স্বপ্ন?পর্ব_৪৯/৫০/৫১

0
419

স্বপ্ন?পর্ব_৪৯/৫০/৫১
#অনামিকা_সিকদার_মুন
#পর্ব_৪৯
.
.
.
নিশির ঘুম ভেঙে গেলেও চোখ বন্ধ করে উপুর হয়ে শুয়েছিল । কারণ কাল রাতে নিঝুমের সাথে কথা হবার পর অনুকে নিয়ে বারান্দায় বসে গল্প করতে করতে পাঁচটা বাজিয়ে দেয় । পরে রুমে এসে ঘুমানোর চেষ্টা করে । তাতে বিশেষ কোনো লাভ হয়নি । তবুও চোখ বুজে ছিল চোখ জ্বালা করছিল বলে । কিন্তু হঠাৎ করে মায়ের চিৎকার শুনে শোয়া থেকে লাফিয়ে উঠে । হুড়মুড় করে বের হয় মায়ের রুমে যাওয়ার জন্য । রুম থেকে বেড়িয়েই দেখে মায়ের রুমের কাছে অনু মাটিতে পড়ে আছে । আর মা অনুর নাম ধরে চিৎকার করে ডাকছে । নিশির মাথা ঝিম ধরে এলো । বুঝতে আর বাকি রইলো না যে আবার কোনো অঘটন ঘটেছে । নিশি অনুর কাছে গিয়ে ফ্লোরে লেপ্টে বসে পড়ে । অনুর মাথা কোলে তুলে নেয় । ডাকাডাকি করে কোনো কাজ হলো না । নিশি আর মা মিলে অনুকে ধরাধরি করে তুলে সোফায় শোয়ালো ।

অনুর জ্ঞান ফিরে রাত আড়াইটার সময় । পিটপিট করে চোখ খুলে দেখে ওর মা সামনে বসে কাঁদছে । নিশি একটু দূরে দাড়িয়ে আছে । অনুকে চোখ খুলতে দেখে কান্না থামিয়ে মেয়ের মাথায় হাত রাখেন অনুর মা । অনু কোনো কথা না বলে আবার চোখ বন্ধ করে ফেলে । মায়ের রুমে আড়ালে দাড়িয়ে শোনা কথাগুলো মনে পড়ে যায় ওর । সাথে সাথে দু’চোখে জলেরা এসে হানা দেয় । একটা ঢোক গিলে বড় করে শ্বাস ফেলে কান্না চাপিয়ে নেয় ।
—অনু…
মায়ের ডাক শুনেও কোনো কথা বলল না অনু । চুপ করে রইলো । নিশি ইশারায় মাকে মানা করল কথা বলতে । তিনি আর কোনো কথা বললেন না ।
সেদিন রাতে অনু আর কোনো কথাই বলেনি । অনুর জ্ঞান ফেরার কিছুক্ষণ পর নিশি মাকে জোর করে রুমে পাঠিয়ে দেয় । বলে বিশ্রাম নিতে । মাকে পাঠিয়ে দিয়ে নিশি বোনের কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, যে কি হয়েছিল? হঠাৎ করে এমন জ্ঞান হারালো কেন?
জবাবে অনু কিছুই বলেনি । শুধু বলে,
—আপি আমার পাশ দিয়ে শুয়ে পর ।
নিশি কথা না বাড়িয়ে অনুর পাশে শুয়ে পড়ে । নিশি শোয়ার সাথে সাথেই অনু নিশিকে বাচ্চাদের মতো জড়িয়ে ধরে গুটিশুটি হয়ে থাকে । নিশি অবাক হয় অনুর এমন আচরণে । কিন্তু কিছুই বলল না ।

পরের দিন বিকালে_____
অনু সবসময়ে ন্যায় দাড়িয়ে আছে ধানমন্ডি লেকের ভেতরের ব্রিজটার উপরে । দৃষ্টির নেই কোনো নির্দিষ্টতা । আনমনে ভেবে চলেছে অনেক কিছু । যেই ভাবনার নেই কোনো সীমাবদ্ধতা ।
নীল আসলো কিছুক্ষণ পরে । এসে দেখে অনু আনমনে অনির্দিষ্ট কোথাও তাকিয়ে আছে । সাদা রংয়ের ড্রেস পরে এসেছে । কেন জানি নীলের অনুকে সাদা রংয়ে দেখতে খুব ভালো লাগে । শুভ্র একটা পরী মনে হয়ে । কিন্তু আজ কেমন জানি বিধস্ত লাগছে । নীল দূর থেকে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলো অনুকে । তারপর চুলে হাত চালাতে চালাতে অনুর কছে এসে দাড়ালো । নীল অনুকে ডাক দিবে ঠিক তখনই অনু পেছন ফিরে তাকায় । নীলকে দেখে সামান্য হাসে । নীল অনু পাশে দাড়িয়ে বলে,
—ওয়েট করালাম অনেকক্ষণ তাই না? আসলে জ্যামে পড়েছিলাম তাই দেরি হয়ে গেল ।
উত্তরে অনু শুধু হাসলো । নীল আবার বলল,
—কি ব্যাপার আজ এত চুপচাপ যে??
—নাহ এমনি আরকি…
নীল কালকে অনুর জ্ঞান হারানোর কথা জানে না । নিশি জানাতে চেয়েছিল । কিন্তু অনু মানা করে জানাতে ।
অনুকে এমন চুপচাপ দেখে নীল অনুকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আবার জিজ্ঞেস করে,
—অনু সত্যি করে বলো তো কী হয়েছে?? এমন দেখাচ্ছে কেন তোমাকে?
অনু কিছু না বলে নীলকে জড়িয়ে ধরলো । নীল তো যারপরনাই অবাক হয়ে গেল । বিষ্ময়ে অনুকে জড়িয়েও ধরতে পর্যন্ত ভুলে গেল । যখন একটু খেয়াল হলো তখন নিজেও জরিয়ে ধরল । মুচকি হেসে বলল,
—বাব্বাহ্ আজ সূর্য কোন দিকে উঠেছে!!
অনু কোনো জবাব দিল না । নীরবে কয়েক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন দিল নীলের বুকে । তারপর নীরবেই অনু চোখের পানি মুছে নীলকে ছেড়ে সরে দাড়ালো । হাসি হাসি মুখে বলল,
—আমার অপরাজিতা কই?
নীল এক চোখ কুঁচকে বলল,
—ইসসস সরি সরি । একদম ভুলে গেছি আনতে । অনু রাগী চোখে তাকালো নীলের দিকে । বলল,
—হ্যাঁ সেটা তো ভুলবেনই ।
তারপর গটগট করে হেঁটে চলে যেতে লাগল । পিছে নীল দৌড়ে এসে বলল,
—আরে সুন্দরী দাড়াও।
কে শুনে কার কথা । অনু দাড়ালোই না । নীল পেছন থেকে অনুর হাত ধরে আটকালো । চমকে উঠল অনু । তড়িৎ গতিতে তাকায় নীলের আকড়ে ধরা হাতের দিকে ।
নীল অনুকে নিয়ে গাড়িতে এসে বসল । এর মধ্যে অনু একটা কথাও বলে নি । গাড়িতে বসে নীল অনুর হাতে অপরাজিতা ফুল রাখল । বলল,
—এই নিন অপরাজিতা । এবার তো একটু হাসুন ।
অনু নীলের দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসলো শুধু ।
বিকাল থেকে প্রায় রাত ন’টা পর্যন্ত নীলের সাথে ঘুরল অনু । তারপর অনুকে বাসায় ড্রপ করে দিয়ে যায় নীল । বাসার সামনে আসার পর অনু নীলের দিকে তাকিয়ে রইল । নীলকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছে করছে না একদম । এরপর যে আর কোনোদিন এভাবে পাশাপাশি বসা হবে না । চোখে চোখ রাখা হবে না । নীলের পাগলামো কাজে লাজুক হাসি হাসতে পারবে না । যখন তখন দেখা করতে পারবে না । রাত ভর জেগে মুঠোফোনে হাজারটা #স্বপ্ন বোনা হবে না । কারণ মনে মনে যে অনেক বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে ও ।
নীলের দিকে তাকিয়ে নীরবতার ভাষায় অনু বলছে,
—শেষ আরেকবার বলবেন “মিষ্টি অনু ভালোবাসি” ?
কিন্তু কথাটা অনুর মনেই রয়ে গেল । মুখে আর বলা হলো না ।
গাড়ি থেকে নেমে অনু গটগট করে হেঁটে ভেতরে চলে গেল । একবারও পেছন ফিরে তাকায়নি । আজ অনুর সবকাজে কেমন অস্বাভাবিকতা খুঁজে পেয়েছে নীল । অনু তিন বছরে করেনি এমন কাজও করেছে আজ । তাই কেমন জানি খটকা লাগছিল নীলের । হয়তো অনুর কিছু হয়েছে । কিন্তু ওকে বলছে না । কিন্তু সেটা কি? অনেক খুঁজেও উত্তর পেল না নীল । অনুকে যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছিল ততক্ষণ পর্যন্ত নীল তাকিয়ে ছিল । বাসার একদম ভিতরে চলে যাওয়ার পর যখন আর অনুকে দেখা গেল না তখন নীল গাড়িতে উঠে পড়ে । নীল গাড়িতে উঠে যাওয়ার পর গেইটের আড়াল থেকে হালকা মাথা বের করে তাকালো অনু । নীলের গাড়িটা চলে যাচ্ছে । ভীষণ ইচ্ছে করছে দৌড়ে গিয়ে নীলকে আটকাতে । কিন্তু সেটা করবে না অনু । কারণ এখন থেকে মায়ার বাঁধন কাটতে হবে । তার বদলে যদি মায়ায় আরও জড়ায় তাহলে তো মনে মনে যেই সিদ্ধান্ত ও নিয়েছে সেটা করতে পারবে না ।

—কালকে তোমাদের বাসায় যাবে আব্বু আম্মু ।
বিছানার সাথে হেলান দিয়ে বসতে বসতে বলল নিঝুম । নিশি উত্তেজিত কণ্ঠে বলে,
—কিহহ!! সত্যি বলছো!!
নিশির উত্তেজিত কণ্ঠ শুনে হেসে ফেলে নিঝুম । বলল,
—হ্যাঁ, রে বাবা সত্যি ।
তারপর দুষ্টুমি স্বরে নিঝুম আবার বলল,
—এত তাড়া বিয়ে করার? জানতাম না তোহ…. তাহলে আরও আগেই বউ করে নিয়ে আসতাম ।
নিঝুমের কথা বুঝতে পেরে লাজুক হাসি হাসলো নিশি । একদম চুপটি করে রইল । নিঝুম শব্দ করে হেসে উঠে । বলল,
—বাব্বাহ এখন লজ্জাও পাওয়া হচ্ছে? এইজন্যই বলে…
নিঝুমকে সম্পূর্ণ কথা বলতে দিল না নিশি । কথার মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বলল,
—আমি ফোন রাখলাম ।
নিঝুমের হাসির মাত্রা আরও বেড়ে গেল । নিশি খট করে লাইনটা কেটে দিল । নিঝুমের কথায় প্রচন্ড পরিমাণে লজ্জা লাগছে নিশির । “লোকটা আস্ত একটা বদ । ” মনে মনে নিঝুমকে বকা দিল নিশি ।
নিঝুম সাথে সাথেই কল দেয় । কিন্তু নিশি কল কেটে দেয় । আবারও কল দেয় নিঝুম । নিশিও আবার কেটে দেয় । এভাবেই চলতে থাকে কিছুক্ষণ । পরে আর কল না দিয়ে ম্যাসেজ পাঠায় নিঝুম ।
—” issh amr lojjaboti lajuklata re… Lal hoye gecho ekdom…aynay dekho takiye… ”
এইটুকু পড়ে নিশি সত্যি সত্যি আয়নায় তাকালো । তারপর আবার ভীষণ লজ্জা পেয়ে চোখ সরিয়ে নিল আয়না থেকে । আবার নিঝুমের ম্যাসেজ পড়তে লাগল,
—” ki dekhecho? hum jani jani… thak r kichu bollam na…
accha shono kichu picture pathacchi… dekho…. dekhe jodi mon chay tahole call dio… wait korbo…
amr shopnokonno I Love You…”
নিঝুমের ম্যাসেজ পড়ে মুচকি মুচকি হাসতে লাগল নিশি । কিছুক্ষণ পরেই কতগুলো ছবি এলো ফোনে । নিঝুম পাঠিয়েছে । ছবিগুলো দেখে তব্দা খেয়ে রইল নিশি । চোখকে যেন বিশ্বাস হচ্ছে না । স্লাইড পাল্টে একটা একটা করে ছবি দেখতে লাগল । এতসুন্দর নিখুঁত করে ওর ছবি আঁকা । বাম চোখের কোণে ছোট্ট তিলটা পর্যন্ত বাদ যায়নি । বারোটা ছবি পাঠিয়েছে নিঝুম । একেকটা ছবি একেক ভঙ্গিতে ।
এরমধ্যেই অনু আসে রুমে । এসেই ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়ে বিছানায় । কপালের উপর হাত রেখে চোখ ঢেকে রাখে । নিশি অনুকে দেখে ফোন রেখে দেয় । বারান্দা থেকে ভেতরে এসে অনু পাশে বসে । নিশির পাশে এসেছে বুঝতে পেরে অনু কপাল থেকে হাত সরালো । নিশির দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিয়ে বলে,
—কি ব্যাপার আপি? তোকে খুব খুশি খুশি মনে হচ্ছে ।
নিশি মুখ একটু গোমড়া করে বলে,
—আর তোকে খুব দুঃখী দুঃখী লাগছে । ব্যাপার কি?
নিশির কথায় আরেক দফা হেসে নেয় অনু ।
—হুহ
মুখ ভেঙ্গায় নিশি ।
—জানিস কালকে নিঝুম নীলের আব্বু আম্মু আসবে।
বলেই একটা বিশাল হাসি দেয় নিশি । কিন্তু নিশির কথা শুনে অনুর মুখ থেকে হাসি উবে যায় । নিশি আরও বলতে লাগল,
—একটু আগেই নিঝুম বলেছে ।
অনুর মনে ঝড় শুরু হয়ে যায় । যেই ঝড়ে দুমড়ে মুচড়ে যাওয়া শুরু করেছে ওর ভেতরটা । চোখে ফেটে পানি আসতে চাইছে । কিন্তু নিশিকে কিছুই বুঝতে দিবে না বলে নিজেকে সামলে নেয় অনু । একটা মিথ্যে হাসি মুখে ঝুলিয়ে বলে,
—গ্রেট । তার মানে কালকে আমার বোনের বিয়ের পাকাপাকি কথা হবে ।
নিশি অনু গাল টেনে বলল,
—শুধু আমার না বাচ্চা তোমারও বিয়ের পাকা কথাও হবে ।
উত্তরে কিছু বলল না অনু । স্মিত হেসে শুধু নিশির দিকে তাকিয়ে রইল ।

—অনু পাগল হয়ে গেছো তুমি । আবল তাবল কি বলছো এইসব?
নীলের গলা কাঁপছে । মাথার রগ দপদপ করছে অনুর কথা শুনে । অনু স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
—যা শুনেছ তাই ।
—হঠাৎ এসব কেন বলছো? কারণটা তো বল ।
—কোনো কারণ নেই ।
—তাহলে?
—কোনো তাহলে টাহলে না । বলেছি তো আই নিড ব্রেকাপ । আর কোনো কারণ জিজ্ঞেস করবেন না । আর হ্যাঁ, দয়া করে এসবের মধ্যে আমার বোনকে টানবেন না । ওদের সব কিছু যেমন স্বাভাবিক চলছে সেভাবেই যেন থাকে । আর আপিকেও এসব কিছু বলবেন না ।
নীল এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না । রাগে একবারে গর্জের ওঠে । রাগ ঝরা কণ্ঠে বলল,
—ফাজলামো পেয়েছ? তুমি বলবা আর আমি মেনে নিব? আমি এমন কিছু করিনি যার জন্য তুমি ব্রেকাপ করবা ।
অনু কোনো উত্তর দিল না । চুপ করে রইল । অনুর কোনো উত্তর না পেয়ে নীলের আরও রাগ উঠতে লাগল । তারপরও নিজেকে শান্ত করারা চেষ্টা করছে ও । শান্ত কণ্ঠে বলল,
—অনু কি হয়েছে? কোনো প্রবলেম? আমাকে বলো আমি ঠিক করে দিব সব ।
অনু আগের মতো শান্ত ভাবেই জবাব দিল,
—কিছুই হয়নি ।
—তাহলে কেন এমন করছো? অনু আমাদের সম্পর্কটা এত ঠুনকো না যে বললেই ব্রেকাপ হয়ে যাবে । তোমাকে ছাড়তে পারবো না আমি । ভালোবাসি তোমাকে । কেন পাগলামি করছো?
অনু চোখ বুজে ফেলল । ওর কানে বার বার একটা কথা প্রতিধ্বনিত হতে লাগল । ” ভালোবাসি তোমাকে ” চোখ থেকে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে । তার সাক্ষী হলো রাতের আঁধার আর নীরবতা । সেই চোখে বেয়ে পড়া আশ্রু আর কারো নজরে পড়ল না । শ্বাস আটকে আসছে অনুর । গলায় মনে হচ্ছে পাথর চাপা পড়েছে । কথার খেই হারিয়ে ফেলেছে । প্রচন্ড অসহায় লাগছে নিজেকে । অপর পাশ থেকে নীলের কণ্ঠ আবার শোনা গেল ।
—অনু..
নিশ্চুপ অনু ওর কাছে আজ কোনো কথা নেই । সব হারিয়ে ফেলেছে ছোট্ট একটা সত্যি নামক ঝড়ে। নীল আবার বলল,
—নিজে কষ্ট পাচ্ছ । আর আমাকেও দিচ্ছ । কেন অনু?
অনু একটা ঢোক গিলে লুকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল । কণ্ঠ স্বাভাবিক করে বলল,
—আমি কোনো কষ্ট পাচ্ছি না । আর হ্যাঁ, যেটা বলেছি সেটাই । রাখছি আল্লাহ হাফেজ ।
নীলকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কল কেটে দিল । ফোন রেখে মুখে হাত চেপে হু হু করে কেঁদে উঠে অনু । কাঁদতে কাঁদতে সেখানেই বসে পড়ে ।
অপরদিকে নীল এখনও কানে ফোন লাগিয়ে বসে আছে । বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে যে অনু এমন কিছু বলেছে । নিজে হাতে সম্পর্কের ইতি টেনে দিয়েছে । কি করে এমন করল অনু? কি করে? কোন অপরাধের শাস্তি দিচ্ছে ওকে? রাগে ফোনটা এক আছাড় মারলো নীল । ফোনটা ছিটকে গিয়ে দেয়ালের সাথে বাড়ি খেয়ে দু’টুকরো হয়ে গেল । তারপর সেন্টার টেবিলের উপর রাখা ল্যাম্পটা এক ধাক্কায় ফেলে দিল। টুকরো টুকরো হয়ে গেল সেটাও । কাঁচের ফুলদানীটাও ভেঙে ফেলে নীল ।
নীলের ঘরের পাশ দিয়েই যাচ্ছিল নীলের মা । নীলের ঘরে ভাংচুরের আওয়াজ পেয়ে দৌড়ে আসেন তিনি । এসে দেখেন নীল পাগলের মতো ঘরের সব জিনিসপত্র ভাংচুর করছে । নীলের কাছে গিয়ে নীলকে শান্ত করার জন্য আকড়ে ধরেন তিনি । কিন্তু নীল আরও রেগে গেল । চোখ বন্ধ করে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,
—মা প্লিজ ছাড়ো । আর আমাকে একা থাকতে দাও
নীলের কণ্ঠ শুনে একটু ভয় পেয়ে গেলেন উনি । কারণ নীল প্রচন্ড রেগে গেলেই শুধু এভাবে কথা বলে । উনি চুপচাপ ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন । নীলের মা বেরিয়ে যেতেই নীল মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ে । কোনো অজানা কারণেই ওর আজকে কেমন অস্থির অস্থির লাগছিল । আর এখন তার কারণটা বুঝতে পারলো । নীলের চোখের কোণা বেয়ে দু’ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো ।
নিঝুম নীলের মা মিসেস তাহমিনা নীলের রুম থেকে বেরিয়েই ছুটে যান নিঝুমের ঘরের দিকে । গিয়ে দেখেন নিঝুমও রুম থেকে বেড়িয়ে আসছে । নিঝুম মাকে দেখেই মায়ের কাছে এসে বলল,
—মা ভাংচুরের আওয়াজ আসছিল কোত্থেকে?
মিসেস তাহমিনা একটু আগে নীলের করা পাগলামির কথা বললেন । সব শুনে নিঝুম নীলের রুমের দিকে দৌড়ে গেল । গিয়ে দেখে নীল রুমের বেহাল দশা বানিয়ে ফেলেছে । কাঁচ ভাঙার উপরেই বসে আছে । নীলের হাত কেটে গেছে । ব্লিডিং হচ্ছে সেখান থেকে । কিন্তু সেদিকে নীলের কোনো ধ্যান নেই । থম ধরে বসে আছে ও । নিঝুম নীলের কাছে গিয়ে ওকে টেনে তুলল ওখান থেকে । তারপর নীলকে বিছানায় বসিয়ে ফার্স্ট এইড কিট নিয়ে এসে নীলের হাত ড্রেসিং করে ব্যান্ডেজ করে দেয় । নীল একটা কথাও বলল না । আগের মতোই নির্বিকার বসে রইলো ।
—এমন পাগলামি কেন করলি? কি হয়েছে?
বেশ ঠান্ডা স্বরে প্রশ্ন করল নিঝুম । কিন্তু উত্তরে নীল কিছুই বলল না । উল্টো কেমন উদ্ভট হাসি হাসতে লাগল । নিঝুম একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখতে লাগল নীলকে । ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে কি এমন হয়েছে যে নীল এমন করছে ।
—ভাইয়া আমার মাথা ধরেছে । ঘুমাবো ।
একথা বলে নীল একদম শুয়ে পড়ল । নিঝুম উঠে পড়ল যাওয়ার জন্য । দরজার কাছে যেতেই নীল নিঝুমকে পেছন ডেকে বলল,
—ভাইয়া কালকে যেন আব্বু আম্মু শুধু তোর বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যায় ।
নীলের কথা শুনে চমকে উঠে নিঝুম । অবাক হয়ে বলে,
—মানে?
নীল নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে বলল,
—ইট’স অল ওভার ভাই । সব শেষ ।
নিঝুম নীলের কথার আগামাথা কিছুই বুঝলো না ।

ঝিলের পাড়ে বসে আছে অনু । হাতে নুড়ি পাথর । একটা একটা নুড়ি ঢিল মেরে পানিতে ফেলছে ও । পাশে বসে আপাতত আযান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে অনুর দিকে । অনু একটু আগে যা যা বলেছে সব ওর মাথার উপর দিয়ে গেছে । অনুর জায়গায় ও হলে এতক্ষণে যে কি হতো সেটাই ভাবছে আযান । অথচ অনু এমন ভঙ্গিতে বসে আছে যেন কিছুই হয়নি । সব কষ্টগুলো কিভাবে পারে এভাবে হাসিমুখে সহ্য করতে । সেটাই মাথায় আসছে না আযানের । হঠাৎ বাজখাই এক ধমকে ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে পা রাখলো আযান. ….
.
.
.
চলবে?
(বিঃদ্রঃ ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন ।)

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

#স্বপ্ন?
#অনামিকা_সিকদার_মুন
#পর্ব_৫০
.
.
.
ঝিলের পাড়ে বসে আছে অনু । হাতে নুড়ি পাথর । একটা একটা নুড়ি ঢিল মেরে পানিতে ফেলছে ও । পাশে বসে আপাতত আযান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে অনুর দিকে । অনু একটু আগে যা যা বলেছে সব ওর মাথার উপর দিয়ে গেছে । অনুর জায়গায় ও হলে এতক্ষণে যে কি হতো সেটাই ভাবছে আযান । অথচ অনু এমন ভঙ্গিতে বসে আছে যেন কিছুই হয়নি । সব কষ্টগুলো কিভাবে পারে এভাবে হাসিমুখে সহ্য করতে । সেটাই মাথায় আসছে না আযানের । হঠাৎ বাজখাই এক ধমকে ভাবনার জগত থেকে বাস্তবে পা রাখলো আযান ।
—ওমন হ্যাবলার মতো তাকিয়ে আছিস ক্যান? জীবনে আমাকে দেখিস নাই? এই প্রথম দেখছিস?
আযান অনুর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকেই বলল,
—তুই কি মানুষ? নাকি এলিয়েন রে? নিজের অনুভূতিগুলো এভাবে দেবে রেখে অনুভূতিশূণ্য মানুষদের মতো থাকিস কিভবে?
অনু চোখ পাকিয়ে বলল,
—এত বিজ্ঞদের মতো কথা তোকে কে বলতে বলেছে? হ্যাঁ? আমি বলেছি? এহহহ আসছে আমার বিজ্ঞ ব্যাক্তি! আমার কোনো অনুভূতি টুতি নেই । কাজের কথায় আয় । যা বললাম তা পারবি কিনা বল?
আযান অনুর চুল টেনে ধরল । হাতে একটা খামচিও মারলো । তারপর চটাস করে একটা থাপ্পর মেরে দিল ডান গালে । বলল,
—একদম ঢং করবি না । তোরে আমি চিনি না ভাবছিস? এক্ষুণি যদি ভ্যা ভ্যা করে না কাঁদিস, তাহলে মেরে গাল লাল আর গায়ের খাল দু’টাই তুলে নিব ।
অনু তেড়ে এলো আযানের দিকে । দেখে মনে হলো এক্ষুণি গিলে খাবে আযানকে । কিন্তু হলো উল্টোটা । অনু আযানকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে মাটিতে ধপ করে বসলো । বসে নিজের চুল টেনে ধরল । নিজের হাতেই নিজে কামড় বসালো । পাগলের মতো দু’হাতে মাটি খামচালো । নখের কোণা ভেঙে রক্তও বেড়িয়ে এলো । কিন্তু থামলো না অনু । উল্টো আঘাতের পরিমাণ আরও বাড়ালো । শেষে চিৎকার করে কেঁদে উঠল । পাশে দিয়ে কিছু মানুষ যাওয়ার সময় ঘুরে ঘুরে তাকাতে লাগলো অনুর দিকে । প্রথমে আযান কিছুই বলল না। কারণ ওর মনেই হচ্ছিল এমন কিছু করবে অনু । তাই খালি দেখল অনু কি করে । কিন্তু এখন অনুকে থামানো দরকার । আযান অনুকে উঠিয়ে সোজা করে বসালো । হাত দিয়ে অনুর এলোমেলো চুলগুলো ঠিক করে দিল । অনু মাথাটা নিজের কাঁধে রেখে বলল,
—এবার কাঁদ ।
এবার আর অনু কাঁদলো না । নিশ্চুপ হয়ে গেল একদম । কিন্তু চোখ দিয়ে অনবরত অশ্রু গড়াতেই থাকলো । নীলের হাসি হাসি মুখটা ভেসে উঠলো । সাথে সাথে চোখ বন্ধ করে নিল অনু । একটা ঢোক গিলল বড় করে । এখনো নীলের মুখটাই দেখলো । চোখ বন্ধ করে কারো প্রতিচ্ছবি যখন চোখে ভাসে তখন চোখ খুলে তাকে দূরে সরিয়ে ফেলা যায় একটু হলে । কিন্তু চোখ বন্ধ বা খোলা নিজের সবটা অস্তিত্ব জুড়েই যখন কেউ দখল করে বসে থাকে তার থেকে কিভাবে দূরে যাবে? এ যে অসম্ভব ।
আযান মাথা ঘুড়িয়ে অনুর দিকে তাকালো । অনুর কান্নামাখা মুখটা দেখে মুখ ঘুড়িয়ে নিল আযান । অনু দেখার আগেই চোখের পানি মুছে ফেলল । গলা ভার হয়ে আসছে ওর । সুপ্ত অনুভুতিগুলো অনুকে কাছে পেয়ে মাথা চাড়া দিয়ে আবার নিজের আস্তানা গাড়তে চাইছে আযানের মাঝে । কিন্তু তার আগেই আযান মাহির নামটা নিয়ে ওর মুখটা চোখের তারায় ভাসিয়ে সুপ্ত অনুভূতিদের আবার গেড়ে ফেলল । কথা বলতে যেয়েও সব দলা পাকিয়ে যাচ্ছে গলায় এসে । নীরবে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে স্বাভাবিক করে অনুকে বলল,
—অনু তুই কিন্তু বললি না যে কেন নীল ভাইয়ার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেবার মত এত বড় সিদ্ধান্ত নিলি?
সাথে সাথে চোখ খুলল অনু । আযানের কাঁধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসে স্মিত হাসলো । সেই হাসিতে মিশে ছিল রহস্য । এইমুহুর্তে অনুর হাসিকে আযানের ঠিক মোনালিসার হাসি মনে হলো । যদিও অনুর হাসি আযান মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখে । কিন্তু এখন অনুর এই হাসি দেখে রাগে গা রিনরিন করছে আযানের । মন চাচ্ছে কানের নিচে চটাস করে আরেক লাগাতে । কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো আযান । সেটা দেখে অনুর হাসি আরও চওড়া হলো । বলল,
—আমাকে নিয়ে কোনোদিন নীলের একটা শব্দ শুনতে হোক আমি চাই না । আমার জীবনের কঠিন সত্য জেনে ওর জীবনটা এলোমেলো হোক আমি চাই না রে । তাই…..
অনুর কথা শেষ করতে না দিয়ে আযান বলল,
—তাই তুই মহামানবী সাজচ্ছিস । বাহ । আসাধারণ ।
রাগে ফসফস করতে লাগল আযান । একটুপর আবার বলল,
—ওয়েট । কি কঠিন সত্য তোর জীবনের?
অনু কোন উত্তরে হাসল মাত্র । আকাশের দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই বলল,
—সবাই খুব ভালো থাকবে দেখিস ।
.
.
নিশি মাথা নিচু করে বসে আছে । সামনে বসে আছে নিঝুমের বাবা, মা, মাহি আর নিঝুম । নিশির মা ওর পাশে বসে আছে । সবাই কথা বললেও নিশি চুপ করে বসে আছে । ভেতরে ভেতরে প্রচুর নার্ভাস লাগছে ওর । মনে মনে অনুকে একশতটা গালাগাল দিচ্ছে । ওকে ফেলে এভাবে কই চলে গেল মেয়েটা? কিভাবে পারলো? তাছাড়া অনুকেও তো আজ দেখতে আসার কথা । তারপরেও বেড়িয়ে গেল কেন? আবার নীলও আসে নি । কাল রাতেও অনুকে একটু অস্বাভাবিল লাগছিল । আড়চোখে একবার নিঝুমকে দেখেছিল নিশি । তখন নিঝুমের মুখটা কেমন বিষণ্ণ দেখাচ্ছিল । মাহি হাসছে কথা বলছে । তবে কেমন জানি একটু চুপচাপ । চুপচাপ বিষয়টা মাহির স্বভাবে একদমই নেই । কিন্তু আজ দেখছে । সবমিলিয়ে নিশির তালগোল পাকাতে শুরু করেছে । কোনো সমস্যা হয় নি তো! নিশি ঘামতে লাগলো । মাথার ভেতরেও যেন কি একটা ভনভন করে ঘুরছে লাগছে । হঠাৎ ঘোর ভাঙ্গলো হাতে কারো ছোয়া পেয়ে । চমকে উঠে সেদিকে তাকালো নিশি । হাসি হাসি মুখে নিশির পাশে বসে ওর হাত ধরেছেন নিঝুমের মা । নিশি আবার মাথা নিচু করে ফেলল । হাতের দিকে তাকালো যেটা আপাতত নিঝুমের মায়ের হাতে বন্দী । নিঝুমের মা নিশির হাতে একজোড়া বালা পড়িয়ে দিয়ে নিশির মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
—আলাদা করে কিছু আর বলার নেই আপা । আপনার লক্ষীকে এবার আমি আমার ঘরের লক্ষী করে নিয়ে যেতে চাই খুব শিঘ্রই ।
তারপর নিশির থুতনি হাত দিয়ে মুখটা উঁচু করে কপালে চুমু দিলেন । নিশির মা হেসে বললেন,
—যেখানে নিঝুম নিশি দু’জনই দু’জনকে পছন্দ করে আর আপনারাও রাজি । সেখানে কি আর আমার অমত হয় নাকি । নিঝুমকেও আমার খুবই পছন্দ হয়েছে ।
টুকটাক আরো কথা চলল । এংগেজমেন্ট কবে করবেন, বিয়ের ডেট কবে ঠিক হবে ইত্যাদি বিষয়ে আলাপ চলতে থাকলো । কিন্তু নিশির মন সেদিকে নেই । অনু আর নীলকে নিয়ে তখন ভাবনায় বিভর ও । নিঝুম তো বলেছিল অনু আর নীলের বিয়ের কথাও আজ পাকা হবে । কিন্তু সেই বিষয়ে তো কোনো কথাই উঠল না । তাহলে কি কোনো ঝামেলা হলো?
.
নিশি নিঝুমের বিয়ে ঠিক করা হয়েছিল একমাস পর । সেই সময় দেখতে দেখতে পেরিয়ে গিয়ে একসপ্তাহের মতো বাকি । এর মধ্যেই সব আয়োজনের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল । নিঝুম যদিও দেরি করতে চেয়েছিল কিন্তু অনুর জন্য পারে নি । অনু নিঝুমের সাথে আলাদা দেখা করে অনেক অনুরোধ করে রাজি করায় নিঝুমকে । নিঝুম অনেক চেষ্টা করেছিল জানতে যে অনুর কি হয়েছে । কেন ও নীলকে ছাড়ার মতো এমন একটা সিদ্ধান্ত নিল । কিন্তু জানতে পারে নি । শেষে রেগে অনুর সাথে কথা বলা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল নিঝুম । নিজের ভাইয়ের কষ্ট সহ্য করার মতো সাধ্য নিঝুমের কোনো কালেই ছিল না । কিন্তু সেটাও করতে হচ্ছে আজ পরিস্থিতির স্বীকার হয়ে । হুট করেই সব কিছু কেমন জানি বদলে গেল । যেই নীলকে হাসি ছাড়া কথা বলতে দেখতো না নিঝুম সেই নীলকে এখন শত চেষ্টা করেও হাসানো যায় না । প্রতিদিন সবার সামনে স্বাভাবিক ভাবে থাকলেও প্রতিটা রাতে ঘর অন্ধকার করে বারান্দায় বসে নীরব কান্নায় ভেঙে পড়ে নীল । সবই নিঝুম দেখে । কিন্তু কিছুই করতে পারে না । এই নীলকে নিঝুম চেনে না । এক অচেনা নীলকে এখন দেখে নিঝুম । সেই অচেনা নীলকে দেখে কষ্টে ভেঙে গুড়িয়ে আসে নিঝুমের ভেতরটা ।
অনু নীলের সাথে সম্পর্ক শেষ করে দেওয়ার পর থেকে একবারও অনুর সামনে যায়নি নীল । না বলেছে ওর সাথে কথা । চাপা একটা অভিমান, রাগ, ক্ষোভ এক হয়ে দূরে সরে গেছে অনুর থেকে । খুঁজেছে অনুর চলে যাওয়ার কারণ । পায়নি খুঁজে । এখনো খুঁজে বেড়ায়। উত্তর যে মেলে না । কেন? এমনটা কেন করলো অনু?

এমন আরও হাজারটা প্রশ্ন মনে মনে করে নীল । কিন্তু কেউ যে উত্তর দেয় না। এর মধ্যে নিহার পাগলামির আবার শুরু হয়েছে । যেই শুনেছে অনুর সাথে নীলের সম্পর্কটার ইতি করে দিয়েছে অনু ওমনি উঠে পড়ে লেগেছে নীলকে পাওয়ার জন্য । বলেতে গেলে মরিয়া হয়ে উঠেছে । সেই সাথে চেষ্টা করে অনুর নামটা নীলের কাছে বিষিয়ে তুলতে । কিন্তু পারে না । অনুকে নিয়ে একটু বাজে কথা বললে আরও দশটা শুনতে হয় নীলের কাছ থেকে । একদিন থাপ্পড় ও মেরেছিল নিহাকে । তবুও নিহা থামে নি । সুযোগ পেলেই আবার এক কাজ করতে চায় ।

বিছানায় উপুর হয়ে শুয়ে আছে অনু । হাতে ফোন । নিশির গায়ে হলুদের প্রোগ্রাম আজ ছিল । এক’টা পর্যন্ত নাচ গান হয়েছে । মাত্র কিছুক্ষণ আগে শেষ হলো সেই অনুষ্ঠান । ফ্রেশ হয়ে এসে মাত্র বিছানায় শুয়েছে অনু । আর একটা একটা করে আজকে নীলের লুকিয়ে তোলা ছবিগুলো দেখছে । বটল গ্রিন কালারের উপর গোল্ডেন আর ব্লাক স্টোনের কাজ করা একটা পাঞ্জাবি পড়ে এসেছিল নীল । মারাত্মক রকমের হ্যান্ডসাম লাগছিল নীলকে । অনু শুধু আড়ালে থেকে দেখছিল । কো-ইন্সিডেন্টলি নীলের সাথে অনুর ড্রেসের কালারটা মিলে গিয়েছিল । অনুও বটল গ্রিন কালার শাড়ি পড়েছিল । নীল পুরো সময়ের মধ্যে একবার মাত্র তাকিয়েছিল অনুর দিকে । বাকি সময় এভাবে ছিল যেন অনুকে চেনেই না । ছবি দেখতে দেখতে হুট করে নিহা আর নীলের একটা ছবি সামনে চলে আসে । সেটা দেখেই মেজাজের পারদ সপ্ত আকাশে উঠে যায় অনুর । ইচ্ছে করছিল ফোনের মধ্যে ঢুকে দু’জনকে সরিয়ে দিতে । পর মুহুর্তেই আবার এটা ভেবে চুপ হয়ে গেল যে ও তো আর নীলের জীবনে থাকবে না । তাই বলে নীলের জীবন তো আর আটকে যাবে না । ওর রাইটস আছে অন্য কাউকে লাইফে জায়গা দেওয়ার । এই ভেবেই চুপ হয়ে রইল । আবার মনে পড়ে গেল সেদিন আড়ালে দাড়িয়ে শোনা মায়ের কথাগুলো । অস্থিরতা আবার বেড়ে গেল অনুর । বিছানা থেকে নেমে গায়ে ওড়না পেঁচিয়ে ছাদের দিকে রওনা দিল । এক পা দুই পা করে ছাদে গিয়ে রেলিং ধরে দাড়াল….
.
.
.
চলবে?
(বিঃদ্রঃ ঈদের পরের দিন থেকে জ্বর ? তাই গল্প দিতে দেরি হলো । লেখায় ভুল থাকতে পারে ।
ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন ।)

#স্বপ্ন?
#অনামিকা_সিকদার_মুন
#পর্ব_৫১
.
.
.
রাতের নীরবতা বরাবরের জন্যই খুব পছন্দ অনু । শান্ত কালচে নীল রংয়ের আকাশটায় যখন মেঘেরা ভেসে বেড়ায় তার খেলা দেখতে দেখতে ভাবনায় ডুবে যেতে আরও তো ভালো লাগে । মৃদু শীতল একটু বাতাস এসে ছুঁয়ে গেল অনুর শরীর মন । কালকে নিশির বিয়ে । আজ এইদিনটা ওর জীবনেও আসতো । যদি ছোট্ট একটা সত্যি ওর জীবনের অজানাই থাকত । এই একটা কারণে সাজানো সব #স্বপ্ন গুলো আজ দুঃস্বপ্ন হয়ে যাচ্ছে । আজ আকাশে চাঁদটাও নেই । চাঁদটাও বুঝি বুক ভার করা কষ্টে আড়াল হয়ে আছে আজ । অনু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো । খুব মিস করছে নীলকে । আজ এতদিন পর নীলকে দেখে নিজেকে সামলাতে অনেক কষ্ট হয়েছে অনু । একবার চেয়েছিল সব ভুলে দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে নীলকে বুকে । কিন্তু সব চাওয়াই তো আর পূর্ণ হয় না । মানুষের জীবনে অনেক চাওয়াই অপূর্ণ থেকে যায় । আজ যখন নীলের পাশে নিহাকে দেখছিল তখন ভেতরটা পুড়ে খাড় হয়ে যাচ্ছিল অনুর । পুড়ছিল মন । জ্বালা করছিল হৃদয় । আর অশ্রুরা হানা দিয়েছিল আঁখিতে । একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনু । হঠাৎ পেছন থেকে ঘাড়ে কারো নিঃশ্বাস পড়ায় চমকে উঠে অনু । সেই সাথে একজোড়া হাত ওর কোমড় পেঁচিয়ে ধরে । পেছন ফিরে আর দেখার প্রয়োজন হয়নি অনুর । স্পর্শটা যে খুব পরিচিত ওর । সাথে মাতাল করা সেই ঘ্রাণ । কিন্তু কথা হলো এত রাতে নীল কোথা থেকে এলো? ও তো চলে গিয়ে ছিল তাহলে? মনে মনে কথাগুলো ভাবছিল অনু । কিন্তু চুপ করে রইলো । সময় কেটে যেতে লাগল এভাবেই । আকাশের মেঘগুলো উঁকি দিয়ে আড়ি পেতে রইলো নীল অনুর কথা শোনার জন্য । তারাগুলো আরো জ্বল জ্বল করে জ্বলতে লাগল । আজ অনু নিজে থেকে কোনো কথাই বলবে না । করবে না একটা টু শব্দও । অপেক্ষা করে যাবে নীলের বলার জন্য ।
—তুমি খুব খারাপ অনু । খুব খারাপ তুমি ।
কথাটা বলতে গিয়ে কেঁপে উঠে নীলের কণ্ঠ । সেই সাথে হাতের বন্ধনটা হয় আরো গভীর । অনুর কাঁধের উপর নীলের থুতনিটা ঠেকানো । নীলের ওমন কণ্ঠ শুনে মাথার চুল থেকে পায়ের নখে পর্যন্ত বিদ্যুৎ খেলে গেল অনুর । ওর কাঁপুনি এতটা বেড়ে গেছে যে মনে হচ্ছে বুঝি ভূমিকম্প হচ্ছে । হ্যাঁ, ভূমিকম্পই তো । ওর মনের যে ভুমিকম্পই হচ্ছে । তার কাঁপুনি পুরো শরীর জুড়ে খেলে যাচ্ছে । নিজেকে শূণ্য মনে হচ্ছে । মুহুর্তটা সুখের? নাকি বেদনার? নীলকে হয়তো আর কোনোদিন এত কাছ থেকে পাওয়া হবে না । কিন্তু আজ পেয়েছে তার জন্য খুশি হবে? নাকি বিচ্ছেদের বেদনায় আড়ষ্ট হবে? বুঝে উঠতে পারছে না । দুইয়ে মিলে এক মিশেল অনুভূতির উত্তাপে দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে অনু । কিছু মুহুর্তের জন্য বর্তমানের সব ভুলে গেল ও । নীলের বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে নীলের দিকে ঘুরে আছড়ে পড়লো নীলের বুকে । নিঃশব্দে চোখের অশ্রু বিসর্জন দিতে লাগলো । ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে বলল,
—তোমায় খুব ভালোবাসি তাই খুব খারাপ আমি…
তারপর ফুঁপিয়ে উঠল । নীল অনুর মুখটা দু’হাতে আঁজলা করে ধরলো । তারপর কপালে অধর ছোঁয়ালো গভীরভাবে । মরুভূমিতে পানির ফুয়ারা বেড়িয়ে এলো । ভালোলাগার বিষ্ফোরণ ঘটলো দু’টি হৃদয়েই । অনু চোখ বুঝে ডুবে রইলো সেই অনুভূতিতে । নীল অনুর মুখ ছেড়ে ওর ডান হাতটা নিজের দু’হাতের মাঝে নিয়ে বলল,
—অনু কেন আমার থেকে দূরে সরে যেতে চাইছো? কেন এতবড় শাস্তি দিতে চাইছো আমায়? বলো প্লিজ ।
চমকে উঠে চোখ মেলে তাকালো অনু । ছিটকে দূরে সরে যেতে চাইলো নীলের কাছ থেকে । কিন্তু পারলো না । নীল অনুর আরও কাছে এসে দাড়ালো ।
—আমার চোখের দিকে তাকাও অনু ।
অনু তাকালো না । নীল গাঢ় স্বরে আবার বলল,
—তাকাওও
এবার তাকালো অনু । নীলের চোখের গহীনে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো । নীল বলল,
—সত্যিটা বলো অনু ।
অনু চুপ করে রইলো কিছুক্ষণ । তারপর বলতে শুরু করে,
—আমি অনাথ নীল ।
নীল চমকালো না । স্থির ভাবেই তাকিয়ে রইলো অনুর দিকে । একটু থেমে অনু আবার বলতে শুরু করে,
—আমার বাবা মা কে আমি জানি না নীল । জানি না আমি ।
বলতে বলতে ফুঁপিয়ে উঠল অনু ।
—সেদিন আম্মুর কথা আড়াল থেকে শুনে ফেলেছিলাম আমি । আব্বু আর আম্মু কোথায় যেন যাচ্ছিল । রাস্তায় আমাকে পেয়েছিল । সাথে নাকি আমার মা ছিল । সে মৃত্যু পথ যাত্রী ছিল । বাঁচাতে চেষ্টা করেছিল আব্বু আম্মু কিন্তু পারেনি । তখন মাকে কথা দিয়েছিল আব্বু আম্মু যে আমাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে বড় করবে । তাই নিশি আপির থেকে আমাকে বেশি আদর করতো আব্বু আম্মু দু’জনেই । আমার জন্য নিশি আপি সবসময় আম্মুর কাছ থেকে দূরে থেকেছে । নিশি আপিও জানে যে আমি ওর আপন বোন না । তবুও কখনো আমাকে বুঝতে দেয়নি । আমি….
থেমে গেল অনু । ওর কথা আটকে আসছে । শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে । একটু সময় নিয়ে অনু আবার বলল,
—আমার জীবনের সত্যিটা জানার পরে তোমার সাথে নিজেকে জড়ানোর সাহস পাচ্ছিলাম না আমি । আংকেল আন্টি যদি কখনো জানে তারাও কোনোদিন মানবে না নীল । মানবে না । কোনো বাবা মা-ই মেনে নিতে পারবে না এটা । সব জেনেও আমি কিভাবে নিজের সাথে তোমাকে জড়াতাম? আমি নিজেই জানি না আমি কে? আমি…
অনুর কথা শেষ করতে পারল না । তার আগেই নীল একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিল অনুর গালে । অবাক হলো না অনু । চুপ করে দাড়িয়ে রইলো শুধু । চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে থাকলো । নীল অনুর থেকে দূরে গিয়ে দাড়ালো । দু’হাতে চুল টানতে লাগলো । রাগ সামলে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করলো । তারপর হুট করেই পকেট থেকে ফোন বের করে নিঝুমকে কল দিল । নিঝুম নীলের সাথেই এসেছিল । গাড়িতে বসে বসে নিশির সাথে কথা বলছিল । নীলের কল দেখে দেখে নিশির কল কেটে নীলের কল রিসিভ করে । রিসিভ করার সাথে সাথেই নীল বলল,
—ভাই আমি অনুকে এক্ষুণি বিয়ে করবো । রাইট নাও । এনি হাউ তুই ব্যবস্থা কর ।
এতটুকু বলেই কল কেটে দিল নীল । নিঝুম নীলের কথা শুনে কতক্ষণ থ হয়ে রইলো । তারপর মুচকি একটা হাসি দিল কিছু একটা ভেবে ।
নীলের কথা শুনে অনু আকাশ থেকে পড়ল । কি বলছে এসব নীল!! যার জন্য এতকিছু করল সেটাই হতে যাচ্ছে । অনু কিছু বলার জন্য আগাতেই নীল বলে,
—যদি একটাও আজেবাজে কথা এখন বলিস তাহলে আরও চারটা লাগাবো কানের নিচে । যেই কষ্ট এই কয়েক মাসে দিয়েছিস তার শোধ আজকে তুলবো দেখিস ।
বিষ্ময়ে অনু কথা বলতে ভুলে গেল ।
ঠিক এক ঘন্টার মধ্যে নিঝুম সব ব্যবস্থা করে ফেলল । নিশি অনুর মা সেদিন বাসায় ছিলেন না । কোনো এক দরকারে বাহিরে গিয়েছিলেন । সকালে ফিরে আসার কথা । নিশি নিঝুম মাহি আযান নীলের দুইটা ফ্রেন্ডের উপস্থিতিতে নীল অনুদের বাসায় বসেই অনুকে বিয়ে করে নেয় । তারপর…..
.
.
.
চলবে?
(বিঃদ্রঃ রহস্যর শেষ করে দিলাম । কি এবার হলো তো? ? এখন কেউ আর বকা দিবেন না প্লিজ ? বাই দ্যা রাস্তা মেইন ঝটকা এখনো বাকি আছে ? গল্প প্রায় শেষের দিকে । কেমন হয়েছে জানাবেন। ?
এবং ভুলত্রুটি ক্ষমার চোখে দেখবেন । )
.

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here