মায়া ( ছোট গল্প)

1
381

মায়া
Farida Ali Khan

যেদিন আমার স্ত্রী অন্য জেলায় পোস্টিং হওয়ায় সরকারি চাকরি ছেড়ে এলো,সেই খবরটা শুনে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেলো, সেদিন ওকে খুব মেরেছিলাম।
এত এত মেরেছিলাম মন চেয়েছে ওকে খুন করে ফেলি।
মরেও যেতে পারত কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো তাই এত মারের পরও ও মরেনি।
আসলে মরতে তো খুব বেশী চোট আঘাতের দরকার হয় না।কপাল খারাপ থাকলে ফুলদানির আঘাতেও মানুষ মরে যায়।দুই দিনের ডেঙ্গুতেও লোকে দুদিনেই নাই হয়ে যায়।

আমি সেই মারের পর ভেবেছিলাম ওর সম্বিত ফিরবে।
ও প্রকৃতিস্থ হবে।দুনিয়া কি সেটা বুঝবে।
এবার অন্তত আমার দিক থেকে ও মুখ ফেরাবে।একটু হলেও অভিমান করবে।
বাপ মাকে ডেকে দু চার দিনের জন্য হলেও বাপের বাড়ি যাবে।আমি একটু গা ছেড়ে হালকা হব।

আমি ওকে মেরে নাক মুখ ফাটিয়ে দিই।ঠিক কতগুলো ঘুষি লাথি মেরেছি নিজেরও মনে নেই।

মনে আছে চোর পেটানোর মতন অমন মার খেলে একটা পুরুষের ও সুস্থ হতে সপ্তাহখানেক সময় লাগবে।
সেদিন মারামারির পর রাগে আমি হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে একটা শার্ট গায়ে চড়িয়ে বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম।
ও মরল কি বাঁচল ফিরেও দেখলাম না।

অনেক রাতে বাড়ি ফিরে এলাম।
এক্সট্রা চাবি দিয়ে বাসায় ঢুকে দেখলাম সব ঠিক আছে।
টেবিলে আমার জন্য খাবার ঢাকা দেয়া আছে।

শুধু একটাই চেঞ্জ,আগের মতন দশবার বিশবার ফোন করে “কখন ফিরবা, কখন ফিরবা” বলে আজ বিরক্ত করেনি।কলিংবেল দেওয়া মাত্র লাফাতে লাফাতে গিয়ে দরজা খোলেনি।
আজ তো চাবি সাথেই ছিলো,বেল বাজাই ই নি। দেখলাম ও একটা কাঁথা মুড়ি দিয়ে খাটের এক কোনায় গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে।

আমার মাথা ঠান্ডা হলেও পুরোপুরি শীতল হয়নি।
ওকে ঘরে দেখে বরং বিরক্ত লাগছে।আমি কাপড় পাল্টে টেবিলে সাজিয়ে রাখা ভাত খেয়ে অন্য রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
ওর পাশে ঘুমালে আমার আবার বিরক্ত লাগবে।
বিরক্তি যখন যায়নি তখন যেকোন মূহুর্তে সেই বিরক্তি আবার রাগে পরিনত হতে পারে। তাই ঝুঁকি নিলাম না।নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতেই আলাদা রুমে ঘুমালাম। রাত বিরাতে প্রতিবেশীরা মারপিটের শব্দে চলে আসলে খুব খারাপ দেখাবে।
আমাদের বিয়েতে যে দু লাখ টাকা ওর বাপ যৌতুক দিয়েছিলো, ওর সরকারি চাকরি নিতে আমি ঐ টাকাটাই ঘুষের জন্য দিয়ে দিয়েছিলাম।

আর ও কিনা অন্য জেলায় থাকতে হবে বলে আমাকে না বলে চাকরি ছেড়ে এসেছে!
যদিও ও জানে আমাকে জানালে আমি চাকরি ছাড়তে দিতাম না।ওকে সেখানেই বাসা ভাড়া নিয়ে থাকতে বাধ্য করতাম।
কিন্তু ঐ পাগল নারী কিভাবে বুঝবে এই দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির যুগে সংসার একজনে চালানো কত কঠিন!

এটুকু বলে ভদ্রলোক থামলেন।
আমি আরও শোনার জন্য উনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
উনি সামনে থাকা গ্লাস থেকে একটু পানি খেলেন।
তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

আমার স্ত্রী ভালো মানুষ। বিয়ের পর থেকে ও কোনদিনই আমার কাছে কিছু আবদার করত না।
আমার কাছে এটা স্বাভাবিক ব্যাপার লাগত।
কোনদিন এসব নিয়ে ভাবিই নি।
ওর ছোট্ট একটা চাকরি ছিলো।সকাল সাতটায় যেত দুপুর বারোটার মধ্যে চলে আসত।
যে কয়টা টাকা বেতন পেত সেটা সংসারেই খরচ করে ফেলত।
আমি কোনদিনই ওর টাকা পয়সার খোঁজখবর রাখতাম না।
মাসের বাজার নিজের ইচ্ছেমাফিক করতাম।এরপর বাড়তি যা লাগত সব ও ই কিনত ওর টাকায়।
দু চার মাস পরপর টাকা জমিয়ে জমিয়ে ও সংসারের টুকটাক ফার্নিচার কিনত।
চোখেই দেখতাম ওর টাকা ঘুরেফিরে আমার সংসারেই খরচ হয়, তাই কখনও ওর বেতনের হিসেব চেয়ে ওর ছোট্ট স্বাধীন জগতটা নষ্ট করতে চাইতাম না।
নিজের জন্য কখনো শাড়ি, চুড়ি, জামা এসব কিনত না।
দুইটা তিনটা ড্রেস পরতে পরতে ফ্যাকাশে করে ফেলত।
নিজে কিনত তো নাই আবার আমাকেও কিনে দিতে বলত না।
এগুলো তখন খেয়াল করিনি কিন্তু এখন খুটিনাটি সব মনে পড়ে।
আমার জন্মদিন, আমাদের বিবাহবার্ষিকী এসব ও খুব আগ্রহের সাথে মনে রাখত।
সবসময়ই আমার প্রিয় ডেজার্ট রান্না করে ফ্রিজে রাখত।
ওর এতসব অতিরিক্ত যত্ন পেতে পেতে আমি এসব স্বাভাবিক ভাবে নিতে লাগলাম।ভাবলাম এইযত্ন আমার পাওনা,আমি এসব ডিজার্ভ করি।
আমার সাথে এমন আচরণ হওয়াই উচিত।
ভাবটা এমন, আমি ওর স্বামী হয়ে ওকে ধন্য করেছি।

শুরুর দিকে এত কেয়ারিং আমার ভালোই লাগত।
আমি নবাবের মতন ঘরে আচরণ করতাম।
আর ও দাসীর মতন ছিলো।
আমার মনের পাখা মেলা শুরু হলো।
কোন ভয়, কোন প্রশ্নের সম্মুখীন কোনদিনও হতে হবে না আমি বুঝতে পারলাম।
আমার বিয়ের আগের সম্পর্কগুলির খোঁজ খবর নিতে শুরু করলাম।
ওদেরও বিয়ে হয়ে গেছে ওরা কেউ আর আমার প্রতি আগ্রহী নয়।
বিষয়টা ইগোতে লাগলো।
আমি নিজের বেশভূষা, সাজগোজের দিকে মনোযোগ দিলাম।
নতুন প্রেমের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এদিকে ফোন হাতে দেখলেই আমার স্ত্রী কিড়মিড় করে।
ভয়ে সরাসরি কিছু বলে না।
কোন একদিন মোবাইল নিয়ে কিছু একটা বলেছিলো আমি ওকে চড় মেরেছিলাম।
কি বলেছিলো এতদিন পরে আর মনে করতে পারছি না।
এরপর থেকে নিয়মিত আমার মোবাইল নষ্ট হতে লাগলো।
মোবাইল সারাতে নিলে জানতাম মোবাইলে পানি ঢুকেছে।
প্রতিবারই এমন হত।
আমি সংসারের খরচ কমিয়ে মোবাইল কেনা ও সারানোতে মনোযোগ দিলাম।
এই কারণে বিভিন্ন উসিলায় আমি ওকে মারতাম।
আসলে একবার যার উপর বিরক্তি চলে আসে তাকে অসম্মান করতে কোন যৌক্তিক কারণ লাগে না।
বিয়ের চারবছর হয়ে গেছে। আমাদের কোন বাচ্চা আসেনি।
এটা নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।
আমার স্ত্রীর ও বাচ্চার ব্যাপারে কোন আগ্রহ দেখি না।
আমার বাবা মা গত হয়েছেন তাই আমার ভালোমন্দ বলারও কেউ নেই।
আমার মনে হয় আমার স্ত্রীর কাছে আমিই তার বাচ্চা।
সকালে কখন উঠব,কখন কি খাব,আমার কাপড় ধবধবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, কয়টায় ফিরব
এসব ছাড়া ওর জীবনে আর কিছু নেই।

