রংধনু পর্ব ১

0
2568

রঙধনু?

তৃধা মোহিনী(ছদ্মনাম)

পর্ব এক

?

বধূ বেসে বসে আছে ১৮ বছর কিশোরী কায়নাত আফ্রা মোহ..দীর্ঘ ৩ঘন্টা যাবত মাথায় ঘোমটা দিয়ে,ভারী সাজে আর ভারী গয়না পরে অপেক্ষা করছে তার বরের কিন্তু যার জন্য সে অপেক্ষা করছে তার আসার নাম গন্ধ নেয়।।

পুরো নাম কায়নাত আফ্রা মোহ,বাবা মা বলতে কেও নেয় তার..ছোট থেকে আশ্রমে বড় হয়েছে সে..ছোট থেকে শান্ত স্বভাবের..বাবা মায়ের অভাব বুঝতে পারলেও কখনো কারো সামনে সে প্রকাশ করে নি..নিজে টিউশানি করিয়ে নিজের পড়ালেখা সে এইচ.এস.সি পর্যন্ত টেনে নিয়ে এসেছে..

এই পরিবারের বড় ছেলের সাথে বিয়ে হয়েছে মোহর..বিয়েটা হতে না হতে তার স্বামী নিরুদ্দেশ.. দেখা হয়ে উঠে নি মোহর তার স্বামীকে শুধু নামটায় শুনেছিলো তার দাদী শাশুড়ির কাছ থেকে..তার স্বামীর নাম “ফাইজান ফারিশ ফাজ” বয়স ২৮ তার আর মোহর বয়স ১৮..গুনে গুনে ১০ বছরের বড় তার স্বামী তার থেকে..এতোটুকু সে জানে..

মোহর বিয়েটা হুট করে হয়ে উঠেছে..মোহর বিয়েটা হয়েছে ঠিক এমনভাবে,

ফ্ল্যাশব্যাক,

মোহ তার প্রতিদিনের মতো টিউশানি শেষ করে বাসাই ফিরছিলো এমন সময় দেখলো এক বয়স্ক মহিলা রাস্তায় পরে আছে..সেইটার চারপাশে মানুষ ভিড় জমিয়ে পরে আছে কিন্তু কেও সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে না,হন্তদন্ত হয়ে ছুটলো সেখানে..কেও সাহায্যের করছে না অথচ দাড়িয়ে তামাশা দেখছে..মোহ একটা রিক্সা ডেকে বয়স্ক মহিলাটাকে নিয়ে সে হাসপাতালের উদ্দেশ্য রওনা দিলো..মহিলাটিকে কেবিনে শিফট করে সব ফর্মালিটি সে পূরন করলো,আজ মাসের প্রথম তারিখে বেতন পেয়েছিলো..এইসব পূরন করতে যেয়ে তার অর্ধেক টাকা ফুরিয়ে গেলো কিন্তু মোহর সেটার মাথাব্যাথা নেয়..

“উনার বিপি লো থাকার কারনে রোদের উত্তাপে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো..এখন ঘুমের ইঞ্জেকশন দেয়া হয়েছে ঘন্টা দু এক এর মাঝে জ্ঞান ফিরবে..আপনি রোগীর কে হোন??ডাক্তার বের হয়ে জিজ্ঞেস করলো

” আসলে উনি রাস্তায় জ্ঞান হারিয়ে পরেছিলো,আমার কেও হোন না উনি”মোহ জবাব দিলো

ডাক্তার এমন উদারতা দেখে ভ্রু কুচকে চলে গেলো

একটা ফোন বাজছে অনেকক্ষন যাবত..পাশে গিয়ে দেখলো তার বয়স্ক মহিলার ব্যাগ এটা..মোহ রিসিভ করবে কিনা বুঝছে না..রিসিভ না করলে উনার বাড়ির লোক টেনশন করবে আবার..মোহ ফোন বের করে দেখলো স্ক্রিনে নাম লিখা “সুলেমান”

“হ্যালো মা কই তুমি??এতোক্ষন হয়ে গেলো আসলে না যে??ঠিক আছো তুমি??আর তুমি একা বের হয়েছো ক্যান একা??” অপরপাশ থেকে বলে উঠলো

“আসসালামুলাইকুম আঙ্কেল!!প্লিজ প্যানিক হবেন না!!আপমার মা আসলে রাস্তাতে বেহুশ হয়ে পরেছিলো,আমি উনাকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি” মোহ এক নাগাড়ে বলে উঠলো মোহ

“কিহ??কোন হাসপাতাল??সুলেমান বিচলিত কন্ঠে বলে উঠলো

মোহ সব ডিটেইলস দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলো উনার ফ্যামিলি আসার..এর মধ্যে নার্স এসে পেসেন্টের জ্ঞান ফিরেছে

মোহ দরজা ঠেলে কেবিনের মাঝে ঢুকলো..উনার পাশে যেয়ে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

“এখন কেমন আছেন??আসলে আপনার ত বিপি লো,এইভাবে একা বের হওয়া ঠিক হয় নি আপনার..আপনার ছেলে কল করেছিলো..সরি আসলে আপনার ফ্যামিলিকে জানানো দরকার ছিলো তাই রিসিভ করে ফেলেছিলাম..আপনার ফ্যামিলিকে জানানো হয়েছে চলে আসবে কিছুক্ষনের মধ্যে” মোহ এক নিঃশ্বাসে বলে ফেললো

এতোক্ষন উনি মোহর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন..উনি ইশারায় মোহকে কাছে ডাকলো…পাশে বসাতে মোহর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

“নাম কি তোমার?”

মোহ তার নাম বললো..এরপর টুকটাক অনেককিছু জিজ্ঞেস করলো মোহকে তিনি..তার মনে যে মোহকে বেশ ধরেছে তার কথায় বুঝা যাচ্ছে..
এর মধ্যে দুজন মাঝবয়সী মানুষ আসলো..

“মা আপনাকে কতবার বলেছি একা না বের হতে?? কথা কি শুনবেন না কখনো??মাঝবয়েসী মহিলাটি বলে উঠলো

” তুমি আমাকে কত টেন্সে ফেলে দিয়েছিলে জানো তুমি??পাশে থাকা লোকটি বলে উঠলো

“আরে থাম তোরা!!এতো কথা বলিস কানের পোকা বের হয়ে গেলো!!দিদা বলে উঠলো

দিদার কথা শুনে উনার দিকে ভ্রু কুচকে তাকিয়ে হেসে ফেললো..

” এই যে ছেলেটাকে দেখছো??যার ফোন তুমি রিসিভ করেছিলে??আমার ছেলে এই,সুলেমান আর আমার বউ এভ্রিল”দিদা বলে উঠলো

মোহ দুজনকে সালাম দিলো..

“এই পিচ্চি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে??দেখ কতো সুন্দর??দিদা বলে উঠলো

এভ্রিল এগিয়ে এসে মোহর মাথায় চুমু একে দিয়ে বললো,

” মাশাল্লাহ!!তোমাকে অনেক ধন্যবাদ মা..আসলে কি বলে যে তোমার শুকরিয়া আদায় করবো??

“না আন্টি সমস্যা নাই..আচ্ছা আমি এখন আসি,আমাকে দ্রুত ফিরতে হবে ত” মোহ বললো

সবার কাছ থেকে মোহ বিদায় নিয়ে চলে গেলো।।

“আমাদের ফারিশের জন্য এরে ভাবছি বউ করে আনবো” দিদা বলে উঠলো

“মা তোমার কি মনে হয় ও রাজি হবে??ও ত দেশে আসতে রাজি হয় না!!তাও এইবার তোমার জোরাজুরিতে সে আসছে অল্প কয়েকদিনের জন্য” সুলেমান অবাক হয়ে বললো

মোহর সব ডিটেইলস নিয়েছিলো দিদা..পরেরদিন মোহর সবকিছু জেনে নিয়ে সুলেমান আর এভ্রিলকে জানালো..

মেয়েটার কেও নেই শুনে সুলেমান আর এভ্রিলের দুজনেরই খারাপ লাগলো..কিন্তু তারা আতঙ্কে আছে যে ফারিশ রাজি হবে কি না..

ফারিশ অত্যন্ত রাগী আর বদমেজাজী..নিজে যা চায় তাই করে,কারো কথায় পাত্তা দেয় না..যেটা জিদ হবে সেটা করেই ছাড়বে..

অতঃপর দিদার কসম খেয়ে ফারিশ বিয়ে করেই সেদিন রাত্রিরেই চলে যায় বাংলাদেশ ছেড়ে আমেরিকা চলে যায় ফারিশ..যেখানে সে থাকে,একবার চেয়েও দেখলো না পুতুলের মতো তার জন্য অপেক্ষা করছে..

বর্তমান,

চারপাশে গুঞ্জনে মোহর পুরোনো স্মৃতি থেকে ধ্যান ভাঙলো..

“এরকম এতিমকে কে বিয়ে করলে কে মাইনা নিবো??ঠিকই পোলা দেশ ছাইড়া চইলা গেলো বিদেশ” কেও একজন বললো

“ঠিকই ত,তার মতো এতিমকে বিয়ে করে এনেছে এটাই ত অনেক” বিড়বিড় করে বলে উঠলো মোহ

দরজা ঠেলে এভ্রিল ঘরে প্রবেশ করলো আর বললো,

“তুই আমার মেয়ে.. তোকে কারো পরিচয়ে বেচে থাকতে হবে না..তুই তোর পরিচয়ে বাচবি”

মোহ এভ্রিলকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলো..এভ্রিল ও কি বলে শান্তনা দিবে বুঝে উঠতে পারছে না,তার মনে এই ভয়টাই ছিলো যা সত্যি হয়ে গেলো..

সুলেমান পলিটিশিয়ান আর সাথে নামকরা টপ বিজনেসম্যান বাংলাদেশে..বাংলাদেশে রিচ ফ্যামিলি সবাই ফাজ ফ্যামিলিকে এক নামে চিনে..এভ্রিল ডাক্তার সে হাসপাতালে ডিউটি করে..মোহর একটা ননদ আছে,সে ক্লাস এইটে পড়ে..নাম ফারিহা..

তিন বছর পর,

কেটে গেছে তিনটা বছর..সেই কিশোর মোহ এখন ২১ বছরে পা দিয়েছে..অনার্স থার্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট.. ইংলিশ নিয়ে পড়ছে..আর ফারিহা ইন্টারমিডিয়েট এ ক্যান্ডিডেট এখন..

সুলেমান,এভ্রিল এবং দিদা মোহকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রেখেছে..কষ্টের টোকাও পরতে দেয় নি…মুখ ফুটে কিছু চায় না মোহ কিন্তু ভিতরের চাপা কষ্ট যে তাকে ক্ষত বিক্ষত করে রেখেছে,এভ্রিল সহ বাকি সবাই ও বুঝতে পারে…আর ফারিহার বেষ্টফ্রেন্ড হলো মোহ..মোহকে সব কথা বলে,মোহ ও বলে..

ফারিশ সবার সাথে কথা বললেও এভ্রিল ফারিশের সাথে কথা বলে না..এই তিন বছরের ফারিশ একবারো মোহর কথা জিজ্ঞেস করে নি,কেও কথা তুললেই ফোন কেটে দেয়..সবাই কথা তুলে না আর মোহর..

ফারিশের ছবি দেখে মোহর এই তিনটা বছর কেটে যায়..এভ্রিল বুকের সাথে জাপটে ধরে মোহকে,মোহকে তিনি যে তার সন্তান ভাবে..অনেকবার ভেবেছে ফারিশের কাছে তালাক দিয়ে নতুন বিয়ে দিবে মোহর কিন্তু মোহ এই কথা শুনলেই কেদে বুক ভাসায়..মোহ ফারিশকে না দেখে ফারিশকে তার জীবনের চাইতে বেশি ভালোবেসে ফেলেছে যে সে..

আমেরিকা,

ক্রিস্টল হোটেলে বসে ড্রিংকস করছে ফাইজান ফারিশ ফাজ..আমেরিকার টপ আইকুন..বিজনেস ডিল করছে..কিন্তু তার চোখ সামনে থাকে এক মেয়ের উপর বর্তমানে,যে ফারিশকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে..ফারিশ বাকা হেসে চুমুক দিলো গ্লাসে..ডিল পছন্দ না হওয়ায় সে পকেটে হাত দিয়ে এটিটিউডের সহিত হোটেল ত্যাগ করলো..তার যেটা পছন্দ না সেটার সামনে দ্বিতীয়বার তাকাবে না..

“অন্ধকার রাজ্যের বেতাজ বাদশা আমি” বাকা হেসে ফারিশ গাড়িতে উঠলো..

বয়স এখন ৩১ ফারিশের..৬ফুট দেহের ফর্সা দেহে সুঠম গঠনের সুদর্শন পুরুষ সে..মেয়েদের মুখের অলওয়েজ ব্রেকিং নিউজে থাকে সে..মেয়েরা তাকে গিলে খায় যখনি দেখে..নীল চোখ দেখে মেয়েরা একটা কথা বলে “হট”

নিজের বিয়ের কথা তার মনেই নাই..মোস্ট হট টু হ্যান্ডেলর ব্যাচেলর হিসেবে সে পরিচিত..

চলবে?

 

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে