আংটি পর্ব_২

0
1320

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
লেখনীতেঃ- অনামিকা ভট্টাচার্য্য

আংটি পর্ব_২

বনগাঁও সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের লেকচারার অরণ্য চ্যাটার্জী।ছোটবেলা থেকেই ইতিহাস,ঐতিহ্যের প্রতি খুব আগ্রহ তার।পুরাতন জমিদার বাড়ি,ভাঙা রাজপ্রাসাদ,প্রসিদ্ধ মন্দির,পুরাকীর্তি এগুলো ওকে খুব টানে।ক্লাস এইটের বৃত্তি পরীক্ষায় অরণ্য ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়ে জেলা পর্যায়ে ফার্স্ট আর সারা বিভাগে মধ্যে ফোর্থ হয়েছিল।স্বভাবতই সবাই ভেবেছিলেন অরণ্য সায়েন্স নিয়ে পড়বে।কারণ কেউ পড়াশুনায় ভালো হলেই আমরা ধরে নেই যে সে হয় ডাক্তার নয়তো ইঞ্জিনিয়ার হবে।অথচ রবি ঠাকুর, নজরুল ইসলাম,জয়নুল আবেদিন ওদের কারোরই যে সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড ছিলো না এটা কারোরই মনে থাকে না।

যা-ই হোক,অরণ্য নাইনে উঠে মানবিক শাখায় ভর্তি হওয়াতে সবাই খুবই অবাক হয়েছিলেন।অনেকেই উপযাচক হয়ে অনেককিছু বুঝালেন।কিন্তু কারো কথায়ই কোন কাজ হয় নি।অরণ্যের এক কথা।হয় মানবিকে পড়বে,নয়তো পড়াশুনা ছেড়ে দেবে।একমাত্র ছেলের জিদের কাছে বাবা-মা হেরে যান।তারপর ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ইতিহাস বিষয়ে অনার্স-মাস্টার্স কমপ্লিট করে বিসিএস পাস করে এই বনগাঁও সরকারি কলেজে লেকচারার হিসেবে পাঁচ বছর ধরে কর্মরত আছে।

আজ এই কলেজে সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত নতুন একজন লেকচারার এসে জয়েন করবেন।সেটা নিয়ে সবাই খুব বিজি।যদিও এটা বাংলা ডিপার্টমেন্টের বিষয়,তবু নতুনকে নিয়ে সবারই আগ্রহ আছে।তার ওপর প্রথমবারেই বিসিএসে ঠিকে যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়।তাই নতুন অতিথি কে দেখার জন্য সবাই অপেক্ষায় আছেন।

সকাল দশটায় উপমা এসে কলেজে পৌঁছায়।পরনে নীল জামদানি শাড়ী।থ্রী কোয়ার্টার ডিজাইন করা ব্লাউজ।চুলে লম্বা বেনী করা।কপালে ছোট্ট একটা কালো টিপ।ঠোঁটে হালকা গোলাপি লিপস্টিক। ম্যাচিং কানের দুল।সবমিলিয়ে উপমাকে আজ অন্যরকম লাগছে।বাংলা বিভাগের স্টুডেন্টরা ওকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়।প্রথম দিন হওয়ায় একটু নার্ভাস লাগছিলো উপমার।কিন্তু সবার আন্তরিকতা দেখে মুগ্ধ উপমা।স্টুডেন্টদের জন্য চকলেট নিয়ে এসেছিল উপমা।এক এক কার্টুন করে এক এক ইয়ারে পিয়নকে দিয়ে পাঠিয়ে দেয়া হলো।নতুন ম্যাডামকে দেখে তো ছাত্র-ছাত্রীরা ফিদা হয়ে যায়।এতো সুন্দরী ম্যাডাম!কি মিষ্টি হাসি।সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছাত্রটাও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলো এই ম্যাডামের ক্লাস কিছুতেই মিস করবে না।ছাত্রীদের মধ্যে ম্যাডামের শাড়ী,স্টাইলিশ ব্লাউজ,ম্যাচিং কানের দুল এগুলো নিয়ে আলোচনা শুরু হলো।সবচেয়ে অবাক হলো ম্যাডামের ফাঁকা সীঁথি দেখে।তবে ম্যাডামের সাহস আছে বলা যায়।নইলে এতোদূরে একা একা চলে আসেন।

নিজ বিভাগে পরিচয় পর্ব শেষ হবার পর প্রিন্সিপাল স্যার নিজে উপমাকে নিয়ে গিয়ে সব ডিপার্টমেন্টের টিচার্সদের সাথে আলাপ করিয়ে দিলেন।সবার সাথে পরিচিত হয়ে ভালো লাগলো উপমার।অনেক সিনিয়র জুনিয়র কলিগরা আছেন।যদিও প্রতিটা ডিপার্টমেন্টেই স্যারদের সংখ্যাই বেশী,তবু ম্যাডামরাও একেবারে কম নয় সংখ্যায়।সবশেষে আসলেন ইতিহাস বিভাগে।একে একে সবার সাথে পরিচয় শেষে এবার অরণ্যের পালা। অরণ্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবার পর উপমা নমস্কার জানালো।ঠিক তখনি অরণ্যের মাথাটা ঘুরে গেলো।কোনমতে নমস্কারের প্রতিউত্তর দিয়ে ক্লাস আছে বলে সেখান থেকে পালিয়ে গেলো অরণ্য।ব্লু চেক-শার্ট আর কালো ফরমাল প্যান্ট পরা অরণ্যর আচরণ বেশ অদ্ভুত লাগলো উপমার কাছে।

ক্লাসে সর্বদা মনোযোগী অরণ্য স্যারকে আজ বেশ উদাসীন দেখাচ্ছে।যেটা ছাত্রদের চোখে পড়েছে।আসলে ক্লাসের মাঝেও উপমার কথা মনে হতে লাগলো অরণ্যর।উপমা বলতে উপমার হাতের ঐ আংটিটার কথাই ভাবতে লাগলো অরণ্য।এটা কি করে সম্ভব।ঐ আংটিটা দেখেই মাথা ঘুরে যায় অরণ্যের।অরণ্য ছোটবেলা থেকে প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখে।একটা ছেলে একটা মেয়েকে আংটি পরিয়ে দিচ্ছে।এই একই স্বপ্ন সে বার বার দেখে।মাকে বলার পর মা বলেছে স্বপ্নের কোন ব্যাখ্যা হয় না।বড় হবার পর বন্ধুদের সাথেও বিষয়টা শেয়ার করেছে।বন্ধুরা ঠাট্টা করে বলেছে ও নাকি মনে মনে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে আছে।তাই এমন স্বপ্ন দেখে।অথচ এই কথাটা একদম ঠিক নয়।বিয়ে শাদী নিয়ে অরণ্যের মাঝে কোন ফ্যান্টাসি নেই।বিয়ে দূরে থাক, আজ পর্যন্ত একটা প্রেমও করে নি অরণ্য।অথচ স্বপ্নে দেখা সেই আংটিটাই আজ উপমার হাতে দেখলো অরণ্য।স্বপ্ন সত্যি হলো কি করে!কিন্তু পুরোটা তো সত্যি হয় নি।কিছুটা গড়মিল রয়েছে।এই রহস্যটা যেভাবেই হোক ভেদ করতে হবে অরণ্যকে।মাথায় কেমন একটা যন্ত্রণা হচ্ছে।না,আজ আর ক্লাস নিতে পারবে না অরণ্য।

কয়েকদিন পরের ঘটনা।কলেজ লাইব্রেরীতে বসে বই পড়ছে উপমা।ওকে দেখেই এগিয়ে আসছে অরণ্য।এই তো উপমার বাঁ হাতের অনামিকায় বসানো আছে সেই আংটিটা।এই আংটি অরণ্যের খুব চেনা।স্বপ্নে দেখেছে একটা ছেলে একটা মেয়েকে এই আংটিটা পরিয়ে দিচ্ছে।কিন্তু ছেলে-মেয়ের চেহারা কখনোই স্বপ্নে দেখে নি অরণ্য।শুধু হাত দুটোই দেখেছে।স্বপ্নে দেখা সেই হাতের সাথে উপমার হাতের কোন মিল নেই।সেই দুইখানি হাত হলো শ্যামলা রঙের অতি সাধারণ হাত।আর উপমার হাত হচ্ছে টকটকে ফর্সা।খয়েরী রঙের নেইলপালিশ আঙুলের শোভাবর্ধন করেছে।অবিকল সেই আংটি।কি বলবে না বলবে মনে মনে ঠিক করে নিলো অরণ্য।যদিও অরণ্য খুব মিশুকে স্বভাবের ছেলে।যে কারো সাথে সহজেই বন্ধুত্ব করে নিতে পটু সে।তবু আজ কেমন জানি একটু একটু টেনশন হচ্ছে।তবু মনে সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে গেলো উপমার দিকে।অরণ্য মুখোমুখি চেয়ারে বসে বললোঃ-

-যা-ই হোক,আমার মতো আর একজন তো পেলাম যে কিনা এতো ব্রিলিয়ান্ট রেজাল্ট নিয়েও আর্টসে পড়াশুনা করেছেন।

-হাহাহা…….আমি আসলে ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যানুরাগী।আপনি যেমন অতীতকে ভালোবেসে ইতিহাসকে সঙ্গী করে নিয়েছেন,আমার ক্ষেত্রেও তা-ই।
-আমার খবর কি করে জানলেন?

-আমাদের বিভাগের রিমি ম্যাডাম বলছিলেন সেদিন।উনি তো আপনার ক্লাসমেট।

-ও হ্যাঁ।রিমি কি বললো?আমার রেকর্ডস ভেঙে যাওয়ার কথা?

উপমা প্রত্যুত্তরে কিছু না বলে মিষ্টি করে হাসলো শুধু।

-আসলে কি জানেন তো ম্যাডাম।এতোদিন পর্যন্ত সকল টিচার্সদের মধ্যে আমার একাডেমিক রেজাল্ট ছিলো সবার ওপরে।আপনি সেই রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন।রিমি তো সবসময়ই বলে,রেজাল্ট নিয়ে এতো লাফালাফি করিস না।দিনরাত পড়ার টেবিলে মুখ গুজে বসে থাকলে ওমন রেজাল্ট সবাই করতে পারে।পড়াশুনা ছাড়া তো আর কোন কর্মই পারিস না।আমাদের মতো মাল্টি ট্যালেন্ট হলে বুঝতি।আপনিই বলুন, অন্যদিকে মন দিলে পড়াশুনায় বিঘ্ন ঘটতো না?এমন রেকর্ডস মার্কস পাওয়া কি সম্ভব হতো?আপনি এসবের মর্ম বুঝবেন।ও হ্যাঁ,রিমি কিন্তু খুব ভালো গান গায়।সামনেই তো নবীনবরণ অনুষ্ঠান আছে।তখন শুনতে পাবেন।
-ওহ,আচ্ছা।এখন আমার একটা ক্লাস আছে।উঠছি তবে।বলেই দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেলো উপমা।

অরণ্য বসে বসে ভাবছে।যাক,বাবা!আসল কথাই তো জানা হলো না।আংটির ব্যাপারে কথা বলার জন্যই তো এতোক্ষণ কথা বললো।থাক।সমস্যা নেই। একই কলেজে যখন আছে,অারো অনেকবারই তো দেখা হবে।অন্য কোনদিন জেনে নেয়া যাবে।

#চলবে

#পরবর্তী_পর্ব

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/962498257514227/

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে