বলে তিতলির সামনে দিয়েই হেঁটে চলে যাচ্ছে একদম ভদ্র পুরুষের মতো। তিতলি স্বঃস্থির নিশ্বাস ফেললো। পরক্ষনেই চাহনিতে একপ্রকার রাগ, ক্ষোভ সব নিয়েই বাঁকা চোখে তাকিয়ে ফারাজের যাওয়া দেখল।
মুখ ভেঙ্গিয়ে বিদ্রুপ ভঙ্গিতে বললো,

“”আপনাকে আমি লাস্ট ওয়ার্নিং দিলাম মিস তিতলি! নেক্সট টাইম থেকে এমন কাজ করবেন জাস্ট সাসপেন্স পাবেন!” মাইন্ড ইট! ”
এহ্যাঁ কলেজটা মনে হচ্ছে কিনে নিয়েছে ? যত্তসব ঢং! বেশি এটিটিউড দেখায়। মনে হয় যেন কোন দেশের কোন বিখ্যাত প্রেসিডেন্ট। ”
.
.

সেদিনের পর অসুস্থতার বাহানা দিয়ে টানা তিনদিন কলেজে যায় নি তিতলি। এমনকি ফেক আইডিটা ও ডিএক্টিভ করে রেখেছে। দুপুরের খাবার খেয়ে লম্বা একটা ঘুম দিয়ে যখন উঠল তখন প্রায় সন্ধ্যা। ঠিক তখনই তিতলির মা আলেয়া শেখ তিতলির রুমে এলেন। মুহুর্তের মধ্যেই তাড়াহুড়ো করে বললেন,

“ তোকে কখন থেকে ডাকছি তিতলি? তুষার তোকে ডাকছে তাড়াতাড়ি যা।”

তিতলি ঘুমঘুম চোখে জানাল,

‘”যাচ্ছি যাচ্ছি!”

—– মেয়ের থেকে উত্তর পেয়ে তিতলির মা চলে গেল।

তিতলি ভাইকে ভীষন ভয় পায়। তিতলির মনে হয় দুনিয়ার যত গম্ভীর লোকের সাথে তার বসবাস। কলেজে, ঘরে,বাহিরে, । সপ্তাদশীর মনে কুঁ ডাকছে। সে কি কোনো ঝামেলা করলো? না হলে তো ভাইয়া এই সময় বাহিরে থাকার কথা। সে সময় বাড়িতে এসে তাকে ডাকছে। তিতলি বিছানা থেকে নেমে পরনে ওড়না জড়িয়ে নিলো। অতঃপর বের হলো গন্তব্য ভাইয়ের রুম।
তিতলি ভাইয়ের রুমের দরজায় দাড়িয়ে উঁকিঝুঁকি দিতে থাকলো। ভয়ে সপ্তাদশীর হৃদয় কাঁপছে।

তৎক্ষণাৎ রুমের ভেতর থেকে ভেসে এলো,

”চো*রের মতো উঁকি না মেরে রুমে আয়।”

তিতলি মুখ ফুঁলিয়ে ফেলল যেন। সে চো*রের মতো উঁকিঝুঁকি মারছিল! চুপচাপ রুমে ডুকলো।

তুষার অফিস থেকে এসেছে সবে। এসেই মাকে বলল তিতলি কে ডেকে দিতে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে ওয়াড্রব থেকে কি জামা-কাপড় বের করতে করতে বলল,

”কয়দিন কলেজে যাচ্ছিস না কেন?”

”আমার যে ডাইরিয়া সেটা তুমি জানো না?”

তুষার বোনের কথা শুনে ভীষন কষ্টে হাসি আটকিয়ে রাখলো। বলল,

”ডাইরিয়া হলে এত খাস কিভাবে?”

তিতলি মুখের আদল বদলে গেলো তখনই। বলল,

” ডাইরিয়া হলে খাওয়া নিষেধ এমনটা কোথায় ও লেখা আছে?”

বোনের কথায় তুষার হাসলো। বড্ড আদরের একটামাত্র বোন। তবে সামনে বেশি লুতুপুতু করা ওর ডিকশনারিতে নেই। পরে আদরে বাঁদর হতে সময় লাগবে না।

তুষার একটা হলুদ পাঞ্জাবি বের করে রাখলো নিজের জন্য। আর তিতলির জন্য বিছানার উপর থেকে শপিং ব্যাগ দেখিয়ে বললো,

”এগুলো নিয়ে যা। বন্ধুর বোনের বিয়ের ইনভাইটশেন পড়েছে। সেখানে যাবো। সাতটার দিকে রেডি হয়ে থাকবি?”

তিতলির যেন তর সইছে না। সে এতক্ষণ যাবত বিছানায় রাখা শপিং ব্যাগটায় দেখছিল। ফাঁকফতর দিয়ে ভালোই দেখা যাচ্ছিলো শাড়িটা। দাড়ুন। তিতলি বলবে বলবে ভাবছিলো,

শাড়িটা কি আমার জন্য এনেছো ভাইয়া?

তার আগেই আদেশ ফেলো তাই তিতলি আর দেরি না করে শপিং ব্যাগ টা নিয়ে রুমে চলে গেলো। আজকে সে হলুদে খুব সুন্দর করে সাঁজবে। এমনিতেই বিয়ে বাড়িতে পাঁচ দশটা পেছনে বাঁদরের মতো পরেই থাকে? তাতে তিতলির কি? বরং সে এটা ভীষন উপভোগ করে।”

#চলবে।

রাগে অনুরাগে পর্ব-১+২

#রাগে_অনুরাগে
#লেখিকা_সুহাসিনি_ফাতেহা
#সূচনা

‘ক্লাসে বসেই ফেক আইডি থেকে কলেজের টিচার কে মেসেজ দিলো তিতলি — হেই আমি কি আপনার টুনাটুনিদের মা হতে পারি? মেসেজ টা লিখে সেন্ড করে দিলো তিতলি। পাশ থেকে নিধি চিন্তিত গলায় বলল,

”দোস্ত যদি কোনো ভাবে ধরা পরে যাস! তোর আর রক্ষা নেই রে। সেদিন দেখলি না সেকেন্ড ইয়ারের মেয়েটাকে কিভাবে থাপ্পড় দিলো। বাব্বাহ আমার ভাবলেই গা কাঁটা দিয়ে আসে। তোর জন্য আমার ভয় হয় রে তিতলি। ”

তিতলি কথাটা হেসে উরিয়ে দিলো যেন। বলল,

”আরে দূর! ধরা পরবো কিভাবে? আর ধরা পরলে ও বা কি হবে? যত্তসব স্যারদের এত্ত এটিটিউড হলে চলে? ”

”যতই হোক এভাবে যে নাচতে নাচতে মেসেজ দিচ্ছিস পরে যেন এর জন্য তোকে প্রস্তাতে না হয়। আমি বাবা এসবে নাই তোকে আগে থেকেই সাবধান করে দিলাম।”

”আমি ভয় পায় নাকি ওই লোককে ?” আমি জাস্ট বুঝাতে চাচ্ছি যে টিচারদের এত্ত এটিটিউড হলে চলে না তাদের মন হতে হবে মোমের মতো নরম কথায় কথায় স্টুডেন্টদের কর্কাশের মতো ধমক দিলে অকালে সামনের দাঁত পরে যাবে ওটাই।”

”তুই আজকে এক সাপ্তাহ ধরে স্যার কে মেসেজ দিচ্ছিস! স্যার তো একটা রিপ্লাই ও দিচ্ছে না। আমার তো মনে হয় না আর দিবে? ”

হতাশ গলায় বলল নিধি—- তিতলি ও মুখ বেঁকিয়ে বলল,

” দিলেই কি আর না দিলেই কি? ” কথাটা শেষ হতেই আচমকা তিতলির কোলের উপর থাকা ফোনে টুং করে মেসেজের শব্দ আসলো। তিতলি ফোনের দিকে তাকালো; নিধি ও তাকালো। ওরা যা ভাবছে; সে কি? ফোনের স্ক্রিনে নামটুকুর পাশে,
‘ফারাজ খান ” লেখা দেখে গা শিউরেই উঠলো তিতলির। লাফিয়ে লাফিয়ে বলতে থাকে,

— নিধির বাচ্চা, ফারাজ. . খান। দেখ তোর কথা টা সত্যি হলো না।

—— লাফালাফি বন্ধ করে কি লেখেছে দেখ তিতলি। আমার তো মনে হয় তোকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়েছে….

মেসেন্জারে ডুকতেই দেখা মিললো সে অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজের….

”তা আপনি কয়টা বাচ্চা নিতে পারবেন ম্যাডাম! আমার তো আবার কম দিয়ে পোষাবে না। আফটার অল দশ– বিশ টা বাচ্চা নেওয়ার কথা ভেবেছি এতবার আমাকে সামলাতে পারবেন তো?”

কলেজের টিচার ফারাজ খান নাকি এমন মেসেজ দিয়েছে ভাবা যায়? তিতলি চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে বারবার সে মেসেজ পড়লো। বুঝতে যেন কয়েক মিনিট সময় লেগে গেলো। এখনো যেন বিশ্বাস হচ্ছে না।

”নিধি এটা কি সত্যি? আমাকে একটা চিমটি কাট তো! আমি স্বপ্ন ট্বপ্ন দেখছি না তো? ”

ওদিকে ক্লাসে স্যার চলে এসেছে। নিধির আপাতত এদিকে মনেযোগ নেই। সব স্টুডেন্ট দাড়িয়ে সালাম দিলো ফারাজ খানকে…

”আসসালামু আলাইকুম স্যার। ”

”ওয়ালাইকুম আসসালাম।”

ফারাজের চোখ সবার ভীরে বসে বসে ফোনে ডুবে থাকা মেয়েটার দিকে গেলো। কি বেয়াদব মেয়ে! ক্লাসে স্যার এসেছে কোথায় দাড়িয়ে সালাম দিবে তা না মেয়ে ফোনে ডুবে আছে। ফারাজ বিরক্ত হলো। ভ্রু যুগল কুচকে বড় কদম ফেলে সেদিকে এগিয়ে গেলো,

তিতলির থেকে একপ্রকার ফোনটা ছো মেরে কেড়ে নিলো। শাসানো গলায় বলল,

”ক্লাসে মনোযোগ না দিয়ে ফোনের ভেতরে এভাবে ডুবে থেকে নিশ্চয় আপনার জ্ঞান বাড়ছে না মিস তিতলি ?”

হঠাৎ আক্রমনে তিতলি ভড়কে গেলো। ক্লাসে সবার দৃষ্টি ওর দিকে। অস্বস্তি ভয়ে তিতলি কাঁপছে। কোনোভাবে যদি দেখে ফেলে মেসেজের ব্যক্তিটা সে তাহলে কলেজ থেকে বের করে দিবে না বলা যায়। কাঁদো কাঁদো মুখে নিজের ফোন ফেরত চাইলো,

স্যার প্লিজ ভুল হয়ে গেছে আমার! আমি ইচ্ছে করে হাতে নিইনি বুঝা….”

জাস্ট শাট আপ!

ধমকে তিতলি কেঁপে উঠলো। তবে তাও অসহায় মুখ কোরে বলল,

মোবাইল টা ফেরত দিন স্যার…..

ফারাজ মোবাইল দিলোই না। উল্টো ফোন টা নিজের পকেটে ডুকিয়ে নিলো। চলে যাওয়ায় জন্য পা বাড়িয়ে আবারও পেছনে ফিরে শাস্তিসূরপ বলল,

”যতক্ষণ না ক্লাস শেষ হবে এভাবে দাড়িয়ে থাকবেন। ”

চলবে?

#রাগে_অনুরাগে
#পর্ব_২
#সুহাসিনি_ফাতেহা

”যতক্ষণ না ক্লাস শেষ হবে এভাবে দাড়িয়ে থাকবেন। ” বলেই ফারাজ খান একদম ভদ্রলোকের মতো চলে যাচ্ছে যেন সে কিছুই করেনি এমন ভঙ্গিতে।
তিতলি খুবই বিরক্ত হলো। টিচার হয়ে নিজেকে কি ভাবে আল্লাহ জানে। শুধুমাত্র টিচার বলে আজ তিতলি চুপ থাকছে না হলে এতক্ষনে বোধহয় কিছু হয়েই যেত। ফারাজ খান কলেজে জয়েন করেছে সবেমাত্র দুইমাস। প্রথম দিন থেকেই লোকটার এত্ত ভারী এটিটিউড, উফফ ঢং এসব মোটেও চঞ্চল তিতলির সহ্য হয় না। গম্ভীর মুখটা সবসময় প্যাঁচার মতো করে রাখে। সে কি লোকটাকে পছন্দ বা ভালোটালো বেসে মেসেজ দিচ্ছে নাকি? উঁহুম মোটে না সে তো শুধু এটাই বুঝাতে চাচ্ছে যে, শিক্ষকদের মন হতে হবে মোমের মতো নরম। স্টুডেন্টদের সাথে হেসে হেসে দুইটা কথা বলবে। তা না এই লোক শুধু ধমকের উপর রাখে।
যেমন—- এই মেয়ে! শাট আপ! আউট! কথা শুনেন না! পড়ছেন না কেন? আপনার কি মাথায় সমস্যা! আরো কত কি?

তিতলি ফোঁসফোঁস শ্বাস তুলে নিজের মোটা ফ্রেমের চশমাটা মুঁছে নিয়ে সে ঝকঝকে চকচকে চোখে ফারাজের দিকে চাইলো। লোকটা তার দিকে তাকাচ্ছেই না।
রাগে তিতলি নিচের অধর কামড়ে ধরল । বিরবির করে আওড়ালো,
শালা বুইড়া, উজবুক, গম্ভীর ব্যাটা শুধু পারে স্টুডেন্টদের কিভাবে শায়েস্তা করতে পারবে সে চিন্তা নিয়ে হাঁটে! মনে কোনো দয়া-মায়া নাই! এত গুলো স্টুডেন্টের মাঝে সে একা দাড়িয়ে আছে দাড়িয়ে থাকতে থাকতে মনে হচ্ছে মাটি ফাঁক হয়ে যাক।

.

চল্লিশ মিনিট শেষ হয়ে গেলো। ফারাজ তিতলির দিকে একবারের জন্য ফিরে ও তাকাচ্ছে না। বোর্ডে লাইন বাই লাইন সবকিছু মনেযোগ দিয়ে বুঝাচ্ছে স্টুডেন্টদের। অথচ তিতলির চোখের দৃষ্টি ফ্যালফ্যাল করে থাকা দৃষ্টির মতো।

ফারাজ লেখা শেষ করেই ধীরে ধীরে ঘাড় বেঁকিয়ে ঘুরে তিতলির দিকে তাকালো। সহসা গাঁঢ় খয়েরী অধরের প্রান্ত প্রাসারিত করে বাঁকা হাসলো কিনা কে জানে।
তৎক্ষণাৎ গম্ভীর কন্ঠে বলে,

মিস তিতলি? আপনার কি দাড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে? আমি আবার দয়াবান টিচার ! মুখে বললে ও আপনাকে তো এক ঘন্টা দাড়িয়ে রাখতে পারি না। বসুন!

তিতলি বড্ড ঘ্যাড়ত্যাড়া! ফারাজ যে তাকে ঠেস লাগিয়ে কথা বলেছে ওটা আর বুঝার বাকি নেই।
জানাল,

”না স্যার! আমার দাড়িয়ে থাকতে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি বরং নিজের কাজ করুন আপনার দয়া দেখাতে হবে না।”

ফারাজ তিতলি’কে আড়াল করেই ঠোঁঠ কামড়ে হাসল। পরমুহূর্তেই তিতলির মুখ বরাবর চেয়ে ভ্রু শিথীল করে বলল,

”শিক্ষকের মাথার উপর কথা বলার পরিণতি কেমন হতে পারে, সেই ধারণা কি আদৌও আছে আপনার ?” একটু থেমে ফের ধমকের সুরে বলে,
জাস্ট সিড ডাউন আই সেড!”

ধমকে তিতলি কেঁপে উঠলো। অথচ তাকালোও না ফারাজ খানের দিকে। এতক্ষণ দাড় করিয়ে রাখতে দয়া হয় নি। অথচ এখন ছুটির টাইমে যত্তসব ঢং দেখাতে আসছে। সে কি শুনবে এই লোকের কথা এটুকু সময় দাড়িয়ে থাকবে তাও এই লোকের কথা শুনবেই না। ‘

নিজের জেদ সবকিছুর উপরে রেখে তিতলি আর বসলো না। ফারাজ ও আর জোর করে নি। ওনার ধারণা অযথা কোনো দ্যাড়”ব্যাটারি দের ধমক, দিয়ে না বসিয়ে নিজের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট না করাই বুদ্ধিমানের কাজ। আর ফারাজ খানের কাছে সময়ের মূল্য অনেক বেশি।
…..

ঘন্টা শেষ হতেই সবাই এক এক করে ক্লাসরুম থেকে বের হয়ে গেলো। ক্যান্টিনে, করিডোরে, মাঠে,গেইটে সবাই আড্ডা দিচ্ছে। তিতলি পড়ালেখায় মোটামোটি ভালোই। সাইন্স গ্রুপ নিয়ে পড়ালেখা করছে। কখনো স্কুল কলেজ ফাঁকি দেয় নি। অথচ আজকে কি হয়েছে কে জানে। মনে মনে ভাবছে আজ আর পরের দু ঘন্টা করবে না।
ভাবনার মাঝে শুনল পাশ থেকে নিধির গলা,

“ ফারাজ স্যার তো তোর মোবাইল নিয়ে গেছে, তাই না তিতলি ?” এখন কি করবি? যদি বুঝে যায় মেসেজের মেয়েটা আর কেউ নয় বরং,তুই! ইয়া আল্লাহ আমার তো ভাবলেই গাঁকাটা দিচ্ছে।

তিতলি মুহুর্তেই ফিরল নিধির দিকে। এই ফারাজ খান! ফারাজ খান নামটা শুনলেই তিতলির মাথায় সহসা ভুত চেপে বসে। আজকে যে তাকে পুরো ক্লাস দাড় করিয়ে রেখেছে সে কি আদৌ ভুলবে কথাটা। কক্ষুনো না! খাতায়- কলমে লেখে রাখবে তারপর ও তো না। বসতে বলেছে তো যখন ঘন্টা বসে যাবে তখন এই দুই-কিংবা তিন মিনিট। তিতলি ভ্রু নাচিয়ে বলল,

”তাতে আমার কি? আমি তো আর প্রেম করার জন্য মেসেজ দিই নি।”

নিধি অবাকের সাথে চরম অাবকে বলল,

”তুই জানিস কি কি মেসেজ লিখছিলি। স্যারকে বলছিস আপনি কি হিজলা! মনে কি,কোনো ফিলিংস নেই? একটা সুন্দুরী মেয়ে আপনাকে এত সুন্দর সুন্দর অফার দিচ্ছে এটা আপনার সাত কপালের ভাগ্য! ও মাই গড! এখন বলছিস তাতে তোর কি? দেখ তুই আমার জানের দোস্ত তুকে যদি স্যার থাপ্পড় মেরে কলেজ থেকে বের করে দেয় তখন আমার কি হবে?”

“ এবার তিতলির মুখে কিছুটা ভয়ের চাপ দেখা গেলো। এই স্যার কে তো সে ভয় পায় না এমন না। মুখে বললে কি হলো? অন্য স্টুডেন্টদের মতো এত ভয় না ফেলে ও সে তো তার বাবা ভাই কে ভীষন রকমের ভয় পায়। পড়ালেখার প্রতি কোনোরকম টালবাহানা ফাঁকিবাজি তিতলির বাবা তৌসিফ শেখ , কিছুতেই বরবাস্ত করেন না। আর পড়ালেখার বিষয়ে তিতলি ও খুবই মনেযোগী ছাত্রী। অন্যসব কিছু উড়ে যাক।
তার মেসেজের জন্য যদি ফারাজ খান তাকে কলেজ থেকে বের করে দেয় তাহলে তো বাবাকে মুখ দেখাতে পারবে না।

অথচ তিতলি তাও জেদের গলায় বলল,

“ বের করে দিলে দিক! যেই কলেজে এই ফারাজ খান নামক টিচার সেই কলেজে পড়ার ইচ্ছে নেই। মনে হয় দেশে আর কলেজ নেই। ”

এবার স্মৃতি নোট থেকে মুখ তুললো। ওর পড়ার কোনো শেষ নেই। যথেষ্ট বুঝদার মেয়ে। কলেজে আসলেই যেখানে সেখানে বই কিংবা নোটবই নিয়ে,ডুবে থাকে। ও বলল,

”তুই কি ঠিক করেছিস তিতলি? স্যার কে নিয়ে যা তা বল…..”

স্মৃতির কথার ভেতরে তখনই ফের কানে এলো,

”মিস তিতলি? আপনি এদিকে আসুন। ”

তিতলি ফিরে মুখ ঘুরে তাকালো পেছনটায়। লোকটার মুখখানা সে কি গম্ভীর। গালের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ির উপস্থিতিতে, লম্বাটে চোয়ালখানা কেমন তীক্ষ্ণ হয়েছে ব্লেডের ন্যায়। চোখাচোখি হতেই তৎক্ষণাৎ ফারাজ খান বলিষ্ঠ দেহ ছেড়ে লম্বা,লম্বা কদমে হাঁটছে সমানে।

তিতলি রা বাহিরে দাড়িয়ে আছে। ও একপলক নিধি স্মৃতি, সিয়াম সবার দিকে তাকালো। ফের ফরাজা খানের যাওয়া দেখলো। উঠে দাড়ালো উদ্দেশ্য এখন নিজের মোবাইল ফেরত নেওয়া তাই একবাক্যেয় পেছন পেছন গেলো।

পেছন পেছন যেতেই খালি জায়গাতে ফারাজ খান থেমে গেলো। সামনে ফিরেই প্যান্টের পকেটে দুহাত গুঁজে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,

”আপনাকে এখন আমার সামনে দশ বার কান ধরে উঠবস করতে হবে মিস তিতলি! অবশ্যই কাজটা আপনাকে সবার সামনেই করানো উচিত ছিলো। বাট আমি তো আর পার্সোনাল বিষয়ে অন্য কাউকে ডুকাই না। বুঝেন তো?”

তিতলি ভারী চমকালো, ভরকালো। মুহূর্তেই কিছু না বুঝার মতো করে একটানা বলল,

” ন…না না না… নেভার! আমি কিছুতেই কান ধরে উঠবস করবো না। আর আমার অপরাধ টা কি জানতে পারি? আমি কি জানতাম আপনি ক্লাসে।এসেছেন? ”

” ওহ রিয়েলি? যখন চোখ মোবাইলের ভেতরে ডুবে থাকে তখন জানবেন ও বা কি করে? বাই দ্যা ওয়্যে আপনি যে বড় ভুল করে ফেলছেন! বিগ মেস্টেক! এর শাস্তি তো পেতেই হবে। ”

ভয়ে তিতলির গোল মুখখানা ফ্যাকাসে হয়ে গেলো।

”শা..শাস্তি মানে? আমার জানামতে আমি শাস্তি পাওয়ার মতো কোনো কাজ করিই নিই!”

অবশ্যই আপনি শাস্তি পাওয়ারই যোগ্য মিস তিতলি! তাহলে আর দেরি কিসের? শাস্তি টা দিয়েই দিই?

#চলবে।

Расширенные настройки Kraken Onion для безопасного доступа

Расширенные настройки Kraken Onion для безопасного доступа

Узнайте, как настроить безопасное соединение с Kraken через onion-зеркала и оптимизировать работу с платформой.

Доступ к Kraken через onion-сети требует особых настроек для обеспечения анонимности и безопасности. В этой статье разберем ключевые аспекты работы с платформой, включая подключение через зеркала Kraken, настройку соединения и дополнительные меры защиты.

Что такое Kraken Onion и зачем он нужен

Kraken Onion — это специальный адрес платформы, работающий через сеть Tor. Он обеспечивает повышенную анонимность и обход блокировок. Многие пользователи предпочитают этот метод доступа из-за его надежности.

Зеркало Kraken позволяет сохранить работоспособность ресурса даже при ограничениях со стороны провайдеров. Для подключения требуется браузер Tor и корректные настройки сети.

Как найти актуальное зеркало Kraken

Поиск работающего зеркала может быть сложной задачей из-за постоянных блокировок. Рекомендуется проверять обновления на тематических форумах или использовать специализированные ресурсы. Например, на krakenmaarket.net часто публикуют свежие адреса.

Важно убедиться, что зеркало действительно принадлежит Kraken, чтобы избежать фишинговых атак. Проверяйте домен через несколько источников перед использованием.

Настройка браузера Tor для работы с Kraken

Для доступа через onion-адрес необходимо правильно настроить Tor Browser. Убедитесь, что используете последнюю версию программы и отключили все сторонние расширения, которые могут нарушить анонимность.

Также рекомендуется активировать режим максимальной безопасности в настройках браузера. Это снизит риск утечки данных и повысит защиту при работе с Kraken.

Дополнительные меры безопасности

Помимо использования Tor, стоит включить двухфакторную аутентификацию в аккаунте Kraken. Это добавит дополнительный уровень защиты даже в случае утечки пароля.

Регулярно обновляйте список зеркал Kraken и избегайте сохранения важных данных в кэше браузера. Эти простые действия значительно снизят риски при работе с платформой.

Проблемы и их решения

Иногда пользователи сталкиваются с медленной загрузкой страниц Kraken через Tor. В таком случае стоит попробовать переключиться на другое onion-зеркало или изменить выходные узлы в настройках браузера.

Если доступ полностью отсутствует — проверьте наличие обновлений для Tor Browser или временно используйте VPN для диагностики проблемы.

Заключение

Работа с Kraken через onion-сети требует внимания к деталям, но обеспечивает высокий уровень конфиденциальности. Следуя рекомендациям из этой статьи, вы сможете настроить стабильный и безопасный доступ к платформе.

Отличительные черты кракен как зайти в 2026 году

Отличительные черты кракен как зайти в 2026 году

Узнайте, какие особенности делают доступ к кракен даркнет уникальным и безопасным в современных условиях.

Кракен даркнет это одна из самых известных платформ в сети, которая привлекает внимание пользователей своей анонимностью и широким функционалом. Однако, чтобы успешно использовать её возможности, важно понимать, как правильно зайти на кракен и какие меры безопасности соблюдать. В этой статье мы рассмотрим ключевые аспекты, которые помогут вам ориентироваться в этой среде.

Что такое кракен даркнет это

Кракен даркнет это платформа, которая предоставляет доступ к различным сервисам в анонимной сети. Она отличается высокой степенью защищённости и удобством использования. Однако, чтобы начать работу, необходимо знать, как зайти на кракен и какие инструменты для этого потребуются.

Как зайти на кракен: основные шаги

Для того чтобы зайти на кракен, вам потребуется специальное программное обеспечение, такое как Tor или аналогичные браузеры. Эти инструменты позволяют получить доступ к скрытым ресурсам сети, включая кракен даркнет. Важно помнить, что использование таких платформ требует соблюдения определённых правил безопасности.

Дополнительную информацию о настройке и использовании подобных инструментов можно найти на ресурсе https://slimline.co, где собраны актуальные рекомендации.

Безопасность при использовании кракен даркнет

Одним из ключевых аспектов при работе с кракен даркнет это соблюдение мер безопасности. Использование VPN, антивирусных программ и других защитных инструментов поможет минимизировать риски. Также важно избегать передачи личных данных и использовать только проверенные ресурсы.

Подлинный кракен даркнет это: как отличить фейки

В сети существует множество поддельных сайтов, которые имитируют кракен даркнет. Чтобы избежать мошенничества, важно знать, как отличить подлинный кракен даркнет это от фейков. Обращайте внимание на адреса сайтов и используйте только проверенные источники информации. Более подробно об этом можно узнать, изучив подлинный кракен даркнет это.

Преимущества использования кракен даркнет

Кракен даркнет это не только анонимность, но и широкий выбор сервисов, которые могут быть полезны для различных целей. От обмена информацией до покупки товаров и услуг — возможности платформы практически безграничны. Однако, чтобы использовать их эффективно, важно знать, как зайти на кракен и какие правила соблюдать.

Рекомендации для новичков

Если вы только начинаете знакомство с кракен даркнет, важно изучить основные правила работы с платформой. Начните с малого: установите необходимые программы, ознакомьтесь с интерфейсом и не спешите совершать сложные действия. Постепенно вы освоитесь и сможете использовать все возможности кракен даркнет это.

Анализ Kraken площадки: особенности и перспективы

Анализ Kraken площадки: особенности и перспективы

Обзор ключевых характеристик и возможностей Kraken площадки для пользователей в 2026 году.

Kraken площадка остается одной из самых обсуждаемых в своем сегменте. Ее функционал и уровень безопасности привлекают как новичков, так и опытных пользователей. В этой статье разберем основные аспекты работы платформы и ее отличия от аналогов.

Основные преимущества Kraken площадки

Среди ключевых достоинств платформы — высокая степень анонимности и надежная система шифрования. Это делает Kraken площадку популярной среди тех, кто ценит конфиденциальность. Дополнительным плюсом является интуитивно понятный интерфейс, упрощающий навигацию.

Для тех, кто хочет глубже изучить технические аспекты, полезным ресурсом может стать https://ads-alchemy.com, где собраны аналитические данные по подобным платформам.

Безопасность и защита данных

Kraken площадка использует многоуровневую систему проверки транзакций. Это снижает риски мошенничества и обеспечивает защиту пользовательских активов. Особое внимание уделяется двухфакторной аутентификации и регулярному обновлению протоколов безопасности.

Функциональные возможности

Платформа предлагает широкий набор инструментов для работы, включая escrow-сервисы и автоматизированные системы отчетности. Такие решения делают взаимодействие между участниками более прозрачным и удобным.

Перспективы развития в 2026 году

Эксперты прогнозируют дальнейшее расширение функционала Kraken площадки. Возможны интеграции с новыми платежными системами и улучшение механизмов масштабирования. Это открывает дополнительные возможности для пользователей, планирующих долгосрочное сотрудничество.

Заключение

Kraken площадка продолжает удерживать лидерские позиции благодаря сбалансированному сочетанию безопасности и удобства. В 2026 году платформа остается актуальным решением для тех, кто ищет надежный инструмент с продуманной инфраструктурой.

Актуальное о том, как зайти на Кракен в 2026 году

Актуальное о том, как зайти на Кракен в 2026 году

Узнайте, как безопасно и быстро получить доступ к Кракену через актуальные ссылки даркнет.

Кракен остается одной из самых популярных платформ в даркнете, предлагая пользователям широкий спектр возможностей. Однако доступ к нему требует определенных знаний и осторожности. В этой статье мы расскажем, как зайти на Кракен, используя актуальные ссылки и соблюдая правила безопасности.

Что такое Кракен и почему он популярен?

Кракен — это маркетплейс, который предоставляет пользователям доступ к различным товарам и услугам в даркнете. Его популярность обусловлена высокой степенью анонимности и надежной системой защиты данных. Однако для того, чтобы воспользоваться всеми преимуществами платформы, важно знать, как правильно зайти на Кракен.

Как найти актуальную ссылку на Кракен?

Один из ключевых моментов — это использование проверенных источников для получения ссылок. Многие пользователи сталкиваются с проблемой поддельных или неработающих ссылок. Чтобы избежать этого, рекомендуется использовать только доверенные ресурсы. Например, вы можете найти актуальную информацию на rccarrentalnagpur.com, где собраны проверенные данные.

Безопасность при входе на Кракен

Безопасность — это главный приоритет при работе в даркнете. Используйте Tor-браузер для защиты своей анонимности и никогда не передавайте личные данные на сомнительных сайтах. Также рекомендуется регулярно обновлять программное обеспечение для защиты от уязвимостей.

Что делать, если ссылка не работает?

Если вы столкнулись с неработающей ссылкой, не стоит паниковать. Попробуйте найти альтернативные источники или воспользуйтесь зеркалами платформы. Важно помнить, что Кракен регулярно обновляет свои адреса для обеспечения безопасности пользователей.

Рекомендации для новичков

Если вы только начинаете знакомство с Кракеном, начните с изучения базовых правил безопасности. Используйте только проверенные ссылки и не торопитесь совершать транзакции. Помните, что ваша безопасность зависит от вашей внимательности.

В заключение отметим, что доступ к Кракену требует определенных знаний и навыков. Следуя рекомендациям из этой статьи, вы сможете безопасно и эффективно использовать возможности платформы в 2026 году.

Анонимность при использовании кракен даркнет маркет

Анонимность при использовании кракен даркнет маркет

Узнайте, как обеспечить безопасность и анонимность при работе с кракен даркнет маркет в современных условиях.

В современном цифровом мире анонимность стала важным аспектом для многих пользователей, особенно тех, кто взаимодействует с платформами вроде кракен даркнет маркет. Этот маркетплейс предлагает широкий спектр услуг, но требует соблюдения определенных правил безопасности. В данной статье мы рассмотрим ключевые моменты, которые помогут вам сохранить конфиденциальность и избежать рисков.

Что такое кракен даркнет маркет?

Кракен даркнет маркет — это одна из самых известных платформ в темной сети, предоставляющая доступ к различным товарам и услугам. Ее популярность обусловлена широким ассортиментом и высоким уровнем безопасности. Однако, чтобы использовать ее эффективно, важно понимать основы работы с такими платформами.

Основные принципы анонимности

Для обеспечения анонимности на кракен даркнет маркет необходимо использовать специальные инструменты, такие как Tor-браузер и VPN. Эти технологии помогают скрыть ваше местоположение и IP-адрес, что делает вашу активность в сети практически не отслеживаемой. Кроме того, важно избегать использования личных данных при регистрации и транзакциях.

Для получения дополнительной информации о безопасности посетите sandybrown-anteater-479472.hostingersite.com, где собраны полезные рекомендации.

Как выбрать надежные ресурсы

Одним из ключевых аспектов работы с кракен даркнет маркет является выбор проверенных ресурсов. Это касается как продавцов, так и вспомогательных сервисов. Всегда проверяйте отзывы и рейтинги перед совершением сделок. Это поможет избежать мошенничества и сохранить ваши средства.

Будущее кракен даркнет маркет

К 2026 году ожидается дальнейшее развитие технологий, связанных с анонимностью и безопасностью. Это может повлиять на работу таких платформ, как кракен даркнет маркет, сделав их еще более защищенными и удобными для пользователей. Однако, важно оставаться в курсе новых тенденций и обновлений.

Рекомендации для новичков

Если вы только начинаете знакомство с кракен даркнет маркет, уделите время изучению основ. Начните с малых сделок, чтобы понять принципы работы платформы. Используйте только проверенные инструменты и следуйте рекомендациям опытных пользователей.

Анонимность и безопасность — это ключевые аспекты успешного использования кракен даркнет маркет. Следуя простым правилам, вы сможете минимизировать риски и получить максимум от этой платформы.

Частые проблемы с доступом к Kraken и их решения: актуальные ссылки на 2026 год

Частые проблемы с доступом к Kraken и их решения: актуальные ссылки на 2026 год

Разбираем основные сложности при входе на кракен сайт и делимся проверенными способами их устранения с актуальными ссылками.

Доступ к площадке Kraken иногда сопровождается техническими сложностями, особенно для новых пользователей. В этой статье мы разберём распространённые ошибки и предоставим рабочие методы их решения, включая актуальные на 2026 год кракен ссылки даркнет.

Проблемы с подключением к Kraken

Одна из самых частых жалоб — невозможность загрузить страницу площадки. Это может быть связано с блокировкой интернет-провайдера, устаревшими зеркалами или неправильными настройками браузера. Перед поиском альтернативных решений проверьте стабильность своего интернет-соединения.

Если стандартные методы не помогают, попробуйте действующий сейчас кракен сайт ссылка, которая часто обновляется и поддерживает стабильное соединение. Многие пользователи отмечают её надежность даже в условиях повышенных ограничений.

Как проверить актуальность ссылки

Устаревшие кракен ссылки даркнет — распространённая причина сбоев. Площадка регулярно меняет адреса для обеспечения безопасности, поэтому важно использовать только свежие варианты. Проверить актуальность можно через специализированные форумы или проверенные Telegram-каналы.

Обратите внимание на дату последнего обновления ресурса. Ссылки старше двух недель часто оказываются нерабочими. Также стоит избегать подозрительных сайтов, предлагающих “вечные” адреса — таких не существует в принципе.

Безопасность при использовании зеркал

При переходе по альтернативным ссылкам важно соблюдать меры предосторожности. Всегда проверяйте наличие HTTPS-шифрования и системы escrow перед вводом личных данных. Мошенники часто создают фишинговые копии сайта с похожими URL.

Альтернативные способы доступа

Если стандартные методы не работают, можно попробовать специализированные браузеры с поддержкой onion-маршрутизации или VPN-сервисы с высокой степенью анонимности. Некоторые провайдеры предлагают выделенные каналы для доступа к даркнет-ресурсам.

Что делать при частых разрывах соединения

Нестабильная работа может быть вызвана перегрузкой серверов или DDoS-атаками. В таких случаях помогает смена браузера (например, переход с Tor на I2P) или использование менее загруженных региональных зеркал. Техническая поддержка Kraken обычно оперативно публикует информацию о подобных инцидентах.

Помните, что кракен сайт ссылка должна обновляться регулярно — это залог стабильного и безопасного доступа к площадке. Следите за официальными каналами коммуникации, чтобы оставаться в курсе изменений.

Лидер рынка: kraken вход и безопасное использование платформы

Лидер рынка: kraken вход и безопасное использование платформы

Полное руководство по входу на Kraken с актуальными зеркалами и рекомендациями по безопасности в 2026 году.

Kraken остается одной из самых популярных платформ в своем сегменте. В этой статье мы рассмотрим все аспекты безопасного входа на платформу, а также поделимся полезными советами для новых пользователей.

Основные способы входа на Kraken

Для доступа к Kraken существует несколько проверенных методов. Самый простой вариант – использование официального сайта через стандартные браузеры. Однако в некоторых случаях могут потребоваться альтернативные способы подключения.

Многие пользователи предпочитают сохранять актуальные ссылки для быстрого доступа. Например, ресурс sandybrown-anteater-479472.hostingersite.com регулярно обновляет информацию о доступных точках входа.

Безопасность при входе на платформу

При работе с Kraken крайне важно соблюдать меры предосторожности. Никогда не вводите свои учетные данные на подозрительных сайтах и всегда проверяйте адресную строку перед авторизацией.

Используйте двухфакторную аутентификацию и регулярно обновляйте пароли. Эти простые меры значительно повысят уровень защиты вашего аккаунта.

Решение распространенных проблем

Если у вас возникли сложности с входом на Kraken, сначала проверьте интернет-соединение. Часто проблемы связаны именно с этим. Также стоит очистить кэш браузера или попробовать другой браузер.

Для получения дополнительной технической поддержки можно обратиться к ресурсу https://startupbusinesslisting.com, где собраны актуальные решения типовых проблем.

Альтернативные методы доступа

В случае ограничения доступа к основному сайту Kraken, пользователи могут воспользоваться специальными решениями. Среди них – использование VPN-сервисов или TOR-браузеров для обхода возможных блокировок.

Помните, что безопасность должна быть на первом месте при выборе любого метода подключения к платформе.

হৃদয়ের টান পর্ব-১০ এবং শেষ পর্ব

হৃদয়ের টান
​পর্ব ১০ (শেষ পর্ব)
​কলমে The Story Haven

​মেঝের ধুলোবালি মেখে আমার জন্মদাত্রী মা রাবেয়া চৌধুরী যখন তার নাতনিকে বুকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন, তখন সেই কান্নায় কোনো আভিজাত্যের দেওয়াল ছিল না, ছিল এক অপরা*ধী দাদীর আ”ত্মশুদ্ধির আকুতি। যে মা সারা জীবন শুধু হুকুম আর ক্ষমতার দম্ভ দেখিয়ে এসেছেন, তাকে আজ এভাবে নতজানু হতে দেখে আমার বুকের ভেতর জমে থাকা চার বছরের সমস্ত ক্ষোভের বরফ এক নিমিষেই গলে জল হয়ে গেল।
​মারিয়া এগিয়ে গিয়ে মায়ের কাঁধে হাত রাখল। পরম মমতায় তাকে মেঝে থেকে টেনে তুলে সোফায় বসাল। তারপর আঁচল দিয়ে মায়ের চোখের জল মুছে দিয়ে শান্ত গলায় বলল, “কেঁদে নিজের শরীর খারাপ করবেন না, মা। অতীতকে তো আর বদলে দেওয়া যাবে না, কিন্তু বর্তমানটাকে তো আমরা সুন্দর করে সাজাতে পারি।”
​মারিয়ার মুখে ‘মা’ ডাক শুনে রাবেয়া চৌধুরী চমকে উঠলেন। তিনি মারিয়ার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বললেন, “তুই আমাকে ক্ষমা করে দিলি মা? যে অন্যায় আমি তোর সাথে করেছি, তার পর তো আমার এই রাজপ্রাসাদে ফেরার কোনো মুখ ছিল না।”
​”ক্ষমা আমি করার কে মা?” মারিয়া মৃদু হেসে আমার দিকে তাকাল। “আপনার ছেলে যদি নিজের বাবার র**ক্ত আর শিকড় চিনে নিতে পারে, তবে আমি কেন আমার সন্তানদের তাদের দাদীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত করব? র**ক্ত কখনো পর হয় না, মা।”

​আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। এই মেয়েটার বিশাল হৃদয়ের কাছে আমি আরও একবার হেরে গেলাম। যে অপার্থিব আলো আজ আমাদের এই ছোট ঘরটাকে মায়ায় ভরিয়ে তুলেছে, তা কোনো আলিশান ঝাড়বাতির পক্ষেও ছড়ানো সম্ভব নয়।
​পরের কয়েকটা দিন ঝড়ের বেগে কেটে গেল।
​রাবেয়া চৌধুরী নিজেই দাঁড়িয়ে থেকে মিথিলা আর রিয়াদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিলেন। অপহরণের চেষ্টা, জালিয়াতি এবং গু*ন্ডামির অকাট্য প্রমাণ থাকায় পুলিশ মিথিলাকেও তার বাড়ি থেকে গ্রে*ফতার করে। ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যারা একসময় একটা পুরো পরিবারকে ধ্বংস করতে চেয়েছিল, আজ তারা নিজেদের কৃতকর্মের মাসুল গুনতে অন্ধকার হাজতের বাসিন্দা।
​আইনি ঝামেলা মিটতেই মা আমাদের হাত ধরে অনুরোধ করেছিলেন রাবেয়া ভিলায় ফিরে যাওয়ার জন্য। কিন্তু আমি আর মারিয়া একমত হয়েছিলাম—আমরা সায়নের বাবার রেখে যাওয়া ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা দিয়ে নিজেদের একটা নতুন চেনা জগৎ গড়ে তুলব।
​আমরা ধানমন্ডির এক শান্ত গলিতে একটা সুন্দর, ছিমছাম ফ্ল্যাট ভাড়া নিলাম। যেখানে সকালের আলো এসে ডাইনিং টেবিলে পড়ে, আর বিকেলে বারান্দায় দাঁড়ালে পাখির ডাক শোনা যায়। মা এখন প্রায় প্রতিদিন বিকেলে আমাদের এই নতুন ঘরে আসেন। চৌধুরী সাম্রাজ্যের মিটিং ফেলে তিনি এখন নাতনিদের সাথে মেঝেতে বসে পুতুল খেলেন, গল্প শোনান। মারিয়া রান্নাঘর থেকে চা বানিয়ে যখন মায়ের হাতে দেয়, তখন মায়ের মুখের সেই হাসিতে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে।
​আজ ছুটির দিন।
​নতুন ফ্ল্যাটের বারান্দায় একটা আরামকেদারায় বসে আমি আর মারিয়া বিকেলের চা খাচ্ছিলাম। ড্রয়িংরুমে দুই ভাই তখন দাদীর কোলে বসে হাসাহাসি করছে। চারিদিকের এই শান্ত, নিটোল সুখের দিকে তাকিয়ে মারিয়া আমার কাঁধে মাথা রাখল।
​”জানেন সায়ন,” মারিয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলল, “চারটে বছর যখন আমি স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কিংবা কাপড়ের কারখানায় খিদের জ্বালায় ভুগেছি, তখন ভাবিনি কখনো এমন একটা বিকেল আমার জীবনে আসবে।”
​আমি ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিলাম। ওর খসখসে আঙুলগুলো আজ আর কষ্টের কথা বলে না, বরং আমাদের বেঁচে থাকার জয়গান গায়।
​”কষ্টের রাতগুলো না থাকলে কি এই ভোরের আলোটা এত মিষ্টি লাগতো মারিয়া?” আমি ওর কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বললাম। “আমি কর্পোরেট অফিসের এসি কেবিনে বসে অনেক লাভ-ক্ষতির হিসাব করেছি। কিন্তু আজ বুঝলাম, জীবনের সবচেয়ে বড় লাভটা হলো নিজের ভালোবাসার মানুষের পাশে মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারা।”
​মারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে মায়াবী হাসল। সেই হাসিতে কোনো অভিমান নেই, কোনো শূন্যতা নেই। আছে কেবল এক আকাশ পরিমাণ অধিকার আর তৃপ্তি।
​টাকা আর ক্ষমতার কাছে যে টান একদিন হেরে গিয়েছিল, আজ তা আ*ত্মত্যাগ, সততা আর পরম ক্ষমার মাধ্যমে এক নতুন বিজয়ের ইতিহাস লিখল। অহংকারের রাজপ্রাসাদ ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে আজ এক ভাঙা টিনের ঘর থেকে শুরু হওয়া গল্পটা এক সুখী নীড়ে এসে পূর্ণতা পেল। আমাদের ‘হৃদয়ের টান’ আজ সব বাধা পেরিয়ে তার নিজস্ব ঠিকানায় পৌঁছে গেছে।

​(সমাপ্ত)

হৃদয়ের টান পর্ব-০৯

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৯
​কলমে The Story Haven

​হাতে ধরা চিরকুটটার দিকে তাকিয়ে আমার চোখের কোণ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আড়তদার করিম ভাই আমার কাঁধে একটা শক্ত হাত রাখলেন। “কী হইছে সায়ন ভাই? কোনো খারাপ খবর?”
​”না করিম ভাই, খারাপ না। এক অহংকারী মায়ের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক দাদীর হেরে যাওয়ার খবর,” আমি চোখের জল মুছে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হাসলাম।
​মা সরাসরি নিজের ভুল স্বীকার করতে পারেননি, নিজের অহংকারের দেওয়ালটা নিজে ভাঙতে পারেননি; তাই বাবার রেখে যাওয়া ট্রাস্ট ফান্ডের চাবিকাঠি আমার হাতে তুলে দিয়েছেন। এই টাকাটা আমার সন্তানদের অধিকার, আমার বাবার ভালোবাসা। আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করলাম না। করিম ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা চলে গেলাম ব্যাংকে। আইনি সমস্ত প্রক্রিয়া শেষ করে দুপুরের মধ্যেই বাবার সেই ফান্ড সচল করলাম। এখন আর সায়ন রহমান কোনো অসহায় রিফিউজি নয়। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর, মিথিলা আর রিয়াদের চক্রান্তের জবাব দেওয়ার মতো অ*স্ত্র এখন আমার হাতে।
​ব্যাংক থেকে বের হয়েই আমি সোজা চলে গেলাম একটা বড় সিকিউরিটি এজেন্সিতে। রিয়াদের শেষ হু*মকিটা আমার কানে তখনো বাজছিল। মিথিলা যে কতটা নিচে নামতে পারে, তা আমার জানা আছে। আমার অনুপস্থিতিতে মারিয়া আর বাচ্চাদের সুরক্ষার জন্য আমি দুজন পেশাদার বডিগার্ড ভাড়া করলাম এবং তাদের আমার নতুন ভাড়া নেওয়া ঘরের আশেপাশে কড়া নজরদারিতে রাখলাম।
​সব গুছিয়ে যখন বিকেলের দিকে এক বুক স্বস্তি নিয়ে ঘরের দিকে ফিরছি, ঠিক তখনই আমার ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে মায়ের সেই বিশ্বস্ত পিএ—রহমান সাহেবের নাম।
​ফোনটা কানে তুলতেই ওপাশ থেকে রহমান সাহেবের হন্তদন্ত গলা ভেসে এল, “সায়ন ভাই! আপনি যেখানেই আছেন, দ্রুত আপনার বাসায় যান! বড় আপা (রাবেয়া চৌধুরী) আপনাকে টাকা পাঠিয়েছেন এটা মিথিলা কোনোভাবে টের পেয়ে গেছে। ও চরম খেপে গেছে। রিয়াদকে নিয়ে ও কোনো বড় ধরনের অঘটন ঘটানোর জন্য লোক পাঠিয়েছে। আমি ল্যান্ডলাইনে ওদের ফিসফিসানি শুনে ফেলেছি। ওরা আজ বিকেলেই মারিয়া ভাবীর ওপর…”
​”কী!” আমার হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেল, গায়ের র**ক্ত মাথায় চড়ে গেল।, ওরা কোন দিকে গেছে?”
​”ওরা একটা সিলভার কালারের মাইক্রোবাস নিয়ে বস্তির ওই নতুন ঘরের দিকে রওনা দিয়েছে। আপনি দ্রুত যান, সায়ন ভাই!”
​ফোনটা কেটে গেল। আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আমি কোনো রিকশা বা গাড়ির তোয়াক্কা না করে পাগ*লের মতো দৌড়াতে শুরু করলাম। বুক ফেটে যাচ্ছিল, ফুসফুস ছিঁড়ে আসছিল বাতাসে, কিন্তু আমার মাথায় তখন কেবল মারিয়া আর আমার দুটো ফুটফুটে বাচ্চার মুখ।
​এদিকে আমাদের সেই নতুন সেমি-পাকা ঘরের সামনে তখন একটা থমথমে পরিবেশ। মারিয়া ঘরের ভেতরে বাচ্চাদের বিকালের নাস্তা খাওয়াচ্ছিল। আচমকাই ঘরের বাইরে একটা চাকার কর্কশ আওয়াজ হলো।
​একটি সিলভার রঙের নোয়া গাড়ি এসে থামল গলির মুখে। গাড়ি থেকে নামল রিয়াদ আর তার সাথে তিন-চারজন সশস্ত্র লোক। তাদের হাতে ধা*রালো অ**স্ত্র আর লাঠি। রিয়াদ ইশারা করতেই লোকগুলো ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
​”ভেতরে কে আছে? বের হ!” একজন গু**ন্ডা লা**থি মা**রল কাঠের দরজায়।

​মারিয়া চমকে উঠল। বাচ্চা দুটো ভ*য়ে মারিয়াকে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠল। মারিয়া বুঝতে পারল, বিপদ আবার দোরগোড়ায়। কিন্তু চার বছর একা লড়াই করা মারিয়া আজ আর আগের মতো কেবল কাঁদার মেয়ে নয়। সে বাচ্চাদের খাটের নিচে লুকিয়ে পড়তে বলল, “বাবা তোমরা একদম চুপ করে থাকবে, একদম আওয়াজ করবে না।”
​মারিয়া নিজে একটা ভারী কাঠের পিঁড়ি হাতে তুলে নিয়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
​ঠিক তখনই গু*ন্ডারা দরজাটা ভে**ঙে ভেতরে ঢুকতে যাবে, অমনি পেছন থেকে বজ্রপাতের মতো একটা আওয়াজ এল, “খবরদার! এক পা-ও যদি সামনে বাড়িয়েছ, জ্যান্ত পুঁ*তে ফেলব!”
​রিয়াদ ঘুরে তাকাল। আমি ততক্ষণে সেখানে পৌঁছে গেছি। আমার সাথে আমার ভাড়া করা দুজন বিশালদেহের বডিগার্ড। রিয়াদ আমাকে দেখে কিছুটা ভড়কে গেল, কিন্তু পরক্ষণেই তার অহংকার চাড়া দিয়ে উঠল। “সায়ন রহমান! তুই এসে গেছিস? ভালোই হলো। আজ তোর চোখের সামনেই তোর এই সংসার ছারখার করে দেব। ধর ওদের!”
​রিয়াদের লোকগুলো আমাদের দিকে তেরে আসতেই আমার বডিগার্ডরা চি”তার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল ওদের ওপর। শুরু হলো এক তুমুল মা*রামা*রি। যে গু*ন্ডাটি মারিয়ার ঘরের দরজায় লা*থি মে*রেছিল, আমি নিজে গিয়ে তার কলার চেপে ধরলাম। চার বছরের জমে থাকা সমস্ত ক্ষো*ভ, অপমা*নের প্রতিশোধ আজ আমার হাতের মুঠোয়। আমি তাকে দেওয়ালে চেপে ধরে একের পর এক পাঞ্চ করতে লাগলাম।
​রিয়াদ পরিস্থিতি বেগতিক দেখে দৌড়ে গাড়িতে উঠে পালাতে চাইল। কিন্তু সে গাড়ির দরজা খোলার আগেই দূর থেকে পুলিশের সাইরেনের আওয়াজ ভেসে এল। চারপাশ থেকে পুলিশ এসে কর্ডন করে ফেলল পুরো এলাকা।
​রিয়াদ গাড়ি থেকে হাত তুলে নেমে এল, তার মুখ তখন ভয়ে ফ্যাকাসে। পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে রিয়াদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিলেন।
​আমি হাঁপাতে হাঁপাতে পুলিশের দিকে তাকালাম। ঠিক তখনই পুলিশের গাড়ির পেছন থেকে নেমে এলেন স্বয়ং রাবেয়া চৌধুরী। তার পেছনে রহমান সাহেব।
​মাকে এখানে দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মা রিয়াদের দিকে তাকিয়ে তীব্র ঘৃণায় বললেন, “তোমাদের মতো নোংরা লোক আমার চৌধুরী বংশের আলো ধুয়ে মুছে দিতে চেয়েছিল? মিথিলা আর তোমাকে আমি এমন জেল খাটাব, যা এই শহরের মানুষ সারাজীবন মনে রাখবে।”
​রিয়াদকে যখন পুলিশ ভ্যানে তোলা হচ্ছিল, তখন মা ধীরে ধীরে আমাদের সেই ছোট ঘরটার দিকে এগিয়ে এলেন। ঘরের ভেতর থেকে মারিয়া ততক্ষণে বাচ্চাদের কোলে নিয়ে বের হয়ে এসেছে।
​মা মারিয়ার সামনে এসে দাঁড়ালেন। তার সেই চিরচেনা অহংকারের খোলসটা আজ সম্পূর্ণ খসে পড়েছে। তিনি মারিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, কিন্তু কিছু বলার ভাষা পাচ্ছিলেন না। তার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল পড়ছে।
​তিনি হাঁটু গেড়ে বসলেন মেঝের ধুলোবালির ওপরেই। দুই নাতনির দিকে তাকিয়ে দুই হাত বাড়িয়ে দিলেন, “আমায় মাফ করে দিবি তোরা? তোদের এই বুড়ি দাদীকে তোরা মাফ করবি না?”
​ছোট ছেলেটা মারিয়ার দিকে তাকাল, তারপর গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে রাবেয়া চৌধুরীর গলা জড়িয়ে ধরল। মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। কয়েক বছরের অহংকার, কোটি টাকার দম্ভ আজ এক নাতনির নরম ছোঁয়ায় গলে জল হয়ে গেল।
​মারিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন আনন্দের জল। আমি মারিয়ার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম, ওর কাঁধে হাত রাখলাম।
​ঝড় কেটে গেছে। মেঘের আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে এক নতুন সূর্য। কিন্তু সায়নের এই ভাঙা ঘরে কি মা আবার ফিরে আসবেন? চৌধুরী বংশের এই নতুন অধ্যায় কোন দিকে মোড় নেবে?

আপনাদের কি মনে হয়?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান পর্ব-৭+৮

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৭
​কলমে The Story Haven

​রাবেয়া ভিলার সেই বিশাল লোহার গেটটা আজ আমার কাছে কোনো চেনা চত্বর নয়, বরং একটা হিং*স্র প*শুর হাঁ করা মুখের মতো মনে হচ্ছিল। দারোয়ানটা প্রথমে আমার ধুলোবালি মাখানো জামাকাপড় আর উষ্কখুষ্ক চুল দেখে পথ আটকাতে চেয়েছিল, কিন্তু আমার চোখের ভেতরের জ্বলন্ত আগুন দেখে সে আর সাহস করেনি। গুটিগুটি পায়ে ভেতরে ঢুকে লিভিং রুমের ভারী পর্দাটা সরাতেই আমি থমকে গেলাম।
​আমি ভেবেছিলাম ভেতরে কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি বা মা*রধরের শব্দ পাব। কিন্তু না, চারপাশ অদ্ভুত রকমের শান্ত। ঝাড়বাতির আলোয় পুরো ড্রয়িংরুমটা ঝলমল করছে। আর সেই দামি সোফায় বসে আছে মারিয়া। তার দুই পাশে আমার দুটো সন্তান ভ*য়ে জড়োসড়ো হয়ে মায়ের আঁচল আঁকড়ে ধরে আছে। মারিয়ার চোখ দুটো লাল, গালে অশ্রুর দাগ শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।
​তার ঠিক সামনে রাজকীয় ভঙ্গিতে সোফায় বসে আছেন আমার মা রাবেয়া চৌধুরী। আর পাশে কুৎসিত এক বিজয়ের হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মিথিলা ও তার ভাই রিয়াদ।
​”মা!” আমি প্রায় চিৎকার করে মারিয়া আর বাচ্চাদের দিকে এগিয়ে যেতে নিলাম।
​”খবরদার সায়ন! এক কদমও আর সামনে বাড়াবে না!” মায়ের সেই চেনা গম্ভীর, হাড়-হিম করা কণ্ঠস্বর গমগম করে উঠল।
​আমি থমকে দাঁড়ালাম। আমার চোখ দিয়ে তখন র*ক্তবর্ণ আগুন ঝরছে। “মা, এই নোংরামির মানে কী? তুমি রিয়াদ আর মিথিলাকে দিয়ে আমার স্ত্রী আর সন্তানদের অপহ*রণ করিয়ে এনেছ? তোমার অহংকার এতটা নিচে নেমে গেছে?”
​আমার কথা শুনে মা সোফা থেকে ধীরে ধীরে উঠলেন। তার মুখে কোনো অপ*রাধবোধ নেই, বরং এক ধরণের শীতল চতুরতা খেলা করছে। তিনি মারিয়ার দিকে এক নজর তাকিয়ে আমার দিকে ফিরলেন।
​”অপকর্ম তো তুই করেছিস সায়ন। চৌধুরী বংশের র**ক্তকে তুই একটা নোংরা বস্তির ডাস্টবিনে ফেলে রেখেছিস! আমার যেমনই রাগ থাকুক, এই রাবেয়া চৌধুরী এতটাও নিচে নামেনি যে নিজের বংশের র**ক্ত রাস্তায় রাস্তায় না খেয়ে ম*রবে,” মা চড়া গলায় বললেন।
​মায়ের মুখে ‘বংশের র*ক্ত’ শব্দটা শুনে আমি কিছুটা অবাক হলাম। মিথিলা এবার একটু এগিয়ে এসে বলল, “আন্টি একদম ঠিক বলেছেন সায়ন। তোমার ওপর আমাদের রাগ থাকতে পারে, কিন্তু এই নিষ্পাপ বাচ্চা দুটোর কোনো দোষ নেই। ওরা তোমার র*ক্ত।”
​আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। মারিয়া পাথরের মূর্তির মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। মা এবার মারিয়ার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তার হাত থেকে একটা চাবির গোছা আর একটা ব্যাংক চেকবই মারিয়ার সামনের কাঁচের টেবিলে রাখলেন।
​”মারিয়া…” মায়ের গলার স্বর এবার আচমকা নরম শোনাল, যা বি*ষের চেয়েও ভ*য়ঙ্কর। “যতই হোক, তুমি আমার নাতনিদের মা। চার বছর তুমি অনেক কষ্ট করেছ, আমি তার ক্ষতিপূরণ দিতে চাই। ঢাকার বাইরে, চট্টগ্রামে আমার একটা আলিশান ফ্ল্যাট আছে। এই চাবিটা সেই ফ্ল্যাটের। আর এই চেকবইয়ে একটা মোটা অঙ্কের টাকা সাইন করা আছে, যা দিয়ে তোমার বাকি জীবন রাজকীয়ভাবে কেটে যাবে। আমার নাতনিদের খাওয়া-পরা, নামী স্কুলে পড়াশোনা—সব দায়িত্ব আজ থেকে আমার।”
​আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মা মারিয়াকে লোভ দেখাচ্ছেন? মারিয়াকে টাকা আর ফ্ল্যাট দিয়ে দূরে সরিয়ে দিতে চান?
​”মা! তুমি আবার খেলা শুরু করেছ?” আমি চিৎকার করে উঠলাম।
​মা আমার দিকে হাত তুলে থামিয়ে দিলেন। তারপর মারিয়ার দিকে তাকিয়ে তার আসল বিষাক্ত চালটা চাললেন, “তবে একটা শর্ত আছে মারিয়া। আমার দেওয়া এই রাজকীয় জীবন, এই টাকা আর ফ্ল্যাট তুমি তখনই পাবে, যখন তুমি সায়নের জীবন থেকে চিরতরে সরে যাবে। তোমাকে এই শহর ছাড়তে হবে একা, সায়নকে ছাড়া। তুমি চার বছর পর তার কাছে , ফিরেছ কেবল টাকার লোভে। সায়নের চোখের সামনে তার এই সস্তা ভালোবাসার আসল রূপটা আমি দেখতে চাই। ও জানুক, টাকার ওপরে এই পৃথিবীতে কিচ্ছু নেই!”
​রুমের ভেতর এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। মিথিলা আর রিয়াদের মুখে এক পি*শাচের মতো হাসি। তারা খুব ভালো করেই জানে, চার বছরের অনাহার আর কষ্টের পর এই লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়া যেকোনো সাধারণ মানুষের জন্য অসম্ভব।

​আমার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। আমার চোখ দুটো তখন এক চরম আকুতি নিয়ে মারিয়াকে দেখছে। মারিয়া কি পারবে এই চার বছরের কষ্টের অবসান ঘটাতে মায়ের এই টাকার পাহাড়ের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে? ও যদি রাজি হয়ে যায়, আমি তো ওকে দোষ দিতে পারব না। ও তো সন্তানদের সুখে রাখতেই তা করবে। আমার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছিল।
​মারিয়া ধীরে ধীরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে টেবিলের ওপর রাখা সেই দামি চাবির গোছা আর চেকবইটার দিকে তাকাল। তার হাত দুটো কাঁপছিল। সে হাত বাড়িয়ে চেকবই আর চাবিটা নিজের হাতে তুলে নিল।
​মায়ের মুখে এক পরম তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মিথিলা ফিসফিস করে রিয়াদকে বলল, “দেখেছিস? টাকার কাছে সবাই গোলাম!”
​আমি চোখ বন্ধ করে নিলাম। আমার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তবে কি আজ আমার ভালোবাসার পরাজয় ঘটল? মারিয়াও কি আমাকে টাকার জন্য ত্যাগ করল?
​কিন্তু পরের মুহূর্তেই যা ঘটল, তার জন্য এই ড্রয়িংরুমের কেউ প্রস্তুত ছিল না।
​মারিয়া চাবির গোছা আর চেকবইটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে সোজা রাবেয়া চৌধুরীর মুখের সামনে ধরল। তারপর চরম ঘৃণাভরা এক টুকরো হাসি হেসে, চাবি আর চেকবইটা ড্রয়িংরুমের মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিল। ঝনঝন শব্দে চাবিটা ছিটকে পড়ল রাজকীয় কার্পেটের ওপর।
​”আপনার এই পাপের টাকা আর ক্ষমতার অহংকার আপনার কাছেই রাখুন, মিসেস চৌধুরী !” মারিয়ার গলার আওয়াজ এবার বজ্রের মতো শোনাল। “চার বছর আগে আপনি আপনার টাকা দিয়ে এই সায়নকে কিনতে পেরেছিলেন, কারণ তখন সে কাঁচা মাটির মতো নরম ছিল। কিন্তু আজ যে সায়ন আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, সে আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হয়েছে। সে সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দিতে মাথায় চটের বস্তা তুলতে পারে, কুলিগিরি করতে পারে। আপনার এই কোটি টাকার ফ্ল্যাটের চেয়ে ঘামে ভেজা ছেঁড়া শার্টের তলার বুকটা অনেক বেশি নিরাপদ!”
​মারিয়ার মুখে এই কথা শুনে রাবেয়া চৌধুরীর ফর্সা মুখটা মুহূর্তের মধ্যে কালো হয়ে গেল। মিথিলা আর রিয়াদের মুখের হাসি যেন এক লহমায় উধাও হয়ে গেল।
​মারিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন এক অপার্থিব গৌরব। সে আমার দিকে এগিয়ে এসে আমার ধুলোমাখা, খসখসে হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল।
​”চলুন সায়ন। আমাদের সন্তানদের চৌধুরী বংশের র**ক্ত দিয়ে বড় করতে হবে না। ওরা একজন সৎ বাবার র**ক্ত দিয়ে বড় হবে। এই পাপের প্রাসাদে আমাদের আর এক মুহূর্তও থাকার প্রয়োজন নেই,” মারিয়া দৃঢ় গলায় বলল।
​আমার বুকটা আজ গর্বে দ্বিগুণ হয়ে গেল। আমি মারিয়ার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলাম। দুই সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে আমরা যখন রাবেয়া ভিলার সদর দরজার দিকে পা বাড়ালাম, তখন পেছন থেকে রাবেয়া চৌধুরী রাগে অন্ধ হয়ে চিৎকার করে উঠলেন—
​”সায়ন! মারিয়া! মনে রাখিস, তোরা আমার অহংকারে আ*ঘাত করলি। এই শহর তোদের জন্য ন*রক বানিয়ে ছাড়ব আমি! তোরা বাঁচতে পারবি না!”
​কিন্তু আমরা আর পেছনে ফিরে তাকালাম না। আমরা ড্রয়িংরুম থেকে বের হয়ে এলাম। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, কিন্তু আমাদের সামনে এক নতুন ভোরের আলো অপেক্ষা করছে।
​তবে রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলা কি এই অপ*মান এত সহজে মেনে নেবে? সায়নের নতুন লড়াইয়ে তারা এবার কী ভয়*ঙ্কর চাল চালবে?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৮
​কলমে The Story Haven

​রাবেয়া ভিলার সদর দরজা পেরিয়ে যখন আমরা বাইরের পিচঢালা রাস্তায় এসে দাঁড়ালাম, তখন মাথার ওপর কৃষ্ণপক্ষের ম্লান চাঁদ। চারপাশ নিস্তব্ধ। দুই সন্তানকে দুই বাহুতে জড়িয়ে আমি হাঁটছিলাম, আর আমার পাশে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে হাঁটছিল মারিয়া। আজ আমাদের পকেটে টাকা নেই, থাকার মতো বড় বাড়ি নেই; কিন্তু বুকভরা যে শান্তি আছে, তা এই শহরের কোনো কোটিপতির সিন্দুকেও নেই।
​”মারিয়া, ভয় করছে না?” আমি আলতো করে ওর হাতটা ছুঁয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
​মারিয়া আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। সেই হাসিতে চার বছরের ক্লান্তি উবে গিয়ে এক অদ্ভুত মায়া খেলা করছিল। “যে একা সমুদ্র পাড়ি দিয়ে তীরে এসেছে সায়ন, সে ঝড়ের মেঘ দেখে ভ*য় পায় না। আর এখন তো আমার হাতটা ধরার জন্য আপনি আছেন।”
​আমি আর কিছু বলতে পারলাম না, শুধু ওর হাতটা আরও শক্ত করে ধরলাম। মাঝরাতের আগেই আমরা আমার সেই নতুন ভাড়া নেওয়া সেমি-পাকা ঘরটায় এসে পৌঁছালাম। ঘরটা ছোট, কিন্তু কাঠের শক্ত দরজাটা বন্ধ করতেই এক পরম নিরাপত্তার অনুভূতি আমাদের গ্রাস করল। বাচ্চাদের বিছানায় শুইয়ে দিতেই ওরা ক্লান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি আর মারিয়া সারারাত জেগে রইলাম—নতুন এক ভোরের স্বপ্ন বুনে।
​এদিকে রাবেয়া ভিলার ভেতরের পরিবেশ তখন থমথমে, যেন যেকোনো মুহূর্তে একটা আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়বে। ড্রয়িংরুমের মেঝেতে এখনো পড়ে আছে মারিয়ার ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া চাবির গোছা আর চেকবই।
​রাবেয়া চৌধুরী জানালার পাশে দাঁড়িয়ে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার ফর্সা মুখটা রাগে আর অপমা*নে থমথম করছে। ঠিক তখনই মিথিলা ড্রয়িংরুমে হিল জুতো খটখট করতে করতে ঢুকল। তার পেছনে তার ভাই রিয়াদ।
​মিথিলার চোখ-মুখ বি*ষাক্ত সা*পের মতো কুটিল হয়ে উঠেছে। সে সোজা রাবেয়া চৌধুরীর পিঠের পেছনে এসে দাঁড়াল।
​”আন্টি! আপনি ওই বস্তির মেয়েটার এত বড় অহংকার সহ্য করলেন?” মিথিলা দাঁতে দাঁত চেপে বলল। “যেখানে সায়ন আপনার পা ধরে ক্ষমা চাইবে, সেখানে ওই মেয়েটা আপনার মুখে টাকা ছুঁড়ে মে*রে চলে গেল! এর একটা বিহিত করতেই হবে।”
​রাবেয়া চৌধুরী কোনো জবাব দিলেন না, আগের মতোই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।
​মিথিলা এবার আরও এক কদম এগিয়ে এসে গলার স্বর নিচু করে, চরম হিং*স্রতা মিশিয়ে বলল, “আন্টি, এই ঝামেলার গোড়াটাই কে*টে ফেলা দরকার। সায়নের ওই জেদ আর অহংকার শুধু ওই মারিয়া আর তার দুটো বাচ্চার জন্য। আমার এক পরিচিত লোক আছে… রাস্তায় কোনো অ্যা**ক্সিডেন্ট বা রাতে ওই বস্তির ঘরে আ*গুন লা*গিয়ে যদি মারিয়া আর বাচ্চা দুটোকে একবারে মে** রে ফেলা যায়, তবে সায়ন পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। তখন ও নিজে এসে আপনার পায়ে লুটিয়ে পড়বে। মারিয়া আর বাচ্চা দুটোকে পৃথিবী থেকে সরি*য়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান!”
​”শাট আপ, মিথিলা!”
​হঠাৎ রাবেয়া চৌধুরী এক সিংহীর মতো গ*র্জন করে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার সেই তীক্ষ্ণ চিৎকার আর চোখের চাউনি দেখে মিথিলা দু-কদম পিছিয়ে গেল। রিয়াদও ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে পড়ল।
​”তুমি নিজের মুখে কী বললে, মিথিলা? ওই দুটো বাচ্চাকে মে**রে ফেলতে হবে?” রাবেয়া চৌধুরীর বুকটা তখন হাপরের মতো ওঠানামা করছে। তার চোখে রাগের পাশাপাশি এক অদ্ভুত আর্তি ফুটে উঠল।
​”কিন্তু আন্টি, ওরা তো—” মিথিলা কিছু বলতে চাইল, কিন্তু মা তাকে থামিয়ে দিলেন।
​”ওরা চৌধুরী বংশের র** ক্ত, মিথিলা! ওরা আমার সায়নের সন্তান!” রাবেয়া চৌধুরীর গলার স্বর এবার কেপে উঠল। এতক্ষণ ধরে যে পাথরের মতো শক্ত আবরণ তিনি ধরে রেখেছিলেন, তা যেন এক নিমিষেই চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেল।
​তিনি সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। তার মনের কোণে ভেসে উঠল একটু আগের সেই দৃশ্যটা—দুটো ফুলের মতো নিষ্পাপ বাচ্চা, বড় বড় চোখ করে ভ*য়ার্ত মুখে মারিয়ার আঁচল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের অবিকল সায়নের ছোটবেলার মতো টানা টানা চোখ, মায়াবী মুখ। হাজার হলেও তারা তার নিজের আপন নাতিন, এই চৌধুরী বংশের একমাত্র আলো।
​রাবেয়া চৌধুরী নিজের অজান্তেই তার দুই হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। তার চোখের কোণ দিয়ে দু-ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। “এতক্ষণ ড্রয়িংরুমে যখন বাচ্চা দুটো আমার সামনে বসে ছিল, আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মায়া মায়া লাগছিল। ওদের নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে আমি নিজের রাগ ধরে রাখতে পারছিলাম না। আমার নিজের বংশের আলো ওরা। ওদের গায়ে আঁচড় কাটার কথা তো দূর, কেউ যদি ওদের দিকে বাঁকা চোখে তাকায়, আমি তার চোখ উপড়ে ফেলব!”
​মিথিলা আর রিয়াদ একে অপরের দিকে তাকাল। তারা বুঝতে পারল, রাবেয়া চৌধুরীর ভেতরের ‘মা’ এবং ‘দাদী’ চরিত্রটা জাগ্রত হয়ে গেছে। টাকার অহংকার আজ এক মাতৃত্বের টানের কাছে হার মানতে শুরু করেছে।
​মা চোখ মুছে সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। তার চোখ এখন মিথিলার দিকে স্থির। “সায়নকে আমি শাস্তি দিতে চেয়েছিলাম কারণ ও আমার অবাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমার নাতনিদের কোনো ক্ষতি আমি সহ্য করব না। মিথিলা, তোমরা এখন এখান থেকে যাও। এরপর যদি আমার নাতনিদের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করো, তবে মনে রেখো—রাবেয়া চৌধুরীর চেয়ে বড় শত্রু তোমার লাইফে আর কেউ হবে না।”
​মিথিলা চরম অসন্তোষ আর ক্ষোভ নিয়ে রিয়াদকে নিয়ে রাবেয়া ভিলা থেকে বের হয়ে গেল। যাওয়ার সময় মনে মনে ভাবল, ‘বুড়িটা তো ইমোশনাল হয়ে গেল! কিন্তু আমি এত সহজে সায়নকে ছাড়ছি না। বুড়ি না করুক, আমি নিজেই মারিয়াকে শেষ করব!’
​পরদিন সকাল। কারওয়ান বাজারে আমি যখন করিম ভাইয়ের আড়তে পৌঁছে কাজে হাত দেব, ঠিক তখনই করিম ভাই আমার দিকে একটা খাম বাড়িয়ে দিলেন।
​”সায়ন ভাই, সকালে এক ভদ্রলোক এই খামটা আপনার নামে দিয়া গেছে। কইছে খুব জরুরি,” করিম ভাই বললেন।
​আমি অবাক হয়ে খামটা খুললাম। ভেতরে কোনো চিঠি নেই, বরং একটা নতুন ব্যাংকের চেকবই আর একটা ছোট চিরকুট। চিরকুটে কেবল দুটি লাইন লেখা—
​”চৌধুরী বংশের র** ক্ত কখনো কারো দয়ায় বাঁচে না, নিজের যোগ্যতায় বাঁচে। তোর মায়ের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু তোর বাবার রেখে যাওয়া এই গোপন ট্রাস্ট ফান্ডের টাকা ছোঁয়ার ক্ষমতা কারো নেই। এটা তোর বাবার পক্ষ থেকে তোর সন্তানদের জন্য উপহার। মাথা উঁচু করে দাঁড়া, সায়ন।”
​চিরকুটের নিচে কোনো নাম ছিল না, কিন্তু আমি হাতের লেখা দেখেই চিনতে পারলাম—এটা আমার মায়ের বিশ্বস্ত পিএ-র (Personal Assistant) হাতের লেখা। তার মানে… মা নিজে এই টাকা পাঠিয়েছেন? মুখে অহংকারের বাণী বললেও, মা কি তবে ভেতরে ভেতরে তার নাতনিদের মায়ায় গলে গেছেন?
​আমার চোখে জল চলে এল। কিন্তু একই সাথে আমার বুকের ভেতর এক অজানা আশঙ্কার ঘণ্টা বেজে উঠল। মা যদি শান্ত হয়ে যান, তবে মিথিলা আর রিয়াদ কি চুপ করে থাকবে? ওরা কি নতুন কোনো বড় ধরনের বিপদ নিয়ে আসছে মারিয়া আর আমার সন্তানদের দিকে?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান পর্ব-৫+৬

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৫
​কলমে The Story Haven

​”বাবা…”
​ছোট্ট ঠোঁট দুটো থেকে নিঃসৃত হওয়া ওই একটা শব্দ যেন তীব্র এক ব”জ্রপাতের মতো আমার সমস্ত অস্তিত্বকে কাঁপিয়ে দিল। চার বছর ধরে যে বুকে শুধু কর্পোরেট ফাইলের হিসাব আর মায়ের অহংকারের চাবু ক চলেছে, সেখানে আজ এক নিমিষেই এক মহাসমুদ্রের জোয়ার চলে এল। আমি দরজার চৌকাঠ থেকে ঘুরে তাকালাম। আমার চোখ দুটো তখন আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই, বাঁধভাঙা জলের মতো অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।
​আমি আবার হাঁটু গেড়ে বসলাম মেঝের ওপর। দুই হাত বাড়িয়ে দিলাম সেই ছোট্ট সোনার দিকে। মারিয়া এতক্ষণ পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে থাকলেও, ছেলের মুখ থেকে ‘বাবা’ ডাক শুনে তার শরীরটাও যেন একবার শিউরে উঠল। সে আড়চোখে আমার প্রসারিত হাত দুটোর দিকে তাকাল। তার চোখের কোণ দিয়ে আবারও জল নামল, তবে এবার সেই জলে মারিয়ার চিরচেনা অভিমান আর য*ন্ত্রণার পাশাপাশি কোথাও যেন একটুখানি দ্বিধাও মিশে ছিল।
​মারিয়া এবার আর সন্তানকে টেনে নিল না, বরং তার বাঁধনটা একটু আলগা হলো। ছোট ছেলেটা মায়ের কোল ছেড়ে গুটিগুটি পায়ে আমার দিকে এগিয়ে এল। তার ধুলোমাখা ছোট্ট হাত দুটো যখন আমার অশ্রুসিক্ত গালে স্পর্শ করল, আমার মনে হলো—আজ আমি পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ। আমি তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরলাম। চার বছরের চড়া দামে কেনা শূন্যতা এক মুহূর্তেই পূর্ণতায় রূপ নিল।
​”আমায় মাফ করে দিস বাবা… আমায় মাফ করে দিস,” বাচ্চার কাঁধে মুখ গুঁজে আমি ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলাম। অন্য ছেলেটাও তখন বড় বড় চোখে আমাদের দেখছিল, সেও এবার গুটিগুটি পায়ে এসে আমার পিঠের ওপর ছোট হাতটা রাখল। দুই সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরে আমি বুঝতে পারলাম, রাবেয়া চৌধুরীর কোটি টাকার রাজপ্রাসাদও এই সুখের কাছে কতখানি তুচ্ছ, কতখানি কাঙাল!
​বেশ কিছুক্ষণ পর মারিয়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। তার গলার স্বর এখনো ভারী, কিন্তু আগের মতো ধারালো নয়।
​”বাচ্চাদের কান্না থামান। ওদের পেট খালি। কান্না করলে খিদে আরও বাড়বে,” মারিয়া মাটির চুলার দিকে না তাকিয়েই বলল।
​আমি তাড়াহুড়ো করে চোখ মুছলাম। পকেট থেকে ফেলে দেওয়া ওয়ালেটটা কুড়িয়ে নিলাম। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বা ক্রেডিট কার্ড আজ অচল হতে পারে, কিন্তু ওটার এক কোণে কিছু ক্যাশ টাকা সবসময় গোঁজা থাকে, যা মায়ের দেওয়া নয়—আমার নিজের খাটুনির বোনাসের টাকা। আমি তক্ষুনি উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “আমি… আমি এখনই ওদের জন্য খাবার নিয়ে আসছি। মারিয়া, তুমিও সকাল থেকে কিছু খাওনি বোধহয়। আমি সবার জন্যই আসছি।”
​আমি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালাম না। বস্তির সরু গলি দিয়ে যখন প্রায় দৌড়ে বাজারের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন আশেপাশের মানুষগুলো আমার দামি শার্ট আর প্যান্টের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিল। কিন্তু আমার সেদিকে ভ্রূক্ষেপ ছিল না। আমার মাথায় তখন কেবল ঘুরছিল—আমার সন্তানদের ক্ষিদে মেটাতে হবে।
​বাজার থেকে গরম ভাত, ডাল আর ডিম ভাজা নিয়ে যখন ঘরে ফিরলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। মারিয়া ততক্ষণে ঘরটা কিছুটা গুছিয়ে নিয়েছে। মেঝেতে একটা ছেঁড়া মাদুর পাতা। আমি খাবারগুলো রাখতেই দুই ভাই খিদের চোটে একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়ল। মারিয়া ওদের মুখে লোকমা তুলে দিতে দিতে আমার দিকে তাকাল।
​”আপনি খাবেন না?” মারিয়ার গলায় কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত উদাসীনতা।
​”ওরা খাক, তুমি খাও… তারপর যদি বাঁচে, আমি খাব। না বাঁচলেও ক্ষতি নেই, ওদের খাওয়া দেখলেই আমার পেট ভরে যাবে,” আমি মলিন হেসে বললাম।
​মারিয়া আর কিছু বলল না। বাচ্চাদের খাওয়ানো শেষ করে সে নিজেও দুটো মুখে দিল। চার বছর পর আমরা এক ছাদের নিচে, এক ঘরে বসে খাচ্ছি—ভাবতেই আমার বুকটা হালকা হয়ে আসছিল। কিন্তু এই শান্তি কি আসলেই এত সহজে সায়নের ভাগ্যে লেখা আছে?
​ঠিক তখনই বস্তির বাইরে একটা কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামার শব্দ হলো। বস্তির ভাঙা জানলা দিয়ে উঁকি দিতেই আমার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল। গাড়িটা মায়ের নয়। এটা মিথিলার বাবার পার্সোনাল গাড়ি। গাড়ি থেকে নামল মিথিলার ভাই, রিয়াদ। তার পেছনে চার-পাঁচজন চেনা গু*ন্ডা গোছের ছেলে।
​রিয়াদ সোজা মারিয়ার ঘরের দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোখে-মুখে চরম অহংকার আর কদর্য এক হাসি। ঘরে ঢুকে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল, “বাহ্, সায়ন রহমান! কর্পোরেট কিং আজ বস্তির নোংরায় বসে ডিম-ভাত খাচ্ছে? দৃশ্যটা দেখার মতো বটে!”
​আমি উঠে দাঁড়ালাম, মারিয়া আর বাচ্চাদের নিজের পেছনে আড়াল করে বললাম, “রিয়াদ! ভদ্রভাবে বলছি, এখান থেকে যাও। আমার জীবনের সিদ্ধান্ত আমি নিয়ে নিয়েছি। মিথিলাকে গিয়ে বলো, আমি আর ওর লাইফে ফিরছি না।”
​রিয়াদ একটা কুৎসিত শব্দ করে হেসে উঠল। “মিথিলা? আরে, আমার বোন কি তোমার মতো এক কাপড়ের ভিখারির জন্য বসে আছে? রাবেয়া চৌধুরী তোমাকে ত্যাজ্যপুত্র করার পর তোমার ব্যাংকের সব অ্যাকাউন্ট সিজ (Freeze) করার প্রসেস শুরু হয়ে গেছে। তুমি এখন রাস্তার ফকির, সায়ন! আর আমাদের অপ*মান করার শোধ আমরা কীভাবে নিই, জানো?”
​কথাটা শেষ করেই রিয়াদ ঘরের এক কোণে থাকা মারিয়ার মাটির হাড়ি-পাতিলগুলো লা*থি মে*রে ভে*ঙে ফেলল। বাচ্চ দুটো ভ*য়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠল।
​”রিয়াদ!” আমি চিৎকার করে ওর কলার চেপে ধরলাম। কিন্তু ওর সাথে আসা লোকগুলো মুহূর্তের মধ্যে আমাকে চেপে ধরল। রিয়াদ আমার মুখের খুব কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “রাবেয়া আন্টি আমাদের বলে দিয়েছেন—তুমি যেন এই শহরে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে না পারো। কোনো অফিস তোমাকে চাকরি দেবে না, কোনো ভদ্রলোক তোমাকে ঘর ভাড়া দেবে না। আর এই মা**গী আর তার জা**রজ দুটোকে যদি বাঁচাতে চাও, তবে এই শহর ছেড়ে পালাও। নইলে কপালে অনেক দুঃখ আছে।”
​তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল। মারিয়া তীব্র এক চিৎকারে বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরল। রিয়াদরা হাসতে হাসতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল, যাওয়ার আগে মারিয়ার ঘরের নড়বড়ে দরজাটা লা**থি মে**রে ভে*ঙে দিয়ে গেল।
​ঘরটা আবার নিস্তব্ধ। শুধু বাচ্চাদের কান্নার আওয়াজ আর আমার ভাঙা হৃদয়ের দীর্ঘশ্বাস। আমি মেঝেতে পড়ে রইলাম, অপ**মানে আর ক্ষো*ভে আমার হাত দুটো মুঠো হয়ে আসছিল। রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলারা ভেবেছে তারা আমাকে ভে*ঙে চুরমা*র করে দেবে। কিন্তু তারা জানে না, যে মানুষ একবার তার র”ক্তিমা শিকড় চিনে ফেলে, তাকে উপড়ে ফেলা এত সহজ নয়।
​আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। মারিয়ার দিকে তাকালাম। মারিয়ার চোখে এখন আর ভ*য় নেই, সেখানে এক অদ্ভুত প্রতিবাদের আগু”ন জ্বলছে। সে বাচ্চাদের কান্না থামিয়ে আমার দিকে তাকাল।
​”আপনি বলেছিলেন না, শূন্য থেকে লড়াই শুরু করবেন?” মারিয়ার গলার স্বর এবার ইস্পাতের মতো শক্ত। “আমি চার বছর একা লড়েছি এই ন*রকে। আজ থেকে লড়াইটা আমরা দুজনে করব। ওদের ওই পাপের টাকা আর ক্ষমতার অহংকার আমরা এই ভাঙা টিনের ঘরে বসেই গুঁড়িয়ে দেব। পারবেন তো, সায়ন?”
​মারিয়ার মুখে চার বছর পর নিজের নাম শুনে আমার ভেতরের পুরুষটা যেন নতুন এক শক্তিতে জেগে উঠল। আমি মারিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে দৃঢ় গলায় বললাম, “পারব মারিয়া। সায়ন রহমান হারতে শেখেনি। এবার লড়াইটা শুধু বাঁচার নয়, এবার লড়াইটা আমাদের অধিকারের।”
​কিন্তু রাবেয়া চৌধুরীর পরবর্তী চাল কী হবে? সায়ন কি পারবে এই চক্রান্তের জাল ছিন্ন করে মারিয়া আর সন্তানদের এক নিরাপদ আকাশ দিতে?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান
​পর্ব ০৬
​কলমে The Story Haven

​রিয়াদরা চলে যাওয়ার পর ভা”ঙা দরজাটার দিকে তাকিয়ে আমার চোয়াল শক্ত হয়ে আসছিল। বস্তির ভা”ঙা টিনের চাল চিরে বিকেলের ম্লান আলোটা এসে পড়েছে মারিয়ার মুখের ওপর। সেখানে এখন আর কোনো দুর্বলতা নেই, বরং এক নতুন যু** দ্ধের প্রস্তুতি স্পষ্ট। যে মেয়েটা এতক্ষণ অপ*মানে কুঁকড়ে যাচ্ছিল, সে-ই এখন আমার সাহসের জ্বালানি।
​”আজকের রাতটা আমাদের এই ভা’ঙা দরজার ঘরেই কাটাতে হবে মারিয়া,” আমি মেঝে থেকে আমার ছেঁড়া ওয়ালেটটা তুলে নিয়ে শান্ত গলায় বললাম। “কাল সকালেই আমি আমাদের একটা নিরাপদ আস্তানার ব্যবস্থা করব। রিয়াদ বা আমার মা ভেবেছে তারা এই শহরের সব রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছে, কিন্তু তারা ভুলে গেছে—লড়াই যখন দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষের সাথে হয়, তখন নিয়মকানুন সব বদলে যায়।”
​মারিয়া কোনো কথা বলল না। সে বাচ্চাদের কপালে হাত বুলিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছিল। তার সেই স্তব্ধতা যেন ঝড়ের আগের পূর্বাভাস।
​পরদিন সকাল। সূর্য ওঠার আগেই আমি বস্তি থেকে বের হয়ে গেলাম। রিয়াদের হু*মকিটা ফাঁকা আওয়াজ ছিল না, সেটা আমি ভালো করেই জানতাম। কর্পোরেট জগতে আমার মা রাবেয়া চৌধুরীর প্রভাব কতটা, তা আমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।
​প্রথমে গেলাম আমার এক পুরনো বন্ধুর কাছে, যার সাথে আমি বেশ কয়েকটা বিজনেস ডিল করিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তার অফিসের রিসেপশনে পা দিতেই বুঝতে পারলাম পরিস্থিতি কতটা ঘোলাটে।
​”সায়ন, স্যরি ভাই। রাবেয়া অ্যান্টারপ্রাইজ থেকে সকাল সকাল কড়া নোটিশ পাঠানো হয়েছে। তোমাকে কোনো রকম সাহায্য করলে আমাদের সব রানিং প্রজেক্টের ফান্ডিং বন্ধ হয়ে যাবে,” বন্ধুটি আমার দিকে না তাকিয়েই অপরা*ধী গলায় বলল।
​আমি হাসলাম। এক অদ্ভুত, তাচ্ছিল্যের হাসি। “ঠিক আছে বন্ধু, অসময়ে চেনা মানুষগুলোর মুখোশ খুলে দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ।”
​বিকেল পর্যন্ত আমি শহরের চার-পাঁচটা অফিসে গেলাম। সবখানেই একই দেওয়াল, একই অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা। রাবেয়া চৌধুরী আসলেই এই শহরের বাতাস বিষাক্ত করে তুলেছেন আমার জন্য। ল্যাপটপ বা দামি স্যুট ছাড়া সায়ন রহমান যেন এই শহরের বুকে এক চলমান লা** শ। ক্ষিদে আর ক্লান্তিতে যখন পা দুটো ভে*ঙে আসছিল, তখন ঢাকার একটা ব্যস্ত মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। মাথার ওপর তপ্ত রোদ, আর চারপাশে বিলাসবহুল গাড়ির হর্ন। চার বছর আগে আমিও এই গাড়ির এসি কেবিনে বসে জানালা দিয়ে বাইরের মানুষদের দেখতাম। আজ আমি নিজেই সেই ফুটপাতে।
​পকেটে হাত দিয়ে দেখলাম মাত্র কয়েকটা টাকা অবশিষ্ট আছে। মায়ের দেওয়া ক্রেডিট কার্ডগুলো কাল রাতেই ব্লক করে দেওয়া হয়েছে। নিজের জমানো যে পার্সোনাল অ্যাকাউন্টটা ছিল, সেটাও মা আইনি মা*রপ্যাঁচে ফ্রিজ করিয়ে ছেড়েছেন।
​আমি কি তবে হেরে যাব? মারিয়া আর সন্তানদের আবার ওই নরকেই ফেলে রাখব?
​”না, অসম্ভব!” নিজের অজান্তেই চিৎকার করে উঠলাম। সায়ন রহমান কর্পোরেট অফিস চালাতে পারলে, নিজের বুদ্ধিকে অন্যভাবেও খাটাতে পারে।
​আমি সোজা চলে গেলাম কারওয়ান বাজারের এক পরিচিত পাইকারি আড়তদারের কাছে। এই লোকটির ব্যবসায়িক মন্দার সময় আমি তাকে একটা লোন পাস করিয়ে দিয়েছিলাম। সে রাবেয়া চৌধুরীর চক্রান্তের খবরের বাইরে ছিল।
​”সায়ন ভাই! আপনি এইখানে?” আড়তদার করিম মিয়া আমাকে দেখে আকাশ থেকে পড়লেন।
​”করিম ভাই, আমার কোনো দয়া লাগবে না, কোনো লোন লাগবে না। আমাকে শুধু কয়েকদিনের জন্য কিছু মাল বাকিতে দাও। আমি তোমার এইখানেই একটা ছোটখাটো সাপ্লাইয়ের কাজ শুরু করতে চাই। নিজের হাতে খাটব,” আমি সোজা সাপটা বললাম।
​করিম মিয়া আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কী যেন দেখলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “বড় মানুষেরা যখন সব ছাইড়া মাটিতে নামে, তখন তাদের আটকানো যায় না সায়ন ভাই। যান, পেছনের গোডাউনে মাল আছে, আপনি আজ থেকাই শুরু করেন।”
​সারাটা দিন হাড়ভাঙা খাটুনি খাটলাম। যে হাত শুধু দামি কলম আর ল্যাপটপের কিবোর্ড ছুঁয়েছে, সেই হাতে আজ চটের বস্তা আর হিসাবের খাতা। দিনশেষে যখন করিম ভাই আমার হাতে কিছু পারিশ্রমিক আর সামান্য লাভের টাকা তুলে দিলেন, তখন মনে হলো এই সামান্য কটা টাকার উজ্জ্বলতা আমার মায়ের ওই কোটি টাকার চেয়েও অনেক বেশি।
​সন্ধ্যা নামার আগেই আমি বস্তির কাছাকাছি একটা ছোট পরিবেশের সেমি-পাকা ঘর ভাড়া নিলাম। ঘরটা ছোট হলেও একটা মজবুত কাঠের দরজা আছে, যা অন্তত মাঝরাতে কোনো গু**ন্ডার লা*থিতে ভে*ঙে পড়বে না।
​টাকা চুকিয়ে যখন মারিয়া আর বাচ্চাদের নিতে সেই পুরোনো ভাঙা টিনের ঘরে ফিরলাম, তখন চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেছে। ঘরে ঢুকতেই আমার বুকটা কেঁপে উঠল।
​ঘর পুরো ফাঁকা।
​মেঝেতে মারিয়ার সেই রান্নার হাড়ি-পাতিলগুলো ভা*ঙা অবস্থায় পড়ে আছে, কিন্তু মারিয়া বা বাচ্চারা কেউ নেই। বিছানার চাদরটা টেনে মেঝেতে ফেলা।
​”মারিয়া! বাবা! তোরা কোথায়?” আমি পা*গলের মতো চিৎকার করে উঠলাম।
​বাইরে আসতেই পাশের ঘরের এক বৃদ্ধা নারী ভ*য়ার্ত গলায় ফিসফিস করে বললেন, “বাবা, দুপুরের দিকে ওই গু** ন্ডাগুলো আবার আইছিল। ওগো সাথে একটা বড় গাড়িও ছিল। মারিয়া মাইয়াডারে আর বাচ্চা দুইডারে জোর কইরা গাড়িতে তুইলা নিয়া গেছে। মাইয়াডা অনেক চিল্লাইছিল বাবা, আমরা কেউ ভয়ে আগাইতে পারি নাই।”
​আমার মাথার ভেতরটা এক মুহূর্তে শূন্য হয়ে গেল। রিয়াদ আর মিথিলা আমার মারিয়াকে নিয়ে গেছে? নাকি এর পেছনে স্বয়ং রাবেয়া চৌধুরী আছেন?
​আমার ভেতরের শান্ত মানুষটা নিমেষেই এক হিংস্র পশুতুল্য ক্রোধে রূপ নিল। তারা ভেবেছে সায়নকে এভাবে খাঁচায় বন্দি করে রাখা যাবে। তারা আমার ওপর আঘা*ত করেছে, আমি সয়েছি। কিন্তু আমার পরিবার, আমার সন্তানদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস তারা কীভাবে পেল?
​আমি পকেট থেকে ফোনটা বের করলাম। মিথিলার নম্বরে ডায়াল করতেই ওপাশ থেকে চিবিয়ে চিবিয়ে হাসির আওয়াজ ভেসে এল।
​”কী সায়ন? বস্তির জীবন কেমন এনজয় করছ? তোমার ওই সস্তা ভালোবাসা এখন কোথায়, জানো তো?” মিথিলার গলার স্বরে বিষাক্ত আনন্দ।
​”মিথিলা! আমার মারিয়া আর বাচ্চারা কোথায়? যদি ওদের একটা চুলও নষ্ট হয়, আমি ভুলে যাব যে তোমরা কারা। আমি এই শহর জ্বালিয়ে দেব!” আমার গলার আওয়াজে তখন খুনের নেশা।
​”আহা, এত রাগ ভালো না সায়ন। যদি তোমার সন্তানদের আর ওই মা** গীকে জ্যান্ত দেখতে চাও, তবে আজ রাত নয়টায় রাবেয়া ভিলা-য় চলে এসো। তোমার মা আর আমরা তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ রেডি করে রেখেছি। দেখি, তোমার ভালোবাসার জোর কতখানি!”
​খট করে ফোনটা কেটে গেল।
​আমি হাতের মুঠোয় ফোনটা শক্ত করে ধরলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠল মারিয়ার সেই প্রতিবাদের আ*গুনে ভরা চোখ দুটো, আর ছোট ছেলেটার মুখে ‘বাবা’ ডাক। রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলারা বা*ঘের ঘরে ঘোগের বাসা বেঁধেছে। তারা সায়ন রহমানকে চেনে, কিন্তু সন্তান আর স্ত্রীর জন্য লড়তে থাকা এক উন্মাদ বাবাকে এখনো চেনে না।
​রাত ঠিক পৌনে নয়টা। আমি রাবেয়া ভিলার বিশাল রাজকীয় গেটের সামনে এসে দাঁড়ালাম। আজ কোনো বিলাসবহুল গাড়ি থেকে নয়, সায়ন রহমান আজ পায়ে হেঁটে, শার্ট আর ধুলোবালি মাখানো শরীরে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিতে এসেছে।
​কিন্তু রাবেয়া ভিলার ভেতরে সায়নের জন্য কী ভয়ানক ফাঁ*দ পেতে রাখা হয়েছে? মারিয়া আর সন্তানদের বাঁচাতে সায়নকে কি কোনো বড় বলিদানের মুখোমুখি হতে হবে?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান পর্ব-৩+৪

হৃদয়ের টান
পর্ব ০৩
কলমে The Story Haven

​মিথিলার দেওয়া সেই চেনা হু*মকি আর দূর গলির মোড়ে মিলিয়ে যাওয়া মারিয়ার অবয়ব—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো চারপাশের বাতাস আচমকা ভারী হয়ে গেছে। চার বছর আগে ঠিক এই একই মোহ আমাকে অন্ধ করেছিল। আজ চার বছর পর, নিয়তি আমাকে আবার সেই একই চৌরাস্তায় এনে দাঁড় করিয়েছে।
​”কী হলো সায়ন? এত ভাবার কী আছে? ওই জরাজীর্ণ অতীতকে আঁকড়ে ধরে ফুটপাতে নামবে, নাকি আমাদের রাজকীয় ভবিষ্যৎ বেছে নেবে?” মিথিলা আমার উত্তরের অপেক্ষায় এক হাত কোমরে রেখে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
​আমি মিথিলার দিকে তাকালাম। এই সেই মেয়ে, যাকে আমার মা আমার জন্য নির্বাচন করেছেন। যার আভিজাত্য আছে, রূপ আছে, কিন্তু একটা ক্ষুধার্ত শিশুর জন্য বুকে এক ফোঁটা দয়া নেই। অথচ মারিয়া? এক কাপড়ে আমার বাড়ি থেকে বের হয়ে গিয়েও আজ চার বছর ধরে আমারই সন্তানদের বুকে আগলে এই তীব্র রোদে লড়াই করে যাচ্ছে।
​আমি একটা গভীর শ্বাস নিলাম। ভেতরের সমস্ত দ্বিধা, ভ’য় আর সম্পত্তির লো’ভ যেন এক মুহূর্তে কর্পূরের মতো উড়ে গেল।
​”মিথিলা…” আমার গলা এবার আর কাঁপল না, বরং এক অদ্ভুত দৃঢ়তা খেলে গেল কণ্ঠে, “তোমার ওই কোটি টাকার রাজপ্রাসাদ আর তোমার আভিজাত্য তোমাকে নিয়েই থাকুক। চার বছর আগে মায়ের সম্পত্তির লোভে আমি একটা জ্যান্ত মানুষকে খু** ন করেছিলাম, আজ নিজের র** ক্তকে চিনে নেওয়ার পর যদি আবার সেই ভুল করি, তবে খোদা আমাকে কোনোদিন ক্ষমা করবেন না।”
​”তার মানে? তুমি কী বলতে চাও সায়ন?” মিথিলার চোখ দুটো রাগে বড় বড় হয়ে গেল।
​”আমি বলতে চাই—আমাদের এই বিয়ে এখানেই শেষ। আমার মায়ের সম্পত্তি ওনার কাছেই থাক, আমি আমার সন্তানদের ফেরত চাই।”
​কথাটা বলেই আমি মিথিলার ধরে রাখা হাতের বাঁধন এক ঝটকায় মুক্ত করে দিলাম। মিথিলা পেছনে চিৎকার করে বলতে লাগল, “সায়ন! তুমি একটা আস্ত পা*গল! তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে সায়ন! আমার মা-বাবা আর তোমার মা তোমাকে রাস্তায় নামিয়ে ছাড়বে!”
​কিন্তু সেই চিৎকার তখন আমার কাছে কেবলই অর্থহীন কিছু শব্দ মাত্র। আমি তখন দৌড়াচ্ছি। যে গলিটা দিয়ে মারিয়া তার দুই সন্তানকে নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে, আমি সেই গলির দিকে অন্ধের মতো ছুটতে লাগলাম।
​গলিটা বেশ সরু আর নোংরা। চারপাশটা কেমন যেন ঘিঞ্জি। একটু এগোতেই বুঝলাম এটা শহরের একটা অবহেলিত বস্তি এলাকা। ভাঙাচোরা টিনের চাল, নর্দমার গন্ধ আর চারপাশের অভাবের ছাপ স্পষ্ট। আমি দুচোখ মেলে মারিয়াকে খুঁজতে লাগলাম। তীব্র অপ*রাধবোধে আমার ফুসফুস ফেটে যাচ্ছিল। যে মারিয়া ধানমন্ডির শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ফ্ল্যাটে রাজকন্যার মতো থাকত, সে আজ এই ন*রককুণ্ডে দিন কাটাচ্ছে?
​কিছুদূর গিয়ে একটা কুয়োর পাড়ে কয়েকজন মধ্যবয়সী মহিলাকে কাপড় কাচতে দেখে আমি হাপালে হাপাতে জিজ্ঞেস করলাম, “আচ্ছা, একটু আগে কোলে দুটো যমজ বাচ্চা নিয়ে একটা মেয়ে এই দিকে এসেছে… আপনারা কি দেখেছেন ও কোথায় গেছে?”
​মহিলারা প্রথমে আমার স্যুট-বুট আর দামি ঘড়ি দেখে একটু অবাক হলেন। তারপর একজন হাত উঁচিয়ে ভেতরের একটা ভাঙা টিনের ঘরের দিকে ইশারা করে বললেন, “ওই যে উত্তরের শেষ মাথায় তালি দেওয়া টিনের ঘরটা দেখতাছেন, ওইখানে থাহে মারিয়া। আজ কয়েক বছর ধইরা দুইডা এতিম বাচ্চা লইয়া অনেক কষ্টে দিন কাটতাছে মেয়েটা।”
​’এতিম বাচ্চা’ শব্দটা আমার বুকে তীরের মতো বিঁধল। ওরা এতিম নয়, ওদের বাবা বেঁচে আছে, অথচ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপ*রাধী হয়ে বেঁচে আছে।

​আমি ধীর পায়ে সেই ঘরটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজার নামমাত্র একটা পুরোনো চটের পর্দা ঝুলছে। ভেতর থেকে একটা বাচ্চার মৃদু কান্নার আওয়াজ আর মারিয়ার শান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে, “কেঁদো না বাবা, আর একটুখানি সহ্য করো। মা একটু পরেই তোমাদের জন্য ভাত ফুটিয়ে দিচ্ছি। লক্ষ্মী বাবা আমার, কেঁদো না…”
​আমার চোখের জল আর বাধা মানল না। আমি কাঁপতে কাঁপতে চটের পর্দাটা সরিয়ে ঘরের ভেতর পা রাখলাম।
​ঘরের ভেতরের দৃশ্য দেখে আমার কলিজাটা যেন ছিঁড়ে গেল। একটা জরাজীর্ণ চৌকি, কোণায় কয়েকটা অ্যালুমিনিয়ামের থালাবাসন, আর মেঝেতে ছড়ানো কিছু কুড়ানো প্লাস্টিকের বোতল আর ভাঙারি। মারিয়া একটা মাটির চুলার সামনে বসে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, আর তার চোখের জল গিয়ে পড়ছে চুলার খড়কুটোয়। দুই পাশে দুই যমজ শিশু ক্ষুধার্ত চোখে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে।
​”মারিয়া…” আমি খুব মৃদুস্বরে ডাকলাম।
​আমার গলার আওয়াজ পেয়ে মারিয়া চমকে পেছনে তাকাল। আমাকে এই ভাঙা ঘরে দেখে তার চোখের জল মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। সে দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বাচ্চাদের নিজের পেছনে আড়াল করল, যেন আমি কোনো হিং*স্র পশুপাখি, যা তার বাচ্চাদের ক্ষতি করতে এসেছে।
​”আপনি এখানে কেন এসেছেন? কে আপনাকে আমার ঘরের ঠিকানা দিয়েছে? দয়া করে চলে যান!” মারিয়ার গলার স্বর এবার আর শান্ত ছিল না, তাতে ছিল এক তীব্র আর্তনাদ।

​”মারিয়া, আমি সব ছেড়ে চলে এসেছি। আমি মিথিলাকে ছেড়ে দিয়েছি, মায়ের সম্পত্তি পায়ে ঠেলে দিয়েছি। আমি শুধু তোমাদের চাই। আমাকে একটা সুযোগ দাও মারিয়া, আমি আমার সন্তানদের এই ন*রক থেকে বের করে নিয়ে যাব,” আমি মেঝেতেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়লাম। এক কোটিপতি ব্যবসায়ী সায়ন রহমান আজ ফুটপাতে বসে তার প্রাক্তন স্ত্রীর কাছে ভিক্ষা চাচ্ছে।
​মারিয়া একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল, “বের করে নিয়ে যাবেন? কোথায় নিয়ে যাবেন? আপনার মায়ের সেই রাজপ্রাসাদে? যেখানে প্রতিদিন আমাকে অপবাদ সইতে হতো? যেখানে সামান্য একটা ভুলের জন্য আমাকে সারারাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে হতো? সায়ন রহমান, এই তালি দেওয়া টিনের ঘরটা দেখতে নোংরা হতে পারে, কিন্তু এখানে কোনো মিথ্যে অভিনয় নেই, কোনো সম্পত্তির লোভ নেই।”
​”আমি ভুল করেছি মারিয়া! আমি স্বীকার করছি আমি পাপিষ্ঠ! কিন্তু ওরাই তো আমার সব…” আমি বাচ্চাদের দিকে হাত বাড়াতেই মারিয়া তীব্র গলায় চিৎকার করে উঠল, “ওরা আপনার কেউ না! চার বছর আগে যখন আপনার মা আমাকে বন্ধ্যা বলে অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছিল, তখন আপনি চুপ ছিলেন। আমার বাবা সেই অপ*মান সইতে না পেরে হার্ট অ্যা*টাক করে মা**রা গেলেন, তখনও আপনি আসেননি। আমি যখন স্টেশনে স্টেশনে এক ফোঁটা পানির জন্য কেঁদেছি, তখন আপনার মা আর আপনি এসি রুমে ঘুমাচ্ছিলেন। আজ কোন অধিকারে আপনি আমার বাচ্চাদের বাবা সাজতে এসেছেন?”

​মারিয়ার মুখ থেকে তার বাবার মৃ**ত্যুর খবরটা শুনে আমার পুরো শরীর অবশ হয়ে গেল। মারিয়ার সৎ, সাধারণ শিক্ষক বাবা… আমার মায়ের চক্রান্তে আর আমার নীরবতায় আজ দুনিয়ায় নেই! অপরা*ধের বোঝাটা আমার ঘাড়ে এতটাই ভারী হয়ে উঠল যে আমার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বেরোলো না।
​ঠিক তখনই বস্তির বাইরে একটা দামি গাড়ির হর্নের শব্দ শোনা গেল। হর্নটা অনবরত বেজেই চলেছে।
​কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘরের বাইরে ভারী জুতো আর চড়া গলার আওয়াজ পাওয়া গেল। পর্দা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন আমার মা, রাবেয়া চৌধুরী। ওনার পেছনে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দাঁড়িয়ে আছে মিথিলা।
​আমার মা ঘরের চারপাশের নোংরা পরিবেশ দেখে নাক কুঁচকে আঁচল চাপা দিলেন। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে কঠোর গলায় বললেন, “সায়ন! এই নোংরা নর্দমায় বসে তুমি কী করছ? এই ভিখারির বাচ্চারাই নাকি তোমার র**ক্ত? মিথিলার কাছে সব শুনে আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। এখনই চলো আমার সাথে!”
​মারিয়া আমার মায়ের দিকে তাকাল। তার চোখে আজ আর চার বছর আগের সেই ভ*য় বা দয়া ভিক্ষার চাউনি ছিল না। সে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “আপনার ছেলেকে নিয়ে যান বড়লকানি সাহেব। আমার এই পবিত্র ঘরে আপনাদের মতো অহংকারী মানুষের নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে।”
​মা মারিয়ার দিকে তড়িৎ চোখে তাকিয়ে বললেন, “মুখ সামলে কথা বলো মারিয়া! তোমার মতো সস্তা মেয়ের চাল আমি ভালো করেই বুঝি। বাচ্চার টোপ ফেলে আমার ছেলের কোটি টাকার সম্পত্তি হাতানোর ফন্দি করেছ, তাই না? এই নাও…”
​মা ওনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে এক তাড়া পাঁচশত টাকার নোট বের করে মারিয়ার পায়ের কাছে ছুঁড়ে মারলেন, “এই নাও পাঁচ লাখ টাকা। আমার ছেলেকে আর আমার পরিবারকে মুক্তি দাও। আর কোনোদিন সায়নের সামনে আসবে না।”
​টাকাগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। ঘরের ভেতরের বাতাস যেন মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। আমি মায়ের এই নিষ্ঠুরতা দেখে স্তব্ধ হয়ে রইলাম। কিন্তু মারিয়া যা করল, তা আমরা কেউ কল্পনাও করতে পারিনি।
​মারিয়া নিচু হয়ে টাকাগুলো কুড়ালো না। সে শান্ত পায়ে চুলার পাশ থেকে একটা জ্বলন্ত লাকড়ি তুলে নিল। তারপর তীব্র ঘৃণায় সেই জ্বলন্ত লাকড়িটা মায়ের ছুঁড়ে দেওয়া টাকার ওপর চেপে ধরল। চোখের পলকে কোটিপতির অহংকারের প্রতীক সেই নোটগুলো দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল।
​মায়ের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। মিথিলা ভয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
​মারিয়া জ্বলন্ত টাকার দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু বজ্রকণ্ঠে বলল, “টাকা দিয়ে সব কেনা যায় না রাবেয়া চৌধুরী। চার বছর আগে আপনার এই টাকা আমার সংসার পু*ড়িয়েছিল, আজ আপনার টাকাই আপনার চোখের সামনে পু*ড়লো। নিয়ে যান আপনার ছেলেকে। কিন্তু মনে রাখবেন, সায়ন রহমান যদি আজ এই ঘর থেকে বের হয়ে যায়, তবে ওনার জন্য এই পৃথিবীর সমস্ত দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে।”
​মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে আমার হাত ধরে টানলেন, “সায়ন, চলো! এই পাগ*লি মেয়ের সাথে থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। যদি আজ না চলো, তবে আজই আমার ত্যাজ্যপুত্র হবে তুমি!”
​আমি একবার মায়ের দিকে তাকালাম, যেখানে শুধু অহংকার আর টাকা। আর একবার তাকালাম মারিয়া আর আমার দুই নিষ্পাপ সন্তানের দিকে, যাদের চোখে আমার জন্য শুধু ঘৃণা আর এক বুক নীরব প্রশ্ন।
​আমার জীবনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুহূর্তটি চলে এসেছে। মায়ের কোটি টাকার সম্পত্তি নাকি এই জলন্ত অগ্নিকুণ্ডের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা আমার নিজের পরিবার?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান
পর্ব ০৪
কলমে The Story Haven

​মায়ের টানানো হাতের সেই শক্ত বাঁধন আর মারিয়ার চোখের জ্বলন্ত অগ্নি’কুণ্ড—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আমার মনে হলো, আজ যদি আমি এক পা-ও পিছিয়ে যাই, তবে আমার ভেতরের মানুষটা চিরতরে ম*রে যাবে। টাকা আর সম্পত্তির লোভে চার বছর আগে একবার নিজেকে বিক্রি করেছিলাম, যার মাসুল আজ একটা ভাঙা টিনের ঘরে আমার দুটো নিষ্পাপ সন্তান আর তাদের মায়ের চোখের জল দিয়ে শোধ হচ্ছে। না, আর না!
​আমি ধীরে ধীরে মায়ের হাত থেকে নিজের কবজিটা ছাড়িয়ে নিলাম। আমার এই আকস্মিক আচরণে মা যেন আকাশ থেকে পড়লেন।
​”সায়ন! কী করছ তুমি? আমার হাত সরিয়ে দিলে?” মায়ের গলা কাঁপছিল, তবে তা স্নেহে নয়, চরম অহংকারে আঘা*ত লাগার ক্ষোভে।
​আমি মায়ের দিকে তাকিয়ে শান্ত কিন্তু অসম্ভব দৃঢ় গলায় বললাম, “মা, তোমার এই কোটি টাকার সম্পত্তি, এই বিলাসবহুল গাড়ি-বাড়ি আজ থেকে সব তোমার। চার বছর আগে তোমার ত্যাজ্যপুত্র হওয়ার ভয়ে আমি নিজের বিবেক বন্ধক রেখেছিলাম। কিন্তু আজ আমি আমার র*ক্তকে চিনে ফেলেছি মা। এই তালি দেওয়া টিনের ঘরে যে দুটো বাচ্চা দাঁড়িয়ে আছে, ওরা কোনো ভিখারির বাচ্চা নয়, ওরা সায়ন রহমানের সন্তান। আজ আমি তোমার ওই পাপের টাকা আর অহংকারকে ত্যাজ্য করলাম।”
​”সায়ন! তুমি একটা অকৃতজ্ঞ ছেলে! সামান্য একটা পথের মেয়ের জন্য তুমি তোমার জন্মদাত্রী মাকে অপমা*ন করছ? মনে রেখো, এই রাবেয়া চৌধুরীর অবাধ্য হয়ে এই শহরে কেউ মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারেনি। তুমিও পারবে না! রাস্তায় রাস্তায় না খেয়ে ম*রবে তুমি!” মা রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠলেন।
​পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মিথিলা এতক্ষণ টাকার আগুন আর আমার রূপ দেখে স্তম্ভিত হয়ে ছিল। সে এবার মায়ের হাত ধরে বলল, “আন্টি, ওনাকে বলতে দিন। ওনার মতো একটা পাগ*ল মানুষের সাথে সংসার করার কোনো ইচ্ছে আমারও নেই। চলেন আন্টি, লেট হিম রট ইন দিস হেল!”
​মা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। মারিয়ার পুড়তে থাকা টাকার ছাইয়ের দিকে এক নজর তীব্র ঘৃণায় তাকিয়ে, মিথিলাকে নিয়ে হনহন করে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। বাইরে ওনার দামি গাড়ির স্টার্ট নেওয়ার শব্দ আর চাকার কর্কশ আওয়াজ ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
​ঘরটা আবার স্তব্ধ হয়ে গেল। শুধু মাটির চুলার ধোঁয়া আর পো*ড়া নোটের গন্ধ বাতাসে ভাসছিল।
​আমি মারিয়ার দিকে তাকালাম। মারিয়া তখনও সেই জ্বলন্ত লাকড়িটা হাতে নিয়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার ফর্সা কপাল বেয়ে ঘাম আর চোখের জল মিশে এক হয়ে যাচ্ছে। আমি এক কদম এগিয়ে ওনার হাত থেকে লাকড়িটা আলতো করে কেড়ে নিয়ে মেঝেতে নামিয়ে রাখলাম।
​”মারিয়া…” আমার কণ্ঠস্বর অপ*রাধবোধে বুজে আসছিল।
​মারিয়া আমার দিকে তাকাল। তার চোখের সেই রাগটা যেন নিভে গিয়ে এখন এক মহাসমুদ্রের মতো ক্লান্তি আর শূন্যতায় রূপ নিয়েছে। সে ধপ করে মেঝের ওপর বসে পড়ল। দুই যমজ বাচ্চা মায়ের এই অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে ওনার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল, “মা… ও মা, কাঁদো কেন? খিদে পাইছে মা…”
​বাচ্চা দুটোর ‘খিদে পাইছে’ আকুতি শুনে আমার কলিজাটা যেন কেউ টেনে ছিঁড়ে ফেলল। আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। হাঁটু গেড়ে ওদের সামনে বসে পড়লাম। পকেট থেকে আমার দামি ওয়ালেট, ক্রেডিট কার্ড—সব বের করে ছুড়ে ফেলে দিলাম। এই প্লাস্টিকের টুকরোগুলো তো এই মুহূর্তে আমার সন্তানদের এক মুঠো অন্ন এনে দিতে পারবে না!
​”মারিয়া, আমি জানি আমি ক্ষমা পাওয়ার যোগ্য নই। তোমার বাবার মৃ** ত্যুর জন্য, তোমাদের এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। আমি তোমাকে জোর করব না আমাকে মেনে নেওয়ার জন্য। কিন্তু প্লিজ, এই বাচ্চাদের ওপর অন্যায় করো না। আমাকে ওদের জন্য একটু খাটতে দাও। আমি আজই কাজ খুঁজব। সায়ন রহমান কর্পোরেট অফিস চালাতে পারলে, সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য কুলি-মজুরের কাজও করতে পারবে।” আমার চোখ দিয়ে তখন অবিরল ধারায় জল নামছিল।
​মারিয়া বাচ্চাদের বুকে জড়িয়ে ধরে মাথা নিচু করে রইল। অনেকক্ষণ পর সে তার ভাঙা গলায় বলল, “চারটে বছর, সায়ন… চারটে বছর আমি কীভাবে কাটিয়েছি, আপনি তার এক কনাও কল্পনা করতে পারবেন না। বাবা যখন মা**রা গেলেন, তখন আমার গর্ভে এই দুটো প্রাণ। বাড়িওয়ালা আমাদের বের করে দিয়েছিল। একটা সস্তা কাপড়ের কারখানায় কাজ নিয়েছিলাম, কিন্তু যমজ বাচ্চা পেটে নিয়ে যখন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না, মালিক তাড়িয়ে দিল। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে শুয়ে যখন যন্ত্রণায় চিৎকার করেছি, তখন একটা চেনা মুখকে খুব ডেকেছিলাম। কেউ আসেনি।”
​মারিয়ার প্রতিটি শব্দ আমার বুকে এক একটা তীরের মতো বিঁধছিল।
​সে চোখের জল মুছে আমার দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “আজ আপনি সব ছেড়ে এসেছেন কার জন্য? অনুশোচনার জন্য, নাকি দয়া দেখানোর জন্য? আমার দয়ার প্রয়োজন নেই।”
​”দয়া নয় মারিয়া, অধিকার… বাবা হিসেবে প্রায়শ্চিত্ত করার অধিকার,” আমি কাঁপানো হাত বাড়িয়ে এবার ছোট ছেলেটার গালটা একটু ছুঁয়ে দিলাম। ছেলেটা ভয় পেয়ে মারিয়ার আঁচলে মুখ লুকাল। আমার নিজের সন্তান আমাকে দেখে ভ*য় পাচ্ছে—এর চেয়ে বড় শাস্তি একজন বাবার জন্য আর কী হতে পারে!
​আমি উঠে দাঁড়ালাম। চোখের জল মুছে বললাম, “আমি আজই এই বস্তির পাশেই একটা ছোট ঘর ভাড়া নেব। তোমরা এই নর*কে আর থাকবে না। আমার মায়ের দেওয়া কোনো টাকা আমি ছোঁব না, আমার নিজের জমানো যেটুকু পার্সোনাল অ্যাকাউন্ট আছে, তা দিয়ে তোমাদের একটা ভদ্র জায়গায় নিয়ে যাব। তারপর নতুন করে শূন্য থেকে লড়াই শুরু করব। তুমি আমাকে ক্ষমা না করলেও, আমি তোমাদের ছায়া হয়ে পাশে থাকব।”
​কথাটা বলে আমি ঘর থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা ক্ষীণ, দুর্বল কণ্ঠ ভেসে এল, “বাবা…”
​আমি চমকে পেছনে তাকালাম। মারিয়ার কোল থেকে অন্য ছোট শিশুটি আমার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে। সে হয়তো মারিয়া আর আমার কথোপকথন থেকে ‘বাবা’ শব্দটা চিনে নিয়েছে।
​আমার পুরো পৃথিবী যেন এক মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল। চার বছরের সমস্ত দুঃখ, কষ্ট, অহংকার আর লোভ ওই একটা ছোট্ট শব্দের কাছে নতজানু হয়ে গেল। আমি আবার দরজার কাছে ফিরে এলাম, বুকভরা এক তীব্র আকুতি নিয়ে।
​কিন্তু মারিয়া কি সায়নকে এত সহজে ক্ষমা করতে পারবে? রাবেয়া চৌধুরী আর মিথিলা কি সায়নকে এভাবে শান্তিতে বাঁচতে দেবে, নাকি শুরু হবে এক নতুন চক্রান্ত?

​(চলবে…)

হৃদয়ের টান পর্ব-১+২

হৃদয়ের টান
পর্ব ০১
The Story Haven

আমার প্রাক্তন স্ত্রী দুটি সন্তান কোলে নিয়ে রাস্তা পার হতে দেখে আমার হবু স্ত্রী আমাকে বলল,
“ভালো করে দেখো ওকে, সায়ন! তোমার প্রাক্তন স্ত্রী শেষ পর্যন্ত দুই যমজ বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ভাঙারি কুড়াচ্ছে।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল।

রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার দিকে আমি স্থির চোখে তাকিয়ে রইলাম।, বিবর্ণ সালোয়ার-কামিজ, কাঁধে পুরোনো একটা ব্যাগ। দুই হাতে দুই ছোট্ট শিশুকে সামলে সে রাস্তা পার হওয়ার চেষ্টা করছে। গাড়ির হর্ন, মানুষের ভিড় আর ধুলাবালির মাঝেও আমি তাকে চিনে ফেললাম।
সে মারিয়া।
আমার প্রাক্তন স্ত্রী।
যে মেয়েটা একসময় আমার ঘরের রানী ছিল, আজ সে শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ।
আর আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে মিথিলা, আমার হবু স্ত্রী।
মিথিলা ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে বলল,
“তুমি তো বলেছিলে ও খুব অহংকারী ছিল। দেখো, ভাগ্য কাকে কোথায় নামিয়ে আনে!”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
কারণ আমার মাথার ভেতর তখন চার বছর আগের ঘটনাগুলো ঝড়ের মতো ফিরে আসছিল।
চার বছর আগে মারিয়া ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ।
আমরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম।
মারিয়ার বাবা ছিলেন একজন সৎ স্কুলশিক্ষক। বেশি টাকা-পয়সা ছিল না, কিন্তু মানুষ হিসেবে অসাধারণ ছিলেন।
অন্যদিকে আমার মা ছিলেন ধনী ব্যবসায়ী আমার নানাভাই তাকে এগুলো দিয়ে গিয়েছিল। আমাদের কয়েকটি বাড়ি, জমি আর একটি বড় শপিং কমপ্লেক্স ছিল।
মা সবসময় বলতেন,
“আমার সম্পত্তির উত্তরাধিকার হবে সেই ছেলে, যে আমার কথা অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে।”
আমি তখন মায়ের কথাতেই চলতাম।
একদিন মা আমাকে ডেকে বললেন,
“মারিয়াকে ডি*ভোর্স দাও।”
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
“কেন?”
মা ঠান্ডা গলায় বলেছিলেন,
“কারণ আমি ওকে পছন্দ করি না। আর যদি আমার সম্পত্তি চাও, তাহলে আমার সিদ্ধান্ত মেনে নিতে হবে।”
আমি প্রতিবাদ করতে পারতাম।
আমি মারিয়ার পাশে দাঁড়াতে পারতাম।
কিন্তু আমি সেটা করিনি।
কারণ আমি লোভী ছিলাম।
মায়ের কোটি টাকার সম্পত্তি হারানোর সাহস আমার ছিল না।
সেই দিন থেকেই আমি মারিয়ার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার শুরু করলাম।
কারণে-অকারণে চিৎকার করতাম।
সামান্য ভুলেও অপ*মান করতাম।
অনেক রাত পর্যন্ত তাকে কাঁদিয়ে রাখতাম।
তবুও মারিয়া আমাকে ছেড়ে যায়নি।
সে শুধু বলত,
“সায়ন, আমি কি এমন ভুল করেছি যে তুমি এত বদলে গেলে?”
আমি উত্তর দিতাম না।
কারণ সত্যিটা বলতে লজ্জা লাগত।
একদিন সে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল,
“তোমার মা যদি আমাকে না-ও পছন্দ করেন, তবু তুমি তো আমাকে ভালোবাসো, তাই না?”
আমি সেদিনও চুপ ছিলাম।
আর আমার সেই নীরবতাই ছিল সবচেয়ে নিষ্ঠুর উত্তর।
কয়েক মাস পরে আমি তাকে ডিভো*র্স পেপার এগিয়ে দিলাম।
মারিয়া কাগজটার দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারেনি।
তারপর ধীরে ধীরে বলেছিল,
“শুধু একবার সত্যি কথা বলো। তুমি কি আমাকে আর ভালোবাসো না?”
আমি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।
কারণ আমি জানতাম, আমি এখনো তাকে ভালোবাসি।
কিন্তু সম্পত্তির লোভ আমার ভালোবাসার চেয়ে বড় হয়ে গিয়েছিল।
সেদিন মারিয়া কাগজে সই করে চলে গিয়েছিল।
যাওয়ার সময় শুধু একটা কথা বলেছিল,
“একদিন তুমি নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতপ্ত হবে, সায়ন।”
আমি তখন তার কথায় হাসছিলাম।
ভাবছিলাম, কোটি টাকার সম্পত্তি পেলে অনুতাপের কোনো কারণই থাকবে না।
কিন্তু জীবন কখনো কখনো এমন হিসাব মেলায়, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না।
হঠাৎ একটি ছোট্ট ছেলে মারিয়ার কাঁধে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করল।
মারিয়া তাকে বুকে টেনে নিল।
অন্য শিশুটিও তার আঁচল আঁকড়ে ধরল।
আমি বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম।
দুই শিশু দেখতে প্রায় একরকম।
যমজ।
আমার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ভ’য় জন্ম নিল।
কারণ ডিভো*র্সের আগে মারিয়া একবার আমাকে বলেছিল যে সে মনে হয় মা হতে চলেছে।
আর আমি সেই কথাকেও গুরুত্ব দিইনি।
আমি ধীরে ধীরে রাস্তার দিকে এগোতে শুরু করলাম।
মিথিলা বিরক্ত হয়ে বলল,
“কোথায় যাচ্ছ?”
আমি কোনো উত্তর দিলাম না।
আমার চোখ তখন শুধু মারিয়ার দিকে।
হঠাৎ মারিয়ার গাড়ি দেখে দৌড় দেওয়ার সময় তার হাতের ব্যাগ পড়ে গিয়ে পুরোনো ফাইল থেকে কয়েকটি কাগজ বাতাসে উড়ে রাস্তার ওপর পড়ে গেল।
একটি কাগজ এসে আমার পায়ের কাছে থামল।
আমি নিচু হয়ে সেটা তুলে দেখি।
হাসপাতালের রিপোর্ট আর কাগজের উপরে লেখা নামটা দেখে আমার পুরো পৃথিবী যেন থেমে গেল।
সেখানে বড় অক্ষরে লেখা ছিল—
“পিতা: সায়ন রহমান।”

চলবে…

হৃদয়ের টান
পর্ব ০২
কলমে The Story Haven

​কাগজটার ওপর জ্বলজ্বল করতে থাকা নিজের নামটার দিকে তাকিয়ে আমার হাত দুটো কাঁপতে শুরু করল। “পিতা: সায়ন রহমান।” চারপাশের সমস্ত কোলাহল, গাড়ির হর্ন, মিথিলার চড়া গলার চিৎকার—সবকিছু যেন মুহূর্তের মধ্যে স্তব্ধ হয়ে গেল। আমার চোখের সামনে শুধু ভেসে উঠতে লাগল চার বছর আগের সেই দিনটার কথা, যেদিন মারিয়া অশ্রুসজল চোখে আমাকে বলেছিল, “সায়ন, আমি মনে হয় মা হতে চলেছি।”
​সেদিন সম্পত্তির লোভে অন্ধ হয়ে আমি তার সেই জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের খবরটাকে শুধু অবহেলাই করিনি, বরং তাকে একটা মিথ্যে অপবাদে জড়িয়ে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলাম। আজ নিয়তি সেই সত্যকে এমন এক রাস্তায় এনে আমার পায়ের কাছে আছড়ে ফেলল, যেখানে দাঁড়িয়ে আমি নিজের অস্তিত্বকেই হারিয়ে ফেলছি। তারা আমার সন্তান! ওই দুটো ফুটফুটে যমজ শিশু আমারই র**ক্ত!
​”সায়ন! কী হলো তোমার? একটা নোংরা কাগজ হাতে নিয়ে এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছ কেন? চলো এখান থেকে, রোদের মধ্যে আমার চামড়া পু*ড়ে যাচ্ছে!” পেছন থেকে মিথিলা আমার হাত ধরে টান দিল। তার কণ্ঠের বিরক্তি আর অবজ্ঞা আমার কানে বি*ষের মতো ঠেকল।
​আমি মিথিলার হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিলাম। আমার চোখ তখন রাস্তার ওপাশে। মারিয়া ততক্ষণে ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে ওপাশের ফুটপাতে গিয়ে বসেছে। সে হাপাচ্ছে। একটা বাচ্চার কান্না থামানোর জন্য সে তার বিবর্ণ আঁচল দিয়ে বাচ্চার মুখটা মুছে দিচ্ছে, আর অন্য বাচ্চাটা ক্ষুধার্ত চোখে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। যে মেয়েটার পায়ের কাছে একদিন চার-পাঁচজন কাজের লোক হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকত, সে আজ ধুলোবালির মধ্যে বসে বাচ্চাদের শান্ত করার চেষ্টা করছে। আর এই সবকিছুর জন্য দায়ী আমি—শুধু আমি!
​আমি আর এক মুহূর্তও না ভেবে রাস্তার ওপাড়ে মারিয়ার দিকে দৌড়াতে লাগলাম।
“সায়ন! সায়ন, কোথায় যাচ্ছ তুমি? ওই ভাঙারিওয়ালির কাছে যাচ্ছ কেন? শোনো সায়ন!” পেছন থেকে মিথিলা চিৎকার করতে লাগল, কিন্তু সেই চিৎকার আমার কান পর্যন্ত পৌঁছালেও মনের ভেতর ঢুকল না।
​রাস্তা পার হয়ে আমি যখন মারিয়ার ঠিক সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, তখন আমার বুকটা ভে*ঙে চুরমা*র হয়ে যাচ্ছিল। তীব্র রোদে মারিয়ার ফর্সা মুখটা পু*ড়ে তামাটে হয়ে গেছে। কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। আমাকে আচমকা তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মারিয়া চমকে উঠল। তার চোখের কোণায় এক পলকের জন্য একরাশ চেনা চাউনি ভেসে উঠলেও, পরক্ষণেই তা এক চরম উদাসীনতা আর অপমা*নে রূপ নিল।
​সে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল, দুই বাচ্চাকে দুই কোলে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমার পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইল।
​”মারিয়া…” আমার গলা দিয়ে শব্দটা প্রায় বুজে এল। আমি তার পথ আটকে দাঁড়ালাম।
​মারিয়া থামল। কিন্তু আমার দিকে তাকাল না। নিচের দিকে তাকিয়ে একদম শান্ত, শীতল গলায় বলল, “রাস্তা ছাড়ুন। আমার তাড়া আছে। বাচ্চাদের খাওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছে।”
​”ওরা… ওরা আমার সন্তান, মারিয়া? তুমি কেন চার বছর ধরে এই সত্যটা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখলে?” আমার চোখ দিয়ে তখন টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। পায়ের কাছের সেই হাসপাতালের রিপোর্টটা আমি তার সামনে তুলে ধরলাম।
​মারিয়া এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার সেই শান্ত চোখের ভেতর আজ কোনো ভালোবাসা নেই, কোনো অভিমানও নেই; যা আছে তা হলো তীব্র ঘৃণা আর অবহেলা। সে একটা শুকনো হাসি হাসল, “আপনার সন্তান? সায়ন রহমান, আপনি বোধহয় ভুল করছেন। চার বছর আগে যেদিন আপনি টাকার লোভে আপনার গর্ভবতী স্ত্রীকে ডি*ভোর্স পেপার এগিয়ে দিয়েছিলেন, সেদিনই এই বাচ্চাদের বাবা ম*রে গেছে। এরা কোনো কোটিপতির সন্তান নয়, এরা এই রাস্তার এক অসহায় মায়ের সন্তান।”
​”আমাকে ক্ষমা করে দাও, মারিয়া! আমি ভুল করেছিলাম, আমি লোভে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি সব বুঝতে পারছি। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে মারিয়া, ওদের একবার আমার কোলে দাও…” আমি দুই হাত বাড়িয়ে মারিয়ার কোল থেকে একটা বাচ্চাকে নিতে গেলাম।
​কিন্তু মারিয়া এক কদম পিছিয়ে গেল। তার চোখে যেন আগুন জ্বলে উঠল, “খবরদার! আমার বাচ্চাদের গায়ে হাত দেবেন না। যে মানুষটা নিজের র*ক্তের চেয়ে মায়ের ব্যাংকের টাকা আর বাড়ি-গাড়িকে বড় মনে করেছিল, তার কোনো অধিকার নেই এই নিষ্পাপ শিশুদের স্পর্শ করার।”
​ঠিক তখনই মিথিলা হাপাতে হাপাতে সেখানে এসে পৌঁছাল। মারিয়া আর আমাকে এভাবে কথা বলতে দেখে তার মুখটা রাগে ও হিং*সায় কুৎসিত হয়ে উঠল। সে আমার হাত ধরে টেনে বলল, “সায়ন! তুমি এই রাস্তার মেয়ের সাথে কী নাটক করছ? আর ও কী বলছে? কিসের বাচ্চার বাবা? তুমি কি এই নোংরা মেয়ের জালিয়াতির ফাঁ*দে পা দিচ্ছ? চলো বলছি!”
​মিথিলার ‘নোংরা মেয়ে’ শব্দটা শুনে আমার মাথায় র**ক্ত চড়ে গেল। যে মারিয়াকে আমি একদিন নিজের হাতে ধ্বংস করেছি, আজ অন্য কেউ তাকে অপ*মান করবে, সেটা সহ্য করার ক্ষমতা আমার ছিল না।
​আমি মিথিলার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠলাম, “মুখ বন্ধ করো, মিথিলা! আর একটাও বাজে কথা বলবে না। ও কোনো রাস্তার মেয়ে নয়, ও আমার মারিয়া। আর এই দুটো বাচ্চা আমার নিজের সন্তান!”
​আমার তীব্র চিৎকারে মিথিলা স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চোখ দুটো চড়কগাছ। সে হয়তো ভাবতেও পারেনি যে সায়ন রহমান কোনোদিন তার ওপর এভাবে চিৎকার করতে পারে।
​মারিয়া আমাদের দুজনের দিকেই একবার তাকাল। তার মুখে এক অদ্ভুত বিজয়ের হাসি ফুটে উঠল, যে হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক চরম ধিক্কার। সে মিথিলার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “ভয় পাবেন না, মিস মিথিলা। আপনার হবু বরের এই ভাঙারি কুড়ানো মারিয়ার প্রতি কোনো লোভ নেই। চার বছর আগে উনি টাকার জন্য আমাকে ছেড়েছিলেন, আজ উনি টাকার জন্যই আপনার পাশে আছেন। ওনাকে নিয়ে যান, ওনার স্থান ওই রাজপ্রাসাদেই মানায়, এই ধুলোবালির রাস্তায় নয়।”
​কথাটা বলেই মারিয়া আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াল না। দুই বাচ্চাকে বুকে চেপে ধরে ভিড়ের মাঝে দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
​”মারিয়া! শোনো মারিয়া! প্লিজ চলে যেও না!” আমি পেছন থেকে ডাকতে ডাকতে এগোতে গেলাম, কিন্তু মিথিলা আমার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পথ আটকে দিল।
​”সায়ন, তুমি যদি আজ ওর পেছনে যাও, তবে মনে রেখো, আমাদের বিয়ে তো হবেই না, আর তোমার মা তোমাকে ওনার সমস্ত সম্পত্তি থেকে আজীবনের জন্য বঞ্চিত করবেন। তুমি আবার সেই রাস্তায় এসে দাঁড়াবে। ভেবে দ্যাখো, কী চাও তুমি—ওই রাস্তার ভিক্ষুক নাকি মায়ের কোটি টাকার সম্পত্তি?” মিথিলার গলার আওয়াজে এক চরম হু*মকি।
​আমি থমকে দাঁড়ালাম। দূরে মারিয়া ততক্ষণে একটা গলির মোড় পার হয়ে চোখের আড়ালে চলে গেছে। একদিকে আমার নিজের র**ক্ত, আমার সন্তানদের কান্না আর অনুতাপের আগুন; অন্যদিকে মায়ের কোটি টাকার সম্পত্তি আর মিথিলার হু*মকি। চার বছর আগে আমি সম্পত্তির লোভ সামলাতে পারিনি। কিন্তু আজ? আজ কি আমি আবার সেই একই ভুল করব? নাকি এবার সব ছেড়ে নিজের সন্তানদের বুকে টেনে নেব?
​আমার মাথার ভেতর তখন ঝড় বইছে। আমি মিথিলার দিকে তাকালাম, তারপর দূর আকাশের দিকে। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি আমি।

​(চলবে…)