তৈমাত্রিক পর্ব-৯+১০

0
1034

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#পর্বঃ ০৯

🌿✨
.
.
.
.

যে যার মতো করে চলছে। সময়ের চাকা গড়িয়ে আরো প্রায় ৫ মাস চলে গেছে। তবে সবার মাঝেই কেমন একটা ফ্যাকাশে ভাব। মেহরাম তার শশুড় বাড়িতেই রয়েছে। সোহেল বাইরে চলে গিয়েছে বেশ কিছুদিনের জন্য। তনুও আয়ুশের সাথেই আছে। তনু আগে থেকেই বেশ নরমাল হয়ে গিয়েছে। সত্যি বলতে বাড়িতে কেউ তাকে সেই কথা টা মনেই পরতে দেয় না। তার নিজের মধ্যেও যে একটা কমতি আছে তা বুঝতেই দেয় না তনুকে। তবে আয়ুশ চুপচাপ থাকে, তেমন কথা বলে না। তনু মাঝে মাঝে আয়ুশকে লক্ষ করে। কেননা এই আয়ুশকে তো সে চিনতো না। যেই কিনা সারাদিন বাইকে করে ঘুড়ে বেড়াতো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে শেষই হতো না সে এখন এমন একটা পরিস্থিতিতে এসে দাড়িয়েছে। সেই আগের আয়ুশের সাথে এখনকার আয়ুশের রাত দিন তফাৎ। আজ অফিসের অফ ডে তাই সবাই একসাথে বসে টেবিলে খাচ্ছিলো। আয়ুশ শুধু খাবার সামনে নিয়ে বসে আছে। আর তনু বারবার আয়ুশকে দেখছে।

তনু;; আয়ুশ।

আয়ুশ;; হ্য..হ্যাঁ বলো।

তনু;; খাচ্ছো না কেন?

আয়ুশ;; ন.. না খাচ্ছি আমি।

তনু;; হুম।

কোন রকমে খেয়ে আয়ুশ জলদি রুমে চলে যায়। কিছুক্ষণ পর তনুও খেয়ে ওপরে রুমে এসে পরে। তনু এসেই দেখে আয়ুশ বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তনু গিয়ে আয়ুশের পেছনে দাঁড়িয়ে পরে।

তনু;; আয়ুশ।

আয়ুশ;; হুম।

তনু;; তোমার কি হয়েছে? এমন চুপ মেরে গিয়েছো কেন?

আয়ুশ;; আমার দম বন্ধ হয়ে যায় তনু। পানি যখন নাকের ওপরে চলে যায় তখন মানুষ বাচার চেষ্টা করে কিন্তু যখন তার কাছে সেই বাচার উপায় টুকুও না থাকে তখন মৃত্যু ব্যাতীত আর কোন পথ থাকে না।

তনু;; আয়ুশ তুমি এমন কেন হলে, আমার দোষ তাই না। সব, সব আমার দোষ আমি তোমাকে কখনো কোন বাচ্চা দিতে পারবো না তাই এমন করছো তাই না?!

আয়ুশ;; না তনু অযথা ভুল বুঝো না। এতে তোমার কোন দোষই নেই।

তনুর এবার কাদো কাদো ভাব হয়ে গেলো।

তনু;; আয়ুশ তুমি অনেক পালটে গেছো অনেক।

আয়ুশ;; মানুষ পরিবর্তনশীল তনু।

তনু এবার আয়ুশকে জড়িয়ে ধরে। আয়ুশও তার হাত টা তনুর পিঠে রেখে দেয়। আয়ুশ মুখ ঘুড়িয়ে অন্যপাশে তাকিয়ে থাকে। তনু তখন মাথা তুলে আয়ুশের দিকে তাকিয়ে বলে…

তনু;; আয়ুশ, আমাকে কখনো ছেড়ে যাবে না তো? (চোখে পানি টলমল করছে)

আয়ুশ;; হাহা, যদি তোমার আগে আমার মরণ হয়ে যায় তাহলে তো ছেড়ে যেতেই হবে বলো! (মলিন হেসে)

তনু;; আয়ুশ চুপ করো প্লিজ।

তনু আরো শক্ত করে আয়ুশকে জরিয়ে ধরে। আয়ুশকে ক্ষীন হেসে উঠে। তনু হুহু করে কেদে দিয়েছে। আর এদিকে অজান্তেই আয়ুশের চোখের কার্ণিশ বেয়ে এক ফোটা জল গড়িয়ে পরে। সাথে সাথে সে তা মুছে ফেলে।


কুসুম;; মেহরু মা কোথায় তুই?

মেহরাম;; হ্যাঁ মা বলো এই তো আমি।

কুসুম;; এটা খা। (একটা লাড্ডু মেহরামের মুখে পুড়ে)

মেহরাম;; হুম হুম কিন্তু মমমা এটা কিকিশের লাড্ডু? (খেতেখেতে)

কুসুম;; কিছুরই না, আগে যখন সোহেল আমার কাছেই থাকতো মানে আর্মি তে যোগ দেবার আগে। তখন প্রায় বলতো মা এটা বানিয়ে দাও ওটা বানিয়ে দাও। নতুন নতুন রেসিপি তাকে আমার বানিয়ে দিতেই হতো রোজ। এখন তো ছেলে নেই তাই মেয়ে কেই খাওয়াই।

মেহরাম;; হুমম বুঝলাম। আচ্ছা এদিকে এসো দেখি তোমার না মাথায় ব্যাথা ছিলো। এখন কেমন লাগছে?

কুসুম;; ওইতো আছে আর কি।

মেহরাম;; এমনিতেই মাথা ব্যাথা তার ওপর এই গরমে রান্নাঘরে কেন গেলে। এদিকে এসো মাথায় তেল লাগিয়ে দেই।

মেহরাম কিছুটা জোর করেই তার শাশুড়ীর মাথায় তেল মালিশ করে দিলো। কিছুক্ষন পর মালিশ শেষ হলে মেহরাম কেমন কপাল কুচকে ফেলে। দুজনেই এসে সোফায় বলে পরে। তবে মেহরামের শাশুড়ীর একটা অভ্যাস আছে উনি প্রায় মাঝে মাঝে পান খান। মেহরাম বসে বসে পান বানাচ্ছিলো। কিন্ত তখনই তার মাথা টা কেমন চক্কর দিয়ে উঠে। মেহরাম ঠিক হয়ে বসে তার শাশুড়ী কে পান দেন। কুসুম বেগম তার মতো করেই কথা বলে যাচ্ছেন। কিন্তু এরই মাঝে মেহরামের মাথা ভনভন করে ঘোড়াতে থাকে। আর এর পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে মেহরাম সেখানে সোফাতে অজ্ঞান হয়ে পরে যায়। এটা দেখে কুসুম বেগম মেহরাম বলে চিল্লিয়ে উঠে দ্রুত তার কাছে যায়। মেহরামের গালে হাত দিতে ডাকতে থাকে। কুসুম বেগম দ্রুত বাসার কাজের মেয়েকে ডেকে মেহরাম কে ভালোভাবে শুইয়ে দেয়। তাদের পারসোনাল ডাক্তার ছিলো কুসুম বেগম দ্রুত তাকে ফোন করে বাসায় ডাকেন।

কুসুম;; মেহরামের কি হয়েছে?

ডাক্তার;; উনি কি কোন কিছু নিয়ে অনেক চিন্তা করেন নাকি। মানে কোন বেপারে কি অনেক স্ট্রেস নেন নাকি উনি?

কুসুম;; না, মেহরাম অনেক হাসি খুশি একটা মেয়ে। সারা বাড়ি নিজে মাতিয়ে রাখে। আসলে ও বাসায় না থাকলে বাড়িই মরে যায়। একে দেখে কেউ বলবে না যে ওর মতো মেয়েও কোন বেপারে চিন্তিত থাকে।

ডাক্তার;; অতিরিক্ত চিন্তার জন্য এমন হয়েছে। তাকে দেখে রাখবেন আর কিছু মেডিসিন দিচ্ছি এগুলো নিয়মিত খাওয়াবেন। আর উনার হয়তো রাতের ঘুম খুব কমই হয়। তাকে রাতে ঘুমাতে বলবেন।

কুসুম;; জ্বি।

ডাক্তার মেহরামকে দেখে সেখান থেকে চলে আসেন। তবে এবার কুসুম বেগম চিন্তায় পরে গেলেন। মেহরাম কি নিয়ে এতো টেনশন করে তাই সে বুঝে উঠতে পারেন না। কুসুম বেগম বাইরে তাকিয়ে ছিলো তখনই মেহরামের জ্ঞান আসে।

মেহরাম;; মমমা..মা (আধো আধো গলায়)

কুসুম;; হ্যাঁ রে মা আমি আছি। এখন কেমন লাগছে তোর?

মেহরাম;; হ্যাঁ মা ভালো।

মেহরাম উঠে বসে। আর কুসুম বেগম তাকে এক গ্লাস ঠান্ডা শরবত খাইয়ে দেয়। গ্লাস টা টেবিলে রেখে কুসুম বেগম মেহরামের পাশে বসে পরে…

কুসুম;; হ্যাঁ রে কি হয়েছে তোর? এতো কিশের চিন্তা?

মেহরাম;; মা অতিরিক্ত গরম তাই হয়তো এমন হয়েছে আর হ্যাঁ রাতে একটু ঘুমাতে আমার সমস্যা হয়। কিন্তু চিন্তা কি নিয়ে করবো আমি। ধুর ছাড়ো তো।

কুসুম;; কি আর বলি তোকে। আচ্ছা শোন।

মেহরাম;; হুমম।

কুসুম;; তোর শরীর ভালো না দেখে আমি সোহেলকে ফোন করে বলে দিয়েছি।

মেহরাম;; আরে মা কিন্তু, কেন বললে উনাকে। উনি এমনিতেই এত্তো ব্যাস্ত থাকেন, কাজের এতো চাপ। তার মধ্যে তাকে কেন ফোন দিয়ে বলতে গেলে। এখন উনি অযথা চিন্তা করবেন।

কুসুম;; আসছে।

মেহরাম;; কি?

কুসুম;; তোর কথা শুনে অনেক চিন্তিত হয়ে গিয়েছিলো তাই পরশু আসছে।

মেহরাম;; মা তুমিও না।

কুসুম;; আচ্ছা পরের টা পরে দেখা যাবো এবার তুই রেস্ট নে। রুমে যাবি?

মেহরাম;; নাহ সেখানে একা একা কি করবো। এখানেই থাকি।

কুসুম;; আচ্ছা।

এভাবেই তারা থাকে। বিকেলের দিকে তনুর ফোন আসে মেহরামের কাছে।

মেহরাম;; হ্যালো..

তনু;; মেহরু কেমন আছিস?

মেহরাম;; হুম এতো দিনে বোনের কথা মনে পরেছে তাই না। ভালোই আছি। তুই কেমন আছিস আর বাড়ির সবাই কেমন আছে?

তনু;; আরে আস্তে। হ্যাঁ সবাই অনেক ভালো আছে। আচ্ছা শোন যে কারনে তোকে ফোন করা!

মেহরাম;; হ্যাঁ বল না।

তনু;; অনেক দিন তো বাড়িতে যাওয়া হয় না, চল না একদিন সবাই একসাথে গিয়ে ঘুড়ে আসি।

মেহরাম;; হুম বুদ্ধি মন্দ না। যাওয়াই যায়। কিন্তু তোর ভাইয়া বাসায় নেই।

তনু;; কবে আসবেন?

মেহরাম;; আর বলিস না আমি আজ একটু অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম তো আ…..

তনু;; কিহহহ, মেহরু তোর আক্কেল কবে হবে। অজ্ঞান হয়েছিলি মানে কিভাবে, আর আমায় একটাবার বলার প্রয়োজন মনে করিস নি তুই?

মেহরাম;; আরে তেমন বেশি সিরিয়াস কিছু না এমনি আর এখন আমি একদম ঠিক আছি।

তনু;; তুই যে কি করিস না। আচ্ছা এখন কি শরীর ভালো আছে তোর। মাথা ঘুড়াচ্ছে না তো আবার?

মেহরাম;; আরে না। কিন্তু মা এইদিকে চিন্তায় পরে সোহেল কে ফোন করে দিয়েছেন। উনি কিছুদিন পর আসতেন কিন্তু এখন আমার কথা শুনে পরশু দিনই আসছে।

তনু;; ওহহ তাহলে তো হলোই। শোন এখান থেকে আমরা সবাই যাবো আর তুইও খালামনি কে আর ভাইয়া কে নিয়ে এসে পরিস কেমন। ভাইয়া তো পরশু আসবেন আমরা না হয় তার পরেরদিন গেলাম।

মেহরাম;; আচ্ছা, তো প্লেন ডান।

তনু;; হ্যাঁ, আচ্ছা বোনু শোন একটু কাজ আছে বুঝলি এখন রাখি।

মেহরাম;; হ্যাঁ।

তনু;; লাভ ইউ বইনা।

মেহরাম;; টুউউউউ 😅।

এভাবেই দেখতে দেখতে মাঝ খানে দুইদিন কেটে যায়। পরেরদিন সকাল ১১ টায় সোহেল এসে পরে। তখন মেহরাম আর তার শাশুড়ী মিলে আড্ডা দিচ্ছিলো। সোহেল কে এভাবে আসতে দেখেই মেহরাম অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। কুসুম বেগম ছুটে চলে যান ছেলের কাছে। গিয়েই কেদে দেন। অনেক কথা বলে সোহেল সোজা মেহরামের কাছে আসে। মেহরাম সোহেলের সামনে দাঁড়িয়ে পরে। সোহেল তার হাত থেকে ব্যাগ টা নিচে রেখেই মেহরামকে জড়িয়ে ধরে। মেহরাম সোহেলের পিঠে হাত দিবে কি দিবে না কেমন এক দোটানায় পরে যায়। মেহরাম আর সোহেল যে পুরো পুরি ভাবে একে ওপরের হয়নি তা কিন্তু না। কিন্তু তবুও প্রায়ই কেমন এক জড়তা কাজ করে মেহরামের মাঝে।

সোহেল;; কি হয়েছিলো তোমার? নিজের ওপর তো একটু খেয়াল রাখতে পারো নাকি?

মেহরাম;; আপনি কেন এতো চিন্ত করছেন। সামান্য অজ্ঞনই তো হয়েছিলাম। আর এখন একদম ঠিক।

সোহেল;; হুমম বুঝলাম।

মেহরাম;; আচ্ছা ভালো হয়েছে আপনি এসেছেন। আমরা আগামীকাল একটা জায়গায় যাবো।

কুসুম;; হ্যাঁ আর মেহরু মা আমার সাথে আগেই কথা বলে নিয়েছে।

সোহেল;; কিন্তু যাবো টা কোথায়?

মেহরাম;; শশুর বাড়ি।

সোহেল;; কিছুদিন পর গেলেই পারতে, এখন তো..

মেহরাম;; না এখনই ঠিক আছে। আপনি আবার চলে যাবেন তখন কবে না কবে আসবেন। কালই যাবো আমরা।

সোহেল;; আচ্ছা।

পরেরদিন হলে মেহরাম, সোহেল, কুসুম বেগম সবাই বেড়িয়ে পরেন। ওদিকে তনুর বাড়ির সবাই বেরিয়ে পরেছে। প্রায় অনেকক্ষণ পর তারা সবাই বাড়িতে চলে চলে যায়। মানে তনু আর মেহরামের বাবার বাড়িতে। বাড়িতে একটা ছোটখাটো আনন্দের রেশ পরে গেছে। মেহরামের বাবা মা চাচি চাচ্চু দিদুন তাদের কি খুশি। তবে মেহরাম যতো পারছে আয়ুশের থেকে দূরে থাকছে। আয়ুশও খেয়াল করছে যেন সে মেহরামের সামনে না পরে। সবাই হলরুমে বসে আছে অনেক গল্প করছে। এরই মাঝে সোহেল মেহরামের ওপর অনেক নজর রাখছে। মূলত সে কিছুটা অসুস্থ তাই। সোহেল মেহরামকে খাইয়ে পর্যন্ত দিচ্ছে। তবে আয়ুশ কোন এক জায়গায় স্থির হয়ে বসছে না। তার ভেতরে ছটফট অনেক, এক প্রকার অস্থিরতা কাজ করছে। যা তনু বেশ ভালোই খেয়াল করেছে। যেখানে মেহরাম আর সোহেল একসাথে বসে ছিলো সেখান থেকে আয়ুশ উঠে আসে। সারা টা দিন সেখানে থেকে তারপর সবাই চলে আসে। সবাই অনেক বেশি খুশিছিলো। কেউ কেউ অতিমাত্রায় খুশি, কেউ সামান্য, আবার কারো মাঝে খুশির ছিটেফোঁটাও ছিলো না, আবার কেউ খুশি থাকার ভনিতাই করে গেছে মাত্র। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে পরে।

.

রাতে মেহরাম বসে বসে বই পড়ছিলো। তখনই সোহেল বলে ওঠে…

সোহেল;; মেহরাম আমার না শরীর টা তেমন ভালো লাগছে না।

মেহরাম;; এমা কেন কি হলো আবার। (সোহেলের কাছে গিয়ে)

সোহেল;; জানি না। আচ্ছা আমি ঘুমাই।

মেহরাম;; হ্যাঁ আসুন।

সোহেল ঘুমিয়ে পরে। মেহরামও কিছুক্ষণ পর ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়। তার একদিন পরেই সোহেল আবার বাইরে চলে যায়। মেইন অফিসার ফোন দিয়েছিলো সোহেলকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এসে পরতে বলেছে। সেও বেশি দেরি না করে দ্রুত চলে যায় পরেরদিনই।

একদিন আয়ুশ অফিসের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। মূলত গাড়িতে করে কোথাও যাচ্ছিলো। তখনই তার চোখে পরে মেহরামকে। হয়তো বাইরে গিয়েছিলো, হাতে কিছু ব্যাগও আছে। আয়ুশ আর নিজেকে আটকাতে পারলো না। দ্রুত তার গাড়ি সাইডে করে মেহরামের কাছে ছুটে গেলো। চোখ যেন তার ঝলমলিয়ে উঠে। মেহরাম যাচ্ছিলো হঠাৎ আয়ুশকে এভাবে নিজের সামনে আসতে দেখে কিছুটা ঘাবড়ে যায়। আয়ুশ মেহরামের সামনে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো শ্বাস ছাড়তে লাগলো। মেহরাম আয়ুশের এমন করার মানে বুঝতে পারছে না। আয়ুশ কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার জন্য মাথা নিচু করে রাখে। মেহরাম তার সামনে থেকে চলে আসতে নিলেই আয়ুশ বলে ওঠে…

আয়ুশ;; মেহরাম!!

মেহরামের পা গুলো না চাইতেও থেমে পরে। আয়ুশ এবার মেহরামকে দেখতে থাকে।

মেহরাম;; ককি..কিছু ববলবেন?

আয়ুশ মেহরামের কথায় অন্য পাশে মাথা ঘুড়িয়ে ফেলে। তারপর নিজের ডান হাত দিয়ে কপাল টা একটু স্লাইভ করে আবার বলে ওঠে…

আয়ুশ;; কেমন আছো মেহরু??

মেহরামের সাহস নেই সে আয়ুশের ওই চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের উত্তর দিবে। “মেহরু” ডাকটা কখনোই কি আর মুখ থেকে যাবে না তার। তবে আসলেই কি দুই কিণারের দুটো মানুষ প্রকৃতিপক্ষে ভালো আছে। যদি না ই থাকে তাহলে কি এবারও মিথ্যেই বলতে হবে। কারণ মাঝে মাঝে একদম ছোট্ট একটা কথার মাঝেও ভারি সত্য লুকিয়ে থাকে। তখন প্রশ্ন টা আর তার উত্তর টা তো সহজ ভাষারই হয়, কিন্তু তা কি আদৌও সত্য নাকি নিছক মিথ্যেই। মেহরাম এবার খুব কষ্টে কিছুটা সাহস জুগিয়ে আয়ুশের দিকে তাকায়। তবে আয়ুশ মেহরামের আর মেহরাম আয়ুশের চোখের দিকে তাকানোর আগেই ঝমঝমিয়ে মুষুলধারে বৃষ্টি নেমে পরে। আকাশে মেঘ গর্জে উঠে। চারিদিকে সবাই এদিক ওদিক ছুটছে বৃষ্টি থেকে বাচার জন্য। কেউ কেউ মাথায় হাত রেখেই দৌড়ে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের দুজনের কোন হেলদুল নেই। সেভাবেই দাঁড়িয়ে আছে। মূহুর্তেই দুজন ভিজে একাকার হয়ে গেলো। এতে অবশ্য তাদের সুবিধেই হয়েছে। চোখের পানি গুলো বৃষ্টি পানির সাথে ধুয়ে মুছে যাবে। না দেখতে পারবে আয়ুশ মেহরামের চোখের পানি আর না দেখতে পারবে মেহরান আয়ুশের। কখনো কখনো হয়কি যে প্রকৃতিও মানুষের মনের ভাষা বুঝে ফেলে। যদি বেশি চাপা কষ্ট হয় তাহলে বাধ্য হয়েই নেমে পরতে হয়, বিনা অনুমতিতেই। আর এর জন্যই হয়তো কিছু প্রেমিক-প্রেমিকাদের কাছে এই বৃষ্টিটা অতি পছন্দের একটা জিনিস। যদি এতে কিছুটা দুঃখবিলাশ কমে, কিছুটা🥀।





💙চলবে~~

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#পর্বঃ ১০

🤎🦋
.
.
.
.

বাইরে এখনো মুষুলধারায় বৃৃষ্টি হচ্ছে। দরজায় কলিং বেল বাজতেই কুসুম বেগম গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। খুলতেই অবাক হন। বাইরে পুরো চুপচুপে ভিজে মেহরাম দাঁড়িয়ে আছে। দুইহাতে দুটো ব্যাগ।

কুসুম;; কিরে তোর এই অবস্থা কেন? এভাবে ভিজলি কি করে?

মেহরাম;; _______________

কুসুম;; আরে জলদি আয় ঘরের ভেতরে, ভিজে কি একটা অবস্থা করেছে। এই নিলা (বাড়িতে কাজ করে) এই জলদি এখানে আয়। তোর আপার কাছ থেকে এগুলো ব্যাগ নে।

নিলা;; জ্বি খালাআম্মা।

কুসুম;; বাইরে এতো বৃষ্টি কতো বলি বাইরে গেলে ড্রাইভারকে নিয়ে যা কে শোনে কার কথা। এদিকে আয় দেখি মাথা মুছে দেই।

এতো গুল কথার মাঝে মেহরাম হু হা কিছুই বলছে না। শুধু মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কুসুম বেগম তাকে নিয়ে গিয়ে আগে মাথা মুছে দিলেন। মেহরাম ওপরে তার রুমে চলে এলো। হাত-পা যেন তার বরফ হয়ে গিয়েছে। কোন রকমে একটা টাওয়াল নিয়ে সোজা ওয়াসরুম চলে গেলো। শাওয়ার ছেড়ে দিয়ে তার নিচে ধপ করে বসে পরে। চোখের সামনে খালি আয়ুশের চেহারা টাই ভাসছে। আয়ুশ হুহু করে কেদে দিয়েছিলো তার সামনে। ভেবেছিলো সে হয়তো লুকাবে তার কান্না গুলো কিন্তু না। কথায় বলে ছেলেদের নাকি কাদতে নেই। কিন্তু ফিলিংস,ইমোশন এগুলো তো সবারই আছে তাই না। এমন তো আর না যে দুইজন একে ওপরের থেকে মিলো দূরে থাকে। বারবার, হাজার বার একে ওপরের সাথে চোখাচোখি হয়ে যায়। আয়ুশ একদম বাচ্চাদের মতো করে কাদছিলো। মেহরাম শুধু এই সব মনে করছে আর কাদছে শাওয়ারের নিচে বসে থেকে। সে এবার নিজের মাথার চুল গুলো হাতে খামছে ধরলো। হিচকি উঠে গেছে কাদতে কাদতে। অনেকক্ষন যাবত এমন থেকে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পরে। নাক মুখ সব লাল হয়ে গেছে। চোখ গুলো ফোলা ফোলা। সে নিচে নেমে পরে। নামতেই দেখে কুসুম বেগম সোফায় বসে বসে পান খাচ্ছেন। মেহরাম সোজা সিড়ি বেয়ে নেমে তার শাশুড়ীর কাছে চলে যায়। তারপর তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরে। কুসুম বেগমও তার মাথায় হাত বুলিয়ে দেন।


তনু;; আয়ুশকে কখন থেকে ফোন দিচ্ছি। কিন্তু ফোন কেন তুলছে না (ফোন দিতে দিতে)। আয়ুশ প্লিজ পিক আপ দি ফোন।

আরো প্রায় ২-৩ বার ফোন বাজার পর আয়ুশ ফোন ধরে।

আয়ুশ;; হ্য….

তনু;; এইই ধরেছো তুমি ফোন এতোক্ষণে। জানো আমি সেই কখন থেকে ট্রাই করছি। কোথায় ছিলে তুমি?

আয়ুশ;; কোথায় আর থাকবো অফিসেই।

তনু;; বাসায় আসছো না কেন কতো রাত হয়েছে। ১২ টা বাজতে চললো।

আয়ুশ;; কাজের চাপ বেশি ছিলো। আসছি আমি।

তনু;; আচ্ছা।

আয়ুশ ফোন কেটে দিয়ে বাইরে বের হয়ে পরে। আয়ুশ বাসায় এসেই দেখে তার আম্মুর মাথায় আইস ব্যাগ দেওয়া। আর তার পাশে তনু কণা সবাই বসা। আয়ুশ দ্রুত সেখানে চলে যায়৷

আয়ুশ;; কিরে কণা কি হয়েছে মায়ের?

কণা;; প্রেসার বেশি।

আয়ুশ;; মা, কি হয়েছে? সেইদিন না দেখলাম প্রেসার ঠিক। আজ হঠাৎ করেই কেন বাড়লো।

তনু;; সেটাই তো ভাবছি।

আয়ুশ;; আচ্ছা ডাক্তার কে ফোন করেছিলে কেউ তোমরা?

তনু;; হ্যাঁ আমি করেছিলাম, কিন্তু উনি বললেন ঠান্ডা জাতীয় কিছু দিতে। আর এই গরমে মাংস টা একটু কমিয়ে খেতে। মানে যেগুলো তে প্রব্লেম আছে আরকি সেগুলো একটু এভোয়েড করতে বলেছেন।

আয়ুশ;; মা এখন কেমন লাগছে?

লায়লা খাতুন;; না বাবা আমি একদম ঠিক আছি, তুই চিন্তা করিস না। বাইরে থেকে এসেছিস ফ্রেশ হতে যা।তনু মা তুই আয়ুশের সাথে যা এখানে কণা আছে তো।

তনু;; আচ্ছা।

আয়ুশ রুমে এসে পরে। তনুও তার পিছু পিছু। আয়ুশ তার ওপর থেকে কোর্ট টা খুলে দিলে তনু তা টাংগিয়ে দেয়। তনু খেয়াল করে দেখলো যে আয়ুশের চোখ মুখ কেমন একটু ফোলা ফোলা।

তনু;; বৃষ্টির পানি লেগেছিলো নাকি গায়ে, কোর্ট টাও তো ভিজা?!

আয়ুশ;; হ্যাঁ বাইরে গিয়েছিলাম একটু তখন ভিজে গেছি।

তনু;; তুমি জানো না যে বৃষ্টির পানিতে তোমার সমস্যা হয় তবুও!

আয়ুশ;; আরে ওইতো একটু ভিজে গেছি।

তনু;; আচ্ছা ফ্রেশ হতে যাও। আমি খাবার বাড়ছি।

আয়ুশ;; আব..খিদে নেই আমার বাইরে থেকে খেয়ে এসেছি।

তনু;; কি শুরু করলে তুমি, প্রতিদিন বাইরে থেকে খেয়ে আসো কেন?

আয়ুশ;; এমনি, আমি ফ্রেশ হতে গেলাম।

আয়ুশ ওয়াসরুমে চলে গেলে তনু একটা ছোট খাটো হাফ ছেড়ে বাইরে চলে আসে।

পরেরদিন সকালে~~

মেহরাম;; মা মাথা টা ঘোড়াচ্ছে!

কুসুম;; আবার। কাল রাতে ঘুমিয়েছিলি?

মেহরাম;; হ্যাঁ।

কুসুম;; সকালে খেয়েছিস?

মেহরাম;; ওহ আর বলো না, কাল রাত ২ টায় উঠে খেয়েছি। জানি না খিদে লেগে গিয়েছিলো খুব।

কুসুম;; হাহাহা…

মেহরাম;; আচ্ছা তুমি কি খাবে বলে ফেলো, জলদি বানিয়ে দেই।

কুসুম;; আমি খেয়ে নিবো মাথা নাকি ঘোড়াচ্ছে তোর। কিচেনে যেতে হবে না।

মেহরাম;; আহা বলো তো তুমি।

কুসুম;; হ্যাঁ আমি……

তমাল মোহাম্মদ;; কুসুম…

মেহরাম;; আরে আপনি কে, আর এভাবে ভেতরে এলেন কি করে?

মেহরাম আর কুসুম বেগম কথা বলছিলেন তার মাঝে একজন লোক এসেই মেহরামের শাশুড়ীর নাম ধরে ডাক দেয়। মেহরাম তো চিনেই না লোকটিকে তাই সে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন গুলো করে বসে। কিন্তু এবার মেহরাম তাকিয়েই দেখে যে কুসুম বেগম উঠে দাঁড়িয়ে পরেছেন। যেই লোক টি ভেতরে এসেছিলো তার চোখে আর কুসুম বেগমের চোখেও পানি টলমল করছে। মেহরাম তো কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না। কুসুম বেগম উঠে গিয়ে লোকটির কাছে যায় তারপর ‘দাভাই’ বলেই অঝোরে কেদে দেন।

কুসুম;; দাভাই কেমন আছো? আজ এতো গুলো বছর পর এই বোনের কথা মনে পরলো তোমার?

তমাল;; বোন হোস তুই আমার, হাজার বছর পর হলেও মনে করবো। মাফ করে দিস বোন আমার তোকে আমি আমার কাছে রাখতে পারিনি।

কুসুম;; না দাভাই দয়া করে এমন ভাবে বলো না। সেখানে তোমার কোন দোষই ছিলো না। মাঝে মাঝে তো আমাকে দোষী মনে হয় যে আমি ভাবীর মৃত্যুর দিন যেতে পারিনি।

তমাল;; আমাকে মাফ করে দিস বোন। তোকে আমি ভাই হিসেবে কিছুই করে দিতে পারি নি। আমি ব্যার্থ রে বোন।

কুসুম;; এভাবে বলো না দাভাই। তুমি, তুমি আসো তো।এদিকে আসো। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে তুমি এসেছো।

কুসুম বেগম তার ভাইকে এনে ঘরে বসিয়ে দিলেন। তারপর দ্রুত মেহরাম কে ডেকে নিয়ে আসেন।

কুসুম;; দাভাই, আমাদের সোহেলের বউ।

তমাল;; সোহেলের বউ! মাশআল্লাহ। নাম কি মা তোমার?

মেহরাম;; জ্বি মেহরাম।

তমাল;; মাশআল্লাহ ভারী মিষ্টি তুমি মা।

মেহরাম বসে পরে। নিলা কে বলে খাবার-নাস্তা দিয়ে গেলো। তারপর সবাই এক সাথে বসে কথা বলতে থাকে। মেহরাম তার শাশুড়ী কে খেয়াল করলো। আজ কতোটা দিন ধরে সে এখানে আছে কিন্তু কোন দিনও এভাবে তাকে কাদতে দেখেনি। অনেক বছর পর নিজের কোন আপন জনকে দেখলে বোধ হয় এমনই লাগে। মেহরামের ভাবনাতে ছেদ ঘটিয়ে কুসুম বেগম বলে উঠেন…

কুসুম;; মেহরাম মা উনি আমার বড়ো ভাই।

এবার কুসুম বেগম মেহরামকে সবকিছু খুলে বললেন।
কুসুম বেগম আর তার বড়ো ভাই তমাল আগে একসাথেই থাকতো। কিন্তু কথায় আছে না বাইরে থেকে চাপ পরলে সব জিনিসেরই ফাটল ধরে। ঠিক তেমন। কুসুম বেগমের ভাই তমাল বিয়ে করলে তার বউ কুসুম বেগমকে কোন ভাবেই সহ্য করতে পারেন না। কুসুম বেগমের হাসবেন্ড মারা যাবার পর তো আরো না। এমনকি বাবার সম্পত্তিতেও কোন ভাগ দেয় না। আর কোন উপায় না পেয়ে কুসুম বেগমের ছেলে কে নিয়ে বাইরে বের হয়ে আসতে হয়েছে। আর তমাল মোহাম্মদ উনার চোখের সামনে সবকিছু হয়েও তিনি কিছুই করতে পাছিলেন না। কেননা তমাল মোহাম্মদের বউ তাকে হুমকি দিয়েছিলো যে উনি যদি নিজের বোনের সাইড নেন তাহলে তার বউ তার মেয়েকে নিয়ে বের হয়ে পরবেন। তখন তমাল মোহাম্মদের একটা ফুটফুটে মেয়ে ছিলো। তখন থেকে তমাল মোহাম্মদ শুধু লুকিয়ে লুকিয়েই তার বোন কুসুমের সাহায্য করে এসেছেন। রোজ কথা হতো তার। এর মাঝে সোহেলের মনে তার মামা মামির জন্য ভারি তেজ জমা হয়। কিন্তু সোহেল যখন ধীরে ধীরে বড়ো হলো আর পুরো বেপার টা বুঝলো যে সেখান তার মামার কোন দোষ নেই তখন ঠিক হলো। তমাল মোহাম্মদের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। আর নিজের ভাবীর জন্য কুসুম তার আপন ভাগ্নীর বিয়েতেও যেতে পারেন নি। বিয়ের দিন লুকিয়ে লুকিয়ে নিজের ভাই আর ভাগ্নীর সাথে কথা বলতে হয়েছে তাকে। তবে প্রায় দু বছর আগে তার ভাবী মৃত্যুবরণ করেন। কুসুম বেগম সেখানে যেতে চাইলে সোহেল সোজা মানা করে দেয়। এমনকি সোহেলের বিয়ে তেও কুসুম বেগম তার ভাইকে ডাকতে পারেন না। আর আজ হঠাৎ করেই তমাল মোহাম্মদ বোনের বাসায় এসে পরেন। কুসুম বেগম বলেছিলেন তো যে নিজের ছেলে বাদে তার আর কেউ নেই। আসলে কথা টা তাকে বাধ্য হয়েই বলতে হয়েছে। কুসুম বেগম সবকিছু মেহরাম কে খুলে বললেন। আর বাম হাতে নিজের চোখ দুটো মুছে ফেললেন। কুসুম বেগম তাকিয়ে দেখেন তার ভাই কাদছে। তারপর নিজ হাতে তার চোখের পানি গুলো মুছে দেন।

কুসুম;; দাভাই হিয়া কে কেন আনলে না। কতো টা দিন ধরে মেয়েটাকে দেখি না বলো তো। (তমাল মোহাম্মদের মেয়ে)

তমাল;; আসলে কি জানিস তো। মেয়েটা ইদানীং খুব ব্যাস্ত থাকে বুঝলি। আমি তাকে বলিই নি যে আমি তোর কাছে আসছি শুনলে তো পাগল হয়ে যাবে।

কুসুম;; (কুসুম বেগম কাদার মাঝেই হেসে দিলেন), এটা কোন কথা।

তমাল;; আচ্ছা পরের বার আসলে ওকে নিয়ে আসবো। আচ্ছা সোহেল বাবা কবে ফিরবে, এতো টা দিন পর এলাম তবুও আমার বাপজান কে দেখতে পেলাম না।

কুসুম;; এসে পরবে জলদিই। ফোন করলে তোমার কথা বলবো নি।

তমাল;; আচ্ছা।

নিজের মামা শশুড়ের সাথে মেহরাম অনেক কথা বললো। যেমন বোন তার তেমন ভাই। খুব মিশুক আর খুব মজার একজন মানুষ। একদিনেই অনেক ভালো সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। মেহরাম সোহেল আর নিজের বোন কে তার বাসায় যেতে বলে তমাল মোহাম্মদ চলে গেলেন। মেহরাম তাকিয়ে দেখে কুসুম বেগম মুখে শাড়ির আচল গুজে নিজের ভাইয়ের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে এখনো কাদছেন। এবার সত্যি মেহরামের নিজেরই কান্না বের হচ্ছে। আড়ালে চোখের কোণা মুছে মেহরাম এক পাশ থেকে তার শাশুড়ী কে জড়িয়ে ধরে বলে….

মেহরাম;; আরে মা, এখনো কাদছো কেন। আরে এবার সবকিছু ঠিক হয়ে গেছে তো। তোমার ওই দজ্জাল ভাবী গেছে পরপারে। এবার তো আর কোন বাধা নেই। ভাই বোন এখন আগের মতোই থাকবে।

কুসুম;; নারে মা একজন মানুষ যতোই খারাপ হোক তার বেপারে এভাবে বলতে নেই। আর ভাবী তো মারা গিয়েছেন। ইন্না-লিল্লাহ। এভাবে বলিস না মা।

মেহরাম;; কেন যে আমার মন টা এতো বড়ো হলো না তোমার মতো।

কুসুম;; ধুর চল ভেতরে যাই। আর তোর ফোন টা দে সোহেলের কাছে ফোন দেই।

মেহরাম;; নাও।

মেহরাম আর তার শাশুড়ী সোহেলের সাথে অনেক কথা বললো। সোহেলও অনেক খুশি হলো এই শুনে যে তার মামা এসেছিলো।

রাতের দিকে সবাই হলরুমে বসে টিভি দেখছিল। মেহরাম কোলে একটা কুশন নিয়ে বসে বসে আপেল খাচ্ছিলো আর কথা বলছিলো। কিন্তু হঠাৎ বসে থাকতে থাকতে মেহরামের কেমন একটা অস্বস্তি লাগতে থাকে। এভাবে আর বসে থাকতে না পেরে পেটে হাত দিয়ে সোজা বেছিং-এ দৌড় লাগায়। আর সাথে গড়গড় করে বমি। কুসুম বেগম দ্রুত গিয়ে মেহরামের পিঠে চাপড় দিতে থাকে। মেহরাম একটু উঠে দাড়াতেই আবার হরহর করে দেয় বমি করে। কুসুম বেগমের বেপার টা কেমন ভালো ঠেকলো না। মেহরামকে নিয়ে আলতো করে বসে পরলো। একটু ঠান্ডা পানি আর লেবু খাইয়ে দেয়।

কুসুম;; কাল যদি তুই আমার সাথে ডাক্তারের কাছে না গিয়েছিস দেখিস কি করি!

মেহরাম;; আরে মা..

কুসুম;; অনেক হয়েছে। মা ভালো আছি, কিছু হয় নি, গরমের কারণে হাবি জাবি কতো কিছু বলে যে আমাকে বুঝ দেয়। কাল উঠেই আগে আমার সাথে ডাক্তারের কাছে যাবি।

মেহরাম;; আচ্ছা যাবো।

কুসুম;; আচ্ছা তুই থাক দেখি আমি আসছি।

মেহরাম;; হুমমম।

কুসুম বেগম ফোন টা হাতে নিয়ে কিছুটা বাইরে চলে গেলো। তারপর সোজা সোহেল কে ফোন দেয়।

কুসুম;; হ্যালো সোহেল।

সোহেল;; হ্যাঁ মা বলো।

কুসুম;; বাবা তুই কবে আসবি?

সোহেল;; মা দু-একদিনের এসে যাবো।

কুসুম;; ওহহ আচ্ছা, একটু জলদি আসিস বাবা।

সোহেল;; কেন মা কিছু হয়েছে? সবকিছু ঠিক আছে তো?

কুসুম;; না মানে মেহরামের শরীর টা অনেক খারাপ যাচ্ছে বুঝলি। একটু আগেই মুখভরে বমি করেছে। আমার না ভালো ঠেকছে না, তুই জলদি এসে পরিস পারলে।

সোহেল;; এই মেয়ে টাও না কি আর বলি। নিজের বেপারে এতো টা কেয়ারলেস। বাড়ির সবার দিকে নজর আছে নিজের দিকে নেই।

কুসুম;; আচ্ছা শোন আমি মেয়েটার কাছে যাই রাখি। তুই জলদি আসিস।

সোহেল;; আচ্ছা মা, আল্লাহ হাফেয।


তনু;; ঘুমাবে না তুমি? আর কতো কাজ করবে। অফিসেও থাকো সারাদিন বাসায় এসেও কাজ করো!

আয়ুশ;; একটা ডিল ফাইনাল করতে হবে, কাজ তো থাকবেই। শুনো আমার দেরি হবে তুমি ঘুমিয়ে পরো।

তনু;; আচ্ছা আর বেশি রাত জেগো না শুয়ে পরো।

আয়ুশ;; হুম।

প্রায় ১ ঘন্টা কাজ করে আয়ুশ কিছুটা আড়মোড়া ভেংগে উঠে পরে। কি জেন ভেবে নিজের পাশে থাকা ড্রয়ার টা খুলে। এখানে কেউ হাত দেয় না কারণ আয়ুশ বারণ করেছে এখানে তার যাবতীয় সব কিছু রয়েছে। হঠাৎ ড্রয়ার টা খুলতেই আয়ুশের চোখে বাধে একটা ডায়েরি। জীবনেও কখনো ডায়েরি লিখতো না আয়ুশ। কিন্তু এক সময় মেহরামই তাকে ডায়েরি টা লিখা শিখিয়েছে। মেহরামের মতে “যে কথা গুলো তুমি কাউকে বলতে পারো না, কাউকেই না এমন কি নিজের সাথেও তেমন ভাবে না। তাহলে সেক্ষেত্রে এই ডায়েরিই হচ্ছে তোমার সবথেকে বড়ো ফ্রেন্ড। যখন যা ইচ্ছে, যাই মনে পরুক না কেন সব লিখে ফেলো সব।” আয়ুশ ডায়েরি টা হাতে তুলে নেয়। মোটা ফ্রেমের একটা ডায়েরি। মাঝে নীল রঙের একটা সুতো বের হয়ে আছে। সেটা ধরে টান দিতেই একদম মাঝ বরাবর ডায়েরি টা খুলে যায়। আর খুলতেই আয়ুশের ভেতর টা যেন দুমড়েমুচড়ে গেলো। মেহরাম গিটার নিয়ে বসে আছে। আর আয়ুশ তাকে পেছন দিক থেকে জড়িয়ে ধরে গিটার বাজানো শেখাচ্ছে। মেহরাম মন খুলে হাসছে আর আয়ুশ মেহরামকে দেখতে ব্যাস্ত। সেইদিন টা যেন আয়ুশের চোখে ভেসে উঠলো। আর এখনো কানে মেহরামের হাসির আওয়াজ গুলো বাজতে থাকলো। আয়ুশ ঠাস করে ডায়েরি টা বন্ধ করে দেয়। তারপর আবার আগের জায়গায় ড্রয়ারে রেখে দেয়।


মেহরাম;; মা না গেলে হয় না ডাক্তারের কাছে গিয়ে কি করবো। কাল রাতে সামান্য ভমেটিং তো হয়েছে।

কুসুম;; চুপ কর মেয়ে। চল।

কুসুম বেগম মেহরামের কথা কে পাত্তা না দিয়ে সোজা চলে যায় হস্পিটালের দিকে। প্রায় ১৫-২০ মিন পর পৌঁছেও যায়। গিয়ে ডাক্তারকে সবকিছু খুলে বললো। ডাক্তার মেহরামকে কিছু টেস্ট করালেন। তারপর এসে আবার নিজের জায়গায় বসলেন। রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তারের মুখে হাসি ফুটে ওঠে..

ডাক্তার;; মিসেস কুসুম বেগম সবার মুখ মিষ্টি করান আগে। কারণ মিসেস মেহরাম প্রেগন্যান্ট।

ডাক্তার যা বললো মেহরাম যেন তা শুনে ৪৪০ ভোল্টের একটা ঝটকা খেলো। মানে কি সে প্রেগন্যান্ট। কোন ভাবেই মেহরাম এটা বিশ্বাস করতে পারছে না। কুসুম বেগম তো খুশিতে পাগল হচ্ছেন। কিন্তু মেহরাম যেন পাথর হয়ে গিয়েছে। সে ঠাই বসে রয়েছে।

কুসুম;; মেহরু কিরে এভাবে বসে আছিস কেন। আমার আগে থেকেই সন্দেহ ছিলো। আল্লাহ আমার দোয়া কবুল করেছেন। মেহরু মা আমার খুশির আর তর সইছে না। সোহেল কে ফোন দিয়ে বলতে হবে। সে তো কেদেই দিবে খুশিতে।

মেহরাম;; না মা প্লিজ তুমি আগেই উনাকে কিছু বলো না।

কুসুম;; কি কেন?

মেহরাম;; উনি আস্তে ধীরে আগে বাসায় আসুক তারপর আমি নিজেই বলে দিবো।

কুসুম;; আচ্ছা বলিস। আগামীকালই সোহেল আসছে তার ডিউটি শেষ প্রায়। তখন না হয় নিজেই বলিস। আর শোন এখন থেকে কিন্তু আমার সব কথা শুনতে হবে। আরে বাড়ির সবাইকে বলতে হবে, আমার যে কি খুশি লাগছে।

মেহরাম তার শাশুড়ীর এমন অবস্থা দেখে হাসছে। সে যাই হোক তারপর সাবধানে তারা বাসায় ফিরে গেলো। কুসুম বেগম গিয়েই মেহরামের যা যা পছন্দের সবকিছু রান্না করলো। এখনো বাড়ির কাউকেই জানানো হয় নি। শুধু মেহরাম আর তার শাশুড়ী জানেন। আগামীকাল সোহেল এলে প্রথমে তাকে জানাবে আর তারপর বাড়ির সবাইকে। রাতে খেয়ে দেয়ে যে যার ঘরে চলে গেলো। রাতে মেহরামের ঘুম উধাও। এখনো যেন তার বিশ্বাসই হচ্ছে না যে সে মা হতে চলেছে। নিজের অজান্তেই আয়ুশের কথা টা মাথায় এসে বারি খায়। মেহরাম আয়ুশের সাথে থেকে যে স্বপ্ন গুলো একটা সুতোয় গেথেছিলো তার সবগুলোই তো পূরণ হচ্ছে কিন্তু অন্য কারো নামে, অন্য কারো সাথে। মেহরাম প্রেগন্যান্ট। বেপার টা কেমন লাগছে তার কাছে। আবার এটা ভেবেও ভালো লাগছে যে নিজের ভেতরেও একটা প্রাণ বড়ো হয়ে ওঠছে। মেহরামের অজান্তেই তার হাত টা তার পেটের ওপরে চলে যায়। মুচকি হাসে সে।

.

পরেরদিন সকালে মেহরাম উঠেই দেখে তার ফোনে সোহেলের ১১ বার ফোন দিয়েছিলো। কিন্তু ফোন সাইলেন্ট থাকার ফলে শুনেনি। ফোনে এতো গুলো কল দেখেই তো মেহরামের মাথায় হাত। সে জলদি সোহেলকে ফোন দেয়। একবার রিং হতেই সোহেল ধরে।

মেহরাম;; হ্যাঁ হ্যালো। আসলে অনেক গুলা সরি ফোন সাইলেন্ট ছিলো আর আমি ঘুম শুনতে পাইনি।

সোহেল;; ইট’স ওকে।

মেহরাম;; আচ্ছা আপনি কোথায়?

সোহেল;; আমি রাস্তায়।

মেহরাম;; মানে?

সোহেল;; মানে আমি বাড়ি আসছি আরকি।

মেহরাম;; আচ্ছা জলদি আসুন। অনেক দরকারি একটা কথা আছে।

সোহেল;; হুম বলো আমি শুনছি।

মেহরাম;; ফোনে বলা গেলে তো গতকালই বলে ফেলতাম।

সোহেল;; আচ্ছা বাবা আমি আসছি। আর তুমি উঠে ফ্রেশ হয়ে নাও।

মেহরাম;; আচ্ছা।

সোহেল;; রাখি।

সোহেল ফোন কেটে দেয়। মেহরামও উঠে ফ্রেশ হয়ে নেয়। আস্তে আস্তে সকাল গড়িয়ে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল তারপর রাত হয়। আসতে বেশ দেরি হয়ে যায় সোহেলের। বাড়িতে আসতেই দারোয়ান গেট খুলে দেয়। সোহেল সোজা বাড়ির ভেতরে চলে যায়। গিয়েই দেখে তার মা নিলার সাথে কথা বলছে। পেছনে দরজা খোলার শব্দে কুসুম বেগম ঘুড়ে তাকায়। দেখে সোহেল এসেছে। ছুটে ছেলের কাছে চলে যান।

কুসুম;; এসেছিস বাবা?

সোহেল;; হ্যাঁ মা।

মা-ছেলের মাঝে অনেক গল্প হয়। তবে সোহেল খেয়াল করলো অন্যান্য দিনের থেকে তার মা আজ একটু বেশিই খুশি। সারা বাড়িতে চোখ বুলিয়ে দেখলো কিন্তু কোথাও মেহরাম নেই।

সোহেল;; মা মেহরাম কোথায়?

কুসুম;; ওপরে ঘরে আছে, তুই জলদি যা।

সোহেল;; আচ্ছা।

এই বলেই সোহেল দ্রুত পায়ে সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠে পরে। রুমের দরজা খুলতেই দেখে মেহরাম একটা বই নিয়ে শুয়ে শুয়ে পরছে। মেহরাম হাসে সোহেলকে দেখে। সোহেল মেহরামের পাশে বসে। তারপর কপালে চুমু খায়।

সোহেল;; কি হয়েছে বলো তো। এভাবে জলদি জলদি আসতে বলছো তুমিও আর মা ও। ক্লিয়ারলি বলো তো হয়েছে কি?

মেহরাম উঠে গিয়ে সোহেলের সামনে দাঁড়ায়। সোহেলও মেহরামের সামনে দাঁড়িয়ে পরে। সোহেল দাড়াতেই মেহরাম হেসে দেয়। কেননা সে অনেক লম্বা। মেহরাম তার বুক অব্দি।

এবার মেহরাম সোজা সোহেলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে…

মেহরাম;; আমি প্রেগন্যান্ট।

মেহরামের প্রেগন্যান্টের কথা শুনে সোহেলের পুরো মুখের নকশাই পালটে গেলো। সে অবাক হয়ে মেহরামের দিকে তাকিয়ে আছে। মেহরামের মুখ টা কেমন মলিন।





🌻চলবে~~

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে