আংটি পর্ব_৪

0
1310

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০

লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব_৪

আজ কলেজে নবীনবরণ অনুষ্টান।সে উপলক্ষে আলোচনা সভা ও বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে টিচার্সদেরও অংশগ্রহণের সুযোগ রয়েছে।আলোচনা সভা শেষে ফুল,ডায়েরি ও কলম দিয়ে নবীনদের বরণ করে নেয়া হলো।তারপর শুরু হলো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।স্টুডেন্টসদের পারফরম্যান্স শেষে টিচার্সদের পালা।টিচার্সদের পক্ষ থেকে কয়েকজন কবিতা আবৃত্তি করলেন।রিমি গান গাইলো।এক ফাঁকে অরণ্য উপমাকে বললোঃ-
-দেখলেন তো।রিমি কি সুন্দর গান গায়!আমি বলেছিলাম না?
-হুম। তাই তো দেখছি।

এরপরই উপমাকে গান গাইতে ডাকা হলো।অরণ্যের অবাক করা দৃষ্টির সামনে দিয়েই উপমা উঠে মঞ্চে চলে গেলো।উপমা এতো সুন্দর গান গায়।এতো মিষ্টি কন্ঠস্বর ওর।এই স্মরটা তো অরণ্যের খুব চেনা।কোথায় যেন শুনেছে সে।কিছুতেই মনে করতে পারছে না।উফ!কিছুতেই মনে পড়ছে না কেন?কেমন একটা অদ্ভুত ভালো লাগায় মনটা ভরে গিয়েছে যেন।চোখ বন্ধ করে আছে অরণ্য।যেন পৃথিবীতে কেউ কোথাও নেই।উপমা গাইছে আর অরণ্য শুনছে।অনন্তকাল কেটে যাক এভাবে।গান শেষে দর্শকদের অগণিত হাততালি আর ওয়ান মোর ওয়ান মোর রিকোয়েস্ট শুনে চোখ খুলে তাকায় অরণ্য।সবার প্রশংসা কুড়িয়ে মঞ্চ থেকে দৃঢ় পায়ে নেমে আসছে উপমা।এসে অরণ্যের পাশের সীটে বসলো।অরণ্যের কেমন লজ্জা লজ্জা করছে।এই মেয়েকে সেদিন বলেছিলো এক্সট্রা কারিকুলামে এক্টিভ থাকলে কি আর পড়াশুনায় ওমন রেজাল্ট করা সম্ভব হতো।তাছাড়া রিমির গানের প্রশংসাও করেছিল খুব।যে মেয়ে নিজেই কোকিল কন্ঠী,তার কাছে বান্ধবীর গানের প্রশংসা করাটা কোন বাহাদুরির কাজ নয়।

-আচ্ছা।আপনি সেদিন বললেন না-তো নিজে এতো ভালো গান করেন।
-এতে বলার কি আছে?
-না বললে মানুষজন জানবে কি করে?
-আজকে যেভাবে জানলেন সেভাবেই জানতো সবাই। তাছাড়া না জানলেও হবে।এটা এমন জরুরী কোন ইস্যু না।
-হাহাহা……আচ্ছা আচ্ছা।

পাশ থেকে উপমা কখন উঠে গিয়েছে খেয়ালই করে নি অরণ্য।গানের অনুষ্ঠান শেষ হয়ে নৃত্যানুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে।নৃত্যশিল্পী হিসেবে উপমাকে স্টেজে নাচতে দেখে অরণ্য খেয়াল করলো ওর পাশের সীটে অন্য কেউ বসে আছে।আজকাল তো ক্লাসিকাল নৃত্য তেমন একটা কেউ করেই না।উপমার নৃত্যের তালে চারদিকে সুনসান নীরবতা। একে তো ওমন রূপ,তার ওপর উপমার নাচে আছে শৈল্পিক ছোঁয়া।সব মিলিয়ে মুগ্ধ দর্শকরা।নাচ শেষে গ্রীন রুমে গিয়ে ড্রেস পাল্টে আবার দর্শক সারিতে এসে বসে উপমা।অরণ্য গলার স্মর নীচু করে বলেঃ-

-আপনার আর কি কি গুণ আছে বলুন তো ম্যাডাম?

-আকাশে চাঁদ উঠলে,বাগানে ফুল ফুটলে তা কি কাউকে বলে দিতে হয়?
এমনিতেই সবাই দেখতে পায়।

-দারুণ বলেছেন।

-ধন্যবাদ।আসুন আমরা পুরো অনুষ্ঠান টা উপভোগ করি এবার।

**************

রুমে ফিরে ফ্রেশ হয়ে বিরিয়ানির প্যাকেটটা খুলে উপমা।কলেজ থেকে দিয়েছে সবাই কে।খেয়ে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেয়।সন্ধ্যায় উঠে চা খেয়ে বাসায় ফোন দেয়।প্রতিদিন নিয়ম করে ওর মায়ের সাথে কথা বলতে হয়।কি খায় না খায় সবকিছু খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেন উপমার মা।

-তুই তো অনেকটা শুকিয়ে গিয়েছিস রে মা।

-না মা।একটুও শুকাই নি।আগেও ৫২ কেজি ছিলাম,এখনো তা আছি।ওয়েট মেশিন কিন্তু তা-ই বলছে।

-কিন্তু চোখমুখ এতো শুকনো লাগছে কেন?

-জানই তো মা আজ কলেজে একটা প্রোগ্রাম ছিলো।তাই হয়তো একটু টায়ার্ড লাগছে।

-দুপুরে কি খেয়েছিস?

-বিরিয়ানির প্যাকেট দিয়েছে কলেজ থেকে।

-রানের পিসটা পেয়েছিলি?

-উফ মা!এতো চিন্তা কেন করছো?রান পাই নি।তবে ভালো একটা পিসই পেয়েছি।কলেজ ক্যান্টিনে রান্না হয়েছিলো।খেয়েছি তৃপ্তি সহকারে।লেবু,সালাদ, ডিম সব ছিলো প্যাকেটে।

-আচ্ছা মা ঠিক আছে।

-বাবাকে বলো আমি পরে কল দেবো।আগামীকালের ক্লাসের জন্য লেকচার শীট রেডী করতে হবে।রাখছি।

উপমার মা উর্মিলা দেবী।সন্তান স্নেহে অন্ধ বলা যায়।কতো সাধনার ধন এই কন্যাটি।উর্মিলা দেবীর সাধনা বিফলে যায় নি।মেয়েকে তিনি সবদিক দিয়ে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলতে পেরেছেন।আজ একা একা এতোদূরে পড়ে আছে।মেয়েটা মুরগির রান খেতে খুব ভালোবাসে।মাছের লেজ ওর প্রিয়।উপমা যাবার পর বাসায় মুরগী এলেও রানগুলি তিনি ফ্রিজে জমিয়ে রেখেছেন।তেমনি বড় মাছের লেজও রাখা আছে।মেয়ে ছুটিতে এলে একসাথে খেতে দেবেন।মায়েরা তো এরকমই হোন।

কলেজ লাইব্রেরীতে উপমার সাথে আবার দেখা হয় অরণ্যের।এতোদিন শুধুমাত্র ওর আংটির প্রতিই অরণ্যের সব আগ্রহ ছিলো।এবার উপমার প্রতিও কিছুটা আকর্ষণ বোধ করছে।আংটি সম্পর্কে জানতেই হবে।সেজন্য আগে উপমার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে হবে।এক্ষুনি স্বপ্নের কথা বলা যাবে না।আর বললেও উপমা কখনোই এটা বিশ্বাস করবে না।বরং ভাববে ওকে আকৃষ্ট করার জন্য অরণ্য বানোয়াট গল্প সাজিয়েছে।

-ম্যাডামের উনি কি করেন?
-কার কথা বলছেন?
-মানে আপনার উড বির কথা বলছিলাম আর কি।
-এখনো ঠিক জানি না কি যে করেন।তবে এইটুকু জানি এখনো বিয়ে করেন নি।
-বাহ!বেশ বললেন তো।উনার নাম বুঝি “B” দিয়ে।
-“A” নাকি “B” তা এখনো ঠিক জানিনা।আসলে ঐটা আমার এনগেজমেন্ট রিং নয়।
-কি বলেন! আমি তো আংটিতে বি লেখা দেখে ভেবেছিলাম আপনার হবু স্বামীর নামের প্রথম অক্ষর বোধহয় বি।
-না,না।এই আংটিটা ছোটবেলা থেকেই আমার হাতে আছে।মা বলেছেন কোন এক সাধু বাবা এটা আমাকে দিয়েছেন।তবে এই বি লেখার মানে বুঝিনি।মা-ও ঠিক জানেন না।
-আপনার টাইটেল তো মুখার্জি।উপমা মুখার্জি।তবে তো টাইটেলে অক্ষরও বি নয়।
তাহলে ঐ সাধু বাবা বোধহয় জানতেন আপনি ভবিষ্যতে এই বনগাঁও কলেজের লেকচারার হবেন।তাই এটা আপনাকে দিয়েছেন।
-হাহাহা…….. এভাবে তো ভেবে দেখি নি।
-মজা করে বললাম।যা-ই হোক,”B” for the best.
-সেটাই।
-আংটি টা খুব আনকমন ডিজাইনের।তবে সুন্দর!হয়তো এটা অনেক পুরাতন ডিজাইন।
-এই আংটির একটা স্পেশালিটি আছে।আংটিটা আমি ছাড়া আর কেউ খুলতে পারে না।আবার এরকম আংটি আর কেউ বানাতেও পারে না।আমার এক বান্ধবী বানাতে চেয়েছিলো।বাট কারিগর অর্ডার নিয়ে আবার দু দিন পর না করে দিয়েছে। একটা মজার ব্যাপার হলো,একদিন ইউনিভার্সিটি থেকে ফেরার পথে কিছু ছিনতাইকারী আমাকে ধরে।ওরা আমার রিকশা আটকে দেয়।মোবাইল,টাকা সব নিয়ে যখন আংটিটা নিতে চায় তখনি ওরা তিনজন একসাথে সেন্সলেস হয়ে যায় আর অনেক মানুষ জড়ো হয়ে ওদেরকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়।আমি আমার সব জিনিস নিয়ে নির্বিঘ্নে বাসায় চলে আসি।
-ভেরি ইন্টারেস্টিং!আমি এখন ক্যান্টিনে যাবো চা খেতে।আপনিও চলুন একসাথে যাই।
-ঠিক আছে চলুন।
চা-টা খেয়ে যে যার ক্লাসে চলে যায়।উপমা মনে মনে ভাবতে থাকে ও তো সবসময়ই স্বল্পভাষী।চট করে কারো সাথে ফ্রি হতে পারে না।অথচ অরণ্য কে কেমন জানি বন্ধু বন্ধু মনে হয়।এতো কথা অরণ্যের সাথে শেয়ার করলো।এমনকি আংটির বিষয়েও কতোকিছু জানালো।আবার একবার বলতেই চা খেতেও চলে আসলো।তবে কি উপমার জীবনে নতুন কিছু হতে চলেছে।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/962952950802091/

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে