স্বপ্নীল ২০

0
1284

স্বপ্নীল
২০

পাউরুটিতে জেলি লাগিয়ে মুখে দেবে এমন সময় শায়লা বলল
-“প্রাচ্য তোমার সাথে আমার কিছু কথা বলার ছিল।”
পাউরুটি মুখে না দিয়ে নামিয়ে রেখে বলল,
-“বলো!
-“তোমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছি আমরা।”
প্রাচ্য তার মায়ের দিকে একবার তাকায় আবার সমুদ্র দিকে একবার তাকায়।
-“আমার বিয়ে ঠিক করেছে তাও আবার আমার মতামত না দিয়ে। অবাক হলাম তোমাদের কৃতকাজে।”
-“আমরা এখন তাদের ফাইনাল কথা দিয়নি।সমুদ্র বলেছে তোমার মত নিয়ে বিয়েতে এগোতে।তোমার কি এই বিয়ে মত আছে!
-” মা আমি পড়াশুনা করছি! এখনি কি বিয়ে করতেই হবে।
-“বিয়ের পরে পড়াশুনা করবে।তোমার শ্বশুর বাড়ির লোক বলেছে বিয়ের পর তুমি যদি পড়তে চাও তাহলে তাদের অসুবিধা নেই!”
-“তারপর মা….
শায়লা মেয়েকে থামিয়ে বলল।
-“তুমি কি কাউকে পছন্দ করো।যদি করে থাকো বলতে পারো।তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে আমরা তোমায় বিয়ে দেবো না।”

পছন্দ,,, সেতো আমি একজন করতাম। আর সেই ছিল তৃণ। ভালোবাসতাম আমি তাকে।আর সে আমার ভালোবাসার মর্যাদা কখনো দেইনি। আমি তাকে ভালোবাসি না।ঘৃণা করি আমি তাকে।আই হেইট ইউ।আই হেইট ইউ…
-“মা আমি রাজি বিয়েতে।
এটা বলে টেবিল ছেড়ে বলে যায়।রুমে গিয়ে খাটের উপরে উবু হয়ে শুয়ে বালিশ জড়িয়ে কান্না করতে থাকে।সে এমন চাইনি।সে চেয়েছে লালটুকটুকে শাড়ি পড়ে তৃণ’র বউ হবে।কতশত স্বপ্ন দেখেছে তৃণকে নিয়ে।ছোট একটা সংসার হবে।সেই স্বপ্নের সংসারে ভালোবাসায় আনাচেকানাচে ভরপুর করবে।এক নিমিষে সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে তার।কেন করেছে তৃণ তার সাথে এমন।কেন??
বালিশ ফেলে দিয়ে দৌড়ে বাথরুমে ঢুকে পড়ে।পানি ছেড়ে দিয়ে হাউমাউ করে কান্না করতে থাকে।চিৎকার করে কান্না করতে পারছিল না বলে বুক ফেঁটে যাচ্ছিল তার।এখন একটু শান্তিতে বুক ফাটিয়ে কান্না করতে পারবে।অনেকক্ষন কান্না করে।তারপর নিজের চোখে জল মুচে নিজেকে বুঝ দেয়, সে আর কান্না করবে না।কার জন্য কান্না করবে।যে তাকে কোনোদিন ভালোবাসিনি।তার ভালোবাসা কোনো মর্যদা দেয়নি।
★★★
প্রাচ্যকে ছেলে পক্ষে দেখতে এসে আংটি পড়িয়ে দিয়ে গেছে।১৫ দিন পরে বিয়ে।বিয়েটা তাদের গ্রামের বাড়িতে হবে।সেই জন্য তারা আজকে বিকেলে সবাই গ্রামে বাড়ি চলে যাবে।প্রাচ্য তার বন্ধুদের সবাইকে একজায়গা ঢেকেছে। দেখার করা জন্য
সবাই পার্কে বসে আছে প্রাচ্য’র জন্য।সবাই বুঝতে পাচ্ছে না প্রাচ্য’র হঠাৎ এই জরুরী তোলবে ডাকছে কেন?তৃণ’র মাথা কিছু ঢুকছে না।প্রাচ্য কি করতে চাইছে।কালকে কত বুঝাইছে তারপর প্রাচ্য কিছুতে মানতে রাজি নয়। হাতের নখ দাঁত দিয়ে অন্যমনস্কতা হয়ে কাটছে আর নানা চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
-“তৃণ তোর এই বদ অভ্যাস আর গেলো না! দাঁত নিয়ে নখ কাটা!”রোদ বলল।
তৃণ নিজের দিকে তাকিয়ে দেখে সত্যি সে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে।টেনশনে পড়লে সে সব সময় এরকম করে। হাত সরিয়ে বলল,
-“প্রাচ্য কেন ঢেকে কিছু জানোছ তোরা।”
-“না! বাট কেন জানি মনে হচ্ছে কিছু একটা ঘটাবে প্রাচ্য”
-” তুই যে প্রাচ্যকে ভালোবাসি আগে যদি এই কথা প্রাচ্যকে বলে দিতি। তাহলে আজ এই পরিস্থিতি হতো না।”
স্বপ্ন বলল।তারপর ধূসর বললো,
-“আমার এখন ইচ্ছা করছে টিনা মেয়েটা ঠাস ঠাস করে চড় মেরে আসতাম।ওর জন্য এমন হয়েছে ”
রোদ সন্দেহের দৃষ্টি মেলে বলল,
-“তৃণ যদি এমন কিছু না করে তাহলে খামোখা টিনা এরকম ছবি পাঠাবে কেন? তার কি লাভ!
-“তুই কি বলতে চাস রোদ!
-“যা বলতে চেয়েছি তুই বুঝতে পাচ্ছিস।এই টিনার সাথে ছেলেটা যে তুই সেটা স্পর্শ বুঝা যাচ্ছে।তারপর তুই বলছি ওই ছেলে তুই নয়।”
-“এত বছরে আমায় এই চিনলি।”
-“আসলে আমি,,,,,
ধূসর বলল,
-“তোকে গাধি বলি যে এমনি এমনি বলি না। এখনকার যোগ ডিজিটাল যুগ। ছবি এডিট করে এসব করা অনেক সহজ।তৃণ ছবি এডিট করে টিনা এই কাজ করেছে।”
গাধি বলাতে রোদের রাগ উঠলে ও সে এখন রাগটা প্রশ্রয় না দিয়ে এই বিষয় জানতে হবে।তার বেষ্ট ফ্রেন্ড কষ্ট ভাবে সে দেখতে পারবে না। তাই আবার প্রশ্ন করে ধূসর কে?
-“মানলাম টিনা এই ছবি গুলো এডিট করেছে। সে কেন তৃণ ছবি এডিট করতে গেলো।তার জন্য কি অন্য কোনো ছেলে ছিলো না। আর এডিট করেই প্রাচ্যকে কেন এই ছবি গুলো পাঠাতে হলো।বল আমায়!তোরা”
এই বিষয় সত্যি তারা কিছু ভাবে নি।এসব করে টিনার কি লাভ হবে। স্বপ্ন বলল,
-“ধূসর, তুই না আমায় একদিন বলেছিস তৃণকে টিনা পছন্দ করে।আর প্রেমে প্রস্তাব ও দিয়েছিল।তৃণ তাকে ফিরিয়ে দে,আর প্রাচ্য’র কথা বলে দেয়,
-“হুম!
-“এবার আমি বুঝতে পাচ্ছি টিনা এমন কিছু কেন করেছে?
সবাই এক সাথে বলে উঠে,
-“কেন করেছে?
-“টিনা পছন্দ করত তৃণ কে।তৃণ তাকে প্রাচ্য কথা বলে।টিনাকে প্রত্যাখ্যান করে তৃণ।সে এটা হয়তো মানতে পারেনি।প্রাচ্য যেদিন টিনাকে চড় মেরেছে সেদিনই কিন্তু টিনা প্রাচ্যকে পিক গুলো পাঠিয়েছে।তার মানে কি দাঁড়ায়।প্রাচ্য’র জন্য তৃণকে সে পাচ্ছিলো না।।আর এইভাবে সবার সামনে চড় মারাতেই প্রাচ্য’র থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই এমন করেছে। যাতে প্রাচ্য এমন ছবি দেখে তৃণকে ঘৃণা করে।আমার মনে হয় তার মূল উদ্দেশ্য ছিল।তার ভালোবাসা প্রত্যাখ্যান করে তৃন প্রাচ্য’কে ভালোবাসে।তাই তৃণ আর প্রাচ্যকে মধ্যে জামেলা সৃষ্টি করে দুজন থেকে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে।”

ধূসর বলল,
-“আম আই রাইট! এই মেয়েকে পাই তারপর মজা দেখাবো।এই রোদ টিনা ভার্সিটি আসছে আজকে।
-“না! অনেক দিন হয়েছে আসে না।
-“টিনা পালিয়েছে।ও বুঝে গেছে আমাদের সামনে পরলে নিজেকে আর রক্ষা করতে পারবে না।তাই পালিয়েছে।এই তৃণ টিনার বাসার ঠিকানা আছে তোর কাছে?
তৃণ রাগি রাগি চোখে তাকায় ধূসর দিকে।ধূসর বলল,
-“আরে এভাবে তাকাস কেন? তুই যেটা ভাবছিস সেটা বলি নাই।
-“তাহলে কি বলতে চেয়েছিস?
-“ওর বাসার ঠিকানা থাকলে। ওর বাসায় যেয়ে পিঠিয়ে আসতাম। তাই জিজ্ঞেস করেছি।
-“না, নেই।তোরা সবাই একটু প্রাচ্যকে বুঝিয়ে বললে হবে।টিনাকে পরে দেখে নেওয়া যাবে!”
-“ওই দেখ প্রাচ্য আসছে!”
রোদের দৃষ্টি অনুসরণ করে সবাই সেদিকে তাকায়।রোদ বলল,
-“তোরা একটু প্রাচ্য’র হাতের দিকে তাকা তো।
ধূসর বলল,
-“প্রাচ্য’র হাতে একটা লাল কার্ডের মত লাগছে?কিসের কার্ড এটা! ”
স্বপ্ন বলল,
-“প্রাচ্য আসলে বুঝতে পারবি এটা কিসের কার্ড!এখন চুপ কর তোরা।
প্রাচ্য এসে তাদের সামনে দাঁড়ায়।তার বন্ধুদের দৃষ্টি তার হাতে রাখা কার্ডের দিকে।তা দেখে মুচকি হেসে বলল,
-“কেমন আছিস তোরা সবাই!
-“আমরা সবাই ভালো আছিস! বাট তোর চেহারা এই অবস্থা কেন?”স্বপ্ন বলল।
প্রাচ্য কিছু বলতে গেলে তার আগে রোদ বলল,
-“তোর হাতে কি এটা প্রাচ্য?
প্রাচ্য নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“ওহ,এটা!এটা হলো আমার বিয়ে কার্ড।
বিয়ের কার্ডটা তৃণ দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
সবাই একসঙ্গে বলে উঠে,
-“বিয়ের কার্ড!”
তৃণ তার দিকে বড় বড় চোখ করে তাকায়।এই মেয়েটা কি বলছে।কাঁপা কাঁপা হাতে তৃণ কার্ড নিতে গেলে স্বপ্ন হাত বাড়িয়ে নিয়ে বলল,
-“বিয়ের কার্ড মানে! ”
-“বিয়ের কার্ড মানে বিয়ের কার্ড! নাম শুনিস নাই মনে হয় তোরা যেভাবে রিয়েক্ট করলি!
-“হ্যাঁ শুনিস!তোর বিয়ে মানে কি? তোর বিয়ে ঠিক হলো কবে। “স্বপ্ন বলল
-“পরশু।
এটা বলে ব্যাগ থেকে আরো কার্ড বের করে সবার হাতে একটা একটা করে দিয়ে বলল,
-“আমি আসি।তোরা সবাই বিয়ের সাতদিন আগে চলে যাবি আমার গ্রামের বাড়িতে।”
এটা বলে চলে যেতে নিলে তৃণ হাত ধরে ফেলে প্রাচ্য’র।ঝাঁড়া দিয়ে হাত ফেলে বলল,
-“ডোন্ট টার্চ মি? তোর ওই পাপ হাতে ছোঁয়ার চেষ্টাও করবি না।”
প্রাচ্য’র দুইবাহু চেপে ধরে চিৎকার করে তৃণ বলল,
-“তোকে ছোঁয়ার অধিকার শুধু আমার।তুই বউ সাজলে শুধু আমার জন্য সাজবি।আর
কারো জন্য নয়।”
প্রাচ্য নিজেকে ছাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠে।কিন্তু পেরে উঠছে না তৃণ সাথে।দাঁত মুখ খিচিয়ে বলল,
-“ব্যথা পাচ্ছি আমি ছাড় বলছি!”
-“ছাড়বো না। তোর এই ব্যথার চেয়ে দ্বিগুন ব্যাথা আমি পাচ্ছি,আমার হৃদয়ের যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তা কি হবে।সেই রক্তক্ষরণ বন্ধ করা একমাত্র যে উপায় তুই!প্লিজ এমন পাগলামি করিস না তুই!তোকে ছাড়া আমি একমূহুর্তে থাকতে পারবো না।খুব কষ্ট হবে আমার।”
বাহু ছেড়ে আলতো করে দুইহাত প্রাচ্য’র গাল ছুয়ে বলল,
-“সব দোষ আমার আমি মেনে নিচ্ছি।তুই আমায় শাস্তি দে,তারপর এভাবে ছেড়ে যাস না।তোকে অন্যের হতে দেখতে পারবো না।তোকে নিয়ে যে স্বপ্ন বুনেছি সেগুলো মিথ্যে হতে দিস না।ভালোবাসি আমি তোকে।এবার সুযোগ দে প্লিজ,,,,

গাল থেকে হাত সরিয়ে ফেলে প্রাচ্য ।তার নিজের তর্জনী আঙুল তৃণ হার্ট বরাবর রেখে বলল,
-“এখানে খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না, বিশ্বাস কর তৃণ আমার হত।কি বললি, তুই আমাকে অন্যের হতে দেখতে পারবি না ,তাহলে আমি কি করে সহ্য করতাম। যখন তুই আমার সামনে দাঁড়িয়ে অন্য মেয়ের সাথে ফ্লাটিং করতি।তখন আমার কষ্ট হত।বিশ্বাস কর খুব কষ্ট হতো আমার।খুব,,,,,,আমার সব স্বপ্ন গুলো ভেঙে দিয়েছিস তুই,তোকে আমি কখনো ক্ষমা করবো না।”
এটা বলে সেখান থেকে চলে যায় কান্না করতে করতে।তৃণ ধপাস করে মাটিতে পা ফেলে বসে যায়।এভাবে বসতে দেখে সবাই আতঁকে উঠে। স্বপ্ন তৃণ কাছে এসে বলল,
-“তুই চিন্তা করিস না ! আমি প্রাচ্যকে বোঝালে প্রাচ্য বুঝবে।”
স্বপ্ন ইশারায় ধূসর বলে তৃণ কাছে আসার জন্য।স্বপ্ন দৌড়িয়ে যায় প্রাচ্য’র কাছে।তার পথ আগলিয়ে দাঁড়ায় স্বপ্ন।তা দেখে প্রাচ্য বলল,
-“স্বপ্ন পথ ছাড়!
-“আগে আমার কথা শুন!
-“কারো কথা শুনার প্রয়োজন নেই আমার । বাসায় যেতে হবে আমায় দেরী হয়ে যাচ্ছে আমার।!
প্রাচ্য’র দুইবাহু ধরে স্বপ্ন শান্ত সুরে বলল,
-“তুই জানিস প্রাচ্য ধূসর আর তৃণ কেমন।এরা একটু আকটু মেয়েদের সাথে ফ্লাটিং করে তার মানে…..
-“তার মানে কি? বলবি এই ছবি গুলো মিথ্যে এটাই তো।প্লিজ আমি আর কিছু শুনতে চাই না এই বিষয়।আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে।
নিজের হাত ছাড়িয়ে চলে যায় প্রাচ্য।স্বপ্ন একটা হতাশার নিশ্বাস ফেলে তৃন কাছে আসে।তাকে দেখে ধূসর বলল,
-“কি হলো,,,
-“যে নিজে থেকে বুঝতে চায় না তাকে হাজার বুঝালে বুঝবে না।”
-“আচ্ছা সমুদ্রকে তৃণ আর প্রাচ্য’র ব্যপারটা বললে কেমন হয়।”
রোদ বলল।তার সাথে তাল মিলিয়ে ধূসর বলল,
-“সমুদ্রকে বললে হয়তো বিয়ে ভেঙে দিতে পারে।
তৃণ উঠে দাঁড়ায়।সে বলল,
-“কোনো দরকার নাই।যে যেতে চায় তাকে আটকানোর কারো সাধ্যে নেই।”

#চলবে
#কাউছার স্বর্ণা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে