প্রিয় রাগান্বিতা পর্ব-৫০ এবং শেষ পর্ব

1
160

#প্রিয়_রাগান্বিতা🩷
#লেখিকা:#তানজিল_মীম🩷
পর্ব-৫০(অন্তিম পর্ব)
________________
বর্তমান,
ইলিয়াসের চোখ বেয়ে কখন থেকে যে পানি পড়ছে তা তার জানা নেই। রামুও কাঁদছে। তার বউও দুয়ারের কর্নারে দাঁড়িয়ে শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদছে। স্বামীর মুখে এ গল্প সে বহুবার শুনেছে। যতবার শুনেছে ততবারই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কি! নির্মম ছিল সেই কাহিনি। এক ষোড়শী কন্যার সাথে কি বিরহ ঘটে গেল ভাবতেই বুক দক করে ওঠে তাদের। রামু ইলিয়াসের দিকে তাকিয়ে বললো,“ডাক্তার বাবু আমনেও কান্দেন?”

ইলিয়াস চমকে ওঠে সে টের পায় নি কখন তার চোখ বেয়ে পানি ঝরছিল। ইলিয়াস আচমকা উঠে দাঁড়ালো। তার বুকে যন্ত্রণা হচ্ছে। এত কষ্ট ছিল রাগান্বিতা আর ইমতিয়াজের মাঝে ভাবতেই পারছে না। সে ভেবেছিল ইমতিয়াজ বেঁচে আছে। সে ফিরে আসবে। কিন্তু কি শুনলো শেষে! এক মৃত ব্যক্তি ফিরে আসার অপেক্ষা করছে এই রেশবপুরের রাগান্বিতা। ইলিয়াস হেঁটে গেল রাগান্বিতার থাকা সেই ছোট্ট কুটির ঘরে। পিছনে রামু তাকিয়ে রইলো। রামু মাঝে মাঝে ভাবে,“যদি সত্যি ইমতিয়াজ ফিরইয়া আইতো তাইলে খুব ভালা হইতো। কিন্তু মরা মানু কি আর কহনো ফিরা আহে!”

নিঝুম বিকেল তখন। রাগান্বিতা এলেমেলো ভাবে নিজ কক্ষে বসে আছে। নীরব থমথমে মুখ। তার পাশেই ইমতিয়াজের লিখে যাওয়া চিরকুটের ঝুড়ি। ইলিয়াস ভিতরে ঢুকলো। রাগান্বিতা ভয় পেল এতে। ইলিয়াস নরম স্বরে বললো,“ভয় পেও না আমি তোমায় কিছু করবো না।”

রাগান্বিতা নিশ্চুপ রইলো কিছু বললো না। ইলিয়াস রাগান্বিতার দিকে তাকিয়ে রইলো অনেকক্ষণ। তার কান্না আসছে। এত কষ্ট তো লাগার কথা নয়। তাও ইলিয়াসের কষ্ট হচ্ছে। হঠাৎই ইলিয়াসের চোখ গেল ইমতিয়াজের লিখে যাওয়া একটা চিরকুটের দিকে। যেখানে ইমতিয়াজ লিখেছিল,
“তুমি আমার ধ্বংসের শেষ অধ্যায়ের গরমিল।”

আরেকটা উঠালো সেখানে লেখা ছিল,
“আমাদের আরো আগে কেন দেখা হলো না বউ,যতটা আগে দেখা হলে আমাদের আর বিচ্ছেদ হতো না।”

ইলিয়াস কথাটা পড়ে আরো ভেঙে পড়লো। কি ভালোবাসা ছিল এই ইমতিয়াজ আর রাগান্বিতার মাঝে অথচ মাঝে কত বারণ। ইমতিয়াজ এমন অসংখ্য চিরকুট লিখে গেছে রাগান্বিতাকে। আর শেষে একটা প্রেমপত্র। যেটা বোধহয় রাগান্বিতা এখনও পরে নি। ইলিয়াস তক্ষৎনাৎ বেরিয়ে আসলো। চোখ মুছতে মুছতে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো। তার এখন সর্বপ্রথম কাজ হলো রাগান্বিতাকে ঠিক করা। লাগলে বিদেশি ডাক্তাদের সাথেও যোগাযোগ করবে ইলিয়াস। তবুও সে রাগান্বিতাকে ঠিক করেই ছাড়বে। রাগান্বিতাকে আবার আগের রূপে এনেই ছাড়বে ইলিয়াস। ইলিয়াস তার জীবনের সকল ডাক্তারির পড়াশোনা লাগিয়ে দিল রাগান্বিতার পিছনে। বড় বড় ডাক্তারদের সাথে এ বিষয়ে কথাও বলে। সে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয় রাগান্বিতার সাথে। টুকিটাকি কথাও বলে। রাগান্বিতার সাথে এমন ব্যবহার করে যেন সত্যি সত্যিই ইমতিয়াজ ফিরে আসবে আবার। রাগান্বিতাও বন্ধু হয়ে যায় তার সাথে। সময় চলতে থাকে আবার।’
——-
সাল ১৯৯১, ৬ই নভেম্বর। দেখতে দেখতে ইমতিয়াজের মৃত্যুর পুরো দশবছর কেটে গেল। রাগান্বিতা এখন পুরোপুরি সুস্থ। তার সব মনে পড়ে গেছে। তার মস্তিষ্ক আবার আগের মতো কাজ করছে। পাঁচবছর আগেই একটু একটু করে ঠিক হচ্ছিল। তার মনে পড়ছিল তার বাবা বেঁচে নেই। পরে রাগান্বিতার সব স্মৃতি মনে পড়তেই সে টানা তিনদিন চেঁচিয়ে কাঁদে। তাকে সামলায় রামুর বউ। তারপর আর কাঁদে না। ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়। তবুও রাগান্বিতা ইমতিয়াজকে ভোলে না। কল্পনায় হলেও সে রোজ ইমতিয়াজের সাথে কথা বলে। কত অভিযোগ, কত অভিমান করে তার হিসাব নেই!’

শীতল সকাল! রাগান্বিতা আজ ব্যস্ত। সে কোথাও যাবে। কোথায় যাবে রামুকে বলে নি। রামুর একটা মেয়ে আর এক ছেলে আছে। রাগান্বিতাকে মামুনি বলে ডাকে। রাগান্বিতা বর্তমানে গ্রামের একজন গন্যমান্য ব্যক্তি। গ্রামের কোনো অসুবিধা হলেই তাকে ডাকা হয়। সে পরামর্শ দেয়। ছাব্বিশ বয়সী এক রমনীর প্রতিভা দেখে তারা সবাই বিমোহিত। মেয়ে পুরো বাবার মতো হয়েছে। তবে রাগান্বিতার সামনে বড় একটা নিষিদ্ধ শব্দ হলো “বিয়ে”! অনেক বয়স্ক মানুষ তাকে নতুনভাবে বিয়ে দেয়ার কথা বলে কিন্তু রাগান্বিতা রাজি হয় না। যেদিন এ বিয়ের কথা উঠবে সেদিন রাতেই সে ইমতিয়াজকে স্বপ্ন দেখবে। রাগী রাগী চেহারা নিয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকে ইমতিয়াজ। রাগান্বিতা খুব হাসে। বলে,“বিয়ে করবো না। তবে আপনার এই চেহারা দেখার জন্য হলেও আমি বিয়ের কথা শুনবো। শুধু শুনবো।”

“মামুনি কোথায় যাও তুমি?”

হঠাৎই রামুর দুই ছেলেমেয়ের কথা শুনে রাগান্বিতা পিছনে তাকায়। নিকাব বেঁধে বলে,
“একটু হাঁটতে যাবো।”
“এই হকাল বেলা।”
কথাটা বলেই মুখে হাত দিল রামুর ছেলে। ঠোঁটে কামড় দিয়ে বললো,
“থুড়ি হকাল না সকাল হবে।”

রাগান্বিতা হাসে। দু’টোর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,
“হা তোমরা ভালো মতো থেকো। রামুভাই আর ভাবিকে জ্বালাবে না ঠিক আছে।”

এই বলে একটা ব্যাগ নিলো রাগান্বিতা। ব্যাগের ভেতর ধারালো ছুরি আর একটা চিঠি। অতঃপর রাগান্বিতা বেরিয়ে যায়। রামুর বউ দেখে তাকে। দুয়ারের কাছে দাঁড়িয়ে বলে,
“যাইতাছো বোইন?”

রাগান্বিতা মৃদু হেঁসে যেতে যেতে জবাব দেয়,“হুম।”

রামুর বউ নির্মল চোখে তাকিয়ে থাকে। আটকায় না। কারণ সে জানে রাগান্বিতা তার আটকানো শুনবে না। রাগান্বিতা প্রতিবছর এই নভেম্বরের ৬ তারিখ কোথাও যায়। এটা গত তিনবছর যাবৎ হচ্ছে। পরে শুনেছিল এই দিনেই ইমতিয়াজ মারা যায়। রাগান্বিতা যাওয়ার পথে তাদের বাড়ির দিকে যায় তার বাবা, বোন, দাদিমা সবার কবর দেখে। শুধু ভাইটার দেখে না। যত যা ঘটেছে সব তো এই নিকৃষ্ট ভাইটার জন্যই। রাগান্বিতা নদীরঘাটে যায় নৌকায় বসে। এখন ঢাকা যাওয়ার জন্য ট্রেনের পাশাপাশি বাসও চলে। রাগান্বিতা আজ বাসে যাবে ঢাকা। সময়টা তখন সকাল ৬টা। রাগান্বিতা বাসে উঠলো। গিয়ে বসলো বাসের একদম শেষের সিটে জানালার পাশে। ঢাকা যেতে তার প্রায় মধ্যম দুপুর হবে। বাস চলতে শুরু করলো। রাগান্বিতা ব্যাগ থেকে চিঠিটা বের করলো, উম না! চিঠি না এটা হলো প্রেমপত্র। যেটা রাগান্বিতা ১০ বছর আগের সেদিনের ভয়ানক রাতে পড়তে পারে নি। সুস্থ হওয়ার পর পরে। এই চিঠিটা রোজ রাতে একবার করে পড়ে, রাগান্বিতা ঘুমায়। কেমন শান্তি শান্তি অনুভব হয় তার। রাগান্বিতা ভাবলো এখনও একবার পড়বে। আবার ভাবলো, না একবার না ঢাকা যেতে যেতে যতবার পড়া যায় ততবার পড়বে।’

রাগান্বিতা চিঠিটা খুললো। তার মনে পড়লো একদিন রাতে ইমতিয়াজ তাকে বলেছিল,
“তুমি চিঠি ভালোবাসো বউ?”
তখন রাগান্বিতা উত্তরে বলে,
“উম চিঠি না প্রেমপত্র।”
যার বিনিময়ে ইমতিয়াজের উত্তর আসে,“কোনো একদিন তোমায় নামে বিশাল প্রেমপত্র পাঠাবো বউ, তুমি পড়ে নিও!”

ইমতিয়াজ সেই কথা রাখে। সেই বিষাদের মাঝেও সে লেখে একখানা প্রেমপত্র। রাগান্বিতা পড়তে শুরু করলো। যেখানে প্রথমই লেখা ছিল,

“প্রিয় রাগান্বিতা”
আমার রাগান্বিতা। কেমন আছো প্রিয়! নিশ্চয়ই ভালো আছো। তোমাকে ভালো থাকতে হবে। আমি কে জানো তো। আমি হলাম তোমার এক নিষ্ঠুর প্রেমিক পুরুষ ইমতিয়াজ সিকদার। যে তোমার জীবনটা হঠাৎ এলেমেলো করে দিলো। আমি কখনো প্রেমপত্র লেখি নি। তবে ছোট খাটো চিরকুট, কবিতা লিখি। কবিতা লিখি বলে আমায় আবার কবি ভেবো না। আমি কিন্তু কবি নই। আমি প্রেমপত্র লেখছি। প্রেমপত্রের শুরুটা কিভাবে করতে হয় তাও জানি না তবুও আমি লেখছি। এই বিষাদময় সময়ে তোমার জন্য চিঠি লিখছি। উম্ না, চিঠি নয় প্রেমপত্র। আমি জানি তুমি এই প্রেমপত্র খুব শীঘ্রই খুলবে না। তোমার সময় লাগবে। ওই বছর পাচেক পর বা তারও বেশিদিন পড় খুলবে। যখন খুলবে তখন কি তোমার মনে থাকবে এই ইমতিয়াজের কথা! অবশ্যই থাকবে। কেন থাকবে না। আমি কি ভুলে যাওয়ার মতো একটা মানুষ। আর কারো কাছে ভুলে যাওয়ার মতো মানুষ হলেও অবশ্যই তোমার কাছে তা নই। মানুষ পৃথিবীতে দু’টো মানুষকে কখনো ভোলে না। এক শত্রু, দুই ভালোবাসার মানুষ। আমি তো তোমার দুটোই ছিলাম। জানো তো ভালোবাসা হিসাব করে হয় না। তবুও অনেকেই ভালোবাসার হিসাব করতে চায়। আমিও চেয়েছিলাম তাই বোধহয় সব এলেমেলো হয়ে গেল। আমি হিসাবে গড়মিল করে বসলাম। এই রাগান্বিতা, তুমি কি জানো তুমি পুরো ফুলের মতো পবিত্র, বাতাসের মতো স্নিগ্ধ, আকাশের মতো শীতল, কি মায়ময়ী চাহনি তোমার, ঘন কালো লম্বা কেশ,ওষ্ঠদুটো ইস আমি কল্পনা করেও প্রেমে পড়ে যাই। তুমি এত সুন্দর কেন মেয়ে! তোমার সুমধুর কণ্ঠ শোনার জন্য আমি যেন বার বার ফিরে ফিরে আসি। এবার বোধহয় ফিরবো না। তবে এ না ফেরার আফসোস নেই। আমাদের দেখা তো হবে। হয়তো এভাবে নয় অন্যভাবে। এই ধরো,
কখনো তোমার চুলের সাজে,
নয়তো আকাশের তাঁরার মাঝে,
হয়তো বৃষ্টি ফোঁটার ভাঁজে ভাঁজে।

শোনো না, যখনই আকাশ বেয়ে বৃষ্টি নামবে,
তুমি তোমার চুলগুলো খুলে দিবে। শাড়ির আঁচল কোমড়ে গুঁজে, বৃষ্টিতে নাইতে নামবে। আমি দূর থেকে তোমায় দেখবো। আমি দূর থেকেই তোমায় ছুঁয়ে দিবো। দূরের ছোঁয়ায় কিন্তু দারুণ মজা। আমি সেই মজা বার বার পেতে চাই। সুযোগ কি পাবো! তুমি দিবে নিশ্চয়ই। আমি কি অবহেলা করার মতো একটা মানুষ। অবশ্যই তোমার কাছে তা নই।

শোনো না, যখন বৃষ্টিতে ভিজবে দয়া করে হলেও আমায় একটু মনে করবে। ঘৃণার নজরে নয়, একটু ভালোবাসার ছোঁয়ায়। মনে করবে তো বউ! যতই হোক আমি তো মনে না করার মতো মানুষ নই। বাকিদের কাছে হলেও তোমার কাছে কিন্তু তা নই।

আমি তো মরেই যাচ্ছি। তবুও মনে হয় দূর থেকে তোমায় দেখে আমি ভালো থাকবো। কখনো রোদের মাঝে বসবে না। তোমার একটা বদঅভ্যাস কি জানো? তুমি রোদ দেখলেই বসে পড়ো। একদম বসবে না। কালো হয়ে যাবে। আমার রাগান্বিতা কালো হোক এ আমি চাই না। তুমি সবসময় সুন্দর থাকবে। মাঝে মাঝে চুলে খোঁপা করে বেলিফুল লাগাবে, লালটুকটুকে শাড়ি পড়বে, লাল চুড়ি পড়বে তোমায় না লাল শাড়িতে দারুন লাগে। এত সুন্দর কেন লাগে? এই সুন্দর কি শুধু আমারই লাগে নাকি আরো অনেকের কাছেই লাগে। অবশ্যই লাগাতে দিবে না। মনে রাখবে তুমি শুধু আমার আর কারো না। শোনো না আমি চার লাইনের একটা ছন্দ সাজিয়েছি তবে তোমার জন্য নয় নিজের জন্য। রাগ করলে কি! অবশ্যই করবে না আমি জানি। আসলে কি বলো তো মাঝে মাঝে নিজেকে নিয়েও লিখতে হয়। যতই হোক রেশবপুরের সবচেয়ে সুন্দর রমণীটি ইমতিয়াজ সিকদারের প্রেমে পড়েছে এ কি চারটে খানে কথা বলো। ওসব বাদ দেও ছন্দটা শোনো,

গভীর রাতে, বিষাদ ঢুকেছে ঘরে,
কান্না ভেজা চোখে আমার তোমারে মনে পড়ে।”
কি দুঃখ! কি বিষাদ! কি নিদারুণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে শরীর,
তবুও আমার খালি তোমারেই মনে পড়ে।

কি প্রেম ছিল সখি! দেখাইতে না পারিলাম তোমায় এ আফসোস আমার চিরকাল রবে। তোমার কথা ভাবিবার পরই আমার শরীর জুড়ে খালি রক্ত ঝরে।আমার খালি তোমারে মনে পড়ে।”

ক্ষমা চাইবো কি সখি! বুঝিতে পারি না আর।
এ কেমন যন্ত্রণা!
বিচ্ছেদের ছোঁয়ায় পুরো শরীর মোর একটু একটু করে যাচ্ছে মরে,
আমার খালি তোমারেই মনে পড়ে।”

আহ! কি লিখলাম বলো তো খালি আবোল তাবোল শব্দ যত। চারলাইন বলেছিলাম কত কি লিখে বসলাম। মুছতে ইচ্ছে করছে না থাকুক কেমন!

আচ্ছা শোনা না রাগান্বিতা। এতকিছু তো লিখে দিলাম। প্রেমপত্র দিলাম। হলো কি না জানি না। এবার বলো, আমায় ভালোবাসবে তো। যতই হোক আমি কি ভালো না বাসার মতো একজন মানুষ! অবশ্যই তোমার কাছে তা নই। আমায় কিন্তু ভালোবাসাই যাই। ভালোবাসার ক্ষেত্রে আমার কোনো খামতি নেই। আমায় নিয়ে হাজার অভিযোগ করবে আমি মেনে নিবো কিন্তু ভালোবাসার অভিযোগ আমি মানবো না। ভালোবাসি, ভালোবেসো, সঙ্গে ভালো থেকো কেমন!’

একটা ছোট্ট কবিতা লিখলাম। এ কবিতার কথাগুলো আমার আফসোসের একটুখানি পূর্ণতা হোক,

“আমাদের বহুদিন দেখা হবে না
যুগ পাল্টে যাবে,সময় বদলে যাবে
তবুও আমাদের দেখা হবে না।

টেলিফোনের যুগটিও বোধহয় যাবে বদলে
সময়ের সাথে সাথে মানুষও বদলাবে
কত মানুষ হারাবে, কত মানুষের জন্ম হবে
অথচ আমাদের দেখা হবে না।

গাছের পাতারা দিনে দিনে রঙ বদলাবে
কিছু গাছ মরে যাবে, কিছু যাবে ক্ষয়ে,
বৃক্ষের বীজ ভেঙে আবার নতুন বৃক্ষরা জন্ম নিবে। অথচ আমাদের দেখা হবে না।

কেন হবে না দেখা? প্রকৃতি এত নিষ্ঠুর কেন বলো! যদি পৃথিবী তার নিয়ম ভেঙে একটু অনিয়ম করে আর একটিবার আমাদের দেখা করাতো তবে কি জগতের কোনো ক্ষতি হতো? হতো বোধহয়!

আমার অন্তরে অন্তরে শুধু বিষাদের শোক
আমি মনের গহীন থেকে বলছি,
আমাদের আর একটিবার দেখা হোক!’

ইস! যদি একটু হতো…..

ইতি,
নিষ্ঠুর এক প্রেমিক পুরুষ
ইমতিয়াজ সিকদার।’

এই নিয়ে পঞ্চমবারের মতো চিঠিটা পড়ে। চিঠিটা বুকে জড়িয়ে ধরলো রাগান্বিতা। জোরে এক নিশ্বাস ফেললো।’

“আফা আমরা আইয়া পড়ছি”

হঠাৎই বাসের কন্ডাকটরের কথা শুনে তড়িৎ চমকে উঠলো রাগান্বিতা। দ্রুত নিজেকে সামলে বললো,“জি আচ্ছা।”

রাগান্বিতা বাস থেকে নামলো। আনমনাই হেঁটে মোটর গাড়ি ডাকলো। গাড়ি থামলো সে উঠে বসলো। গাড়ি চলতে শুরু করলো আবার। সময় যেন কেমন করে বদলে যায়। এই যে ঢাকার শহর দশবছরের কতটা বদলেছে। রাস্তাঘাটও বদলেছে শুধু বদলায় নি ইমতিয়াজের তৈরিকৃত বাড়ি। বাসস্ট্যান্ড থেকে ইমতিয়াজের বাড়ি আসতে প্রায় ঘন্টাখানেক লাগে।’

বেলা দেড়টা। রাগান্বিতা দাঁড়িয়ে আছে ইমতিয়াজের বাড়ির সামনে। চারপাশ নির্জীব আর থমথমে। রাগান্বিতা বাড়ির সামনে থাকা টবের নিচ থেকে চাবিটা নিলো। দুয়ার খুলে ভিতরে ঢুকলো। চারপাশ এলেমেলো ধুলোতে ভরপুর। রাগান্বিতা ভিতরে ঢুকলো পুরো বাড়িটায় একা একা হাঁটলো। শেষে গিয়ে থামলো নিচে টেবিলটার কাছে। টেবিলের একটু দূরেই একটা আলমারির মতো আছে সেটা খুললো। খুলতেই দেখা মিললো ইমতিয়াজের কিনে যাওয়া সেই টেলিফোনটা। সামনেই চিরকুটে লেখা,“শুধুমাত্র তোমার জন্য বউ।”

রাগান্বিতা চিরকুটে হাত বুলালো। পরমুহূর্তেই টেলিফোন উঠিয়ে আপনাআপনি বলে উঠল,“হ্যালো শুনছেন, আমি রাগান্বিতা বলছি।”

অপরপাশে কিছুই শোনা গেল না তবুও রাগান্বিতা একা মনে কিছুক্ষণ কথা বললো। তারপর পুনরায় যত্ন করে টেলিফোন চিরকুট রেখে দিলো। এটা প্রতিবছরই করে। তিনবছর আগে এগুলো দেখতে এসে কেঁদেছিল এখন আর কাঁদে না।

রাগান্বিতা দশমিনিটের মতো সেখানে থেকে কপাট আঁটকে আবার বেরিয়ে পড়লো। এই বাড়িতে এখন কেউ থাকে না। রবিন তার বউকে নিয়ে দূরে থাকে। ইমতিয়াজের ব্যবসায় বানিজ্য বন্ধ। ইমতিয়াজ নাকি রবিনের নামে ব্যবসা দিয়ে যায় কিন্তু রবিন তা রাখে না। বন্ধ হয়ে পড়ে আছে সব। রাগান্বিতা পুরো বাড়িটায় একবার চোখ বুলালো এই উঠানেই সে আর ইমতিয়াজ একসাথে সাইকেলে চড়ে ছিল। কি সুন্দর মুহূর্ত ছিল তখন। রাগান্বিতা ভাবলো না এগিয়ে গেল মৃন্ময়ীর কবরের দিকে। সেখানে গিয়ে কবরের দোয়া পাঠ করে বললো,“আপা আমার ভাইকে ক্ষমা করে দিয়েন। সে খুব অন্যায় করেছে আপনার সাথে। শাস্তিও পেয়েছে তবুও আপনি পারলে ক্ষমা করে দিয়েন তারে।” এমন অনেক কিছু বলে রাগান্বিতা বেরিয়ে গেল। ইমতিয়াজের কবুতরটা আর নেই। মারা গেছে। বাড়ি পিছনেই দাফন করা হয় তাকে। রাগান্বিতা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এখনও একটা শেষ জায়গায় যাওয়া বাকি তার। রাগান্বিতা নদীরঘাটে গেল। একটা বড়সড় ট্রলার তার একার জন্য নিলো। আসা যাওয়ার দুটোরই খরচ দিবে। সাথে এও বলে গিয়ে চারঘন্টার মতো তার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তার বিনিময়ে যত খরচ লাগবে তাও দিতে প্রস্তুত। ট্রলার চালক রাজি হন রাগান্বিতা ট্রলার নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। উদ্দেশ্য একটাই জায়গার নাম “প্রেমনগর”! সেখানেই তার ইমতিয়াজ আছে।

প্রায় ঘন্টা চারেকপর রাগান্বিতা পৌঁছালো প্রেমনগর। কথা মতো ট্রলার চালকে চার ঘন্টা অপেক্ষা করতে বললো। সাথে এও বললো সে যেন ট্রলার থেকে না নামে। ট্রলার চালক রাজি হলো। রাগান্বিতা ট্রলার ছেড়ে অনেকটা দূরে আসতেই তার বোরকা হিজাব খুলে ফেললো। সে লাল টুকটুকে শাড়ি পড়েছে, খোঁপায় বেলীফুল লাগিয়েছে, হাতে লাল চুড়ি। রাগান্বিতা তার বোরকা ঘরের সামনে রেখে চলে গেল। সবটা আগের মতোই আছে ঘাটপাড়ে সেই নৌকা বাঁধা, শেওলায় ভরপুর। বাড়ির সামনে টিয়াপাখির সেই শূন্য খাঁচাটা পড়ে। রাগান্বিতার খারাপ লাগলেও কাঁদলো না। আচমকা কোথ থেকে যেন সেই টিয়া পাখিটা এসে বলে উঠল,“বউ স্বাগতম, বউ স্বাগতম, বউ স্বাগতম!”

তড়িৎ চমকে উঠলো রাগান্বিতা। আনমনেই হেঁসে ফেললো। রাগান্বিতা সেই বাঁশি বাজার জায়গাটায় গেল সেখানে ইমতিয়াজের কবরখানা। রাগান্বিতা খালি পায়ে ভিতরে ঢুকলো। বেশি না ভেবেই কবরের পাশে শুয়ে পড়লো। মাথার নিচে হাত দিয়ে মিষ্টি সুরে বললো,“আমি কি খুব দেরি করেছি। করে নি বোধহয়।”

এসব বলে একা একা গল্প জুড়ে দিল রাগান্বিতা। তখন সন্ধ্যা হওয়ার নিভু নিভু আলো হচ্ছিল। মাঝ আকাশে পাখিরা উড়ে বেড়াচ্ছিল। আর একটা সুন্দরী রমনী, একটা কবরের পাশে শুয়ে শুয়ে গল্প করছিল। দূরের ডালে বসেছিল টিয়াপাখি বোধহয় সে সবটাই বুঝছিল। রাগান্বিতা গল্প করতে করতে হঠাৎ বলে উঠল,

“আচ্ছা আপনি তো আমার বাবা, ভাই, দাদিমা, বোন সবাইকে মারলেন সেই হিসেবে আমার উচিত ছিল আপনায় ঘৃণা করা অথচ আমি আপনায় ঘৃণা করতে পারি না। কেন পারি না বলুন তো।” পরমুহূর্তেই সে কেমন একটু করে বলে উঠল,
“মরা মানুষরে যদি আরেকবার ফিরাইয়া আনা যাইতো। তাইলে আমি পৃথিবীর সব চাইয়া সুখী মানুষ হইতাম! তাই না কও!”

সব চলতে থাকলো। সুন্দরী রমনী শুয়ে রইলো। কথা বলতে থাকতো একা একা। গাছের পাতারা নড়ছিল, আকাশটা লালচে হচ্ছিল। দূরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল একটি ট্রলার। রাগান্বিতা চোখ বন্ধ করে ফেললো। হঠাৎই তার মনে হলো কেউ বুঝি ফিস ফিস করে বললো,
“প্রিয় রাগান্বিতা। আমার রাগান্বিতা। তুমি শুধু আমার প্রিয় রাগান্বিতা।”

~ সমাপ্ত!’
——————
সাল ২০১৮! সিনেমা হলে তুমুল উত্তেজনা। সবার চোখে পানি। কি নিদারুণ যন্ত্রণার কাহিনি ছিল প্রিয় রাগান্বিতা। তাদের সবারই একটাই কথা যদি ইমতিয়াজ ফিরে আসতো। কেন এলো না ফিরে!ধীরে ধীরে সিনেমা হল খালি হলো সবাই চোখে পানি নিয়ে বেরিয়ে গেল। সিনেমাটি তাদের হৃদয় নাড়িয়ে দিয়েছে। ইমতিয়াজের বলা কিছু কথার মাঝে একটা কথাই বলছে সবাই। এই শহরে প্রেম মানেই মৃত্যু! কি বিষাদময় কাহিনি!

“সিনেমা তো শেষ এখনো বসে আছেন বাড়ি যাবেন না।”

আচমকা এক লোকের কণ্ঠ শুনে অষ্টাদশী এক মেয়ে ঘুরে তাকালো। চুড়িদার পড়া মেয়েটি। নাম তার রাগান্বিতা। রাগান্বিতা উঠে দাঁড়ালো। ঘোর তার এখনও কাটে নি কি ভয়ানক কাহিনি ছিল প্রিয় রাগান্বিতা। এই কাহিনি রাগান্বিতা এর আগেও শুনেছে। তার বাবা লিখেছেন। তার বাবার নাম ইলিয়াস বয়াতি। পেশায় ডাক্তার হলেও তিনি জীবনে একটি বই লিখেছেন যার নাম প্রিয় রাগান্বিতা। ইলিয়াস যে আসল রাগান্বিতার চিকিৎসা করে। ইলিয়াস সেদিনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সে যে কাহিনি শুনেছে তা নিয়ে বই লিখবেন। কতজন পড়বে তা ঠিক না থাকলেও নিজের কাছে কাহিনিটি জীবন্ত রাখার জন্য তিনি বই বের করবেন। বইটি ১০ বছর আগে প্রকাশিত হয়। আর দশ বছর পর মুভি বের হয়। বইটা জনপ্রিয়তা পায়। বইয়ের শেষে তিনি রামুর নাম উল্লেখ করেন। বইয়ের শেষেও লিখে দেন। সাংবাদিকদের সাথেও বলেন, এই কাহিনি তার ডাক্তারি জীবনের সেরা কাহিনি ছিল। তাই তিনি এটার বই বের করার সিদ্ধান্ত নেন। ইলিয়াস এও বলেন তিনি বিয়ের করার পরই সিদ্ধান্ত নেন। তার ঘরে যে কন্যা সন্তান হবে তার নাম রাখবেন রাগান্বিতা। তাই রাখেন ইলিয়াসের বিয়ের দশ বছর পর রাগান্বিতার জন্ম হয়। সেই রাগান্বিতাকে তিনি আসল রাগান্বিতার মতোই তৈরি করেন। যদিও শুধু নাম দিলেই হয় না। তার মেয়েকে তিনি বার বার রাগান্বিতার কাহিনি বলেছেন, পড়িয়েছেন। আজ সিনেমাও দেখাতে পাঠিয়েছেন।

কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে একা একা হাঁটছে অষ্টাদশী কন্যা রাগান্বিতা। চোখে মলিনতা, কানে যেন বাজছে ইমতিয়াজের বলা কথা, আমাদের আবার দেখা হবে দেখে নিও। সত্যি কি এমনটা হয়! হয় না তো। হলে তো কবেই হতো। রাগান্বিতা তার বাবার মুখে শুনেছিল আসল রাগান্বিতাও নাকি আর নেই। কোনো এক নভেম্বরেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আর ফেরেনি নাকি। না হলে আসল রাগান্বিতার সাথে দেখা করা খুব ইচ্ছে ছিল তার। কি বিষাদ! রাগান্বিতার কোথাও কোথাও মনে হয়েছে। ওই কাহিনিতে বোধহয় সেই ছিল। তার পূর্বজন্মের কাহিনী। যদিও এসব বলতে কিছু নেই। তবুও তার মনে হয়েছে। বাবা প্রায় বলতো তাকেও নাকি কিছুটা আসল রাগান্বিতার মতো দেখতে। আচ্ছা তার নাম তো রাগান্বিতা। তাহলে তার মতো যদি কোনো পুরুষ এসে বলতো আমি ইমতিয়াজ। বেশ হতো। রাগান্বিতা হেঁসে ফেললো। প্রকৃতি সন্ধ্যা নামার মুখে। হঠাৎই আকাশ পথ গর্জে উঠলো। রাগান্বিতা চমকে উঠলো বোধহয় বৃষ্টি নামবে। তাই হলো। বলতে না বলতেই বৃষ্টি নামলো। রাগান্বিতা মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে কি করবে বুঝতে পারছে না। সে ছাতা আনে নি। হঠাৎই কোথা থেকে যেন একটা ছেলে এসে তার মাথায় ছাতা ধরলো। শক্তপক্ত কণ্ঠে বললো,“এই ভরসন্ধ্যা বেলা বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন?”

রাগান্বিতা ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। গায়ে টিশার্ট, কালো প্যান্ট, চোখে চশমা,মাথায় ঝাকড়া চুল। রাগান্বিতা বিষম খেলো। ছেলেটি বললো,“কি হলো! কথা বলছেন না কেন?”

রাগান্বিতা অবাক চোখে বললো,
“কে আপনি?”

তখনই ছেলেটি মিষ্টি হেঁসে জবাব দিলো। বললো,
“আমি ইমতিয়াজ, ইমতিয়াজ সিকদার।”

#সমাপ্ত!
————————–

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে