শ্বাশুড়ি পর্বঃ ১০

0
487

শ্বাশুড়ি
সৌরভে_সুবাসিনী(moon)
পর্বঃ ১০
.
.
আলোর আলাদা সংসারের বয়স এখন তিন মাস। বেশ ভালোই আছে সে অয়নের সাথে। আলো পুরোপুরি ভাবে কিন্তু সেদিন কে ভুলতে পারেনি। অন্ধকার কে প্রচন্ডরকম ভয় পায়। একা থাকতে পারে না বললেই চলে।
টোনাটুনির সংসার বেশ ভালোই চলছে, কিন্তু আলোর সময় কাটেনা। সারাদিন বাসায় একা থেকে আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলো। তাই অয়নদের বাসার মালিক বললো তার মেয়ে যে বাচ্চাদের স্কুল চালায় সেখানে কি আলো চাকরি করবে?
.
প্রস্তাব টা অয়ন ফেলে দিতে পারে না। আলোর এখন মানুষের মাঝে থাকা বড্ড প্রয়োজন। ৯-৫ অয়ন তো থাকতেই পারে না। আর বাসার পাশেই স্কুল আর মালিক মানুষ টা ভালো তার মেয়ের সাথেই আলো আসা যাওয়া করবে।
.
.
আলো প্রথম থেকেই বেশ মানিয়ে নিয়েছে। সকালে দুজন মিলে খাবার বানিয়ে নেয়। অয়ন যাওয়ার সময় আলোকে স্কুলে দিয়ে যায়। দুপুরে আলো এসে হালকা রান্না করে, আবার কোনদিন করে না কারণ অয়ন দুপুরে আসেনা। আলো আবার স্কুলে যায়, চারটা অবধি ক্লাস করিয়ে এসে আবার দুই এক জন বাচ্চা আসে প্রাইভেট পড়তে। তাদের পড়ায়।হালকা নাস্তা বানিয়ে অয়নের জন্য অপেক্ষা করে।
অয়ন কখনো খালি হাতে ফিরে না। না হলেও চকলেট তো থাকেই। কিছুটা রেস্ট নিয়ে আবার দুজনে মিলেই রাতের খাবার বানিয়ে নেয়৷
আলো এখানে আসার পর রাতে, সকালে নিজের হাতে খাবার খেয়েছে বলে মনে পড়ে না।
খাবার খাওয়ার সময় স্পেশাল ডায়লগ দেয়
——ওগো! এত সুখ কপালে সইবে তো?
.
.
অয়ন যে তার পরিবারের প্রতি দায়িত্ব ভুলে গেছে এমন টা নয়। সে বাড়ি যায়। মায়ের সাথেও থাকে। কিন্তু পুরো দিন। আলোকে সাথে নেয় না। ও সেদিন পুরো সময় বাড়িওয়ালা আন্টির সাথে থাকে।
.

.
হঠাৎ করেই আলোর খুব জ্বর৷ ভেবেছিলো আবহাওয়ার কারণে কিন্তু তিনদিনে না কমলে ডাক্তার কাছে যায়। হালকা পারলা মেডিসিন দিলেও কমে না।
কয়েকদিন যাওয়ার পর আবার গেলে ডক্টর ব্লাড টেস্ট দেয়। টাইফয়েড ধরা পড়ে। আগেও হয়েছিলো। টাইফয়েড ওয়ালাদের এই এক ঝামেলা। একবার হলে আবার হয়৷
ক্লিনিকের একটা কেবিনে আলো চুপচাপ শুয়ে আছে। হাতে ক্যানোলা লাগানো। চুপচাপ চোখ বন্ধ ওর। ক্লান্তিতে দুচোখে ঘুম ভরে করে আসছিলো।
হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কিন্তু কয়েক সেকেন্ড পর চোখ খুলে আর কাউকে দেখতে পেলো না।
হয়তো অয়ন ছিলো, কিন্তু ও তো মেডিসিন আনতে গেছে!
আলো আর চিন্তা করে না৷ কিন্তু স্পর্শ টা চেনা ছিলো।

.
.
.
.
অয়ন খুব যদি ভুল না করে থাকে তাহলে সে এই ভদ্রলোক টা কে চিনে। দ্রুত তার পিছন পিছন যায়। ভদ্রলোকটা ওয়েটিং রুমের ভিতরে বসে। এবার অয়ন শিউর। দ্রুত গিয়ে সালাম দিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ায়।
সাথে থাকা ভদ্রমহিলা উত্তর নেয় কিন্তু ভদ্রলোক ভাবলেশহীন।
.
তারা আর কেউ না। আলোর মা-বাবা। অয়ন গিয়ে তাদের সাথে কথা বলে। এক সময় অয়ন আলোর বাবার হাত ধরে কান্না করে দেয়। পুরুষ মানুষের কাদঁতে নেই কিন্তু অয়ন আলোর পুরোটা তাদের জানায়। এক সময় আলোর বাবা অয়নকে জড়িয়ে ধরে কাদঁতে থাকে। হয়তো উনি মনে মনে বলতে থাকে আলো সত্যিকারের একজন ভালোবাসার মানুষকে পেয়েছে।
.
.
সময় প্রবাহমান। জীবনের সব কিছু একটা সময় নিয়ে সব কিছু ঠিক করে দেয়। আলো অয়নের জীবনেও তেমন টাই হয়েছে। এখন আলোর বাবার কাছে অয়ন সব থেকে বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অয়ন কে জিজ্ঞেস করবে৷ আলো পরিপূর্ণ শুধু আফসোস সে এখনো তার শ্বাশুড়ির মনে জায়গা করে নিতে পারেনি।
.
তিন বছর হয়েগেছে। আলো শ্বশুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলো। আজ অবধি অয়ন নেয় নি।
.
.
এসময় টা তে আলো লেখাপড়া কমপ্লিট করেছে৷ অয়নের বেশ প্রমোশন হয়েছে। সব থেকে বড় কথা নিজেদের স্থানী হিসেবে একটা ছোট্ট ফ্ল্যাট কিনতে পেরেছে৷ আলোর চাকরি করা নিয়ে অয়ন যথেষ্ট সহযোগিতা করে, তাই হয়তো ওদের এত উন্নতি এসেছে। বর্তমানে মালিকের মেয়ের সাথে আলো সমান তালে, সমান অধিকারে স্কুল চালাচ্ছে। বেশ নাম করেছে ওদের স্কুল।
.
.
আলো গ্রীষ্মের গরমে বসে বসে দুধের পুলি পিঠা খাচ্ছে। অয়ন সামনে বসে চামচে করে ওর মুখে তুলে দিচ্ছে। আজ সকালেই আলোর বাবা বানিয়ে নিয়ে এসেছে৷
অয়নের মুখচোখের অবস্থা এমন যে সে প্রচন্ডরকম অবাক কিন্তু আলোর কাছে না জানি কত্তত মজা লাগছে।
এমন সময় আমিন আসে।
.
.
-ভাইয়া… কেমন আছো! (আলো)
-এইতো বোন ভালো! তুমি ভালো তো?
– একদম। পিঠা খাবা? এই শুনো ভাইয়ার জন্য পিঠা নিয়া আসো তো।
-না! আপনিই খান। এই গরমে পিঠা? মাফ চাই বোন। আচ্ছা এই নে তোমার কটকটা পেয়ারা।
.
আলোর সাথে আমিনের বন্ডিং টা বেশ গভীর। সব বিষয়ে সাহায্য করে যে আমিন আলোকে। আলো দেশি পেয়ারা নিয়ে পেটের উপর রাখে। পেট তো নয় যেনো ধানের ডোল।
হ্যাঁ! আলো প্রথম বার মা হতে চলেছে। অবশ্য এবার শেষ বার। আল্লাহ্ তা আলা দুহাত ভরে দিয়েছেন। টুইন বেবি হবে।
.
.
– আপু! পেট বেশ বড় বড় লাগে। কষ্ট হয় কি?
-একটু তো হবেই।
– আমি তো তোমাকে নিতে এসেছি।
-কেনো?
-সামনের সপ্তাহে আমার বিয়ে।
-এটা কি করলা? পাত্রী তো আমি দেখবো বলে ঠিক করছিলাম।
-সব তো তোমার জামাইয়ের দোষ।
-মানে?(অয়ন)
-ভাই তুই যদি তাঞ্জু রে বিয়ে করতি তাহলে আজকে আমার এ দিন দেখতে হতো না।
.
আলো অয়ন দুজনেই অবাক হয়ে বলে
-তাঞ্জুর সাথে বিয়ে?
– হ্যাঁ!
-না! ভাইয়া তুমি ওরে বিয়ে করো না,ও মাইয়্যা না, ধানী লংকা। প্লিজ ভাইয়া। তুমি আমার বোন টা নিতে পারতা কিন্তু ওর তো বিয়ে দিয়ে দিলাম দুই বছর আগে। তখন কেনো বলো নাই যে তুমি বিয়ে করবা?
.
কথা গুলো বলে আলো শ্বাস নেয় জোরে জোরে। অয়নের কাধে মাথা রেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমিনের দিকে।
-আমিন তুই শিউর?
-ভাই মায়ের ইচ্ছে। তুই তো বেঁচে গেলি। আমাকে ডুবালি।
-এই শুনো! তুমি তাঞ্জু কে বিয়ে করে নাও তো। ভাইয়ার জন্য লাল টুকটুকে বউ আনবো আমি।
.
ওরা দুই ভাই শুধু হাসে। বাবার পর এই দুজন মানুষের কাছে আলো বড্ড নিরাপদ অনুভব করে৷ আমিন ওদের যেতে বললেই অয়ন বলে আলোকে এই অবস্থায় নেওয়া ঠিক হবে না৷ সাড়ে আটমাস পার হয়েছে। এখন কোথাও যাওয়া নিষেধ । কিন্তু অয়ন যাবে এটা আলো নিশ্চিত করে। আলোর মা-বাবা এসে থাকবে কয়েকদিন।
তারপর বেশ আনন্দেই কাটলো বিকেল টা। কিন্তু কথায় আছে না?
যত হাসি তত কান্না৷
.
.
চলবে

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here