নারী জীবন

0
572

গত দুমাসে আমার জীবন পুরো তেজপাতা হয়ে গেছে। ঘর সামলাতে যেয়ে পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে। আর ক্লিনিকের চাকুরীটা নামকাওয়াস্তে না পারতে টিকে আছে। যে কোন দিন ওরা ছাঁটাই করে দিল বলে। এর পেছনে কারণটা খুবই সামান্য। বাসার গৃহকর্মীর হঠাৎ প্রস্থান। সে দুদিনের জন্য যাবে বলে একেবারেই বিদায় নিয়েছে।

বাবার বাড়ী শ্বশুরবাড়ী দুটোই ঢাকার বাইরে হওয়ায় অন্য কোন সাপোর্ট পাওয়ারও কোন উপায় ছিল না। স্বামী রাহাত পোস্টগ্রাজুয়েশনের পড়াশোনা আর ট্রেনিংয়ের জন্য পিজিতে পরে থাকে সারাদিন। এদিকে আমার একমাত্র ননদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া সাথে আমারও পোস্টগ্রাজুয়েশনের পড়া শুরু করার জন্য ঢাকাতে থাকাটা দরকার হয়। আর তাই আমি যখন শাশুড়ী মা কে বলি শহরে বাসা নেয়ার কথা একটু গাইগুই করেও উনি রাজী হয়ে যান। রাহাত অবশ্য চায়নি এই মূহুর্তে আমি ঢাকায় আসি। পাছে ওর ওপর সংসারের দায়িত্ব এসে পরে আর ওর পড়াশোনার ব্যাঘাত হয়। আমি কাজ করে যতদূর পারি সামাল দেব এমন আশ্বাস দেয়ার পর আর বেশী ঝামেলা করেনি।

বাড়ি থেকে পাঠানো একটা সার্বক্ষনিক কাজের সহকারী থাকাতে আমি বেশ গুছিয়েই নিয়েছিলাম। কিন্তু বছর ঘুরতেই সেই মেয়ের মাথায় ওঠে বাড়ি যাবার পোঁকা। সামনে পরীক্ষা বলে অনেক বুঝিয়েও রাখতে পারিনি। অল্প কদিনের ব্যাপার, ও নিশ্চিত চলে আসবে আর নয়তো আরেকজন কাউকে পাওয়া যাবে ভেবে আমি আর না করিনি। কিন্তু আরেকজন সহকারী পাওয়া যেন সোনার হরিণ হয়ে দাঁড়ায়।গত দুইমাসে সংসারের কাজ করতে করতে আমার মনে হয়েছে আমার বোধহয় আর কোনদিন পড়াশোনা করা হবেনা। রাহাতকে সংসারের কোন কাজে সাহায্য করতে বললে ও এমনভাবে খেকিয়ে ওঠে যে ওকেও বারবার বলতে ভালো লাগেনা। যেন ওর পড়াটাই শুধু জরুরী আর আমার পড়াশোনার কোন মূল্যই নেই। আর ননদ রায়না তো ছোটমানুষ বলে আমার শাশুড়ী তাকে দিয়ে যেন কিছু না করাই তা বারবার বলে দিয়েছেন।

অনেক অনেক চেষ্টার পর একটা সহকারী মিলেছে অবশেষে সপ্তাহখানেক হলো। পরীক্ষার আছে দুমাস। একদিকে মেয়েটাকে ঘরের কাজ শেখানো অন্যদিকে পড়াশোনা সাথে চাকুরী দুটো ধরে রাখতে যেয়ে শরীরের ওপর বেশ চাপই পরে যায়। কাজে সপ্তাহখানেকের ছুটি নিয়েছি তাই একটু সামলে নিতে। এমনই এক ছুটির দিনে মেয়েটা মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছিল।

– শেফালী, তোমার বাড়ির কথা তো কিছু জানিনা। তোমরা কয় ভাইবোন?

চাইর বইন গো আফা। বড় বইনের বিয়া হই গেসে। আই মাইজ্জাজন। ল্যাদা দুগা ইসকুলে যায়।

– বোনের শ্বশুরবাড়ীর লোকেরা ভালো?

আঁর দুলাভাই এমনে বালা। তয় হেতনের মা বড় জ্বালায় আর বইনগারে। হেতনের কতা মত বৌ রে বলে উঠতে বইতে হিডা না দিলে বৌ ভালা থাকেনা। গত দুগা বছর বইনডা শান্তি হায় ন আর। হেতারা তাগো ছোড হোলারে বিয়া দিসে গত মাসে। এই এক মাস বইনগা কদ্দুর শান্তিতে আছে।

– আর তোমার মা? তোমার বাবা কেমন মানুষ?

আঁর বাফে চ্যাত উইডলে মারে হিডা দেয়। আই আওনের আগে আগে একদিন দিসে এতো জোরে লাথ্থি। আঁই বাড়িত আছিলামনা। আই দেখি মা বাড়ি ছাড়ি গেছে গই। বাফেরে কইলাম যান টোগাই আনেন আম্মারে। কয়, মাতিসনা, ত্যাজ দেয়াই গেছে। তেজ কইমলে ছলি আইবো।

– চলে এসেছিল তোমার মা?

না আই কিতা কইরবো? বইনের জামাই খবর হাডাইসে বাড়িত আইবো। আই যদি হুনে মা বাড়ি ছাড়ি গেছে গই, বইনডারে তো কষ্ট দিবো। আমনেগো কত সুখ আফা। বাইয়ে আন্নেরে ছাড়া কিচ্ছু বুঝেনা, আন্নে যা কন যুত করি হুনি থাকে। আর দুলাভাই আর বাপগা যদি এমন হইত।

মুখ উল্টো দিকে ঘুরে থাকার কারণে শেফালী আমার দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়না। শেফালীর মা তো তবু রাগ করে বাড়ি থেকে চলে যাবার সাহসটুকু করতে পেরেছে। আমার যে সেই সাহসটুকুও নেই। শেফালীকে খুব বলতে ইচ্ছে হয়, কেউ হাতে মারে আর কেউ কথায়। চোখের সামনে মুখোশ পরা যেই হাসিখুশী আমাদের দেখা যায় তা বদ্ধ দরজার ওপাশে আর মুখোশে ঢাকা থাকেনা। শেফালী আসার আগের সপ্তাহেও নিজেদের দোরবন্ধ কামরায় রাহাত চিৎকার করে বলে যায়, ‘ নিজে নাচতে নাচতে ঢ্যাং ঢ্যাং করে ঢাকা থাকতে আসছো। নিজের সংসার করতে আসছো। এখন সংসার কর। কাজের বুয়া না থাকলে সংসার যদি থেমে থাকতে হয় তবে পড়ালেখা ছেড়ে দয়া করে সংসারটাই করো। আমার পক্ষে পড়া ফেলে অন্য কিছু করা সম্ভব না।’

হায়রে, নারী জীবন। গরীব আর ধনীর ঘরে বুঝি খুব একটা তফাত হয়না। কেবলই মানিয়ে নেয়া আর মেনে নেয়া।

#ডা_জান্নাতুল_ফেরদৌস

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে