তৈমাত্রিক পর্ব-২৬+২৭

0
1112

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#পর্বঃ ২৬

.
.
.

তনু মেহরামকে ডাকলে মেহরাম তার পাশে এসে বসে পরে। তনু কিছুক্ষণ মেহরামের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর তার পেটের ওপর আস্তে করে হাতটা রাখে। আনমনেই হেসে ফেলে, তারপর আবার বলা শুরু করে।

তনু;; মেহরু..!

মেহরাম;; হুমমম

তনু;; আমার না জীবনে কখনো কিছু চাইতে হয়নি জানিস। কারণ চাবার আগেই তুই সব কিছু আমার কাছে এনে দিয়েছিস। কি আর চাইবো, আমার তো বলার প্রয়োজন টুকুও পরে নি আগেই সব বুঝে গেছিস।

মেহরাম;; হুমম।

তনু;; জানিস “” নিঃশ্বাস & বিশ্বাস এই দুটু জিনিস একবার হারিয়ে গেলে আর ফিরে পাওয়া যায় না। অনেকের থেকেও অনেক বেশি মূল্যবান এই দুটো জিনিস””।

মেহরাম;; এগুলো কেন বলছিস?

তনু;; আমি জানি না, আমার শুধু ভয় লাগছে। কখন কিনা কি হয়ে যায়।

মেহরাম;; আরে কিছুই হবে না, সব আগের মতোই ঠিক হয়ে যাবে।

তনু;; আগে কি কিছু ঠিক ছিলো..?! (মেহরামের দিকে তাকিয়ে)

মেহরাম;; পরিস্থিতি খারাপ করে দিলেও ঠিক থাকার দায়িত্ব টা কিন্তু আমাদের।

তনু;; আর যখন নিজেই ভেংে পরি তখন?

মেহরাম;; আবার উঠে দাড়াতে হবে এছাড়া উপায় নেই।

তনু;; হাহাহা…

মেহরাম;; হাসছিস কেন?

তনু;; সেই উঠে দাঁড়ানোর শক্তি বা ইচ্ছে কোনটাই আর আমার মাঝে নেই।

মেহরাম;; হয়েছে বকবক করা বন্ধ কর তো এবার।

তনু;; কবে থেকে কথা বলি না, মুখে এই ঘোড়ার ডিমের মাস্ক পরে থাকতে হয় ভালো লাগে না।

মেহরাম;; মাত্র ২-৩ দিন হয়েছে।

তনু;; ৪৮-৭২ ঘন্টা। কম মনে করলি এটা?!

মেহরাম;; হুমম।

তনু;; আর যাই হোক আমি ইহকাল আর পরকালে গিয়ে বলতে পারবো যে আর কিছু পাই বা না পাই একটা বোন যে পেয়েছি না। জীবনে আর কি লাগে।

মেহরাম;; দোয়া করি এমন বন যেন আর কারো ভাগ্যে না পরে।

তনু;; কেন? ওই যে একজনের ভালোবাসা আরেকজন কে দিয়ে দিবে তার জন্য বুঝি?

মেহরাম;; ঠিক তা না। আসলে একদম সত্যি কথা বলতে এই জেনারেশনে কেউ নিজের একটা পুরোনো জিনিস পর্যন্ত কাউকে দেয় না….

তনু;; আর সেখানে তুই তোর জীবন কেই আমার কাছে দিয়ে দিয়েছিস।

মেহরাম;; আমার জীবন তুই।

তনু;; একসময় আয়ুশ ছিলো আর এখনো আছে।

মেহরাম;; ________________

তনু;; মেহরু,

মেহরাম;; হ্যাঁ

তনু;; আমার যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে আমাকে মিস করবি না?

মেহরাম;; আল্লাহ বাচাইছে যে এখন তুই অসুস্থ তা না হলে চড় যে কতোগুলা খাইতি না একদম হিসাব ছাড়া।

তনু;; হ হ মাইরা মাইরা মাইরাই ফালা আমারে।

মেহরাম;; চুপ কর হারামি।

তনু;; মেহরু,

মেহরাম;; হুমম।

তনু;; এই দুনিয়ায় যে যতো বেশি স্বার্থপর সে ততো বেশি সাফল্যবান।

মেহরাম;; হুমমম।

তনু;; আমার না বুকের ধুকপুকানি ক্রমশ বেড়েই চলেছে। আমি তোর কাছে একটা জিনিস চাইবো দিবি?

মেহরাম;; কি বলছিস তুই, শুধু একবার বলে তো দেখ মুখ থেকে বলার আগেই পেয়ে যাবি বল।

তনু;; সত্যি?

মেহরাম;; অবশ্যই।

তনু;; মনে রাখিস এটা আমার শেষ চাওয়া তোর কাছে। আর এতে আর যাই হোক আমি খুশি থাকবো। অনেক বেশি খুশি।

মেহরাম;; তুই একবার বলে তো দেখ।

তনু;; ‘”তুই আর আয়ুশ এক হয়ে যা”’ (মেহরামের হাত ধরে)

তনুর এই কথা শুনে মেহরামের অন্তর-আত্না সব কেপে উঠলো। হাত গুলো কেমন যেন কাপছে। তনু একবার মেহরামের হাতের দিকে তাকিয়ে আবার তার দিকে তাকায়। মেহরাম ফট করে মাথা তুলে তনুর দিকে তাকায়। চোখের কোণে পানি জমেছে।

মেহরাম;; তনু, তনু এমনটা হয় না রে।

তনু;; কেন হয় না?

মেহরাম;; _________________

তনু;; সবাই এই ব্যাপার টা জানে। আর সত্যি বলতে তুই হ্যাপি নেই।

মেহরাম;; তুই তো আছিস।

তনু;; না নেই আমি, আগে ছিলাম এখন না। কারণ আমি আর নিতে পারছি না। এগুলো কুড়ে খায় আমাকে। তোর মতো এতো বেশি ধৈর্য আমার মাঝে নেই। আমি পারবো না, আমি পারবো না সারাজীবন আয়ুশের চোখে তোর জন্য ভালোবাসা দেখতে। যেটা আমার নামে কখনোই ছিলো না। তবে আমি এটা বলতে পারবো যে আয়ুশের মতো লাইফ পার্টনার যে পাবে সে সত্যি অনেক লাকি। এতো কিছু হবার পরেও আয়ুশ কখনোই আমার সাথে উচু গলায় কখনো কথা বলে নি। শুধু সেইদিন অফিসে একটু কথা কাটাকাটি হয়েছে। সেইদিন দুজনেরই মাথা গরম ছিলো আর লেগে গেলো। মেহরাম আমি আর কিছুই চাই না, কিচ্ছু না প্লিজ তুই এই কাজ টা করে দে। আমার জন্য হলেও আয়ুশের হয়ে যা। ছেলে টা শেষ হয়ে গেলো, গেছেও। আমি জানি সব করেছিস আমার জন্য কিন্তু সব জানার পর খুব বেশি অপরাধ বোধ কাজ করে নিজের মাঝে।

মেহরাম;; এমন হয় না তনু।

তনু;; কেন হয় না। হবে তো তুই চাইলেই সব হবে। একটা বার হ্যাঁ বলে দে।

মেহরাম;; শোন এই সব বকা বন্ধ করে, কিছুই হবে না তোর তুই একদম আগের তনু হয়ে যাবি। আর বাসায় যাবি। আগের মতোই থাকবি আর আয়ুশের সাথে যা কথা কাটাকাটি হয়েছে সব মিটমাট করে নিবি। এখানে আমি, আমি কোথা থেকে এলাম।

তনু;; তুই ছিলি, তুই আছিস আর তুই-ই থাকবি। না চাইলেও আয়ুশ আর আমার মাঝে অনেক দূরত্ব এসে পরেছে রে মেহরু। আমি আয়ুশ কে আর তুমি বলে ডাকি না, আপনি ডাকি। সুই-এর মতো খোচা লাগে আমার। ওই যে কথায় আছে না “” আমি পাই না ছুতে তোমায়, আমার একলা লাগে ভারি “”। ঠিক তেমন।

মেহরাম;; রেস্ট নে।

মেহরাম সেখান থেকে উঠে চলে আসতে নিলে তনু মেহরামের আচল খামছে ধরে। মেহরাম পেছন ফিরে তাকায়।

তনু;; তোর এই আচল খামছে ধরার অভ্যাস আমার কখনোই যাবে না।

মেহরাম;; না যাক থাকুক।

তনু;; আর আমিই যদি না থাকি তাহলে..!!

মেহরাম;; যাবি কোথায় টেনে নিয়ে আসবো।

তনু;; আমি থাকি বা না থাকি তোর মুখে যেন হাসি থাকে। আমি দেখবো আর বলতে তো পারবো যে না মহান গিরি খালি তুমি দেখাও নি আমিও দেখিয়েছি।

তনুর কথায় মেহরাম হেসেই দেয়।

তনু;; মেহরু কথা টা মাথায় রাখিস, আমি সত্যি মন-প্রাণ থেকে যাই তুই আর আয়ুশ যেন একসাথে থাকিস। জেলে কোন আসামী কেও মৃত্যুদন্ড দিলে তার জীবনের শেষ ইচ্ছে জিজ্ঞেস করা হয়। তুই আমাকে জিজ্ঞেস তো করিস নি কিন্তু আমিই বলে দিয়েছি।

মেহরাম;; হ্যাঁ আমি জিজ্ঞেস করিনি কারণ আমি জানি যে তোর কিছুই হবে না।

তনু;; হোক বা না হোক, আমি চাই তোরা দুজন এক হয়ে যা।

মেহরাম চলে যেতে নিলে তনু আবার থামিয়ে দেয়।

তনু;; মেহরাম প্লিজ,, আ আমি আমি আর পাপারছি না, পপ্লিজ কথা টা শোন। আম আমার কিকিইছু হয়ে যাবে। প্লিজ আয়ায়ুশ কে এএভাবে কস কষ্ট দিদিস না। হয়ে যা না ওর। (শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে)

মেহরাম;; আল্লাহ, তনু তোর অবস্থা খারাপ হচ্ছে। ডাক্টার মানা করেছে বেশি কথা বলতে আর তুই সেই কখন থেকে বকবক করেই চলেছিস। প্লিজ চুপ কর।

মেহরাম কোন উপায় না পেয়ে জলদি ডক্টার কে ডেকে আনে। ডক্টর এসে অক্সিজেন মাস্ক টা মুখে পরিয়ে দেয়। কেননা এতোক্ষণ তা খোলা ছিলো। নার্স এসে ইঞ্জেকশন দিয়ে দেয়। মূহুর্তেই তনু শান্ত হয়ে যায়। মেহরাম সব বাইরের কেবিন দিয়ে দেখছিলো। ডাক্তার বাইরে বের হলে মেহরাম খানিক সরে দাঁড়ায়।

ডাক্তার;; অক্সিজেন মাস্ক টা খুলতে বারবার বারণ করি কিন্তু উনি শুনেই না। উনার তীব্র শ্বাসকষ্ট আছে। বেশিক্ষণ এভাবে থাকলে হীতে বিপরীত হবে।

মেহরাম;; জ্বি।

ডাক্তার চলে গেলেন এগুলো বলেই। মেহরাম আরেকবার তনুর কেবিনের দিকে উকি দিয়ে তারপর এসে বসে। পেটের ওপর এক হাত দিয়ে বসে আছে। কেন জানি বারবার কানের কাছে ঘুরেফিরে তনুর বলা কথাগুলোই আসছে। আর তনুর জন্য না চাইতেও এক অজানা ভয় মনের মধ্যে এসে বাসা বাধছে। এরই মধ্যে আয়ুশ আসে, এসেই দেখে মেহরাম বসে আছে। বেশ চিন্তিত লাগছে। আয়ুশ হেটে মেহরামের কাছে চলে যায়। আয়ুশ যে এসে মেহরামের পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার প্রতি মেহরামের কোন খেয়ালই নেই, সে এতো টাই চিন্তায় মগ্ন রয়েছে।

আয়ুশ;; মেহরাম?

মেহরাম;; আব..হ হ্যাঁ এসেছো।

আয়ুশ;; হ্যাঁ, কি হয়েছে। Is everything Okay?! (তনুর কেবিনের দিকে তাকিয়ে)

মেহরাম;; হ্যাঁ সবকিছুই ঠিক আছে।

আয়ুশ;; মনে হচ্ছে না।

মেহরাম মাথা তুলে আয়ুশের দিকে তাকায়। আয়ুশ এসে মেহরামের পাশে বসে পরে।

আয়ুশ;; কি হয়েছে?

মেহরাম;; তনু পাগলামি করছে।

আয়ুশ;; মানে?

মেহরাম;; কিছু না।

আয়ুশ;; খেয়েছো কিছু?

মেহরাম;; খিদে নেই।

আয়ুশ;; তনু কেমন আছে?

মেহরাম;; বেশি কথা বলছিলো তাই আবার একটু শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিলো। নার্স আর ডাক্তার এসে দেখে গেছে।

আয়ুশ;; ওহহ,

মেহরাম;; খালামনি & কণা কেমন আছে?

আয়ুশ;; আলহামদুলিল্লাহ সবাই ভালো।

মেহরাম;; হুমম।

এভাবেই সেই সময় টুকু চলে যায়। হস্পিটালে কুসুম বেগম এসেছিলেন তনু কে দেখতে। এসেই আয়ুশ, মেহরাম, তনু সবার সাথেই কথা হয়। কিছুক্ষণ থেকে আবার চলেও গেছে। মেহরাম গিয়ে তনু কে খাইয়ে দেয়।

মেহরাম;; আরেকবার খা এই শেষ বার।

তনু;; আমাকে এভাবে ঠেসে ঠেসে খাওয়াচ্ছিস। অথচ নিজে খাস নি কিছুই।

মেহরাম;; আরে হলো তো, তুই খা।

তনু;; মেহরু

মেহরাম;; জ্বি বলেন আমি শুনছি। (বেংঙ করে)

তনু তখন কিছু না বলে একদম চুপ করে থাকে। সামান্য উঠে বসে মেহরাম হেল্প করে তাতে। খাবারের বাটি সব রেখে এসে মেহরাম আবার তনুর কাছে বসে। মেহরাম গিয়ে দেখে তনু মাথা নিচু করে হেলান দিয়ে আছে।

মেহরাম;; কিরে কি হয়েছে?

তনু মেহরামের একটা হাত তার দুই হাতের মাঝখানে কোন রকমে এনে জড়িয়ে ধরে। চোখের পানি ছেড়ে দিয়েছে তনু। এক প্রকার হাউমাউ করে কেদে দিয়েই তনু বলে ওঠে…

তনু;; প্লিজ মেহরাম, প্লিজ আয়ুশের হয়ে যা। আমি তোর কাছে অনুরোধ করছি। প্লিজ আমার এই কথা টা রাখ, এভাবে তিলে তিলে মরার থেকে ভালো তো আমি একেবারেই মরে যাই। প্লিজ মেহরু প্লিজ আয়ুশের হয়ে যা। প্লিজ।

মেহরাম নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে কোন রকমে ঠিক হয়ে বসে। তনুর চোখের পানি গুলো টলমল করছে, সেগুলো মুছে দেয়।

মেহরাম;; তুই শুয়ে থাক ঘুমানোর চেষ্টা কর।

তনু;; __________

মেহরাম তনু কে শুইয়ে দিয়ে কেবিনের বাইরে চলে আসতে ধরে। তখনই তনু আবার নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে গলা খাকাড়ি দিয়ে বলে ওঠে….

তনু;; যদি আমাকে কখনো একদিন এক মিনিটের জন্য হলেও নিজের বোন ভেবে থাকিস তাহলে মেহরাম তুই আয়ুশের হয়ে যাবি।

সামনে একদম স্থীর চোখে তাকিয়ে তনু কথা টা বলে উঠলো। কেন জানি মেহরাম বাইরে পা রাখিতে গিয়েও রাখতে পেলো না। একবার মাথা ঘুড়িয়ে তনুর দিকে তাকালো। দেখে তনু শুয়ে আছে। মেহরাম আবার গিয়ে অক্সিজেন মাস্ক তা সুন্দর করে লাগিয়ে দিয়ে এসে পরে। তনু তার চোখ গুলো বন্ধ করে ফেলে। মেহরাম বাইরে গেতেই আয়ুশকে দেখে। মেহরামেকে দেখে আয়ুশ দাঁড়িয়ে পরে। আয়ুশ খেয়াল করে মেহরামের চোখের পানি চিকচিক করছে যেন এই পরে গেলো। আয়ুশের মনে ভয় ঢুকে গেলো যে এই দুই বোনের মাঝে আবার কিছু হলো না তো। তাই আয়ুশ আবার মেহরামকে কিছু বলতে যাবে তখনই মেহরাম আবার বলে ওঠে….

মেহরাম;; “” মন & মস্তিষ্কের মাঝে যে কোন একটা কে চুস করা অনেক কঠিন “”। মস্তিষ্কের কথা শুনলে নিজের কাছে নিজেকে ঝুকে যেতে হয়। মনে হয় নিজের সাথে বড্ড বেশি অন্যায় করে ফেলেছি। আর যদি মনের কথা শুনি তাহলে বাকি সব কিছু বেমানান লাগে। তাহলে কি করবো?

আয়ুশ মেহরামের দিকে কয়েক কদম এগিয়ে যায়।

আয়ুশ;; যখন তুমি তোমার এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে, সীমাহীন কষ্ট নিয়ে রাতের অন্ধকারে একলা ঘরের কোণে বসে থেকে দুঃখবিলাশ করবে তখন মনে হবে হয়তো মনের কথা শুনলে ভালো হতো। তুমি নিজে খুশি থাকতে। কারণ আমাদের আশে পাশের লোক-সমাজ এমনই,, তুমি লোকে কি ভাববে তা ভেবে যদি নিজের ইচ্ছেকে তুচ্ছ ভেবে কাজ করো তাহলে নেহাত তুমি নিজের সাথে অন্যায় করছো। আর যদি নিজের ইচ্ছে কে প্রাধান্য দিয়ে নিজের মনের কথা শোন হ্যাঁ তাহলে হয়তো মানুষ কিছু কথা বলবে তবে আবার চুপও হয়ে যাবে। আর হ্যাঁ সেই রাতের গভীর আঁধারে তোমাকে ঢুকরে মরতে হবে না রোজ রোজ। তুমি নিজে খুশি থাকতে পারবে। মনে রেখো “” পাছে লোকে কিছু বলে””।

মেহরাম;; কিন্তু তনু..?

আয়ুশ;; কি হয়েছে তনুর?

মেহরাম;; কিছু না ভালো লাগছে না আমার।

আয়ুশ;; একটু বসে থাক।

মেহরাম;; আয়ুশ!

আয়ুশ;; হ্যাঁ

মেহরাম;; _____________

আয়ুশ;; অনেক সময় কিছু কথা মুখ ফুটে আমরা বলতে পারি না। সমস্যা নেই তুমি মনে মনে বলতে পারো।

মেহরাম;; _____________


মেহরাম আর আয়ুশ এভাবেই বসে থাকে। আসলে আয়ুশ জানে যে মেহরাম তাকে ঠিক কি বলতে চায়। কারণ আয়ুশ তনু আর মেহরামের সব কথা শুনেছে। পরে আয়ুশ সেখান থেকে দূরে গিয়ে কেদেও এসেছে। তারপর আবার চোখে মুখে ইচ্ছে মতো পানি। যেন কেউ না বুঝে। আয়ুশের এখন ইচ্ছে করছে মেহরাম কে চিল্লিয়ে বলতে যে “” হয়ে যাও না আমার, অনেক তো অন্যের জন্যে করলে এবার একটু আমার কথা টা ভাবো। জেদের বশে তো আমিও তনুকে বিয়ে করে ফেলেছিলাম। বুঝি নি, কারো কথা ভাবি নি। এবার একটু না হয় ভাবলাম। হয়ে যাও আমার “”। কিন্তু আমরা যা ভাবি তা যদি সত্যিই বলতে পারতাম তাহলে জীবন টা কতোই না সোজা হয়ে গেতো। ওদিকে তনুর চোখে ঘুম নেই। অথচ তাকে মেডিসিন দেওয়া হয়েছে ঘুমের কিন্তু ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। তনুর দম বন্ধ হয়ে আসছে। চোখের সামনে শুধু বার বার মেহরাম & আয়ুশের মুখখানা ভাসছে। ডাক্তার রেস্টে রেখেছে তনুকে। তাই বলেছে এই সময়ে তনুর কেবিনে কারো প্রবেশ করা অর্থাৎ কারো এখন এই মূহুর্তে দেখা না করা টাই ভালো হবে।

তনু;; আমি শুধু মুক্তি চাই, আর কিচ্ছু না মুক্তি চাই আমি। এখান থেকে এই জীবন থেকে। আমি একা কোথাও চলে যেতে যাই। আর আসবো না এখানে। আমি চলে যেতে যাই। কিন্তু আমি আমার বোন কে অনেক ভালোবাসি (মনে মনে)

তনুর যেন এখন রাগ হতে লাগলো মুখের এই অক্সিজেন মাস্কের ওপর। ৩ দিন ধরে পরে থাকতে থাকতে আর ভালো লাগে না। জাস্ট তিক্ততা এসে পরেছে এর ওপর। তনু পাশে তাকিয়ে দেখে নার্স তার হাতের পেট বই টা রেখে গিয়েছে। পাশে একটা কলমও আছে। তনু তা একটু টানা দিয়ে হাতে নিয়ে নেয়। খুব কষ্টে কিছু একটা লিখে নিজের পাশেই রেখে দেয় আবার। এবার তনু তার মুখ থেকে আলতো করে মাস্ক টা খুলে ফেলে। মুখ থেকে মাস্ক টা হাতে নিয়ে শুয়ে থাকে ওপরের দিকে তাকিয়ে। এবার যেন সে আগে থেকে ভালো বাইরে নিঃশ্বাস নিতে পারছে। বুক ভরে শ্বাস নিতে লাগলো সে। এভাবেই থাকতে থাকতে তনু এক সময় নিজের চোখ গুলো বন্ধ করে ফেলে। মাস্ক টা হাতে রয়েছে। মনে হচ্ছে আগে থেকে তনু অনেক শান্তি পাচ্ছে এখন।





🖤চলবে~~

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#পর্বঃ ২৭

.
.
.

তনু মুখের ওপর থেকে মাস্ক টা খুলে নিলো। বাম হাতের ওপর মাস্ক টা নিয়ে বেডে রেখে দিয়েছে। যদিও শ্বাস তেমন ভাবে নিতে পারছে না কিন্তু তবুও বুকভরে শ্বাস নেওয়ার প্রচুর ব্যার্থ চেষ্টা তার। চোখ গুলো কেমন নিভু নিভু হয়ে এসেছে। কিন্তু এতে তার কষ্ট না যেন আরাম লাগছে। মনে হচ্ছে মুক্তি পাচ্ছে সব রকম কষ্ট থেকেই। আর ভালো লাগে না কিছুই। তার মনে হচ্ছে এই মাস্ক টা যদি সে অনেক আগেই খুলে দিতো তাহলে আরো আগেই সবকিছু থেকে মুক্তি পেয়ে যেতো। চোখের সামনে বারবার মেহরামের ওই হাসিমাখা মুখটা ভাসছে। তনু এবার একটু চোখ মুখ কুচকে আবার স্পষ্ট দৃষ্টিতে চোখ মেলে তাকায়। জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে আর শূন্যে তাকিয়ে আছে। আগের দিনের কথা গুলো অনেক মনে পরছে। সেই ভার্সিটি লাইফের কথা গুলো। মেহরামের সাথে মারামারি কথা, তার পেছনে ছুটা, একসাথে এত্তো হাসাহাসি কথা সেইসব কিছুর শব্দ যেন কানে এসে লাগাতার বারি খাচ্ছে। চোখের সামনে সবকিছু আজ সাদা-কালো হয়ে ভেসে বেড়াচ্ছে। খানিক হেসে ওঠে সে। দম যেন ক্রমশ খাটো হয়েই আসছে। আরেকবার চোখ বন্ধ করে বুকে ভরে শ্বাস জোড় করে নেয়। তবে এবার যেন আর সে পারছে না। চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ধীরে ধীরে। মাথা টা একদম আস্তে করে একটু কাত করে হাতে থাকা মাস্ক টার ওপর এক নজর তাকায়। মূহুর্তেই তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওঠে সে। কষ্ট হচ্ছে ঠিকই কিন্তু মাস্ক টা তুলে যে আবার মুখের ওপর দিবে তার ইচ্ছেশক্তি কিছুই নেই। মন চাইছে এক নজর মেহরামকে দেখতে পারলে অনেক ভালো হতো। বেশি না হলেও কিছু কথা বলতে পারতো কিন্তু এখন নেই। চোখ ঘুড়িয়ে টেবলের ওপর তাকিয়ে দেখে সে যেই লেটার টা লিখেছিলো তা সেখানেই আছে। একটু চোখ বন্ধ করে আবার খোলে। এখন তার মাঝে চোখ জোড়া মেলে তাকাবার শক্তি টুকু নেই। হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে মাস্ক। এবার তনু মাস্ক টা নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে খানিক দূরেই ছুড়ে ফেলে দিলো। মুক্তি চায় সে চিরতরে।


ডাক্তার অনেক গুলো মেডিসিন প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়েছে। মেহরাম তনুর জন্য খাবার আনতে বাড়ি গিয়েছে কারণ হস্পিটালের খাবার তনু খেতে পারে না। আর আয়ুশ গিয়েছে মেডিসিন আনতে। এদিকে তনুকে যতো টুকু টাইম ডাক্তার দিয়েছিলো রেস্টের জন্য তা প্রায় শেষ, এখন সবাই চাইলে দেখাও করতে পারবে। নার্স তনু কে যে ইঞ্জেকশন দিয়েছিলো তার ডোসও শেষের পথে। সব মেডিসিন কেনা শেষে আয়ুশ আবার হস্পিটালে এসে পরে। সব গুলো অনেক হাই পাওয়ারের মেডিসিন। আয়ুশ আসতেই ডাক্তারের সাথে তার দেখা হয়।

ডাক্তার;; ওহ ভালো হলো আপনি এসেছেন মি.আয়ুশ। উনার টাইম তো শেষ এবার আপনারা দেখা করতে পারেন। আর মেডিসিন?

আয়ুশ;; হ্যাঁ মেডিসিন আমি এনেছি সব।

ডাক্তার;; জ্বি তাহলে আপনি কেবিনে যান আমি কিছুক্ষণ বাদে আসছি।

আয়ুশ;; জ্বি।

ডাক্তার সেখান থেকে চলে গেলে আয়ুশ এক ক্ষীণ দম ছেড়ে আলতো করে কেবিনের দরজা খুলে দেয়। ভেতরে এসে এক নজর তনুর দিকে তাকায়। তনু একদম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। হয়তো ঘুমিয়েছে, দেখে মনে হচ্ছে অনেক গভীর ঘুমের মধ্যে রয়েছে। আয়ুশ মলিন হাসে তনুকে দেখে। ডেস্কের ওপর মেডিসিনের ব্যাগ টা রেখে তা চেক করতে করতে আয়ুশ বলে ওঠে…..

আয়ুশ;; তনু, তনু উঠো। টাইম শেষ, আর যে মেডিসিন গুলো দেওয়া হয়েছে সেগুলোর ডোসও শেষ হয়ে এসেছে। তনু উঠো।

আয়ুশ ডেস্কের ওপর মেডিসিন গুলো দেখছে আর কথা গুলো বলছে। তনুর কোন সাড়াশব্দ না পেয়ে আয়ুশ আবার বলে ওঠে….

আয়ুশ;; তনু উঠে পরো। জানো মেহরাম তোমার জন্য পাগল হয়ে গেছে। যা যা পছন্দ সব বানিয়ে আনতে গিয়েছে বাসায়। সেও প্রায় এলো বলে। উঠো তনু।

তনু;; _______________

আয়ুশ;; তনু, তনু। তনু উঠো, তনু।

আয়ুশের হাজার ডাকার পরও তনু উঠে না। আয়ুশ ভাবে হয়তো ঘুমের ঔষধ দেওয়া হয়েছে বেশি। কিন্তু ডাক্তার তো বললো তনুর এখন জেগে ওঠার কথা। আয়ুশ একই ভাবে আরো বেশ কয়েকবার ডাক দিলো কিন্তু তনুর কোন সাড়াশব্দ কিছুই নেই। আগের ন্যায় শুয়ে আছে। এবার আয়ুশ তনুর দিকে ঘুড়ে দাঁড়ায়। তনুকে দেখে যেন এবার আয়ুশ সব বুঝতে পারে। অক্সিজেন মাস্ক টা ফ্লোরে পরে আছে। তনুর হাতে যে ইঞ্জেকশন টা ছিলো তা খুলে বেডের এক কিণারেই পরে আছে। যেখানে সুই টা লাগানো ছিলো সেখান থেকে খানিক রক্ত গড়িয়ে পরছে। রক্ত টা কেমন কালো বর্ণের হয়ে গেছে। অজান্তেই আয়ুশের মনে কেমন এক ভয় ঢুকে যায়। কপাল কুচকে খানিক শুকনো ঢোক গিলে। ধীরে পায়ে তনুর দিকে এগিয়ে গিয়ে আরো খেয়াল করে দেখে তাকে। আয়ুশ বসে পরে তনুর পাশে। নিচে তাকিয়ে দেখে মাস্ক টা সেটা খানিক ঝুকে তুলে নেয়। আয়ুশের কেমন ভয় হতে থাকে।

আয়ুশ;; তনু, তনু। এই তনু। তনু প্লিজ দেখো কথা বলো। খুব অস্বস্তি লাগছে এভাবে চুপ হয়ে থেকো না। তনু প্লিজ চোখ খোল। এখানেই আছি তো যাই নি, এইতো আমি। তনু, তনু ভালো লাগছে না আমার প্লিজ চোখ খোল। এই তনু, তনুউউউ।

আয়ুশের এবার ঘাম ছুটে যেতে থাকে, চিন্তায় যেন আর কোন কূল-কিণারা পাচ্ছে না। আরো কয়েকবার তনু কে ডাক দিলো কিন্তু তনুর কোন রেসপন্স নেই। চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে আয়ুশের। হাতের তালু দিয়ে কপালে জোড় হওয়া ঘামগুলো মুছতে মুছতে নিজের আশেপাশে তাকাচ্ছে। তাকাতে তাকাতে হঠাৎ আয়ুশের চোখ যায় বেডের পাশে থাকা টেবিলের ওপর একটা কাগজের ওপর। কাগজ টা হাল্কাভাবে ভাজ করে রাখা আছে। আয়ুশ তা হাতে নিয়ে মেলে দেয়। সে তনু হাতের লেখা অনেক ভালো করেই চিনে। এখন একটু অগোছালো কিন্তু এটা যে তনুর হাতের লিখা তা বুঝতে আর বাকি রইলো না আয়ুশের। আয়ুশ লেটার টা মেলে পড়তে থাকলো…..

“” তনু, নামটাই কেমন যেন লাগে এখন আমার কাছে। ছোট থেকেই যা চেয়েছি সব পেয়েছি। যদি আমার প্রাপ্তির হিসেব মেলানো হয় তাহলে তা পরিপূর্ণ পাবে। কখনোই কোন কিছুর কমতি আমার ছিলো না, এখনো নেই। শুধু একটা জিনিস ছাড়া। কিন্তু সত্যি বলতে আমার সেটার জন্য আফসোস নেই। আমার আফসোস আমার বোনটা আমাকে কিছুই বলে নি। বললে হয়তো আমি ভেংে পড়তাম, কষ্ট পেতাম এগুলো ভেবেই বলে নি। হাসি পায় বড্ড হাসি, সেদিন মরতে গিয়েছিলাম তাই হয়তো আমার বোন আমাকে বলার আরো শক্তি-সাহস পায় নি। এটা ভেবেছে যে নিজের বোন আর আয়ুশের সম্পর্কের কথা শুনলে যদি আমি সহ্য করতে না পেরে আরো খারাপের পথে চলে যাই তাহলে। বোন হিসেবে মেহরামের ভাবনা একদম ঠিক। আয়ুশ তুমি যদি এই চিঠি টা পড় তাহলে একটা কথা শুনে রেখো তুমি অনেক ভালো। এতো কিছু হবার পরও আমার ওপর চাইলেই তুমি মেহরামের রাগ জেদ টা দেখাতে পারতে কিন্তু দেখাও নি। হ্যাঁ অবশ্যই তোমার চোখে আমরা দুই বোন দুই রকম ছিলাম তাই না ই কখনো তুমি আমার ওপর মেহরামের রাগ টুকু দেখাতে পেরেছো আর না ই মেহরামের ভালোবাসা টা আমাকে দিতে পেরেছো। ভালোবাসার রশি অনেক শক্ত তোমার সহজে কারো ওপর ট্রান্সফার হয়ে যায় না। মনে রেখো আয়ুশ একতরফা হলেও আমি তোমায় ভালোবাসি। আর তুমি আমার মেহরামকে। হ্যাঁ আমার মেহরাম। আমি আল্লাহ’র কাছে দোয়া করবো যে পরেরবার যদি আমাকে কারো বোন হিসেবে দুনিয়াতে পাঠানো হয় তাহলে যেন আমার বোন মেহরামই হয়। তবে হ্যাঁ চিন্তা করো না। পরেরবার এই এতোসব ঝামেলা হবে না। হাহাহা,, আয়ুশ কখনো তোমার কাছে নিজ ইচ্ছায় কিছু চাই নি। কারণ চাবার আগেই তুমি দিয়েছো কিন্তু আজ & এখন চাচ্ছি প্লিজ আমার মেহরাম টাকে দেখে রেখো। আমার মেহরামের বাচ্চা মানে আমারও বাচ্চা। আর আমার বাচ্চা যেন বাবাহারা না হয়। হাসি পাচ্ছে কিন্তু হাসতে পারছি না। কি আর বলি, আমি যদি ছেলে হতাম তাহলে তোমাকে আসতেই দিতাম না। ধুর ছাই, আমি ছেলে হলে আমি নিজেই মেহরামকে বিয়ে করে নিতাম। সব সমস্যার এক সমাধান। অতিরিক্ত সবকিছুই খারাপ হলেও মেহরাম হয়তো আমার জন্য অনেক বেশি করে ফেছেলে। আমি তো এতোকিছু করতে পারিনি কিন্তু হ্যাঁ এক বুক ভালোবাসা আছে মেহরামের জন্য। আমার একটা ভাই আছে নাম আকাশ। সত্যি বলতে মেহরাম যতো আমার জন্য করেছে বা আমাকে ভালোবাসে তা হয়তো বড়ো হয়ে আমার ভাই টাও করতো না। যাই হোক আয়ুশ মেহরামকে বলো যে তনু মেহরামকে অনেএএএএএক বেশি ভালোবাসে। কিন্তু এখন আমার জীবনে তিক্ততা এসে পরেছে। জানো তো মরার আগে একটা মানুষ বাচার জন্য লাক্ষ চেষ্টা করে কিন্তু আমার সেই ধৈর্য টা নেই আর বাকিই নেই। আমি পারবো না। শুনেছি কোন মানুষ মরার ঠিক চল্লিশ দিন আগে নাকি বুঝতে পারে যে তার সময় হয়তো বা শেষ আমিও বুঝেছি। তাই ভাবলাম যে কেননা জমরাজের কাজ টা আরেকটু এগিয়ে দেই। তাই এমন করলাম। জানো মাস্ক টা আর পরে থাকতে ইচ্ছে হয় না আমার। ভাবতেই অবাক লাগে যে এখন আমার জীবন টা এই ছোট্ট একটা অক্সিজেন মাস্কে অবধারিত। পরলাম না মাস্ক কি হলো। ছুড়ে ফেলে দিয়েছি রাগ লাগে অনেক। লিখার শক্তি আর পাচ্ছি না, হাত ব্যাথা করছে। হাতের রগে টান লাগছে অনেক। আমার সময় শেষ, হয়তো আমি শেষ করে দিয়েছি। আমি শুধু এখান থেকে চলে যেতে চাই। আমি যাবো। আয়ুশ আমি জানি মেহরামকে অনেক ভালোবাসো তুমি। কারণ আমার বোনটাই এমন, কেউ না ভালোবেসে থাকতেই পারে না। মেহরাম আমাকে সবার উর্ধ্বে রেখেছে সবসময়, আমি জানি। আয়ুশ একটা কথা রাখবে আমি হাত জোর করে অনুরোধ করছি প্লিজ মেহরামকে নিজের করে নিও। আমার মেহরু তোমাকে আজও একই ভাবে ভালোবাসে বেচারি বলতে পারে না। আমি বুঝি। আমি হাত জোর করে বলছি মেহরামের হয়ে যাও আয়ুশ। আমি এতেই খুশি হবো সবথেকে বেশি। আর আমার মেহরামের ব্যাপারে বলার কিছুই নেই। আমার জীবন ও। মেহরাম বোন তোর কাছে আমি আমার দুহাত মেলে দিয়ে তোর নিজেরই খুশি চাইছি। এবার থাম আর না প্লিজ। আমি দূরে থাকবো কিন্তু খুশি থাকবো এই ভেবে যে তোরা একসাথে আছিস। আমার সময় হয়তো সত্যি শেষ তাইতো এখনো লেখার শক্তি টুকুও পাচ্ছি না। আমি আমার ইচ্ছেতেই চলে যাচ্ছি। আয়ুশ & মেহরাম। আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি। তবে হ্যাঁ মেহরামকে বেশি। তবে সবার থেকে বেশি বাসি আমার ছোট মেহরামকে যে কিছুদিন পর আসবে। শেষ ইচ্ছে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে তবে এটাই বলবো “আয়ুশ & মেহরাম”। মেহরাম আমার মা টাকে দেখে রাখিস। আকাশ কে দেখিস। যদিও আমার থেকে তুই সবার বেশি কেয়ার করিস বলার কিছুই নেই। আমার মেহরু। নিজে যেখানে খুশি খুঁজে পাস প্লিজ তাই করবি। আর হ্যাঁ যাচ্ছি আমি ঠিকআছে কিন্তু তোর পিছু ছাড়ছি না। ভুত হয়ে আসবো 😅। ভালোবাসি মেহরাম & আয়ুশ””।


পড়া শেষ হতেই আয়ুশের হাত থেকে কাগজ টা পরে যায়। সবাই বলে ছেলেদের নাকি কানতে নেই। কিন্তু এখন আয়ুশের কান্না আসছে। কানতে বাধ্য সে। হাত থেকে কাগজ টা পরে যায় নিচে। আয়ুশ অশ্রুসিক্ত নয়নে তনুর দিকে তাকায়। তখনই এক চাপা শব্দ কানে আসে তার। আয়ুশ তার পাশে তাকিয়ে দেখে পেসেন্ট’স হেলথ্ ডিভাইসের সবুজ রঙের দাগ গুলো একদম সরু, সোজা হয়ে আছে। আর তা থেকেই চাপা শব্দ গুলো আসছে। আয়ুশের মাথায় যেন এবার ভাজ ভেংে পরে। মানে কি এইসবের। আয়ুশ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। মানে তনু আর নেই। জেনারেল ডেথ ওর সুইসাইড…!? আয়ুশের মুখ দিয়ে যেন কোন কথা বের হচ্ছে না। সবকিছু গলায় দলা পাকিয়ে আটকে গেছে। নিঃশব্দে তনুর দিকে তাকিয়ে আছে, চোখ দিয়ে পানি ভেসে যাচ্ছে। কাপা কাপা হাতে তনুর দিকে হাত বাড়ায় কিন্তু আবার হাত টা গুটিয়ে নেয়। আয়ুশ আর পারে না। সে তনুকে হুট করেই নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে। একদম কেদে দেয় শব্দ করে। তনু তনু করে হাজার ডেকেও কোন লাভ হচ্ছে না। তনু চুপ, আয়ুশ খুব কাদছে। তখনই মেহরাম তনুর কেবিনের ঢোকে। গিয়েই দেখে আয়ুশ তনুকে ধরে এক প্রকার হাউমাউ করেই কাদছে। আয়ুশের এমন অবস্থা দেখে মেহরামের আত্মা টা কেমন কু ডেকে উঠলো। মানে কি হয়েছে আয়ুশ এভাবে কাদছে কেন। এটাই ভেবে যাচ্ছে মেহরাম। মেহরাম আয়ুশের দিকে এগিয়ে যায়। কিন্তু যেতেই তার পায়ের কাছে কিছু একটা অনুভব করে। তাকিয়ে দেখে একটা কাগজ পরে আছে। মেহরাম হালকা ভাবে ঝুকে সেটা তার হাতে তুলে নেয়। তুলে নিয়ে পড়া শুরু করে দেয়।





🥀চলবে ~~

#তৈমাত্রিক
#লেখিকা; Tamanna Islam
#{বোনাস পার্ট 💖}



মেহরাম নিচ থেকে লেটার টা তুলে হাতে নেয়। তারপর তা মেলে পড়তে শুরু করে। এদিকে আয়ুশ তনুকে নিয়ে কেদেই যাচ্ছে। এই যে ডাকছে সে আর কথা বলে না। আয়ুশ শুধু একবার মেহরামের দিকে তাকায়। মেহরাম খুব মনোযোগ দিয়ে লেটার পড়ছে। আয়ুশ কোন রকম করে তনুকে বেডে শুইয়ে দিয়ে ছুটে ডক্তারের কাছে চলে যায়। মেহরাম একবার তনুর দিকে তাকিয়ে আবার পড়তে শুরু করে। কিছুক্ষণ পর আয়ুশ ডাক্তারকে নিয়ে ছুটে আসে। ডাক্তার তো তনু কে দেখেই অবাক হয়ে যায়। কেননা যেভাবে তনুকে মাস্ক লাগিয়ে বা সব কিছু সেট করে গিয়েছিলো তার কিছুই নেই। ডাক্তার দ্রুত গিয়ে নার্সের সাহায্যে তনু কে ভালোভাবে শুইয়ে দেয়। তারপর অক্সিজেন দেয়। হাতের পার্লস চেক করে বাট নো রেসপন্স। মেহরামের হাত থেকে কাগজ টা নিচে পরে যায়। নিজের সামনে যে তনুর দিকে তাকাবে তার সাহসই পাচ্ছে না মেহরাম।

আয়ুশ;; ডক্টর প্লিজ সে সামথিং, হয়েছে কি। তনুর কিছু হয় নি তাই না। মেডিসিনের ডোস বেশি হয়েছে মেবি। আপনি প্লিজ ভালোভাবে ওর চেকাপ করুন।

ডাক্তার;; মি.আয়ুশ প্লজ আপনি শান্ত হন, এভাবে হাইপার হয়ে যাবেন না। আমরা আমাদের যথাসম্ভব দেখছি।

আয়ুশ তার দাত দিয়ে ঠোঁট গুলো কামড়ে ধরে। চিন্তায় মাথা ফেটে যাচ্ছে। মেহরামের দিকে তাকিয়ে দেখে পুরো মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। তার প্রায় পাচ মিনিট পরেই ডাক্তার হতাশভাবে হাত থেকে গ্লাপস্ গুলো খুলতে খুলতে বলে ওঠে…

ডাক্তার;; মি.আয়ুশ আমরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত, উনি আর নেই। সি ইস নো মোর…

ডাক্তার এই কথা বলে আয়ুশের দিকে হতাশার নয়নে একবার তাকিয়ে কেবিন থেকে বের হয়ে পরে। আর নার্স সবকিছু ঠিকঠাক করছে। ঠিক তখনই মেহরাম মাথা ঘুড়িয়ে একদম পরে যেতে নেয়। কিন্তু আয়ুশ ধরে ফেলে। নার্স ছুটে এসে মেহরামকে ধরে। ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে এসে পরে। আয়ুশ মেহরামের মাথা টা নিজের কাছে এনে রেখে দিয়েছে। গালে হাল্কাভাবে চড় দিচ্ছে, আবার কখনো হাতের তালুতে ঘষা দিচ্ছে। ডাকছে কিন্তু মেহরামের হুস নেই। চোখে মুখে পানির ছিটা দেওয়া হয়। তার বেশ খানিক সময় পর মেহরামের জ্ঞান ফিরে আসে। ধীরে ধীরে চোখ মেলে তাকায়। তাকিয়েই দেখে মেহরাম আয়ুশের কাছে। মেহরাম মাথায় হাত দিয়ে উঠে বসে।

আয়ুশ;; ঠিক আছো?

মেহরাম;; হুম।

মেহরামের ফট করে মনে পরে তনুর কথা। আর এক মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে উঠে কেবিনের দিকে ছুটে যায়। কিন্তু তনুর বেডের কাছে গিয়ে মেহরামের আর সাহস হয় না পা আগানোর। পা গুলো যেন জমে যাচ্ছে। তার নিজের বোনের লাশ তার চোখের সামনে পরে আছে। ভাবতেই গা কেমন গুলিয়ে আসছে। মেহরামের মনে হচ্ছে সে এই দুনিয়াতে নেই, সে এক ভিন্ন গ্রহে আছে। আর এখানে সবকিছুই মিথ্যা হচ্ছে। যাই হচ্ছে, নিজের সাথে ঘটছে সব কিছুই একটা কল্পনা। হ্যাঁ কিছু কিছু সত্য আছে যেগুলো কল্পনাকেও হার মানায়। বিশ্বাসই হয় না, কিন্তু তবুও সবাই বিশ্বাস করতে বাধ্য। করার কিছুই নেই। মেহরাম তনুর কাছে বসে পরে। হাত দিয়ে তনুর কপালে এসে পরা চুল গুলো সরিয়ে দিলো। তনুর আরো একটু কাছে গিয়ে বসে মেহরাম। কপাল ক্রমশ কুচকে আসছে, ঠোঁট গুলো সমাল তালে কাপছে, চোখের বাধ যেন ভেংে যাচ্ছে। এক লম্বা শ্বাস নিয়ে নাক মুছে ফেলে মেহরাম। হাতের উলটো পাশ দিয়ে নাকের ডগা মুছে কোম রকমে একটু চুপ করে। হাত দিয়ে তনুর মাথায় বুলিয়ে দিতে দিতে বলে ওঠে….

মেহরাম;; ত..তনু, তনু

একদম চিকন ভাবে গলার স্বর বের হচ্ছে তার। আবার খানিক গলা খাকাড়ি দিয়ে ঠিই করে।

মেহরাম;; ততনু, তনু জানিস বাড়িতে না সবাই অনেক অপেক্ষা করছে, তুই ঠিক হয়ে বাড়ি যাবি। সবার কত্তো কথা। আকাশ লাফাচ্ছে তুই কবে বাড়ি যাবি তা শুনে। শোন না এভাবে আর থাকিস না প্লিজ উঠে পর না। আমার তো ভেতরে সব ভেংে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। প্লিজ এভাবে থাকিস না। তনু।

অন্যদিকে তাকিয়ে চোখের পানি গুলো মুছে ফেলে মেহরাম। আবার তনুর হাত ধরে নিয়ে বলে ওঠে…

মেহরাম;; না না এভাবে শুয়ে থাকলে চলবে না। তনু উঠ প্লিজ। আমার কলিজা টা মনে হচ্ছে কেউ ছিটে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। তনু উঠে পরে। ডাক্তার রা আসলে পাগল বুঝলি, ওরা ঠিক ভাবে চেকাপই করে নি। তোর কিছু হবেই না। আমি হতেই দিবো না। আমাকে ছেড়ে তুই কি করে যাবি, কোথায় যাবি।

মেহরাম এবার ফুপিয়ে কেদে দেয়। হেচকি পারতে পারতে বলে ওঠে…

মেহরাম;; তনু উঠ না বোন এভাবে আর শুয়ে থাকিস না। আমি পাগল হয়ে যবো। আমার জিনিসে এখন কে ভাগ বসাবে। আমার চুল ধরে এখন কে টানবে। আমার আচল, এই আয়া আচল ধরে কে টানবে (ওরনা সামনে এনে) তনু প্লিজ উঠ। আমার বোন আমার কলিজা রেএএএ, আমার তনু তনু। তনু উঠ তোর কিছু হয় নি। আমি জানি। আমি জীবন্ত লাশ হয়ে যাবো তনু। আমাকে একা ফেলে যাস না তনু। গেলি আমাকে কেন নিলি না। আমাকে একা ফেলে যাস না তনু।

আয়ুশ এতোক্ষন দরজার পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফালাচ্ছিলো আর মেহরামের কথা গুলো শুনছিলো। মেহরামের এমন পাগলামি দেখে আয়ুশ আরো ভেংে পরেছে। তবে এবার মেহরাম তনুর হাত ধরে ঝাকাচ্ছে। আয়ুশ বুঝলো যে মেহরামকে এখন এখানে রাখলে তার পাগলামো আরো বেড়ে যাবে। আর তার সম্পূর্ণ প্রভাব পড়বে বেবির ওপর। মেহরাম এক প্রকার চিল্লাচ্ছে আয়ুশ সিচুয়েশন খারাপ দেখে দ্রুত মেহরামের কাছে যায়। তাকে সেখান থেকে টেনে তুলে। নার্স র’ হেল্প করছে। মেহরামকে সামলানো অনেক কঠিন হয়ে পরেছে। আয়ুশ মেহরামকে অনেক বুঝাচ্ছে, কিন্তু এখন মেহরাম নিজের মাঝে নেই। সে মানতেই পারছে না যে তনু এখন আর তার সাথে নেই। মেহরামের আবোল তাবোল বকা যেন বাড়ছেই। আয়ুশ খুব কষ্টে মেহরামকে সামাল দেয়। আয়ুশের সাহস হচ্ছে না যে সে বাড়িতে সবাই কে কি করে বলবে। মুখ দিয়ে কোন কথাই বের হচ্ছে না। আয়ুশ কয়েকবার ফোন বের করে কল দেবার জন্য। কিন্তু মনে যেন সাহসই জোড় করতে পারছে না।

আয়ুশ;; তনু নেই, মানে আমি পাগল হয়ে যাব। এতো কিছু আমি আর মেনে নিতে পারছি না। তনু, আমি কি করে বলবো যে তনু নেই। আমি কিভাবে, মেহরামকে কিভাবে সামলাবো। মেহরাম কখনোই ঠিক থাকতে পারবে না।



তনুর লাশ হস্পিটাল থেকে বাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছে। তনুর মা মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। তনুর বাবা বিল্লাল হায় হায় করছে। তনুর বড়ো মা তনুর পায়ের কাছে বসে আছে। বাড়িতে মরণ যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সব যেন যমের দুয়ার বেধে এসেছে। আর যমরাজ যেন এই বাড়ি টা একদম চিহ্ন করে রেখে গিয়েছে। আয়ুশ মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ মুখ কেমন শুকিয়ে গেছে। তার কানে শুধু তনুর কথা গুলো বারি খাচ্ছে “” আয়ুশ এই ড্রেস টা আমায় কেমন লাগবে, আয়ুশ বলোনা আমায় ভালোবাসো, আয়ুশ আমরা কাল ঘুড়তে যাবো আর তুমি কাল আমার পছন্দের পাঞ্জাবি পড়বে কেমন, আয়ুশ জানো মেহেদী পরেছি আমি তো তোমার নাম লিখেছি তবে মেহরামকে দেখে আমার খুব খারাপ লাগছে ওই কার নাম লিখবে””। এগুলো মনে পরতেই আয়ুশ তার চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে। গাল বেয়ে চোখের পানি গুলো পরে যায়। মেহরাম তনুর মাথার কাছ বসে বসে পাগলের মতো প্রলাপ বকছে। সোহেলের সময়ও ঠিক এই ব্যাপার গুলোই হয়েছিলো। আজ ঠিক সেই দিনটি আবার ঘুড়ে ফিরে এসেছে। ইতিহাস যেন আবার চোখের সামনে দৌড়াচ্ছে। শীতল হাওয়া বয়ে যাচ্ছে,। মেহরামকে কেউ টেনেও তনুর কাছ থেকে আনতে পারছে না। এদিকে মেহরামের শরীর দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। সবাই একদম ভেংে পড়েছে। এই মূহুর্তে যে কেউ মেহরামের অবস্থা দেখলে ঠিই থাকতে পারবে না। সকাল ১১ টার দিকে তনুকে বাড়ি আনা হয়েছে। এখন ধীরে ধীরে বিকেল হয়ে এসেছে। জানাযার সময়ও বলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবাই এখন ভয় পাচ্ছে মেহরামকে নিয়ে। না জানি কি করে বসে।





❤️❤️চলবে~

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে