Friday, August 29, 2025
বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 2026



ভদ্র স্যার♥রাগী বর-পর্ব ৯

0

#ভদ্র স্যার♥রাগী বর-পর্ব ৯
Writer: ইশরাত জাহান সুপ্তি

এখন আমি শুধু সুযোগ খুঁজছি কিভাবে এগুলো
থেকে মুক্তি পাওয়া যাওয়া যায়।হঠাৎ এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি উপায় আমার মাথায় আসল।আর তা হল আমার বাবার বাড়ি যাওয়া।এমনিতেও কতদিন ধরে যাই না।ওখানে গেলে অন্তত কয়দিনের জন্য হলেও তো এসব থেকে বাঁচব।

সকালে স্যার যখন অফিস যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলো তখন আস্তে আস্তে স্যারের পিছনে দাঁড়িয়ে বললাম,স্যার একটা কথা ছিল।
স্যার আয়নায় আমার দিকে তাকিয়ে চুল ঠিক
করতে করতে বলল,কি?
আমি বললাম,আমি আমাদের বাড়িতে যাবো।
স্যার ভুরু কুঁচকে বলল,না এখন আমার অফিসে জরুরী কাজ আছে আমি যেতে পারব না।
আমি বললাম,আপনাকে কে যেতে বলেছে আমি একাই যাবো।
স্যার বললো,আমি যখন যেতে পারব তখনই তুমি যাবে।আমার সাথে।
স্যারের কথা শুনে তো আমার বিরক্তি চরম শিখরে উঠে গেল।
ইশশ!ওখানেও তাকে সাথে নিয়ে যাবো যাতে সেখানেও আমার ক্লাস নিতে পারে!
আমি কপাল কুঁচকে বললাম,আমি একাই যাবো।
স্যার আমার দিকে ফিরে বলল,আমি তোমাকে যেতে দিবো না মানে দিবো না।
এই বলে সে অফিসে চলে গেল।
আমিও ভাবছি কিভাবে যাওয়া যায়।

“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



রাতে সবাই একসাথে খেতে বসেছি।আমার মাথায়
একটা বুদ্ধি আসল।
আমি দুঃখী দুঃখী একটা ভাব নিয়ে আমার শ্বশুরকে বললাম,বাবা আমার না বাসার কথা খুব মনে পড়ছে।আমি কয়েকদিন গিয়ে থেকে আসি?
বাবা নরম গলায় বলল,আরে মা এটা আবার জিগ্যাসা করার কি আছে,তোমার যখন ইচ্ছা তুমি যাবে।
শুনে আমি তো সেই খুশি।কিন্তু আমার খুশির
বারোটা বাজিয়ে স্যার থমথম গলায় বলে উঠল,
না না ও এখন যেতে পারবে না।
আমি চেহারায় কাঁদো কাঁদো ভাব এনে রাখলাম।
এবার আমার শ্বাশুড়ি মা বলে উঠল,দিলি তো মেয়েটার মন খারাপ করে।
তারপর আমার মাথায় হাত দিয়ে বলল,মা তুমি মন খারাপ করো না।তুমি অবশ্যই যাবে।
স্যার রাগী গলায় বলে উঠল,আমি বলেছি না ও এখন যেতে পারবে না।
এবার আমার শ্বাশুড়ি মা স্যারকে একটা ধমক দিয়ে বললেন,চুপ।তুই বলার কে রে?বেশি কথা বললে এখন আমার হাতে মার খাবি।
সুপ্তি কালকেই যাবে।

ইয়াহু!আমার তো ইচ্ছা করছে আমার শ্বাশুড়ি  মাকে গিয়ে একটা টাইট হাগ দেই।
স্যারের মুখটা দেখার মতো।একেবারে থমথম হয়ে রয়েছে।

আমি গুনগুন করে গান গেয়ে জামাকাপড় গোছগাছ করছি আর স্যার রুমের ভেতর অস্থির হয়ে পায়চারি করছে একবার এই মাথায় আরেকবার সেই মাথায়।
হঠাৎ থেমে আমার সামনে এসে বলল,তোমার যেতেই হবে,কয়দিন পর গেলে কি হয়?
আমি জামা ভাঁজ করতে করতেই তার দিকে না তাকিয়েই বললাম,অনেককিছু হয়।
স্যার এবার নরম করে বলল,আর কয়দিন পর যাও না!
কিন্তু আমি সেভাবেই বলতে থাকলাম,না আমি কালই যাবো।আপনি আমাকে এখন কিছুই বলতেও পারবেন না।বললে আমি বাবা মাকে বলে দিব।আর এইবার গেলে আমি একমাসের আগে আসছি না।

আমার এতটুকু বলতে না বলতেই স্যার ঝট করে আমায় কোলে নিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে আমার উপর উঠে তার হাত দিয়ে আমার হাত বিছানার সাথে চেপে ধরে আমার ঘাড়ে তার মুখ ডুবিয়ে কামড় দিয়ে উঠল।
আমি তো আচমকা কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

কিছুক্ষণ পর আমাকে ছেড়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,এখন দেখি তুমি কিভাবে যাও।সবাই যখন জিগ্যাসা করবে এই দাগ কিসের তখন কি বলবে?
আমি তাকে ধাক্কা দিয়ে আমার উপর থেকে সরিয়ে আয়নার সামনে গিয়ে হাত দিয়ে দেখলাম,সত্যিই গলার কাছটায় লাল হয়ে কামড়ের দাগটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এখন আমি দাগ নিয়ে কিভাবে ওখানে যাই।কেউ দেখলে কি ভাববে!এখানে তবুও ওড়না দিয়ে ঢেকে টেকে রাখতে পারব কিন্তু সেখানে এভাবে
তো থাকতেও পারব না।আমার LC ভাবীটা দেখলেই ওড়না টেনেটুনে বলবে এমন করে রয়েছিস কেনো?আর যদি এই দাগ দেখে তাহলে তো আর কথাই নেই! লুচু লুচু কথা বলে খ্যাপাতে শুরু করবে।
আমি আয়নাতেই দেখলাম স্যার আয়নাতে আমাকে দেখে মিটিমিটি হাসতেই আছে।
আমি রাগে দুঃখে আমার ভাজঁ করা জামাগুলো সব তার মুখে ছুড়েঁ মারলাম।

এরপর আমি আর ঐ বাড়ি যেতে পারলাম না।আর এখানেও অনেক দিন পর্যন্ত ওড়না দিয়ে গলা ভালো করা পেঁচিয়ে তারপর রুম থেকে বের হতাম।কেউ জিগ্যাসা করলে বলতাম ঠান্ডা লেগেছে।আর সবাই বলা শুরু করত,নিজের একটু যত্ন নাও আরো কতকিছু তার সাথে স্যারও তাল মিলিয়ে বলতে থাকে, সত্যি সুপ্তি!তুমি একটু নিজের যত্ন নিতে পারো না।বলে হাসতেই থাকে।
আর আমি রাগে কটমট চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকি, ইচ্ছা করে তখন স্যারের গলা টিপে ধরি।

বাড়ি তো যেতে পারলামই না কিন্তু প্রতিদিন সেই স্যারের ক্লাস নেওয়া চলতেই থাকল।একটু পড়া না পারলেই বলে হাত পাতো তারপর চলে বেতের বারি।

দুইদিন হলো স্যারের দুই খালাতো ভাই ভাবী এসেছে।সকালে আমরা সবাই একসাথে বসে নাস্তা করছিলাম।বাবা খেয়ে অফিসে চলে গেছে।রাত বারোটা পর্যন্ত পড়ার কারণে এখনো চোখে ঘুমঘুম ভাব রয়েছে তাই বসে বসে হাম্ দিচ্ছিলাম।
এমন সময় স্যারের এক ভাবী বলল,কি ব্যাপার সুপ্তি রাতে ঘুম হয় নি ঠিকমতো?
আমি ভাবলাম এই সুযোগ।সবার সামনে বলে যদি
স্যারকে থামাতে পারি আমাকে রাত বারোটা পর্যন্ত পড়ানো থেকে।তাই ফট করে বলে ফেললাম,কি করব বলেন? আপনার দেবরের জ্বালায় রাতে একটু শান্তিমতো ঘুমাতেও পারি না।
আমার এই কথা বলার সাথে সাথে স্যারের বিষম উঠে গেল।
আর সবাই মুখ টিপে হাসাহাসি শুরু করে দিল।আর মা তো একটা লাজুক হাসি দিয়ে উঠে চলেই গেল।
আমি বুঝলাম না আমার এই কথায় হাসির কি ছিল।কই স্যারকে সবাই একটু বকা দিবে তা না!
আর স্যারের বিষম তো যেনো থামছেই না।
সেই ভাবী স্যারের সামনে একটি পানির গ্লাস দিয়ে বলল,আহারে! শুভ্র,আমাদের সুপ্তিকে একটু মাঝে মাঝে ঘুমাতেও দিয়ো।
বলেই আবার সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল।

বিকেলে সবাই মিলে ঠিক করলাম ঘুরতে যাবো।
আমি খুব সুন্দর একটি বেগুনি রঙের শাড়ি বের করলাম পড়ার জন্য।তখনই স্যার রুমে এসে আমার কাছে বলল,সুপ্তি তুমি তো মনে হয় শাড়ি পড়তে পারো না,দাও আমি পড়িয়ে দেই।
আমি তাকে থামিয়ে বললাম,জ্বি না।আমি একাই পড়তে পারি।এতদিন যে পড়লাম।
স্যার হঠাৎ রেগে গিয়ে বলল,সবকিছুই তোমার পারতে হবে।
বলেই একটা রাগ আর বিরক্ত ভাব নিয়ে চলে গেল।আর আমি তো হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
তার আবার কি হল?কেউ কিছু না পারলে মানুষ রাগ হয় জানতাম,কিন্তু কেউ কিছু পারলে যে রাগ হয় এটা তো জানতাম না।

আমি শাড়ি পড়ে হালকা সাজুগুজু করে বেরোলাম।সাজুগুজু বলতে আমার সেই সিম্পল সাজ।
দুটা গাড়ি করে আমরা বেরিয়েছি।একটাতে স্যারের খালাতো ভাই ভাবী আরেকটাতে আমি,স্যার আর সামিয়া।সামিয়া পেছনে বসেছে।
কখন থেকে দেখে যাচ্ছি স্যার ড্রাইভিং এর ফাঁকে ফাঁকে আমাকে দেখেই যাচ্ছে।এত দেখার কি হল বুঝলাম না।এভাবে তাকাতে না তাকাতে আবার অ্যাক্সিডেন্ট করে বসে।

আমরা সবাই অনেক জায়গায় ঘুরলাম।অনেক মজা করলাম।তারপর এলাম একটি নদীর পাড়ে।
আমরা সবাই গাড়ি থেকে বেরোলে আমি সবার সামনেই বললাম,স্যার চলুন না ওদিকটায় যাই।
আমার মুখে স্যার ডাক শুনে সবাই হাসাহাসি করতে লাগল।স্যারের এক খালাতো ভাই বলল,কিরে শুভ্র তোর বউ তোকে স্যার ডাকে কেন?
আবার এক ভাবী বলল,বোধহয় আমাদের সামনে নাম ধরে ডাকতে লজ্জা পাচ্ছে তাই।সুপ্তি তুমি আমাদের সামনে তোমার স্যারকে নাম ধরে ডাকতে পারো।বলেই আবার হাসতে লাগল।
স্যারও দেখলাম খানিকটা লজ্জা পাচ্ছে।

নদীর পারে আমরা একেকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে ঘুরতে লাগলাম।স্যারের ভাই,ভাবী,সামিয়া কাউকেই এখন আর দেখা যাচ্ছে না।আমি আর স্যার পাশাপাশি হাঁটছি। জায়গাটা একটু নিরিবিলি।হঠাৎ আমার চোখে পড়ল একটি আইসক্রিমের ভ্যান।আমি স্যারকে চিৎকার করে বলতে লাগলাম,স্যার আমি আইসক্রিম খাবো।প্লিজ এনে দেন।
স্যার বলল,এখন এই অসময় অাইসক্রিম খাবে?
উফ!আইসক্রিম খাবার আবার সময় অসময় থাকে।আমি স্যারকে আবার বললাম।
স্যার আমার পাগলামো দেখে আর মানা করতে পারলো না।আমাকে গাড়ীর কাছে দাড়া করিয়ে রেখে আনতে গেল।একটুপর ফিরে আসল দুইটা কোন আইসক্রিম নিয়ে তারপর দুইটাই আমার হাতে দিয়ে দিল।আমি অবাক হয়ে বললাম,আপনি খাবেন না?
সে বলল,না।দুইটাই তোমার।
আমার খুশি আর দেখে কে!দুইটা অাইসক্রিম দুই হাতে নিয়ে একসাথে খাওয়া শুরু করলাম।একটা অলরেডি খাওয়া হয়ে গেছে।আমি খাচ্ছি আর স্যার আমার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে
আছে।তা দেখে আমি দুষ্টুমি করে আমার হাতের আইসক্রিমটি তার গালে লাগিয়ে দিলাম।স্যার চমকে উঠল আর আমি হাসতে লাগলাম।স্যার হঠাৎ খপ করে আমার হাত ধরে আমাকে গাড়ির সাথে চেপে ধরল।তারপর তার গাল আমার গালের সাথে আস্তে আস্তে ঘষে তার গালের ক্রিম আমার গালেও লাগিয়ে দিল।তার ছোঁয়ায় আমি কেঁপে উঠে একদম ফ্রিজ হয়ে গেলাম।হাতের আইসক্রিমটি মাটিতে পড়ে গেল।স্যার আমার সামনের ছোট চুলগুলো আলতো করে হাত দিয়ে কানে গুঁজে দিয়ে আমার চোখে চোখ রেখে খুব আস্তে আস্তে বলতে লাগল,
আমাকে এখনো স্যার ডাকো কেন?
আমি তার চোখের ভেতর হারিয়ে গিয়েই জবাব দিলাম,আপনিই তো বলেন আপনি আমার স্যার।
স্যার একটু মুচকি হেসে বলল,আমি কি শুধু তোমার স্যারই লাগি?
এতটুকু বলে স্যার ধীরে ধীরে আমার মুখের দিকে আগাতে লাগল।খুব কাছে।তার নিঃশ্বাস আমার চোখে মুখে পড়ছে।আমি ব্লাশ করতে লাগলাম। চোখ বন্ধ করে ফেললাম।
কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই আমার সামনে ভেসে উঠল সেই মেয়ের স্যারকে জড়িয়ে ধরার দৃশ্য।
মূহুর্তের মধ্যেই সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেল।আমি স্যারকে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেললাম।স্যার পেছনে তাল সামলাতে সামলাতে আমার দিকে আহত চোখে তাকাল।আমার চোখেও পানি এসে পড়ল।আমি পেছনে ঘুরে গেলাম।

তখনই সবাই ফেরত এসে পড়ল।সবাই হেসে হেসে বলতে লাগল তারা কি কি দেখল।আমিও মুখে একটা জোর করে নকল হাসি এনে রাখতে চাইলাম।
তারপর যে যার গাড়িতে উঠে বসলাম।সামিয়া হরবর করে কথা বলেই যাচ্ছে।আমি আর স্যার দুইজনই চুপচাপ।কেউ কারো দিকে তাকাতেও পারছি না।গাড়ি চলতে লাগল।
হঠাৎ সামিয়া গাড়ির ব্লুটুথে একটি গান ছেড়ে দিল।একটি সেড সং চলছে।সামিয়া চেঞ্জ করতে চাইল।কিন্তু হচ্ছে না।তাই ওটাই চলতে লাগল।

   ইয়েহ দূরিয়া….ইন রাহো কি দূরিয়া…..♪♪♪♪♪
  নিগাঁহোন কি দূরিয়া….হামরাহো কি দূরিয়া…♪♪♪
               ফানাহ্ হো সাভিঁ দূরিয়া…….♪♪♪♪
     কিউ কোইইঁ পাস্ হে….দূর হে কিউ কোইইঁ…
           জানে না কোইই ইহা পে….♪♪♪
     আআা রাহা পাস্ ইয়া দূরঁ মে যা রাহা…♪♪
            জানু  না  মে  হুন   কাহাঁন পে…..♪♪♪
       ইয়েহ দূরিয়া…..♪♪♪ইয়েহ দূরিয়া…….♪♪♪♪
      
গানটি শুনতে শুনতে আমি জানালা দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।বারবার চোখটা ছলছল করে উঠছে।স্যারের দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম,স্যার বাম হাত দিয়ে ড্রাইভ করছে আর ডান হাতটি গাড়ির জানালার উপর রেখে মুঠ করে মুখে ধরে রেখেছে।
তার চোখও লাল হয়ে রয়েছে।

এর কিছুদিন পর স্যারের ভাই ভাবীরা চলে গেল।
আজ আমাদের ভার্সিটিতে রিইউনিয়ন।অনেক বড় আয়োজন করা হবে।আমি সকাল থেকেই নীল রঙের শাড়ি পড়ে তৈরী হচ্ছিলাম।এত বড় অনুষ্ঠান বলে কথা,ভালো করে রেডি তো হতেই হবে।আমি আয়নার সামনে চুল আঁচড়াতে লাগলাম।তখন স্যার এসে আমার পিছনে……….

চলবে,,

ভদ্র স্যার♥রাগী বর-পর্ব ৮

0

#ভদ্র স্যার♥রাগী বর-পর্ব ৮
Writer: ইশরাত জাহান সুপ্তি

একদিন বিকেলে বেডে বসে ফোনে গেমস খেলছিলাম।হঠাৎ স্যার এসে আমার সামনে একবাটি ফ্রুটস রেখে বলল,খাও।
আমি সাথে সাথে চোখ মুখ কুঁচকে ফেললাম।
এই ফল মূল আমার একদমই ভালো লাগে না।
আমি তো একদমই খাইই না।আর কলা তো আমার চোখের বিষ।এটা কোনো খাওয়ার জিনিস হলো!

ইয়াক!মুখে দিলেই আমার বমি আসে।বাবা কতবার ধমক দিয়ে আমাকে ফ্রুটস খাওয়ানোর চেষ্টা করেছে।কিন্তু বাবার সামনে এক কামড় দিয়ে বাবা সামনে থেকে যেতেই লুকিয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিতাম।পরে বাবা জিগ্যাসা করলে বলতাম সব খেয়েছি।
স্যার আমাকে আবার ধমক দিয়ে বলল,
কি হল,খেতে বলছি না!
আমি তার দিকে বিরক্ত হয়ে তাকিয়ে বললাম, এগুলো খেতে আমার ভালো লাগে না।এগুলো কোনো খাওয়ার জিনিস হলো?
স্যার আমাকে মুখ ভেংগিয়ে বলতে লাগল,না না এগুলো তো খাওয়ার জিনিস না!
খাওয়ার জিনিস তো ফুচকা,চটপটি,ঝালমুড়ি।
তুমি যে প্রতিদিন দুপুরে কম খাবার খাও আর তার কারণ যে প্রতিদিন খাওয়া ফুচকা,ঝালমুড়ি তা আমি সবই জানি।

যাহ বাবা!সে আবার আমাকে কখন দেখলো এগুলো খেতে।আমার পেছনে কি কোনো ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছে।আমি তো ভয়ে শেষ।আমার ফুচকা খাওয়া আবার বন্ধ না করে দেয়।
আমার ভয় কে সত্যি করে সে বলল,ফুচকা খাওয়া
কি বন্ধ করে দিতে চাও?
আমি তাড়াতাড়ি মাথা নাড়িয়ে না বললাম।
তাহলে তাড়াতাড়ি লক্ষী মেয়ের মত সব খাও।বলেই সে আমার সামনের সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসল।আর আমি চোখ মুখ কুচকে খেতে লাগলাম।আশায় আছি কখন বাইরে যাবে আর আমি এগুলো ফেলতে পারব।
কিন্তু না অ্যাংড়ি বার্ডটা বাইরে যাওয়ার নামও
নিচ্ছে না।সব কোনোমতে খেলাম।এখন শুধু বাকি আছে কলা।
আমি স্যারের উদ্দেশ্যে বললাম,আমি কলা খেতে পারব না।
স্যার আমাকে রাগী গলায় বলল,তাড়াতাড়ি খাও।
আমি আরো জোর দিয়ে বললাম,আমি কিছুতেই খাবো না।
স্যার এবার হাত মোড়ামুড়ি করতে করতে  বলল,আচ্ছা আমিও দেখব তুমি আর কিভাবে ফুচকা খাও।
আমি কাঁদো কাঁদো মুখ করে একটু একটু করে খাওয়া শুরু করলাম।স্যার এসে আমার হাত থেকে কলা নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে বেশি করে আমার মুখে তুলে দিতে লাগল।
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



এই অ্যাংড়ি বার্ড টা এভাবেই আমাকে জ্বালিয়ে মারছে।ঝাল খেতে না দিয়ে,সকালে জগিং করিয়ে,সকাল সকাল গোসল করিয়ে,ব্রেকফাস্টে এক গাদা ফল আর কলা খাইয়ে আবার রাতে একগ্লাস দুধ।সব আমার অপছন্দের জিনিস।আমার যত্ন নিয়েই আমাকে সে জ্বালিয়ে যাচ্ছে।

তার জ্বালায় রাতে একটু না খেয়ে ঘুমাতেও পারি না।
একদিন রাতে না খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আগে আগে।কিন্তু স্যার এসে শুনেই প্লেটে এক গাদা ভাত নিয়ে আমাকে একটান দিয়ে বসিয়ে দিল।
আর নিজের হাতে আমাকে খাইয়ে দিতে লাগল।
আর আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও ঘুমঘুম চোখে খেতে থাকি।

এভাবে যখনই আমি খেতে চাইব না তখনই আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয়।তার কথা না শুনেও উপায় নেই তার ধমক আর শাস্তি তো আছেই।

একদিন রাতে আমার হাতে একগ্লাস দুধ দিয়ে সে বাথরুমে চলে গেলে আমি আস্তে আস্তে ব্যালকনিতে গিয়ে সব দুধ ফেলে দিয়ে আসি।তারপর এমন ভাব করি যে সব খেয়েছি।
একটু পরেই বাড়িতে ড্রাইভারের চেচাঁমেচিতে সবাই নিচে চলে যায়।ড্রাইভারের চেচাঁমেচির কারণ হল,সেই এক গ্লাস দুধ।বুঝতে পারলাম আমি যেই দুধ ব্যালকনি দিয়ে ফেলে দিয়েছি সব ড্রাইভারের মাথায় পড়েছে।আর বেচারা সেগুলো ভুতের কান্ড মনে করে ভয়ে ভূত ভূত করে চেচাঁমেচি করছে।স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখি সে আমার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে।তার মানে ইনটেলিজেন্ট ছেলে সবই বুঝে গেছে।

সেদিন আমাকে দুধ না খাওয়ার জন্য আঠারো মিনিট কানে ধরে দাড়ঁ করিয়ে রেখেছে তাও আবার টি টেবিলের উপর।তাহলে বুঝো ঠ্যালা!
তবে একটা কথা,স্যার যখন আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দেয় আমার বেশশশ ভালো লাগে।

রাতে একা একা কিছু করার নেই দেখে আলমারিটা ঘাটাঘাটি করছিলাম।হঠাৎ একটা ছবি পেলাম।আমাদের কলেজের বিদায় অনুষ্ঠানের।সকল টিচার আর ক্লাসের সবাই মিলে যে ছবিটা তুলেছিলাম।কলেজের ছবিটা দেখে আগের সব কথা মনে পড়তে লাগল।স্যারের সাথে আলাপ,ঘোরাঘুরি করা,তারপর যোগাযোগ বন্ধ করা।
মনে খারাপ হয়ে গেল।তখনই স্যার এসে ছো মেরে আমার হাত থেকে ছবিটি নিয়ে আমার হাত শক্ত
করে ধরে বলল, এগুলো বের করেছো কেনো?
সেই যন্ত্রণার কথা আমাকে মনে করিয়ে দিও না।
তুমি আমার সাথে যা করেছো তা আমি কোনোদিনই ভুলতে পারব না।এই বলে সে রেগে টি টেবিলটায় একটা লাথি দিয়ে চলে গেল।

আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলাম।আমার কথা আমাকেই শুনাচ্ছে।এই কথা গুলো তো আমার বলা উচিত।বড্ড অভিমান জমা আছে আমার তার উপর।কেনো করল আমার সাথে এমন?আর এখন আবার আমাকেই রাগ দেখাচ্ছে।আমার চোখ ছলছল করে উঠল।

আমার ইনকোর্স এক্সাম শেষ হয়েছে কয়দিন আগেই।সন্ধ্যা বেলা বসে টিভিতে সিরিয়াল দেখছিলাম।এমন সময় স্যার এসে টিভির মেইন সুইচ অফ করে দিল।আমি বিরক্ত মুখে বললাম,কি হল টিভি বন্ধ করলেন কেনো?এখনই কি সুন্দর একটা সিন হত।
সে থমথম গলায় বলল,সারাদিন শুধু ঘুম, মোবাইল আর টিভি।ভুলেও বই হাতে নিতে তো দেখিই না।
তারপর রাগী বলায় বলল,তোমার ইনকোর্স এক্সামের রেজাল্ট দিয়েছে।A মাইনাস পেয়েছো।

তার কথা শুনে বুঝলাম সে ভার্সিটিতে গিয়ে আমার রেজাল্ট নিয়ে এসেছে।রেজাল্ট আমিও পেয়েছি আগেই ফোনে।কিন্তু এই ইনকোর্স এক্সামের রেজাল্টে কি হয় তাই শুধু শুধু আর মাথা ঘামাই নি।
তারপর স্যার আমাকে বলল,যাও তোমার সব বই নিয়ে আসো।আমাকেই এখন থেকে তোমায় পড়াতে হবে।আমি না ধরলে তুৃমি আর ঠিক হবে না।
আমি মুখ ফুলিয়ে রইলাম।উফ! এখন আবার আমার সাথে স্যারগিরি ফলাবে।বই নিয়ে তার সামনে রাখলাম।
সে বই নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,কতটুকু পড়েছো।
আমি তার কথা শুনে মাথা চুলকাতে লাগলাম।

কারণ আমি এখনো এই সেমিস্টারের কোনো বই পড়া শুরুই করিনি।আসলে আমি সারাবছর বেশি বই পড়ি না।পরীক্ষার আগে আগে পড়ি।
এখন স্যারকে কি বলব?
স্যার আবারো আমার দিকে তাকিয়ে বলল,কি হল
বলো?
আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে স্যার বুঝে গেল।
তারপর বিরক্ত হয়ে বলল,হাফ সেমিস্টার শেষ হয়ে গেছে আর তুমি এখনও বই ধরোও নি।
এখন দাঁড়িয়েই থাকবেন নাকি তাড়াতাড়ি পড়তে বসবেন।
আমি মুখ ফুলিয়ে তার সামনে পড়তে বসে গেলাম।স্যার আমাকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে।কিন্তু আমি ঠিকঠাক মনোযোগ দিচ্ছি না।একবার এদিক সেদিক তাকাচ্ছি তো একটু বিছানার সাথে হেলান দিচ্ছি আবার হাম দিচ্ছি,ঝিমুচ্ছি।স্যার কয়েকবার ধমক দিয়ে ফেলেছে কিন্তু আমাকে পড়ায় মনোযোগ দেওয়াতে পারছে না।

স্যার বিরক্ত হয়ে উঠে বাইরে চলে গেল।আমিও একটু সুযোগ পেয়ে বিছানায় হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লাম হাতের উপর মাথার ভার দিয়ে।
একটু পর স্যার রুমে ফিরে আসল।তার হাতের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ চড়কগাছ!
ধরফরিয়ে শোওয়া থেকে উঠে বসলাম।স্যার বেত হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আমি চোখ কপালে তুলে তাকে বললাম,আপনি কি এখন পাজী ছেলেদের মতন বউ পেটাবেন?
স্যার একটা চোখ টিপ মেরে বললেন,বউ পেটাবো না ছাত্রী পেটাবো।
তারপর আবার গম্ভীর হয়ে বললেন,তাড়াতাড়ি সোজা হয়ে পড়।
আমি তো বেত দেখে সোজা হয়ে বসলাম।কিন্তু পড়তে একদমই ইচ্ছে করছে না।মোচড়ামোচড়ি করতে লাগলাম।একটু পরপরই ঝিমুনি এসে পরে।
আর যখনই একটু ঝিমুই স্যার দেয় বেত দিয়ে একটা বারি।
একটুপর আমি মুখে রাজ্যের সব ইনোসেন্ট ভাব নিয়ে ন্যাকু ন্যাকু করে বললাম,স্যার পুরো বই কি আজকেই শেষ করে দিবেন?
এখন একটু ঘুমিয়ে পড়ি প্লিজজ।
আমার এত ইনোসেন্ট ভাবের কোনো দাম না দিয়ে
সে বলল,চুপ। পড়তে থাকো।বলেই আমাকে পড়া দেখাতে লাগলেন।
আমিও মুখ ভেংগিয়ে হাত দিয়ে তার গলা টেপার ভঙ্গি করে বিড়বিড়িয়ে গালি দিতে লাগলাম।

এভাবেই আমার ঝিমুনি,মোচড়ামোচড়ি,স্যারের ধমক আর একটু পরপর বেতের বারি খেতে খেতে পড়া চলতে লাগল।রাত বারোটা বাজে পেলাম ছুটি।
ছুটি পেয়ে আমি একলাফে যে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লাম।তারপর এক ঘুমিয়ে রাত কাবার।

এরপর থেকে প্রতি রাতেই চলতে লাগল স্যারের আমাকে বেত দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে পড়ানো।রাত বারোটার আগে একদমই ছাড়ে না।যখন স্যার ছিল তখন যা করেনি এখন বর হয়ে তা করছে।
আমার তো মনে হয় আমি শ্বশুরবাড়িতে না  টুয়েন্টি ফোর আওয়ার একটি ট্রেনিং স্কুলে আছি।
হায় আল্লাহ!আমার জীবনটা তো এই অ্যাংড়ি বার্ড টা ত্যানা ত্যানা করে দিচ্ছে।

এখন আমি শুধু সুযোগ খুঁজছি কিভাবে এগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যাওয়া যায়।হঠাৎ এসব থেকে মুক্তি পাওয়ার একটি উপায় আমার মাথায় আসল।
আর তা হল……..

চলবে,,

ভদ্র স্যার♥রাগী বর-পর্ব ৭

0

#ভদ্র স্যার♥রাগী বর-পর্ব ৭
Writer: ইশরাত জাহান সুপ্তি

আমি হাসতে হাসতেই পিছনে ফিরে দেখলাম,
স্যার দূর থেকে আমার দিকে রক্তবর্ণ চোখে তাকিয়ে রয়েছে।রাগে যেন সে এখনই ব্লাস্ট হয়ে যাবে।
হঠাৎ আমার কাছে এসেই সে আমার হাত ধরে টেনে রুমে নিয়ে আমার কাধঁ তার দু হাত দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।তার চোখে রাগ স্পষ্ট।আমাকে যেন কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না।

হঠাৎ আমাকে ছেড়ে দিয়ে পিছনে ফিরে দু হাত দিয়ে তার সামনের চুলগুলো পিছনে নিতে নিতে নরম গলায় বলে উঠল,
আমার ভালো লাগে না….অন্য কারো সাথে……
তোমাকে……
আর যেন কিছু বলতে পারছে না।এতটুকু বলেই মুখ ফ্যাকাসে করে রুম থেকে বেরিয়ে গেল।আর আমি হতভম্ব হয়ে দাড়িয়ে রইলাম।স্যারের আবার কি হল!কি ভালো লাগে না?হঠাৎ এত রাগই বা কেন হয়ে এত নরম গলায় কথা বলল?কিছুই বুঝতে পারলাম না।

“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



আমাদের বাড়িতে আমাদের সেদিনটাও থাকার কথা ছিল কিন্তু স্যারের হঠাৎ নাকি কোন জরুরী মিটিং পরে গেছে।তাই বিকেলেই চলে যেতে হবে।
শুনেই আমি মুখ গোমড়া করে বসে রইলাম।
স্যারকে বললাম,তাহলে আপনি একাই যান।আমি থাকি।
ভাবী আমার পাশেই দাড়িয়ে ছিল।আমার কথা শুনে আমাকে পাশ থেকে একটা চিমটি দিয়ে
ফিসফিসিয়ে বলতে লাগল,এই গাধী কি বলিস!
দুইদিন হয়েছে বিয়ে হল,আর তুই একজায়গায় থাকবি আর জামাই আরেক জায়গায় থাকবে?
আমাকে কখনো দেখেছিস তোর ভাইয়াকে ছেড়ে একা থাকতে!চুপচাপ শ্বশুর বাড়ি যা।

উফফ! এই ভাবীটা না আমাকে জ্বালিয়ে মারবে।
আমাকে স্যারের সাথে পাঠিয়েই ছাড়ল।

গাড়ীতে চুপচাপ মুখ ফুলিয়ে বসে আছি।একবারো স্যারের দিকে তাকাই নি।স্যার বারবার আমাকে আড়চোখে দেখছে।
বাসায় এসে পৌঁছাতেই স্যার আমার পাশে গাড়ীর দরজা খুলে বলল,বের হও।

আমি চুপ করে বসেই আছি গোমড়া মুখ করে।
হঠাৎ স্যার আমাকে কোলে তুলে নিল।আমার তো চোখ বড়বড় হয়ে গেল।আমি ছটফট করতে করতে বললাম,কি করছেন?নামান আমাকে কেউ দেখলে কি বলবে!
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে বলল,ছটফট করা বন্ধ করবে।তারপর একটু মুচকি হেসে বলল,উফফ!কি ভারি তুমি।বলেই বাড়ির ভেতর হাঁটা শুরু করল।
আমার তো আরো রাগ উঠে গেল।আমাকে মোটা বলা!
আমাকে সোজা রুমে নিয়ে কোল থেকে নামিয়ে বেডে বসিয়ে দিল।
আমি রাগ করে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে রাখলাম।
স্যার আমার দিকে তাকিয়ে একটি মুচকি হাসি দিল।তারপর তার ফাইলগুলো নিয়ে অফিসে চলে গেল।

সন্ধার একটু পরেই সে ফিরে এলো।আমি সোফায় বসে টিভি দেখছিলাম।তার দিকে ফিরেও তাকালাম না।স্যার আমার সামনে এসে এক বক্স চকলেট রাখল।আমি একটু আড়চোখে দেখলাম কিন্তু ধরলাম না।কারণ আমি তো রাগ করেছি।এত সহজে কি গলে যাওয়া যায়!
আমি ধরছি না দেখে সে চকলেটগুলো নিয়ে ড্রয়ারে রাখতে রাখতে বলল,কেউ যদি খেতে চায় এখান থেকে নিতে পারে।
আমি শুনে টিভির দিকে তাকিয়েই একটা মুখ ভেংচি দিলাম।

একটু পর স্যার রুম থেকে বেড়িয়ে গেল। আমার চোখ বারবার ড্রয়ারের দিকে যাচ্ছে।এমন কোনো মেয়ে নেই যে কিনা চকলেট পছন্দ করে না।আর এতগুলো চকলেট একসাথে দেখে তো….।
না খাওয়া যাবে না।আমি না রাগ করেছি?কোনো মান সম্মান আছে নাকি!
পুরো রুম চকলেটের ঘ্রাণে ভরে গেছে।এত খেতে ইচ্ছে করছে!
পরে সিদ্ধান্ত নিলাম,শুভ্র স্যার যেহেতু রুমে নেই তাই একটা খাওয়া যেতেই পারে।এতগুলোর ভেতর থেকে একটা খেলে স্যার বুঝতে পারবে না।

যেই ভাবা সেই কাজ।ধীরে ধীরে ড্রয়ার টা খুলে একটা চকলেট নিয়ে খেতে শুরু করলাম।একটা খাওয়ার পর আরেকটা খেতে ইচ্ছা করল।
তাই আরেকটা নিয়ে অর্ধেক খেতেই স্যার রুমে চলে আসল।আমাকে এই অবস্থায় দেখে হাসতে লাগল।আমি রাগে লজ্জায় লাল হয়ে রুম থেকে বের হয়ে সামিয়ার রুমে চলে গেলাম।

রাতে খাওয়া দাওয়ার পর আমি আগেই শুয়ে পরলাম অন্য দিকে মুখ করে।একটু পর স্যার এসে আমাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে তার দিকে ঘুরানোর চেষ্টা করল।কিন্তু আমি ঘুরলাম না।মুখ গোমড়া করে রইলাম।তারপর স্যার আমার উপর দিয়ে গিয়ে আমার এই পাশে এসে শুয়ে পড়ল।আমিও আবার উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে পড়লাম।
সাথে সাথে স্যারও এই পাশে এসে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।এবার আমি আর নড়তেই পারছি না।হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছোটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলাম।কিন্তু তাকে একচুলও নড়াতে পারলাম না।স্যার আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে।তারপর আমিও হাল ছেড়ে সেভাবেই শুয়ে থাকলাম।

একটুপর স্যার ঘুমিয়ে পড়ল।তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার সব রাগ হাওয়া হয়ে গেল।স্যারের ঘুমন্ত মুখটি দেখতে কি সুন্দরই না লাগছে।মনে হচ্ছে পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর জিনিস আমার চোখের সামনে রয়েছে।
হঠাৎ আমার চোখ গেল স্যারের সোজাসুজি রাখা মাছর অ্যাকুরিয়ামটির দিকে মাছ দুটি মনে হচ্ছে একসাথে থেকেই বেশি খুশি হয়েছে।আগের থেকেও বেশি।

সকালে নিচে গিয়ে মাকে একটু আধটু সাহায্য করলাম।সামিয়ার সাথে চা খেয়ে একটু গল্প স্বল্পও করলাম।তারপর রুমে আসতেই সামনে তাকিয়ে মুখে হাত দিয়ে দিলাম একটা চিৎকার।
কারন আমার সামনে স্যার দাঁড়িয়ে রয়েছে তাও আবার শুধু মাত্র একটি টাওয়েল পেঁচিয়ে।মাত্রই মনে হয় স্নান সেরে  এসেছে।উন্মুক্ত বুকে বিন্দু বিন্দু পানি জমে রয়েছে।চুলও ভেজা।
তাকে এই অবস্থায় দেখে আমার চোখ বড় বড় হয়ে মুখ দিয়ে চিৎকারই বেরোলো।সে আমার দিকে তাকিয়ে ভুরু কুঁচকে বলল,কি হল,এমন করছো হাউকাউ করছো কেনো?
আমি তাকে বললাম,আপনার কি একটুও লজ্জা শরম নেই।এভাবেই বাথরুম থেকে বের হয়ে গেছেন!
সে আমার কাছে ধীরে ধীরে আগাতে লাগল আর আমি পিছাতে লাগলাম।একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলতে লাগল,কেনো লজ্জা করবে কেনো!রুম আমার,মর্জি আমার,এমনকি সামনের বউটাও আমার।
কাছে আসতে আসতে সে তার দু হাত দিয়ে একেবারে আমাকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।

উফফ!কথায় কথায় সে শুধু আমার কাছে এসে পড়ে কেনো?
এটা কেনো বুঝে না সে কাছে আসলেই আমার হার্টবিট রেলের গতিতে চলতে থাকে।
আমি তাকে মুখ ভেংচি দিয়ে বললাম,
আপনি একটা LC।
সে অবাক হয়ে বলল,LC মানে?
আমি বললাম,মানে হল Luchu Company.
বলেই জিভ কামড় দিলাম।এটা কি বলে ফেললাম।এখন তো আমি গেছি!
স্যার আমার আরো কাছে এসে রাগী গলায় বলল,আমি লুচু?

তখনি সামিয়া রুমে এসে পড়ল।আমাদের দুজনকে এই অবস্থায় দেখে একটা মৃদু চিৎকার দিয়ে ওর হাতের জামাটা ফেলে এক দৌড় দিয়ে চলে গেল।বেচারি বোধ হয় জামাটা আমাকে দেখাতে এসেছিল।না জানি কি ভাবছে।ধ্যৎ!

সামিয়াকে দেখে স্যার দূরে সরে গিয়েছিল।তাই আমিও তাড়াতাড়ি সেখান থেকে চলে আসি।

নাস্তার টেবিলে সবাই বসে আছি।সামিয়া শুধু আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসেই যাচ্ছে ।এখন একে কিভাবে বোঝাই,ও যা ভাবছে এমন কিছু না।

এমন সময় আমার শ্বাশুড়ি মা আমাকে বলে উঠল,সুপ্তি,শুভ্র বলল তোমার নাকি অনেক গ্যাষ্টিক।তোমার জন্য সব খাবার ঝাল কম দিয়ে রান্না
করেছি।
আমার তো মাথায় বাঁশ!
তার মানে স্যার এখানেও বলে বেড়িয়েছে।আমি আমতা আমতা করে বললাম,না মা একটু ঝাল খেলে কিছুই হবে না।
আমার শ্বাশুড়ি মা  জোর দিয়ে বলে উঠল,না না স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো আস্কারা নয়।তুমি এখন থেকে ঝাল কমই খাবে।
আমি আর কি বলব এখন।রাগে কটমট চোখে স্যারের দিকে তাকালাম।আমার ঝাল খাওয়ার বাড়োটা বাজিয়ে সে নিশ্চিন্তে খেয়ে যাচ্ছে।

আজ আমাকে রান্না করতে হবে সবার জন্য।শুভ্র স্যারের ফুফু বলেছেন।আমার শ্বাশুড়ি মা মানা করেছিল।কিন্তু স্যারের ফুফু বলেছে এটাই নিয়ম।স্যারের দুই ফুফু।আরেক ফুফু বিদেশে থাকেন।আসতে পারেন নি।আর এই ফুফুটা একটু কড়া।

আমি রান্নাঘরে সবকিছু নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।
এমন সময় স্যার হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে আসল।আমি অবাক হয়ে চোখ দিয়ে ইশারা করলাম,এখানে কি?

স্যার বলল,তুমি তো রাধঁতে পারো না।দাও আমি রান্না করে দেই।আমি চোখ কপালে তুলে বললাম,
আপনি রান্নাও করতে পারেন।সে বলল,হ্যাঁ।লন্ডনে যখনে হায়ার স্টাডিজের জন্য যখন ছিলাম তখন আমার নিজের রান্না আমিই করতাম।
আমিও একটু ভাব নিয়ে বললাম,আমিও এখন রান্না শিখেছি।আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
স্যার বলল,ঠিকাছে তুমি রান্না কর,আমি অন্তত সবজিটা কেটে দেই।
আমি আরো কিছু বলতে নিচ্ছিলাম।কিন্তু স্যার আমাকে থামিয়ে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
কি সুন্দর করে সবজি কাটছে।মনে হচ্ছে খুবই যত্ন সহকারে সবজি গুলোকে কুচি কুচি করছে।

আমি রান্না পারলেও মোটামুটি পারি।শখের রান্না।মাঝে মাঝে মন চাইলে করি।সব আইটেম মোটামুটি কোনোমতে কমপ্লিট করলাম।
কিন্তু বাঁধ মানল পায়েস।আমি পায়েস কখনো করি নি।শুনেছি কিভাবে বানায় কিন্তু তবুও ভয় লাগছে।যদি ঠিকঠাক না হয়।
স্যার আমার অবস্থা দেখে বলল,দাও পায়েশ আমি করি।
আমি তাকে থামিয়ে হরবরিয়ে বলতে লাগলাম,
না না।ফুফু বলেছে পায়েস আমাকেই করতে।এটাই নাকি নিয়ম।বাড়ির বউকেই করতে হবে।আর আপনি কিভাবে…
আর কিছু বলতে দিল না।আমার ঠোঁটে তার আঙুল দিয়ে চুপ করিয়ে বলতে লাগল,বিয়েটা আমরা দুজন করেছি।তুমি একা নও।তাহলে নিয়ম শুধু তুমি একা পালন করবে কেনো?
আমি যদি পায়েস রাধঁতে পারি তাহলে আমার করতে অসুবিধা কি?

বলেই আমাকে ধরে সাইডে দাঁড় করিয়ে তার ব্লেজার আর হাতের ঘড়ি খুলে আমার হাতে দিয়ে শার্টের হাতা ফোল্ড করে রান্না করতে লাগল আর আমাকে শেখাতে লাগল।
আর আমি মুগ্ধ চোখে স্যারের দিকে তাকিয়ে দেখতে লাগলাম।একটা মানুষ এতটা পারফেক্ট কি করে হয়!তার ভাবনাও কি সুন্দর!
যতটুকু আমি জানি ছেলেরা রান্নাঘরে প্রবেশ করাটাকেও তাদের পুরুষত্বের বাইরে মনে করে।
স্ত্রীকে সাহায্য করা তো দূরে থাক।

স্যার রান্না শেষে আমার মুখে একচামচ পায়েস তুলে দিয়ে আমার ধ্যান ভাঙালো।চোখ দিয়ে ইশারা করে জানতে চাইল কেমন হয়েছে।
আমি তো মুখে নিয়ে স্ট্যাচু হয়ে গেছি।মিষ্টি জিনিস আমার বেশি ভালো লাগে না কিন্তু স্যারের হাতের পায়েস অসাধারণ হয়েছে।খেতে খুবই ভালো লাগছে।

দুপুরে সবাই খাওয়া দাওয়া করে রান্নার খুব প্রশংসা করল।সব থেকে বেশি করেছে পায়েসের।সবাই ভাবছে এটা আমিই করেছি।তাই আমারই প্রশংসা করছে।আমার খারাপ লাগল।এত কষ্ট করে স্যার রেধেঁছে আর প্রশংসা সব আমি নিচ্ছি।আমি একবার বলতে নিলাম যে স্যার পায়েস করেছে।কিন্তু স্যার আমাকে চোখ ইশারা করে মানা করে দিল।

সকাল বেলা নামাজ পড়ে আমি সবসময় আবার ঘুমাই।তাই আজও নামাজ পড়ে ঘুমাতে যাচ্ছিলাম।স্যার জগিং স্যুট পড়ে আমার সামনে দাড়িয়ে বলল,এখন আবার শুয়ে পড়লে কেনো?
আমি চোখ মেলে কপাল কুঁচকে বললাম,আমি এখন ঘুমাবো।আমাকে বিরক্ত করবেন না।
স্যার কোমড়ে দুই হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে বলল,সকালে
ঘুমিয়ে থাকা ভালো না জানো না?
একটু এক্সারসাইজও করতে হয়।চলো আজকে থেকে তুমি আমার সাথে জগিং করবে।
আমার তো এই কথা শুনে চরম বিরক্তি লাগল।
এই সকাল বেলা এই সুন্দর ঘুমটা বাদ দিয়ে নাকি এখন তার সাথে দৌড়াদৌড়ি করব!

আমি বিরক্তি নিয়েই বললাম,যান তো এখান থেকে।আমি এখন দৌড়াদৌড়ি করতে পারব না।
স্যার একটা ধমক দিয়ে বলল,আবার কথা শুনছো না।উঠবে নাকি কানে ধরাবো?

তার ধমক শুনে উঠতেই হল।
হায় আল্লাহ!আমার ঝাল খাওয়া বাদ দেওয়ালো
এখন আবার আমার ঘুমটাও কেড়ে নিচ্ছে!এই অ্যাংড়ি বার্ডটা আমাকে আর কত জ্বালাবে!
আমার হাতে একটা জগিং স্যুট ধরিয়ে দিয়ে বাথরুমে পাঠিয়ে দিল।স্যুট তো পড়লাম কিন্তু আমি কখনো ওড়না ছাড়া বাইরে যাই নি।আর স্যারের সামনে এভাবে যাবো?
তাই একটা স্কার্ফ গলায় পেঁচিয়ে নিলাম।আমাকে দেখে স্যার মিটিমিটি হাসতে লাগল।আমি চুল ঝুঁটি করে তার সাথে বেড়িয়ে পড়লাম দৌড়াদৌড়ি করতে।

উফ!স্যারের সাথে কি দৌড়ে পারা যায়।
আমাকে একটি মাঠ দেখিয়ে বলল,এটা একটা চক্কর দিয়ে আসো।আমি শুনে আকাশ থেকে পড়লাম।
কিন্তু কি করার দিতেই হল।চক্কর দিয়ে আমার অবস্থা শেষ।কোমড়ে হাত দিয়ে জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগলাম।স্যার আমার হাতে একটা পানির বোতল ধরিয়ে দিয়ে আমার সামনেই ঐ মাঠটায় তিনটা চক্কর দিল।কিন্তু তার ভেতর এতটুকুও ক্লান্তি দেখা যাচ্ছে না।বাহ!সে তো ভালো ফিট।
জগিং শেষে বাসায় এসে গোসল করে নিচে চলে গেলাম।

এখন আমি ভার্সিটিতেও যাওয়া শুরু করেছি।শুভ্র স্যারই আমাকে দিয়ে আসে।আসার সময় আমি একাই আসি রিকশায়।মাঝে মাঝে স্যারও নিতে আসে।
একদিন বিকেলে বেডে বসে ফোনে গেমস খেলছিলাম।হঠাৎ স্যার এসে আমার সামনে………

চলবে,,
,,

স্বপ্ন হলেও সত্যি পর্বঃ-১৯ এবং ২০

2

স্বপ্ন হলেও সত্যি পর্বঃ-১৯ এবং ২০
আফসানা মিমি

চোখ বন্ধাবস্থায়ই দুই ঠোঁটের ফাঁক গলে অস্ফুটস্বরে স্বপ্নে দেখা অবিশ্বাস্য মানুষটার নাম বেরিয়ে আসলো
—“আকাশ!”

বেশ কয়েকটা ক্ষণ এভাবে চোখ বন্ধ করেই দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনেপ্রাণে প্রার্থনা করেই যাচ্ছিলাম এটা যেন ‘আকাশ’ নামের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিটা না হয়। স্বপ্ন যদি এভাবে সত্যি হয়ে সামনে এসে ধরা দেয়, তাহলে কী এমন অনুভূতিই হয়? স্বপ্ন স্বপ্নই থাক, সত্যি হয়ে বাস্তবে যেন তার প্রভাব না ফেলে। ভাগ্য বোধহয় এবার আমার সুপ্রসন্ন হলো না। দুরুদুরু বুকে চোখের পাতা খুলে মানুষটাকে দেখে আমার হুঁশ হারানোর মতো অবস্থা হলো। হৃৎপিণ্ডটাও যেন টুপ করেই গলায় এসে আঁটকে গেছে। এটা কীভাবে সম্ভব! সম্পূর্ন অচেনা একটা মানুষ যাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, চোখের সামনে তাকে দেখে আমার বারংবার দম আঁটকে যাচ্ছে যেন মনে হচ্ছে। কোথায় এসে পড়লাম আমি!? এতগুলো লোকের সামনে অজ্ঞান না হলেই বেঁচে যাই আমি।

মানুষটা কেমন অপলক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রথমে তো আমি ভ্রম মনে করে তাকিয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন কেমন যেন অস্বস্তিরা দানা বাঁধছে ধীরে ধীরে। আমার ভিতর বাহির পুরোটা গ্রাস করে নিচ্ছে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে। কেমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে! মেয়ে মানুষ কখনো দেখেনি নাকি?

—“এই আফসানা!”

হঠাৎই কেউ আমার নাম ধরে আচমকা ডাক দেওয়াতে সেই জায়গাটাতে যেন বাজ পড়লো। সেদিকে তাকিয়ে দেখি বড় মামী হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আবারও আগের জায়গাতে তাকিয়ে দেখি মানুষটা গায়েব। এদিক সেদিক তাকিয়ে খুঁজতে লাগলাম। কিন্তু নাহ্, কোথাও নেই। মামী আমার কাছে এসে বললো
—“এদিক সেদিক তাকিয়ে কাউকে খুঁজছো নাকি?”
আমি আনমনা হয়ে প্রত্যুত্তর করলাম
—“হ্যাঁ।
—“কাকে?”
এতক্ষণে আমার হুঁশ হলো। মামীকে কী উত্তর দিব আমি! আমতাআমতা করে বললাম
—“না না, কাউকে না। এমনিই এদিক সেদিক তাকাচ্ছিলাম। বাড়িটা দেখছিলাম আরকি। সাজানোটা খুব সুন্দর হয়েছে।”
—“হ্যাঁ, আসলাম ভাইয়ের একমাত্র মেয়ের বাগদান বলে কথা!”
মাথায় একটা প্রশ্ন তড়াক করে বারি খেয়ে গেল। মামী এখানে কী করে!? ফাল্গুনী আপুদের কোন আত্মীয় লাগে কী!? না পেরে প্রশ্ন করেই ফেললাম
—“আচ্ছা আঙ্কেল কী আপনাদের কোন আত্মীয় হয়? আপনি এ বাড়িতে যে!”
—“হ্যাঁ, আসলাম ভাই তো আমাদের খালাতো ভাই হয়। জানো না তুমি?”
আমি অবাক হয়ে বললাম
—“না তো।”
—“উনার মা আর আমাদের মা আপন দুই বোন ছিলেন। খালা আসলাম ভাইয়ের জন্মের সময়ই মারা যায়। উনার আর কোন ভাইবোন নেই। আর আমার মায়ের ঘরে আমরা তিন ভাইবোন। এক ভাই আর দুই বোন। আমার বড় ভাইয়ের সন্তানও তিনজন। দুই ছেলে ও এক মেয়ে। আর ছোট বোন সপরিবারে সিঙ্গাপুর থাকে। ওর এক ছেলে ও এক মেয়ে। আর আসলাম ভাইয়েরও এক ছেলে, এক মেয়ে।”
আমি আস্তে ধীরে বললাম
—“ও আচ্ছা, সেই কথা! আমি তো আর আপনাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে অবগত ছিলাম না। তাই জানার জন্যই প্রশ্ন করলাম। কিন্তু উনাদের তো কখনো দেখিনি নানুবাড়িতে যেতে কিংবা আপনাকেও তো দেখিনি এ বাড়িতে আসতে। কারণ আমি তো বেশ কয়েকদিনই এ বাড়িতে ছিলাম।”
মামী হেসে বললো
—“আরে বোকা মেয়ে, এখন কী আর এত বেড়ানোর সময় আছে? যার যার সংসার নিয়ে সবাইই ব্যস্ত। ফ্যামিলি অকেশন ছাড়া আমরা কেউই একসাথে জড়ো হতে পারি না। একমাত্র কোন অনুষ্ঠান হলেই কেবল আমরা সবাই এক হতে পারি। তখন সবার সাথেই দেখা হয়। আর তুমি তো তোমার নানুবাড়িতে যাওই না। কালেভদ্রে গেলেও দুই এক দিনের বেশি মনে হয় না থেকেছো। তাহলে দেখবে কী করে? আর আমারও এ বাসায় আসা হয়নি অন্তি আর রিফার জন্য। ওদের পিছনে ছুটতে ছুটতেই আমার দিন কাবার।”
আমি আবারও প্রশ্ন করলাম
—“আচ্ছা আম্মু আব্বু কী জানতো যে আসলাম আঙ্কেল আপনার খালাতো ভাই হয়?”
—“হ্যাঁ, জানতো।” তারপর হেসে বললো “তোমার মামার জন্য তো সোহরাব ভাই-ই আমাকে পছন্দ করেছিলেন। উনার বন্ধুর বোন ছিলাম যেহেতু। আসলাম ভাই তো আমার আপন ভাইয়ের মতোই ছিল। আমার মায়ের কাছেই তো উনি মানুষ হয়েছেন। তাই তোমার বাবা যখন বললো যে মেয়ে খুঁজছেন তোমার মামার জন্য, তখন ভাই আমার মায়ের কাছে এসে বলেছিলেন যে উনার বন্ধুকে নাকি উনি কথা দিয়ে ফেলেছেন যে আমাকে উনার সুমন্দীর হাতেই তুলে দিবেন। এরপর কয়েকদিনের মধ্যেই তোমার মামার সাথে আমার আক্বদ হয়ে যায়।”

আসলে আমার এই বড় মামীর সাথে আলাদা একটা সম্পর্ক আছে। আমার মনের যত কথা সব উনাকে বলি একদম নিঃসঙ্কোচে। মানুষটা বড্ড সরল আর মমতাময়ী। খুবই আদর করেন আমাকে। তিন মামীর মাঝে একমাত্র উনার সাথেই আমার সখ্যতা বেশি। তাই অকপটে এমনভাবে নিজের বিয়ের কথাগুলো বলে ফেললো। আমি চোখ কপালে তুলে বললাম
—“বাপরে! এই হিস্টোরি তো আমার অজানা ছিল। যাক এতবছর পর তাহলে জানতে পারলাম! কিন্তু আব্বু আম্মু কখনো বলেনি যে আপনি আঙ্কেলের বোন হন সম্পর্কে।”
—“হয়তো মনে ছিল না বলতে।”
—“হুম হতেও পারে।” হঠাৎই আমার কাজিনদের কথা মনে পড়লো। তাই জানতে চাইলাম “নিবিড় ভাইয়া, অন্তি আর রিফা আসেনি?”
—“অন্তির তো সামনে এইচএসসি পরীক্ষা তাই ও আসেনি। নিবিড় আর রিফা মনে হয় আকাশের সাথে। আচ্ছা তুমি থাকো আমি একটু আপার সাথে দেখা করে আসি।”

কথাগুলো বলেই মামী দ্রুত পায়ে সে জায়গা থেকে প্রস্থান করলো। আর আমার ভিতর বাহির সবটা জুড়ে যেন তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে ফের ‘আকাশ’ নামটা শুনে। কী হচ্ছে এসব আমার সাথে? নিজেই যেন নিজেকে চিনতে পারছি না। ঐ নামটা শুনেই আমার হার্ট এভাবে লাফানো শুরু হয়ে গেছে কেন? স্ট্রেঞ্জ! নিজের এমন অদ্ভুত বিহেভিয়ারের হেতু খুঁজে পাচ্ছি না। উফফ্! মস্তিষ্ক মনে হয় লোড নিতে পারছে না। চিনচিনে ব্যথা শুরু হয়ে গেছে। বেশিকিছু না ভেবে ফাল্গুনী আপুর কাছে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালাম। নিশ্চয়ই আমার অপেক্ষায় বসে আছে।

—“সানা শুনো না! আমার না খুব চিন্তা হচ্ছে। দ্যাখো হাত পা কেমন ঘামছে! উল্টাপাল্টা যদি কিছু হয়ে যায়! ভেবে ভেবে মনে হচ্ছে আমি সেন্সলেস হয়ে যাব।”
আপুকে খুব চিন্তিত দেখালো। অবশ্য চিন্তা করার মতো ব্যাপারই এটা। আমার যে দুশ্চিন্তা হচ্ছে না তেমনটা নয়। তবুও আপুর সামনে নরমাল থাকতে হচ্ছে। আল্লাহ্ যেন রহম করে।
আপুকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম
—“রিলেক্স আপু। এত টেনশন করছো কেন? যা হবে ভালোই হবে। এত বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। এতটুকু পর্যন্ত যখন আমার ওপর ভরসা রাখতে পেরেছো, শেষ মুহূর্তে এসে তা হারিয়ে ফেলো না। বললাম তো একদম টেনশন ফ্রি থাকো।”
—“তুমি ঠিক বলছো তো?”
—“হ্যাঁ, আর একটু ধৈর্য ধরো।”

আমাদের কথা বলার মাঝেই ডাক পড়লো নিচে যাওয়ার জন্য। টিস্যু দিয়ে আপুর কপালের ও গলার ঘামগুলো মুছে নিচে যাওয়ার জন্য রওয়ানা হলাম। আপুকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। ইচ্ছে করছিল কানের নিচে চোখ থেকে কাজলের কালি নিয়ে নজর টিকা দিয়ে দিতে। কিন্তু তা করা তো ঠিক না। তাই কারো নজর যেন না লাগে সেজন্য মনে মনে বদ নজরের দোয়া পড়ে ফুঁ দিলাম।

“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



ড্রয়িংরুমে সবাই একসাথে জড়ো হয়ে বসে আছে। অল্প কয়েকজন আশেপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে খোশগল্পে মত্ত হয়ে আছে। আঙ্কেলদের সকল ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনেরা একত্রে রয়েছে। আপুকে নিয়ে নামার সময় সর্বপ্রথমে আমার চোখ গেল ভাইয়ার ওপর। ভাইয়া মাথানিচু করে বসেছিল। আম্মু যখন তার পাশ থেকে উঠে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছিল তখন তার চোখ পড়ে আমাদের ওপর। এবং চোখ পড়া মাত্রই সে থমকে যায় আপুকে এই রূপে দেখে। অন্তত ভাইয়ার আঁখিদ্বয় সে কথা-ই বলছে। কেমন একটা অবাক মুগ্ধতা পরিলক্ষিত করলাম ভাইয়ার চোখে মুখে। কিন্তু পরক্ষনেই কেমন একটা বেদনার ছাপ প্রকাশ পেল পুরো মুখজুড়ে। সেটা যে কেন তা ভালো করেই বুঝতে পারছি। ভালবাসার মানুষটা অন্যকারো হয়ে যাবে সেটা ভেবেই ভাইয়ার এই অবস্থা। স্বচ্ছ পানিতে টলমল করা চোখদুটো দেখে আমার কী যে খারাপ লাগছিল বলার ভাষা জানা নেই আমার। মাথাটা নিচু করে জুতোর ফিতা বাঁধার অজুহাতে চোখের পানিটা সবার অগোচরে মুছে নিল। তা দেখে আমার ঠোঁটের কোণে এক দুর্ভেদ্য হাসির রেখা দেখা দিল। ভাইয়া এখনও সেই আগের মতো করেই পাগলের মতো ভালবাসে আপুকে। অথচ দেখো, মুখ ফুটে কিছুই বলছে না। এত ইগো ছেলেদের মধ্যে আসে কোথা থেকে!?

আপুর কাছ থেকে সরে এসে ভাইয়ার কাছে আসলাম। ভাইয়া ফ্যাকাসে মুখ করে বসে আছে। সেইসাথে কিছুটা শক্তও দেখালো মুখের হাবভাব। ভাইয়ার পাশে বসে বললাম
—“আর কত স্বাভাবিক থাকার মিথ্যে অভিনয় করে যাবে ভাইয়া? দেখলে তো তোমার ইগোর জন্য আজ আপু কারোর জীবনের অংশ হতে চলেছে। তার সাথেই জুড়ে যাবে আপুর নামটা। এতদিন আপু পাগলের মতো তোমার পিছনে ছুটে চলেছিল। আজ বোধহয় তার অবসান হতে যাচ্ছে। এখন আর তোমাকে কেউ বিরক্ত করবে না। ভালবাসার দাবি নিয়ে কেউ সামনে আসবে না তোমার।”

ভাইয়া আমার কথাগুলো শুনে কোন রিয়েক্ট না করে উঠে দাঁড়ালো। কয়েক কদম এগোনোর পর পিছন থেকে আব্বুর ডাক শুনে থেমে যেতে বাধ্য হলো।
—“কই যাচ্ছিস? এখন অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে। এদিকে আয়।”

আব্বু, আম্মু, আঙ্কেল, আন্টি, মামী, রিফা সহ আরো বেশ কয়েকজন আপুকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। ভাইয়াকে দেখে মনে হচ্ছে সেখানে যেতে ইতস্ততবোধ করছে। তাই আমি ভাইয়ার হাত টেনে ধরে নিয়ে গিয়ে সেখানে দাঁড়ালাম। দাঁড়ানোর পর আম্মু আর আব্বু ভাইয়ার পাশে এসে দাঁড়ালেন। আর আপুকে ঘিরে আছেন আঙ্কেল, আন্টি, মামী, রিফা সহ আরো কয়েকজন। যাদেরকে আমি চিনিই না। সেই মুহূর্তে মামীর পাশে যে মানুষটা এসে দাঁড়ালো তাকে দেখে আমার হাত পা বরফের ন্যায় শীতল হয়ে আসলো। বরফ যেমন হালকা ধোঁয়া উড়ে উড়ে একসময় তা তরল পানিতে রূপান্তরিত হয়! তেমনি আমার শরীরও শীতল ভাবটা কেটে আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে আসছে। যেন এক্ষুণি আমি ধপাস করে পড়ে যাব। দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও মনে হচ্ছে যেন নেই। চোখ বন্ধ করে মাথাটা এদিক সেদিক কয়েকবার ঝাঁকি দিয়ে এবার ভাইয়ার দিকে তাকালাম।

ইতিমধ্যে ভাইয়া আর ফাল্গুনী আপুর এনগেজমেন্টের এনাউন্সমেন্ট হয়ে গেছে। আমার ভাই বেচারার মুখটা হয়েছে দেখার মতো। এত বড় শক মনে হয় জীবনে এই প্রথমবার খেয়েছে। ভাইয়া নড়বার আগেই আব্বু আস্তে করে ভাইয়াকে বললো
—“এমন কোন কাজ কোরো না, যাতে করে আমার সম্মান আজ ধূলিসাৎ হয়ে মাটির সাথে মিশে যায়। যা করবে ভেবেচিন্তে করবে। মনে রেখো, উল্টাপাল্টা কিছু করলে এর ফল কিন্তু খুব একটা সুখকর হবে না। এটাই আমার শেষ কথা।”

আব্বুর রাগের সাথে আমরা সবাইই খুব ভালো করেই পরিচিত। তাই ভাইয়াও আর টুঁশব্দটিও না করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। আপুর আঙুলে পরানোর জন্য ভাইয়ার হাতে যখন রিংটা দেওয়া হলো, তখন ভাইয়া আপুর দিকে একবার তাকিয়ে আবার চোখ ফিরিয়ে নিল। আপু ভাইয়ার দিকেই তাকিয়ে ছিল। ভাইয়ার এমন করে চোখ ফিরিয়ে নেওয়াটা আপুর কাছে যেন কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ালো। আর কোন কথা না বাড়িয়ে ভাইয়া আপুর অনামিকায় রিংটা খুব সযত্নে পরিয়ে দিল। ভাইয়ার হাত ধরার স্টাইলটা আমার খুব ভালো লেগেছে। আপুও কাঁপা কাঁপা হাতে ভাইয়ার ডান হাতে রিং পরিয়ে দিল। ভাইয়া অপলক নেত্রে আপুর দিকে বেশ কয়েকটা ক্ষণ তাকিয়ে ছিল। পরক্ষনে দুজনেই চোখ ফিরিয়ে নিল।

আমার কেন যেন মনে হচ্ছে এক জোড়া কৌতূহলী চোখ আমার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। যার জন্য চরম অস্বস্তিবোধ করছি। মেয়েদের ষষ্ট ইন্দ্রীয় এটা জানান দেয় শুনেছি। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে খুঁজার চেষ্টা করছি কোন মানুষটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার ধারনাই সঠিক হলো। মামীর পাশের সেই অচেনা ছেলেটা হাসি হাসি মুখ করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। স্বপ্নে দেখা একটা মানুষের সাথে এতটা মিল কী করে সম্ভব এই মানুষটার? সেই একই চুল, একই চেহারার ধরণ, একই নাক, একই ঠোঁট, একই হাসি, সেই একই চোখ….. না না চোখগুলো এক না। সেই ঘন, লম্বা লম্বা পাপড়ির নীল চোখের সাথে এই চোখের কোন মিলই নেই। বেমিল শুধুমাত্র এই একটা জায়গাতেই। তবে আরেকটা জিনিস চেক করার আছে। সেটা হলো কণ্ঠস্বর। আচ্ছা, আমি এত ইম্পোর্টেন্স দিচ্ছি কেন এই ছেলেটাকে। নো নো, আমার ভাবনায় লাগাম টানা উচিৎ।
‘কেমন বেহায়ার মতো হা করে তাকিয়ে আছে দেখো!’ এটা মনে মনে বলার সাথে সাথেই আমার মন আমাকে কষে একটা ধমক দিল ‘তুই কী কম বেহায়া নাকি? তুইও তো ঐ ছেলেটার চেয়ে দুই ডিগ্রী উপরে। দুইবারই এমন রাক্ষুসে দৃষ্টি মেলে ছেলেটাকে গিলছিলি তুই। তবে ছেলেটা তাকালে দোষ কোথায়? নিজের বেলায় ষোলআনা, তাই না রে?’

আমার বিরুদ্ধে মন এভাবে অন্যের পক্ষ নিয়ে কথা বলায় ওর সাথে নীরব যুদ্ধ লাগিয়ে দিলাম। কেমন অবিচার দেখেছো! আমার মন আমার কথা না বলে অন্যের পক্ষ নেয়। আমাদের নীরব যুদ্ধের অবসান ঘটলো আচমকা মামীর ডাকে। মনকে ইচ্ছেমতো শাসালাম এটা বলে যে ‘তোকে আমি পরে দেখে নেব। তুই আসলেই একটা নিমকহারাম। আমার সাথে থেকে অন্যের পক্ষপাতিত্ব করিস।’ আমার শাসানিতে কাজ হলো। মন আমাকে ভ্যাংচি কেটে নীরব হয়ে গেল।

মামীর কাছে যাওয়ার পর মামী বললেন
—” নিবিড়ের সাথে তো তোমার দেখা হয়নি, তাই না? দেখলাম ও খুঁজছে তোমাকে। এসো দেখা করে যাও। আমরা আবার বাড়ির পথে রওয়ানা দেব। অন্তিটা বাসায় একা।”
—“হ্যাঁ, যাচ্ছি। চলেন।”

গোলবৈঠকের নিকট গিয়ে উপস্থিত হওয়ার পর দেখি তিন পরিবারের সবাই সেখানে। একমাত্র আমিই দলছাড়া ছিলাম এতক্ষণ। এবার বোধহয় পরিপূর্ণ হলো। ঐ ছেলেটাও দেখি উপস্থিত এখানে। এবার তাকিয়ে সাথে সাথেই চোখ ফিরিয়ে নিলাম। মনকে এবার কোন সুযোগই দেব না আমাকে বেহায়া বলার। সাহস কত বড়! বলে কিনা আমি বেহায়া! আমার ভাবনার মাঝেই আম্মু বলে উঠলো
—“কিরে এতক্ষণ তুই কই ছিলি? আমরা সবাই এখানে, আর তুই কই গিয়ে উধাও হয়ে গেছিলি?”
মিনমিন স্বরে জবাব দিলাম “আমি তো এখানেই আশেপাশেই ছিলাম।”

—“আপুটা কেমন আছে?”
নিবিড় ভাইয়া জিজ্ঞাসা করলো আমাকে। আমিও হালকা হেসে বললাম
—“আলহামদুলিল্লাহ্। আপনি কেমন আছেন ভাইয়া?”
—“ভালোই আছি সকলের দোয়ায়। আমাদের কী ভুলে গেলে নাকি? ফুপীর সাথে মাঝে মাঝে যেতে পারো না?”
—“আসলে ভাইয়া পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি তো তাই খুব একটা যাওয়া হয় না কোথাও।”
আমার কথা শেষ হতে না হতেই মামী বললেন
—“তোমাকে তো আমার ভাইয়ের ছেলের সাথে পরিচয়ই করাইনি।” ছেলেটাকে দেখিয়ে “এ হচ্ছে আকাশ। পেশায় কলেজের প্রফেসর। আর আকাশ, এ হচ্ছে আমার একমাত্র ননদের একমাত্র মেয়ে আফসানা।”
এর মাঝেই নিবিড় ভাইয়া ধীরস্বরে দুষ্টুমি করে বললো
—“মিমি চকলেট।”

ভাইয়ার দিকে আমি রাগী চোখে তাকানোর আগেই ছেলেটা আমাকে বললো
—“হাই মিমি চকলেট।”
যদিও উনার ‘মিমি চকলেট’ বলা নামটা কেউ শুনতে পায়নি। আমি উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম বিধায় বুঝতে পেরেছি। আমিও দাঁতে দাঁত চেপে ভদ্রতাসূচক হেসে হালকা স্বরে বললাম
—“হ্যালো।”

আমার সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কণ্ঠস্বরও একদম সেম। মানে এটাও কী সম্ভব! কেন যেন এ সবকিছু আমার কাছে স্বপ্ন মনে হচ্ছে। ঘুম ভাঙলেই যেন সব আগের মতো হয়ে যাবে তেমনটা ভেবে যাচ্ছি। বেশিকিছু আর ভাবতে পারছি না। মনে হচ্ছে মাথার তার সব ছিঁড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। আল্লাহর লীলাখেলা বোঝা বড়ই দায়। আমার সাথে এসব কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে কিছুই বুঝতে পারছি না। একটা জিনিস খুব ভালো করে যেটা বুঝতে পারছি সেটা হলো এসব কিছু আমি মেনে নিতে পারছি না। জাস্ট অসহ্য লাগছে আজকের এই দিনটা। মনে হচ্ছে সব ছেড়েছুড়ে হারিয়ে যাই একলা কোথাও। তবে যদি একটু শান্তির দেখা মেলে। শ্রাবণ তো আমাকে ভুলে সুখেই আছে। তেমন করে আমিও যদি ভুলে যেতে পারতাম সবকিছু! কেন এভাবে জড়ো হাওয়ার মতো আচমকা আমার জীবনে এসে আমাকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে আবার সেভাবেই চলে গেল?! কান্না পাচ্ছে আমার, খুব জোরে কান্না পাচ্ছে। একটু চিৎকার করে কাঁদলে বোধহয় মনটা হালকা হতো।

চলবে…….

“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন


স্বপ্ন হলেও সত্যি পর্বঃ-১৮

0

স্বপ্ন হলেও সত্যি পর্বঃ-১৮
আফসানা মিমি

—“আপু প্লিজ কান্না থামাও। এভাবে ভেঙ্গে পড়ো না। নিজেকে একটু শক্ত করো। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি ভাইয়া তোমার হবেই ইন শা আল্লাহ্।”
আপু কান্না থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো
—“না সানা, কারো উপর জোর করে কোনকিছু চাপিয়ে দেওয়া ঠিক না। দেখা গেলো তোমাদের চাপে পড়ে আমাকে ও বিয়ে করে নিল। কিন্তু ওর ভালবাসা আমি পেলাম না। তাতে লাভ কী হবে? সারাজীবন ভালবাসার অভাববোধ আমাকে কুরে কুরে খাবে। তখন এই সম্পর্কটাও আমার কাছে বোঝা বৈ অন্যকিছু মনে হবে না।”
আপুর হাতদুটো আমার হাতদ্বয়ের মুঠোয় নিয়ে আশ্বস্ত করে বললাম
—“আমার ওপর ভরসা রাখো আপু। যা হবে ভালোর জন্যই হবে।”

আমাদের কথার মাঝখানে বাধা পড়লো মোবাইলের ভাইব্রেশনের আওয়াজে। দেখলাম আমার ফোনে ভাইয়ার কল এসেছে। দুপুরে ভাইয়ার সাথে কথা বলেই আপুদের বাসায় চলে এসেছিলাম। ফোন রিসিভড করার সাথে সাথেই ভাইয়ার কথার আক্রমণ শুরু হয়ে গেল।
—“কিরে আফু, তুই কই? বাসায় নেই কেন তুই? না বলে কই গেছিস তুই, হ্যাঁ?”
আমি গলায় কিছুটা অভিমান ঢেলে বললাম
—“এখন আমাকে শুধুশুধু খুঁজছো কেন? আমি তো বলেছিলামই যে আমার কথা না মানলে আমি আপুদের বাসায় চলে আসবো এবং সেখানেই থাকবো। আমার কথা তুমি যেহেতু শুনোনি তাই আমি চলে এসেছি বাসা থেকে। এবার তুমি খুশি তো?”
—“মাকে বলে গেছিস সেখানে? আর আমার পারমিশন নিয়েছিস সেখানে যে গেছিস?”
—“হ্যাঁ, আম্মুকে বলেই আসছি। আর তোমার পারমিশন নেওয়ার কী আছে এখানে? তুমি যেহেতু তোমার একমাত্র ছোট বোনের কথা মানো না, তাহলে আমি কেন মানবো? আমি তো তোমার পর। আমার কথা মানতে যাবেই বা কেন?”
এবার বোধহয় ভাইয়া একটু নরম হলো। বললো
—“দ্যাখ লক্ষ্মী বোনটি, প্লিজ বাসায় চলে আয়! আমার সাথে রাগ করিস না প্লিজ! শুনেছি ভাইদের দুঃখ নাকি বোনেরা বুঝে। কিন্তু তুই আমাকে কেন বুঝতে পারছিস না?”
—“কিন্তু তুমিও বা গোঁ ধরে এক জায়গায় থেমে আছো কেন? সময়ের সাথে সাথে নাকি মানুষের আচার-আচরণ, চিন্তাভাবনা, মানসিকতা চেঞ্জ হয়। কিন্তু তুমি দেখি সেই কতদিন আগেকার ঘটনাতেই আঁটকে আছো। কেন আগে বাড়তে পারছো না ভাইয়া?” শেষ কথাটা অনেকটা আর্তনাদের মতো করেই বললাম।
—“দ্যাখ তুই তো আমার ছোট। তাছাড়া আমার আপন বোনও। তোর সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে হেজিটেট ফিল করি আমি। বুঝিস না তুই?”
—“দ্যাখো আমি নিজে ছোট হয়ে বড় ভাইয়ের এসব ব্যাপারে নাক গলাতে যে খুব একটা ভালো লাগে আমার, তা কিন্তু নয়। তুমি মেনে নিলেই তো ব্যাপারটা মিটে যায়। আমারও পরবর্তীতে এসব বলার দরকার পড়বে না, আর না তোমাকে এসব শুনতে হবে। আমি শুধু তোমাদের দুইজনের ভিতরের কষ্টটা লাঘব করে তোমাদের মুখে তৃপ্তির হাসি দেখতে চেয়েছি। এটা কী আমার অপরাধ ছিল? ওকে, অপরাধই যদি হয়ে থাকে তবে তা-ই সই। তোমাকে নেক্সট টাইম কোনকিছু নিয়ে জোর করবো না। এমনকি কিছু বলবোও না তোমাকে। আমাকে তো চিনো না তুমি। একবার যা বলি তা করিই আমি।”

ভাইয়া একপেশে হেসে বললো
—“তোকেও চিনি না আমি! আমার চেয়ে বেশি তোকে কে চিনে আর? তুই…..”
ভাইয়াকে আর কিছু বলতে না দিয়ে বললাম
—“ভুল চিনেছো এতদিন আমাকে। এখন থেকে চিনে রাখো আমাকে। রাখি… শান্তিতে থেকো একা বাসায়। আম্মুও তো চলে যাবে বাড়িতে। আর আমি তো আপুর সাথেই থাকবো। তোমার রাজ্যে তুমি একাই রাজত্ব করো গিয়ে। কেউ তাতে ভাগ বসাতে আসবে না। আল্লাহ্ হাফেজ।”

বলেই খট করে ফোনটা রেখে দিলাম। আপু উদাস গলায় বললো
—“এভাবে কথা না বললেও পারতে ওর সাথে। যদি রাগ করে আবার!”
আমি মুচকি হেসে বললাম
—“ভাইয়াকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি। কী বললে, কী করলে যে ভাইয়ার মন নরম হবে সেটা খুব ভালো করেই জানি আমি। এবার শুধু দেখে যাও কী হয়। আরেকটা কথা, আঙ্কেল আন্টিকে বলে দাও এনগেজমেন্টের আয়োজন করতে। আম্মু মনে হয় খুব শীঘ্রই উনাদের সাথে যোগাযোগ করবেন এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য। এবার দেখি ভাইয়া কীভাবে পালিয়ে বেড়ায়!”
আপু চিন্তিত হয়ে বললো
—“যদি হিতে বিপরীত হয় এতে করে?”
আপুকে আশ্বস্ত করে বললাম
—“শুধু একটু ভরসা রাখো এই ছোট আপুটার ওপর। আর কিছু আশা করছি না আমি এই মুহূর্তে তোমার কাছ থেকে। সো নো চিন্তা, ডু ফুর্তি।”

ভাইয়ার জোরাজুরিতে বাসায় আসতে বাধ্য হলাম। এক প্রকার ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে বাসায় এনেছে আমাকে। আমিও মিথ্যে অভিমানে গাল ফুলিয়ে রাখলাম। ভাইয়া আমার কাছে এসে বললো
—“দ্যাখ আফু, আমি কিন্তু মায়ের কথা মেনে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি। ইভেন আগামীকাল নাকি এনগেজমেন্টের ডেইটও ফিক্স করা হয়ে গেছে। সেটাও নীরবে মেনে নিয়েছি আমি। এবার তো আমার সাথে কথা বল!”

আমি তো মনে মনে বেজায় খুশি। তবে সেটা বাইরে প্রকাশ না করে বললাম
—“আমি তো তোমার কেউ না। তাই আমি একটা জিনিস চেয়েছিলাম তোমার কাছে সেটাই দিতে পারলা না আমাকে! ঠিক আছে এতে যদি তুমি খুশি থাকো তাহলে আমিও খুশি।”
—“প্লিজ আমার লক্ষ্মী বোনটি আর মন খারাপ করে থাকিস না। এবার তো একটুখানি হাসি উপহার দে!”
আমি হালকা হেসে বললাম
—“ঠিক আছে।”
আমার মুখে হাসি দেখে ভাইয়াও সামান্য হাসলো। তবে সেটা আমার কাছে মেকি হাসিই মনে হয়েছে। ভাইয়া সেখান থেকে চলে যাওয়ার পর আম্মুর কাছে গিয়ে বললাম

—“আম্মু, আব্বু কখন আসছে?”
—“ট্রেনে উঠে ফোন দিয়েছিল, একটু আগেই নাকি রওয়ানা হয়েছে। দেরি লাগবে না বেশি।”
—“আব্বুকে বুঝিয়ে সব বলেছো তো?”
—“হ্যাঁ, সবই বলেছি।”
—“এতে আপত্তি নেই তো কোন?”
—“আরে না। যখন শুনেছে বন্ধুর মেয়ে, তখন তো খুশিতে একেবারে আটখানা। আপত্তি করার এত আজাইরা সময় কই!” হেসে উত্তর দিল আম্মু।
একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নিয়ে বললাম
—“যাক, ভালোই ভালোই ব্যাপারটা মিটে গেলে তবেই শান্তি। পালিয়ে যাবে কোথায় তোমার ছেলে বেচারা!”
মা-মেয়ে দুজনেই হাসতে লাগলাম সমস্বরে।

ফাল্গুনী আপুদের বাসার সামনে এসে যখন গাড়ি থেকে নামলাম আমরা চারজন তখন ভাইয়ার মুখটা হয়েছিল দেখার মতো। আমি ভিতরে ভিতরে হেসে কুটিকুটি হচ্ছিলাম। আর আব্বু-আম্মু উনাদের মুখ যথেষ্ট গম্ভীর রাখার মিথ্যে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তবে সফলও হচ্ছেন। ভাইয়া হঠাৎই বলে উঠলো
—“বাবা আমরা এখানে কেন এলাম?”
উত্তর দিল আম্মু
—“আজকে তোর বাবার বাল্যকালের বন্ধু আসলাম সাহেবের মেয়ে আরাদ্ধার বাগদান। তাই আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে আমরা এখানে এসেছি। গতকাল রাতেই আমাদের জানিয়েছে আজ নাকি আরাদ্ধার বাগদান হবে। খুব করে বলছিলেন তাই না করতে পারেনি তোর বাবা।”

আম্মুর এমন কথায় ভাইয়ার মুখটা রক্তশূন্য হয়ে গেল। ক্ষণে ক্ষণে তার মুখের রঙ বদলাচ্ছিল। আমি শুধু তা-ই দেখে যাচ্ছিলাম নীরবে। এমন ফ্যাকাসে মুখ করেই বললো
—“কিন্তু তুমি যে গতকাল বললে আজ আমার এনগেজমেন্ট কার সাথে যেন!”
—“হ্যাঁ, সেটা তো হবেই। আমরা ওদের জানিয়ে দিয়েছি যে সেখানে যেতে একটু দেরি হবে। আসলে তোর বাবার বন্ধুর মেয়ের এত বড় একটা দিনে তোর বাবাকে থাকতে বলেছেন। তাই তোর বাবাও উনার কথাটা ফেলতে পারেননি। তাই…..”
ভাইয়া মাঝপথেই বলে উঠলো
—“কিন্তু আমাকে এখানে আনার কী দরকার ছিল? এখান থেকে বেরিয়ে আমাকে ফোন দিলেই আমি সেখানে পৌঁছে যেতাম। শুধুশুধু…..”
এবার আব্বু বললো
—“আসলাম আমার বন্ধু কম ভাই বেশি। আমাকে সপরিবারসহ আমন্ত্রণ করেছে। ওর কথাটা না রাখলে তার কাছে আমি ছোট হয়ে যেতাম না? তাছাড়া তোমার প্রবলেমটা কোথায় শুনি এখানে আসতে?”

আব্বু রেগে গেলে আমাদের দুই ভাইবোনকেই তুমি করে বলে। মনে হচ্ছে এখনো রেগে গেছে। ভাইয়া নিজেও আব্বুর এই স্বভাবের সাথে পরিচিত। তাই তো এত বড় হয়ে যাওয়া স্বত্তেও ভয় পায় সেই বাল্যকালের মতোই। মিনমিন করে বললো
—“না আমি তো শুধু বলছিলাম যে…..”
আব্বু ফের গমগম স্বরে বলে উঠলেন
—“এখানে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট না করে ভিতরে চলো। অযথা কথা বাড়িও না।”

কথাটা বলেই আব্বু আম্মুকে নিয়ে সামনে এগোলেন। বেচারা আমার ভাইটা পড়েছে মহা বিপাকে। না কিছু বলতে পারছে, আর না পারছে এসব সহ্য করতে। বড়ই মায়া হচ্ছে ভাইয়ার জন্য। সত্যিটা বলে দিতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এতো বড় একটা শক খাওয়ার পর ভাইয়ার মুখটা কেমন হবে তা দেখার লোভ আমাকে বারবার বলে দেওয়া থেকে বিরত রাখছে।

আজ এ বাড়িতে ঢুকার পর কেমন একটা শীতল বাতাস আমাকে হঠাৎ করে ছুঁয়ে দিয়ে গেল। এবং সেই মুহূর্তে শ্রাবণের হাসিমাখা মুখ, রেগে যাওয়া মুখটা চোখের তারায় ভেসে উঠলো সম্পূর্ন আমার অনুমতি ব্যতিরেকে। কই সেদিনও তো এ বাড়িতে এসেছিলাম এমনটা তো ফিল করিনি। শ্রাবণকে তো এমন প্রবলভাবে মনে পড়েনি। তবে আজ কেন এমন লাগছে আমার কাছে! অকারণে এভাবে হৃৎপিণ্ড লাফানোর রহস্য কী? এর সাথে কী শ্রাবণের কোন যোগসূত্র আছে? নাকি কারণটা ভিন্নকিছু?

বাড়িতে প্রথম প্রবেশ করেছিল আব্বু আম্মু। তারপর পরই ভাইয়া এবং ভাইয়ার কয়েক হাত পিছনে আমি। প্রবেশ করার মুহূর্তে কয়েক কদম এগোনোর পর আমার পা দুটো সেখানেই যেন মাটির সাথে আঁটকে গেছে আমার মুখোমুখি দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে। যেন মনে হচ্ছে অদৃশ্য কেউ এক প্রকারের অদৃশ্য শিকল দ্বারা আমার পা জোড়াকে বেঁধে ফেলেছে সে জায়গাটায়। তার সাথে সাথে আমার হৃৎপিণ্ডের বাতাস চলাচল কয়েকটা মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়েছিল মনে হয়। এবং তার পর পরই আচমকা আবারও শুরু হয়ে গেছে হাজার মাইলের গতির চেয়েও বেশি দ্রুতবেগে ছুটে চলা ঘূর্ণিঝড়ের মতো হার্টের গতি। বিস্ময়ে বিস্ফোরিত চোখদুটি অজানা কারণেই কেমন কেঁপে উঠলো। আমি প্রবলবেগে তেড়ে আসা ধাক্কাটা সইতে না পেরে সেখানে দাঁড়িয়েই চোখ বন্ধ করে ডান হাত দিয়ে হার্ট লাফানো জায়গাটায় মুঠো করে চেপে ধরলাম। হাত পা কেমন তিরতির করে কাঁপছে আর শরীরটাও কেমন অসাড় লাগছে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে দোয়া করছি ‘ইম্পসিবল! এটা যেন সত্যি না হয়। এই অসম্ভবটা যেন কোনমতেই সম্ভব না হয়। হে আল্লাহ্! তোমার বান্দার এই আকুল আবেদনটা রাখো।’

চলবে……..

“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন


Protected: ময়না আমার নাম।

0

This content is password protected. To view it please enter your password below:

Protected: গল্পের নাম- নিরব ঘাতক

0

This content is password protected. To view it please enter your password below:

Protected: হাজার টাকার নোট

0

This content is password protected. To view it please enter your password below:

বোবা বর শেষ পর্ব

0

বোবা বর শেষ পর্ব

আমি সে-সময় অষ্টম শ্রেণিতে পড়তাম। মা সহ ছোট খালার বাড়ি বেড়াতে গিয়েছি, সব ভাই বোন একসাথে হৈ,চৈ আনন্দে মেতে ছিলাম সবাই।

রোজ বিকেলে খালাতো ভাই আর পাড়ার ছেলেরা মিলে ক্রিকেট খেলা হতো। খেলার এক পর্যায় বল গিয়ে পড়ে পাশের এক বাড়িতে। সবাই মুখ কালো করে আছে, আজ আর সেই বলটা তাদের পাওয়া হবে না বলে। সে বাড়ির মেয়েটা অনেক ঝগড়াটে নাকি, যেই বল আনতে যাবে তার জন্য কানে ধরে ওঠাবসা অবধারিত, খেলার ছোট মাঠটার পাশেই বাড়িটা ছিলো।

আমি নতুন জন্য সবাই জোরজবরদস্তি করে আমাকেই পাঠালো বলটা আনতে। আমি বল আনতে গেলাম, দেখি একটা মেয়ে বলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছে। ভালো করে দেখলাম এমন সুন্দর মেয়ে কি করে এতটা ঝগড়াটে হতে পারে, টানা টানা চোখ, জোড়া ভ্রু যুগল যেন শ্যামা মেয়েটার সৌন্দর্য অনেক গুন বৃদ্ধি করেছে।

মেয়েটা আমাকে নতুন দেখে একটু অপ্রকৃতস্থ হয়ে গেলো, আমি নিজে থেকে বললাম ম্যাডাম বলটা আমার।
মেয়েটি কোনো কথা না বলে বলটা আমার সামনে এগিয়ে দিলো।

বল নিয়ে ফিরে আসছি, কিন্তু মেয়েটাকে আরো একবার ভালো করে দেখতে ইচ্ছে করছে এখন খুব আমার। ঠিক তখনি মেয়েটা আমায় বলওয়ালা বলে ডাক দিলো।
সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়ালাম, বললাম আমাকে বলছেন?

জ্বী, আপনাকেই। এ পাড়ায় আগেতো আপনাকে দেখিনি কে আপনি? আমি নিহানের খালাতো ভাই মুরাদ, আপনি?
মেয়েটা — আমি সামিহা।
আমি আবার জিঙ্গাসা করলাম কোন ক্লাসে পড়েন আপনি?

মেয়েটা — ক্লাস এইটে, আপনি?
আমি — এমা আমিও ক্লাস এইটে পড়ি, তাহলে আমরা তো এখন বন্ধু, বান্ধবী হয়েই গেলাম। সামিহা কিছু না বলে বাড়ির ভিতরে চলে যায়।

বল নিয়ে ফেরার পর সবাই আমার আর সামিহার কথোপকথন শুনে অবাক হয়, তারপর থেকে সবাই সামিহা কে দিয়ে ক্ষ্যাপায় আমাকে।
আমার খারাপ লাগে না, খালার বাড়িতে যতদিন ছিলাম সবসময় সামিহার সেই চোখ, মুখের মায়াভরা দৃশ্য ভাসতো আমার সামনে।

আরো তিনদিন দেখা হয় সামিহার সাথে আমি প্রথম কথা বলি দু’দিন, তিনদিনের দিন সামিহা নিজে থেকেই কথা বলে।
একই ক্লাসে পড়লেও সামিহা আমাকে আপনি আর আমি সামিহাকে তুমি সম্মোধন করি।
মেয়ে মানুষ মনেহয়না সহজে কোনো ছেলে মানুষকে তুমি বলতে পারে।

সামিহাকে আমার ভালো লাগে, সামিহাও কথা বলার সময় আমার দিকে আঁড় পানে তাকায়। সেবার খালার বাড়ি থেকে চলে আসতে, বুকের ভিতর প্রথম এক অজানা কষ্ট অনুভব করি।

এরপরে যতবার ছুটি পেতাম স্কুলে ততবারই ছুটে যেতাম খালার বাসায়। দেখা হলেই টুকটাক কথা হয় সামিহার সাথে, আমি রাতে ঠিক করে রাখতাম কাল দেখা হলে কি বলবো কিন্তু সামিহা সামনে আসলে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় আমার।

এসএসসি পরীক্ষার পর সামিহার আম্মুর মোবাইল নাম্বার নিয়ে আসি, তারপর থেকে মোবাইলে এসএমএস এ কথা বলতাম আর এইচএসসি পরীক্ষার পর অনার্স ফাস্ট ইয়ারে মোবাইল কিনে সামিহা। সামিহার আম্মু আমাকে অনেক পছন্দ করেন, বাসার আশেপাশে দেখলেই বাড়িতে ডেকে নিতেন গল্প করতে।

আমি ঢাকার এক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই আর সামিহা ফেনীর এক কলেজে ভর্তি হয় বাড়ির থেকে কাছে জন্য ।
এভাবে কথা বলতে বলতে কখন যে আমারা দু’জন এক হয়ে যাই ঠিকভাবে বুঝতে পারি না আমি।
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



সারাদিন রাত সামিহার খোঁজ না নিলে নিজেকে অসমাপ্ত লাগতো আমার। আর সামিহাও একবার মোবাইলে চার্জ না থাকার কারনে বন্ধ হয়ে যায় পরেরদিন কল দিলে কান্নায় ভেঙে পড়ে মেয়েটা।

তখনই সিদ্ধান্ত নেই আমরা সারাজীবন একসাথে কাটাবো, কেউ কাউকে ছাড়া একদিনও চলতে পারি না। একদিনের কষ্ট হাজার দিনের মতো হয়ে যায়।
এতোদিনের কথায় কখনো আমাদের ঝগড়া হয়নি, কোনো কারনে কেউ রাগ করলে অন্যজন নিজেকে শান্ত রাখতাম।

বেশ চলছে এভাবে হঠাৎ বাড়ি থেকে সামিহার বিয়ে দেওয়ার জন্য সামিহার বাবা অস্থির হয়ে পড়েন।
সামিহা আমার কাছে অনেক কান্নাকাটি করে কিছু একটা করতে বলে।
আমি তখন আন্টির (সামিহার আম্মু) সাথে কথা বলে বুঝাতে সক্ষম হই।

কিন্তু আমাকে শর্ত দেওয়া হয়েছিলো, নিজের একটা চাকরি জোগাড় করতে হবে যতদ্রুত পারি তবেই সামিহা কে বিয়ে করতে পারবো, তার আগে নয়।
সামিহার বাবা বেকার কোনো ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দেবেনা বলে, তাহলে যে তিনি সমাজের মানুষের কাছে ছোট হয়ে যাবেন।

আমাদের বাড়িতে আব্বা, আম্মা সবাই রাজি ছিলেন
সামিহা সুন্দরী, মেয়ে ভালো জন্য।
অনার্স শেষ করেই একটা বেসরকারি চাকরি তে যোগদান করি। তারপর ঘরোয়া ভাবেই বিয়েটা সম্পন্ন হয় আমাদের।

বিয়ের পর একবছর ঢাকায় থাকি আমরা, জীবনের এতো প্রশান্তি, সুখ আর কখনো পাইনি আমি যতটা সামিহার সাথে থাকা কালিন পেয়েছি। একবছর পর সামিহা প্রেগন্যান্ট হলে, আমার খুশির অন্ত থাকে না। অফিসের কাজের চাপের জন্য সামিহা কে বাড়িতে রেখে আসি, এসময় ওর অনেক যত্নের প্রয়োজন বলে।

সামিহাকে বাড়িতে রেখে আসার পর আমার দিন গুলো অনেক কষ্টে কাটে। সামিহা আমার অবস্থা বুঝে ওই অবস্থায় ঢাকা আসতে চাইলে আমি বারণ করি।

সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে আমাদের এক কন্যা সন্তান পৃথিবীতে আসে। আমার আর সামিহার নামের সাথে অক্ষর মিলিয়ে মেয়ের নাম সামাহ্ রাখি।
আগে মাসে দুই /তিন বার বাড়িতে গেলও সামাহ্ হওয়ার পর প্রতিটা সপ্তাহে বাড়িতে যেতাম।

সন্তানের প্রতি এক বাবার কতটা আত্নার সম্পর্ক, টান তা এই প্রথম বুজতে পারলাম।
মা, মেয়েকে ছেড়ে আসার সময় কষ্টে আমার বুকের ভিতরটা কেঁদে উঠতো কিন্তু চোখ কাঁদত না ছেলে মানুষ বলে কথা। ছেলেদের এতো সহজে কাঁদতে হয়না।

ছয়মাস পর সামিহা, মেয়ে সহ ঢাকায় গেলাম।
গাড়ি থেকে নামার পর আমি কি একটা কাজের জন্য সামিহা আর মেয়েকে রাস্তার একপাশে রেখে অন্যপাশে যাই।

অন্যপাশে দাঁড়িয়ে আছি আমি, সামিহা হঠাৎ সামাহ্ কে কোলে নিয়ে এপাশে আসতে চাইছে আমি হাত দিয়ে বার বার নিষেধ করছি যে আমি আসছি তোমাদের কাছে। কিন্তু সামিহা কি বুঝলো কে জানে আমার চোখের সামনে রাস্তা পার হওয়ার সময় একটা বাস এসে সামিহার উপর দিয়ে চলে যায়। আমি চিৎকার করে দৌড়ে ওদের কাছে আসি, মূহুর্তে সেখানে অনেক লোক জড়ো হয়। সামিহার মাথার মগজটা রাস্তায় লাফাচ্ছিলো আর সামাহ্ কে আমি দেখতে পারি নাই কোথায় হারিয়ে গেছে আমার কলিজাটা , মাথার মগজটা নিয়ে সামিহার রক্তাক্ত মাথার ভিতর রাখছিলাম আর আল্লাহ আল্লাহ বলে চিল্লাতে থাকি।

তারপর আমার আর কিছু মনে নেই, অতিরিক্ত কষ্ট সহ্য করতে না পারায় আমার ব্রেইন স্ট্রোক করে।
বয়স কম থাকায় সেবার বেঁচে যাই কিন্তু কথা বলার শক্তি টুকু হারায় ফেলি আমি। অবশ্য আমি চাই না কথা বলতে যেখানে আমার সামিহা আর সামাহ্ নাই।
গ্রামের বাড়ির সামনে ওদের কবর দেখে কবরের পাশে বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ি আমি।
সেসময় পরিবারের মানুষ, আম্মার কাছে অনেক মানসিক সাপোর্ট পাই।

কোনোদিন রাতে ঘুম ভাঙলে আমার বুকের ভিতরটাই ভেঙে চুরমার হতো কষ্টে, চারিদিকে হাহাকার, শূন্য লাগতো সবকিছু এতটা খারাপ লাগতো ভাষায় বুঝাতে পারবো না, গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট লাগে তখন নিজের ।

সবসময় নিজেকে ঘরবন্দী করে রাখতাম জন্য আব্বা ওনার ব্যবসার দায়িত্ব আমায় দেন, আমি কথা বলতে পারি না জন্য সবকিছু দ্রুত লিখে দিই। অল্পদিনে ব্যবসায় সফল হই, কিন্তু কষ্ট লাগে খুব বাড়ির সামনে কবর দুটো দেখে তাই সপরিবারে শহরের বাড়িতে এসে থাকা শুরু করি।

এই পাঁচ বছরে আল্লাহর রহমতে ব্যবসাটাকে সফলভাবে অনেক দুরে নিয়ে যাই।

আজ অনেক বছর পর নানার বাড়িতে গেলে একটা মেয়ে কে আমার চোখে লাগে, তার নাম আমার অজানা,,,,

এরপর আরো কয়েক পৃষ্ঠা ভর্তি লেখা আমার আচরণের কথাই লিখছেন মনেহয়, আর পড়তে পারলাম না।

আমার চোখের পানি কোনো কথা শুনছে না ডাইরির পাতা ভিজে গেছে, মানুষটার জীবনে এতো কষ্ট আর আমিও কতো অত্যাচার করেছি। ডাইরিটা বন্ধ করে, ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে ওনার আনা নীল রঙের শাড়ী আর চুড়ি পড়লাম। খোঁপা করছি কিন্তু বেলি ফুলের মালা আজ কোথাও নাই, আবার চোখ থেকে পানি পড়ছে।

নিজেকে সামলিয়ে চুল খোলা রেখেই রুম থেকে বের হলাম, ওনার খোঁজে পুরো বাড়ির প্রতিটা রুম তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও নেই।
এখন আমার বুকের ভিতরে ঝড় উঠছে কালবৈশাখী, যতক্ষণ খুঁজে না পাচ্ছি ওনাকে এ ঝড় থামবে না।

ছাঁদের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম, হঠাৎ মনে হওয়ার দৌড়ে ছাঁদে যাই। ছাঁদের একপাশে দাঁড়িয়ে পশ্চিম আকাশের রক্তিম সূর্য দেখছিলেন তিনি।

একদৌড়ে পিছন থেকে জড়ায় ধরি ওনাকে আর কেঁদে ক্ষমা চাই আমার এতোদিনের আচরণের জন্য, তখন উনি আমার ঠোঁটে ওনার একটা আঙ্গুল রেখে চুপ করতে বলে আমায় সেই সাথে চোখের পানি মুছে দেয়।
এপাশ ফিরে উনিও জড়িয়ে ধরে আমায় মাথায় হাত বুলায়, খোলা চুল দেখে নিজেই খোঁপা বেঁধে তাঁর বাগানের কয়েকটা ফুল ছিঁড়ে গুঁজে দেয় খোঁপায় সেই সাথে আমার কপালে তার দুই ঠোঁটের আলতো ভালোবাসার ছোঁয়া দেয়।

আমি আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরি তাকে, আর বলি সারাজীবন এভাবে জড়িয়ে থাকবো আপনাকে যেনো আমাদের কলিজা দু’টো মিশে এক হয়ে থাকে।

(সমাপ্ত)

লেখা : মরিয়ম খাতুন হাওয়া।

(ভুল ক্রটি মার্জনীয়)

বোবা বর দ্বিতীয় পর্ব

0

বোবা বর দ্বিতীয় পর্ব

শ্বশুর সাহেব হাসপাতাল থেকে ফিরেছেন আজ। বাড়িতে অনেক আত্নীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশীর সমাগম । সবমিলিয়ে ভালোই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি আমি।

এ বাড়ির সবাই অনেক ভালো, সবার সাথে অল্প সময়ে বেশ ভাব হয়েছে আমার। শুধু ওই লোকটাকেই এখন পর্যন্ত সহ্য করতে পারছি না যদিও এ কয়দিন হাসপাতালে বেশির ভাগ সময় বাবার সাথে ছিলো।

এবার বাড়িতে গেলে আর আসবো না আমি, তাতে যা হবার হবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।

এখন শুধু অপেক্ষা কখন বাড়িতে যেতে পারবো, কিন্তু হঠাৎ শ্বশুরের অসুস্থতার জন্য সব এলোমেলো হয়ে গেছে। কবে যে আর বাড়িতে যেতে পারবো আমি ।

এইকয়দিন আমি পিউ আর আশা আপু একসঙ্গে ছিলাম। ছোট ভাইয়া, মা আর লোকটা হাসপাতালে ছিলো। ছোট দেবর বাড়িতেই ছিলো।

আজ রাতে লোকটা আমার পাশে শোয়াতে আমি উঠে ফ্লোরে বিছানা করে শুয়ে পড়লাম। ওনার বাড়ি ওনার ঘর উনি থাকুক খাটের উপর, তাছাড়া এইকয়দিন হাসপাতালে ঠিকমতো ঘুম হয়নি লোকটার শ্বাশুড়ি মা বলছিলেন।

সকালে উঠে দেখি লোকটাও রুমের অন্য পাশে ফ্লোরে ঘুমাচ্ছে, কি নিষ্পাপ লাগছে ঘুমন্ত মুখটা লোকটার মনে হয় সারাজীবন চেয়ে থাকি।

ছি, আমি কেনো এই লোকটাকে দেখছি ওনার জন্য আমি আমার রবিকে হারালাম, ওনার জন্যই রবি আমার সাথে কথা বলে না এখন। আর সেই আমি কিনা,

ঘৃণা করি আমি লোকটাকে অনেক ঘৃণা করি। এরপর ফ্রেশ হয়ে নিচে রান্নাঘরে যাই আপুকে সাহায্য করার জন্য।

সকালের নাস্তা করে, যে যার অফিসে চলে যায়। একি লোকটাও কোট, টাই পড়ে হাতে ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন। শ্বাশুড়ি মা বলেন — বাবা আজ অফিসে না গেলে হয়না, বউমা তো নতুন মানুষ তাকে তোর সময় দেওয়া উচিত।
লোকটা মা কে কি যেনো বলে বেড়িয়ে গেলেন, যাওয়ার সময় মা তাড়াতাড়ি বাড়িতে ফিরতে বলেন।
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



বোবা একটা লোকেরো অফিস আছে, আমি ভাবছি।সারাদিন সবার সাথে স্বাভাবিক ভাবে থাকলেও একটা কথাই ভাবি কিভাবে লোকটাকে হেনস্তা করা যাবে।
আপু সহ দুপুরের খাবার রান্না করি, আর মা সবসময় বাবার পাশেই থাকেন।

লোকটাও দুপুরের খাবার খেতে আসে, খাওয়া শেষে রুমে যায় বিশ্রাম করার জন্য। আশা আপু আমাকেও জোর করে রুমে পাঠায়, রুমে যাওয়ার পর আয়নার পাশে কিছু বেলি ফুল দেখতে পাই।

বেলি ফুলতো আমার পছন্দের অনেক, ফুল দেখে আনন্দিত হয়ে হাতে নিলাম, তখন লোকটা ইশারায় ফুলটা মাথার খোঁপাতে গেঁথে নিতে বললেন।
আমি খানিকক্ষণ চুপ থেকে ফুলটা হাত দিয়ে ছিড়ে কুটি কুটি করলাম লোকটার সামনেই।

খোঁপায় বাঁধবো না আমি ওই লোকটার আনা বেলি ফুলের মালা। আজ কেন, আমি আর জীবনে কখনো খোঁপায় বেলীফুলের মালা বাঁধবো না।

লোকটা তবুও আমার দিকে চেয়ে আছে, সত্যি লজ্জা বলতে কিচ্ছু নাই লোকটার। ফুলের মালাটা সামনেই ছিড়ে এতো অপমান করলাম, তারপরেও যদি একটু ওনার আত্মসম্মানে লাগতো।

সহ্য করতে পারছি না লোকটার তাকানোটা,
রুম থেকে বের হয়ে ছাঁদে গেলাম। ছাঁদে লাগানো বাগানে অনেক রঙ্গের ফুল ফুটে আছে, ফুল গুলো দেখে আমার সেই ফুলের গাছ হতে ইচ্ছে করছে।

আমি যদি ফুলের গাছ হতাম তাহলেই আর এই লোকটাকে বিয়ে করতে হতো না। ছাঁদে অতিরিক্ত রোদ থাকা স্বত্বেও চেয়ারে পা তুলে আয়েশ করে বসে কোন ফুলের কি রং, কার আকৃতি কেমন তা মনোযোগ দিয়ে দেখছি। মাঝে মধ্যে কোথা হতে যেনো ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক ভেসে আসছিল, রোদের তাপ ও কমে যাচ্ছে
সবমিলিয়ে মনোরম একটা পরিবেশ ভালোই লাগছে আমার।

আজ আর ছাঁদ থেকে রুমে যাবো না আমি, ফুল গুলোর সাথেই সময় কাটাবো আর ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করবো ভাবছি । বিকেল হয়ে গেছে, আছরের আযান শুনা যাচ্ছে পাশের মসজিদ থেকে।

কিছুক্ষণ পর লোকটা সেখানে উপস্থিত হয়ে ক্যাবলার মতো একটা হাসি দিয়ে ঈশারায় বোঝালেন এই ফুলের বাগানটা তার নিজের হাতে গড়া।

আমি বুঝেও না বুঝার ভান করে আছি।
আমার মুখটা অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে লোকটার জন্য ভালোই ছিলাম এতোক্ষণ, লোকটা এসে আমার মুডটাই নষ্ট করে দিলো।

লোকটা পানি দিচ্ছেন ফুলের গাছগুলোতে অনেক খুশি মনে, আমি ওনার জন্য ছাঁদ থেকে নেমে আসলাম।

শ্বাশুড়ি মা — আশা, তোমার ভাবি কে চা করে দাও ছাঁদে তোমার ভাইয়ার জন্য নিয়ে যাবে । বিকেলের চা’ তো তোমার ভাইয়া ছাঁদে বসেই খায়।

আমি — আপু আমি চা করে নিয়ে যাচ্ছি ওনার জন্য, আপনাকে আর কষ্ট করতে হবে না। সরাটাদিন কতো পরিশ্রম করেন আপনি।

আশা আপু — ঠিক আছে কিন্তু ভাইয়া একবারে ঠান্ডা চা খান আর চায়ে চিনি বেশি লাগে।

আমি — ঠিক আছে আমি করে নিবো আপু, বলে চা অনেক গরম করলাম আর চিনির বদলে একটু ডিটারজেন্ট পাউডার এর গুড়া মিক্স করছি।

ছাঁদে চা নিয়ে গেলাম লোকটার জন্য, লোকটা চেয়ারে বসে আছে। আমি পাশে গিয়ে হাসি মুখে চা ওনার সামনে এগিয়ে দিলাম।

লোকটাও খুশি মনে চায়ের কাপে এ মুখ লাগালো আর সাথে সাথে আআআআআ করে হালকা চিৎকার করলো, অসাবধানতার কারনে সব চা ওনার পায়ে পড়াতে পানির বালতিতে পা চুবালেন।

আমি এবার আশেপাশে কেউ নেই জন্য মুচকি হাসতে লাগলাম। লোকটা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে এমন কাজ ইচ্ছে করেই করেছি আমি, মাথা নিচু করে বিষন্ন মনে বসে থাকেন।

আমি চায়ের কাপটা তুলে সেখান থেকে চলে আসলাম। জিহ্বা পুড়ে যাওয়ার জন্য সেদিন রাতে লোকটা আর কিছু খেতে পারলো না, না খেয়েই শুয়ে পড়লো।
আজো লোকটা বেলি ফুলের মালা এনে রাখছেন আয়নার পাশে। আজ না ছিড়ে এমনিতেই লোকটার সামনে ডাস্টবিনে ফেলে দিলাম।

রাতে আবার অনেক চকলেট, চিপ্সের প্যাকেট এনে আমার বালিশের পাশে রাখছে।
খেতে ইচ্ছে করলেও খেলাম না।

ফ্লোরে শুয়ে ঘুমায় পড়লাম, একটা স্বপ্ন দেখে হঠাৎ মাঝ রাতে ঘুম ভেঙে গেলো আমার তখন দেখলাম লোকটা চার্জার লাইটের আলোয় কি যেনো লিখছে আর কাঁদছে। লোকটাকে দেখে আমার মনে একটু মায়া হয়, আবার ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকালে উঠে পিউ রুমে আসলে, লোকটার সামনে সব চকলেট আর চিপ্সের প্যাকেট বের করে পিউ কে দিলাম। পিউ খুশি হয়ে, প্রথমে লোকটার গালে তারপর আমার গালে আদর দিলো।
পিউ এর কান্ড দেখে লোকটা মুচকি হাসছে, আর আমার নিজের গালটাই ছিলে ফেলতে মন চাচ্ছিলো।

পিউ কে কোলে তুলে বাইরে বেড়িয়ে আসলাম।
আজ কলেজে আমার অনার্স প্রথম বর্ষ পরীক্ষার ফর্ম পূরণ করতে যাবো আমি, শ্বাশুড়ি মা লোকটার সঙ্গে আমায় কলেজে পাঠালেন, যা আমি একদম চাই নি।

কলেজের কাজ শেষ করে, একটা পার্কের সামনে গাড়ি থামলো লোকটা।
কিন্তু আমি গাড়ি থেকে নামলাম না। লোকটা তখন আমার দিকে তাকাচ্ছিলো, বললাম বাড়িতে যাবো আমি । আবার সেখান থেকে ফিরে বাড়িতে আসলাম।

এক সপ্তাহ কেটে গেছে এভাবে লোকটা প্রতি দিন বেলি ফুলের মালা নিয়ে আসে আর আমি ফেলে দিই। আজ আয়নার পাশে বেলি ফুলের মালা না দেখে মনটা কেমন করে উঠলো। পিছন ফিরে দেখলাম লোকটা হাত দিয়ে আমার খোঁপায় ফুল গুঁজে দিচ্ছে। এক ঝটকায় হাত সরায় দিলাম, লোকটা কষ্ট পেলেও কিছু বললো না।

এতোকিছুর পরেও রাতে একটা নীল রঙের শাড়ী আর চুড়ি এনে আমার হাতে দিলো, সাথে সাথে আমি শাড়ি, চুড়ি লোকটার হাতে দিয়ে বললাম লাগবে না আমার এসব। লোকটা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েই রইলো আবার আমার দিকে।

বাবা এখন পুরোপুরি সুস্থ, কিন্তু আরো কিছু দিন বিশ্রাম নিতে হবে। তাই লোকটার উপর কাজের চাপ বেশি শুনলাম।
বড় ননদ এর কাছে বাড়ির সবাই আজ সকালে বেড়াতে গেছে হয়তো দুই এক দিন থাকবে সেখানে।
লোকটার অফিসের জন্য যেতে পারেনি সেই সাথে আমিও বাড়িতেই আছি।

ছোট মেয়েটা সহ রান্নার কাজ শেষ করে দুপুরে খেয়ে নিলাম, আর মেয়েটাকে ঘুমাতে বললাম।

আধাঘন্টা পরে লোকটা বাড়িতে আসে, ফ্রেশ হয়ে খাবারের টেবিলে গিয়ে বসে খাওয়ার জন্য প্লেট কাছে নিলো। কিন্তু সব খাবারের বাটি ফাঁকা ছিলো, তারপর রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায় লোকটা আমি দুর থেকে দেখছি এসব।
রান্নাঘরেও কোনো খাবার না পেয়ে তিন গ্লাস পানি দ্রুত পান করে চেয়ারে বসে রইলো সেখানে লোকটা। সব খাবার আমি আগেই ডাস্টবিনে ফেলে দিয়েছিলাম যাতে লোকটা খেতে না পারে।

রুমে আসলাম, লোকটার ফ্লোরে ঘুমানোর বিছানা, বালিশ অগোছালো হয়ে আছে। সেগুলো গুছানোর সময় একটা ডাইরি পাই।
কারো ব্যক্তিগত ডাইরি পড়ার কোনো ইচ্ছে আমার ছিলো না কখনো, কিন্তু আজ লোকটার লেখা ডাইরি পড়ার আগ্রহ যেনো আমায় গ্রাস করে বসলো।

ডাইরির প্রথম পাতা খুললাম,
আমি মুরাদ আহমেদ।
জন্মসাল : ১৯৮৪
লোকটার নাম তাহলে মুরাদ,,,,,,,( চলবে)

(ভুল ক্রটি মার্জনীয়)

লেখা :মরিয়ম খাতুন হাওয়া।

প্রথম পর্বের লিংক: