#প্রাণেশ্বরী
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat
#পর্ব-২০
প্রাণ ভ্রু কুঁচকে ছন্দের দিক তাকাতেই ছন্দ মৃদু হেসে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলে, “সান্নিধ্য এড়িয়ে আমার যাবেন কই এখন?”
প্রাণ নিচের দিকে দৃষ্টি স্থাপন করে বলে, “টু দি হেল!”
ছন্দ মুখ কুঁচকে বলে, “তেঁতো জবান অথচ দেখতে মায়াবিনী। নট ফেয়ার!”
প্রাণ প্রত্যুত্তর করলো না। ছন্দকে এখন কিছু বলা মানেই কথা বাড়ানো। ছন্দও এবার প্রাণের উপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বাকিদের সাথে মেশার চেষ্টা করলো। ছন্দ হচ্ছে প্রাণের বিপরীত চরিত্রের অধিকারী। প্রাণ ভীষণ ইন্ট্রোভার্ট হলেও ছন্দ হচ্ছে পুরোই এক্সট্রোভার্ট। যার দরুণ সহজেই যে কাউকে আপন করে নিতে পারে সে৷ এই যেমন কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানেই সকলকে ফ্রি হতে বাধ্য করে ফেললো। বিশেষ করে রাজ সেনের সাথে তার ভাব হলো বেশ। রাজ সেন ক্রিকেট পাগল, তাই আড্ডা জমতে তাদের সময় লাগে নি। কথার ফাঁকে ছন্দ আসন্ন ম্যাচটির জন্য সকলকে স্টেডিয়ামে যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণও জানালো। রাজ সেনের পাশাপাশি অনেকই সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলো। প্রাণ কিছু বলছে না দেখে ছন্দ ফিসফিসিয়ে বলল, “আপনি কিন্তু বিশেষভাবে আমন্ত্রিত মিস. ল্যাভেন্ডার। ম্যাচ দেখতে আসবেন কিন্তু।”
প্রাণ নিজের খাওয়া শেষ করে বলে, “নট ইন্টারেস্টেড!”
কথাটা বলে ছন্দকে কথা বলার দ্বিতীয় কোন সুযোগ না দিয়ে রাজকে বলে সে উঠে পড়ে। ছন্দ সেদিক তাকিয়ে আনমনে বলে উঠে, “লাইফলেস!”
________
রোদ্দুর ভেজা নীলাভ নভস্থল আচ্ছাদিত শুভ্র তুলোর সমোরোহে। কাক-পক্ষি উড়ছে স্বাধীনভাবে। স্নিগ্ধ বাতাসে নিঃশ্বাস ফেলতেই অন্তঃকরণের বি’ষা’ক্ত’তা ছুট দেয় ম্রিয়মাণ পথে। সাধারণত এমন প্রকৃতির সান্নিধ্য পেয়ে কারো মন খারাপ থাকে না। কিন্তু প্রাণের সেই সুযোগ কোথায়? কাজের পরিমাণ এত যে কোনদিক মুগ্ধ নজরে তাকানোর সময়ই নেই৷ ব্যস্ত এই সময়ের মধ্য দিয়েই অতিক্রান্ত হয়ে গেল একদিন। উদয় হলো নতুন এক প্রত্যুষের। আজ দুপুরেই জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ছন্দের ম্যাচ। ছন্দের আমন্ত্রণে মোটামুটি ফিল্ম ক্রিউ এর সকলেই আগ্রহ দেখিয়েছে স্টেডিয়ামে গিয়ে ম্যাচ দেখার। তাই রাজ সেনও কাঙ্ক্ষিত প্রহরের পূর্বেই সকল শুট সম্পন্ন করে প্যাক আপ করে দিয়েছেন। অতঃপর হোটেলে এসে ফ্রেশ হয়ে সবাই মিলে রওনা দিয়েছে ম্যাচ দেখার উদ্দেশ্যে। তবে প্রাণ বাদে। এতদিন অবিশ্রান্ত কষ্ট করার পর অবসর পেয়ে সে বিশ্রাম নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ মনে করেছে। উপরন্তু, কোলাহলপূর্ণ জায়গা তার পছন্দও না। লোকসমাগম সর্বদা এড়িয়ে চলে সে। তাই রাজকে বলে থেকে গিয়েছে সে। যদিও রাজ সেন এতে আপত্তি জানায়নি, প্রাণের স্বভাব সম্পর্কে তিনি কিছুটা হলেও অবগত এখন। রুমে লাঞ্চ শেষ করে চেয়ারে গা হেলিয়ে বসতেই চৈতি রিফ্রেশমেন্টের জন্য লেমোনেড নিয়ে আসে। চৈতির কাছ থেকে লেমোনেডের গ্লাসটা হাতে নিয়ে প্রাণ জিজ্ঞেস করে, “তুমি যাওনি কেন তাদের সাথে?”
চৈতি মাথা নত করে বলে, “এভাবেই ম্যাম! ইচ্ছে করেনি।”
প্রাণ অপ্রসন্ন দৃষ্টিতে তাকায় চৈতির দিকে। সে যায়নি বলেই যে চৈতি এখানে থেকে গিয়েছে সে-টা ভালো করেই জানে। অথচ স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখার ইচ্ছে তার বহুদিনের। কথায় কথায় বলেছিল তাকে একবার। কিন্তু দেখো সুবর্ণ সুযোগটা পেয়েও হাত ছাড়া করলো মেয়েটা। কাজের জন্য বুঝি কেউ এভাবে নিজের ইচ্ছা মাটি চাপা দেয়? মাঝে মধ্যে কাজের প্রতি চৈতির এমন মনোনিবেশ দেখে প্রাণ অভিপ্রেত না হয়ে পারে না। কিন্তু সে-টা কখনো প্রকাশ করে না। বলতে প্রকাশ করতে জানে না সে। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো প্রাণ। শান্ত কন্ঠে বলে, “যাই হোক! পার্কিং লটে কোম্পানির একটি গাড়ি আছে, আমি ফোন করে বলে দিচ্ছি তোমায় যাতে স্টেডিয়াম নিয়ে যায়।”
চৈতি তৎক্ষনাৎ বলে উঠে, “না! না! ম্যাম, এসবের প্রয়োজন নেই। আমি যাব না। মোবাইলে এভাবেই লাইভ দেখা যাবে, খামাখা কষ্ট করে যাওয়ার মানে হয় না।”
প্রাণ ভারী কন্ঠে বলে, “বেশি কথা বলা আমি পছন্দ করি না তুমি জানো। তাই যা বলেছি তা কর।”
চৈতি দ্বিধাগ্রস্থ কন্ঠে বলে, “কিন্তু ম্যাম…”
“নো মোর ওয়ার্ডস।”
প্রাণের ধমকে চৈতি নিভে যায়। জড়সড়ো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে শুধু। প্রাণ কলে সব নিশ্চিত করে বলে, “নিচে গাড়ি অপেক্ষা করছে তোমার জন্য। যাও!”
চৈতি চেয়েও কিছু বলতে পারলো না। মৌন থেকে মাথা নাড়লো। প্রাণ জিজ্ঞেস করে, “টাকা আছে নাকি লাগবে?”
“নাহ! নাহ! আছে। লাগবে না ম্যাম।”
চৈতির কন্ঠ তটস্থ শোনালো। প্রাণ স্বল্প পরিসরে হাসলো। নম হলো কন্ঠ তার, “দ্যান গো এন্ড ইঞ্জয়।”
চৈতি এবার কৃতজ্ঞচিত্ত দৃষ্টিতে তাকায়, অধর জুড়ে তার স্নিগ্ধ হাসি। সে খুব করে চাইলো প্রাণকে কিছু বলতে কিন্তু আফসোস শব্দভাণ্ডার তার শূন্যের কোঠায়। কথায় আছে, নীরবতা তখনই কথা বলে যখন ভাষা কথা বলতে পারে না। চৈতির বেলায়ও ঠিক তাই হলো, নীরবতা তার বলতে চাওয়া কথাগুলোর প্রস্ফুটন ঘটালো। অতঃপর কিয়ৎক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চৈতি ত্যাগ করলো রুমটি। চৈতি যেতেই প্রাণ দরজা লাগিয়ে পুনরায় চেয়ারে গা হেলিয়ে বসে। হাতে গ্লাস উঠিয়ে কিছুক্ষণ নিউজফিড ঘুরতে থাকে৷ নিজের অফিশিয়াল পেজে ঢুকে একবার লাস্ট পো’স্ট’টা দেখে নেয়, এখনো তাতে অজস্র মন্তব্যের সমাহার। নয়ন আর জেসিকা যে সেই রাতে তার ড্রিং’ক স্পা’ই’ক করেছিল এবং তার সাথে হী’ন কিছু করতে চেয়েছিল সে-টার কনফার্মেশন পো’স্টই এটা। প্রাণের নিকট থেকে এই পো’স্ট’টা পাওয়ার পর পরই নেটিজেনরা ক্ষে’পে উঠেছিল এবং তো’পে’র মুখে পড়েছিল জেসিকা ও নয়ন। এখনো কম হে’ন’স্তা হচ্ছে না তারা। সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে তাদের নিয়ে অজস্র মিমস এবং কনটেন্টস বিদ্যমান। মাঝে-সাঝে প্রাণ এইগুলা দেখে, ক্লান্ত মন তার তখন এটা ভেবে তৃপ্তি পায় প্র’তা’র’ক’রা ভালো নেই। তবে যে ভ’ঙ্গু’র হৃদয় তাকে তারা উপহার দিয়েছে, তাতে আর কখনো কারো জন্য অনুভূতি জন্ম নিবে কি-না কে জানে? আর কে-ই বা চাইবে দ্বিতীয়বার মন ভা’ঙ্গা’র তীক্ত স্বাদ নিতে?
আচ্ছা, খুব কি ক্ষতি হতো বি’শ্বা’স’ঘা’ত’ক’তা’টা না করলে? সব স্বাভাবিক থাকলে? বাকি আট-দশটা মেয়েদের মতই তার জীবন হলে? তার সাজানো-গুছানো স্বপ্নগুলো সত্যি হলে? এত এত প্রশ্নের ভিড়ে উত্তরের দেখা নেই কোন। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে প্রাণ। কিছুক্ষণ অতিবাহিত হওয়ার পর সে উপলব্ধি করতে পারে তার চোখ দুটো বেশ জ্ব’ল’ছে, কণ্ঠনালী ধরে আসছে। ফোনটা রেখে প্রাণ আঁখিপল্লব বন্ধ করে নেয়, নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু অবাধ্য জলগুলো শেষ পর্যন্ত আদেশ অমান্য করে ঝরে পড়ে। কিয়ৎক্ষণ লাগে তার সামলে উঠতে, সিক্ত গাল মুছে ওয়াশরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে এসে বিছানায় গা এলিয়ে দেয়৷ ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলই কিন্তু কিছুটা একটা ভেবে মুঠোফোনটা পুনরায় হাতে নেয় এবং জনপ্রিয় এক অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে চলমান ক্রিকেট ম্যাচটির লাইভ টেলিকাস্ট প্লে করল সে। প্রথমে ব্যাটিং করার সুযোগ বাংলাদেশ পেয়েছে, ছন্দ ও শ্রাবণ নেমেছে মাঠে। দুর্দান্ত খেলছে তারা দু’জন। ছন্দের ব্যাটিং স্কিল আসলেই প্রশংসনীয়। একটা বলও ফাঁকা যেতে দিচ্ছে না সে৷ অকস্মাৎ ছন্দ ছক্কা মারতেই স্টেডিয়াম কাঁপিয়ে গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে উঠে সকলে। পরক্ষণেই ম্যাচটা জমে উঠে৷ সে সাথে প্রাণের সম্পূর্ণ মনোযোগ গিয়ে স্থির হয়ে গেল মুঠোফোনের কৃত্রিম স্ক্রিনটিতে। রাখতে পারলো না আর সে ফোনটি হাত থেকে। তার ঘুমিয়ে অবসর কাটানোর পরিকল্পনাটি মাটি হয়ে গেল পলকেই।
___
আঁধার পালায় নব্য অরুণোদয়ের আগমনে। ষোড়শী লজ্জা পেয়ে গাল লাল হয়ে যাওয়ার মতো মেঘের একটা কিনারা লাল হয়ে উঠছে৷ পাহাড়ের সীমা পেড়িয়ে আনকোড়া সূর্যের আলতো রশ্মি পরশ বুলাচ্ছে ধরণী গায়ে। জানা-অজানা পক্ষী সব ডেকে উঠছে গুনগুন করে, বুনো ফুলের সতেজ সুবাস মুখরিত করে পরিবেশ৷ হাইওয়ের রাস্তা ধরে চলছে গাড়ি। গন্তব্য পতাঙ্গা সি বিচ। আজকে শুট সেখানেই হবে। তবে সকল ক্রিউ মেম্বারদের ক্লান্ত চেহারা সুস্পষ্ট। কাল খেলায় বাংলাদেশ জিতেছে বলে হোটেল এসে ছন্দ ও তার টিম মেম্বাররা মিলে তা সেলিব্রেট করেছে৷ তাতে ফিল্ম ক্রিউ মেম্বাররাও ছিল। শুধু উপস্থিত ছিল না প্রাণ। ইচ্ছাকৃতভাবে না, অনিচ্ছাকৃতভাবেই। খেলা শেষ হওয়ার পর ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। ঘুম এতই গাঢ় ছিল যে কারো ডাক তার কান অবধি পৌঁছায়নি। ফোনও সাইলেন্ট করা ছিল। যার দরুণ সেলিব্রেশনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি। যদিও তার ইচ্ছা ছিল ছন্দকে শুভেচ্ছা জানানোর কিন্তু তা সম্ভব হয়নি। রাতে ছিল ঘুমিয়ে, সকালে উঠে চলে এলো কাজে। শুভেচ্ছা জানাতো কখন? উপরন্তু, সেই রাতের পর আর মুখোমুখি হয়নি তারা। তাই কে কোন রুমে আছে তা জানাও হয়নি।
শুট শেষ করে প্রাণ যখন হোটেল ফিরলো তখন অবসন্ন অপরাহ্ণ। প্রাণ ক্লান্ত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে নিজের রুমেরদিকে। করিডরের শেষ প্রান্তের আসা মাত্র পিছন থেকে ছন্দ ডেকে উঠে, “কাল আপনি কোথায় নিরুদ্দেশ হলেন বলুন তো মিস. ল্যাভেন্ডার? হারিকেন দিয়ে খুঁজেও আপনাকে কোথাও পেলাম না আমি। স্ট্রেঞ্জ না?”
#চলবে
#প্রাণেশ্বরী
#Writer_Asfiya_Islam_Jannat
#পর্ব-২১
“কাল আপনি কোথায় নিরুদ্দেশ হলেন বলুন তো মিস. ল্যাভেন্ডার? হারিকেন দিয়ে খুঁজেও আপনাকে কোথাও পেলাম না আমি। স্ট্রেঞ্জ না?”
প্রাণ পিছন ফিরে তাকায়। অবসন্ন কন্ঠে বলে, “রুমেই ছিলাম।”
ছন্দ ভ্রু কুটি একত্রিত করে বলে, “যদি তাই হয় তাহলে দেখা পেলাম না কেন?”
প্রাণ লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বলে, “ঘুমিয়ে ছিলাম।”
ছন্দ ম্রিয়মাণ কন্ঠে বলে, “আর আমি অপেক্ষায় ছিলাম।”
প্রাণ কথাটা ঠিক ধরতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, “জি?”
ছন্দ কথা ঘুরানোর স্বার্থে বলে, “কাল আসলেন না কেন আপনি? সত্যি ক্রিকেট পছন্দ না? নাকি আমায় পছন্দ না?”
প্রাণ প্রত্যুত্তর করতে পারলো না। উত্তরে কি-বাই বলবে সে? তার স্বভাবটাই কেমন অদ্ভুত ধরণের, পাবলিক ফিগার হওয়া সত্ত্বেও লোকসমাগম অসহ্য লাগে তার। অস্বস্তি হয় অচেনা মানুষের ভিড়ে। তাই গুটিয়ে রাখে নিজেকে। উপরন্ত, লো প্রোফাইল মেইনটেইন কি স্বাদে করে নাকি সে? কাল বিশ্রাম নেওয়ার প্রসঙ্গটা নেহাৎ ছুঁতো হিসেবেই দিয়েছিল, আসল কারণ ছিল এটা। কিন্তু ছন্দকে কি আর সে-টা বলা যায়?
প্রাণকে মৌন দেখে ছন্দ তির্যক কন্ঠে বলে, “প্রশ্ন করেছি আমি।”
প্রাণ ছন্দের লম্বাটে চেহেরার পাণে এক পলক তাকায়। ছন্দের নিবিড় কৃষ্ণ মনি তার উপরই নিবদ্ধ, উত্তরের অপেক্ষায় কা’ত’র। প্রাণ দৃষ্টি সরায়। স্বতঃস্ফূর্ত কন্ঠে বলে, “তেমন কিছু না।”
ছন্দের পাল্টা প্রশ্ন, “তাহলে কেমন কিছু?”
স্বভাবগত প্রশ্নের প্রত্যুউত্তরে নীরব থাকতে পছন্দ করে প্রাণ। এবারও তাই করলো। ছন্দ তা দেখে বলল, “আজ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত ছাড়ছি না আপনায়। আই নিড এ প্রোপার এন্সার।”
প্রাণ হাঁপিয়ে ওঠে এবার। বুঝতে পারে ছন্দ সত্যি আজ উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত তাকে ছাড়ছে না। তারও আর ছুঁতো দিতে ইচ্ছে করলো না। তাই ধাতস্থ কন্ঠে বলে উঠে, “জনসম্মুখে অস্বস্তি হয় আমার৷”
কথাটা শুনে ছন্দ অনিমেষ দৃষ্টিতে তাকায়। জিহান বলেছিল তাকে প্রাণ প্রচন্ড ইন্ট্রোভার্ট। সোশ্যাল গ্যাদারিং এ বেশি একটা উপস্থিত হয় না, একা একা থাকে। তবে ছন্দ ভেবেছিল প্রাণ হয়তো মাঝে মধ্যে এমন করে, কেন না আর যাই হোক নায়িকা হয়ে গা ঢাকা দিয়ে বসে থাকা সম্ভব না।
সে আসলে বুঝে উঠতে পারেনি প্রাণ এতটা ইন্ট্রোভার্ট। ছন্দ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো। ছোট করে বলল, “আগে বলবেন না?”
প্রাণ প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে স্মিত হেসে বলে, “বাই দ্যা ওয়ে, কংগ্রাচুলেশন ফর ইউর ভিক্টোরি।”
ছন্দ বলে, “থ্যাংকস বাট জরিমানা দিতে হবে আপনাকে।”
প্রাণ ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে, “কিসের জরিমানা?”
ছন্দ বলে, “কাল ম্যাচ দেখতে না আসার জন্য, সেলিব্রেশনে অংশগ্রহণ না করার জন্য প্লাস দেরিতে উইশ করার জন্য।”
প্রাণ সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকাতেই ছন্দ হেসে বলে, “চিন্তা নেই উল্টাপাল্টা কিছু চার্জ করবো না। শুধু নায়িকা সাহেবার ব্যস্ত সময় থেকে কিছুটা সময় নিজের নামে বরাদ্দ করার আর্জি জানাবো।”
প্রাণ ছন্দের গালে পড়া নিখুঁত গর্তটার দিকে তাকালো। এতদিনের সাক্ষাৎ-এ আজ প্রথমবার উপলব্ধি করলো সে, শ্যামবর্ণ এই মানবটির হাসি একটু বেশি সুন্দর৷ প্রাণের জবাব না পেয়ে ছন্দ বলে উঠে, “উত্তরের অপেক্ষায় আছি কিন্তু।”
প্রাণ নিজেকে ধাতস্থ করে বলে, “আর্জি যদি প্রত্যাখ্যান করা হয়?”
“তাহলে পরেরবার ডাবল চার্জ করে আর্জি জানাবো।”
ছন্দের এমন কথা শুনে প্রাণ আনমনে কিঞ্চিৎ হেসে উঠে। বলে, “কাল সন্ধ্যায় ফ্রি আছি।”
কথাটা বলে প্রাণ নিজের রুমের দিকে চলে যায়। ছন্দ মাথার পিছে হাত গলিয়ে মিনমিনে কন্ঠে বলে, “মেয়েটা সত্যি রাজি হয়ে গেল? বিশ্বাস হচ্ছে না কেন?”
_______
আজ শুটিংয়ের শেষদিন হওয়ায় রাজ সেন দ্রুত সব প্যাক আপ করে দিলেন। তাই বিকেলের আগেই হোটেলে ফিরে আসলো প্রাণ। রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে নিল সে। মাথা ভাড় লাগছিল বিধা চৈতিকে ফোন করে একটা কফি আনতে বলে দিল। যৎসামান্য সময়ের মাঝেই চৈতি হাতে কফি নিয়ে হাজির হলো। প্রাণ কফির কাপে একবার চুমুক বসিয়ে বিরক্তিতে ‘চ’ উচ্চারণ করার মত শব্দ করে বলল, “কফিটা আজ একটু বেশি তিতা।”
চৈতি তটস্থ কন্ঠে বলে, “তাহলে ফেলে দিন ম্যাম। আমি আরেকটা কফি নিয়ে আসছি।”
চৈতির দিক একবার তাকিয়ে প্রাণ বলল, “থাক! প্রয়োজন নেই।”
প্রাণের খাবার অপচয় করা অপছন্দ । তাই কোন রকম অর্ধেক কফিটুকু খেল, কিন্তু কফিটা এতই তিতা ছিল যে চেয়েও আর খেতে পারলো না। সে বুঝে উঠতে পারছে না নরমাল কফি এত তিতা কে বানায়? অদ্ভুত! কফির কাপটা সেন্টার টেবিলের উপর রেখে প্রাণ ছন্দকে একটা মেসেজ করে উঠে দাঁড়ায়। চৈতি তা দেখে জিজ্ঞেস করে, “ম্যাম আপনি কি কোথাও যাচ্ছেন?”
প্রাণ পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে চুলে খোঁপা এঁটে নিয়ে বলে, “হ্যাঁ বেরুব একটু।”
“আমি যাব সাথে?”
প্রাণ ভেবে বলে, “না তার প্রয়োজন নেই।”
চৈতি পুনরায় প্রশ্ন করে, “ফিরবেন কখন?”
প্রাণ আনমনে বলে উঠে, “দেখি!”
কথাটা বলে মুখে মাস্ক আর চশমা পরিধান করে বেড়িয়ে পড়ে সে।
_____
“আমরা যাচ্ছি কোথায়?”
রাস্তার ধারে হাঁটতে হাঁটতে জিজ্ঞেস করলো প্রাণ। ছন্দ ভাবান্তরহীন কন্ঠে বলে, “যেখানে দু’চোখ যায়। কেন হাঁটতে কি কষ্ট হচ্ছে আপনার?”
প্রাণ না সূচক মাথা দুলিয়ে বলে, “না।”
“তাহলে চলতে থাকুন।”
প্রাণ অপ্রসন্ন ভঙ্গিতে ছন্দের পিছু পিছু চললো। কয়েক মিনিট হাঁটার পর তার এসে পৌঁছালো চট্রগ্রামের অলংকার মোড়ে। প্রাণকে একপাশে দাঁড় করিয়ে ছন্দ চলে যায় টেক্সি ভাড়া করতে। কয়েক মুহূর্তের মাঝে একটা টেক্সি নিয়ে হাজির হয় ছন্দ। প্রাণকে উঠে বসতে বললেই সে কৌতূহলপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায়৷ ছন্দ তা দেখে বলে, “এভাবে তাকাচ্ছেন কেন? কি’ড’ন্যা’প করছি না আপনাকে, নিশ্চিন্তে উঠে পড়ুন।”
প্রাণ নিম্নস্বরে কিছু একটা বলে উঠে পড়ে। অতঃপর পাহাড়ি এলাকার আঁকাবাঁকা পথের দিকে ছুটে চলে টেক্সিটি। সাঁঝ নামতে তখনও দেরি। মিঠে রোদে রাস্তার দু’ধারে শ্যামলতা উঁকি দিচ্ছে যেন। বন্য হাওয়ার দল শীতল কা’ম’ড় বসাচ্ছে প্রাণের গায়ে। উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে ওড়নার শেষপ্রান্ত। নিজের ওড়নাটা কোলে গুঁজে প্রাণ পুনরায় জিজ্ঞেস করে, “এবার তো বলেন যাচ্ছি কোথায় আমরা?”
ছন্দ বলে, “আমার পছন্দের এক জায়গায়।”
প্রাণকে অধৈর্য দেখালো। এভাবেই এখানের কোন কিছু সে চিনে না, উপরন্তু চলেছে এক অজানা পথে। মানুষটাও সহজ-সরল উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে রহস্য করছে। আগের শোধ তুলছে কি-না কে জানে? প্রাণ বিহ্বল কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো, “আর সে-টা কোথায়?”
“সীতাকুণ্ড, গুলিয়াখালী।”
নামটি শুনে প্রাণ অনুদ্ধত হলো। ছন্দ তা লক্ষ্য করে বললো, “আমার খুব প্রিয় জায়গা ওইটা। যখনই চট্রগ্রাম আসি তখনই যাওয়া পরে আমার।”
প্রাণ বলে, “প্রিয় সবকিছু একান্ত রাখা ভালো অন্যথায় অন্যের সংস্পর্শে অনুভূতি ফিকে হয়ে যায়।”
“তা ঠিক। তবে বিশেষ মানুষটির সংস্পর্শে প্রিয় সব তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে। তখন একান্ত কিছু আর মনে ধরে না।”
প্রাণ ক্ষীণ কন্ঠে বলে, “হয়তো!”
ছন্দ প্রত্যুত্তরে দূর্লভ হাসলো। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা,উঁচুনিচু পথ পেরিয়ে অবশেষে সীতাকুণ্ড এসে পৌঁছালো তারা। টেক্সি বদল করে এবার গুলিয়াখালীর জন্য সিএনজি নিল তারা। মাঝে সীতাকুণ্ড বাজার থেকে কিছু খাবার-দাবারসহ জরুরি জিনিসপত্র কিনে নিজের ছোট কাঁধ ঝুলানো ব্যাগে পুড়ে নিল ছন্দ। ঘন্টার মত পেড়ুতেই গুলিয়াখালী চলে আসে তারা। আসার পথেই ছন্দ জায়গায়টার সম্পর্কে মোটামুটি সাধারণ সব ধারণা দিয়ে দেয় প্রাণকে। প্রাণও মন দিয়ে শুনে কথাগুলো। গুলিয়াখালীতে নেমে ছন্দ সিএনজি চালকের নাম্বারটা নিজের কাছে রাখলো আর তাকে বলে গেল এখানেই তাদের জন্য অপেক্ষা করতে। ঘন্টা খানেকের মাঝেই তারা চলে আসবে। সিএনজি চালক সম্মতি জানাতেই নৌকায় উঠে পড়ে দুইজনে। দুই ধারে ঘন সবুজ,শ্যামল বনের নিস্তব্ধতা, মাঝে সমুদ্রের অথৈ ঢেউয়ের কলকাকলি। সূর্যের রশ্মি খেলা করছে ধূসর লহরির বুকে। অদ্ভুত এক মা’দ’ক’তা’য় বেষ্টিত সুবাস ভেসে বেড়াচ্ছে অনিলে৷ প্রাণ মুগ্ধ নয়নে চারদিক তাকালো। ঠিক শেষ কবে এভাবে ঘুরতে বেড়িয়ে প্রকৃতি দেখছে সে মনে পড়ে না তার। তবে সে জানতেও চায় না। আজ শুধু সে সবকিছু উপভোগ করতে চায়।
আকস্মিক ছন্দ বলে উঠে, “আপনি নিজের মাস্ক আর চশমা এবার খুলে নিতে পারেন। এখানে আমাদের চেনার মত কেউ নেই।”
ছন্দের কথা শুনে প্রাণ আশপাশ তাকালো, নৌকায় মাঝি এবং তারা ব্যতীত আর কেউ নেই৷ তাই সে নির্ভয়ে নিজের মাস্ক ও চশমাটি খুলে সাইড ব্যাগে রেখে দিয়ে লম্বা নিঃশ্বাস নিল। গুলিয়াখালী সি বীচের তীরে নৌকা এসে যখন থামলো তখন সূর্যাস্তের সময় প্রায়। ছন্দ তা দেখে হেসে বলে, “পার্ফেক্ট টায়মিং!”
কথাটা শুনে প্রাণ ছন্দের দিক তাকাতেই ছন্দ নেমে পরে। অতঃপর প্রাণের দিক এক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, “আসুন!”
প্রাণ নিঃসংকোচে ছন্দের হাত ধরে নামতে নিল। ছন্দ তা দেখে বলে উঠে, “আমি ধরে রেখেছি, সাবধানে নামেন।”
প্রাণ নামলো।সবুজ গালিচার ঘাসের উপর রাখতেই ছন্দ তার হাতের কব্জি ধরে এগিয়ে নিয়ে গেল একটি জায়গায়। নম কন্ঠে বলল, “এবার সামনে তাকান আর অপেক্ষা করুন।”
প্রাণ তাকালো সামনে, র’ক্তি’ম আভা গায়ে মেখে সূর্য চলেছে অন্তিম বিদায় নিয়ে। নিমজ্জিত হতে প্রস্তুতি বিশাল সমুদ্র সৈকতের গহীনে। কেওড়াবাগান জুড়ে নির্জনতা,নিস্পন্দতার অদৃশ্য দা’পা’দা’পি। কিন্তু তবুও এর মাঝে আলাদা এক মায়া বিদ্যমান, যা ঐশ্বরিক। মেঘমালা সেজেছে আজ বাহারি রূপে। তার কোন অংশ লাল, কোন অংশ আবার হলুদ,কমলা,গোলাপি। যার দরুণ আকাশটা আজ অনিন্দ্য সুন্দর। প্রাণ অস্ফুট কন্ঠে বলে উঠলো এবার, “প্রকৃতি এত সুন্দর কেন?”
ছন্দের প্রাণের দিক তাকিয়ে বলে, “আপনি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছেন বলে।”
প্রাণ এক পলক ছন্দের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। প্রকৃতির এই অপার্থিব সৌন্দর্য উপভোগ করার মাঝেই র’ক্তি’ম আভা হারিয়ে গেল গুলিয়াখালী সৈকতের অন্তরালে। আঁধারের আসে নিভৃতে। প্রাণের ঠোঁট আপনা-আপনি প্রসারিত হয়৷ তার দেখা জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সূর্যাস্ত ছিল এটা। আগে কখনো এভাবে প্রকৃতির মাঝে দাঁড়িয়ে উপভোগ করা হয়নি তার। মনে মনে ছন্দের প্রতি অগাধ কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে সে, এমন সুন্দর এক দৃশ্যের সাক্ষী তাকে করার জন্য। এদিকে, প্রাণের অধর কোণে হাসিটুকু দেখে ছন্দ আনমনে বলে উঠে, “প্রাণদের সর্বদা প্রাণোচ্ছলই মানায়, প্রাণহীন না।”
#চলবে
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ।]