কাজে গেলে দশবার ফোন দিত।ওর জন্য বাধ্য হয়ে ফোন সাইলেন্ট করা রাখতে হত।
শুরুর দিকে তো গুগল ম্যাপ থেকে লোকেশনের স্ক্রিনশট দিতে হত!
এরপর মারতে মারতে অত মাথায় উঠা বন্ধ হয়েছে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় ও একটা রাতও কোথাও গিয়ে থাকত না।
বাপের বাড়ি আছে, বোনের বাড়ি আছে কোথাও গিয়ে রাতে থাকত না।
আমি না গেলে কোথাও যেতও না।
রাগ করে কত দাওয়াত যে বাদ দিয়েছি।
ওর ভাইয়ের বিয়েতে আমার কাজ ছিলো বলে আমি রাতে থাকিনি।
সবাই জোর করে ওকে রাতে রেখে দিয়েছিলো।
রাত চারটার সময় সে বাপের বাড়ি থেকে আমার কাছে চলে এসেছে।
আমি ওর এই একগুঁয়ে আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলাম।
দমবন্ধ লাগত।হাসফাস লাগত।
ওর থেকে পালাতে চাইতাম।কিন্তু দুষ্ট গ্রহের মতন ও আমার পিছু লেগে থাকত।
কোন স্পেস রাখত না।
প্রায়ই আমি চেষ্টা করতাম কোন বন্ধু বান্ধবের বাসায় রাতটুকু থাকতে।
কিন্তু সার্কেলের সবাই অতদিনে বিয়ে-শাদি করে সংসারে থিতু হয়ে গেছে।
বিবাহিত লোক রাতে বন্ধুর বাসায় থাকা বন্ধুদের পরিবারের কাছে অশোভন দেখাত।

আমি খুব করে একটা প্রেমিকা পেতে চাইলাম।
এই শহরে পতিতা পাওয়া সহজ, প্রেমিকা নয়।
প্রেম হতে হলে সময় দেয়া লাগে কিন্তু আমার স্ত্রীর জন্য সেটিও সম্ভব নয়।

এত মারধোর করতাম
ও চেহারার ফোলা নিয়ে কাজে যেতে লজ্জা পেত।এ ছুতোয় ও ছুতোয় ছুটি নিত।তবু কোনদিনই ওর বাপমায়ের কাছে অভিযোগ জানাত না।

হঠাৎ একদিন অনেক গুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে ও সুইসাইড এটেম্পট করল।
সেবার অনেক টাকা লেগেছিল ওকে সুস্থ করতে।

ডাক্তারের পরামর্শে ওকে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে গেলাম।
একে একে অনেক অন্ধকার দিক সামনে এলো।
আমি যা স্বাভাবিকভাবে নিয়েছিলাম এগুলো সবই সাইকিয়াট্রিস্ট এর ভাষায় অস্বাভাবিক।
এত যত্ন কোন স্বাভাবিক মানুষ কাউকে করতে পারেনা।
এত অবহেলা,অপমান সয়ে ভালোবেসে যাওয়া কোন কমন বিষয় নয়,এটা মনের অসুখ।

Obsessive love disorder

ওর বাবা মাকেও ওর অতীত জানতে সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে নিয়ে গেলাম।
জানা গেলো ছোটবেলায় ওর মা বিদেশে চলে গিয়েছিলেন।
সেটা ও মেনে নিতে পারেনি।
খুব ভালোবাসতেন যে দাদী, উনিও সে বছরই মারা গিয়েছিলেন।
সেই থেকে মনে বেধেছে এই অসুখ। ভালোবাসার মানুষকে ধরে রাখার অসুখ।

এ রোগ সহজে সারবার নয়।তবে ভালোবাসার মানুষ বিশ্বস্ত ভাবে শুশ্রূষা করলে সারতে পারে।

আমি আরও জানলাম, আমার স্ত্রী আমার পুরনো প্রেমের নতুন চারা গজানোর খবর জেনে গেছে।

সত্যিই
এরমধ্যে আমি পুরনো একজনের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করতাম।সেটা আরো নির্বিঘ্ন করতে ওর সরকারি চাকরির সুযোগটা কাজে লাগাতে চেয়েছিলাম।

আর আমার পরকীয়ার খবরের ধাক্কা ও নিতে পারেনি।সুইসাইড করতে চেয়েছিলো।

বাড়ি ফিরে আমি নিজেকে নিয়ে বসলাম।অনেক ভাবলাম।মন স্থির করলাম যে আমি আমার স্ত্রীর পাশে থাকব।

আমি আমূল বদলে গেলাম।অতটাই যত্ন কেয়ার করা শুরু করলাম যতটা ও আমাকে করত।

কিন্তু আমার স্ত্রী অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে গেলো।
হু হা ছাড়া কিছুই বলত না।যে মানুষটা আমার সাথে একটু কথা বলার জন্য মুখিয়ে থাকত সে এখন পাথরের মতন নীরব।

নিয়মিত ডাক্তার দেখাই।ঔষধ বাড়ে কিন্তু রোগ সারে না।

একদিন ও মাথা ঘুরে পড়ে গেলো।বমিও হলো।মনে নতুন আশা উঁকি দিলো।
সুখবরের খুব আশা নিয়ে ডাক্তার দেখালাম।

আমাকে নির্বাক করে দিয়ে ওর ব্রেন ক্যান্সার ধরা পড়ল।
ডাক্তার বললেন সর্বোচ্চ পনেরো মাস বাঁচবে।

আমার দুনিয়াটা নড়ে গেলো।
এখন আর আমি ওর কাছ থেকে পালাতে চাই না।
আমার সারাজীবন ওর সাথেই কাটাতে চাই।

হলো না।
কথা বলতে পারত।কিন্তু ও আমার সাথে আর কথা বলে না।
ও একটা রহস্য হয়ে আমার সামনে স্থির হয়ে রইল।
আমি ওর অভিমান, শীতলতা দূর করতে পারলাম না।
ও একা একাই হাঁটতে যেত।
পথের কুকুর খাওয়াত।কুকুরের জন্য মায়া লাগলেও আমার উপর থেকে ওর অভিমান শেষ দিন পর্যন্ত অটুট ছিলো।
শেষের দুইমাস ওর যন্ত্রণা কমাতে ঘুম পারিয়ে রাখা হত।
আমি কপালে হাত রাখলে
ও বিড়বিড় করত।কিন্তু কথা বলত না।

পনেরো মাস পরেই ও মারা গেলো।
আমার মুক্তির স্বাদ পাওয়া উচিত ছিলো।
কিন্তু তা হলো না।
আমার কলিজার একটা অংশ যেন কেউ খাবলা মেরে নিয়ে গেছে।
ঐ অংশটায় প্রতিনিয়ত যন্ত্রণা হয়,রক্ত ঝরে।

মন্ত্র মুগ্ধের মতন আমি এতক্ষণ রোগী ভদ্রলোকের কথা শুনছিলাম।
এইবার প্রশ্ন করলাম উনি ঠিক কি সমস্যা নিয়ে আবার সাইকিয়াট্রিস্ট এর চেম্বারে এসেছেন।

উনি আবার বলতে শুরু করলেন।
ওর মৃত্যুর ধাক্কা সামলাতে আমার বছরখানেক সময় লেগেছে। আমি শুধু কাঁদতাম।

মাসখানেক ধরে ও আমার কাছে আসে।বসে।ধরা দেয়। হাসে।গল্প করে।
যাবতীয় প্রেম আমাদের ঘটে যায় মগজে,হৃদয়ে।
আমি ওর সাথে খিলখিল করে হাসি কিন্তু লোকে ভাবে আমি একা হাসি,কথা বলি।

সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে এসেছি এ আমার মনের অসুখ কিনা জানতে।
আচ্ছা বাবা মনের রোগ স্থায়ী করার কোন ঔষধ আছে?

সমাপ্ত।

1 মন্তব্য

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে