“তিমির” পর্ব ৯

0
700

“তিমির” পর্ব ৯

আমার মাঝে অদ্ভুত এক পরিবর্তন এসেছে। আমি সাধারণত ভালো জিনিসের সংস্পর্শে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। সাবিলাদের সাথেও পারছি না। কিন্তু থাকছি। কেননা আমার বিবেক আমাকে চলে যেতে বললেও মন বলছে এরূপ পরিবারকে দেখার সৌভাগ্য যে-কেউ পায় না। সে উদ্বিগ্নতা নিয়েই আমি এখনও এখানে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পেরেছি।
ধ্রুবের সম্বন্ধে কিছুক্ষণ ভেবেছি। তার কথা কেউই বলেনি। তবে কি সে কাউকে না জানিয়ে এসেছে? এখন ঘরে কেবল আবির স্যার এবং সাবিলাই আছে। আমার হাতের কামড়ানো অংশে আবির স্যার ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছেন। মেয়েদের বাকিরা রান্নার কাজে গিয়েছে। ছেলেরা তাদের ঘরে। বাকি দু’জন সাবিলার বাবা-মা এখানে আশেপাশে কোথায় একটি কুয়ো আছে, ওখানেই গিয়েছে।
সাবিলা এখন অনেকটাই সুস্থ। ওর মাঝে মাংসের ওই ছেঁড়া অংশের ব্যথা অনুভব করার যথেষ্ট ক্ষমতা আছে। ওকে এখন গতবারের মতোই স্লিম দেখাচ্ছে। হয়তো ডানার কারণে মোটা দেখিয়েছিল। আমি তার পাশে বসে আবির স্যারের হাতের দিকে চেয়ে রয়েছি। তার বামহাতে অদ্ভুত এক কালো ব্যান্ড আছে, যেটি দেখতে খানিকটা সুতার মতোই, কিন্তু পুরোপুরি নয়। আমি এটি আগেও দেখেছি, কিন্তু এখন সাবিলার হাতেও একটি দেখায় আগ্রহ বোধ করলাম।
“স্যার? এগুলো কি আপনারা ফ্রেন্ডশিপ ব্যান্ড পরেছেন? বা এই টাইপের কিছু?”
“আমাকে স্যার আর ডেকো না। আমরা কলেজের বাইরেই একে অপরের সাথে অধিক পরিচিত হয়েছি।” তিনি উত্তর দিলেন, “এই তাবিজগুলো সাবরিনা ও আদিলের পক্ষ থেকে গিফট হিসেবে পেয়েছি।”
সাবিলা বিরোধ করল, “এগুলো তাবিজ না। দরবেশ বাবা তো দেননি।”
“তুমিই বলেছিলে।” তার কথায় সাবিলা ভেংচি কাটে।
“আপনি তাদের নাম ধরে ডাকেন?”
“শ্বশুর- শাশুড়ি ডাকব?” তিনি হাসলেন, “ওয়েল, আদিল দেখতে আমার চেয়েও ছোট। আমি কোথায় দেখতে সাতাশ, আর তিনি পঁচিশ মাইনাস। সাবরিনাকে আর কীভাবে সংজ্ঞায়িত করি। তিনি দেখতে আমার সাবিলার মতোই। সাবিলার বিশ চলছে। আর তারাও এসব উদ্ভট পরিস্থিতি দেখে তাদের নাম ধরেই ডাকতে বলেছেন।”
“তাদের আসল বয়স কেমন?”
সাবিলাই বলল, “মায়ের বয়স একান্ন।”
“কি!” বিস্ময়ে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল।
আবির বললেন, “আর আদিলের ছেচল্লিশ। তিনি যখন ডিগ্রি কম্পলিট করেন, তখন তার তেইশ ছিল। সাবরিনার সাথে বিয়ের পর তিনি এখানে চলে এলে চাকরি করতে শুরু করলেন। তিনি বাড়িটি বাঁধলেন। তারপর পাশাপাশি দুই বছরে মাস্টার্স কম্পলিট করেছেন। আরেক বছর পর সাবিলার জন্ম হয়। সে যখন আট বছর, তখন তার মৃত্যু হয়। এর দশ বছর পর, মানে আজ থেকে দুই বছর আগে তিনি সাবরিনার মাধ্যমে জ্বীনের রূপ পান। তো টোটাল ছেচল্লিশ।”
“ওদেরকে আপনাদের চেয়ে ছোট মনে হয়।”
“হ্যাঁ। ওদের ভুবনে সবাই দেখতে একই। ছেলে, বাবা, দাদা সকলেই দেখতে সমবয়সীর ন্যায়। বয়স বাড়লেও তাদের গড়ন আঠারোর পর থেমে যায়। আর এই আঠারো বছরেই ওরা যথেষ্ট ম্যাচিওর হয়ে যায়, শারীরিক কী মানসিক দিক থেকে।”
ধ্রুবের বয়স আসলেই আঠারো? “সাবিলার ক্ষেত্রেও কি তাই?”
“না। সাবিলা উনিশের পর এই এক বছর আর বাড়েনি। হয়তো এখানেই ওর শারীরিক অবস্থা থেমে যাবে। আমি অবশ্য পঞ্চাশ পার করলেও আমার বউ উনিশই থাকবে।” তিনজনই হাসলাম। “বলছিলাম কী, এই ব্যান্ডগুলো পরীদের জগতেরই। এগুলো আগে সাবরিনাদের ছিল। আমাদের কাছে পৌঁছার পর ওরা সর্দারের কাছ থেকে নতুন একজোড়া নেয়।”
“কেন?”
“বন্ডিং-এর জন্য। এগুলো অনেক দূরত্ব থেকেও জুটিদের মাঝে কানেকশন বানিয়ে রাখে।”
“যদি জুটির একজন এখানে, আরেকজন উপরে থাকে, তখনও এমনটা হবে?”
“হ্যাঁ। সবার ব্যান্ড কিন্তু একই না। জোড়া হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন। আমাদের ব্যান্ডে সাবরিনাদের ব্যান্ডের কিছু অংশ আছে, যার কারণে আমরা সাবরিনা আর আদিলের সাথে কানেক্টেড থাকি। প্রয়োজনে তাদের ডাকি। তারা আসে। আবার চলে যায়।”
আমি সাবিলার ব্যান্ডের ওপরের অংশ ছুঁয়ে দেখি। অনেকটাই পিচ্ছিল। অনুভূতিটা কেন যেন পরিচিত। পরক্ষণে আমি ভয়ে হাত সরাই, “ব্যান্ডটা কাঁপছে।”
সাবিলা হাসল, “এতকিছু কীভাবে খেয়াল কর? আমার আবিরও ততটুকু পারে না।”
আবির বলল, “এটা আমার হৃদপিন্ডের কম্পন। ওই যে বললাম, আমরা কানেক্টেড।”
আমি আবিরেরটা ছুঁয়ে দেখি। তার ব্যান্ডও অনুরূপ কাঁপছে। কিন্তু মানুষের হার্টবিটের মতো করে নয়।
আবির বলল, “সাবিলাদের হার্টবিট মানুষের মতো নয়। একটু স্লো। সাবরিনাদের আরও স্লো। যদি সম্ভব হতো, তবে দেখাতাম আমার ব্যান্ডে সাবিলার পাশাপাশি আদিল আর সাবরিনার হৃদস্পন্দনের আওয়াজও আছে।”
“ইন্টারেস্টিং!” ধ্রুবের কাছে তো কোনো ব্যান্ড দেখিনি। তবে এক আঙুলে পিচ্ছিল সুতা পেঁচানো দেখেছিলাম। আর ওখান থেকে আমাকেও এক টুকরো সুতো দিয়েছিল। তার মানে… আমার সাথে সে কানেক্টেড থাকতে চেয়েছিল? “আমি একটি ব্যাপার এখনও বুঝছি না। আবিরের শরীর থেকে এই স্বর্গীয় সুগন্ধটা কেন বেরুয়, যা তোমার কাছ থেকে পাচ্ছি?”
আবির বলল, “আমি অর্ধ হলেও একটি পরীর ভালোবাসা, ওর আত্মারও সঙ্গী। এজন্য আমার কাছ থেকে ওর সুগন্ধটা বেরুয়।”
“ওহ্।”
সাবিলা একহাতে আমার হাত ধরে রইল। আরেক হাতে আবিরের হাত। হাউ সুইট!
“তুমি আজ এখানে থেকে যাও।” সে অনেক ফ্রেন্ডলি। আমার কাছে আসিয়ার কথা মনে পড়ে গেল।
“না সাবিলা। বাবা টেনশন করবেন। আমি ফোন রাখি না।”
এমন সময় দেবদূতগুলো এসে সাবিলা আর আবিরকে জড়িয়ে ধরল, “আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। আমরা তোমাদের মিস করলে চলে আসব।”
অবাক হয়ে আমি এখান থেকে জানালা দিয়ে দেখছি, আধো আঁধারর মুহূর্তেই ঘটে যাওয়া ঘটনাটা। সাবরিনার লম্বা ডানাগুলো দৃশ্যমান হয়েছে। তার পিঠের ওপর আদিল উঠল। সাবরিনা তার হাত দিয়ে আদিলের পাগুলো কোমরের নিচে ধরে রাখে। আদিল হাত দিয়ে সাবরিনার বাহুর উপরের অংশ ধরে রেখেছে। সাবরিনা তাহলে তার ভার সইতে পারছে। সে উঠার পর সাবরিনা ডানাগুলো পুরোপুরিভাবে মেলল। তারপর এক ঝাপটানোয় জানালা অবধি উঠে যায়। আমি দৌড়ে জানালার কাছে গেলাম। ওরা আমার বিস্ময় দেখে হাসল। ওরা আরও উপরে উঠার পর হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেল।
“ওরা গেল কোথায়?”
“ওই জায়গার পর থেকে মানুষ তাদের দেখে ফেলতে পারে। তাই বাকিটা পথ অদৃশ্য হয়ে যায়। অবশ্য তাদের জগতে তারা অদৃশ্যই থাকে, যাতে মাটির কেউ তাদের না দেখে।”
“ওয়াও! ওদের জীবনযাত্রা কতই না ইন্টারেস্টিং!” দেখলাম, সাবিলা তার ডানাগুলোকে আদর করছে, “এগুলোকে কী করে তুমি অদৃশ্য করো?”
“অনেক ইজি। আমাদের শরীর অনেক অনেক হালকা, যার কারণে আমরা অভিকর্ষ বলের বিরুদ্ধে থাকতে পারি, যার কারণে আমরা নিজেকে বাতাসে মিলিয়ে ফেলতে পারি। তখন কেউ আমাদের দেখতে পায় না। আমাদের শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপর মানুষের চেয়ে আমাদের অনেকগুণ বেশি নিয়ন্ত্রণ থাকে, যার কারণে আমরা আলাদাভাবে ডানাকে অদৃশ্য করতে পারি।”
তাহলে ধ্রুব প্রথমদিন আমার দৃষ্টিসীমানার বাইরে যায়নি। সে অদৃশ্যই হয়ে গিয়েছিল। ওহহো, সে তো সত্যই বলছিল, সে আমার পাশ কাটিয়েই গেইট দিয়ে বেরিয়েছে।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

“আদিল নিজে কেন উড়েনি?”
“পরীদের ডানা থাকার কারণেই ওরা এক্সট্রা পাওয়ারফুল। কিন্তু জ্বীনেরা ততটুকু উড়তে পারে না। তাদের কেবল অভিকর্ষ বলের বিপক্ষে থাকার ক্ষমতা আছে। অনুমান করলে তারা বেশি থেকে বেশি এই দু’তলা বাসার ছাদেই লাফ দিয়ে উঠতে পারবে, তাও মাটিতে প্রবলভাবে বল প্রয়োগ করে।” সেই রহস্যময় ছেলেটির অনেক রহস্যই গুছে গেল। কিন্তু কে সে? এদের সাথে তার কেন যোগাযোগ নেই?
আমি সাবিলাদের বিদায় দিতে গেলে সে আরিয়ান স্যারকে আমায় ড্রপ করে দিয়ে আসতে বলেছে। তিনি আমায় তার জিপে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। আমি বাসায় পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে আসি। এসেই যেন হাঁফ ছাড়ি। সত্য বলতে, ওই বাড়িতে আমি আমার জীবনের বিশেষ কিছু মুহূর্ত কাটিয়েছি। কিন্তু সেই জায়গা থেকে আসতে পেরে এতটা ভালোও কেন লাগছে বুঝতে পারছি না।
সবচেয়ে ভিন্ন হলো, আমি এখন শান্তিতে নাক দিয়ে শ্বাস নিচ্ছি। ওদের সেই স্বর্গীয় গন্ধে আমার দম ঘুটে এসেছিল। কিন্তু আমি ওখানে যেতে চাই। আমি সাবিলার মাঝে আমার অমায়িক বোন আসিয়াকে দেখতে পেয়েছি।
আমার মেজাজ অনেক প্রফুল্ল ছিল। তাই বাবা যখন জিজ্ঞেস করলেন, আমি কোথায় গিয়েছি, তখন সুন্দরভাবে উত্তর দেই, আবির স্যারের স্ত্রী অসুস্থ বিধায় তাকে দেখতে গিয়েছি। মজিদ ভাই খাবার পরিবেশন করেছেন। কিন্তু তিনি খাবার অতিরিক্ত ঝাল করতে ভুলে গিয়েছেন। তা দেখেই আমার ভেতরের চিনচিনে রাগটা উবলে উঠতে শুরু করল। আমি খাবারের প্লেটটা টেবিল থেকে ফেলে দেই। মজিদ ভাইকে কিছু করব ভেবে তৎক্ষণাৎ ওই জায়গাটা ত্যাগ করে আমি নিজের ঘরে চলে আসি।
বাবা পেছন থেকে অনেকবার ডেকেছেন। আমি সাড়া দেইনি। বরং তার ডাকটাই আমার অসহনীয় লাগতে শুরু করেছে। আমি দরজা খুলে বেলকনিতে চলে গেলাম। আবারও সেই পরিচিত দুর্গন্ধ আমার নাকের পাশে ভোঁ ভোঁ করতে থাকল। আশ্চর্য হয়ে উপলব্ধি করলাম, এই দুর্গন্ধটা সাবিলাদের সুগন্ধের চেয়ে অনেকটুকু সহনীয়। অন্তত আমার মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হচ্ছে না। আমার শরীরটা অদ্ভুত ঠান্ডা হয়ে থাকলেও আমার ঠান্ডা অনুভূত হচ্ছে না। ঠিক এই সময় আমি বাড়ির সামনে, রাস্তার আগে কী যেন দেখতে পেলাম। সেই পিংক কালার গাউন পরা মেয়েটি, যার কথা ভাবলেও আমি সবধরনের রাগ ভুলে যাই। আসিয়া বায়ুর সাথে মিশে আছে। তাকে ভেদ করে আসা ওর পেছনের রাস্তাটাও আমি দেখতে পাচ্ছি। আমার চোখ ছলছল করতে লাগল। আমি উপর থেকেই চিৎকার করে বললাম, “আসিয়া, আই অ্যাম রিয়েলি সরি।”
সে ভ্রূ কুঁচকিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। আমার তৎক্ষণাৎ দৌড়ে ওর কাছে যেতে ইচ্ছে হলো। কিন্তু গতবারের কথা ভেবে যাচ্ছি না। যদি আমি তাকে কোনো এক অজ্ঞাত ঘৃণায় ধাক্কা দেই। এমন সময় দরজায় কারো বাড়ি দেওয়ার আওয়াজে আমি পেছনে ফিরি। বাবা ডাকছেন। আমি পরোয়া না করে সামনের দিকে তাকিয়ে দেখলাম আসিয়া ওখানে নেই। বাবা আরও জোরে ডাকছেন। আমি ফুঁসে উঠে অগত্যা বেরিয়ে ঘরে গিয়ে দরজা খুলে দেই।
দাঁত চেপে বললাম, “কী হয়েছে?”
“চিৎকার করেছিলি কেন? কোনো সমস্যা হয়েছে কি?”
“তাতে আপনার কী?”
আমি দরজা বেঁধে দেই। আমার উত্তপ্ত মেজাজে পানি পড়ল, একটা চিন্তা মাথায় আসায়। দরজা খোলার পর বাবা নাক কুঁচকিয়েছিলেন, ঠিক যেভাবে আসার সময় গাড়িতে আরিয়ান স্যার করেছিলেন। হয়েছে কী? আমি নিজের ঘ্রাণ নিয়ে দেখলাম। না, খারাপ তো মনে হচ্ছে না।
আমি এসে শুয়ে পড়ি। সাবিলা এখনও অসুস্থ বিধায় আবির দুইদিন কলেজে যাবে না। যদি সত্যিই ধ্রুব তাদের ওপর আজ সারাদিন নজর রেখে থাকে, তবে এটাই নিশ্চিত সে তাদের কাছ থেকে দূরে থাকবে। সে হয়তো কাল কলেজে যাবে। আমি এখন ওর সত্য জানি। ওকে সরাসরি দেখার প্রবল ইচ্ছা জাগছে। যদিও আসিয়ার বিয়োগে ব্যথিত ছিলাম, সাবিলা আমার জীবনে আসায় আমি অনেকটাই নিশ্চিন্ত ফিল করছি। সে বলেছে, আমার যখনই ইচ্ছে হয়, তার কাছে চলে যেতে পারি। আমি কাল কলেজে যাব। সাঈদ আর মৌমিতাকে ফোন করব। পার্টির পর আমি তাদের ভুলেই গিয়েছিলাম।
সকালে ঘুম থেকে খুব স্বাভাবিকভাবেই উঠি। কোনো স্বপ্ন দেখিনি, কোনো দুশ্চিন্তা নেই, কোনো ক্লান্তি নেই। উঠে নাশতা করার পর গোসল সেরে নেই। এরপর সাঈদকে ফোন করি। সে আমাকে কিছু বাড়ির কাজ বুঝিয়ে দিয়েছে। আমি দশটার আগে ওইটুকু সময়ে দুটো ক্লাসের কাজ শেষ করতে পারলাম। মৌমিতাকে ফোন দিয়ে জেনে নেই, সেও কলেজে যাচ্ছে কিনা। সে না গেলে আমি বসব কার পাশে? এরপর ধ্রুবকে ফোন দিয়ে কনফার্ম হয়ে নেই, সেও কলেজে যাবে কিনা। ধ্রুব বলল, “আমি তো তোমাদের বাড়ির সামনের রাস্তা দিয়েই যাই। তোমাকে একেবারে পিক করে নেই?”
আমি রাজি হয়ে কলেজের জন্য বেরুই। বাবা আমাকে দেখে অবাকও হয়েছেন, সেই সাথে কিছুটা খুশিও হয়েছেন। তিনি মজিদ ভাইকে ডেকে গাড়ি বের করতে বললেন। আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠি, “ধ্রুব আমাকে ওদের গাড়ি করে নিয়ে যাবে।”
“ধ্রুব সেই ছেলেটি না যে তোমার খেয়াল রেখেছিল?”
আমি উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। মিনিট কয়েক পর ধ্রুব তাদের গাড়ি করে এলো। ওখানে ড্রাইভারের পাশের সিটে জিসান ভাই বসে রয়েছে। আমি পেছনে ধ্রুবের সাথে বসলাম। ড্রাইভার গাড়ি চালাতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর সে এয়ার ফ্রেশনার চালু করে দেয়। আমার তো কোনো দুর্গন্ধ লাগেনি। ধ্রুব দীর্ঘক্ষণ পর বলল, “আলিয়া, তুমি কি পারফিউম ইউজ কর না?”
“না। আমি ন্যাচারাল থাকতে পছন্দ করি।”
“এতটা ন্যাচারাল থাকাও ভালো নয় যে, ঘামের দুর্গন্ধটার মাধ্যমে আরেকজনকে নাক বন্ধ করতে বাধ্য করবে।” কী?
“ঘাম? এই শীতে আমি ঘামছি না। আর ডাভ সোপ দিয়ে গোসল করে এসেছি।”
চুলের গন্ধও নেই। আমার তো খারাপ কিছু মনে হচ্ছে না। আমরা কলেজে পৌঁছলাম। সাঈদের সাথে দেখা হলো। সে আমাকে কলেজে দেখলে আগে যেভাবে হাত প্রসারিত করে একগাল হাসি নিয়ে ওয়েলকাম করত, আজও সেভাবে করল। কিন্তু যেই ওর পাশে গিয়েছি, ও আমায় অবাক করে দিয়ে বলল,
“আলিয়া, তুমি কি ময়লা-আবর্জনার স্তূপ থেকে উঠে এসেছ?”
“না তো।”
তার ফোলা মুখ দেখে মনে হলো, সে এখনই বমি করে দেবে। আমি তাড়াতাড়ি সরে পড়ি। হচ্ছেটা কী?
আমি রীতিমতো ক্লাস করতে গেলাম। আমার পাশে বসা মৌমিতা বারবার অস্বস্তি ফিল করছে। সে শেষ পর্যায়ে সিট বদল করল। আমি এই কারণে কিছুটা রাগ করে ছুটি শেষে তার সাথে দেখা করি। সাঈদ আর রুমনও ওখানে ছিল। মৌমিতা বলল, “আলিয়া, মাইন্ড করিস না। তোর একটা ভালো থেকে পারফিউম ইউজ করা উচিত। দুর্গন্ধটা…”
“অনেক বাজে।” সাঈদ মন্তব্য করল।
মৌমিতা বলল, “মনে হচ্ছে কে যেন একটা মৃত কুকুর সপ্তাহ খানেক ফেলে রেখেছে।”
“হ্যাঁ, ঠিক তাই। একই ধরনের ভোটকা গন্ধ।”
(চলবে…)
লেখা: ফারিয়া কাউছার