0
2517

টক_মিষ্টি_ঝাল পর্ব_2

ওর চুমু দেওয়া, ওর বউ বলা, ওর জড়িয়ে ধরা সবকিছুতেই যেন লুকিয়ে আছে অনেক ভালবাসা। এই ছ্যাঁচড়া লোকটার সাথে ঝগড়া করলেও , খুব ভালবেসে ফেলেছি।

আদনান আমাকে বললো, ” জানো, মেয়ে মানুষের প্রতি কেন যেন রাগ কাজ করে খুব। ওরা মানুষের মন নিয়ে খেলা করে, ছেলেদের সাথে প্রতারণা করে। আর সুন্দরী মেয়েরা এসব দিকে আরো এক ধাপ‌ এগিয়ে। আর তাই‌ আমি বিয়ে করতে চাইনি। প্রতিটা মেয়েরই কোনো না কোনো দোষ খুঁজে বের করতামই। মা আমার উপর বিরক্ত হয়ে গত এক মাস ধরে মেয়ে দেখা বন্ধ করে দিছে। আমিও যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। আনিলা সেদিন তোমাকে দেখতে যাওয়ার কথা বলতেই, মা না করে দেয়। পরে আপু অনেক বুঝিয়ে মাকে নেয়। মা বলে‌ দিয়েছিল, এবারই শেষ। আর না। আমিতো তোমাকে দেখার‌ পর সমস্যা খুঁজছিলাম। কিন্ত তুমি যখন বলো যে ,আমাকে‌ পছন্দ হয়নি। তখন খুব জেদ কাজ করে। তাই জোর করে তখনই তোমাকে‌ বিয়ে করে নেই। আচ্ছা ,সত্যি বলো তো। আমাকে কি তোমার সত্যিই পছন্দ হয়নি।
–: আপনার মতো ছ্যাঁচড়া লোককে পছন্দ করবো আমি?
–: তুমিও কম ছ্যাঁচড়া না। তোমার মতো মেয়েকে বিয়েতে জোর করে রাজি করানো সম্ভব না। কিছু তো একটা হয়েছে।
–: কিছুই হয়নি। ঘুমাবো এখন।
–: ঘুমাও, তবে আমি তোমাকে সম্পূর্ণভাবে স্ত্রীর অধিকার দিতে পারব না। যদি মনে হয়, তুমি অন্য সব প্রতারক,ঠকবাজ মেয়েদের থেকে আলাদা, তাহলে তোমাকে আমি মেনে‌ নিব। জানি এটা অন্যায়। তবুও মেনে নিতে হবে তোমাকে।

ইস!! কি কপাল আমার। ও কতো কাছাকাছি শুয়ে আছে আমার। কিন্তু আসলে তো অনেক দূরত্ব আমাদের মাঝে। মনের দূরত্বই আসল দূরত্ব। কিছু কিছু মেয়েদের নাকি সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয় বিয়ের রাতে। আর আমি পড়লাম এ কোন পরীক্ষায়। আল্লাহ আমাকে সাহায্য করো।

যখন কোনো বিষয় নিয়ে খুব ভাবি, তখন আমার ঘুম হয় না ভালো। আজও সেরকম হলো। ভোর রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে তাহাজ্জুদের সালাত আদায় করে স্রষ্টার দরবারে হাত উঠালাম,
হে আল্লাহ, আমাকে সকল বিপদে ধৈর্য্য ধরার শক্তি দাও। আদনানের ধারনা যেন আমি পরিবর্তন করতে পারি। ওর সাথে যেন আমি সারা জীবন কাটাতে পারি।
ফজরের নামাজ আদায় করে,আদনানকে ডাকতেছি। উফ! কি লোক! এতো ডাকছি কোনো সাড়া নেই। অথচ নামাজের সময় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই , কিছু পানি এনে মুখে ছিটালাম।
আর তখনি চেঁচিয়ে উঠল আদনান, “এই মেয়ে ,তোমার কি কোনো বুদ্ধি নেই। সকালের এতো সুন্দর ঘুমটা নষ্ট করলা। কাল কতোটা জার্নি করেছি। আজ একটু শান্তিতে ঘুমাবো। তাও দিচ্ছ না।
–: ওহ! বিয়েতো শুধু আপনার হইছে। আর জার্নিও শুধু আপনিই করছেন । শুনুন এতো ভারী শাড়ি পরে জার্নি করা আমার জন্য আরো কষ্টকর ছিল। আমি উঠতে পারলে আপনি কেন পারবেন না। আর নির্বোধ আমি নই। নির্বোধ তো সে লোক, যে স্রষ্টার এতো নিয়ামত ভোগ করেও স্রষ্টার ইবাদাত করতে আলসেমি করে।
আদনান আর কিছু বললো না। নামাজ পড়তে চলে গেল।

বারান্দায় দাড়িয়ে আছি। মাথা ব্যাথা করছে খুব । এক কাপ‌ চা হলে ভালো হতো। কিন্ত কাকে বলবো এই সকালে।
একটু পরেই আদনান দুই কাপ চা নিয়ে আসলো বারান্দায়। লোকটাকে মনে মনে ধন্যবাদ দিলাম। আদনান আমার কাছে এসে দাড়াল। এক কাপ চা আমার হাতে দিয়ে বললো,
–: আমি সকালে জেগেই ছিলাম। ইচ্ছা করেই উঠিনি। তবে তোমার কথাগুলো খুব ভালো লেগেছে। সত্যিই আমরা মানুষ জাতি অনেকটা নির্বোধ আর স্বার্থপর। অফিসের কর্মচারীরা যখন কাজে একটু এলোমেলো‌ করে,তখনই মালিক‌ কত কথা শোনায়। খারাপ ব্যাবহার করে। বাসার মালিক চাকরদের সাথে‌ খারাপ ব্যবহার করে, কাজ করতে দেরী হলেই। আর আমরা কত অন্যায় করি। স্রষ্টা তো‌ কিছুই বলেনা। আর কিছু না করলেও, আমাদের স্রষ্টার ইবাদাত ঠিক মতো করা উচিত।
–: আসলেই আপনার চিন্তা- ভাবনা খুব সুন্দর। যাই‌ হোক এখন একটু শাশুড়ি মায়ের কাছে যাই।

আনিলা আমাকে দেখেই বলে, ” ও মা! নতুন বউ এত সকালে। আমো তো ভাবছি সারা রাত রোমান্স করবি, আর আজ সারাদিন ঘুমাবি। তা রোমান্স কেমন হলো?
–: এই মেয়ে আমি তোর বিয়াইন লাগি যে এসব জিজ্ঞাসা করছিস।‌ আমি তোর ভাইয়ের বউ। তা শাশুড়ি‌ মা কোথায়?
তখনই‌ শাশুড়ি মা আসলো। আনিলা বললো,
–: দেখো মা, কতো‌ সকালে উঠছে তোমার বউ মা। আমি হলে তো দুই‌ দিন শুধু ঘুমাতাম।
–: তোর মতো হবে কেন ও। ও অনেক ভোরেই উঠছে। আদনান এসে চা করে নিছে।
–: তাই নাকি। তোমার ছেলে দেখি‌ বউয়ের প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে।
–: তো তুই এতো সকালে উঠলি কীভাবে।
–: মা,‌আজ ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম আছে।
–: ওহ! কথা বল তোরা।
বলেই শাশুড়ি মা চলে গেলেন।

কিরে‌ ‌ আনিলা কীসের প্রোগ্রাম আজ? প্রোগ্রাম না অন্যকিছু।
–: উফ,জুইঁ আস্তে বল। মারুফ বললো গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে। তাই ওর সাথে বের হব।
–: ফোনে বললেই তো হয়। দেখা করা লাগে?
–: তুই এসব বুঝবিনা।
–: ওক্কে, বুঝা লাগবে না। বেশি দেরী করিস না। থাক রুমে গেলাম।
–: হুম যাও। ভাইয়ের কাছে মন পড়ে আছে , সেটা বললেই‌ হয়।
–: হ্যা , তুমি তো আবার অনেক বুঝো।

রুমে এসে দেখি, আদনান নেই। একা একা ভালো লাগছে না। ও যে কেন এমন করে। তবে যাই করুক না কেন, ও সব মিলিয়ে অনেক ভালো। আমি তো ওকে যতবার দেখি , ততোবারই প্রেমে পড়ি। ওর সবদিকটাই ভালো লাগে আমার। কেন এমন করে ও। ওর কি আগে কারো সাথে রিলেশন ছিল। হতে পারে সে মেয়েই ওকে ঠকাইছে। তাই ও কোনো মেয়েকে মানতে‌ পারছে না।

বুক শেল্ফে বই খুঁজছিলাম। হঠাৎ একটা ডায়েরীর উপর চোখ পড়ল।ডায়েরীটা দেখে মনে হলো, ডায়েরীতেই হয়তো লুকিয়ে আছে অনেক রহস্য। ডায়েরী পড়া শুরু করলাম। কিছু কবিতা লিখা আছে শুধু । ভালোই লিখতে পারে ও। কিন্ত তেমন কিছুই খুজেঁ পেলাম না।
হতাশ হয়ে বসে পড়লাম।

বিকালে আদনান ঘুমাচ্ছে। আমার ভালো লাগছে না। তাই বাড়ির পিছন দিকে ঘুরতে আসলাম। এসে তো আমি অবাক। একসাথে দুইটা হিজল ফুল গাছ। গাছের নিচে বিছিয়ে আছে অসংখ্য লাল লাল হিজল ফুল। মুহূর্তেই মনটা ভালো হয়ে গেল। একটা গাছ একটু বাকা টাইপের, আর নিচু। সহজেই গাছটায় উঠতে‌ পারলাম। দুইটা গাছের একটায় ফুল আছে , অন্যটায় নেই। ধরে নিলাম একটা ছেলে গাছ। আর অন্যটা মেয়ে গাছ। দুইটা গাছই একে অন্যের দিকে ঝুকেঁ আছে। মনে হচ্ছে দুইটা গাছই প্রেমে মত্ত।
মেয়ে গাছটাকে বললাম, দেখ তোর ভাগ্য কতো ভালো। তোকে‌ দেখতে ঠিক নতুন বউয়ের মতো লাগছে। আর দেখ ছেলে‌ গাছটা তোর দিকে ঝুঁকে আছে ।যেন তোকে ছাড়তেই চাচ্ছে না। নিচে অসংখ্য ফুল ছিটানো। যেন তোদের ফুলশয্যা। তোকে দেখেতো আমার হিংসে হচ্ছে খুব।
আর আমার জামাইটা কেমন। কাল রাতটা ঝগড়া করেই কাটলো। একটুও ভালবাসেনা আমাকে।

কে বলছে ভালবাসেনা।”
শব্দটা শুনে চমকে উঠলাম। গাছ আবার কথা বলে নাকি!! পেছনে ফিরে দেখি‌ আদনান।
ও আমার কাছে এসে বললো,
” আমার নামে অভিযোগ দেওয়া হচ্ছে ?
–: আপনি‌ না ঘুমাচ্ছেন।
–: বউ একা একা বিরহের সংলাপ‌ বলছে। আমি‌ ঘুমাই কি করে। তো গাছে উঠছো কেন? যদি‌ ভূতে ধরে।
–: পেত্নীকে তো ভূতেই ধরবে।
–: পেত্নী হও, আর শাকচুন্নি হও গাছ থেকে নামো।
নিচে নামার পর‌ অনেকগুলো হিজল ফুল আমার পুরো ‌শরীরে ছিটিয়ে দিল। আমি অবাক‌ হয়ে ওর দিকে‌ তাকিয়ে আছি।
–: কি করছেন আপনি?
–: বউকে সাজাচ্ছি। তোমাকেও হিজল গাছটার মতো সাজালাম। এখন তোমার জামাই ও তোমার পাশে। এখনো কি মনে কষ্ট আছে?
কেন যেন নিজেকে সামলাতে পারলাম না। ওকে জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মাথা রাখলাম। ইচ্ছে করছে অনন্তকাল এভাবেই দাড়িয়ে থাকি। সকালে ,ও নিজে আমার জন্য চা করলো, এখন আবার ফুল ছড়িয়ে আমার মন ভালো করার চেষ্টা করছে। আমার‌ কাছে যদি জীবনের সবচেয়ে ভালো দিনগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়, আমি এই দিনটির কথা বলবো।

আদনান কানের কাছে মুখ এনে বললো,
এই ছাড়ো। আনিলা আসছে। প্রেম- ভালবাসা রুমে গিয়ে কইরো।
আনিলা আমাদের কাছে এসে বললো,
ও মা, জুইঁ ফুল দেখি‌ হিজল ফুল হয়ে গেছে।
আদনান বললো,
তোর ভাবীর নাকি হিজল গাছকে দেখে হিংসে হচ্ছিল। তাই ওকে‌ সাজিয়ে দিলাম।
” হুম , তোমাদের‌ প্রেম দেখে হিজল গাছ লজ্জ্বায় নুয়ে পড়ছে। খেয়াল রেখ, মানুষ যেন না দেখে। বলেই আনিলা চলে‌ গেল।
আনিলা চলে যেতেই, আদনান বললো,
” চলো, আমারাও যাই
–: আর‌ একটু থাকি না।
–: ওকে, বউয়ের ইচ্ছা।

হিজল গাছের নিচে গিয়ে দুজনে বসলাম। আমি ওর কাঁধে মাথা দিয়ে বসলাম। অনুভূতিটাই অন্যরকম। নিচে ফুল, উপরে ফুল, পুরো শরীরে ফুলের ছড়াছড়ি। শীতল বাতাস । এরকম অনুভূতিগুলোই হয়তো কবিরা‌ তাদের কবিতায় উপস্থাপন করে।
আদনান বললো,
–: তোমাকে নিয়ে দুই লাইন গান গাইতে ইচ্ছা হচ্ছে।
–: বলেন।
–: ” জুঁই ফুল, জুঁই ফুল, সুভাস দিয়া ব্যাকুল কেন করিলি।
জুঁই ফুলের ঘ্রাণে, বুইড়া লোকের মনেতেও জাগে লো, বুইড়া লোকের মনেতেও প্রেম জাগে…

চলবে

Saifa adnan

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here