বাড়ি প্রচ্ছদ পৃষ্ঠা 1683



ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ১৪

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ১৪
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

আদিবা আপু চলে যাওয়ার পরই নীলিমা চেঞ্জ করার জন্য বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। জামা নিয়ে ওয়াশরুমে যাওয়ার আগে একবার ফোনের দিকে তাকায়। ফোনের স্ক্রিনে দেখে নেয় নিজেকে। ফোনটা হাত থেকে রাখার আগে কি মনে করে যেন আবারো স্ক্রিনের দিকে তাকায়। আচমকা মোবাইলের তারিখ’টা দেখে উল্লাসে নেচে উঠে নীলিমা।
” আজ আমাদের ৯ম বিবাহবার্ষিকী?”
মনে পড়ে নীলিমার, আদিবা আপুর সাথে ঐদিন হসপিটালে দেখা হয়। আবিরের সাথে সব ঠিকঠাক মত চলছে কি না সেসব কথার’ই একপর্যায়ে আবিরের বোন আদিবা ওর থেকে বিয়ের তারিখ’টা জেনে নিয়েছিল।

তারমানে ওনি আজ হুট করে আমার বাসায় আসেননি। ওনি জেনে শুনেই এসে আমায় সাজিয়েছেন।

নীলিমা ওয়াশরুম থেকে ওর জামাগুলো নিয়ে আসে। ওর ইচ্ছে আবির আসলে ওকে এ সাজে দেখিয়ে তবেই চেঞ্জ করবে।
” আচ্ছা! বুড়ো এসে আজকেও কি আমায় বকবে নাকি এ সাজে দেখে চমকে যাবে! বুড়ো কি আগের মতই আমার দিকে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকবে নাকি মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে পরবে? আচ্ছা, আগের মত ও আজকেও কি আমার জন্য প্রিয় বেলী ফুল আর একটা কবিতার বই নিয়ে আসবে? ও কি আজও আমায় পূর্বের ন্যায় হাতে লাল রেশমী চুড়ি পরিয়ে দিবে?

ভাবতে ভাবতেই ফোনটা বেজে উঠে নীলিমার। মুখে হাসির রেখা নিয়েই ফোনের দিকে ফিরে তাকায়। কি ব্যাপার? আদিবা আপু’তো কেবল গেলেন। ওনি কেন কল দিলেন?
কল রিসিভ করে নীলিমা।
— আসসালামু আলাইকুম, আপু!(নীলিমা)

—– ওয়ালাইকুম আসসালাম। কি ব্যাপার? খুব খুশি খুশি লাগছে যে? ঘটনা কি?(আদিবা)

—– ধূর, আপু! কি যে বলেন না…(নীলিমা)

— আচ্ছা, আচ্ছা! লজ্জা পেতে হবে না। এখন বলো বুড়ো ফিরছে কি না।(আদিবা)

—- আপু, তুমিও???(নীলিমা)

— তুমিও’ই তো প্রতিদিন নালিশ করো বুড়ো এটা করছে, বুড়ো ঐটা করছে। প্রতিদিন বুড়ো বুড়ো শুনতে শুনতে আমার যে মুখস্ত হয়ে গেছে। যায় হোক! আর বলব না। এখন বলো, ও পার্টি থেকে ফিরেছে কি না?!!!(আদিবা)

—– এখনো ফিরেনি। বলে গেছে তো ফিরতে রাত হবে।(নীলিমা)

—– আচ্ছা, বুঝলাম। শুনো…
যে কথাটি বলার জন্য ফোন করেছি। আজ কিন্তু বুড়ো ফিরলে বুড়োকে সব খুলে বলবে। দু’বছর আগে কি কারণে চলে গিয়েছিলা আর তার সত্যতা কতটুকু, সব, সব তোমায় আজকে জানাতে হবে, জানতে হবে। আমাদের কথা তো শুনতে চাও না, আবিরের মুখ থেকেই না হয় শুনে নিও ডায়েরীর গোপন রহস্য। ঠিক আছে এখন রাখছি। ভালো থেকো।(আদিবা)

—- আপু শুনেন… (নীলিমা)

—– হ্যা, বলো…(আদিবা)

—— ও শুধু আমার বুড়ো। …(নীলিমা)

—– হা, হা, স্যরি। মনে হয় কথার মধ্যে দু’একবার বুড়ো ডেকে ফেলেছি। ওকে, শুভ রাত্রি। (আদিবা)

আদিবা কল রাখলে নীলিমা একটা বড়সড় নিশ্বাস ফেলে।
” নাহ! আর নয়। অনেক কষ্ট দিয়েছি, পেয়েছি। আর নয় কষ্ট। আজ’ই সব খুলে বলতে হবে বুড়োকে। জানাতে হবে আসল কথা, জানতে হবে তার সত্যতা।”
ফোনটা হাত থেকে রেখে নীলিমা মনে মনে কথাগুলো সাজাচ্ছে। ওর বুড়োর কাছে কথাগুলো ঠিক কিভাবে উপস্থাপন করবে।
সোফায় শুয়ে আনমনে কথাগুলো সাজাচ্ছিল নীলিমা। একটা সময় চোখে তন্দ্রাভাব চলে আসে। দরজা আংশিক মেশানো শুধু।

নীলিমার চোখটা যখন প্রায় লেগে আসে, তখন’ই রুমে আবিরের আগমন। রুমে এসেই আবির বিছানা ফাঁকা পেয়ে এদিকে ওদিক কাকে যেন খুঁজতে থাকে । হঠাৎ’ই সোফায় চোখ যায়। আবির চোখ বড় বড় করে সোফায় শুয়ে থাকা নীলিমার দিকে তাকায়। মনে হচ্ছে কোনো স্বর্গের অপ্সরী, সবুজ পরী ভুল করে স্বর্গ থেকে ধরার বুকে নেমে এসেছেন। একটু একটু করে আবির সোফায় শুয়ে থাকা ঘুমন্ত পরীটির দিকে এগিয়ে যায়।
” একি! আমার রুমে পরী আসলো কোথায় থেকে?”
চোখ দুটো কচলে ভালো করে আবির আবারো ঘুমন্ত মেয়েটির দিকে তাকায়।
” পরী’ই তো!”
এদিকে রুমেও কেমন মাতাল করা ফুলের ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। এমনিতেই পার্টিতে বন্ধুরা কি যেন কি খাইয়ে দিয়েছে জোর করে, তারপর থেকে মাথাটা ঝিম ঝিম করছে। এখন রুমে এসে দেখল পরী শুয়ে আছে। সবকিছু’ই আবিরের কাছে কেমন যেন রঙিন মনে হচ্ছে।
” আচ্ছা, এগুলো স্বপ্ন নয়তো? আমি কোনো ঘোরের মধ্যে আছি না’তো?”
আবির ঘুমন্ত নীলিমার সোফার পাশে হাটুঘেরে বসে পরে। একটা হাত আবির ওর ভাবনার পরী মানে নীলিমার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। আঙুল দিয়ে আবির ঘুমন্ত নীলিমার ঠোঁট ছুঁয়ে দেয়। নীলিমা কেঁপে উঠে। এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি কিছুই বুঝতে পারছে না আবির। ঘোরের মধ্যেই আবির যখন ওর মুখটা নীলিমার ঠোঁটের খুব কাছে নিয়ে যায়, তখনি জেগে উঠে নীলিমা। চোখ বড় বড় করে আবিরের দিকে তাকায়। আবিরকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে সোফা থেকে উঠে পরে। কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, আপনি ফ্রেশ হয়ে আসুন, আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি। নীলিমা দৌঁড়ে কিচেনে চলে যায়। আবিরও নীলিমার পিছু নেয়। পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে নীলিমাকে। একহাতে নীলিমার খোপা খুলে দেয়, নাক ডুবিয়ে দেয় চুলের গভীরে। আচমকা আবিরের এমন আচরণে রীতিমত কাঁপতে থাকে নীলিমা।
অনেক কষ্টে আবিরের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
” খাবার দিচ্ছি, খেয়ে নিন!”
তাড়াহুড়ো করে খাবারগুলো দিয়ে দৌঁড়ে স্টাডিরুমে চলে যায়। হাতমোজা পরে ঘুমিয়ে পরার প্রস্তুতি নেয়। দরজাটা বন্ধ করার জন্য ধরতেই দরজা ঠেলে রুমে প্রবেশ করে আবির। আবিরের চোখের দিকে একবার তাকিয়ে ভয়ে বুকস্লেফের বইয়ের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দেয় নীলিমা। আবির সামনে গিয়ে একহাত দেয়ালে ঠেকিয়ে নীলিমার পথ আগলে দাঁড়ায়। মাথার ছোট্ট চুলগুলো এলোমেলো ভাবে নীলিমার চোখে মুখে এসে পরছে। কাছে গিয়ে আবির সেই চুলগুলোতে ফুঁ দেয়। একটা বাজে স্মেইল নীলিমার নাকে প্রবেশ করে। চোখ বড় বড় তাকায় নীলিমা। রেগে প্রশ্ন করে__
” আপনি ড্রিংক করেছেন?”
মাথা চুলকায় আবির। না মানে সবুজপরীকে দেখে নেশা ধরে গেছে। একধাক্কায় আবিরকে ওর পথ থেকে সরিয়ে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
” আপনি এখানেই দাঁড়ান। আমি নেশা কাটানোর ব্যবস্থা করছি এখনি।”
নীলিমা ফ্রিজ থেকে তেঁতুলেরটক নিয়ে আসে। আবিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
” নিন! এগুলো খান। নেশা কেটে যাবে।”
আবির তেঁতুলের বয়ামটা ড্রেসিংটেবিলের উপর রেখে এগিয়ে যায় নীলিমার দিকে।
” আমি তেঁতুল খাবো না, তোমাকে খাবো।”

ঘাবড়ে যায় নীলিমা, কিসব উল্টাপাল্টা কথা বলছেন? মানুষকে আবার মানুষ খেতে পারে নাকি? আর এদিকে আসছেন কেন এভাবে?”
আবির একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে, সব’ই যায়। কাছে আসছি তো সেটাই বুঝানোর জন্য। আবির নীলিমার কাছে চলে আসে। নীলিমা আলতো করে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে। আবির নীলিমার এলোমেলো চুলগুলো কানের পাশে গুজে দিয়ে ঘাড়ের মধ্যে আলতো করে উষ্ণ ভালোবাসার রেখা টেনে দেয়। পরম সুখে কেঁপে উঠে নীলিমা। চোখ মেলে তাকায়। কাঁপা কন্ঠে বলে, আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে। প্লিজ আগে আমার কথাগুলো শুনে নিন। আবির মুখে কিছুই বলল না। নীলিমার হাত ধরে নীলিমাকে বিছানায় শুইয়ে দিল। কপালে আর ঠোঁটে কিস করল। নীলিমার বুকে মাথা রেখে কিছুক্ষণ শুয়েও থাকল। তারপর নীলিমার একচোখে কিস দিয়ে আরেক চোখে দেওয়ার জন্য এগিয়ে যেতেই বিছানা থেকে উঠে বসে নীলিমা।
খাট থেকে সোজা বারান্দায় চলে যায়। আবিরও নীলিমার পিছু নেই। মাতাল আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও স্বাভাবিক গলায় বলে উঠে নীলিমা,
” প্লিজ আপনি আমায় একটু সময় দিন। আমার কথাটা শুনার চেষ্টা করুন। কথাগুলো বলা খুব জরুরী। আপনি কথাগুলো আগে শুনে নিন, তারপর না হয়…..(…..)…..???”

পুরো কথা বলতে পারেনি নীলিমা। তার আগেই আবিরের ঠোঁট দুটো নীলিমার নরম ঠোঁট দুটোকে তার ভিতরে নিয়ে গেল। হাত দিয়ে আবির নীলিমার মাথার পিছনের দিকটা শক্ত করে চেপে ধরে। তারপর সজোরে আবির ওর ঠোঁট নীলিমার ঠোঁটের উপর চেপে ধরল।
নীলিমা প্রথমে কাঠের পুতুলের মত দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর একসময় সেও খামচে ধরল আবিরের দুই কাধ। হাত বাড়িয়ে নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল আবিরকে।

কিছুক্ষণ পর আবির নীলিমাকে ছেড়ে দিয়ে দ্রুত ওর রুমে চলে গেল। নীলিমা কিছুক্ষণ সে স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। ভাবল, আজ’ই আবিরকে সব কথা খুলে বলতে হবে। আবিরের রুমে গিয়ে তাই চুপ করে বিছানায় শুয়ে পরল। চোখ দুটো বন্ধ করে নীলিমা যখন বড় বড় নিশ্বাস ফেলছে, আবির তখন’ই চুপটি করে বিছানায় এসে বসে। কিছু বলার জন্য চোখ মেলে তাকাতেই ভড়কে যায় নীলিমা।
শার্টের বোতাম গুলো একটা একটা করে খুলে ফেলছে আবির। চোখ বড় বড় করে ফেলে নীলিমা, একটা দুষ্টু হাসি দেয় আবির। ভয়ে ঢোক গিলে নীলিমা বলে,
” আপনি আমার কথাটা শুনোন…..”
জবাব আসে, আজ আমি তোমাকে শিখাবো ভালোবাসার এক নতুন অধ্যায়। সো, কোনো কথা হবে না।

লাইটটা অফ করে ড্রিম লাইটটা জ্বেলে দেয় আবির। অতঃপর……..

সকালে স্টাডি রুমে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে তোয়ালে দিয়ে ভেঁজা চুলগুলো মুছছিল আর মিটিমিটি হাসছিল নীলিমা। তখনি ঘুম ভাঙে আবিরের। শরীরটা টানা দিয়ে উঠে বসতেই চমকে যায় আবির। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে বলে__
” একি! আমার এ অবস্থা কেন?”
আবির ওর বুকে লিপস্টিকের লাল দাগ দেখে ভড়কে যায়। রাত্রে ঠিক কি হয়েছিল বুঝার চেষ্টা করে। অনেক কষ্টে পার্টিতে ড্রিংক করার কথা মনে পড়ে আবিরের। তার বেশী মনে করতে পারে না। তবে কি নীলিমা….(…..)….???
বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় আবির। ততক্ষণে নীলিমা আবিরের জন্য চা বসিয়েছে। ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে আবির নীলিমার জিনিসপত্র আলমারি থেকে বের করে ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলে। চা হাতে নীলিমা রুমে প্রবেশ করে আবিরের এই অবস্থা দেখে ভয়ে কেঁপে উঠে, তবে প্রকাশ করেনি।
” কিছু খুঁজছেন?”
রাগান্বিত দৃষ্টিতে আবির নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমার হাতের চা’য়ের কাপটা আবিরের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে,
” এই নিন! চা খেয়ে মাথা ঠান্ডা করে বলুন কি চায় আপনার? আমি খুঁজে দিচ্ছি।”
চায়ের কাপটা টেবিল থেকে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেয় আবির। রাগে রীতিমতো কাঁপা শুরু করছে সে। কাঁপতে কাঁপতেই বলে,
” বা হাতে আপনি আমাকে খাবার দিন। ডান হাতে কি হয়েছে আপনার? পঁচন ধরেছে?”
কাঁপা কন্ঠে নীলিমার জবাব, কি হয়েছে আপনার? এভাবে কথা বলছেন কেন?
উত্তর দেয় আবির, আপনি এখনি আমার বাসা থেকে বের হয়ে যাবেন। আমি আপনাকে আর সহ্য করতে পারছি না।
আবারো প্রশ্ন করে নীলিমা, আমার অপরাধ কি? কি করেছি আমি? সেটা বলুন…..
রক্তচক্ষু নিয়ে আবির নীলিমার দিকে তাকায়, আপনি জানেন না কি করেছেন? নাকি স্বীকার করতে চাচ্ছেন না? হা, হা! যে অধিকার এতদিন আমি নিজ থেকে দেইনি, সেই অধিকার কালকে আপনি জোর করে আদায় করে নিলেন, তাই না। লজ্জা করেনি আপনার, একজন অচেতন মানুষের সাথে এরকম কু-কীর্তি করতে?
জবাব দেয় নীলিমা, কু-কীর্তি??? পাশে থেকে ব্যাঙ্গাত্বক উক্তি ছুঁড়ে দেয় আবির।
” নাহ! আপনি কু-কীর্তি করেননি, সু-কীর্তি করেছেন।”

আপনি ভুল বুঝছেন আমায়। আপনি আমার কথাটা শুনোন….
থামিয়ে দেয় আবির। চুপ। একদম চুপ। আমি আপনার কোনো কথায় শুনতে চাচ্ছি না। দয়া করে, আজকে এই মুহূর্তে এ বাসা খালি করেন। বিদায় হোন সামনে থেকে। চোখের জল লুকিয়ে ভাঙা কাপের টুকরোগুলো কুড়িয়ে বাইরে চলে যায় নীলিমা। বেশ কিছুক্ষণ পর রুমে ফিরে নীলিমা। আবির তখন সোফায় মাথায় হাত দিয়ে শুয়েছিল। সোজা কিচেনে ঢুকে নীলিমা। চুলায় ভাত বসিয়ে তরকারী কুটতে থাকে। চোখের পানিতে ওড়না ভিঁজে একাকার নীলিমার। রান্না শেষে গরম গরম খাবার টেবিলে এনে রেখে ডাক দেয় আবিরকে। খাবারের কথা বলতেই গর্জে উঠে আবির। লজ্জা করে না আপনার? এত কথা শুনার পরও এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন? এত বেহায়া কেন আপনি?
রুমে ঢুকছিল সাইমা। ওদের মধ্যকার কথা বার্তা শুনে দরজা থেকেই বিদায় নিচ্ছিল সে। ডাক দেয় আবির-
” কিরে বাইরে দাঁড়িয়ে কেন? ভিতরে আয়।”
সাইমা ভিতরে ঢুকে। মাথা নিচু করে জবাব দেয়, পায়েস রান্না করছিলাম। ভাবছিলাম তোকে দেই…..
বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় আবির। হাসি মুখে বলে, তো আমাকে না খাইয়েই চলে যাচ্ছিস যে? দে। খাইয়ে দে।
সোফার পাশে মাথা নিচু করে বসে সাইমা। আবিরের জুড়াজুড়িতে বাধ্য হয়ে আবিরের মুখে পায়েস তুলে দিচ্ছে। আবিরও ফাঁকে ফাঁকে সাইমাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে।
আমার রান্না করা খাবার অনাদরে পরে আছে আর ঐ শয়তান মেয়ের খাবার খাচ্ছে? রাগে ফুসে উঠে নীলিমা। টেবিলে রাখা পায়েসের বাটি যেখান থেকে দুজনে খাচ্ছে সেই বাটি হাতে নিয়ে ফ্লোরের মধ্যে ছুঁড়ে মারে নীলিমা। আবির সাইমা দুজনেই বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়।
আবিরকে জড়িয়ে অকথ্য ভাষায় নীলিমা সাইমাকে গালাগাল করতে থাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় আবির ঠাস ঠাস শব্দে ৪,৫টা থাপ্পর বসিয়ে দেয় নীলিমার গালে।
থাপ্পর খেয়েও উন্মাদের মত নীলিমা সাইমাকে গালিগালাজ করে যাচ্ছে। এবার মুখ খুলে আবির__
” আপনার উপরটা, বাইরের চেহারাটা যতটা কালো তার থেকে অধিক কালো, অধিক অপরিষ্কার আপনার ভিতরটা। আজ যাকে আপনি বাজে ভাষায় গালিগালাজ করছেন তার নখেরও যোগ্য নন আপনি। আপনি আমার স্ত্রী হবার যোগ্য নন। আমার স্ত্রী হবার যোগ্যতা যদি কেউ রাখে সে সাইমার মত কোনো মেয়ে। যার মনটা আপনার মত নিচু নয়, আকাশের মত উদার।”
………………………………..
আপনি এখনো এখানে দাঁড়িয়ে আছেন? যান। এই মুহূর্তে এই বাসা থেকে বেরিয়ে যান। নীলিমা দৌঁড়ে স্টাডিরুমে গিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।

আবিরের দিকে ফিরে তাকায় সাইমা।
নিচু স্বরে বলে, ও তোমায় বড্ড বেশী ভালোবাসে ভাইয়া। আজ খুব বেশী বলে ফেলেছ। এর জন্য প্রস্তাতে হবে তোমার। সাইমা চলে যায়।

ঘন্টা খানেক পর রুমে ঢুকে নীলিমা। সোফায় মাথায় হাত দিয়ে আবির যে পাশটাই বসে ছিল, তার ঠিক পাশেই আবিরের মুখোমুখী বসে নীলিমা। ফিরে তাকায় আবির। কিছু বলার আগেই মুখ খুলে নীলিমা। আমি চলে যাচ্ছি। আমার জন্য তো আর কারো জীবন থেমে থাকবে না, থাকতে পারে না। হাতের সাদা কাগজটা টেবিলের উপর রাখে নীলিমা। বা হাতে একটা কলম নেয়। তারপর কাঁপা কাঁপা হাতে সাদা কাগজের মাঝখানে বড় অক্ষরে লিখে, নীলিমা।
লিখা শেষে কাগজটা আবিরের দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলে,
” এই নিন! ২য় বিয়ে বা ডিভোর্সের সময় প্রথম বউ হিসেবে সাদা কাগজের এই সাক্ষর’টা কাজে লাগবে।”

প্রতিউত্তরে কিচ্ছু বলেনি আবির। শুধু কৌতূহলের দৃষ্টিতে নীলিমার মোজা পরিহিত ডান হাতের দিকে তাকায়। নজর এড়ায় না নীলিমার। শেষ বেলায় আবিরের কৌতূহলটা মিটিয়ে দেয়ার জন্য নীলিমা ওর হাত থেকে মোজাটা খুলে কাটা হাতটা আবিরের চোখের সামনে মেলে ধরে। আবিরের চোখ মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে নীলিমার হাতটা দেখে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। উত্তেজিত হয়ে নীলিমার চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল আবির তার আগেই ভেঁজা চোখে জবাব দেয় নীলিমা,

” ভালোবাসার অপরাধে আঙুলটা কেটে নেয়া হয়েছে…..”

চলবে….

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ১৩

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ১৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

সাইমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে নীলিমা আবিরের দিকে ফিরে তাকায়। আবির তখনও হা করে দাঁড়িয়ে বিষয়টা কি হয়েছে বুঝার চেষ্টা করছে।
এদিকে নীলিমা?!!!
রাগান্বিত দৃষ্টিতেই সাইমার দিকে তাকিয়ে ওর দিকে এগিয়ে গিয়ে টেনে তুলে দাঁড় করায়। সাইমা কিছু বলতে চাইছিল তার আগেই ঠোঁটের সামনে আঙ্গুল খাড়া করে চুপ করার জন্য ইঙ্গিত করে নীলিমা। সাইমা চুপ হয়ে নীলিমার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলিমা সাইমার দু’বাহু ঝাকিয়ে বলা শুরু করে_
” এই মেয়ে! পৃথিবীতে এত ছেলে থাকতে তুই কেন একটা বিবাহিত ছেলের পিছনে লেগেছিস? এসব করে কি লাভ তোর? তোর এতে কি স্বার্থ লুকিয়ে আছে? কেন তুই এভাবে আমার বরের পিছনে লেগেছিস? কেন তুই অন্যের সম্পদের দিকে এভাবে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাচ্ছিস? নূন্যতম লজ্জাবোধও কি তোর মধ্যে নেই? ধূর! কাকে কি বলছি….?!!!
নীলিমা সাইমার দিকে একটু দুরে সরে যায়। তারপর আবারো বলতে থাকে,
নৈতিকতার যে শিক্ষা মানুষ তার পরিবার থেকে পায় সেটা মনে হয় তোর পরিবার তোকে দিতে পারেনি। তাই তোর এ অধঃপতন। তুই আসলে….(……)….???”

পুরো কথা বলতে পারেনি নীলিমা। তার আগেই রুম ছেড়ে বেরিয়ে যায় সাইমা। পিছন থেকে ডাকতে থাকে নীলিমা-
” ঐ শয়তান মাইয়া! চলে যাচ্ছিস কেন? শুনে যা আরো কিছু কথা। যে শিক্ষা তোর পরিবার তোকে দিতে পারেনি সেটা আমার থেকে নিয়ে যা। বজ্জাতের হাড্ডি, কি হলো চলে যাচ্ছিস কেন?”

কথাগুলো বলতে বলতেই পিছনে তাকায় নীলিমা। আবিরের চক্ষুদ্বয় রাগে রক্তবর্ণ ধারন করেছে। যেই রেগে তেড়ে আসছিল নীলিমার দিকে, তখনি নীলিমা বলে উঠে-
” খবরদার! একদম সামনে আসবি না। এই মুহূর্তে তোর ছায়া পর্যন্ত আমি সহ্য করতে পারছি না। অনেক সহ্য করেছি। আর নয়! এই মেয়ের সাথে কিসের এত পিরিত তোর? ও কেন তোকে কিস করবে? চুল আচড়িয়ে দিবে? কোন শার্ট পরবি সেটা সিলেক্ট করে দিবে, ও কেন তুই কোন জুতা পরবি সেটা বের করে রাখবে? টাই বেঁধে দিবে? ও কেন তোর জন্য একেকদিন একেক রেসিপি তৈরি করে আনবে? কি হয় ও তোর? বউ?!!! তবে আমি কি??? কেন আমায় বিয়ে করলি? ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখার জন্য???”

গর্জে উঠে আবির।
Hey you! Listen…..(……)………
মুখে আঙ্গুল দিয়ে বলে উঠে নীলিমা, চুপ! একদম চুপ। এটা তোর ক্লাস নয়, বেডরুম। সো, একদম লেকচার দিতে আসবি না। তাহলে কিন্তু খুব খারাপ হয়ে যাবে! বের হয়ে যাবে সুন্দর এই মুখটার আড়ালে লুকায়িত খোলস।

নীলিমা স্টাডিরুমে গিয়ে ঠাস করে দরজা বন্ধ করে দেয়। আবির ওর পরনের পাঞ্জাবী’টা খুলে ফেলে দেয়। দাঁতে দাঁত চেপে হাতটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারে। তারপর দরজাটা টান দিয়ে বাইরে বের হয়। দরজা মিশছিল না দেখে দরজায় একটা লাথি মেরে নিচে সাইমার রুমের দিকে পা বাড়ায়।

” সাইমা! দরজা’টা খুল। প্লিজ, সাইমা দরজাটা খুল। লক্ষ্মী বোন আমার প্লিজ দরজাটা খুল…..”
কথাগুলো বলে আবির যখন দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিল তখন পিছন থেকে কেউ একজন আবিরের পিঠে টোকা দেয়। পিছন ফিরে তাকায় আবির। ঝালমুড়ি হাতে সাইমা দাঁড়িয়ে।
চমকে যায় আবির-
” তুই? তাহলে ভিতরে কে?”
ঝালমুড়ি খেতে খেতে সাইমা বলে,
কেউ নেই। দরজায় তালা ঝুলানো আছে কানা। আবির দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে জোরেশোরে নিশ্বাস ফেলে।
” উফফ!”
পাশ থেকে সাইমা বলে উঠে,
নাও! ঝালমুড়ি খেয়ে মাথা ঠিক করো…..
আবির সাইমার হাতদুটো চেপে ধরে। প্লিজ বোন আমার, আমায় মাফ করে দে।
সাইমা চেঁচিয়ে উঠে,
আরে আরে ভাইয়া! কি করছো এসব? ঝালমুড়ি তো পরে যাচ্ছে…..!!!
যাক আমি তোকে আবার কিনে দিব।
তুই প্লিজ বল আমায় মাফ করছিস কি না।
করুণ চোখে আবির সাইমার দিকে তাকিয়ে বার বার একই আকুতি করে যাচ্ছে। সাইমা অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, আমি তোমাকে ছুঁয়ে বলছি ভাইয়া!
আমি তোমার বউয়ের কথায় কিচ্ছু মনে করিনি। আর একটা বাচ্চা মেয়ের কথায় এতকিছু মনে করার’ই বা কি আছে?
আবির সাইমার হাত ছেড়ে দেয়। রাগান্বিত গলায় বলে উঠে, ভাবের বাচ্চা ও। ও তো আসলে একটা পাগল। উন্মাদ হয়ে গেছে ও। সবকিছু পেয়েও হারিয়ে ফেলেছে ও। সেই জন্য উন্মাদ হয়ে গেছে ও…..
পাশ থেকে সাইমার জবাব, উন্মাদ!
হ্যা, উন্মাদ হয়ে গেছে ও। তবে সেটা ভুলের জন্য নয় তোমার ভালোবাসার জন্য। তোমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য। তোমাকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারে না সেই জন্য…..
উত্তেজিত হয়ে আবির বলে উঠে,
তাই বলে ও আমার সাথে এরকম বাজে ব্যবহার করবে? এটা কিরকম ভালোবাসা সাইমা???
ঝালমুড়ির কাগজটা হাতে মুড়ে দুরে সরে ফেলে দিয়ে সাইমা বলে উঠে,
এটাই ভালোবাসা ভাইয়া!
খাঁটি ভালোবাসা….
মেয়েরা সবকিছু সহ্য করতে পারে কিন্তু নিজের স্বামীর পাশে অন্য কাউকে দেখতে পারে না। কারণ, ওরা স্বামীর ভাগ অন্য কাউকে দিতে রাজি নয়।

ওকে ফাইন!
মেনে নিলাম তোর সব কথা। ও আমার পাশে তোকে সহ্য করতে পারেনি তাই আজ আমাকে যাচ্ছে তাই কথা শুনিয়েছে। কিন্তু ঐ সময়..?!!!
দুই বছর আগে ও কেন আমার সাথে এমন করেছিল? কেন আমায় চরমভাবে অপমান করে চলে গিয়েছিল? ঐদিন তো আমার পাশে কেউ ছিল না। তবে কেন আমায় এভাবে…..(…..)…..???

আবিরকে থামিয়ে সাইমার জবাব,
হতে পারে দুই বছর আগে কেউ ছিল না, কিন্তু তারও আগে হয়তো কেউ ছিল,
থাকতে পারে…..
হাত উঁচু করে আবির,
একমিনিট! তুই কার কথা বলছিস???
জবাব আসে, সেটা তো তুমি’ই ভালো জানো ভাইয়া। আমাকে কেন জিজ্ঞেস করছো?
উতলা কন্ঠে আবির বলে, হেয়ালি রেখে বল তুই খোচা মেরে কার কথা বলছিস? দুই বছর আগে কে ছিল আমার জীবনে?
সাইমা আবিরের সামনে গিয়ে উত্তর দেয়, সেটা রাত্রি নয়’তো???

আবিরের সুন্দর মুখটা মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে যায়। ঢোক গিলে বলে,
” তুইও ওর কথা….(….)….???”
ক্ষাণিক হেসে জবাব দেয় সাইমা,
সবাই জানে আমার জানতে অসুবিধে কোথায়? কিছু মনে করো না রাত্রিকে রাত্রি বলে ডাকছি সে জন্য। আসলে ওকে আপু বলতেও আমার ঘৃনা করে। এমন একটা মানুষের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা পাওয়ার পরও যে এত্ত বড় বেইমানি করতে পারে সে আর হোক আমার বোন হতে পারে না। আমার আপু হতে পারে না। ইন্ডিয়া থেকে এসে যখন শুনলাম ও তোমার আর ওর বিয়ের কথা বলে, গহনা কিনার কথা বলে ৪লক্ষ টাকা নিয়ে এক্স বয়ফ্রেন্ডের হাত ধরে পালিয়ে গেছে তখন কতটা কষ্ট যে পেয়েছি সেটা ঐ আল্লাহ জানেন! আমি তখন প্রতিদিন নিজেকে তোমার জায়গায় দাঁড় করাতাম, তোমার কষ্টটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করতাম। তোমাকে দেখলে আমার গর্ব হতো এতকিছুর পরও তুমি আমাদের সাথে সম্পর্ক রেখেছ। তোমার প্রতি শ্রদ্ধাটা তখন থেকেই বেড়ে গেছে। আর ঐ রাত্রির প্রতি ঘৃণাটা দিনকে দিন গাঢ় হয়েছে। তখন থেকেই দোয়া করতাম আমি, আল্লাহ যেন মানুষটার সাথে ঐরকম মানুষকেই মিলিয়ে দেয়। আর আল্লাহর অশেষ রহমতে পেয়েও গেছ। যেন এক হীরক খন্ড। একটা কথা কি জানো….(……)….???

পিছনে তাকিয়ে থেমে যায় সাইমা।
কারণ, আবির ততক্ষণে উদাও হয়ে গেছে।

৪,৫দিন পরের কথা__
সেদিন বিকেলে কলেজ থেকে ফিরে তাড়াতাড়ি ফ্রেশ হয়ে খেতে বসে আবির। ততক্ষণে নীলিমা চেম্বার থেকে বাসায় ফেরে। ক্লান্ত নীলিমা যখন বিছানায় গা টা এলিয়ে দেই তখনি দরজার সামনে এসে দাঁড়ায় আবির-
” আদিবা ফোন দিয়েছিল। ও আসছে, আজকে আপনি আমার রুমে ঘুমোবেন।”

নীলিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে পরে। রেডি হয়ে চলে যাচ্ছিল আবির। ফিরে আসে। দরজার কাছ থেকে বলে-
” বন্ধুর বার্থডে পার্টিতে যাচ্ছি। ফিরতে একটু রাত হবে। আপনারা খাওয়া দাওয়া করে ঘুমিয়ে পরবেন।” এবারো নীলিমা পুরো কথাটা শুনে চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে।

রাত্রি ৯টার দিকে আবিরের বোন আদিবা ওর ছেলে আদিত্যকে নিয়ে আবিরের বাসায় আসে। অবাক হয়ে নীলিমা প্রশ্ন করে, সেকি আপু! দুলাভাই আসে নি? মুখটা কালো করে উত্তর দেয় ননাস আদিবা, আর বলো না! ওর হসপিটাল থেকে জরুরী ফোন এসেছে। তারপর কি হয়েছে জানি না। ফোনটা কান থেকে নামিয়েই সবার থেকে বিদায় নিয়ে বিয়ে না খেয়েই চলে গেল। ওর মামা এজন্য অনেক রাগ দেখালো।
নীলিমা ননাস আসার পর থেকেই টেবিলে হরেক রকমের খাবার সাজিয়ে ফেলে। আদিবা হেসে বলে, ওরে পাগলি মেয়ে! এসব কেন করতে গেলা? পেটটা আমার একদম ভরা। পেটে জায়গা খালি নেই একটুও। এদিক দিয়েই নাকি তোমার দুলাভাই যাবে, তখন নিয়ে যাবে আমাদের মা ছেলেকে। মা ছেলেকে তাই এখানে ওয়েট করতে বলছে। ও আসলেই আমরা চলে যাব…..
” ওহ! চলে যাবেন? নীলিমার মুখটা কালো হয়ে গেল….”
একটা হাসি দিয়ে ননাসের জবাব,
যাও তো! আলমারি থেকে বিয়ের শাড়িটা নিয়ে আসো তো। দেখি বাচ্চা নীলিকে বউয়ের সাজে কেমন লাগে….!!!
বলা মাত্র’ই নীলিমা দৌঁড়ে গিয়ে একটা লেহেঙ্গা নিয়ে আসে।
ভ্রু কুঁচকে ননাসের জবাব,
সেকি! লেহেঙ্গা কেন???
নিচের দিকে তাকিয়ে নীলিমার জবাব,
” এখানে তো শাঁড়ি নেই। লেহেঙ্গা’টাই আছে।”
মুচকি হেসে ননাস আদিবার জবাব, সমস্যা নাই। এটাও লাল রঙের’ই। তাড়াতাড়ি কয়টা মুখে দিয়ে জটপট লেহেঙ্গা’টা পরে আসো। সাজাতে হবে তো। নীলিমা ডিনার সেরে নিয়ে তাড়াতাড়ি চেঞ্জ করে লেহেঙ্গা’টা পরে আসে। আদিবা নীলিমাকে ওর সামনে বসায়। হাতে লাল রঙের চুড়ি, চোখে গাঢ কালো কাজল, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক দিয়ে আদিবা নীলিমার চুলগুলো খোঁপায় বেঁধে দেয়। তারপর নীলিমাকে আয়নার সামনে দাঁড় করায়। আয়নায় নিজেকে নিজে দেখেই লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে নীলিমা। আহ্লাদী স্বরে আদিবা বলে উঠে, ওলে পুতুলবউ’টা লজ্জা পেয়েছেরে…..

ফোন বেজে উঠে আদিবার। কলটা রিসিভ করে কথা বলে। কান থেকে ফোন নামাতে নামাতে নামাতেই বলে, তোমার দুলাভাই এসে গেছে। যেতে হবে এখন। তাড়াতাড়ি এখানে একটু দাঁড়াও। কয়টা ছবি তুলি। নীলিমা ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আদিবা বিভিন্ন এঙ্গেলে নীলিমার অনেকগুলো ছবি তুলে নেয়। তারপর আদিত্যকে ধরে টান দিতেই বলে, দাঁড়াও আম্মু! আদিত্য ওর কাঁধে রাখা ব্যাগটা থেকে এক বিরাট গাধাফুলের মালা বের করে। আরো বের করে অনেকগুলো গোলাপ। এগুলো সে কান্নাকাটি করে ঐ বিয়ে বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছিল। অথচ এখন অনায়াসে সেই ফুলগুলো একটা একটা করে ছিঁড়ে আবিরের বিছানায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। নীলিমাকে টানতে টানতে বিছানায় বসিয়ে ওর উপরও অনেকগুলো পাপড়ি ছড়িয়ে দেয়। তারপর মায়ের কাছে গিয়ে হাত তালি দিতে দিতে বলে, আজকে মামার বিয়ে! কি মজা, কি মজা….
লজ্জায় মাথানিচু করে ফেলে নীলিমা।আদিবা হেসে দেয়। মুচকি হেসে ছেলেকে কোলে নিয়ে নীলিমার থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়।

তারপর এলো সেই রাত……..

চলবে…..

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ১২

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ১২
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

দুপুর হয়ে গেছে তা সত্ত্বেও বিছানা থেকে উঠেনি নীলিমা। সকাল থেকে একটার পর একটা বিরহের গান গেয়ে’ই যাচ্ছে সে। যদিও গান গাইলে ওর মন ভালো হয়ে যায়, তবে আজ কেন জানি গানেও কাজ হচ্ছে না। নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে নীলিমা। আর অঝোরে চোখের জল গড়িয়ে নিচে পরছে। বার বার আবিরের বলা রাত্রের কথাগুলো ওকে পীড়া দিচ্ছে, ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছে ভেতরটা।

রাত্রে অনেক রিকোয়েস্টের পর আবির নীলিমার পাশে শুয়েছিল। আবির নীলিমার ঠিক বিপরীতমুখী হয়ে শুইলেও নীলিমার স্পর্শে ঘুমের মধ্যে সোজা হয়ে যায়। কেন জানি নীলিমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল আবিরের বুকে মাথা রাখতে। ঐ বুকে কান পেতে শুনতে হৃদস্পন্দনগুলো কার কথা বলে? ওর নাকি রাত্রির? যার কথা আবির ওর ডায়েরীর প্রত্যেকটা পাতায় লিখে রাখছে। মনে পড়ে নীলিমার, আবির ওর ডায়েরীর প্রথম পাতায় লিখেছিল__
” আমার হৃদয়ের প্রতিটি স্পন্দন যার কথা বলে সে রাত্রি। আমার প্রথম প্রেম রাত্রি। আমার প্রথম ভালোবাসা রাত্রি।”

আচ্ছা, ও তো এখন ঘুমিয়ে’ই আছে। হৃদস্পন্দন একটু একটু করে উঠা-নামা করছে। এখন তো আমার ওর বুকে মাথা রাখতে কোনো বাধা নেই। আমি তো এখন কান পেতে শুনতে পারি ওর নিশ্বাস-প্রশ্বাস কার কথা বলছে!

নীলিমা আবিরের বুকে মাথা রেখে খুব করে শুনার চেষ্টা করছে আবিরের নিশ্বাস ঠিক কার কথা বলছে?!
কিন্তু পারছে না নীলিমা। শত চেষ্টার পরও নীলিমা শুনতে পায়নি রাত্রি নাম। তবে কি ও আমায়….(….)….???
না, না….!!!
ও তো রাত্রিকেই ভালোবাসে। ডায়েরীতে তো সেটাই লিখল। আচ্ছা, আরেকটু ভালো করে শুনে দেখি তো…..!!
নীলিমা কাঁপা হাতে আবিরের পরনের শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলে ফেলে। মাথা রাখে আবিরের প্রশস্ত বুকে। কান পেতে শুনার চেষ্টা করে ঐ বুকে কে আছে….?!!!
এবারো ব্যর্থ হয়, হাফিয়ে উঠে নীলিমা। ক্লান্ত নীলিমা আবিরের লোমশ বুকে মাথা রেখে চোখের পানি ছেড়ে দেয়। নড়ে উঠে আবির। মাথা তুলে তাকায় নীলিমা। চোখ যায় আবিরের বুকের প্রশস্ত লোমগুলোর দিকে। ছোট বেলায় দাদির মুখে নীলিমা শুনেছে, বুকে লোমওয়ালা লোকদের নাকি দয়া-মায়া বেশী থাকে। চোখের পানি মুছে নীলিমা আবিরের বুকের লোমগুলোর সাথে এক খেলায় মেতে উঠে। আবিরের বুকের প্রশস্ত লোমগুলোতে নীলিমা ওর হাত বুলাতে থাকে। একবার লোমগুলো হাত দিয়ে শুইয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে তো আবার বিপরীতমুখী থেকে হাত বুলিয়ে লোমগুলো দাঁড় করাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত খেলা…!

হঠাৎ’ই আবিরের ঘুম ভেঙে যায়। মনে হচ্ছে বুকের ভিতর কেউ আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। চোখ মেলে তাকায় আবির। নীলিমা তখনো আপনমনে আবিরের বুকে হাত বুলিয়েই যাচ্ছে। বুক থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় আবির নীলিমাকে। খাট থেকে উঠে বসে নীলিমা। ভীরু ভীরু চোখে আবিরের দিকে তাকায়। প্রচন্ড রাগ উঠে যায় আবিরের। খাট থেকে নিচে নেমে পরে। তারপর রাগান্বিত দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, কি মনে করো তুমি নিজেকে? যখন খুশি আমায় লাথি মেরে ফেলে দিবে আবার যখন খুশি বুকে জড়িয়ে নিবে? আমাকে কি তোমার হাতের পুতুল মনে হয়? যখন যেভাবে বলবে, সেভাবেই নাচব আমি??? যদি এসব ভেবে থাকো না, তাহলে ভুল ভাবছো, ভুল….!!!
আমাদের মাঝে যে প্রাচীর তুমি তৈরি করে দিয়েছ তা কখনো ভাঙবার নয়। আর সে প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে তোমার আমার কখনো একত্রিত হওয়াও সম্ভব নয়। So, don’t cross your limit….

সেই যে আবির চলে গেল রুম থেকে, তারপর থেকে নীলিমা রুমে পরে আছে। সারা রাত্রি বালিশে মুখ লুকিয়ে কেঁদে সকাল থেকে বিরহের গান গাওয়া শুরু করছে…..

কলেজে গিয়েছিল আবির। দুপুরে বাসায় চলে আসল। ইতিহাসের শিক্ষক মামুন স্যারের বিয়ে ঠিক হয়েছে। প্রত্যেক শিক্ষক তাদের নিজ নিজ সহধর্মীনিদের নিয়ে তৈরি হয়ে চলে আসছে। আবির’ই কেবল তৈরি হয়নি। তাই বেলা ১২টায় আবিরকে বাসায় পাঠানো হয় নীলিমাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। আবির যখন রুমে ঢুকে নীলিমা তখনো আপনমনে গান গাচ্ছে,

” দুরে কোথাও যাব চলে
যদি না মনের দোয়ার রাখো খুলে,
দুরে কোথাও যাব হারিয়ে
যদি না পাই তোমায় আপন করে।
আনমনা এ হৃদয় জুড়ে
ভালোবাসার হাওয়া বয়ে চলে,
গোপন যত মনের কথা
বলব তোমায় আমি সারাটি বেলা।
এ মনের চাওয়ায় শুধু তুমি আমার,
তুমি আমার;
দুরে কোথাও যাব চলে
যদি না মনের দোয়ার রাখ খুলে…..

দিশেহারা মন যে ব্যাকুল
চাইতে তোমার প্রাণের আকুল,
আঁধারে ডুবে থাকা
ভালো লাগে না আর দোটানা….!!

তুমি ছাড়া এ প্রহর কাটে না,
তুমি ছাড়া আর কিছু ভালো লাগে না।
দুরে কোথাও যাব চলে
যদি না মনের দোয়ার রাখো খুলে,
দুরে কোথাও যাব হারিয়ে
যদি না পাই তোমায় আপন করে….”

(গানটি অনেক ভালো। আমার অনেক অনেক প্রিয় একটা গান। সবাইকে নিজ দায়িত্বে গানটি শুনে নেয়ার অনুরোধ করা হলো।)

নীলিমার গান গাওয়ার মাঝেই আবির রুমে প্রবেশ করে। তাড়াতাড়ি শুয়া থেকে উঠে নীলিমা ওর ডান হাতটা ওড়নায় আবৃত করে ফেলে। ঢেকে ফেলে ওড়না দিয়ে। আবির একটা বিরক্তি ভাব নিয়ে বলে, আমি আপনার হাত কিংবা ঐ হাতের মাঝে লুকিয়ে থাকা কোনো রহস্য উদঘাটন করতে আসিনি। আমি এসেছি মামুন স্যারের বিয়ে, আপনি যাবেন কি না সেটা জানতে।

ওয়াও! দেবদাস স্যার বিয়ে করছে তবে? আমি যাব… আমি যাব… বলে লাফিয়ে উঠে নীলিমা। একনিমিষেই ভুলে যায় রাতের কথাগুলো। আবির ওর রুমে চলে যাচ্ছিল, ফিরে আসে আবার। ভ্রু-কুঁচকে নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলে যায়-
” আর হাত যদি এভাবে ঢেকেই রাখতে হয়, তবে মোজা পরে নিবেন। মোজা আছে তো?!!!”
নীলিমা মাথা ঝাঁকায়, হ্যাঁ! আছে…..
— ওকে, ফাইন! সেগুলো পরে নিবেন। দাঁতে দাঁত চেপে কথাটা বলে আবির ওর রুমে চলে যায়। তাড়াতাড়ি শুয়া থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে আসে নীলিমা। অতঃপর ঝটপট লেহেঙ্গা পরে আবিরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। চেঞ্জ করছিল আবির। চোখের সামনে হঠাৎ এক সবুজপরীকে দেখে হাত থেকে পাঞ্জাবি পরে যায়। কিছুক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মত আবির নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ’ই চোখ চলে যায় নীলিমার হাতের দিকে। প্রচন্ড রেগে যায় আবির।
” আপনাকে আমি মোজা পরতে বললাম বলে, আপনি মোজা’ই পরলেন?”

ভয়ে মাথা নিচু করে ফেলে নীলিমা, আমতা আমতা করে বলে, আপনি’ই তো বলেছেন। দ্বিগুন রেগে হুংকার দিয়ে বলে উঠে আবির, আপনার আর আমার সাথে বিয়ে বাড়িতে যেতে হবে না….
ঠিক আছে বলে জল টলমল চোখ নিয়ে মাথা নিচু করে স্টাডিরুমে চলে যায় নীলিমা। নিচ তলা থেকে আবিরের কাজিন সাইমা আসে। আবিরকে পাঞ্জাবী পরিহিত দেখে চিৎকার দিয়ে ওয়াও মাই ক্রাশ বলে আচমকা আবিরের গালে একটা চুমু দিয়ে দেয়। স্টাডিরুমের সোজাসুজি আবিরের বেডরুম। আবিরের গালে এভাবে চুমু দেয়া দেখে রেগে যায় নীলিমা। সাইমা সুন্দর করে আবিরের চুলগুলো ঠিক করে দিয়ে নাক চেপে ধরে বলে, একদম হিরো হিরো লাগছে তোমাকে। রেগে একদম সাপের মত ফুসে উঠে নীলিমা। স্টাডিরুম থেকে দৌঁড়ে আবিরের রুমে যায়। সাইমা আবির দুজনের বুঝে উঠার আগেই নীলিমা আবিরের পায়ের উপর ভর দিয়ে দাঁড়ায়। তারপর আবিরের মাথার চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে, আবিরের নাকটা ওড়না দিয়ে ঘষা শুরু করে। আবির নীলিমার এমন আচরণে অবাক হয়। অবাকের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যায় আবির। যখন দেখল ওর’ই সামনে নীলিমা ধাক্কা দিয়ে সাইমাকে ফ্লোরে ফেলে দিয়েছে।

চলবে….

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ১১

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ১১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

নীলিমা আবিরের কথায় কান না দিয়ে আপনমনে ওর জিনিসপত্র গুছাতে ব্যস্ত হয়ে পরে। আবির আবারো বলে-
” Oh, hlw! শুনতে পাচ্ছেন….?”
ভ্রু- কুঁচকে ফিরে তাকায় নীলিমা। আবিরের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে, এভাবে জ্বালাতন করছেন কেন?
রেগে যায় আবির, What? কি বলছেন আপনি? আমি আপনাকে জ্বালাচ্ছি??? শান্ত গলায় নীলিমার জবাব, তা নয়তো কি? দেখতেই পারছেন আমি ব্যস্ত আছি। তারপরও ষাড়ের মত চিল্লিয়ে’ই যাচ্ছেন….!!!

কি বললেন আপনি? আমি ষাড়? আগের চেয়ে দ্বিগুণ রেগে দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে আবির। আলমারি’টা বন্ধ করে ফিরে তাকায় নীলিমা। কোমরে হাত রেখে রাগী মুডে জবাব দেয়, নাহ! আপনি ষাড় নন, ষাড়ের মত। উফফ! যা বাচালের পাল্লায় পরলাম না…..!!!
কথাটা বলে হাতে ঝাড়ু নিয়ে নীলিমা আবিরের স্টাডি রুমের চলে যাচ্ছিল, পথ আগলে দাঁড়ায় আবির। নীলিমার দিকে রাগান্বিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, আমি বাচাল???
উত্তর দেয় নীলিমা- আপনি শুধু বাচাল নয়, আপনি সাংঘাতিক রকমের খাটাশও বটে! নীলিমার ঝাড়ু নাড়িয়ে কথা বলা দেখে সে স্থান ছেড়ে চলে যাচ্ছিল আবির, খাটাশ শব্দটা শুনে আবার ফিরে আসল।
” কি বললেন আমি খাটাশ?”
অনেকটা রাগান্বিত ভঙ্গিতে দাঁতে দাঁত চেপে পাল্টা প্রশ্ন করল নীলিমা, ভাই! আপনি আমায় সত্যি করে একটা কথা বলবেন? আপনি কি জন্ম থেকেই এরকম টাইপের? আবিরের রাগটা চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবার।
” আপনার সাহস তো কম নয়, আপনি এখন আমার জন্মের দোষ দিচ্ছেন???”
উত্তর দেয় নীলিমা, উল্টাপাল্টা বুঝেন কেন? আমি আপনার জন্মের দোষ দেইনি। আমি জানতে চাচ্ছি আপনি কি জন্মগত ভাবেই এ স্বভাবের অধিকারি নাকি? মানে এই যে মানুষের পায়ে পা দিয়ে ঝগড়া করেন, সেটা আপনার কোন সময়কার অভ্যাস? শৈশবকাল, বাল্যকাল, যৌবনকাল নাকি নাকি এই বয়সের মানে বৃদ্ধকালের….???
——- আমি বৃদ্ধ???(আবির)
—— হ্যা, আপনি বৃদ্ধ? (নীলিমা)
—— প্রমাণ…..(আবির)
——- ২বছর আগে দেখেছিলাম চুল পেকে গেছে, আজ দেখলাম বকবক না করলে ভালোই লাগে না আপনার…(নীলিমা)
——- What?(আবির)
——- এত ইংলিশ বলবেন না। কথায় কথায় ইংলিশ বলা মানুষ নীলি পছন্দ করে না। যায় হোক বৃদ্ধ মানুষ যখন, বুঝিয়ে দেয়াটা নীলির কর্তব্য। নীলি শুনেছে বুড়ো হলে মানুষের চুল পেকে যায় এবং সারাদিন শুধু আজাইরা বকবক করে। ঠিক যেমনটা এখন আপনার মধ্যে দেখা যাচ্ছে। সেই হিসেবে আপনার এখন বৃদ্ধ কাল। নীলি আশা করছে, ও আপনাকে বুঝাতে পেরেছে। নীলি চায় ওর কথাগুলো ভুল প্রমাণিত হলেও কোনো কথা বলবেন না আপনি। আর যদি বলেই ফেলেন, তাহলে মনে করবেন আপনি সত্যি সত্যি’ই বৃদ্ধকালে আছেন।(নীলিমা)
——- হে আল্লাহ! আমায় বইসহ উপরে উঠিয়ে নিয়ে যাও…..(আবির)
——- হি, হি, হি, হি…(নীলিমা)

Stopped!
কানে হাত দিয়ে জোড়ে চেঁচিয়ে উঠে আবির। কেঁপে উঠে নীলিমা, হাসি বন্ধ হয়ে যায়। নীলিমার বা হাতটা মুঠোয় বন্দি করে ফেলে আবির। তারপর চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে, নীলি এতকিছু জানে তো এটা জানে না কারো বাসায় অনুমতি ব্যতিরেকে প্রবেশ করা, এভাবে চিল্লিয়ে, ভ্রু- নাচিয়ে, দাঁতে দাঁত চেপে কথা বলা একধরনের অভদ্রতা….?!!!
আমার প্রশ্ন এখানেই, আত্মসম্মান বলতে যে একটা জিনিস আছে সেটা কি আদৌ নীলির আছে?
——…….. (নীলিমা)
আমার তো মনে হয় নাই। থাকলে ভদ্রলোকের বাড়িতে এভাবে অভদ্রের মত আচরণ করত না। ভদ্র মানুষের মত’ই সকালে ঘুম থেকে উঠে চলে যেত। কিন্তু নীলি তা না করে রাতের ভিতর বাসায় খবর দিয়ে জিনিসপত্র নিয়ে আসছে। হা, হা! ওকে দেখে তো আমার ব্যাকরণের একটা প্রবাদ মনে পড়ে গেছে, বসতে দিলেই শুইতে চায়। আসলেই, বাঙ্গালির স্বভাব’ই এরকম। ঠিক যেমনটা এখন নীলি অর্থাৎ আপনার মধ্যে দেখছি। কথাগুলো একনিশ্বাসে বলে আবির থামে। প্রতিউত্তরে কিছুই বলেনি নীলিমা। শুধু আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে ঝাড়ু নিয়ে স্টাডিরুমে চলে গেল। আবির গোসল করে কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছিল, প্লেটে করে কয়টা পরোটা আর একটু ডাল নিয়ে রুমে প্রবেশ করে নীলিমা। একরাশ বিরক্তির দৃষ্টিতে আবির নীলিমার মুখের দিকে তাকায়। স্বাভাবিক কন্ঠে বলে উঠে নীলিমা, ব্রেকফাস্ট’টা করে যান। খাবারের সাথে রাগ করতে নেই। না খেয়ে চুপচাপ চলে যায় আবির, যাওয়ার আগে শুধু এটুকু বলে যায়-
” বেহায়া মানুষ কোনো কালেই আবিরের পছন্দ ছিল না….”

আবির কলেজে চলে যাওয়ার একটু পর নীলিমাও হসপিটালে চলে যায়। যাওয়ার আগে রুমে তালা লাগিয়ে যায়। দিনটি ছিল বুধবার। কলেজের হাফ ডে। বুধবার দিন কলেজ দুপুর ১টা ২০মিনিটে ছুটি হয়ে যায়। অন্যদিন ছুটির পর স্টাফ রুমে বসে আড্ডা দিলেও সেদিন কেন জানি আবিরের আড্ডায় মন বসছিল না। হালকা টিফিন করে সবার থেকে বিদায় নেয় আবির। গেইট খুলে রুমের সামনে এসে থেমে যায়। দরজায় ইয়া বড় তালা ঝুলানো। রাগে, দুঃখে আবির ওর হাতটা দেয়ালে ছুঁড়ে মারে। অতঃপর ছাদে চলে যায়। ছাদ থেকে দেখা যাচ্ছে গেইটের সামনে রিক্সা থেকে কেউ একজন নামছে। এ নীলিমা নয়তো…?!!!
দৌঁড়ে নামে আবির ছাদ থেকে। হ্যা, নীলিমায় ছিল। এর’ই মাঝে নীলিমাও সিড়ি বেয়ে উপরে উঠে। সিড়ির পাশে’ই ময়লা ফেলার ঝুড়ির সাথে পুরনো জুতা রাখার বাক্স রাখা। তার’ই একপাশে পলিথিনে মোড়ে চাবি রাখা। চাবি হাতে নিয়ে মিটমিট হেসে দরজা খুলে নীলিমা। আঁচলে চাবি বাঁধতে বাঁধতে বলে, সংসার চালাতে বুদ্ধি লাগে। সাথে সাথে আবির আঁচল থেকে চাবিটা খুলে নিয়ে আলমারির উপর ছুঁড়ে মারে। জবাবে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় নীলিমা।

লাঞ্চের জন্য দুপুরে তাড়াহুড়ো করে ভাত তরকারী রান্না করে আনে নীলিমা। টেবিলে খাবার পরিবেশন করে আবিরকে ডাক দেয়- ” শুনছেন? খাবার রেডি।”
কপালে হাত দিয়ে চোখ বোজে চিন্তাজগতে ডুবে গিয়েছিল আবির, ঘোর কাটে নীলিমার ডাকে। শুয়া থেকে উঠে বসে ভ্রু-কুঁচকে বলে উঠে আবির-
” বেহায়া দেখেছি, তবে আপনার মত বেহায়া দেখিনি।”
কষ্ট পায় নীলিমা কিন্তু মুখে প্রকাশ করেনি। আবার আবিরকেও বিরক্ত করতে চায়নি। তাইতো চুপচাপ আবিরের কক্ষ ছেড়ে বের হয়ে যায়। কিছু না মুখে দিয়ে’ই খাবারগুলো ঢেকে রেখে দেয়। সন্ধ্যার পর পড়ার জন্য স্টাডি রুম থেকে বই নিতে আসছিল আবির, তখনি নীলিমাকে বিছানায় গড়িয়ে কান্না করতে দেখে। পেটে হাত রেখে ওহ মাগো, ওহ আল্লাহ’গো বিছানার এপাশ ওপাশ করছে নীলিমা। আবিরের ভেতরটা কেন জানি মোচড় দিয়ে উঠে। বই রেখে ধীর পায়ে আবির নীলিমার পাশে গিয়ে বসে। নরম স্বরে প্রশ্ন করে, কি হয়েছে নীলিমা? অস্ফুট স্বরে জবাব দেয় নীলিমা, গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট আর একটু পানি প্লিজ…!!!
আবির ওর রুমে নিয়ে একটা গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট নিয়ে আসে। কিচেন থেকে পানির জগটা আনার সময় কৌতূহলবশত পাতিলের ঢাকনা মেলতে’ই ‘থ’ হয়ে যায়। পাতিল ভর্তি ভাত, তরকারী। না চাইতেও চোখের কোণায় জল চলে আসে আবিরের। গ্লাসে করে একগ্লাস পানি নিয়ে স্টাডিরুমে ঢুকে আবির। গ্যাস্ট্রিকের ট্যাবলেট আর পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিতেই ঢকঢক করে একগ্লাস পানি খেয়ে নেয় নীলিমা।
” আরেক গ্লাস প্লিজ…..”
আবির পানির জগটা নিয়ে এসে আরো একগ্লাস পানি এগিয়ে দেয় নীলিমার দিকে। সে পানিটুকুও ঢকঢক করে গিলে ফেলে নীলিমা। আবির আবারো পানি দেয়। এবারো নিমিষেই গ্লাস খালি করে ফেলে। চোখের কোণের জমে থাকা অশ্রু ফোঁটাগুলো একটু একটু করে আবিরের গাল গড়িয়ে নিচে পরছে। কাঁপা হাতে আরো একবার গ্লাস বাড়ায় নীলিমা। আবির জগের অবশিষ্ট পানিটুকু ঢেলে দেয়। এবার একটু পানি মুখে নিয়ে হাতে রাখা ট্যাবলেট’টা খেয়ে সাথে সাথে খাটে হেলান দিয়ে শুয়ে পরে। আবির বই নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়।

রাত্রে খাবারের জন্য ডাক দিতেই টেবিলে এসে বসে আবির। খাবার মুখে দেয়ার একপর্যায়ে পাশে দাঁড়ানো নীলিমার মুখের দিকে তাকায় একবার। কিছুটা অস্বস্তিতে পরে যায় আবির। মনে মনে বলে, বুঝলাম না, খাবার’ই তো খাচ্ছি। তার জন্য এমন হা করে তাকিয়ে থাকার কি আছে??? খাওয়া শেষে চলে যাওয়ার সময় বলে যায় আবির, খেয়ে নিন। নীলিমার মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। নজর এড়ায় না আবিরের। এই হাসি’ই একদিন আমার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, পাগলের মত হয়ে যায় আবির। কিছু না বলে ঠাস করে নীলিমার মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়।

রাত্রে যে যার মত ঘুমিয়ে পরে। আবির বেডরুমে, নীলিমা স্টাডিরুমে।

প্রবলবেগে ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। ঝড়ের তান্ডবে সবকিছু কেমন উলটপালট হয়ে যাচ্ছিল। আবিরের রুমের এক জানালা আরেক জানালার সাথে লেগে ঠাস ঠাস শব্দ হচ্ছিল। বাহির থেকে বৃষ্টির ফোঁটা এসে আবিরের রুমের বিছানার চাদর অনেকটা ভিঁজিয়ে দেয়। শুয়া থেকে উঠে বসে জানালাগুলো লাগাতেই স্টাডিরুমের বারান্দার ঐ দিকের জানালার কথা মনে পড়ে। ঐ জানালা তো লাগানো হয়না ২দিন ধরে। এতক্ষণে তো মনে হয় জানালার কাঁচগুলো ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেছে। দৌঁড়ে যায় আবির নীলিমাকে ডাকতে। দরজা ধরতেই খুলে যায়। তাড়াতাড়ি ভেঁজা পর্দাটা উঠিয়ে জানালাগুলো লাগিয়ে নেয় আবির।
” দরজাটা লাগিয়ে ঘুমান, চোর ঢুকতে পারে….” এটা বলে খাটের দিকে তাকাতে’ই ভয়ে চমকে যায় আবির। একজোড়া চোখ ওর দিকে কেমন ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মনে মনে আল্লাহ নাম জপে লাইটটা অন করে আবির।
—— একি?!!!!
আপনি নিচে গেলেন কেন?(আবির)

এমনিতেই যা শীত, আর উপর প্রবলবেগে ঝড়। শীতে মরার যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল নীলিমার। এদিকে এ রুমে গায়ে দেয়ার জন্য পাতলা কাথা ছাড়া কিচ্ছু নেই। আবিরকে ডাক দিতেও ভয় হচ্ছিল কারণ ওর রুমে যেতে মানা। তাই অনেকটা নিরুপায় হয়ে’ই অসহায়ের মত খাটের উপর মোটা করে পাতানো লেপের ভেতর ঢুকে যায় নীলিমা।

বিস্ময়ে হতবাক আবির প্রশ্ন করে আবারো-
” খালি খাটে শুইতে গেলে পিঠে ব্যথা পাওয়া যাবে, তাই এই ব্যবস্থা করা হয়েছে। এগুলোর নিচে কেন ঢুকেছেন আপনি?”

জবাব দেয় নীলিমা, খুব শীত করছে। তাই…..

আবির ওর রুমে গিয়ে ওর কম্বলটা নিয়ে আসে। ” নিন! এবার দয়া করে বিছানা এলোমেলো না করে এর ভিতর থেকে বেরিয়ে আসুন।”
নীলিমা নিচ থেকে বেরিয়ে আসে বিছানার উপর। কম্বলটা গায়ে দিয়ে শুতে’ই লাইট’টা অফ করে দেয় আবির। চলে যাবে ঠিক তখনি হাতে টান পরে। ফিরে তাকায় আবির। অনেকটা করুণ নীলিমার জবাব- আমি এর ভেতরে শুধু শীতের জন্য যায়নি, আমার খুব ভয়ও পাচ্ছিল।
লাইট’টা জ্বালিয়ে প্রশ্ন করে আবির- তো…????
উত্তর দেয় নীলিমা, আজকে এ রুমেই থাকুন না….

চলবে….

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ১০

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ১০
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

রুগ্ন দেহ, মলিন চেহারার নীলিমাকে চিনে নিতে একটু কষ্ট’ই হচ্ছিল আবিরের। দু’বছরে মানুষ এতটা বদলে যেতে পারে সেটি নীলিমাকে না দেখলে আবির বোধ হয় জানতেই পারত না। শুকিয়ে আগের চেয়ে লম্বা হয়ে গেছে, চোখের নীচে দাগ পরে গেছে, দাতগুলো কেমন ভেসে গেছে।
না চাইতেই আবিরের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। পাশে বসা অর্থনীতি মেম নীলিমার হাতে একটা মাইক ধরিয়ে দিয়ে গান গাওয়ার জন্য বলে। আচমকা আবির মাইকে ঘোষনা করে দেয়-
” সুপ্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ_
এখন এই মুহূর্তে মঞ্চে আপনাদের সামনে গান নিয়ে আসছেন এ কলেজের’ই প্রাণ, কলেজের একসময়ের সেরা ছাত্রী মিস নীলিমা। নীলিমার জন্য একটা জোড়ে হাত তালি হবে। সকল ছাত্র ছাত্রীরা উচ্ছ্বাসে ফেটে পরে। নীলিমাকে করজোড়ে অভিবাদন জানায়। আবির আবারো মাইকে ঘোষনা করে, নীলিমাকে মঞ্চে আসার জন্য বিনীত অনুরোধ করা হচ্ছে। কাঁপা পায়ে নীলিমা মঞ্চে উঠে। ভীরু চোখে আবিরের দিকে তাকিয়ে, মাইক’টা মুখের সামনে নিয়ে গাইতে শুরু করে-

“তুই ফেলে এসেছিস কারে,
মন, মনরে আমার
তাই জনম গেল,
শান্তি পেলি নারে…!!
মন, মনরে আমার
তুই ফেলে এসেছিস কারে,
মন, মনরে আমার।
যে পথ দিয়ে চলে এলি
সে পথ এখন ভুলে গেলিরে!!
কেমন করে ফিরবি তাহার দ্বারে
মন, মনরে আমার
তুই ফেলে এসেছিস কারে,
মন, মনরে আমার।
নদীর জলে থাকিরে কান পেতে
কাঁপেরে প্রাণ পাতার মর্মরেতে….!!
মনে হয় যে পাবো খুঁজি
ফুলের ভাষা যদি বুঝিরে…!!
যে পথ গেছে সন্ধ্যা তারার পানে
মন, মনরে আমার….
তুই ফেলে এসেছিস কারে,
মন, মনরে আমার
তাই জনম গেল,
শান্তি পেলি নারে….!!
মন, মনরে আমার
তুই ফেলে এসেছিস কারে,
মন, মনরে আমার….”

গান শেষে মঞ্চ থেকে নেমে দৌঁড়ে কলেজ মাঠ ছেড়ে পালায় নীলিমা। কলেজ লাইব্রেরি’টা খোলায় ছিল, সেখানে গিয়ে হু, হু করে কেঁদে উঠে নীলিমা__
” তুমি আমাকে এভাবে অপমান করলে?
আমি তো শুধু একটু গান’ই গাইতে চেয়েছিলাম…”

অনুষ্ঠান শেষে বাসায় ফিরছিল আবির, পথিমধ্যে পথ আগলে দাঁড়ায় নীলিমা। গাড়ি থামিয়ে জানালার গ্লাসটা নামিয়ে রাগান্বিত দৃষ্টিতে নীলিমার তাকায় আবির। প্রশ্ন করে,
” দুনিয়াতে এত গাড়ি থাকতে আমার গাড়ির সামনে এসেই মরতে হলো?”
দৌঁড়ে গাড়ির জানালার পাশে যায় নীলিমা। করুণ গলায় বলে, প্লিজ! আপনি আমার কথাটা শুনোন…..
দেখুন মিস নীলিমা! এটা কলেজ নয়, পাবলিক প্লেস। তাই প্লিজ অযথা বাড়াবাড়ি করবেন না এখানে। আমার তাড়া আছে। রাস্তা ছাড়ুন।
প্লিজ, আপনি আমার কথাটা তো শুনোন। তারপর না হয় চলে যাব…..
ওকে, বলুন! কি বলতে চান আপনি?

কথাগুলো একান্ত’ই ব্যক্তিগত, এখানে বলা ঠিক হবে না। আমি কি আপনার সাথে আপনার বাসায় গিয়ে ধীরে সুস্থে কথাগুলো বলতে পারি…???
আবির নীলিমার দিকে একবার ফিরে তাকায়। তারপর গাড়ির দরজাটা খুলে সামনের দিকে তাকিয়ে বলে-
ওকে, ফাইন! চলুন…..
নীলিমা তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে বসে। গেইটের ভিতর গাড়ি’টা ঢুকাতে ঢুকাতে নীলিমা উপরে নিজ রুমে চলে যাচ্ছিল, পিছন থেকে ডাক দেয় আবির। নীলিমা পিছনে ফিরে তাকালে আবির জানায়, “রুম চেঞ্জ করে ফেলেছি। এখানে আমার এক কাজিন থাকে। উপরে আমার রুম। চলুন….”
নীলিমা আবিরের পিছুপিছু ওর রুমের দিকে পা বাড়ায়। দরজার লক খুলে ভিতরে ঢুকে আবির, তার পিছু পিছু নীলিমা। অনেক সুন্দর গুছানো দুটো রুম। একটা আবিরের বেডরুম, আরেকটা স্টাডি রুম। নীলিমাকে আবির স্টাডি রুমে বসার অনুমতি দিয়ে নিজে বেডরুমে চলে যায়। মিনিট পাঁচেক পর ফ্রেস হয়ে ফিরে আসে আবির। স্টাডি রুমে একজন বসা যাবে এরকম একটা ছোট্ট সোফা আছে। আবির সেখানে বসে নীলিমার দিকে জিজ্ঞাসো দৃষ্টিতে তাকায়। নীলিমা কিছু না বলে চুপসে বসে আছে। ভ্রু-কুচকে প্রশ্ন করে আবির, কি হলো? বলুন কি বলতে চান…?!!!
নীলিমা বার কয়েক বলতে গিয়েও আটকে যায়, পারেনি বলতে। অতিবাহিত হয়ে যায় ত্রিশ মিনিটেরও অধিক সময়। এরই মধ্যে আবিরের স্টুডেন্ট’রা এসে যায়। বিরক্তির দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে একবার তাকিয়ে সোফা থেকে উঠে ওদের পড়াতে চলে যায় আবির। ঘন্টা’খানেক পর ওদের বিদায় দিয়ে স্টাডি রুমে ঢুকে আবির। নীলিমাকে দেখে ভ্রু কুঁচকে আবারো বলে উঠে,
” আপনি এখনো এখানে বসে আছেন যে?” করুণ গলায় উত্তর দেয় নীলিমা, আমার কথাটা যে বলা হয়নি আপনাকে।
স্বাভাবিক হওয়ার বৃথা চেষ্টা করে আবির। জ্বি, বলুন। কি বলতে চান…..?
জবাব আসে, একটা বাসা ভাড়া দিবেন?
বিরক্তির চরম সীমায় পৌঁছে গেছে আবির। কোনো রকম রাগকে কন্ট্রোল করে বলে, এই কথাটা আপনি রাস্তায় বললেই পারতেন। যায় হোক! আমার এখানে কোনো বাসা খালি নেই। কথাটা বলে হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায় আবির। ওয়াশরুম থেকে মাগরিবের নামাজের জন্য অজু করে ফিরে এসে দেখে নীলিমা তখনো সে স্থানে ঠায় দাঁড়িয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করে আবির, সন্ধ্যা হয়ে গেছে। আপনি এখনো এখান থেকে যাচ্ছেন না যে?

মাথা নিচু করে জবাব দেয় নীলিমা,
“আজ রাতটা কি এখানে থাকতে পারি আমি? অবাকের চরম সীমায় আবির-
“What?”
কেঁপে উঠে নীলিমা। আমতা আমতা করে বলতে থাকে, না মানে আমি যে বাসায় থাকি সে বাসাটা এখান থেকে মাইল তিনেক দুরে। ঐ এলাকার ছেলেরা খুব খারাপ। দিনে দুপুরে রাস্তাঘাটে মেয়েদের জ্বালাতন করে। তাই আজ রাতটা যদি আমাকে এখানে থাকতে দিতেন….
ঠিক আছে, থাকুন! তবে আজ রাতটাই। কাল সকালে উঠে যাতে স্টাডি রুমটা পরিষ্কার দেখি…!!!
নীলিমা মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানায়।

পরদিন সকালবেলা_
অটো রিক্সার ক্রিং ক্রিং আওয়াজে ঘুম ভাঙে আবিরের। জানালা মেলে নিচে তাকায় আবির। কিছুটা ঘুম গলায় প্রশ্ন করে,
” ও ভাই! সকাল সকাল কি শুরু করছেন এসব?”
অটোচালক আবিরকে দেখে জোরে হাকিয়ে বলে, ” ভাই! ডাক্তার আপা আছে এখানে?”
আবির ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে, কোন আপা? অটোচালক চিল্লানোর স্বরে জবাব দেয়, ডাক্তার নীলিমা আপা…. ওনাকে একটু ডেকে দিন।

আবির ওর স্টাডিরুমের দরজায় গিয়ে নক করে, মিস নীলিমা! আপনাকে নেয়ার জন্য অটো এসেছে। নিচে দাঁড়িয়ে আছে। ধরমরিয়ে বিছানা থেকে উঠে দৌঁড়ে নিচে নামে নীলিমা। আবির ওয়াশরুমে চলে যায়। ততক্ষণে নীলিমা অটো থেকে ওর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নামিয়ে অটোওয়ালাকে দিয়ে ব্যাগপত্র উপরে তুলে। সবশেষে অটোওয়ালাকে বিদায় দিয়ে কাপড়ের ব্যাগটা নিয়ে উপরে উঠে নীলিমা। ওয়াশরুম থেকে কেবল বেরিয়েছিল আবির। নীলিমার জিনিসপত্র দেখে “থ” হয়ে যায় ও। নীলিমা আপনমনে আলমারির লক খুলে কাপড় গুলো আলমারিতে রাখতে ব্যস্ত হয়ে পরে। চোখ কপালে উঠে যায় আবিরের। পিছন থেকে বলে উঠে আবির-
” বসতে বলেছিলাম, এখন তো দেখি শুয়ে পরার ব্যবস্থা করেছেন আপনি…”

চলবে….

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব-০৯

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব-০৯
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় আবির!
বার বার প্রতিধ্বণিত হতে থাকে নীলিমার বলা শেষ কথা,
“সেই বুড়োকে ভালোবাসবে ডাক্তার নীলিমা?”

ভিষণ কষ্ট পায় আবির কিন্তু ভেঙে পরেনি। মুখে জোর করে একটা হাসির রেখা টেনে নীলিমার হাতটা ধরে।
হাঁটু গেড়ে ফ্লোরে বসে হাসিমুখেই বলে, আমি জানি! আমার নীলি আমার সাথে মজা করছে। ও আমার সাথে এমন করতেই পারে না। কারণ, ও যে আমাকে নিজের থেকেও বেশী ভালোবাসে…!!!
একটা ধাক্কা দিয়ে আবিরকে ফ্লোরে ফেলে দেয় নীলিমা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
হা, হা, ভালোবাসা?!!!
সেতো ফুলশয্যার রাতেই মরে পঁচে গেছে;

ফ্লোর থেকে উঠে দাঁড়ায় আবির,
নীলিমার সামনে দাঁড়িয়ে ওর দু’গাল স্পর্শ করে বলে, আমি জানি তো! তুমি এসব রাগ করে বলছ, অভিমান থেকে বলছ….
হাত দুটো ছাড়িয়ে দেয় নীলিমা। আবিরের চোখে চোখ রেখে বলে,
অভিমান…?!!!
সে’তো তার সাথেই মানায়,
যাকে মন থেকে ভালোবাসা যায়।

এমন কেন করছ? একটু শান্ত হও তুমি….
এই কথা শুনে আবিরের কাছে চলে আসে নীলিমা। চোখে চোখ রেখে জোর গলায় বলে উঠে, বুঝতে কেন পারছেন না, আমি সত্যি বলছি…. আমি আপনাকে ভালোবাসি না, বাসতে পারি না….
আবির দু’হাত দিয়ে নীলিমার একটা হাত চেপে ধরে। দু’চোখ দিয়ে অথৈ জলরাশি নিচে গড়িয়ে পরছে। কান্না ভেঁজা গলায় প্রশ্ন করে আবির,
” কেন করলে এমন’টা?”
নীলিমা আবিরের হাতের দিকে চোখ ইশারা করে উত্তর দেয়, এই যে আজকের এই দিনটি দেখার জন্য….
আবির হাতটা ছেড়ে দেয়। নীলিমা সেই অবস্থায়’ই কাপড়ের ব্যাগটা হাতে নিয়ে আবিরের দিকে তাকায়। আবির তখনো সে স্থানে’ই ঠায় দাঁড়িয়ে। কাঁপা গলায় “আসি” বলে বিদায় নেয় নীলিমা….

আবিরের রুম থেকে বেরিয়ে নিচে রাস্তায় গিয়ে সরাসরি রিক্সায় উঠে পরে নীলিমা। অতঃপর বাসস্টপে গিয়ে বাসে উঠে রওয়ানা দেয় নরসিংদীর উদ্দেশ্যে। মাকে আগেই জানিয়ে দেয়া হয়েছে,
“ছোট ভাই আর লিমাকে নিয়ে দু’দিন পর’ই চিটাগাং মামার বাসায় যাচ্ছি। ঐখানকার হসপিটালে একবছর কাজ করতে হবে। তোমরা রেডি থেকো।”
নীলিমা বাসায় পা রাখা মাত্র’ই কল করে নীলিমার শ্বশুর। ভয়ে ফোনটাই অফ করে ফেলে নীলিমা। বুঝতে পারে, আবির ওনাকে নিশ্চয় কিছু একটা বলছে। তাই আজ হঠাৎ এ সময়ে ফোন করছে। আবির যদি সব বলে দিয়ে থাকে, তাহলে এটা নিশ্চিত ওনি এ বাড়িতে চলে আসবে। মা, কাকা, কাকিমা’রা এসব জানবে। সাথে তুলকালাম সৃষ্টি হবে। নাহ, আর একমুহূর্তও এখানে থাকা যাবে না। সে রাতটা কোনো মতে কাটিয়ে পরদিন ভোরের ট্রেনে নীলিমা ওর মা ও ছোট ভাই বোনদের নিয়ে চিটাগাং চলে যায়।

কেটে যায় দু’দিন__
” বাবা! কি হলো? ফোন ধরেছে নীলিমা? কথা বলেছ ও বাড়িতে?”
সেদিন আবিরের বাবা ও মা এসেছিল তাদের বউ-ছেলেকে দেখতে। এসে আবিরের অগোছালো রুম ও রক্ত লাল চক্ষু দেখে ভড়কে যায়। জানতে পারে, আসল ঘটনা। আবিরের বাবা মা দু’জনেই স্তম্ভিত। হওয়ার’ই কথা। এরকম কিছু ওরা যে কল্পনাতেও নীলিমার থেকে প্রত্যাশা করেনি। যায় হোক!
ছেলের মাথায় হাত বুলাতে থাকে মা। আবিরের বাবা এবার কল দেয় নীলিমার মায়ের ফোনে। সালাম দিয়ে কুশল বিনিময়ের একপর্যায়ে জানতে পারে, নীলিমা ওদের নিয়ে চিটাগাং মামার বাসায় উঠেছে। কোনো বনিতা না করে আবিরের বাবা সোজাসাবটা নীলিমার মায়ের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বলে। লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায় নীলিমার মায়ের। কারণ ওনি জানেন আর যায় হোক আবিরের বাবা কখনো মিথ্যে কথা বলার মানুষ না। সে রাত্রে’ই মেয়ের মুখোমুখী হয় মা। প্রশ্ন করেন- কিরে জামাই কল দেয় নি যে আজকে একবারও, জামাইয়ের সাথে কি কিছু হয়েছে? মায়ের প্রশ্নে রেগে যায় নীলিমা। সামনে থাকা গ্লাসটা ছুড়ে মারে ফ্লোরে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে জবাব দেয়, আর কখনো যদি এই জামাই জামাই শুনি, তাহলে কুরুক্ষেত্র বয়ে যাবে। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে স্থান ত্যাগ করে নীলিমার মা। মায়ের সাথে এরকম চোখ রাঙানোতেই বুঝতে পারেন ওনি, ওনার মেয়ে নিচে নামতে নামতে এতটাই নিচে নেমে গেছে যে ঘৃণা করতেও ওকে মানুষের বিবেকে বাঁধবে। দুপুরে লাঞ্চ করে রুমে বসেছিলেন নীলিমার মা, তখনি কল আসে নীলিমার শ্বশুরবাড়ি থেকে। রিসিভ করতেই ওনারা জানান-
আবিরের অবস্থা খুব খারাপ, আপনারা যত শিগ্রয় সম্ভব একবার ঢাকায় আসুন। হসপিটাল থেকে কেবল ফিরছিল নীলিমা। ড্রেসটা চেঞ্জ করে, জরুরী একটা কাজে খাতা কলম নিয়ে বসেছিল। ঠিক তখনি রুমে মায়ের আগমন। অনেকটা ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠেন-
” নবাবজাদী! কলম ঘুরাতে হবে না। আগে আমার সাথে ঢাকায় চল।”
রাগ উঠে যায় নীলিমার। অনেকটা জোর গলায় কলম নাড়িয়ে অসময়ে রুমে আসা এবং নবাবজাদী কথাটা বলার জন্য মাকে কতগুলো তিক্ত কথা শুনিয়ে দেয়। মাথায় রক্ত উঠে যায় নীলিমার মায়ের। ড্রেসিংটেবিলের উপর পরে থাকা ধারালো ছুড়ি হাতে এগিয়ে যায় মেয়ের দিকে। এক হাত দিয়ে নীলিমার হাতটা টেবিলের উপর চেপে ধরে, তারপর আরেক হাতে রাখা ছুড়িটা আঙুলের উপর চেপে ধরে নীলিমার মা। দাঁতে দাঁত চেপে শরীরের সবটুকু ভর দিয়ে মা তার মেয়ের আঙুলে ছুড়িটা চেপে ধরে। রাগে জ্ঞানশূন্য মায়ের কানে মেয়ের আর্তনাদ না পৌঁছলেও পাশের রুমে ভাই বোন এবং মামীর কানে ঠিক পৌঁছে। চিৎকার শুনে দৌঁড়ে আসে ওরা। ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ওমাগো করে বিছানায় চিতল মাছের মতো তড়পাতে তড়পাতে সবার চোখের সামনেই জ্ঞান হারায় নীলিমা। নীলিমার ডান হাত থেকে বৃদ্ধা আঙুলটা আলাদা করে ফেলেছে ওর মা। এটা দেখে ওর ভাই জ্ঞান হারায়। বোন লিমা ও মামি একটা চিৎকার দিয়ে নীলিমার কাছে ছুটে আসে। লিমা ওর বোনকে জড়িয়ে ধরে আপু, আপু বলে আর্তনাদ করতে থাকে। একি করলেন আপা? হাত থেকে একটা আঙুল’ই আলাদা করে ফেললেন? পাশ থেকে নীলিমার মামি প্রশ্নটা করে।
উত্তর আসে- বেশ করেছি! ভাগ্য হাতটা কেটে ফেলিনি এখনো। কলম নাড়ানো…!!! জন্মের মত কলম নাড়ানোর শখ মিটিয়ে দিতাম। কথা বাড়ায়নি নীলিমার মামি। লিমাকে সাথে করে নীলিমাকে ধরে সিএনজিতে করে হসপিটালে নিয়ে যায়। ততক্ষণে জ্ঞান ফিরে নীলিমার ছোট ভাইটার। মায়ের দিকে একরাশ ঘৃনার চোখে একবার তাকিয়ে মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে সেও ছুটতে থাকে হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
জ্ঞান ফিরে নীলিমার। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে রাত্রি ১১টায় বাসায় নিয়ে আসা হয় ওকে। পরদিন ভোর বেলা একরকম জোর করে নীলিমার ছোট দু’ভাই বোন নিয়ে ওর মা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেয়। আসার আগে একমাত্র ছোট ভাই ও ভাবিকে মেয়ের কৃতকর্ম সম্পর্কে সবকিছু জানিয়ে আসেন। এত অসুস্থতার খবর পাওয়া সত্ত্বেও নীলিমা আসেনি, এটা শুনে আবির বুঝে যায় নীলিমার জীবনে ওর স্থানটা কোথায়…!

নীলিমা চলে যাওয়ার পর আবির প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছিল। বাসায় চিৎকার করে কেঁদে উঠত। পরিপূর্ণ জীবনে হঠাৎ বিশাল শূন্যতা ও সামলে উঠতে পারছিল না। বন্ধুরা এসে ওকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। কিন্তু কোনো সান্ত্বনা ওকে বাঁধতে পারল না। আবির কলেজ থেকে ছুটি নিল। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, চন্দ্রিমা উদ্যানে একা একা ঘুরতে লাগল।

আবার শিক্ষকতা শুরু করল। প্রথমে প্রতিটি কাজে ভুল হতো। পরে আস্তে আস্তে সব ঠিক হতে লাগল। আবির স্বাভাবিক হতে লাগল।

দুই বছর পর আবিরের ফোনে একটা কল এলো। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই নারী কন্ঠে বলল, কেমন আছ?
চিনতে অসুবিধে হয়নি, এ নীলিমা। উত্তর দিল আবির, ভালো।
ওপাশ থেকে ভেসে এলো, স্যরি। পুরনো ক্ষতকে নতুন করে জাগানোর কোনো ইচ্ছে’ই আবিরের ছিল না। তাইতো কল কেটে ফোনটা বন্ধ করে ফেলল। অপরপ্রান্তে অন্ধকার রুমে হু, হু করে কেঁদে উঠল নীলিমা। গত একবছর ধরে নীলিমা ঢাকা শহরে। একই শহরেই দু’জনের বসবাস। অথচ নীলিমা পারছে না আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। এতদিন ধরে জমিয়ে রাখা মনের অব্যক্ত কথাগুলো বলতে। হয়তো আর কখনো বলা’ই হবে না….!!!

ফাল্গুনের দু’সপ্তাহ আগে, প্রিন্সিপাল স্যার সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিয়ে মিটিংয়ে বসলেন। আলোচ্য বিষয় এবারের বসন্তের প্রথম দিন ঠিক কিভাবে উৎযাপন করবেন। আলোচনা চলল টানা ৩ঘন্টা, আলোচনার এক পর্যায়ে বক্তব্য রাখেন হিসাববিজ্ঞানের সাইফুল স্যার। ওনি চান, কলেজে এবার বসন্ত উৎসবের পাশাপাশি প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের পূর্নমিলনীর ব্যবস্থা হোক। প্রিন্সিপাল ওনার সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানান। জানিয়ে দেয়া হয় ২০** সালের ব্যাচের সকল প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের কল করে যাতে বিষয়টা জানিয়ে দেয়া হয়। আবিরকে বলে দেয়া হয় আবির যেন নীলিমাকে বিষয়টা জানিয়ে দেয়। সেদিন কলেজের হয়ে মেসেজের মাধ্যমে আবির নীলিমাকে বিষয়টা জানায়। খুশিতে লাফিয়ে উঠে নীলিমা। অনুষ্ঠানের দিন নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই নীলিমা কলেজের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছিল, পথিমধ্যে এক বৃদ্ধার এক্সিডেন্ট হলে ওনাকে হসপিটালে দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে তবেই রওয়ানা দেয়। নীলিমা কলেজে পৌঁছতে পৌঁছতে অনেকটা দেরী হয়ে যায়, ততক্ষণে অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গেছে। সঙ্গীত অনুষ্ঠান পরিচালনার পুরো দায়িত্ব ছিল বাংলার অধ্যাপক আবিরের উপর।

” কলেজের সকল প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীদের তাদের নিজ নিজ আসন গ্রহন করার বিনীত অনুরোধ করা হচ্ছে। কলেজ গেইট থেকেই নীলিমা মাইকে আবিরের কন্ঠটা শুনে নেয়। কম্পন শুরু হয়ে যায় ভিতরে। ভীরু পায়ে কলেজ মাঠে মঞ্চের পাশে একটা চেয়ার টেনে বসে। এখানে এসে নিজেকে খুব অসহায় মনে হচ্ছে নীলিমার। সবাই কিরকম সুন্দর করে সেজে এসেছে। ছেলেরা পাঞ্জাবী আর মেয়েরা বাসন্তী রঙের শাঁড়ি। কি সুন্দর’ই লাগছে সবাইকে। বিশেষ করে আবিরের থেকে তো চোখ’ই সরানো যাচ্ছে না। পাঞ্জাবী’তে অস্থির লাগছে আবিরকে। ইশ! কেন যে আজকে শাঁড়ি পরে এলাম না….!!!!”

নীলিমা মুগ্ধ দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন আবিরকে দেখার তৃষ্ণা এ জন্মে ওর মিটবে না। আবির পাশে বসে থাকা অতিথি মেম জ্যোতি মেয়েটার সাথে কি একটা বিষয় নিয়ে যেন হাসাহাসি করছিল, তখন’ই পিছন থেকে ইতিহাসের অধ্যাপক জনাব মামুনুর রশিদ মাইক হাতে নিয়ে বলতে থাকেন, আবির স্যার! অনেক অপেক্ষা করিয়েছেন। এবার তো শুরু করুন। ওরা যে আপনার কন্ঠের জাদুতে মুগ্ধ হওয়ার জন্য অধির আগ্রহে বসে আছে। আবির মাইকের অনেকটা কাছে গিয়েই বলে, কি করে শুরু করব স্যার? জ্যোতি মেম এত সুন্দর করে রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতে পারে, ওনাকে বললাম আমার সাথে গাওয়ার জন্য, ওনি রাজি হচ্ছেন না…!!!
মন খারাপ করে আবির বলে, ঠিক আছে, আমি একা একা’ই শুরু করছি….. সবাই নড়েচড়ে বসে। আবির গাইতে শুরু করে-

” যদি তারে নাই চিনি গো সেকি…..”

এটুকু বলে আবির থামতেই ডান পাশ থেকে খালি গলায় গেয়ে উঠে নীলিমা-
” যদি তারে নাই চিনিগো সেকি…..
সেকি আমায় নিবে চিনে এই নব ফাল্গুনের দিনে জানিনে…..”

চমকে উঠে আবির মঞ্চের বামপাশে তাকালো, আবিরের সাথে অন্যান্য শিক্ষকরাও তাকালো।

চলবে….

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ০৮

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ০৮
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ক্লাস ভর্তি স্টুডেন্টসদের সামনে এভাবে কান ধরে উঠবস করা, ব্যাপারটা খুব লজ্জার। একশ বার কান ধরে উঠবস করেই নীলিমা ওর জায়গায় গিয়ে বসেছে যদিও অন্য মেয়েরা ২০বারের অধিক উঠবস করেনি। পাশেই ছেলেরা মিটমিট করে হাসছে আর ফিসফিস করে কথা বলছে, লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে থাকা অবস্থা’ই নীলিমার চোখ থেকে দু’ফোঁটা অশ্রু নিচে বইয়ের মাঝে পরে। মাথা নিচু অবস্থায়’ই নীলিমা এক হাত দিয়ে ভেঁজা চোখ মুছে নেয়। সেদিন আর কোনো ক্লাস না করে নিঃশব্দে নীলিমা কলেজ ত্যাগ করে। যে ছেলেরা পাশ থেকে ফিসফাস আর হাসাহাসি করছিল, সেই ছেলেদেরও আবির মাঠের মধ্যে দাঁড় করিয়ে প্রত্যককে একেক ঠ্যাংয়ে ১০টি করে, ২০ ঘা বসিয়ে দেয়। কলেজ ছুটির পর ছেলেরা এ নিয়ে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে নালিশ করে যায়। প্রিন্সিপাল স্যার আবিরকে ওনার কক্ষে ডেকে নেক্সট টাইম যাতে এরকম নালিশ না আসে সে ব্যাপারে হুশিয়ার করে দেন। রাগে গজগজ করে আবির বাসায় চলে যায়। নীলিমাকে ইচ্ছে করেই আবির নেয়নি। কিন্তু আশ্চর্য হলো তখন, যখন বাসায় গিয়ে দেখল নীলিমা তার আগেই বাসায় পৌঁছে গেছে। কলেজ ড্রেস চেঞ্জ না করেই বিছানার এককোণে বালিশ বুকে জড়িয়ে চুপটি করে চোখ বোজে আছে নীলিমা। কিচ্ছু বলেনি আবির। না ধমক, না চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে খাওয়ার কথা। নীলিমাও আবিরের আগমনের শব্দে চোখ টা যে বন্ধ করল, সেটা খুলল আবির সন্ধ্যার আগে বাহিরে চলে যাওয়ার পর।

আবির বাহিরে চলে গেলে উঠে বসে নীলিমা। চোখের পাশে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রুর রেখা মুছে, ড্রেসটা চেঞ্জ করে নেয়। মাগরিবের আজান দিলে নামাজ পড়ে পড়তে বসে। রাত্রি ৮টার দিকে রাতের খাবারের জন্য রান্না বসানো হয়। আবির ফিরে আসে বাসায়। আজ আর কোনো পাগলামি করেনি নীলিমা। আবির আসার পর একবার শুধু তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়েছে। আবিরও কোনো কথা না বলে সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টসদের পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসে পরে। রাত্রি ১০টার দিকে টেবিলে খাবার পরিবেশন করে রুমে যায় নীলিমা। ধীর কন্ঠে আবিরকে জানায়- “টেবিলে খাবার দিয়ে আসছি,
খেয়ে আসেন।”
খাতাগুলো রেখে টেবিল থেকে একটা প্লেট নিয়ে সোফায় নীলিমার পাশে এসে বসে। ভাত মেখে নীলিমার মুখের দিকে এগিয়ে দিতেই, উঠে দাঁড়ায় নীলিমা।
” বিকেলে কলেজ থেকে ফেরার পথে হিয়াদের বাসা থেকে বিরিয়ানি খেয়ে আসছি। আমার দ্বারা আর আজকে খাওয়া সম্ভব না। আপনি খেয়ে নিন।”
কথাটা বলেই বিছানায় একপাশে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে পরে নীলিমা। জবাবে কিছুই বলেনি আবির। শুধু সিক্ত নয়নে একবার নীলিমার দিকে তাকালো। তারপর প্লেটটা টেবিলে রেখে অন্যান্য খাবারগুলো ঢেকে রেখে কিচেনের লাইটটা অফ করে দেয়। চুপটি করে এসে বিছানায় শুয়ে পরে আবির। নীলিমার বিপরীতমুখী হয়ে শুয়ে চোখের জল ছেড়ে দেয়। মনে মনে বলতে থাকে, আমি ওকে এত বড় শাস্তি দিলাম? এ আমি কি করলাম? কিভাবে এটা করতে পারলাম? নিঃশব্দে গুমড়ে কেঁদে উঠে আবির। তারপর একটা সময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়। রাত্রে হাড় কাঁপানো জ্বর আসে নীলিমার। ছটফট নীলিমা কিছু না বলে নিঃশব্দে শুধু বিছানায় এপাশ ওপাশ করেছে। তারপর ভোরের দিকে ঘুমিয়ে পরে।

সকাল হয়ে গেছে।
ফজর নামাজটাও পরেনি
আবার এখনো শুয়ে আছে। রাগ করলে মানুষ এমন করে? নামাজ ছেড়ে দেয়??? প্রশ্নটা করেই নীলিমার হাত ধরে টান দেয় আবির। চমকে যায়। নীলিমার শরীরটা এতটাই গরম ছিল যে আবির তাড়াতাড়ি হাতটা সরিয়ে আনে।
” হায় আল্লাহ! এত গরম কেন এর শরীর?”
কথাটা বলেই ঘুমন্ত নীলিমার কপালে হাত রাখে। আঁতকে উঠে আবির। পুরো শরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে নীলিমার। এখন আমি কি করব? এত সকালে তো কোনো ফার্মেসীও খোলা পাব না। উপয়ান্তর না দেখে আবির ওর রুমাল ভিঁজিয়ে নীলিমার মাথায় জলপট্টি দিতে থাকে। নীলিমার শরীরের তাপমাত্রা এতটাই প্রকট ছিল যে ঐ তাপের প্রভাবে কপালে রুমাল দেয়া মাত্র’ই রুমাল গরম হয়ে যাচ্ছিল। ওমাগো, শরীরটা নাড়াতে পারছি না আমি, খুব ব্যাথা করছে, এসব বলে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ করতে থাকে নীলিমা।
” আজ শুধু মাত্র আমার অবিবেচকের মত কাজের জন্য ওর এই অবস্থা হলো, কথাটা বলেই চোখের পানি ছেড়ে দেয় আবির।”

সকাল ১০টায় ফার্মেসী থেকে ঔষধ আনিয়ে গরম ভাত তরকারী রান্না করে আবির নীলিমার পাশে এসে বসে। ধীর গলায় নীলিমাকে ডাকে।
” নীলিমা! শুনছো….
আর কত ঘুমোবে? সকাল হয়েছে। উঠে পরো এবার”
নীলিমা তড়িগড়ি করে উঠে বসে বিছানায়। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে দিনের ১০টা নাকি রাত্রের নয়টা বাজে? শুকনো মুখে আবিরের জবাব, দিনের ১০টা। সকালের নামাজটা দু’জনেই ঘুমের জন্য মিস দিয়েছি। যায় হোক, পরে কাযা করে নিও। চলো এখন…..

নীলিমা ওর ঘাড় থেকে আবিরের হাতটা ছাড়িয়ে দেয়।
” আপনি আমায় এভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছেন যে? আমি কি যেতে পারি না নাকি?”
নরম স্বরে আবিরের জবাব, তোমার শরীরে জ্বর নীলিমা। পরে যেতে পারো। এখন কথা না বাড়িয়ে চলো তো…..

আবির পিছন থেকে নীলিমাকে জড়িয়ে ধরে নিয়ে যাচ্ছে আর নীলিমা আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছে। ওয়াশরুমে নিয়ে আবির নিজ হাতে নীলিমাকে ব্রাশ করিয়ে দিয়েছে, চোখে মুখে পানিরছিটা দিয়ে দিয়েছে। তারপর আবির ওর কাঁধে রাখা তোয়ালে দিয়ে ভেঁজা মুখটাও মুছে দিয়েছে। হন্যে হয়ে নীলিমা তখনো আবিরের চোখে মুখে কিছু একটা খুঁজে চলেছে। ওয়াশরুম থেকে ফিরে এসে নিজ হাতে আবির যখন নীলিমাকে খাইয়ে দিচ্ছিল, তখনো নীলিমা আবিরের চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা খুঁজছিল। ট্যাবলেটের পাতা থেকে আবির যখন ট্যাবলেট বের করছিল তখন সেদিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে দেয় নীলিমা। মনে মনে চিৎকার দিয়ে নীলিমা ওর ভেতরের সত্তাকে জানান দেয়,
“নীলি! পেরেছিস তুই! তুই পেরেছিস….
যে চোখে একদিন তুই তোর জন্য ঘৃণা দেখতে পেয়েছিলি, আজ সেই চোখে’ই তোর জন্য ভালোবাসার অথৈ সাগর দেখতে পাচ্ছিস। তুই আসলেই পেরেছিস নীলি…..”

সেদিনের পর থেকে নীলিমা পাল্টে যায়, ঘোর পাল্টে যায়। আগের সেই বাচ্চা, বাচ্চা ভাবটি আর ওর মধ্যে নেই। আগের মতো আর পাগলীও করে না। করেনা কারনে অকারনে আবিরকে জ্বালাতন।

অতিবাহিত হয়ে গেল অনেকগুলো বছর। সেদিনের সেই ঘটনা, কলেজে কান ধরে উঠবস করানোর দিন আবির ওর নীলিকে হারিয়ে ফেলেছে, হারিয়ে ফেলেছে আগের সেই বাচ্চা নীলিকে। ওর নীলি এখন আর আগের মত হাসে না, বাচ্চাদের মত আসে না ছুটে ওর কাছে। কাজ থেকে টেনে নিয়ে বলে না, চলুন না! ডাক্তারের কাছে যায়। বাবুটার বয়স কত হয়েছে জেনে আসি। এখন আর কেউ চশমা চুরি করে নিজ চোখে দিয়ে রাখে না। সর্বোপরি, আবির এখন আর কাউকে ধমকাতে পারে না। পারবে কিভাবে? ওর নীলির দিন যে এখন মেডিকেল কলেজের হোস্টেলে পড়াশুনা করে কাটে। মাসে কোনো একদিন মন চাইলে আসে, সাথে সাথে আবার চলেও যাও। যে একটু সময়ের জন্য আবির নীলিমাকে পায়, সে সময়টুকু আবিরের নীলিমাকে চিনতে চিনতেই চলে যায়। নীলিমা চলে গেলে মনকে প্রশ্ন করে আবির-
” এ আমার সেই নীলি তো? যে একসময় আমি ধমক না দিলে খেত না?!”
” এ আমার সেই নীলি তো! একটু ব্যস্ত থাকলেই যে বলত, হু! বুঝি তো আমার দিকে তাকাতে এখন আর ভালো লাগে না, তাই ব্যস্ততার বাহানায় দুরে থাকুন।”

নীলিমা যে সময়টা হোস্টেলে বান্ধবীদের আনন্দে দিন কাটাতো আর আবির সে সময়টা একাকী অন্ধকারে বসে চোখের জল ফেলে কাটিয়ে দিত।

কোর্স শেষে নীলিমা হোস্টেল ছেড়ে দেয়। বান্ধবীদের থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় ফিরে। ২দিন পর’ই আবার ইন্টার্নির জন্য নীলিকে চট্টগ্রাম যেতে হবে। সেখানকার হৃদরোগ ইনস্টিটিউট থেকে ইন্টার্নি শেষে তবেই ঢাকায় ফিরবে। ব্যস্ত নীলিমা বিরামহীন ভাবে যখন ওর জিনিসপত্র গুছাচ্ছে, আবির তখন চুপিসারে বারান্দার এককোণে দাঁড়িয়ে নীলিমার ডায়েরীর পাতায় চোখ বুলায় যেখানে লিখা___
” যে রাত্রি থেকে একজন নারী ও একজন পুরুষের এক নবজীবনের সূচনা ঘটে, অভিনয়টা শুরু ঠিক তার পরদিন থেকে। একটা মেয়ে নিজের বাবা-মা, ভাই-বোন, আত্মীয় পরিজন সবাইকে ছেড়ে শূন্য হাতে শ্বশুর বাড়িতে পা রাখে। সবাইকে ছেড়ে চলে আসলেও তার দু’চোখ ভরা স্বপ্ন আঁকা থাকে অচেনা পুরুষটিকে ঘিরে, যাকে সে কখনো দেখেনি, চিনেনি, জানে নি। আমিও তার ব্যতিক্রম ছিলাম না। বাবাকে হারিয়ে একরকম বাধ্য হয়ে পরিস্থিতির চাপে পরে যখন বিয়ের পিড়িতে বসলাম, তখন চোখ ভর্তি স্বপ্ন ছিল সেই অদেখা রাজকুমারকে নিয়ে, এক মাস্টারমশাইকে নিয়ে। আমার আবিরকে নিয়ে। ৭দিনে একটু একটু করে যে স্বপ্ন আমি আমার বুকে লালন করেছিলাম, সেই লালিত স্বপ্ন নিমিষেই ভেঙে তছনছ হয়ে যায় ভয়ানক সেই ফুলশয্যার রাত্রিতে ওর কথার করাল গ্রাসে। ভালোবেসে বুকে টানার পরিবর্তে ও আমায় তাড়িয়ে দিয়েছিল সেদিন। শারীরিক আঘাত নয়, সে ওর অপ্রিয় কিছু কথার তলোয়ার দ্বারা আমায় আঘাত করেছিল। আমার দিকে চাদর-বালিশ ছুঁড়ে দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিল আমার সঠিক স্থানটা। যে আমি কখনো অন্যায় কিছু সহ্য করিনি, সেই আমি চুপটি করে রুমের এককোণে শুয়ে পরলাম। চোখ থেকে পানি পরেছে কিন্তু ভেঙে পরিনি। পরদিন যখন ও আমার দিকে তাকিয়ে এক পৈশাচিক হাসি দিয়ে বলল, “অভিনয়টা তাহলে ভালো’ই পারো! আমিও এটাই চাই”….
তখন মনে মনে একটাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম_
” যে চোখে আজ আমার জন্য একরাশ ঘৃণা দেখছি, সেই চোখে একদিন আমার জন্য ভালোবাসার অথৈ সাগর দেখতে চায়।” সেদিন থেকেই শুরু হলো অভিনয়ের পালা।
হা, হা! কত বোকা’ই না ও…..
যে আমি অজপাড়া গায়ে বেড়ে উঠেছি, তাকেই কি না বাচ্চা হওয়ার কারন শিখাতে আসে। ওরে! তোদের মত শহুরে ছেলে মেয়েদের চেয়ে আমরা গ্রামের ছেলে মেয়েরা এদিক দিয়ে একধাপ এগিয়ে। যে বিষয়টা তোরা প্রযুক্তির কল্যানে জানতে পারিস, সে বিষয়টা আমরা দাদি, নানি, ভাবীদের থেকে তার অনেক আগেই শিক্ষা পায়। সর্বোপরি আমি একজন সাইন্সের স্টুডেন্ট। আর তাকেই কি না তুই……(……)…..???

নীলিমা সবকিছু গুছিয়ে আবিরের আলমারি শেষমেষ একবার গুছানোর জন্য কাপড়ে হাত দিয়েই ভেতর থেকে আবিরের একটা তালাবন্ধ ডায়েরী নিচে পরে যায়। ডায়েরী তুলে আগের জায়গায় রাখতে গিয়ে নীলিমার ওর নিজের ডায়েরীর কথা মনে হয়।
” কোথায় গেল? খাটেই তো ছিল।”
নীলিমা খাটে রাখা সমস্ত কাপড় এলোমেলো করে ফেলে, খুঁজতে থাকে ওর ডায়েরী। আবিরের সব কাপড় চোপড় এলোমেলো করে তার ভিতরেও খুঁজে নেয়। আলমারির কোনো বক্সে’ই নীলিমা ওর ডায়েরীটা খুঁজে না পেয়ে মাথায় হাত রেখে ফ্লোরে বসে পরে। পিছন থেকে কাঁধে হাত রাখে আবির। ফিরে তাকায় নীলিমা। মলিন মুখে আবির হাতের ডায়েরীটা নীলিমার দিকে এগিয়ে দেয়। আবিরের চোখ মুখ ফ্যাকাসে হয়ে আছে। নীলিমা বুঝতে পারে আবির ওর ডায়েরী পড়ে নিয়েছে। আর এখন ওকে অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। কিন্তু আমি তো আজকে কোনো প্রশ্নের উত্তরের জন্য প্রস্তুত না। মাথা নিচু করে বিছানায় বসে পরে নীলিমা। আবির নীলিমার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ধীর গলায় প্রশ্ন করে-
” ডায়েরীর পাতার কথাগুলো সত্যি?”

মাথা নেড়ে হ্যাঁ-বোধক উত্তর জানায় নীলিমা। আবিরের ভেতরটা ভেঙে চূড়ে গুড়িয়ে যায়। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে পরে যাবে। তারপরও নিজেকে শক্ত করে। নীলিমার দুটো হাত চেপে ধরে বলে-
” আমি জানি নীলিমা তুমি আমার সাথে মজা করছ। তুমি কোনো অভিনয় করতে পারো’ই না। আমার নীলিমা তো এমনি’ই বাচ্চা। ও আমার সাথে কোনো বাচ্চা বাচ্চা অভিনয় করতে পারেই না……”
হ্যাঁচকা টানে হাতটা ছাড়িয়ে নেয় নীলিমা। তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলে,
“আমার নীলিমা, তাই না?”
উত্তর দেয়, হ্যাঁ! আর আমি জানি তুমি আমার সাথে এমন করতে পারো না। তুমি আমায় ভালোবাসো…..

হা, হা! ভালোবাসা?!!……
অট্টহাসিতে মেতে উঠে নীলিমা। হাসি থামিয়ে প্রশ্ন করে, আয়নাকে নিজেকে দেখেছেন আজকাল? চুল অর্ধেক পেকে গেছে, পুরাই একটা বুড়ো বুড়ো লাগে। আর সেই বুড়োকে ভালোবাসবে ডাক্তার নীলিমাকে….?!!!

চলবে…..

[বিঃদ্রঃ- আনাড়ি হাতে গড়া শিল্পকর্ম, আশা করি ভুল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।]

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ০৭

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ০৭
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

যায় হোক!
পরদিনও আবির নীলিমাকে নিজ হাতে শাঁড়ি, চুড়ি পরিয়ে দিয়ে খোঁপায় বেলীর মালা গুজে দেয়। সকাল ১০টা নাগাদ আবির নীলিমাকে নিয়ে নীলিমাদের বাসায় পৌঁছে। কোনো রকম কুশল বিনিময় করেই আবিরকে আবারো রওয়ানা দিতে হয়। নীলিমাদের বাসা থেকে স্কুল খুব কাছেই। ৭মিনিটের পায়ে হাটা রাস্তা। গাঁড়ি নিয়ে যাওয়াতে দু’মিনিটও লাগেনি।

নীলিমার আসার পূর্বেই ওর বান্ধবীরা জমায়েত হয়ে গেছে স্কুলে। নীলিমাকে দেখে দুর থেকে একটা হাসি দেয় “তামান্না”। ও’ই প্রথম নীলিমা আসার খবরটা সবাইকে দেয়। খবর শুনে দৌঁড়ে আসে সবাই। এসেই জড়িয়ে ধরে কেঁদে দেয় একটা মেয়ে। আসলে অনেকগুলো দিন পর বান্ধবীকে পেয়েছে তো তাই হয়তো চোখে জল এসে গেছে। ইতোমধ্যে গাড়ির চারিপাশে ভিড় জমে গেছে। স্কুলের সবচেয়ে সেরা ছাত্রী, সবার প্রাণের “নীলি” এসেছে, সেই সংবাদ শুনে ক্লাস সেভেন, এইটের বাচ্চারাও ছুটে আসে। কেউ কেউ তো দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে আর বলছে- নীলি আপা আইছে, আমাগো নীলি আপা আইছে….. মুহূর্তেই পুরো স্কুল কোলাহলে ছেয়ে যায়। ভিড় ঠেলে কাছে আসেন গ্রন্থাকারের শামীমা মেম। সালাম দিয়ে কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতে পারেনি নীলিমা। তার আগেই মাথায় হাত বুলিয়ে মিষ্টি হেসে গল্প জুড়ে দেন ওনি। আজ অনেকগুলো দিন পর স্নেহের “নীলিমা”কে পেয়ে কথার বলার মাঝখানে চোখের জল ছেড়ে দেন ওনি। নীলিমাকে ওর সহপাঠী বন্ধুরা একরকম টেনে মঞ্চের কাছে নিয়ে যায়। নীলিমা বান্ধবীদের সাথে হাসি, আনন্দ, গল্পে মত্ত হয়ে যায়। অদূরে গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আবির ওর ছোট্ট ডানাকাটা পরীটার প্রাণখোলা হাসি দেখছে।

কিছুক্ষণ পর অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। প্রধান শিক্ষকের চোখ যায় মাঠের শেষ প্রান্তে পলাশ গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি ও তার পাশের ভদ্রলোকটির দিকে।
প্রশ্ন করেন ওনি-
” কে ওনি?”
ছেলে- মেয়েরা নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা উঠে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে প্রশ্নোত্তরে বলে, স্যার! ওনি আমার সাথে এসেছেন। প্রধান শিক্ষক এতক্ষণে বুঝতে পারেন আসল ঘটনা। দপ্তরীকে ডেকে কিছুটা ধমকের স্বরে বলেন, “স্কুলের অতিথিকে যদি এভাবে দাঁড়িয়েই থাকতে হয় তাহলে আপনারা কিসের জন্য?”
মাথা নিচু করে দপ্তরী হাফিজ উদ্দিন জনাব আবির সাহেবকে সসম্মানে অফিসে নিয়ে আসে। অনুষ্ঠান শুরু হয়। প্রথমে পবিত্র কুরআন থেকে তেলওয়াত করবে অত্র বিদ্যালয়ে গর্ভ, বিদায়ী ছাত্রী “নীলিমা”। ইংরেজী স্যারের মাইকে ঘোষনা শুনে বসা থেকে উঠে দাঁড়ায় নীলিমা। যদিও সবসময় ও’ই শুরু করে কুরআন তেলওয়াত থেকে, তবে আজকে কেমন জানি লাগছে। ইতোমধ্যে মাইকে আরো একবার নীলিমাকে ডাকা হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা দৃষ্টিতে নীলিমা ও,প্রান্তে অতিথি আসনে বসে থাকা আবিরের দিকে তাকায়। আবির মাথা নেড়ে ইঙ্গিতে নীলিমাকে তেলওয়াত করতে বলে। নীলিমা মঞ্চে উঠে তেলওয়াত শুরু করে। তেলওয়াত শেষ করে সোজা মাথা নিচু করে নিচে নেমে আসে সে। প্রায় মিনিট পাঁচেক পর আবিরের আসনের দিকে তাকায় নীলিমা। মুগ্ধ দৃষ্টিতে আবির তখনো নীলিমার দিকে তাকিয়ে। মানপত্র পাঠ শুরুর আগে শহীদদের স্মরণে এবার একটা দেশাত্মবোধ গান নিয়ে আসছেন আমাদের অত্র স্কুলের বিদায়ী ছাত্রী “নিলীমা”। নীলিমা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। এমনিতে এখনো হার্টভিট দ্রুত উঠানামা করছে, এখন আবার গানও গাইতে হবে ওনার সামনে। না, না! পারব না। নীলিমা হাত দিয়ে স্যার’কে ওর নাম না বলার বিনীত অনুরোধ করে। স্যার আবারো ঘোষনা করেন, নীলিমাকে অনুরোধ করা হচ্ছে মঞ্চে আসার। বাধ্য নীলিমা মঞ্চে যায়। মাইক হাতে নিয়ে বামে আবিরের দিকে তাকায়। আবির হাসি দিয়ে মাথা নাড়ে। নীলিমা গায়-
” যে মাটির বুকে
ঘুমিয়ে আছে লক্ষ মুক্তি সেনা,
দেনা, তোরা দে….না…..
সে মাটি আমার অঙ্গে মাখিয়ে দেনা….”

সবাই করজোড়ে হাততালি দিয়ে নীলিমাকে অভিনন্দন জানায়। তারপর একে একে সকল কার্যক্রম শেষ হয়ে যায়। সবাইকে মিষ্টি বিতরণ শেষে আলাদা করে পরীক্ষার্থীদের হাতে সুন্দর করে মিষ্টি প্যাক করে দেয়া হয়। অফিস কক্ষে আবিরকেও যথাসাধ্য অতিথীর মর্যাদা দেয়া হয়। সবাইকে সালাম দিয়ে এডমিট কার্ড নিয়ে বিদায় হয় আবির ও নীলিমা।

দেখতে দেখতে পরীক্ষা সন্নিকটে এসে যায়। আবির ওর কলেজ থেকে ৩দিনের ছুটি নিয়ে নীলিমাকে ওদের বাসায় পৌঁছে দিয়ে পরীক্ষার যাবতীয় নিয়মকানুন সম্পর্কে বুঝিয়ে দিয়ে আসে। আসার আগে নীলিমার হাতে একটা ফোন দিয়ে আসে, যাতে করে জানতে পারে নীলিমা কখন কি করছে, কিভাবে পড়ছে? রাত্রিতে তাড়াতাড়ি ঘুমোতে এবং শেষ রাত্রিতে কল দিয়ে ঘুম থেকে তুলে আবির নীলিমাকে পড়তে বসাতো।

পরীক্ষা শেষে রেজাল্ট দেয়। আবিরের দেখাশুনা এবং নীলিমার মেধার জোড় ও আল্লাহর অশেষ রহমতে নীলিমা ভালো রেজাল্ট করে। পুরো বাংলাদেশ থেকে মেধাক্রমে নীলিমা প্রথম হয়।

নীলিমাকে আবির ওর কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়। নীলিমাও এ নিয়ে আর কোনো বাকবিতণ্ডায় যায় নি। কারণ, ও শুনেছে আবিরের কলেজটা খুব নামকরা। অনেক বছরের সুনাম ও গৌরব রয়েছে কলেজটির। কলেজের প্রথম দিন’ই মিশুক নীলিমা ফ্রেন্ডস জুটিয়ে ফেলে। হিয়া নীলিমার বেস্ট ফ্রেন্ড সবচেয়ে কাছের বান্ধবী। হিয়া ছাড়াও নীলিমার আছে আরো ৪,৫জন বান্ধবী। এরা একেকজন একেক গ্রুপের হলেও এদের সাথে নীলিমার রয়েছে আন্তরিকতা। নীলিমা সাইন্সের স্টুডেন্ট। তাই শুধুমাত্র বাংলা এবং ইংরেজী ক্লাসের সময় নীলিমা ওদের সাথে একত্রে বসতে পারত, আড্ডা দিতে পারত।

সেদিন ছিল বোধবার…..
আবিরের বাংলা ক্লাস। নীলিমা ও তার কমার্সের কিছু বন্ধুরা কর্ণারে দুটো বেঞ্চে বসে। সেদিন হিয়া আসেনি বিধায় নীলিমা ওদের সাথেই আড্ডা জুড়ে দেয়। আড্ডা দেয়ার একপর্যায়ে নীলিমাকে একটা বান্ধবী প্রশ্ন করে, কিরে! তোর না বাচ্চা হবে? তো পরীক্ষা করেছিস? নীলিমা শুকনো মুখে উত্তর দেয়, স্যারকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলাম। রিপোর্ট নেগেটিভ আসল। নীলিমার বান্ধবীরা জেনে গিয়েছিল নীলিমা সহজ-সরল, বোকা-সোকা একটা মেয়ে। তাই ওরা ওকে নিয়ে একটা মজা করতে চাইল। আর এক্ষেত্রে নীলিমার বড় দুর্বলতা “বাচ্চা”। সেদিন নীলিমার হাতে ওরা একটা ঔষধ ধরিয়ে দেয়। বলে দেয়-
“নীলি তোর বাচ্চা হবে যদি তুই স্যারের অজান্তে এই ঔষধটা স্যারের জন্য তৈরিকৃত স্যুপ কিংবা অন্য কিছুর সাথে মিশিয়ে খাইয়ে দিতে পারিস।” বান্ধবীদের কথা শুনে নীলিমার চোখে মুখে হাসি ফুটে উঠল। লাফিয়ে উঠে বলল, সত্যি বলছিস তোরা? এটা খাইয়ে দিলেই হয়ে যাবে? ওরা হাসি আটকিয়ে বলল, হুম! হয়ে যাবে….. তুই গোপনে খাইয়ে দিস। আর হ্যাঁ, রাত্রে ঔষধ খাওয়ার পর স্যারের রিয়েকশনটা কিন্তু আমাদের বলতে হবে…! না বললে কিন্তু বাচ্চা হবে না বলে দিলাম… নীলিমা হেসে বলে, আরে! এ নিয়ে চিন্তা করিস না। আমি রাতেই ফোন করে জানাবো।

স্কুল ছুটি শেষে আবিরের সাথে বাসায় চলে যায় নীলিমা। নীলিমার খুশি আর দেখে কে? বাসায় আসার পর থেকে একা একা শুয়ে হাসছে নীলিমা। আবির কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে না। সন্ধ্যায় নামাজের বিছানায় বসে হাসি, কুরআন তেলওয়াত করা থেকে উঠে হাসি, পরতে বসে হাসি, টিভি দেখতে বসে হাসি, রুমে আবিরের সামনে বসে রাতের খাবার খেতে গিয়ে ভাত মুখে নিয়ে হাসি। হাসতে হাসতে নীলিমার নাক দিয়ে ভাত বেরিয়ে আসে। ওমাগো, ঝাল লাগছে, পানি, পানি বলে চিৎকার করতে থাকে নীলিমা। পরীক্ষার খাতা দেখছিল আবির। বসা থেকে উঠে পানি আনার জন্য খাবার টেবিলে রাখা পানির জগটা আনার জন্য জগে হাত দিতেই থমকে যায় আবির। জগের ঠিক পাশেই আবির পাউডার জাতীয় কিছু দেখতে পায়। ঐটা হাতে নিয়েই আবির রুমে যায়। আবিরের হাতে বান্ধবীদের দেয়া ঔষধটা দেখে ভয়ে চুপসে যায় নীলিমা। আবিরের বলার আগেই বসা থেকে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে পরে। ধমকের স্বরে প্রশ্ন করে আবির-
” কি এটা? কে দিয়েছে তোমাকে?”
নীলিমা কাঁপা গলায় জবাব দেয়,
স্যা স্যা স্যাস্যার….
আমার কোনো দোষ নেই। ওরা আমায় দিয়েছে।
ওরা কে? আর কি কারনে দিয়েছে? দ্বিগুন রেগে প্রশ্ন করে আবির। উত্তর দেয় নীলিমা- পপি, জোনাকি, ফাতেমা, ঝুমা… ওরা বলেছে আপনাকে এটা গোপনে স্যুপের সাথে খাইয়ে দিতে। তাহলে আপনি আমায় আদর করবেন। তবেই আমার বাচ্চা হবে।

রাগে কাঁপতে থাকে আবির। ভেবেছিল, বয়স বাড়ার সাথে সাথে ম্যাচিওরিটি’টা চলে আসবে, বুঝতে শিখবে নীলিমা। কিন্তু তার আর হলো কই? কলেজে উঠেও একের পর এক যা ঘটিয়ে চলছে আবিরের তাতে তো মাথা নষ্ট হওয়ার উপক্রম। অন্যদিন মাথা ঠান্ডা করলেও আজ আবির পারেনি নিজেকে কন্ট্রোলে রাখতে। তাইতো ঔষধ বাইরে ফেলে দিয়ে এসে নীলিমাকে ঝাঁঝালো গলায় কড়া কথা শুনিয়ে দেয়, সেই সাথে বলে দেই ওদের সাথে যেন আর কখনো না দেখি তোমাকে। নিশ্চুপ নীলিমা ভয়ে ভয়ে মাথা ঝাঁকায়।

পরদিন যথাসম্ভব এড়িয়ে চলেছে নীলিমা ওর ফ্রেন্ডদের। কিন্তু বাংলা ক্লাসের সময় ওরা ঝেঁকে বসে নীলিমার পাশে। কিরে রাতটা কেমন কাটলো? কিংবা কি হয়েছিলরে রাত্রে? একেকজনের একেক প্রশ্ন আর সেটা নিয়ে হাসাহাসি। নীলিমা উত্তরে কিছু বলার জন্য পিছনে ফিরতেই ক্লাসে আসে আবির। ক্লাসে ঢুকেই আবির নীলিমাকে পিছনে তাকানো অবস্থায় দেখতে পায়। রাগে ফুসতে থাকে আবির। এটা দেখে নীলিমার ভিতরটা কেঁপে উঠে। শুকিয়ে যায় গলা। আবির পড়া জিজ্ঞেস করলে সব গুলিয়ে ফেলে আবিরের লাল চোখ দেখে। বেঞ্চের উপর এক ঠ্যাংয়ে আবির নীলিমা ও তার পড়া না পারা বান্ধবীদের দাঁড় করিয়ে রাখে। প্রায় ১০মিনিট এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখছে, তবুও রাগ কমছিল না দেখে আবির সবগুলারে সামনে আনে। অতঃপর কান ধরে ১০০বার উঠাবসা করতে বসে। একবার কম হলে পরবর্তীতে দ্বিগুন শাস্তি এটা শুনে নীলিমা মনে মনে একদুই গুনতে থাকে আর উঠবস করতে থাকে।

চলবে…..

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ০৬

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ০৬
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ছোট্ট একটা হাত আবির ওর চোখের সামনে দেখতে পায়। আনমনেই মুখে হাসি ফুঁটে উঠে ওর। হাতটা ধরেই আবির বিছানায় উঠে, শুয়ে পরে। পাশাপাশি বালিশে দুজন শুয়ে আছে। নিশ্চুপ আবির পিচ্চি নীলিমার হাসি দেখছে। যখন থেকে পরে গেছে সে, তখন থেকেই হাসার শুরু। একটু একটু করে হাসি বাড়তেই আছে। একপর্যায়ে শুয়া থেকে উঠে বসে হাসতে থাকতে। হাসতে হাসতে পেট ব্যথা হয়ে গেছিল বোধ হয়, তাই ওমাগো করে পেটে হাত দিয়ে মাঝখানে বিরতি নিয়েছিল। এখন আবার হাসার শুরু করছে। হাসতে হাসতে পাশে রাখা কোলবালিশ জড়িয়ে ধরছে আর বলছে- ওমাগো! এতবড় হয়েও পরে যায়….!!!

চুপ করো! ভদ্রতার রেশ মাত্র নেই ভেতরে। কারো বিপদ থেকে মানুষ হাসে??? অনেকটা ধমকের স্বরেই কথাটা বলে আবির। চুপ হয়ে যায় নীলিমা।

অভিমানে নাক, গালটা ফুলে গেছে নীলিমার। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে বিছানা থেকে উঠে চলে যায় সে। প্রথমে আবির ভাবছে হয়তো ওয়াশরুমে গেছে কিন্তু ২৫ মিনিট অতিবাহিত হওয়ার পরও যখন নীলিমা ফিরেনি তখন শুয়া থেকে উঠে, কি করছে নীলিমা এটা দেখার জন্য ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়াই। নিশ্চুপ নীলিমাকে ওয়াশরুমের ঠিক পাশেই মাথা নিচু অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতে পায়। কাছে যায় আবির। ঠোঁট বাকিয়ে বালিকা নিঃশব্দে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে নীলিমা, সাথে নখ দিয়ে নখও কাটছে। মৃদু হেসে কাছে যায় আবির। অনেক দিন হলো পিচ্চিদের কান্না দেখে না, আজ সেই কান্না দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছে পিচ্চির ঠোঁট বাকানো কান্না দেখতে। আর তাইতো আদর করে কাছে টানার পরিবর্তে ধমক দেয় আবির- কত করে বলছি নখ দিয়ে নখ কাটবে না, তারপরও এরকম করছ।আমার কথা কি কানে যায় না? কেঁপে উঠে নীলিমা। ছোট বাচ্চাদের মতই মাথা উঁচু অবস্থায় থেকে’ই চোখটা ঘুরিয়ে আবিরের দিকে নেয়। আবিরের রাগান্বিত দৃষ্টি দেখে আবার নখ কাটায় ব্যস্ত হয়ে পরে নীলিমা, সেই সাথে ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে কান্না। এক টানে বুকে নিয়ে আসে আবির নীলিমাকে। পিঠে, মাথায় হাত বুলাতে থাকে। আদর পেয়ে থামার পরিবর্তে আহ্লাদী আরো ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে।

দিনগুলো এভাবেই কাটছিল হাসি আনন্দে, দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটিতে।

সেদিন ছিল বুধবার_
নীলিমার মনটা প্রচন্ড খারাপ। কারণ, পরদিনই ওর স্কুলের শেষ দিন। অথচ ও যেতে পারছে না। নীলিমাদের ব্যাচের বিদায়ী অনুষ্ঠান। যেহেতু বিদায় অনুষ্ঠানটা ফেব্রুয়ারির ২১তারিখ স্থির হয়েছে, তাই সব মেয়েরা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল সবাই মিলে একই রঙের শাঁড়ি, চুড়ি আর চুলগুলো খোঁপা করে তার সাথে বেলীর মালা পরে স্কুলে সমবেত হবে। নীলিমার মন খারাপ কারন একদিকে ও ঢাকায় আছে, অন্যদিকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ও যেতে পারবে না। কারণ, আবিরের কলেজে নাকি কি পরীক্ষা চলছে। আর না যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ, ও শাঁড়ি পরতে পারে না। ও বাড়িতে আবিরের বোন আদিবা পরিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এখানে তো তেমন কেউ নেই। মন খারাপ করে নীলিমা যখন সোফায় বসে তখন তার পাশে এসে আবির বসল।
মন খারাপ???
মাথা নাড়ে নীলিমা। প্রশ্ন করে আবির, মন খারাপের কারণটা কি জানা যাবে? নীলিমা জানায়, কালকে বিদায় অনুষ্ঠান হবে আমাদের স্কুলে অথচ আমি যেতে পারব না। প্রশ্ন করে আবির, যেতে পারবে না মানে? স্কুলের শেষ দিন আর তুমি যাবে না?! কেন???
জবাব আসে, আপনার স্কুলে পরীক্ষা। কালতো ১১টার সময় অনুষ্ঠান শুরু হবে।
পরীক্ষা শেষ। মন খারাপের কিছু নেই, গাড়ি আছে তো! তো আর সমস্যা কী? সকাল সকাল আমরা রওয়ানা দিয়ে দিব।

—তারপরও যেতে পারব না।(নীলিমা)
—- কেন?(আবির)
—– ওরা সবাই লাল সবুজের শাঁড়ি, লাল চুড়ি, খোপায় বেলীর মালা পরে আসবে।আমার তো আর ওদের মত এতকিছু নেই।(নীলিমা)

বোকা মেয়ে! এই জন্য কেউ মন খারাপ করে? আবির বসে থেকেই ফোন করে ফোন করে ওর বন্ধুর কাছে। বন্ধুকে নীলিমার শাঁড়ি, চুড়ি আর বেলী ফুলের মালার কথা বলে ফোনটা রেখে নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে আবিরের দিকে তাকিয়ে।
ব্যস! বন্ধুকে বলে দিয়েছি। ও নিয়ে আসবে। যেহেতু ও তোমাকে দেখেছে তাই ঠিকঠাক মাপেই সবকিছু কিনবে, কোনো সমস্যা হবে না। এখন চলো তো! খিদে পেয়েছে খুব!

আবির-নীলিমা খাওয়া দাওয়া করে শুয়ে বসে থেকে, আসর নামাজটাও আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু বন্ধুর ফেরার কোনো নাম নেই। আবির ফোন করে বন্ধুকে। জিজ্ঞেস করে, কিরে! শাঁড়ি কি তৈরি করে আনছিস নাকি? এত দেরী কেন হচ্ছে? উত্তর দেয় জোবায়ের, ঠিক’ই ধরেছিস। তৈরি’ই করছি, তাই লেইট হচ্ছে। তবে সেটা শাঁড়ি নয় ব্লাউজ। মেচিং করে কাপড় কিনে বানিয়ে তবেই ফিরছি।
“এইরে! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম। বলেই জিহ্বায় কামড় দেয় আবির।”

সন্ধ্যা ৭টায় জোবায়ের শাঁড়ি, চুঁড়ি, বেলির মালা, সেফ্টিপিন আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস আবিরের বাসায় পৌঁছে দিয়ে যায়।
রাত্রি ১০টার দিকে খাওয়া দাওয়া করে একটু শুয়েছিল আবির। তখন’ই ডাক দেয় নীলিমা। শুনছেন…..!!!
আবির ফিরে তাকায় নীলিমার দিকে। কিছু বলবে? নীলিমা মাথা নিচু করে জবাব দেয়, আমি শাঁড়ি পরতে পারি না। বিছানায় উঠে বসে আবির, পরতে পারো না মানে? আমাদের বাসায় কিভাবে পরেছিলা? মন খারাপ করে জবাব দেয়, ঐটাতো আমি এমনিই পরেছি। পরে দেখলেন না পরে গিয়েছিলাম? তারপর আদিবা আপু পরিয়ে দিয়েছিল……

কিন্তু এখন তো ওরা নেই!(আবির)
—- এজন্য’ই বলছিলাম দরকার নেই যাওয়ার। আমি না হয় পরে ১দিন গিয়ে এডমিট কার্ডটা নিয়ে আসব।(মন খারাপ করে নীলিমার জবাব)

ধমক দেয় আবির!
আবিরের ধমকে কেঁপে উঠে নীলিমা।
—যাও শাঁড়ি নিয়ে আসো।
কোনো কথা না বলে তাড়াতাড়ি আলমারি থেকে শাঁড়ি বের করে আবিরের দিকে এগিয়ে দেয়।
—– শুধু শাঁড়ি কেন? শাঁড়ির সাথে কি আর কিছু পরতে হয় না নাকি?
এবারো নীলিমা তাড়াতাড়ি কাপড় বের করে এনে আবিরের সামনে দাঁড়ায়। আবির মুখে দুষ্টু হাসির রেখা টেনে বলে, ওগুলোও কি আমি পরিয়ে দিব নাকি? এভাবে এগুলো আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছ যে? লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে নীলিমা। মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে। নীলিমার লজ্জা পাওয়া দেখে আবির রসিকতার স্বরে বলে, ওহ! ম্যাডাম তাহলে চাচ্ছে আমি এগুলো পরিয়ে দেই! ওকে, দাও। আবির মুখে দুষ্টু হাসি নিয়ে হাত বাড়াতেই আবিরের হাত থেকে শাঁড়ি নিয়ে দৌঁড় দেয় নীলিমা। আবির হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ে। মিনিট দশেক পর চেঞ্জ করে পরণে কোনো রকম শাঁড়িটা প্যাঁচিয়ে রুমে আসে নীলিমা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায় ঘন্টাখানেক ট্রাই করেও নীলিমা পারেনি ঠিক করে কুঁচি দিতে। না পেরে আয়নার দিকে রাগে চিরুনি ছুঁড়ে মারে। আড়চোখে সবটা দেখছিল আবির। স্মিতহাস্যে এবার বিছানা থেকে নেমে নীলিমার কাছে যায়। আয়নার ভিতর দিয়ে আবিরকে দেখতে পেয়ে মলিন মুখে ঘুরে তাকায় নীলিমা।
আমাকে দাও, আমি পরিয়ে দিচ্ছি। হাসি আটকিয়ে অনেকটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আবির কথাটা বলে।

আহারে! মেয়েটা ঠিক আমার মতই,
সহজ সরল বোকা সোকা। তাইতো দুষ্টু আবিরের এক কথায়’ই রাজি হয়ে যায়। এগিয়ে যায় আবিরের দিকে। সুন্দর করে কুঁচি তুলে নীলিমার দিকে তাকায়।
বোকা নীলিমা কিছু না বলে দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন করে আবির, গুজে দেই???
নীলিমা মাথা নেড়ে “হ্যাঁ” সূচক সম্মতি জানায়। আবিরের চোখে মুখে রাজ্য জয়ের হাসি। কোনো কথা না বলেই কুঁচিগুলো গুজে দিতে দিতে আবির নীলিমার দিকে তাকিয়ে হাসি দেয়। কেঁপে উঠে নীলিমা, তারপরও আবিরের দিকে তাকিয়ে আবিরের সাথে তালমিলিয়ে হাসি দেয়। প্রশ্ন করে নীলিমা, হয়েছে? আবির লক্ষ করেছে লজ্জায় নীলিমার চোখ মুখ কেমন অন্যরকম হয়ে গেছে। বিষয়টা আবির এনজয় করছে। আর তাইতো নীলিমার প্রশ্নের উত্তরে বলেনি, হয়নি! সবেতো প্রস্তুতি ম্যাচ। আবির আবারো শাড়ি নিজ ইচ্ছাতে এলোমেলো করে শাঁড়িতে কুচি তুলতে থাকে। যতবার আবির কুচি গুজে দিচ্ছিল, ততবার’ই শিউরে উঠছিল নীলিমা। পরক্ষণে আবিরের সাথে তালমিলিয়ে অকারণেই হেসে উঠছিল সেও।
এখনো হয়নি? অনেকটা হাফিয়ে উঠে কথাটা বলে নীলিমা। উত্তর দেয়, হ্যাঁ! এদিকটা হয়ে গেছে। এবার উপরে ঠিক করতে হবে। আঁচলটা দাও তো!
নীলিমা আমতা আমতা করে বলে, মামামানে…..?!!!
উত্তর দেয় আবির, সুন্দর করে ভাঁজ করে সেফ্টিপিনে আটকাতে হবে তো। না হলে তোমার বান্ধবীরা হাসাহাসি করবে না তোমাকে নিয়ে? দাও, দাও! দেখি, কিভাবে পরাবো সকালে। নীলিমা কিছু না বলে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে। আবির নীলিমার শাঁড়ির আঁচল ভাঁজ করছে আর মুখটিপে হাসছে। আঁচলটা সেফ্টিপিন দিয়ে আটকানোর সময় আবিরের হাত নীলিমার ঘাড় স্পর্শ করলে নীলিমা কেঁপে উঠে। নজর এড়ায় না আবিরের। নীলিমাকে ছেড়ে দিয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। অনেকটা হিরোর ভাব নিয়ে প্রশ্ন করে, সত্যি করে বলো তো এই যে কুচি তুলে গুজে দিলাম, আঁচল ঠিক করে দিলাম, এতে তোমার কেমন ফিল হয়েছে? মানে তোমার অনুভূতিটা জানতে চাইছি। নীলিমা মাথা তুলে আবিরের দিকে তাকায়। আবির উৎসুক দৃষ্টিতে নীলিমার দিকে তাকিয়ে আছে। কাঁপা কাঁপা গলায় নীলিমার উত্তর, আআআপনি……
আবির খুশি হয়ে বলে, হ্যাঁ আমি…..
আপনি আআমায়…..
হ্যাঁ, বলো আমি তোমায়…….
—- কাতুকুতু কেন দিছেন?(নীলিমা)

ওরে, আমারে কেউ মাইরালা…!!!
কথাটা বলেই ধপাস করে বিছানায় পরে যায় আবির…

চলবে…..

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ০৫

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ০৫
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

বাসা থেকে বেশ ক্ষাণিক’টা দুরে গিয়ে আবির থামে। নীলিমা তখনও দৌঁড়াচ্ছে। নীলিমার জন্য দাঁড়িয়ে ছিল আবির, তখনি আবিরের বাবার ফোন। কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে বলে উঠে-
” এভাবে রাগ দেখিয়ে হনহনিয়ে এক কাপড়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলি, তো বউয়ের কাপড়-চোপড় কেনার জন্য টাকা কি কিছু আছে সাথে?”
উফফ্! বাবা আমি ভুলে গিয়েছিলাম। প্লিজ বাবা আদিবা আপুকে ফোনটা দাও। উতলা কন্ঠে আবিরের জবাব।
এত উতলা হতে হবে না। আদিবা আলমারি থেকে কাপড়-চোপড় বের করছে। তুই মোড়ে একটু দাঁড়া।
ঠিক আছে, বাবা! রাখি…..
আবির কল রেখে পাশে নীলিমার দিকে তাকায়। নীলিমা এতক্ষণে ওর কাছে এসে পৌঁছেছে আর বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলছে। আবির সেদিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে নীলিমাকে, কি হলো হাফাচ্ছ কেন?

নীলিমা:- আপনার জন্য’ই তো….
আবির:- আমার জন্য???
নীলিমা:- তা, নয়তো কি? এভাবে কেউ দৌঁড়ায়?

আবির নীলিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো করে দেখে প্রশ্ন করে, উচ্চতা কত?

নীলিমা:- ৫ফিট, দেড়…..
আবির:- এই জন্য’ই তো…….
নীলিমা:- কি?
আবির:- দৌঁড়াচ্ছ তুমি, আমি নয়।
নীলিমা:-…(মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে)

মিনিট পাঁচেক পর সেখানে উপস্থিত হয় আবিরের বোন আদিবা। নীলিমার হাতে কাপড়ের ব্যাগটা দিয়ে আবিরের হাতে কিছু টাকা তুলে দেয়। অতঃপর বিদায় নেয় আদিবা……
আরো মিনিট দশেক হেঁটে তবেই বাসস্টপে পৌঁছতে হবে ওদের, কারণ এখানে গাড়ি-ঘোড়া পাওয়া যায় না। তাই আবির আবারো হাঁটা শুরু করলে পিছন দিয়ে দৌঁড়ানো শুরু করে নীলিমা। কিছুদুর গিয়েই থেমে যায় আবির। ফিরে তাকায় নীলিমার দিকে। নীলিমা দৌঁড়ে এসে আবিরের সাথে একত্রিত হলো।
দাও, ব্যাগটা আমার কাছে দাও।
নীলিমা হাত বাড়াতেই আবির ব্যাগটা নিয়ে নেয়। তারপর গম্ভীর কন্ঠে বলে, এবার হাঁটো….. পিছনে যাতে না পরো।

নীলিমা:- আজ ছোট বলে…..?
আবির মুচকি হেসে পাশে ফিরে তাকায়। নীলিমা তখন আবিরের সমানে সমানে থাকার জন্য দৌঁড়াচ্ছে রীতিমত।

দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বাড়ি থেকে বের হলেও প্রচন্ড জ্যামে আটকে থাকার কারনে আবির নীলিমাকে নিয়ে সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় নিজ বাসায় পৌঁছে। ক্লান্ত আবির ব্যাগটা আলমারির ভিতর ঢুকিয়ে রেখে বিছানায় ধপাস করে শুয়ে পরে। এদিকে নীলিমা কৌতূহলী দৃষ্টিতে রুমের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে তাকাচ্ছে ঠিক যেমনটা রাস্তায় করেছিল। জীবনের প্রথম শহরে এসেছে, তাই অবাক দৃষ্টিতে বিশ্ব রোডের নিচে দাঁড়িয়ে ঘুরঘুর করছিল নীলিমা। চালককে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে আবির নীলিমার এ হেন আচরণ দেখে মিটিমিটি হাসছিল। নীলিমার তাতে কোনো খেয়াল নেই। ও তখনও গোল হয়ে যাওয়া রাস্তার দিকে ঢ্যাব ঢ্যাব করে তাকিয়ে। কাছে গিয়ে ছুঁয়ে দিতেই হুশ হয় নীলিমার। আরেকবার এভাবে ঘুরঘুর করতে গিয়ে গাড়ি চাপা পরছিল, অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ভাগ্যিস, আবির টান মেরে কাছে নিয়ে আসছে।
এটা রুম, বিশ্ব রোড না। ঘুর ঘুর করা রেখে, ফ্রেশ হয়ে আসো। আবিরের কথায় ঘোর কাটে নীলিমার। যাচ্ছি বলে দরজা দিয়ে বাহির হয়ে আরেক বাসার রুমে প্রায় ঢুকে পরছিল, দরজার সামনে থেকে আবির গিয়ে নীলিমাকে টেনে আনে। তারপর ওয়াশরুমের কাছে নিয়ে যায়।

আবির:- এটা ওয়াশরুম, আর যেখানে ঢুকছিলা ঐটা বেডরুম। সদ্য বিবাহিত এক দম্পতি ঐখানে ভাড়া থাকে।
নীলিমা:- আসলে আমি জানতাম না…(মন খারাপ করে)
আবির:- ইটস ওকে।
নীলিমা:- আপনিও কি এখানকার ভাড়াটিয়া???

ফিরে তাকায় আবির। একটা মুচকি হাসি দিয়ে বলে, এটা আমার বাবার ফ্ল্যাট বাসা। কিনে ভাড়া দিয়ে রাখছে।

সারাদিনের জার্নি,
ক্লান্ত শরীর নিয়ে আবির কিচেনে যেতে পারবে না বলে বাহির থেকে খাবার কিনিয়ে আনল। বিরিয়ানির প্যাক। নীলিমার হাতে একটা দিয়ে আবির খাওয়া শুরু করল। নীলিমা ঢ্যাব, ঢ্যাব করে আবিরের দিকে তাকিয়ে আছে। আবিরের তাতে কোনো খেয়াল’ই নেই। পানি খেতে বোতল নেয়ার সময় হাত বাড়ালেই আবির নীলিমাকে আগের মতই বিরিয়ানির প্যাক হাতে নিয়ে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পায়।

আবির:- কি হলো? দাঁড়িয়ে আছ যে? খাবে কখন?
নীলিমা:- এখন।
আবির:- হুম, বসো….

নীলিমা খেতে খেতে আবিরকে প্রশ্ন করে, আপনার বাবার তো মাশাআল্লাহ অনেক সম্পত্তি আছে। তাহলে আপনি এত কিপ্টা কেন?
What? বিস্মিত চোখে আবির নীলিমার দিকে ফিরে তাকায়। কিপ্টা মানে? কি বলতে চাচ্ছো তুমি?
নীলিমা ভয়ে ঢোক গিলে। তারপর আমতা আমতা করে বলে, না মানে আপনার বাসায় প্লেট নেই তো তাই বলছিলাম।
অবাকের চূড়ান্ত সীমায় আবির, কে বলল প্লেট নেই? আমার যতগুলো খাবার প্লেট আছে, ততগুলো প্লেট কোনো ব্যাচেলর ছেলের নেই।
তাহলে এসবে খান কেন? নীলিমা ওর হাতে রাখা বিরিয়ানির প্যাকটা দেখিয়ে বলে। এতক্ষণে আবির আসল ঘটনা বুঝতে পারে। কোনো রকম হাসি আটকিয়ে বলে, এই শখ হলো আর কি! তাই খেলাম আজকে…..

খাওয়া দাওয়া শেষে আবির নীলিমাকে রুমে বসতে বলে, উপরে ভাড়াটিয়াদের রুমে যায়।

আবির:- আসব?
রিতু:- জ্বি, ভাইয়া আসুন।
আবির:- আড্ডা দিচ্ছিলে নাকি?
মিতু:- খেয়েছি তো, তাই একটু…..
হেনা:- ভাইয়া বসুন।(চেয়ার টেনে দিয়ে)
আবির:- আসলে তোমাদের তো বলেছি’ই সকালে ফোনে তোমাদের ভাবির সম্পর্কে। ও আসছে আজকে আমার সাথে। এখন তোমরা কি সিদ্ধান্ত নিলা?
রোসা:- ভাইয়া আমি তো বেডে একা একা’ই থাকি। ভাবি থাকতে পারবে। আমার কোনো সমস্যা হবে না।
আবির:- ওকে, তোমরা তাহলে পড়াশুনা করো। পরে না হয় ওকে দিয়ে যাব।

আবির রুমে চলে আসল।
নীলিমাকে ভালো ভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে কিছুক্ষণ পর ওদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে চলে আসল।

পরদিন রাত্রিবেলার ঘটনা_
ডিনার করে আবির একটু বাইরে গিয়েছিল, বাইরে থেকে এসে দেখে নীলিমা মুখ ভার করে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রশ্ন করে আবির, কি হলো? মন খারাপ? মন খারাপ করে উত্তর দেয় নীলিমা, আমি ওদের সাথে থাকব না।

আবির:- কিন্তু কেন?
নীলিমা:- ওরা কিসব কথা বলে, হাসাহাসি করে। আমার ভাল্লাগে না।
আবির:- ওরা পড়াশুনা করে একটু মজা করে। আর কথা কিন্তু তুমিও কম পারো না। তাই প্লিজ, আর কোনো অজুহাত নয়, চলো।

আবির নীলিমাকে একরকম জোর করেই উপরে রুমে দিয়ে আসে। রুমে এসে শুইছিল আবির। প্রায় ঘন্টাখানেক বিছানায় ছটফট করে উঠে বসে আবির। কোনো ভাবেই ভালো লাগছে না দেখে ছাদে যায়। ছাদ থেকে ফেরার সময় অনেক হাসাহাসির আওয়াজ আসে রুম ঐ মেয়েদের রুম থেকে। কিসের এত হাসি এটা বলার জন্য দরজার কাছে যেতেই আবির থমকে যায়। কিসব উল্টাপাল্টা প্রশ্ন করছিল ওরা নীলিমাকে।

রোসা:- তোদের একটুও লজ্জা নেই? এই ছোট্ট মেয়েকে কি সব আজেবাজে প্রশ্ন করছিস তোরা?
রিতু:- আজেবাজে নয়, তাই না ছোট আপু? আসো, বসো এখানে।
মিতু:- আচ্ছা, নীলিমা এবার একটু বলো তো বাসর রাত্রে কি হয়েছিল তোমাদের মাঝে?
নীলিমা:- কি হবে?(বোকার মত)
হেনা:- মানে কিভাবে শুরু করছ….?!!!
রিতু:- হ্যাঁ, হ্যাঁ! বলো বলো….
নীলিমা:- কি শুরু করব? আমি ফ্লোরে ঘুমাইছি, আর ওনি খাটে।
মিতু:- ইয়া আল্লাহ! তোমরা আলাদা ঘুমিয়েছিল? তোমাদের হয়নি…?
নীলিমা:- আপু আমি আপনাদের কথা বুঝি না। আর আমার ঘুম পেয়েছে। ঘুমাবো…
নীলিমা উঠতে গেলে ওকে টান দিয়ে হেনা বসিয়ে দেয়। তারপর আবারো প্রশ্ন করে, বলছি তোমার বর কি তোমার শাঁড়ির আচল ধরে টান দেয়নি?
বোকা মেয়ে লাফিয়ে উঠে বলে- হ্যাঁ, আপু! দিয়েছে তো। কালকে সকালে ওনি আমার আঁচল ধরে টান দিয়েছিল।
সবাই একসাথে বলে উঠল, ওয়াও!
রোসা বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠে বলল, ওরে কেউ আমারে মাইরালা।
চুপ কর এলিয়েন! শুয়ে আছিস, শুয়ে থাক। কথা বাড়াইস না। পাশ থেকে রিতুর জবাব।
তোরা কি মানুষ নাকি অন্য কিছুরে? এই ছোট বাচ্চাটার পিছনে কেন লাগছিস? কি লাভ তোদের এসব করে?(রোসা)
আমরা যা ইচ্ছে তাই করব। তুই কেন শুনছিস এসব? তুই কানে তুলা দিয়ে শুয়ে থাক। রোবটের বাচ্চা রোবট….(রিতু)
রেগে যায় রোসা। বিছানা থেকে উঠে, নীলিমার হাত ধরে। বোন তুমি ভাইয়ার রুমে থাকো, ঐটা বেশ নিরাপদ। তবুও এখানে আর এসো না। কথাটা বলে দরজা খুলে রোসা। দরজার সামনে আবিরকে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নীলিমার সাথে সাথে কেপে উঠে রোসাও। কিছু একটা বলতে যাবে রোসা তার আগেই নীলিমার হাত ধরে টানতে টানতে ওকে রুমে নিয়ে যায় আবির। রাগান্বিত গলায় বলা শুরু করে,
রেগে গিয়ে শাঁড়ির আঁচল ধরে টান দিয়েছিলাম, সেটাও ওদের বলতে হলো। বলি তোমার কি নূন্যতম কমন সেঞ্ছ বলতে কিচ্ছু নাই? মন খারাপ করে নীলিমার জবাব, ওরা আমায় জিজ্ঞেস করছে তাই বলছি……
দাঁতে দাঁত চেপে আবির বলে, তাই বলে এসব কথাও তুমি বলে দিবে? গোপনীয়তা বলতে কি কিচ্ছু বুঝো না তুমি? মাথা নিচু করে নখ চিমটাতে চিমটাতে নীলিমার জবাব, আমি তো মিথ্যে কিছু বলিনি। তারপরও ধমকাচ্ছেন কেন?
ধমকাবো না তোমায়, চুমু দিব। ওরা ব্রেন ওয়াশ করছে, আর তুমি কি না….। ভুলটা আমার’ই হয়েছে। যাক।
ড্রিম লাইট’ টা জ্বালিয়ে বিছানার মাঝখানে কোলবালিশ রেখে তার একপাশে নীলিমাকে শুতে বলে আবিরও শুয়ে পরে। মুখটা কালো করে কিছুক্ষণ পর নীলিমাও শুয়ে পরে।
পরের দিন ক্লাস টেনের একসেট বই আর প্রতি বইয়ের জন্য নোট কিনে আনে আবির। বই দেখে আবিরের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে নীলিমা, এগুলো আমার?
হ্যাঁ, তোমার। তোমায় পড়াশুনা করতে হবে এখন থেকে। বাসায় বসেই পড়বা, পরীক্ষার সময় আমিই নিয়ে যাব তোমাদের স্কুলে। চোখগুলো ছলছল করে নীলিমার। মনে হচ্ছে এখনি কেঁদে দিবে।আর হ্যাঁ, এখন থেকে কথা একটু কম বলার চেষ্টা করবা। অযথা বকবক না করে বইয়ে মনোযোগ দিবা। কাজ হবে যেটা। নীলিমা আচ্ছা বলে মাথা ঝাঁকায়।

৬,৭দিন পরের ঘটনা__
আবির কলেজ থেকে ফিরে। বাসায় ফিরে আবির নীলিমাকে কিছুক্ষণ পর পর পেটে হাত বুলাতে দেখে। কিছুটা অবাক হয় আবির। প্রশ্ন করে নীলিমাকে, নীলিমা তোমার শরীর খারাপ? মাথা ঝাঁকিয়ে না বলে নীলিমা।
রাত্রে খাবার খেয়ে শুয়েছিল আবির। পাশ থেকে নীলিমা বলে উঠে, শুনছেন! আমি পেটে হাত দিয়েছিলাম কেন জানেন?
মাথা উঁচু করে নীলিমার দিকে তাকায় আবির। প্রশ্ন করে, কেন?
উত্তর দেয় নীলিমা, দেখছিলাম বাবু আছে কি না পেটে।
চমকে উঠে আবির, What? কিসের বাচ্চা? কার বাচ্চা?
নীলিমার উত্তর, কার আবার আমার। বিয়ে হয়েছে বাচ্চা হবে না???
কিছুটা ঘাবড়ে গিয়ে প্রশ্ন করে আবির, বিয়ে হলেই বুঝি বাচ্চা হয়?
পন্ডিতের মত জোর গলায় বলে উঠে নীলিমা- না, না! শুধু বিয়ে হলেই হবে না। এক বিছানায় থাকতেও হয়। আমার এক ভাবিরও তো বাচ্চা হয়ছে বিয়ের পর। ওনিও ভাইয়ার সাথে একবিছানায় থাকত। তার কয়দিন পরেই ওনার বমি হতো, মাথা ঘুরত। এরপরে লাবিব হয়েছে….
আমিও তো গতকাল বমি করছি, আমারও তো গাড়ি থেকে নামার সময় মাথা ঘুরছে।(নীলিমা)
নীলিমা, কাল তুমি জার্নি করছিলা। আমার সাথে ঘুরতে গিয়েছিলা। তাই…..
পুরো কথা বলতে পারেনি আবির, তার আগেই গড় গড় করে বলতে থাকে নীলিমা, আমি মোটেও গাড়িতে উঠলে বমি করি না, মাথাও ঘুরে না। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমার পেটে বাবু আছে।

বাচ্চা মেয়ের কথায় দম ফাটানো হাসি আসছিল আবিরের। কিন্তু হাসতে গেলে কারন বলতে হবে
পুচকিটাকে। আবির চাচ্ছে না বাচ্চা মেয়েটার মগজে পোকা ঢুকাতে। চাচ্ছে না বলেই হাসি আটকানোর জন্য অন্য পাশে ঘুরতেই নিচে পরে যায়…..

চলবে……

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব-০৪

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব-০৪
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ব্রেকফাস্টের জন্য রুটি বানিয়েছিল নীলিমা। রুটি আর ডাল। এটা দেখেও কিছুক্ষণ ঘেনর ঘেনর করল ওর শাশুড়ি। একটা রুটি একটু পুড়ে গিয়েছিল, ব্যাস! সেটা নিয়েই শুরু হলো। তারপর বাপজন্মে এমন ডাল দিয়ে রুটি খায়নি, এই সেই, আরো কত কি!
বিকেলে আবির ওর বোন-দুলাভাইয়ার সাথে লুডু খেলছিল আর হাসাহাসি করছিল ড্রয়িংরুমে বসে। নীলিমা উপর থেকে সেটা থেকে থমকে দাঁড়ালো।আবিরের হাসিমুখটার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারণ, এ বাড়িতে আসার পর এই প্রথম নীলিমা আবিরের হাসিমুখ দেখেছে। মানুষটার চেহারার মত হাসিটাও খুব সুন্দর…..
হাসি দেখে ঘোর লেগে যায় নীলিমার। ঘোর কাটে ননাস আদিবার ডাকে। কি হলো? ঐখানে দাঁড়িয়ে কেন তুমি? আসো, নিচে আসো। ননাসের ডাকে সাড়া দিয়ে নিচে নামে নীলিমা।
ঐ মেয়ে! ঐখানে বসছ কেন? এদিকে আসো, আবিরের পাশে বসো। কথাটা বলেই ননাসের হাজবেন্ড জায়গা দিয়ে ওনি আদিবা আপুর পাশে চলে যায়। বসবে না বসবে না করেও কাঁপা কাঁপা দৃষ্টি নিয়ে আবিরের দিকে তাকিয়ে নীলিমা ওর পাশে বসে। পাশে বসার পর নীলিমা লক্ষ্য করেছে আবির কেন যেন একটু পর পর ওর দিকে তাকাচ্ছে। ভয়ের মাত্রা আরো বেড়ে যায় ওর। মাকে চা দিতে হবে, আমি উঠি। মিথ্যে অজুহাত দেখিয়ে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াতেই, তার জন্য কাজের মেয়ে আছে কথাটা বলে নীলিমার ননাস নীলিমাকে আবারো বসায়।
খেলা শুরু হলো।
আবির-দুলাভাই বনাম নীলিমা-আপু।
গুটি চালাচালির সময় আবিরের হাতের সাথে নীলিমার হাত লেগেছে অনেকবার। তারই সূত্র ধরে দু’জনের মধ্যে চোখাচোখিও হয়েছে। তারপর আবার খেলা। খেলায় নীলিমাদের জয় হয়েছে। এ প্রথম লুডু খেলায় আবিরের হার হয়েছে তাও নীলিমার কাছে। খেলা শেষে শাশুড়ির ডাকে দৌঁড়ে যায় নীলিমা। তার সাথে আবিরও উঠে দাঁড়াচ্ছিল, বোন আদিবার কথায় আবারো বসে।
— কিছু বলবা?
বলব না, শুনব। গত পরশুদিন রাত্রে কি, কি হয়েছে তোদের রুমে সেটাই শুনতে চাই।
–আপু, এসব কি বলছ? তুমি না আমার ব….(….)…..???
হুম, বড় বোন হই। তবে সেটা নামেই, কাজে নয়। কাজে হলে ঠিক বাবা বোনের কথা মেনে নিতে।
–কি বলতে চাচ্ছো তুমি?
আমি যা বলতে চাচ্ছি, আশা করি তুই তা বুঝে গেছিস।
—আপু, প্লিজ! এভাবে কথা না ঘুরিয়ে সোজাসাবটা বলো কি বলতে চাচ্ছ তুমি?
আবির! মা অন্যরকম হলেও তোকে আমরা ঠিক ভালো মানুষ ভাবতাম। ভাবতাম, মা না বুঝলেও তুই ঠিক বুঝবি।
কিন্তু আমরা ভুল ভাবছিলাম। যে মানুষকে মানুষের মর্যাদা দিতে পারে না, তার থেকে আর যায় হোক ভালো কিছু প্রত্যাশা করা যায় না।
উপস্থিত হয় আবিরের বাবা। মেয়ের সাথে তাল মিলিয়ে বলে, যে ছেলে শত শত মানুষকে শিক্ষা দেয় মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই, সেই ছেলে কি না এরকম মনের অধিকারী? আমার ভাবতে অবাক লাগছে, এই আবিরকে নিয়ে আমি গর্ভ করতাম!
— গর্জে উঠে আবির! চুপ করো তোমরা। আমি আর নিতে পারছি না।
কেন চুপ করবে ওরা? তুমি বলো মেয়েটার কি অপরাধ? কেন ওর সাথে এরকম ব্যবহার করছ? ও কালো এই জন্য নয়তো??? পাশ থেকে আবিরের দুলাভাই বলে উঠে।
—আবির দাঁতে দাঁত চেপে বলে, আমার কাছে সব মানুষ’ই সমান দুলাভাই।
তাহলে কেন এরকম করছিস?
—- এরকম করছি কারন আমি এধরনের মানুষকে ঘৃনা করি আপু।
হা, হা, হা! এই বললি সবাই সমান। এখনি আবার ঘৃণা? ভালো তো!
— বাবা! হাসার কোনো কথা বলিনি এখানে। তুমি হয়তো জানো না, আমি মনে প্রাণে সব সময় একটা জিনিসই চাইতাম, আর সেটা হলো জীবনসঙ্গীনি হিসেবে পাশের মানুষটা যেরকমই দেখতে হোক না কেন তাকে হতে হবে প্রতিবাদী, শক্তিশালী মননের অধিকারী। কালো হোক, দলা হোক যেরকম’ই হোক আমি শুধু চাইতাম, আমার বউটা শিক্ষিত এবং মার্জিত রুচিবোধ সম্পূর্ণ ব্যক্তি হোক। কিন্তু তোমরা এটা কি করলে?
ওহ! তোর তাহলে প্রবলেম এই জায়গায়…..
— কোন জায়গায়?
এই যে নীলিমা অশিক্ষিত…..
— প্রবলেমটা এই জায়গায় নয় আপু। প্রবলেমটা হলো ওর মন মানসিকতা বড্ড সেকেলে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করার কোনো ক্ষমতায় ওর নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা ওর সাথে আমার যায় না। বিশেষ করে বয়সের ক্ষেত্রে। কোথায় ১৫বছরের এক কিশোরী আর কোথায় ২৭বছরের যুবক। বয়সের ক্ষেত্রে ওর সাথে আমার অনেক ব্যবধান।
ওকেও তুই যোগ্য করে তৈরি করতে পারিস। গড়ে তুলতে পারিস তোর মনের মত, এর জন্য শুধু মনের একটু জোর দরকার। জানিস, নীলিমা স্কুলের ফাস্ট গার্ল….(…)…???
—- আপু, প্লিজ! আমি আর শুনতে চাচ্ছি না। ক্ষমা করো।

আবির কাউকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে রুমে চলে যায়। পুরো রাত ভর আবির চিন্তা করল। সব শেষে আদিবা আপুর কথা মনে হলো। বার বার কানের মধ্যে প্রতিধ্বণিত হতে লাগল ওনার বলা শেষ কথা- “ওকেও তুই তোর মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারিস।” সত্যি’ই কি এটা সম্ভব? আমি ওকে আমার মত করে গড়ে তুলতে পারব? নীলিমা স্কুলের ফাস্ট গার্ল ছিল? শুয়া থেকে উঠে বসে আবির। ড্রিম লাইটের মৃদু আলোয় আবির ঘুমন্ত নীলিমার মুখের দিকে তাকিয়ে আচমকা একটা রহস্যজনক হাসি দেয়।

সকাল ১১টা_
শাশুড়ির জন্য চা তৈরি করে দৌঁড়ে নীলিমা শাশুড়ির রুমের দিকে এগুতে থাকে। নীলিমাকে এভাবে দৌঁড়াতে দেখে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায় আবির। নীলিমা সামনের দিকে এগুচ্ছে, নিশ্চুপ আবিরও ধীর পায়ে নীলিমাকে অনুসরন করছে। পৌঁছে যায় শাশুড়ির রুমে।
” মা! চা…..”
একটা হাসি দিয়ে চলে যাচ্ছিল আবির, হঠাৎ ভিতর থেকে মায়ের চিল্লানোর স্বর ভেসে আসে।
আবির ফিরে তাকায় রুমের দিকে। ওর মা নীলিমাকে হাত থেকে পরে কাপ ভাঙার অপরাধে যাচ্ছে তাই কথা শুনাচ্ছে। অলক্ষ্মী, অপয়া বলে গালি দিচ্ছে। গালি দিচ্ছে বাপ তুলে। কথা ধরে নীলিমা। অনেক সহ্য করেছে, আজ ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। কথায় কথায় বাবা মা তুলে গালিগালাজ, আজ মৃত বাবাকে নিয়ে কথা বলছে। না, আর মেনে নেয়া যায় না।
” ক্ষমা করো মা” আমাকে আজ মুখ খুলতেই হচ্ছে, কথাটা মনে মনে বলে, বলতে শুরু করে নীলিমা-
মা, আপনার কাছে হাতজোড় করছি! দয়া করে, কথায় কথায় বাপ মা তুলে গালি দেয়া এবার বন্ধ করুন। অনেক সহ্য করেছি, আর পারছি না মা।
তুই আমাকে ধমক দিচ্ছিস? কেন? কি করবি? আমি তোর ঐ শয়তান বাপের নাম নিলে কি করবি তুই? আমার নামে নালিশ করবি শ্বশুরের কাছে? আমায় বাড়ি ছাড়া করবি? কালকের মেয়ে হয়ে তুই আমায়, এতটুকু বলে থেমে যায় নীলিমার শাশুড়ি।
কি ব্যাপার? ওনি এদিকে কি দেখছেন বলেই পিছনে ফিরে তাকায় নীলিমা। আবিরকে এভাবে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে নীলিমার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। এদিকে নীলিমার শাশুড়ির মনেও ছোট খাটো ঝড় বয়ে যাচ্ছে, সেটা ওনার মুখ দেখেই বুঝা গেছে।
শাশুড়ি বুঝতে পারছে আবিরের প্রশ্ন থেকে আজ আর নিস্তার নেই। কারণ, ওনি ওনার ছেলেকে খুব ভালো করেই চেনেন। শান্ত এবং গম্ভীর প্রকৃতির আবির সবসময় রাগে না। তবে যখন রাগে তখন কুরুক্ষেত্র বয়ে যায়। ভয়ে আবিরের মা হায় আল্লাহ, হায় আফসোস করছে।
আবির ওর মাকে অবাক করে দিয়ে, নীলিমাকে ফ্লোর থেকে টেনে তুলে। নীলিমা তখন ভাঙা কাপের টুকরো জড়ো করছিল। আর ওর কিছু বুঝে উঠার আগেই আবির ওকে টানতে টানতে রুমে নিয়ে যায়।
নিশ্চয় ওনি মায়ের সাথে তর্কে করার সময় তা শুনে নিয়েছেন। হে আল্লাহ! এখন আমার কি হবে? কেন আমি মায়ের কথা মতো চুপ করে থাকতে পারলাম না। এখন যদি ওনি আমায় তাড়িয়ে দেয়? কি হবে আমার? মা বোন ওরা’ই বা সমাজে মুখ দেখাবে কি করে?
আবির আলমারি খুলে ভিতর থেকে নীলিমাকে থ্রি-পিছ বের করে দেয়। সেটা দেখে ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে নীলিমা। আর মনে মনে বিলাপ করতে থাকে, আজ আর সব গেল। মায়ের কথা না শুনাতে আজ আমার সব শেষ হয়ে গেল। আবির রুম থেকে বের হয়ে যায়। যাওয়ার আগে বলে যায়, ঢাকায় যাব। এসে যাতে রেডি দেখি।
আবির রুম থেকে বের হয়ে সরাসরি মায়ের রুমে যায়। মা তখন কপালে হাত দিয়ে চিন্তিত মনে টিভির সামনে বসে ছিলেন। আবিরকে দেখেও না দেখার ভান করে টিভির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। রিমোর্ট দিয়ে টিভির শব্দটা অফ করে মায়ের দিকে তাকায় আবির। জোর করে মুখে হাসির রেখা টেনে প্রশ্ন করে ওর মা, কিরে কিছু বলবি?
হ্যাঁ_

আবিরে মা:- বস এখানে।
.
আবির:- বসতে আসিনি। ঢাকায় চলে যাচ্ছি, সেটাই বলতে আসলাম।
.
আবিরের মা:- কিন্তু তোর না ৭দিনের ছুটি দিয়েছে?
.
আবির:- দিয়েছিল। একটা জরুরী কাজের কথা মনে পড়েছে, তাই এখন চলে যেতে হচ্ছে। ছুটি’টা ওখানেই কাটাবো।
.
আবিরের মা:- ওহ! কখন রওয়ানা দিবি?
.
আবির:- এখন, আসি। ভালো থেকো।

মায়ের কথা উপেক্ষা করে আবির চলে যাচ্ছিল, কি মনে করে যেন দরজার সামনে থেকে ফিরে আসল। টিভির দিকে তাকিয়ে বলতে শুরু করল- আর একটা কথা! এই স্টার জলসা, জি বাংলার খল নায়িকাদের চরিত্র না ফলো করে, বিটিভি দেখো। বিটিভির সাবানা, কবরী, ববিতা ওদেরকে ফলো করো। আদর্শ মা গঠনে কাজে দিবে এটা।
আর কিছু বলতে পারেনি আবির। গত ৩দিন ধরে আবির নিরবে সব লক্ষ্য করে গেছে কিন্তু বুঝতে দেয়নি মাকে। আজ মেজাজ চরম পর্যায়ের খারাপ হয়ে গেছে। তাই কথাগুলো না বলে পারেনি।এখানে থাকলে হয়তো মাকে উল্টাপাল্টা কথা শুনিয়ে দিতে পারে। কিন্তু আবির রাগের বশে কোনো ভুল করতে চাচ্ছে না। কারণ, শত খারাপ’ই হোক, মা’তো মা’য়।
আবির রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

এদিকে নীলিমা?!!!
আবির রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর হু, হু করে কেঁদে দেয়। মনে মনে বলছে, তার মানে আমার ধারনায় ঠিক। ওনি আমাকে বিদায় করে দিবে চিরতরে এ বাড়ি থেকে। ঢাকায় গিয়ে হয়তো আমায় ছেড়ে দিবে। হে আল্লাহ! এখন আমার কি হবে?
খাটে বসে বসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করছে নীলিমা। ঠিক তখনি রুমে প্রবেশ করে আবির। আবিরের রক্তলাল চোখ দেখে থরথর করে কাঁপতে থাকে নীলিমা। কাঁপতে কাঁপতেই খাট থেকে উঠে দাঁড়ায়।
— কি হলো? এভাবে ছাগলের মত ভ্যাঁ, ভ্যাঁ করছ কেন?
কান্না থামিয়ে মাথা নিচু করে আছে নীলিমা। ঝাঁঝালো কন্ঠে আবির বলে, কথা কি কানে যাচ্ছে না? শাঁড়ি চেঞ্জ করে থ্রি-পিছ পরতে বলছি।
আমি এ বাড়িতেই থাকব। কোথাও যাব না। তাই আমি চেঞ্জও করব না, কান্নাভেঁজা কন্ঠে নীলিমার জবাব।
তোমাকে চেঞ্জ করতে হবে না। আমি’ই করিয়ে দিচ্ছি। দাঁতে দাঁত চেপে নীলিমার শাঁড়ির আঁচল ধরে টান মারে আবির।
না, প্লিজ….. আমি করতে পারব। প্লিজ, আপনি এরকম করবেন না। আমি পরব শাঁড়ি। চোখ দুটো বন্ধ করে নীলিমার জবাব।
ঠিক আছে। ১০মিনিট। ১০মিনিটের ভিতর আমি রেডি চায়। কথাটা বলেই দরজা আটকে দিয়ে বাইরে চলে যায় আবির।

১০মিনিট পর___
থ্রি-পিছ পরে মাথা নিচু খাটের একপাশে বসে আছে মায়া। আর ওর চোখ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে অশ্রু পরছে।
চলো…
হঠাৎ’ই নীলিমা আবিরের পা জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে থমকে দাঁড়ায় আবির। কিছু বলতে যাবে তার আগেই নীলিমার বিলাপ- হাত জোর করছি আমায় মাফ করে দিন। আমার ভুল হয়ে গেছে, দয়া করে আমায় মাফ করে দিন। আমি আর কখনো মায়ের মুখে মুখে কথা বলব না, আমার বাবার নামে শপথ করে বলছি। আমায় মাফ করুন, দয়া করুন আমায়। দয়া করে আমাকে তালাক দিবেন না।
শেষ কথাটা শুনে মাথা গরম হয়ে যায় আবিরের। পা থেকে উঠিয়ে ঠাস করে নীলিমার গালে কষে একটা থাপ্পর মারে সাথে সাথে। নীলিমা চুপসে গিয়ে আবিরের চোখের দিকে তাকালো।
দ্বিতীয় বার কখনো যদি এরকম ফালতু কথা বলতে শুনি না, তাহলে এক থাপ্পরে মুখের সব কয়টা দাঁত ফেলে দিব।
পা চালাও….

এবার আর জোর করতে হয়নি। আবির সামনের দিকে চলছে, আর নীলিমা কোনো কথা ছাড়া’ই আবিরের পিছন পিছন দৌঁড়াচ্ছে।

চলবে….

ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব-০৩

ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব-০৩
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

– আসলে পায়ের সাথে শাঁড়ি প্যাঁচ লাগছিল তো তাই বুঝতে পারিনি। মাফ করবেন।
আবির নীলিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে মৃদু হেসে বলে উঠে, শাঁড়ির আর কি দোষ? মানুষের দেহের চেয়ে বড় তো দেখি শাঁড়ি।
ভীরু চোখে নীলিমা আবিরের দিকে তাকায়। আবিরের বুকের প্রশস্ত লোমগুলোর দিকে দৃষ্টি যায় নীলিমার।আবির কিছুটা লজ্জা পেয়ে সাথে সাথে অন্যদিকে ঘুরে যায়। ভ্যাবাচ্যাকা নীলিমা ভ্রু কুঁচকে বিষয়টা কি হয়েছে বুঝার চেষ্টা করছে।
“আমার তোয়ালে…..”
এতক্ষণে নীলিমা বুঝতে পারে আবিরের হঠাৎ এভাবে ঘুরে যাওয়ার কারন। কোনো কথা না বাড়িয়ে নীলিমা তোয়ালেটা রেখে চলে আসে ওখান থেকে।

শরীরটা মুছে শরীরে কোনো রকম তোয়ালে প্যাঁচিয়ে দরজা ধাক্কা দিয়ে রুমে প্রবেশ করে আবির। দরজার ওপাশ থেকে ওহ মাগো করে বেরিয়ে আসে নীলিমা। নীলিমাকে কনুইয়ে হাত রেখে ফ্লোর থেকে উঠতে দেখে কিছুটা ভড়কে যায় আবির।
প্রশ্ন করে নীলিমাকে, আপনি? আপনি এখানে কি করে?
গাঁধা ফুলের মালা, দেয়ালের সাথে আটকানো। ঐটায় নামাতে গিয়েছিলাম। কাঁপা স্বরে কথাগুলো বলে নীলিমা আবিরের দিকে তাকায়। আবির দরজাটা ধাক্কা দিয়ে মিশিয়ে দেখে দরজার পাশে একটা বড় চেয়ার আর তার পাশে আদিবা আপুর বাচ্চার ছোট চেয়ার রাখা। সেগুলোর দিকে ইঙ্গিত করে প্রশ্ন করে আবির, তো এগুলো এখানে কেন? আদিত্যর চেয়ার এ রুমে কেন?
মাথা নিচু করে নখ চিমটাতে চিমটাতে নীলিমার জবাব, ২চেয়ার একসাথে করে উপরে উঠে মালাটা নামাতে চেয়েছিলাম।
আবির এতক্ষণে বুঝতে পারে নীলিমার ওমাগো করে ফ্লোর থেকে উঠার আসল কারন। স্মিতহাস্যে আবিরের জবাব, ঐটাতো উঁকি দিয়েই নাগাল পাওয়া যায়। তার জন্য এত চেয়ারের কি দরকার?
আমি তো আপনার মত বড় মানুষ না…!!! আপনি তো বড়, তাই আপনার উঁকি দিলেই চলবে।
গলা ছেড়ে হেসে দেয় আবির। মুখে হাসির রেখা নিয়েই প্রশ্ন করে, তাই বুঝি!
প্রশ্নোত্তরে “খেতে আসুন” বলেই নীলিমা রুম ছেড়ে পালায়।

রাত্রের ঘটনা_
বিকেলেই সব মেহমান বিদায় নিয়েছে। এই জন্য রাত্রে ঠিক কি পরিমাণ চালের ভাত রান্না করে তা জানার জন্য নীলিমা শাশুড়ির রুমে যায়। শাশুড়ি তখন স্টার জলসা, জি বাংলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। নীলিমাকে প্রবেশ করতে থেকে নাটকের সাউন্ডটা একটু কমিয়ে ফেলে। ধীর গলায় নীলিমা তার শাশুড়িকে ডাক দেয়। প্রশ্ন করে, মা! বলছি মেহমানরা সবাই তো চলে গেছে, বাসায় তো এখন কয়েকজন আছি, খুব বেশী ভাত লাগবে না মনে হয়। এখন কি পরিমাণ চালের ভাত রান্না করব? প্রশ্ন শুনে নীলিমার শাশুড়ি বন্ধ করে ফেলে টিভি। তারপর চিল্লানো শুরু করে। ওনার চিল্লানো শুনে কাজের মেয়েসহ ছুটে আসে আবিরের বাবা। এসে দেখে নীলিমাকে খুব তিক্ত কথা শুনাচ্ছে ওনার স্ত্রী। পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য আবিরের বাবা নীলিমাকে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে’রে মা? উত্তরে নীলিমার শাশুড়ি যা বলে তা শুনে শ্বশুর, কাজের মেয়ে অবাক দৃষ্টিতে শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। ওনার কথা বিশ্বাস করতে যেন ওদের কষ্ট হচ্ছে। হওয়ার’ই কথা। শাশুড়ির ভাষ্যমতে, নীলিমা ওর শাশুড়িকে নাকি বলেছে যে ওনার বাপের বাড়ির মানুষজন একটু বেশী খায়। এখন তো ওরা চলে গেছে, এখন কি পরিমাণ চালের ভাত রান্না করবে।
নীলিমার শ্বশুর কাজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে, যা! তোর ভাবিরে নিয়ে যা। রান্না শুরু কর গিয়ে। আর কোনটায় কি পরিমাণ মসলা দিস সেটা ভালোভাবে দেখিয়ে তবেই রান্না করিস। মাথা নেড়ে নীলিমাকে নিয়ে রুম থেকে চলে যায় কাজের মেয়ে।
আদিবার মা এখনো সময় আছে চিন্তাধারা, মন-মানসিকতা পরিবর্তন করো। না হলে তোমায় পরে প্রস্তাতে হবে। ভুলে যেও না, তুমিও একজন মেয়ের মা। জবাবে কিচ্ছু বলেনি নীলিমার শাশুড়ি। শুধু মুখটা কালো করে অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়।

রাত্রে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষে সবাই সবার রুমে চলে গেলে ভয়ে ভয়ে নীলিমা আবিরের রুমের দিকে পা বাড়ায়। আবির বিছানায় চুপটি করে বসেছিল। নীলিমাকে দেখে কিছুটা নড়ে বসে।
” কি হলো? ঐখানে দাঁড়িয়ে কেন? আসেন।”
ধীর পায়ে নীলিমা রুমে প্রবেশ করে।
আবির বিছানায় আর নীলিমা সোফায় চুপটি করে বসে আছে। কারো মুখেই কোনো কথা নেই। এভাবে মিনিট ত্রিশেক অতিবাহিত হওয়ার পর মুখ খুলে আবির বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলে, রাত তো অনেক হয়েছে। শুয়ে পরুন। আমি একটু বাইরে যাচ্ছি।
আবির বাইরে চলে গেলে নীলিমা সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। খাট থেকে একটা বালিশ নিয়ে রুমের এককোণ ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে গুটিসুটি মেরে সেখানটায় শুয়ে পরে।
বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়া শেষে রাত্রি সাড়ে এগারোটার দিকে বাসায় ফিরে আবির। দরজাটা ফাঁক করে রুমে ঢুকে আবির খাট ফাঁকা দেখতে পায়।
“ও কি তাহলে ঘুমায়নি এখনো?”
হয়তো বাথরুমে গেছে এটা ভেবেই আবির চুপটি করে বিছানার একপাশ খালি রেখে অন্যপাশে গিয়ে শুয়ে পরল। কিন্তু একি? আধ ঘন্টারও বেশী সময় হয়ে গেল, ও আসছে না কেন? বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় আবির। বাথরুমে গিয়ে নীলিমাকে না পেয়ে চমকে যায়। এত রাত্রে কোথায় গেল তাহলে? বাসায় তো সবাই ঘুমিয়ে গেছে। নীলিমা, নীলিমা করে ডাকতে ডাকতে রুমে যায়। কোণায় কিছু একটা নড়ছে, কি ওখানে? আবিরের দৃষ্টি যায় রুমের এককোণে যেখানে নীলিমা গুটিসুটি মেরে শুয়ে ছিল। আবিরের ডাক শুনে শুয়া থেকে উঠে বসে নীলিমা। বাচ্চাদের মত চোখ কচলে আবিরের দিকে ফিরে তাকায় সে। ভয়ে ভয়ে প্রশ্ন করে আবিরকে, কি হয়েছে?
আবির মাথা ঝাকিয়ে উত্তর দেয়- না, কিছু না! ওহ, বলে নীলিমা পূর্বের ন্যায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পরে।
আবির দাঁড়িয়ে থেকেই প্রশ্ন করে, ফ্লোরে শুয়ে আছেন কেন? প্রশ্ন শুনে, শুয়া থেকেই আবিরের দিকে তাকায় নীলিমা। ইতস্তত আবির বলে, না মানে আপনার কোনো অসুবিধা হবে না তো ফ্লোরে ঘুমাতে?
তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে নীলিমার জবাব, আমার বাবার আপনাদের মত এত বড় বাড়ি নেই। আমাদের একটা ছোট্ট ঘর আছে। তার মাঝে বেড়া দেয়া। ঘরে একটাই মাত্র পুরনো চৌকি। বাবা, মা, আর ছোট্ট ভাইসহ আমরা ৫জন সেই চৌকিতেই ঘুমিয়েছি অনেক বছর। তার একটু বড় হতেই আমি আর লিমা ওনাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। আমাদের জন্য ঘরের মাঝখানে বেড়া দিয়ে তার পাশে বিছানা করা হয়। সেই থেকে খেজুর পাতার চাটাই পেতে আমি আমার বোন মাটিতে ঘুমাতাম। সেই মেয়েকে আপনি অসুবিধের কথা বলছেন?
চুপ হয়ে যায় আবির। চোখের কোণে অশ্রুরা জড়ো হয়। লাইট’টা অফ করে চুপটি করে শুয়ে পরে আবির। কপালে হাত রেখে শুয়ে আছে আবির। ওর কানের কাছে বার বার বন্ধুর বলা কথাগুলো প্রতিধ্বণিত হচ্ছে-
” বাবা-বোন-দুলাভাইয়ের সাথে রাগ, প্রথম রাতেই বউয়ের সাথে উঁচু গলায় কথা, ধমক, বালিশ ছুঁড়ে দেয়া এসবের কারন একটাই। আর সেটা হলো মেয়েটা কালো। তোর মনের মত নয়। আমরা বুঝে গেছিরে আবির, যতই মুখে বড় বড় কথা বলিস তুই ঠিক অন্য ৮,১০টা মানুষের মতই। ঘৃণা করিস কালোদের। বাঁকা দৃষ্টিতে দেখিস। শিক্ষিত হলেও তোর মন-মানসিকতা, চিন্তা-ধারা প্রাচীন কালের মানুষের মতই রয়ে গেছে আবির।”
আবির ভাবছে, সত্যি’ই কি আমার চিন্তাধারা এরকম? আমি কি সত্যি’ই ওর গায়ের রঙে অসন্তুষ্ট? না, না… এ হতে পারে না। যে আবির কলেজে শত, শত ছেলে মেয়েদের নৈতিকতার শিক্ষা দেয়, মানুষের মত মানুষ হওয়ার শিক্ষা দেয়, সে আর যায় হোক অমানুষ হতে পারে না।
আচ্ছা, অমানুষ না হলে আমি ওকে কেন বউ হিসেবে মেনে নিতে পারছি না? ওর অপরাধ কোথায়? কি করেছে ও? কেন আমি ওকে দুরে সরিয়ে দিলাম? এর পিছনে কি কারণ? ওর বয়স নাকি গায়ের রঙ?
উত্তর খুঁজে না পেয়ে বিছানায় উঠে বসে আবির। লাইটটা জ্বালিয়ে ধীর পায়ে নীলিমার দিকে এগিয়ে যায়। মনে হচ্ছে ঘুমিয়ে গেছে। আর ঘুমোবে না? এটুকু মেয়ে হয়েও সারাটা দিন যেভাবে শুধু দৌঁড়িয়ে কাজ করছে, তাতে ক্লান্ত হওয়ার’ই কথা। মাথার বালিশ কনুইয়ের নিচে দিয়ে বেঘোরে ঘুমুচ্ছে নীলিমা। বালিশ ঠিক করতে গিয়ে আবির দেখতে পায় নীলিমার কনুই কেমন কালো হয়ে আছে। মুহূর্তেই সকালের ঘটনার কথা মনে হয়ে যায়। একটা হাসি দিয়ে আবির নীলিমাকে কোলে তুলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দেয়। তারপর গায়ে চাঁদর টেনে দিয়ে, লাইটটা অফ করে চুপটি করে নীলিমার পাশে শুয়ে পরে।

সকালে ঘুম ভাঙলে নীলিমা নিজেকে খাটে আবিষ্কার করে। ভড়কে যায় আরো যখন পাশে শুয়ে থাকা আবিরের উপর ওর একটা পা আর একটা হাত উঠানো দেখে। আমি তাহলে ঘুমের ঘোরে হাঁটতে হাঁটতে এখানে এসে পরলাম না তো? নিশ্চয় আমার পুরনো রোগ জেগে উঠেছে। ভয়ে নীলিমার বুক ধুকপুক করছে। দু’লাফে নীলিমা আবির জেগে উঠার আগে রুম ছেড়ে পালায়।

চলবে….

গল্প:- ফুলশয্যা(সিজন-০২) পর্ব- ০২

গল্প:- ফুলশয্যা(সিজন-০২)
পর্ব- ০২
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়ায় আবির। নীলিমার দৃষ্টি এতক্ষণে আয়নার ভিতর দিয়ে আবিরের দিকে যায়। আবিরের রাগান্বিত চাহনী দেখে ভয়ে কেঁপে উঠে নীলিমা।
“ওনি এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?”
ভয়ে ভয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় নীলিমা।
ভীরু চাহনীতে আবিরের দিকে তাকিয়ে ঢোক গিলে নেয় একবার। আবির তখন আর স্থির দাঁড়িয়ে নেই। একপা দু’পা করে নীলিমার দিকেই এগিয়ে আসছে। এটা দেখে তো নীলিমার কলিজা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। মনে মনে আল্লাহু নাম জপছে। আবির নীলিমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে কঠিন স্বরে প্রশ্ন করে, এসব কি শুরু করছেন? নীলিমা কাঁপা গলায় প্রশ্ন করে, কিকিকিকি কি…???
ঝাঁঝালো গলায় আবিরের পাল্টা প্রশ্ন, কিসের গোসল এটা? লজ্জায় নীলিমা মাথা নিচু করে ফেলে। আবারো আবিরের তাড়া, কি হলো? জবাব দিচ্ছেন না যে? নীলিমা তখনো মাথা নিচু করে আছে। কি করে বুঝাবে ও সেটাই বুঝতে পারছে না। কি করে বলবে-
” আর যায় হোক, কেউ অন্তত এটা বিশ্বাস করবে না একটা ছেলে একটা মেয়ে ফুলশয্যার রাত্রে একই রুমে থাকার পরও তাদের মধ্যে কিছুই হয়নি। আর তাইতো….”
কি হলো? চুপ করে আছেন যে?

নীলিমার কোনো জবাব নেই দেখে, আবির অট্টহাসিতে ফেটে পরে। আবিরের এমন রহস্যজনক হাসির কারন বুঝতে পারে না ছোট্ট নীলিমা। বোকার মত শুধু ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে আবিরের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর হাসি থামিয়ে নীলিমার মুখের দিকে মুখ নিয়ে যায়। নীলিমা চোখ দু’টি বন্ধ করে ফেলে। আবির দৃঢ় গলায় বলে, অভিনয়টা তাহলে ভালো’ই পারেন।
Good, Very good….
আমিও এটাই চাই। আমাদের মধ্যকার কথা যাতে বাহিরে না যায় আমি সেটাই চাই। যাক, এ ব্যাপারে তাহলে আমায় আর কিছু বলতে হবে না। নীলিমা চোখ মেলে তাকায়। আবির ওয়াশরুমে চলে যায়। জল ছলছল দৃষ্টিতে নীলিমা আবিরের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে।

অজপাড়া গায়ের এক নিম্নবিত্ত পরিবারের মেয়ে নীলিমা। সেখানেই ওর বেড়ে উঠা। এতবড় বাড়ি, এত সুন্দর পরিবেশে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য নীলিমার আগে কখনো হয়নি। আজ তাই রুম থেকে বের হয়ে প্রত্যেকটা কদমে কদমে মুগ্ধ দৃষ্টিতে নীলিমা এদিক সেদিক তাকাচ্ছে।
” ছমিরের মাইয়্যা নিলীর তো কপাল খুইল্যা গেছে। বড় ঘর থেইক্যা লোক নীলুরে দেইখ্যা গেছে। সামনের মাসেই বিয়া।”
” শুনেছি পোলার বাপটা নাকি সিদাবিদা। অনেক ভালা।”
” বড় বইনড্যাও ভালা। খালি শাওরি’ডাই কিরাম মুখ কালা কইরা আছিল।”
” জামাইডা পুরা হিরার টুকরা। হুনলাম শহরের বড় কলেজের মাস্টার।”
” হ, সব’য় কপাল। কালা অইলে কি অইব, মাইয়্যার কপাল ভালা। কপাল গুনেই এত বড় ঘরের বউ অইতে পারছে।”
নীলিমা শুনেছে। শ্বশুর বাড়ির এমন হাজারো গুনকীর্তন নীলিমা বিয়ের আগেই শুনেছে। আর সেই শুনা থেকেই নীলিমা শ্বশুর বাড়িটা মনের গভীরে কল্পনার তুলিতে এঁকে নিয়েছে। আজ এ বাড়িতে আসার পর মনে হচ্ছে যা শুনেছে, যা কল্পনা করেছে এ বাড়িটা তার থেকেও বহুগুনে সুন্দর। যা দেখে ঘোর লেগে যায় নীলিমার। ঘোর কাটে শ্বশুরের ডাকে।
” কিরে মা? বাড়ি দেখা হলো?”
নীলিমা মাথার ঘোমটা’টা টেনে মিষ্টি হেসে মাথা ঝাকায়, জি আব্বা!
” হুম! তা পছন্দ হয়েছে তোর শ্বশুর বাড়ি?”
শ্বশুরের প্রশ্নোত্তরে মৃদু মাথা নেড়ে, শাশুড়ির রুমে ঢুকে নীলিমা। শাশুড়ি তখন খাটে হেলান দিয়ে বসে পান চিবুচ্ছে। নীলিমা কাছে গিয়ে সালাম দেয় শাশুড়িকে। আধশোয়া থেকে উঠে বিছানায় বসেন ওনি। মা! বলছিলাম কি সকালের জন্য কি ভাত রান্না করব?
নীলিমার শাশুড়ি ভ্রু কুঁচকে নীলিমার দিকে তাকান। চোখে মুখে কেমন বিরক্তির ছাপ ফুটে উঠেছে ওনার। আর সেই বিরক্তিভাব নিয়েই প্রশ্ন করেন নীলিমার শাশুড়ি, কেন? বাপের বাড়িতে সকালে কি কখনো রান্না হয়নি? নাকি বাপ মা শেখায় নি কখনো?
বাপ মা তুলে কথা বলাটা নীলিমা একদম সহ্য করতে পারে না। নীলিমা যথেষ্ট প্রতিবাদী মেয়ে। গ্রামে থাকলে এতক্ষণে কেউ বাপ মা তুলে কথা বললে এর উপর্যুক্ত জবাব দিয়ে দিত। কিন্তু আজ পারছে না। কারন, এ বাড়িতে আসার আগে নীলিমার মায়ের শেষ কথা ছিল- মা’রে! পরের ঘরে যাচ্ছিস। যেখানে খুব ভেবে চিন্তে একেকটা কদম ফেলতে হয়। তাই দয়া করে যত কিছুই হোক মুখে মুখে প্রতিবাদ করিস না। পরে রাগ কমলে বুঝিয়ে বলবি। নীলিমা তাই শাশুড়ির মুখের কথায় কিচ্ছু বলেনি। চুপটি করে নীলিমা রুম থেকে বের হয়ে গিয়ে রান্নাঘরে ভাত বসায়। কাজের মেয়েটা ছুটে এসে কিছু একটা বলতে চাইছিল নীলিমাকে, তার আগেই মেয়েটাকে সরিয়ে নেয় শাশুড়ি।

সকাল ০৮টা_
টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজিয়ে রাখছে নীলিমা। নিজেকে কেন যেন আজ ওর বাংলা সিনেমার কিংবদন্তি নায়িকা সাবানার মতই লাগছে। কিরকম কারো কোনো হেল্প ছাড়াই টেবিলে খাবারগুলো থরে বিথরে সাজিয়ে রাখছে।
সবাই এসে টেবিলে বসেই “থ” হয়ে যায়। নীলিমার তিন মামী শাশুড়ি সহ, তিন মামা, ননাস, ননাসের জামাই সবাই, সবাই কেমন হা করে একবার খাবার তো আরেকবার নীলিমার দিকে তাকাচ্ছে। শুধু নীলিমার শ্বশুর কিছু না বলেই খাওয়া শুরু করে দিয়েছে।
” কি হলো? তোমরা বসো?!!!
দেখো কি মজাই না হয়েছে। নীলিমা খাবার দে তো ওদের প্লেটে।”
শ্বশুরের কথায় কাঁপা হাতে সবার প্লেটে প্লেটে ভাত দেয় নীলিমা। সবার প্লেটে ভাত দেয়া শেষে ভাতের উপর মাছের ঝুল, আলুর টুকরা আর একটা করে মাছ দেয়।
হ্যাঁ, নীলিমা রান্না করেছে। ভাত, আলু ভর্তা আর পাতিল ভর্তি পানি দিয়ে মাছের ঝুল তরকারী। পল্লিগ্রামের ১৫বছরের মেয়ে নীলিমা। সবে ক্লাস নাইন থেকে টেনে উঠেছে। পড়ালেখায় ভালো ছিল বলে সবসময় পড়া লেখা’য় করত। চুলোর আশেপাশে নীলিমা কখনো যায়নি। মায়ের কোনো হেল্প লাগলে নীলিমার মা লিমাকেই ডাকত। তাই রান্না সম্পর্কে নীলিমা কিচ্ছু জানে না। সে’বার মা নানুর বাড়িতে গিয়েছিল। বোনটার গায়েও প্রচন্ড জ্বর ছিল। তাই বাধ্য নীলিমা সেদিন’ই প্রথম রান্না করে। আলু ভর্তা, আর ডিম ভাজি। বিকেলে রান্না করেছিল মাছের ঝুলের তরকারী। এটুকুই শিখেছিল নীলিমা সেদিন। আজও তাই ঠিক এগুলোই রান্না করেছে নীলিমা।
সবাই খাওয়া শেষে টেবিল ছেড়ে চলে গেলে নীলিমার শাশুড়ি তিক্ত গলায় নীলিমাকে কথা শুনায়_
” এই মেয়ে! তোমার বাপ মা কি রান্নাও শেখায়নি তোমাকে….(……)….???”
– আহ, আদিবার মা। চুপ করো না। ওকে কেন ধমকাচ্ছ? মা, তুই রুমে গিয়ে দ্যাখ তো আবির উঠছে কি না? নীলিমা মাথা নিচু করে রুমের দিকে পা বাড়ায়। পিছনে ওর শ্বশুর, শাশুড়িকে থামানোর বৃথা চেষ্টা করছে,
” এবার তো একটু শান্ত হও। তুমি কার সাথে রাগ দেখাচ্ছ? ১৫বছরের এই ছোট্ট মেয়ের সাথে?! যার এই সময় ছুটাছুটি করে স্কুলে যাওয়া, খেলাধুলা করার বয়স ছিল তাকে? আরে, এতো এখনো বাচ্চা’ই আছে। এ রান্না শিখে কি করবে? শুধু অন্তিম যাত্রায় বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে ওর শেষ ইচ্ছা পূরন করলাম, যাতে ও মরে শান্তি পায়। আর আমি বুঝি না তুমি কেন ওর পিছনে এভাবে লাগছ! ও বেচারীর কি দোষ? ও তো গিয়েছিল তোমার কাছে আর তুমি কি করছ….(…..)….???
একটু পর থেকেই এলাকার মানুষজন আসা শুরু করবে বউ দেখার জন্য। যে মহিলা ছেলের বউ দেখার জন্য পুরো দুনিয়া ছেকে ফেলেছে সে কি না শেষে অজপাড়া গায়ের কাঠ কাটে কাঠুরিয়ার এমন কালো মেয়েকে পুত্রবধূ করেছে। এ মুখ আমি সোসাইটিতে দেখাব কি করে…..(….)….???

সিড়ির উপরে দাঁড়িয়ে পুরো কথা শুনে চোখের জল ছেড়ে দিয়ে সে স্থান ত্যাগ করে নীলিমা। রুমে ঢুকতেই ভেসে এলো বাথরুম থেকে আবিরের ডাক, মা! আদিবা আপু, কেউ আছ? তোয়ালেটা দিয়ে যাও না একটু। অনেক খুঁজে তোয়ালেটা বের করে অত্যন্ত ধীর গতিতে নীলিমা সামনের দিকে এগুচ্ছে আর শাশুড়ির কথাগুলো ভাবছে। আচমকা শাঁড়ির সাথে পা আটকে হুমড়ি খায় নীলিমা। আবির ঠিক তখনই ওয়াশরুমের দরজা ক্ষাণিকটা ওপেন করে ডাক দিচ্ছিল, লেইট হয়ে যাচ্ছে তো মমম….(….)…???
তার আগেই কেল্লাফতে। হুমড়ি খেয়ে নীলিমা দরজা ঠেলে ভিতরে আবিরের উপর পরে।
নাহ! কোনো সিনেমাটিক স্টাইলে ওরা একে অপরের চোখের গহীনে ডুবে থাকেনি। পরা মাত্র’ই নীলিমা সোজা হয়ে ভয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে। আর আবির চোখ বড় বড় করে সেদিকেই তাকিয়ে আছে।
নিচের দিকে তাকিয়েই কাঁপা গলায় নীলিমা বলে, মাফ করবেন। আসলে শাঁড়ির সাথে….(…..)….???
পুরো কথা বলতে পারেনি নীলিমা। তার আগেই আবিরের রাগী কন্ঠে ভেসে এলো, যেটা পরে নিজেকেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না, সেটা না পরলেই কি নয়?

চলবে….

গল্প:- ফুলশয্যা(সিজন- ০২) পর্ব- ০১

গল্প:- ফুলশয্যা(সিজন- ০২)
পর্ব- ০১
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

Listen Nilima…
আমি আপনাকে বিয়ে করেছি, তার মানে এই নয় আমি এখন’ই আপনার উপর ঝাপিয়ে পরব আমার পুরুষত্ব প্রমাণের জন্য। শরীরের প্রয়োজন তো পতিতালয়ে গিয়েও মেটানো যায়, তার জন্য বিয়ের কোনো দরকার নেই। আমি বিয়ে করেছি। তবে সেটা আমার ইচ্ছেতে নয়, আমার বাবার ইচ্ছেতে। এ বিয়েটা যেহেতু আমার সম্পূর্ণ ইচ্ছের বিরুদ্ধে হয়েছে সেহেতু আমার কাছ থেকে কখনো কোনো Husband type attitude আশা করবেন না।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে আবির বারান্দার দিকে পা বাড়ায়। কি মনে করে যেন আবার ফিরে আসে। নীলিমা তখনও খাটের উপর চুপটি করে বসে আছে। একবার সেদিকে তাকিয়ে বিরক্তিকর ভঙ্গিতে প্রশ্ন করে, আর খাটে এসব কেন? এসব তাড়াতাড়ি সরান। আমি এসেই ঘুমাবো। ফুলের গন্ধে আমার ঘুম আসে না, তাই এসব ফুলটুল যাতে এসে না দেখি।

আবির চলে গেলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে খাট থেকে নিচে নামে নীলিমা। খাটে চেয়ার রেখে তার উপর দাঁড়িয়ে সবগুলো ফুল টেনে নিচে নামালো। চেয়ারটা আগের জায়গায় রেখে ফ্লোরে সরিয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুলগুলো ঝাড়ু দিয়ে একজায়গায় জড়ো করে সবফুল একত্রে একটা বড় কাগজে মোড়ে বারান্দায় রেখে আসে। মিনিট ত্রিশেক পর রুমে আসে আবির। ততক্ষণে নীলিমা রুমটাকে গুছিয়ে ফেলেছে। আবির রুমে আসলে খাট থেকে কিছুটা দুরে মাথা নিচু করে দাঁড়ায় নীলিমা।
” এভাবে মূর্তির মত এখানে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? নিন। শুয়ে পরুন।”
কথাটা বলেই আবির নববধূ নীলিমার দিকে একটা চাদর আর একটা বালিশ ছুঁড়ে দেয়। নীলিমা পায়ের নিচ থেকে চাদর-বালিশটা হাতে তুলে ফ্লোরের একপাশে বিছানা করে আবিরের দিকে তাকায়। আবির তখন ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
” কি হলো? আবারো দাঁড়িয়ে আছেন যে? লাইটটা অফ করে শুয়ে পরুন না এবার। উফফ্, মাথাটা যন্ত্রণা করছে।”
ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে লাইট’টা অফ করে শুয়ে পরে নীলিমা।

বালিশটা মাথার থেকে বেশ ক্ষাণিকটা দুরে।
নিশ্চুপ নীলিমা হাতে ভর দিয়ে শুয়ে আছে। গরীব ঘরে জন্ম নেয়ার সুবাধে অসংখ্য মানুষের অসংখ্য কথা হজম করতে হয়েছে ওকে। নীলিমা জানতো, জীবন খুব বেশী প্রেমময় হবে না। তাই বলে এতটা অবহেলা? মেনে নিতে পারছিল না। চোখ দিয়ে অনর্গল অশ্রু গড়িয়ে পরতে শুরু করে।

শেষ রাত্রিতে ঘুম ভেঙে যায় নীলিমার। ঘড়িতে তখন সময় তিনটা বেজে ০৯মিনিট। চাদর আর বালিশটা সোফায় রেখে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অজু করে ড্রয়িংরুমের এককোণে জায়নামাজ পেতে নামাজে দাঁড়ায় নীলিমা। তাহাজ্জদ নামাজ শেষে আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছে নীলিমা। না চাইতেও কেন জানি নীলিমার চোখে জল এসে যায়, নীলিমা শব্দ করে করুণ আর্তনাদে কেঁদে উঠে। নীলিমার করুণ আর্তনাদে এ বাড়ির চার দেয়ালও যেন কেঁপে উঠে। মোনাজাত শেষে জায়নামাজটা ভাঁজ করে কোণায় রাখতে গিয়ে চোখ যায় দোতলায় দাঁড়ানো শ্বশুরের দিকে। যিনি মুগ্ধ দৃষ্টিতে পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে আছেন। নীলিমা উপরে গিয়ে শ্বশুরকে সালাম দেয়। অজুর পানি দেওয়ার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে পরে। শ্বশুরটা সে স্থানে দাঁড়িয়েই চোখের জল ছেড়ে দেয়।

যদিও রাত্রে তেমন কিছুই হয়নি তবুও গোসলটা সকাল সকাল সেরে নেয় নীলিমা। আবির তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। ড্রেসিংটেবিলে সামনের চেয়ারটাই বসে চুপচাপ তোয়ালে দিয়ে ভেঁজা চুল মুছছিল নীলিমা। ঠিক তখনই আবির জেগে উঠে। নীলিমাকে এভাবে আয়নার সামনে বসে থাকতে দেখে ভ্রু জোড়া কিঞ্চিৎ বাঁকা হয়ে যায় আবিরের। বিছানা থেকে উঠে বসে আবির। নীলিমা তখন চুল আচড়াতে ব্যস্ত। ধীরে কিন্তু রাগান্বিত ভাব নিয়ে আবির একটু একটু করে এগুতে থাকে ড্রেসিংটেবিলের দিকে।

চলবে….

গল্প:- ♥ফুলশয্যা♥ পর্ব:- ১১(অন্তিম পর্ব)

গল্প:- ♥ফুলশয্যা♥
পর্ব:- ১১(অন্তিম পর্ব)
লেখা- অনামিকা ইসলাম।

নীলিমা আবিরের কাছ থেকে দুরে সরে যায়। বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে ছিল।
কি মনে করে যেন বিছানায় এসে বসল, তারপর শুয়া…
অতঃপর ঘুম….

আবির একহাতে ভর দিয়ে শুয়ে নীলিমার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলিমাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে’ই আবিরের চোখ দুটো কখন যে জলে ভরে উঠে সেটা বুঝতে পারেনি আবির। বুঝতে পারে তখন যখন নীলিমা নড়েচড়ে উঠে। চোখ মেলে আবিরের দিকে তাকাবে ঠিক তখন’ই আবির বালিশে শুয়ে পরে। শুয়ার সময় আবির বুঝতে পারে ওর চোখের জলে বালিশ ভিঁজে একাকার হয়ে আছে।
আবির চোখের জল মুছে নেয় হাত দিয়ে। তারপর মনে মনে বলে__
” আর নয়! আমি কালকে’ই নীলিমাকে ভালোবাসার কথাটা বলতে চাই।”

আবির বিছানা থেকে বারান্দার গ্রিল ধরে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়।
সবাই হয়তো তখন দিনের সমস্ত ক্লান্তি ভুলে নিদ্রাজগতে পাড়ি জমিয়েছে। কিন্তু আবির?!!!
আবিরের চোখে ঘুম নেই। আবিরের মনে তখন শুধু একটি নাম—
নীলিমা,নীলিমা,নীলিমা।
নীলিমা আবিরের প্রথম দেখা প্রেম,
না বলা ভালোবাসা;
নীলিমা আবিরের সুখের স্বর্গ,
বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা।
নীলিমা আবিরের মন খারাপের মহৌষধ।
যার মায়ামাখা মুখখানা দেখলে আবিরের ওর সমস্ত ক্লান্তি দুর হয়ে
নিমিষে’ই মন’টা ভালো হয়ে যায়, সে নীলিমা…. আবিরের নীলিমা…….

ঘড়ির কাটা তখন ভোর ৩টা ছুঁই ছুঁই।
নীলিমা ঘড়িতে একটা বিশেষ কাজে এলার্ম দিয়ে রেখেছিল।
৩টা বাজতে’ই এলার্ম বাজা শুরু করল। তন্দ্রাচ্ছন্ন নীলিমা ঘুম চোখে’ই হাতড়ে খুঁজতে থাকে এলার্ম ঘড়িটা।
খুঁজে না পেয়ে চোখ খুলে নীলিমা।
আধশোয়া হয়ে মাথার কাছ থেকে ঘড়িটা এনে এলার্মটা বন্ধ করে ফিরে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালো।
লাইট না জ্বালিয়ে’ই ভীরু পায়ে নীলিমা আলমারির কাছে হেঁটে যায়।
” যে ডায়েরী ধরার অপরাধে ওনি সেদিন আমায় ধমক দিয়েছিলেন, আজ দেখতে চাই সেই ডায়েরী।
আমি জানতে চাই কি আসে ওতে। একটা সামান্য ডায়েরীকে কেন ওনি এভাবে আগলে রাখেন সেটা আমি জানতে চাই।”

নীলিমা ধীরে ধীরে আলমারিটা খুলে ঐখানটা খুঁজতে থাকে যেখানে আবির সেই ডায়েরীটা রেখেছিল।অনেক খুঁজাখুঁজির অবশেষে নীলিমা খুঁজে পায় ডায়েরীটা।
ডায়েরীটা হাতে নিয়ে আস্তে করে নীলিমা আলমারিটা লক করে দেয়।
শাড়ির নিচে লুকিয়ে ডায়েরী’টা নিয়ে নীলিমা চুপটি করে রুম থেকে বের হয়ে যায়। ছাদে গিয়ে নীলিমা ওর ফোনটা ওপেন করে সেটার টর্চটা জ্বালানো।ডায়েরীটা ওপেন করে নীলিমা।
টর্চলাইটের আলোয় দেখতে পায় ডায়েরীর প্রথম পৃষ্টায় লেখা-

” একটুকরো সাদা কাগজের মাঝে
আমি লিখে যাব সব কথা
অদৃশ্য কালির আচড়ে”

যদি পারিস পড়ে নিস অন্তিম চিঠি ভেবে।

দ্বিতীয় পৃষ্টা খালি।
নীলিমা তৃতীয় পৃষ্টা উল্টালো।
তয় পৃষ্টাও শূন্য।
এভাবে ৪র্থ,৫ম,৬ষ্ট পৃষ্টা উল্টালো নীলিমা। সবগুলো পৃষ্টা’ই শূন্য। তবে উপর থেকে দেখা যাচ্ছে পরের পৃষ্টায় কিছু একটা লিখা আছে। নীলিমা তাই পৃষ্টা উল্টালো। মানে সপ্তম পৃষ্টা উল্টালো।
৭ম পৃষ্টা’ই নীলিমা কিছু একটা দেখতে পায়। টর্চের আলোয় নীলিমা দেখতে পায় তাতে লিখা আছে—
” প্রেমে পরেছি প্রথম দেখায়”

অত্যাধিক কৌতূহল আর আকর্ষন নিয়ে নীলিমা ৮ম পৃষ্টা উল্টায়।
কিন্তু অন্তত দুঃখের বিষয় সে পৃষ্টা’টা খালি ছিল।

তারপর অনেকগুলো পৃষ্টা লিখা শূন্য ছিল। ১৩তম পৃষ্টা’য় নীলিমা আবারো দেখতে পায়। মনে হচ্ছে কিছু একটা লিখা আছে। টর্চের আলোটা নীলিমা ডায়েরীর কাছে নিয়ে যায়।
দেখতে পায় তাতে লিখা-
” সে আমার মায়াপরি যার মায়ামাখা মুখ’খানা দেখলে দুনিয়ার সব ক্লান্তি নিমিষে’ই ভুলে যায় এই আমি।”

নীলিমা পৃষ্টা উল্টালো।
নাহ, কিছু’ই লিখা নেই। ১৭তম পৃষ্টায় নীলিমা দেখতে পায় বড় করে লিখা-
” তাকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে কখন যে তোমায় বুকের ছোট্ট আসনে স্থান দিয়ে ফেলেছি, বুঝতে’ই পারিনি।”

তারপর অমেকগুলো পৃষ্টা শূন্য।
৩৫তম পৃষ্টায় নীলিমা দেখতে পেল তাতে লিখা-
” আজ অনেক দিন পর লিখতে বসলাম।ভেবেছিলাম আর কখনো প্রিয় ডায়েরীটার সাথে দেখায় হবে না।কিন্তু হয়ে গেল।
তাই আবারো লিখতে বসলাম।
– – – – – – – – – – – – – – – – – –
মাকে দিয়ে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে বাবা’কে রাজি করালাম।
বাবার মনটা ভিষণ খারাপ।
কারণ-
বাবার বাল্য বন্ধুর মেয়ে নীলিমা’কে বিয়ে করতে পারিনি আমি। কিন্তু কি করব আমি?!!!
আমি যে প্রথম দেখা’য় ভালোবেসে ফেলেছি আমার মায়াপরিটাকে।

তারপর কয়েক পৃষ্টা শূন্য।
৪১তম পৃষ্টা’য় লেখা-
” বাবাকে নিয়ে নরসিংদীর ছোট্ট এক অজপাড়া গায়ে এলাম। মনটা ভিষণ খারাপ। যাকে প্রথম দেখায় এতটা ভালোবেসে ফেলেছিলাম তাকে পারলাম না বিয়ে করতে। বাবার শরীরটা খুব বেশী ভালো না। তাই মুখের দিকে চেয়ে নিজের ইচ্ছেটাকে বুকের ভেতর’ই ধামাচাপা দিয়ে দিলাম। পড়ন্ত বিকেলে সবাই যখন উঠোনে বসে আড্ডা দিচ্ছে আমি তখন পুকুরপাড়ে চুপটি করে বসে আছি। এই সেই পুকুরপাড় যেখানে অচেনা মায়াপরীটাকে প্রথম দেখেছিলাম। ভাবতে ভাবতে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরল।
রাত্রে সবার সব সিদ্ধান্ত শেষে আমায় আর পাত্রীকে দেওয়া হলো আলাদা রুমে কথা বলার জন্য। প্রথমে যেতে না চাইলেও আদিবা আপুর অনুরোধে গেলাম। পাত্রী তখন মাথায় ওড়না দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। রুমে যেয়ে’ই ডাক দিলাম-
” শুনোন”
মেয়েটি পিছু ফিরে তাকাই।
আমার চোখ দুটো ছানাভরা হয়ে যায়। অবাক বিস্ময়ে প্রশ্ন করলাম-
” আপনি নীলিমা?”
মেয়েটি মাথা নেড়ে বলল- “হুম”….
আচ্ছা তুমি আমাকে চিনতে পারছ?
– হুম।
কে আমি বলো তো?!!!
– বাবার বন্ধুর ছেলে।
~ আর??? আর এর আগে কখনো দেখেছ আমায়???
– নাহ…..
কিন্তু আমি যে তোমায় এর আগে অসংখ্য বার দেখেছি।
– জি, কিছু বললেন???
~ নাহ……কিছু বলিনি। আসি তাহলে।

দৌঁড়ে বাবার কাছে গেলাম।
সাথে সাথে হ্যাঁ বলে দিলাম। বাবা সেদিন’ই বিয়েটা ঠিক করে ফেললেন।
নির্দিষ্ট দিনে আমার আর মায়াপরীটার বিয়েটা সম্পূর্ণ হয়।
শুরু হয় আমার আর নীলির সাজানো সুখের সংসার…..

নীলিমার চোখ ছানাভরা।
অবাক বিস্ময়ে আবিরের ৪১তম পৃষ্টার লিখার দিকে তাকিয়ে আছে।
আর মনে মনে বলছে__
” মানে কি? ওনার সাথে আমার আগেও দেখা হয়েছে? কিন্তু সেটা কখন,কোথায়?”

নীলিমা পৃষ্টা উল্টায়।
তারপর অনেকগুলো পৃষ্টা খালি।
৭৭তম পৃষ্টায় লিখা-

” এই মেয়ে!
তোমার কি মনে আছে তোমার সঙে আমার প্রথম দেখা’টা কোথায় হয়েছিল? নাকি ভুলে গেছ? যাক, ভুলে গেলেও মনে করিয়ে দিচ্ছি।

তোমাদের গ্রামের শেষ সীমানায় ছিল আমার কলেজের বন্ধ সিয়ামদের বাড়ি। পাশেই ছিল পুরনো একটি বিশাল বড় শিমুল গাছ। শিমুল গাছের অদুরে একটি মনোরম স্থান ছিল, সেখানে ছেলেমেয়েদের আড্ডা থাকত প্রায় সবসময়। চাকরীর সুবাধে আমি ঢাকায় থাকতাম। ফলে সেখানে যেতে অনেক সময় লাগত। তাই মাঝেমধ্যে তপ্ত দেহটাকে শীতল করার জন্য সেখানে যেতাম। ইচ্ছে থাকলেও দুরে থাকায় সব সময় যেতে পারতাম না।

এমন’ই এক পড়ন্ত বিকেলে সেখানে যাওয়ার জন্য রওয়ানা দিলাম।আমার সঙ্গে ছিল আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু ‘সিয়াম’। আমরা মন্থর গতিতে হাটতে হাটতে যখন কাঙ্খিত স্থানের কাছাকাছি এসে পড়েছিলাম, ঠিক তখন পিছন পেছন থেকে একটি মিষ্টি হাসির শব্দ ভেসে এলো। অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমার চোখ দুটি পেছনে ফিরল এবং সেখানে স্থির হয়ে থাকল দীর্ঘক্ষণ। কিছু বলার উপায় ছিল না তখন আমার। মনে হয় নিজের বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। আমার হাত থেকে ফোন’টি পরে গিয়েছিল মাটিতে। তোমার হরিণের মত চোখ দুটি থেকে দৃষ্টি ফেরাতে পারছিলাম না আমি।
ইষৎ হাসির ফলে সুগন্ধময় মুখের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা দাতের শুভ্রতা আমায় পাগল করে তুলেছিল। আমার দিকে তাকিয়ে যখন তুমি লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছিলে, তখন তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে দুনিয়ার সবকিছু ভুলে গিয়েছিলাম আমি।

আমাকে যখন তুমি অতিক্রম করেছিলে, তখন আমার মুগ্ধ দৃষ্টি পড়েছিল তোমার মাথায়। যেখানে দীঘল কালো চুলের আধারে গেথে রেখেছিলে তিনটি তাজা কদম ফুল। যার সুগন্ধ স্পর্শ করেছিল আমার নাককে।
শোনো মেয়ে!
তুমি চলে গিয়েছিলে সেদিনের জন্য। আমি তাকিয়ে ছিলাম তোমার পেছন পানে। সেদিন তোমার মায়াবী মুখ দেখে নিজের অজান্তেই অস্ফুট স্বরে উচ্চারিত হয়েছিল, মাশাআল্লাহ!

এরপর থেকে এমন কোনো দিন নেই যেখানে আমি তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম, সেখানে তোমার জন্য অপেক্ষা করিনি। কিন্তু কোনোদিন তোমার দেখা পাইনি। বিশ্বাস করো মেয়ে, তোমাকে না দেখার কারণে অনেক কষ্ট হতো আমার। আমি ঠিকমতো ঘুমাতে পারতাম না। ঘুমের ঘোরে তুমি এসে আনাগোনা করতে আমার চারপাশে। স্টুডেন্টসদেরও ঠিকমতো পড়াতে পারতাম না। জানি না, কেন এমন হতো। হয়তো এর’ই নাম ভালোবাসা।

এরপর তোমার সাথে দেখা হওয়ার জন্য বিধাতা আমাকে অন্য পথ দেখালেন। সেদিন সপরিবারে নরসিংদীর ছোট্ট অজপাড়া গায়ে গিয়েছিলাম। কখনো কল্পনাতেও ভাবিনি যার জন্য আমার চোখের ঘুম হারাম হয়ে গেছে, সে আর কেউ নয়। আমার বাবার’ই বন্ধুর মেয়ে “নীলিমা”…..

সেদিন একবার মাত্র ফিরে তাকিয়েছিলে তুমি।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত বার বার তোমার মুখপানে তাকিয়ে ছিলাম।
আচ্ছা, তুমি কি এখনো আমায় চিনতে পারো নি???
যাক, ভুলে গেলে কিছু’ই ভুলার নেই।
আচ্ছা, নীলিমা সেদিন তোমাদের গ্রামে আমার একটা নীল ডায়েরী ফেলে এসেছিলাম। সেটা কি তুমি পেয়েছিলে???

নীলিমার চোখ দুটো জলে ছলছল করে উঠে। এ তাহলে সেই পাগলটা, যে প্রতিদিন ঐখানকার পুকুরপাড়ে চুপটি করে গিয়ে বসে লিখালিখি করত। বান্ধবীরা প্রতিদিন’ই বলতো দ্যাখ, দ্যাখ! কি সুন্দর, সুদর্শন এক যুবক চুপটি করে বসে আছে গাছের নিচে। ইস! তখন যদি একটা বার তাকিয়ে দেখতাম তাহলে তো আর এমনটি হতো না।

আচ্ছা!!!
ওনার নীল ডায়েরীটা তো আমার পড়ার টেবিলের ভেতরে’ই রেখেছিলাম। ঐটা কি সেখানে এখনো আছে???
মা’কে তো বলেছিলাম পুরনো সবকিছু রুম থেকে বের করে নতুন ফার্নিচার ঢুকাতে।
মা আবার ঐগুলো ফেলে দিল না’তো???
না, না!!!
ফেলে দিলে ওনার ডায়েরীটাও তো হারিয়ে ফেলব। মাকে বরং ফোন করি। নীলিমা ওর মায়ের নাম্বারে কল দেয়। কিন্তু একি?!!!
নাম্বার যে বন্ধ।
যাক আমি বরং একটু পরে’ই ফোন দিব। নীলিমা তাহাজ্জদ নামাজ পরে কল দেই, তখনো নাম্বার বন্ধ।
ফজর নামাজ পরে কল দেই, তখনও বন্ধ। উফ্!
এভাবে বন্ধ থাকলে আমি মাকে কিভাবে বলব টেবিল যাতে কাউকে না দেয়??? কিংবা ফেলে না দেয়???
আচ্ছা!!!
মা যদি কালকে’ই রুম পরিষ্কার করে থাকে?!!!
তাহলে তো এতক্ষণে সব কাগজপত্র ফেরিওয়ালার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে মনে হয়।
না, না। এ হতে পারে না।
আমি এখন’ই বাড়িতে যাব।
নীলিমা সাজ সকালে কাউকে কিচ্ছু না বলে রওয়ানা দেয় নরসিংদীর উদ্দেশ্যে…..

এদিকে আবির?!!!
ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে নিজেকে বারান্দায় ফ্লোরে।
” কি মেয়েরে বাবা!
আমি এভাবে এখানে ঘুমিয়ে পরলাম, একটা বার আমায় ডাক দেওয়ার প্রয়োজন মনে করল না?!!
হুহ্…..
আজকে ওর সাথে কথা’ই বলব না।”
আবির মনে মনে কথাগুলো বলে ফ্লোর থেকে উঠে বিছানায় গিয়ে শুইল। ৭টার দিকে বুয়া এসে চা দিয়ে গেল। চা খেয়ে ল্যাপটপ’টা পেটে নিয়ে ইংলিশ মুভি দেখতে লাগল। সকাল ৮টায় খাবার খাওয়ার জন্য ডাক পরল। শালিকাদের ডেকে তুলে নিচে গেল ব্রেকফাস্ট করতে।
টেবিলে বসে আবির এদিক-ওদিক করছে।
কাজের মেয়ে প্রশ্ন করল__
” ভাইজান! কাউকে খুঁজছেন?”
আবির:- নাহ…..(আমি আবার ওকে খুঁজব? যার মনে একটুও দয়া নেই মানুষের জন্য)
কাজের মেয়ে:- কি কইলেন ভাইজান?
আবির:- না, না…
তুমি খাবার পরিবেশন করো।

কাজের মেয়ে সবাইকে খাবার দিল।
দীঘি:- দুলাভাই! আপু কই??? আপু ব্রেকফাস্ট করবে না?
আবির:- রুমে’ই। একটু পর করবে।
তোমরা খেয়ে নাও।

ব্রেকফাস্ট করে আবির রুমে গেল।
আধঘন্টার মত হয়ে গেছে, নীলিমার কোনো সাড়া নেই। আবির মনে মনে খুজতে খুজতে থাকে নীলিমাকে। খুঁজতে খুঁজতে একটা সময় পুরো বাড়ি খুঁজে হয়রান হয়ে যায় আবির। কিন্তু কোথাও নীলিমা নেই। আবিরের ভেতরটা মুচড় দিয়ে উঠে। নীলিমাকে খুজতে ছাদে যায়। ছাদ থেকে বাগান। তারপর এ বাসা, ও বাসা। কোথাও নেই নীলিমা।
আবির পাগল হয়ে যায়। দাড়োয়ানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে নীলিমাকে কোথাও যেতে দেখেছে কি না!
দাড়োয়ান জানায় নাহ।
ওরা নীলিমাকে গেইট দিয়ে কোথাও যেতে দেখেনি। আবির দৌঁড়ে আশপাশের বাসার মানুষজনের কাছে যায়। একজন বলে নীলিমাকে খুব ভোরে এদিকে’ই ছুটে যেতে দেখেছে। কোথায় গিয়েছে কেউ জানে না। আবিরের ভেতরটা অজানা শূন্যতায় হাহাকার করে উঠে। নীলিমার সবকয়টা বান্ধবীর নাম্বারে কল দেয়, কিন্তু নীলিমাকে কোথায়ও খুঁজে পাওয়া যায় নি। আবির রাস্তা-ঘাট, পার্ক, শপিং মল সবজায়গায় নীলিমাকে খুঁজে। কোথাও নীলিমার সন্ধান পাওয়া যায়নি। সবশেষে আবির আশপাশের হসপিটালগুলোতে গিয়ে খুঁজ করে।কিন্তু কোথাও খুঁজে পায়নি। আবির ওর শাশুড়ির ফোনে কল দেয়। ফোনটা এখনো বন্ধ দেখাচ্ছে। আবির নীলিমার ফোনে আবির কল দেয় যদি ফোন’টা ওপেন করে সেই আশায়। কিন্তু নীলিমার ফোন’টা অফ যে অফ’ই আছে। দুপুর একটাই আবির বাসায় যায়। লিমাকে বলে আবির বের হতে যাবে তখন’ই পিছন থেকে সবাই বলে উঠে_
” আমরাও যাব দুলাভাই আপুকে খুঁজে বের করতে।”
আবির সবাইকে সাথে নিয়ে রওয়ানা হয় বাকি হসপিটাল গুলোতে খুঁজ নেওয়ার উদ্দেশ্যে।
নাহ, কোথাও নেই নীলিমা।
সবাই এবার রওয়ানা দিবে নরসিংদীর উদ্দেশ্যে। তারআগে বাসায় গিয়ে ওদের বলে আসতে হবে__
” ওরা যাতে ফোনের কাছাকাছি থাকে। আবিরসহ সবাই বাসায় যায়।ওদের সবকিছু বুঝিয়ে গাড়িতে উঠতে যাবে তখন’ই লিমা আবির’কে দাঁড় করায়।
” ভাইয়া! আপনি আপনার বন্ধুকে কল দিয়ে একটু বলেন না খুঁজ নিতে আপু বাড়িতে গেছে কি না।”
লিমার কথামতো আবির সিয়ামকে কল করে সবটা বলে।
গাড়িতে উঠার আগে আবির আরেকবার নীলিমার ফোনে কল দেয়। নাহ!
এবারও ফোনটা অফ।
আবিরসহ সবাই গাড়িতে উঠে পরল। গাড়ি চলছে। হঠাৎ’ই মনে হলো গাড়ির পাশ দিয়ে কেউ যেন চলে গেছে। আবির গাড়ির গ্লাসে তাকিয়ে দেখে একটা মেয়ে যার মাথায় ওড়না দেওয়া কিন্তু চুলগুলো বের হয়ে আছে। ঘন কালো চুলগুলো দেখে আবির অতীতে ফিরে যায়। সেই অতীত যে অতীতে আবির ঠিক এরকম’ই চুল দেখেছিল নীলিমা নামের অচেনা মেয়ের। আবির গাড়ি ঘুরায় পিছন দিকে। ততক্ষণে মেয়েটা অনেকটা পথ সামনে এগিয়ে গেছে। গাড়ি’টা মেয়েটার কাছে গিয়ে’ই থামালো আবির। মনে হচ্ছে, এ গেইট দিয়ে’ই ঢুকবে।
আবির গাড়ি থেকে নেমে পরে।
আবিরের সাথে বাকি সবাই।
মেয়েটি গেইটের ভেতর ঢুকবে ঠিক তখনি আবির পিছন থেকে ডেকে বলল_
” দাঁড়াও।
মেয়েটি পিছু ফিরে তাকালো।”

সবাই আপু বলে চিল্লান দিয়ে উঠল।
আবির সবাইকে থামিয়ে বলল__
” তোমরা সবাই রুমে যাও।
সবাই রুমে চলে গেল।আবির নীলিমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। নীলিমা তখন থরথর করে কাঁপছে।

আবির:- কোথায় গিয়েছিলে???
নীলিমা:-……..
আবির:- আমার প্রশ্নের উত্তর দাও বলছি……(ধমকের স্বরে)
নীলিমা:- …….
আবির:- আমার কথা কি কানে ঢুকতেছে না। চুপ করে আছ কেন???(অত্যাধিক মাত্রায় ধমক দিয়ে)
নীলিমা:- বাসায় গিয়েছিলাম….(কাঁপাস্বরে)

আবির তখন’ই ঠাস করে নীলিমার গালে থাপ্পর মারল।
নীলিমা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আবির:- বাসায় গিয়েছিলে আমায় বলে গিয়েছিলে? কি মনে করো তুমি নিজেকে, হুহ? তুমি হুটহাট না বলে উদাও হয়ে যাবে, আর আমি তোমাকে খুঁজে বের করব???
নীলিমা:- আসলে আমি…..(…)….
আবির:- চুপ, একদম চুপ।
আর কোনো কথা বলবা না। সোজা যেখান দিয়ে এসেছ, সেখান দিয়ে চলে যাও। তোমার মুখ যাতে আমি দেখি আর…..

আবির গাড়ি গেইটের ভেতর ঢুকিয়ে হনহন করে বাসার ভিতর ঢুকে পরে।

নীলিমা চুপটি করে গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর নীলিমা পিছুহটে।

এদিকে আবির?!!!
ড্রয়িংরুমে অপেক্ষায় আছে কখন নীলিমা রুমে আসবে। কিন্তু মিনিট পাঁচেক যাওয়ার পরও নীলিমা আসছে না দেখে আবির রুম থেকে বাহিরে বের হয়। গেইটের কাছে গিয়ে নীলিমাকে দেখতে না পেয়ে প্রশ্ন করে দাড়োয়ানকে_
” নীলিমা কোথায়?”
বাগান দেখাশুনা করে যে চাচা সে এসে বলল_
” বাজান! ডোজ’টা বেশী হয়ে গেছে। গাল ফুলিয়ে চলে যাচ্ছিল। আটকিয়ে রাখছি। বাগানের ভিতরে গিয়ে দেখেন।”

আবির চলে যাচ্ছিল তখন আবারো ঐ চাচা পিছন থেকে ডাক দিল__
” এই নাও বাজান! বাগানের সব থেকে সুন্দর ফুল, যাও আম্মাজানের রাগ ভাঙাও গিয়ে।”

আবির থ্যাংক ইউ চাচা বলে ফুল’টা হাতে নিয়ে দৌঁড় দেয়।

নীলিমা চুপটি করে বাগানের একপাশে বসেছিল। আবির গিয়ে নীলিমার পাশে বসল। আবিরকে দেখে নীলিমা বসা থেকে উঠে চলে যাচ্ছিল, আবির লাল গোলাপ হাতে নীলিমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
নীলিমা একবার সেই ফুলের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়।
লাল গোলাপ ধরে রাখা হাতটা ক্রমেই শ্লথ হয়ে আসছিল আবিরের।নীলিমা চলে যাচ্ছিল পাশ দিয়ে, সুযোগ হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় দ্রুত পথ আগলে দাঁড়ালো আবির। চমকে যায় নীলিমা। কিন্তু অস্বাভাবিক হয়নি। মনে হচ্ছে এমন পরিস্থিতির জন্য সে প্রস্তুত ছিল।
লাল গোলাপটি হাতে দিয়ে নির্দ্বিধায় বলে ফেলল আবির__
” I love you,Nilima”….

আবিরের সেই মুহূর্তে কেমন লেগেছিল মন দিয়ে অনুভব করা ছাড়া লিখে বুঝানো সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ কারো মুখেই কোনো কথা সরছিল না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হয়, দুজনের বুকের ভেতর ধুকধুক শব্দ প্রতিধ্বণিত হচ্ছিল। যা ছিল একান্ত নিরব ও গোপন। আর সেটা প্রমাণ করছিল সেই কোয়াচ্ছন্ন বিকালেও নীলিমার নাকের ডগায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের কণাগুলো। ডান হাত দিয়ে গোলাপটি হাতে নিল নীলিমা।

মৃদ্যু কন্ঠে বলল, এত দেরী করলে কেন তুমি? তুমি কি জানো না আমিও যে তোমাকে নিয়ে’ই কল্পনার প্রাসাদ গড়েছি?
কিন্তু আমি নারী। আমি লজ্জার দেয়ালে আবদ্ধ। এ কারণে তোমাকে বলতে পারিনি। কিন্তু তুমিও কি আমার কথাটা বুঝতে পারোনি? কেন এত দেরী করলে তুমি? জানো না, অপেক্ষা করা কত কষ্টের?
নীলিমার কথাগুলো শুনে আবিরের কাছে মনে হচ্ছিল দুনিয়াতেই বুঝি সে জান্নাতের সুখ পেয়ে গেছিল। আবিরের মন আনন্দে আত্মহারা হয়ে শূন্যে উড়ে বেড়াচ্ছিল মুক্ত বিহঙ্গের মতো। সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গের মত হারিয়ে যাচ্ছিল কোনো এক দুর অজানায়। হৃদয়ের মাঝে বিশ্বজয়ের প্রশান্তি অনুভূত হচ্ছিল।

তারপর থেকে বিরামহীন ভাবে চলতে থাকে আবির-নীলিমার দুষ্টু-মিষ্টি প্রেম। হাসি-আনন্দে,দুষ্টু-মিষ্টি খুনসুটিতে ভরপুর ছিল আবির-নীলিমার সম্পর্ক।

তারপর এলো সেই দিন।
যেদিন নীলিমা আবিরের দেওয়া ঐ শাঁড়ি’টা লাল টুকটুকে শাড়িটা পরল, যেটা নীলিমা গত বিবাহবার্ষিকীতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। নীলিমা সেই নূপুর জোড়াও পরল, যা একদিন আবির পরিয়ে দিয়েছিল একবুক আশা নিয়ে।
হাতে লাল রেশমী চুড়ি,
ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক, চোখে গাঢ কালো কাজল।
এ সাজে যখন নীলিমা আবিরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আবির তখন রুমে পরীক্ষার খাতা দেখায় ব্যস্ত। নীলিমার রিনিঝিনি চুড়ির আওয়াজে আবির ফিরে তাকালো সামনের দিকে। নীলিমাকে এভাবে নববধূর সাজে দেখে বসা থেকে দাঁড়িয়ে পরল আবির। ধীর পায়ে এগিয়ে যায় নীলিমার দিকে। নীলিমার দিকে কিছুক্ষণ অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থেকে আলমারি থেকে কি যেন একটা বের করে আবির। তারপর নীলিমার খোপায় সেটা গুজে দিয়ে বলে_
” এবার একদম ঠিকঠাক লাগছে।”
নীলিমা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। আবির নীলিমার কপালে আলতু করে চুমু দিয়ে ঘোমটা’টা টেনে দিয়ে নীলিমার চোখে চোখ রেখে বলে_
” তুমি আমার বউ হবে?”
নীলিমা আবিরের কানে কানে ফিশফিশ করে বলে_
” আমি শুধু তোমার বউ না, তোমার সন্তানের মাও হতে চায়।”

আবির নীলিমার দু’বাহু ধরে চোখে চোখ রেখে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে_
” তাহলে তো এই আদরে হবে না।
এখনো মিশনে নামতে হবে। ডজনখানেক সন্তানের মা হওয়া চাট্টিখানি কথা নয়গো….”

নীলিমা লজ্জায় চোখ দুটো বন্ধ করে ফেলে।

♥The End♥

[ দুটি কথা:- প্রিয় পাঠক/পাঠিকা,
আমাদের বর্তমান সমাজে একটি নতুন ধারনার আবিভার্ব হচ্ছে, যা সত্যি’ই বেদনাময়। আর তা হলো সাদা-কালো, ধনী-গরিবের মধ্যে কখনো প্রেম হয় না। কিন্তু তারা মানতে চায়না যে, প্রেম-ভালোবাসা প্রদত্ত আল্লাহ’র দান। ইহা স্বর্গ হতে আসে আর স্বর্গেই যায় চলে এবং ভালোবাসার কোনো প্রভেদ নেই, নেই সাদা-কালোর পার্থক্য। কারণ ভালোবাসা হয় মনের সাথে মনের। আর যার ভালোবাসার মত মন আছে সেই পারে ভালোবাসা দিতে এবং নিতে। হউক সে সাদা বা কালো।
প্রিয় পাঠক/পাঠিকা,
আমার এই লিখা দ্বারা আমি তাই বুঝাতে চেয়েছি। জানি না আপনাদের কতটা ভালো লেগেছে। তবে যদি এতটুকুও ভালো লাগে তাহলে নিজেকে ধন্য মনে করব।]