স্বপ্নীল ৫১

0
1165

স্বপ্নীল
৫১
তামিম অফিসে এসে দেখে সমুদ্র এখন আসেনি।ফোন দেয়।রিং হচ্ছে কিন্তু ধরছে না ।তাই আর ফোন দেয়নি।বিকালে বাসায় এসে সমুদ্র রুমে যায়।দরজা বাইরে থেকে আটকানো ছিল।দরজা লকে মোচঁর দিতে খুলে যায়।রুমে ঢুকে তামিমের চোখ কপালে উঠে যায়।এই হাল কে করেছে সমুদ্র’র।তামিম কে দেখে চোখে ইশারা দেয় তার বাঁধন যেন গুলো দেয়।সকালে রোদ এসে মুখ বেঁধে দিয়ে যায়। যাতে সমুদ্র চিৎকার না করে হেল্প না চাইতে পারে।তামিম বাঁধন খুলে দেয়।বসে পড়ে সমুদ্র! জোরে জোরে নিশ্বাস নিচ্ছে। দম যেন এতক্ষণ আটকে ছিল।তামিম বলল,
-” তোর এই হাল কে করেছে! ”
সমুদ্র সেই উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে,
-” শালা বিয়ে করতে মাইনষের কে বলে?”
তামিম মুচকি হাসে।সে বুঝে গেছে সমুদ্র এই বেহাল করার পিছনে রোদ আছে।
-” কেন বউ কি পীড়া দেয় নাকি বেশি।”
-” না।আমার বউ আমায় খুব ভালোবাসে।দেখলি না ভালোবাসার নমুনা।”
এটা বলে ওয়াশরুমে যায়।সন্ধ্যায় তামিম চলে যায়।সমুদ্র আজ ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে আয়োজন করেছে ছাদে।রোদ আসবে না, কিছুতে আসবে না।তাই বাধ্য হয়ে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয় সমুদ্র।।ছাদের মাঝখানে ফুলের পাপঁড়ি উপরে দাঁড়ার করার।রোদের চোখ জুড়ে যাচ্ছে।এত সুন্দর করে সমুদ্র তার জন্য আয়োজন করেছে।ভাবতেই তার খুশি লাগছে।পুরো ছাঁদের ক্যান্ডেল,প্রদীপের ভরপুর ।ছাদের মেজেতে গোলাপি পাঁপড়ি। চোখ যায় দোলনায়।ফুলে ফুলে সাজিয়ে রেখেছে।ছুটে যেতে ইচ্ছা করছে কিন্তু যাবে না।সমুদ্র প্ল্যান জল ঢেলে দিবে সে।এটাই মনে মনে ভেবে রেখেছে
সমুদ্র রোদের কানে কাছে ফিসফিস করে বলে,
-” কেমন হয়েছে।”
কানের কাছে সমুদ্র উষ্ণ নিশ্বাস রোদের ভিতরে সত্তাকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।চোখ তুলে তাকায় সমুদ্র দিকে।এমন নরম নরম কথায় গললে হবে না। সেই কাজ করতে এসেছি সে কাজ কর আগে রোদ।বার বার এই কথাটাই রোদ নিজেকে নিজে বুঝ দিচ্ছে।সমুদ্র দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ছাদের উপরে টেবিলে রাখা ডিনারে কাছে যায়।একবার টেবিলের দিকে তাকায়।আরেকবার সমুদ্র দিকে।সমুদ্রকে আজ বেশ খুশি খুশি লাগছে।টেবিলে কার্নিশে হাত দিয়ে উল্টিয়ে ফেলে দেয়।সমুদ্র হাসিমাখা মুখকানা অমাবস্যায় নেমে আসে।রোদ সমুদ্র কাছে এসে বলল,
-” পিরিতি দেখানো হচ্ছে।আমি কি বলছি এসব পিরিতের আয়োজন করতে।”
এটা বলে ছাদের ক্যান্ডল, প্রদীপ গুলো ছুড়ে মারে।সমুদ্র কপাল রগগুলো ফুলে যায়।হাতে পাঁচ আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করে।রোদ সমুদ্র দিকে তাকায় তার রিয়েকশন দেখার জন্য।রোদ দেখতে পাচ্ছে সমুদ্র রেগে গেছে।কিন্তু এখন রাগ দেখাচ্ছে না কেন? এতক্ষনের রেগে বোম হয়ে যাওয়ার কথা।কিছু না বলে সমুদ্র রোদের ভাবনায় জল ঢেলে দিয়ে গটগট করে হেঁটে নিচে চলে যায়।রোদ হা হয়ে গেছে। সে তো ভেবেছে এখন ঘূর্ণিঝড় উঠবে।কিন্তু আজ যে ঘূর্ণিঝড় বেশ শীতল হয়ে গেলো।

আয়োজন করা যায়গাটা দেখে রোদ।কিছুক্ষণ আগে কি সুন্দর ছিল? আর এখন…!মন খারাপ লাগছে। সে চায় নি এত সুন্দর আয়োজন এভাবে লণ্ডভণ্ড হোক। সমুদ্রকে শায়েস্তা করা জন্য এমন করল।

সমুদ্র বেলকনিতে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। প্যান্টের পকেট থেকে একটা ডায়মন্ড রিং বের করে।সন্ধ্যায় তামিম ছেড়ে এসেছে। তখনই আসার সময় কিনে এনেছে রোদের জন্য।ভেবেছে হাতে রিং পড়িয়েছে।এতদিনের অপ্রকাশিত ভালোবাসা প্রকাশ করবে।
রুমে থেকে বার বার উঁকি দিয়ে সমুদ্রকে দেখছে।বার বার রোদের মন বলছে, ‘ রোদ তুই ঠিক কাজ করিস নি।যা গিয়ে ক্ষমা চায়।” আর মস্তিষ্ক বলছে অন্যকথা।অবশেষে মস্তিষ্ক জিতে গেছে।সে যায় নি সমুদ্র কাছে।

তামিম বাড়িতে এসে সবার সাথে কথা বলে।সবাই একে একে দেখেছে এক মাত্র সোহাকে ছাড়া।মাঝরাতে সোহার রুমে উঁকি দেয়।আমেনা খালাকে ছাড়া আর কাউকে দেখতে পায় না।এই রাতের বেলা কই গেছে সোহা।পরক্ষনে মনে পড়ে যায়।সোহা বোধহয় নীলের রুমে।নীলের রুমে নক করে।নীল দরজা খুলে তামিম দেখে হামলে পড়ে কান্না করতে থাকে।তামিম হতচকিত হয়।বুঝতে পাচ্ছে না নীলের এই কান্নার কারণ কী? বাড়ি সবাই তো ভালোই আছে।তামিম নীলের মাথা হাত বুলায়।চোখে তুলে তাকায় নীল।চোখ দুটো তার লাল হয়ে আছে।তামিম বলল,
-” কান্না করছিস কেন? ভাইয়াকে বল কী হয়েছে?”
শব্দহীন ভাবে কান্না করছে নীল।এই দুইদিন কান্না করতে করতে তার গলা ব্যথা আর চোখ দুটো ফুলে লাল হয়ে গেছে। সে বলল,
-” ভাইয়া সোহা!”
-” কি হয়েছে সোহার? ও কোথায়? খালার রুমে যে নাই।তোর সাথে কি আজ ঘুমাইছে!”
এটা বলে নীলের রুমের বেডের দিকে তাকায়।বেড খালি।নীল আবার কাঁদছে।তামিম নীলের দু গাল ধরে বলল,
-” নীল বোন আমার! কি হয়েছে বল আমার?”
-” ভাইয়া সোহা মা হতে চলেছে।”
এই কথা শুনে তামিমের মুখে হাসি ফুটে উঠে।নীল বুঝতে পাচ্ছে না তামিমের এই কথা শুনে হাসছে কেন?মুখে হাসি বজায় রেখে তামিম বলল,
-” সোহার কোথায় নীল!”
-” ভাইয়া পরশু দিন সোহা মাথা ঘুরে পড়ে যায়।ডাক্তার নিয়ে আসে দাদু।ডাক্তার বলে সোহা না কি মা হতে চলেছে।”
এটা বলে নীল থামে।কিছুটা দম নিয়ে বলল,
-” এটা জানার পর ছোট মা, মা, সবাই অনেক কথা শুনাইছে।অনেক বাজে বাজে কথা শুনাইছে।বিয়ের আগে অবেৈধ বাচ্চার মা হতে চলেছে।ইত্যাদি।
তার ফ্যামিলি সোহাকে এত খারাপ কথা বলছে ভাবতেই
তামিমের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে।দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
-” সোহা এখন কোথায়? ”
নীল কাঁদতে থাকে।ভাইয়ের মুখে দিকে তাকায়।স্পর্শ রাগ দেখতে পাচ্ছে।নীল জানে তার ভাই সোহার বিষয়টা কিভাবে নিবে।এসব জেনে কি আগের মত ভালোবাসবে সোহাকে।তামিম এবার ধমকে দিয়ে আবার সেই কথা বলল।নীল কেঁপে উঠে বলল,
-” সোহা নেই।”
তামিম নীলের বাহু চেপে ধরে বলল,
-” নেই মানে কি? ”
-” সবাই বাহির করে দিয়েছে।”
তামিম চিৎকার দিয়ে বলল,
-” কেন? ”
নীল ভাইয়কে শান্তনা দিয়ে বলল,
-” ভাইয়া তুমি শান্ত হও আগে।”
-” সেই মুহূর্তে কি কি হয়েছে সব বল আমায়।”
-” সবাই সোহাকে আর খালাকে খারাপ কথা বলে।খালা তখন সোহাকে মারে।আর বলল, এই দিন দেখার আগে দুই মরে যেতে পারিলি না কেন? তোর এই কলঙ্ক মুখ কেন দেখালি আমাহ।এতই মুহুর্তে তোর পাপ নিয়ে তুই আমার সামনে থেকে চলে যাবি।তারপর ছোট মা সোহাকে বাহিরে বের করে দেয়।যেন এই বাড়ি চৌকাঠ না ফেরায়।”
তামিমের দুচোখ অশ্রু ভরে গেছে।সে বলল,
-” সোহা বলিনি তার বাচ্চার বাবা কে? ”
-” আমি কতবার জিজ্ঞেস করেছিলাম।একবার বলেনি।”
কেন বলোনি সোহা।তোমার বাচ্চার বাবা আমি।কেন চলে গেলে আমায় একা করে।ফ্লোরে বসে পড়ে কান্না করতে থাকে।আর বলল,
-” নীল অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি আমি।আমার আরো আগে সবাইকে জানানো উচিত ছিল।”
নীল ভাইয়ের সামনে বসে বলে।
-” কি ভুল করে ফেলেছো ভাইয়া।”
-” সোহা আমার বাচ্চার মা হতে চলেছে।প্রাচ্য’র হলুদের দিন আমরা বিয়ে করে ফেলেছি।”
তামিমের কথা শুনে থমকে যায়।কি শুনছে সে।একবার তার বেষ্ট ফ্রেন্ডকে সোহার এই কথা বলতে পারল না।তার বাচ্চার বাবা তামিম।তাহলে অন্তত অনেক কিছু সামলানো যেত।তামিম বলল,
-” তুই কেন সোহাকে আটকে রাখিস নি।”
তামিম কান্না করতে করতে বলে।নীল বলল,
-” ভাইয়া আমি সোহার পিছন পিছন গেছিলাম।তারপর
সোহা আমার নাগালের বাহিরে চলে যায়।”
তামিম উঠে দাঁড়ায় চোয়াল শক্ত করে।কপালের রগ গুলো ফুলে রয়েছে। মায়ের রুমে যায়।মায়ের মুখের সামনে সত্যি টা বলে।সোহাগী তামিমের গালে চড় মেরে বলল,
-” অসভ্য ছেলে।তোর নজর এত নিচু।তুই কাজের লোকের মেয়েকে বিয়ে করিস।আবার বড় বড় মুখ করে আমায় বলতে এসেছি।”
-” সোহা তোমাদের কাছে কাজে লোক হলে ও।আমার কাছে সে ভালোবাসার মানুষ।আর সে আমার স্ত্রী, আমার সন্তানের মা।এটা সোহা পরিচয় আমার কাছে।আমি সোহাকে খুজে বের করে নিয়ে আসব।দেখি তোমার কি ভাবে আটকাও!”
তামিমে চলে যায়।সোহাগী বেগম শ্বশুড়কে সব জানায়।তিনি সাফ সাফ জানিয়ে দেয় সোহাকে কিছু মেনে নিবে না। সোলোমান মির্জা কি বলবে? বুঝতে পাচ্ছে না।এক এক করে কি হচ্ছে তার বাড়িতে।
সোহাগী আমেনার রুমে যেয়ে বলল,
-” কাজের লোক হয়ে আমায় ছেলের পিছনে মেয়েকে লেলিয়ে দিয়েছিস। একটু ও লজ্জা লাগে তোর।মা, মেয়ে মিলে প্ল্যান করে আমার ছেলেকে ফাঁসাইছিস।”
আমেনা বুঝতে পাচ্ছে না সোহাগী কেন কথা গুলো বলছে।সব যেন তার মাথা উপর দিয়ে যাচ্ছে।আমেনা এগিয়ে এসে বলল,
-” ভাবী আপনি আমায় ভুল বুঝছেন।”
-” ভুল! ভুল আমাদের হয়েছে তোদের মতো কাল সাপকে ঠাঁই দেওয়ায়।এই জন্য এখন ছোবল খেতে হচ্ছে।”

পুরো মির্জা পুর খোঁজা শেষ।কোথায় ও সোহার খোঁজ পায়নি।শহরে চলে আসে সে।দৌড়াছে বেপরোয়া ভাবে।তাকে সোহার খোঁজ পেতে হবে।সোহাকে ছাড়া একমিনিট থাকা যে কঠিন তার কাছে।সোহা কেন তার জন্য অপেক্ষায় করে নাই।একটু যদি অপেক্ষায় করে পড়ে থাকতো।তাহলে সব এখন ঠিক করে দিত।কিন্তু এখন সে কোথায় পাবে সোহাকে।সোহা কোথায় আছে।কিভাবে আছে সে জানে না ? খুব কষ্ট হচ্ছে তার। বুকে অসহনীয় যন্ত্রনা হচ্ছে।

#কাউছার সুলতানা স্বর্ণা
( এই রোজার দিন এত কষ্ট করে প্রতিদান আপনাদের জন্য গল্প লেখি তার বিনিময় আপনারা আপনাদের ভালোলাগা খারাপ লাগা জানাতে ইচ্ছুক হোন না।তাহলে আর কি জন্য গল্প লিখি বলুন তো।)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে