“তিমির” পর্ব ১১

0
770

“তিমির” পর্ব ১১

আমার ঘরের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। অবশ্য বেলকনির দরজাটা খোলা ছিল। কে লিখতে পারে এই চিঠি? আমি প্রবল আগ্রহ নিয়ে চিঠিটি খুললাম। আমার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল। এই লেখার স্টাইল আমার খুবই পরিচিত! চিঠিটি কাঁপা হাতে পড়তে লাগলাম। তাতে কোনো সম্বোধন নেই।
‘আমার অবশেষে চিঠিই লিখতে হয়েছে। আর কোনো উপায় ছিল না। আমি কেন যেন তোর কাছে যেতে পারি না। তবে এটা নিয়ে খুশি যে, আমাকে দেখে তুই ভয় পাস না।
শোন, তোর আচরণ অনেক পাল্টেছে। আমি কল্পনাই করতে পারি না, তুই সেই মেয়ে, যে কিনা আমার সাথে থেকেছে বোনের চেয়েও বেশি নিকটস্থ হয়ে। কী এমন ঘটেছে আমি তা বুঝতে পারছি না। তবে এটুকু বুঝতে পারছি, যা করছিস, সবই তুই ইচ্ছাকৃতভাবে করছিস না।
তুই ইদানীং বাবার সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করছিস। তিনি ততটা খারাপ নন, যতটা তুই ভাবছিস। আসলে আমার মায়েরই দোষ ছিল। তোকে জানানোর জন্যই আমি চিঠিটা লিখেছি।
বিশদভাবে সবই লিখছি। বাবা যখন লেখাপড়া করছিলেন, তখন তিনি শাহানা মাকে বিয়ে করেছেন। একবছর চলে গেল। কিন্তু তাঁদের বাচ্চা হচ্ছিল না। বাবার বাচ্চা নেওয়ার অনেক ইচ্ছা ছিল। তখন তাঁর সাথে আমার মায়ের দেখা হয়। মাও দেখতে আমার মতোই ছিলেন। তিনি কিছুটা বেপরোয়া ছিলেন, যার কারণে পুরুষেরা তাঁর চাল-চলনে অনেক আকৃষ্ট হতেন। বাবার ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। তাঁর বিবাহিত হওয়া নিয়ে মা পরোয়া করেননি। বাবা তাঁকে বিয়ে করে ফেললেন। তখনও শাহানা মা এসবের কথা জানতেন না। বাবা জানানোর সাহস পাননি। কেননা তিনি বড় অভিমানিনী ছিলেন। বাবা তবু দু’জনকেই সমানভাবে ভালোবাসতেন। যখন আমার মা তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা, তখন বাবা একদিকে খুশি হন। আরেকদিকে তাঁর মাথায় বাজ পড়ে এই শুনে যে, শাহানা মা দুইমাসের অন্তঃসত্ত্বা। কারণ ধরতে গেলে তিনি দ্বিতীয় বিয়ে বংশধরের জন্যই করেছিলেন। ওদিকে তোর মায়ের ক্ষেত্রে, স্বামীর ইচ্ছা ছিল বলে তিনি বাচ্চার জন্য সবকিছু করেছেন। যে যেদিকে বলেছে, ছুটে গিয়ে পানি-পড়া খেয়েছেন, তাবিজ লাগিয়েছেন। হয়তো এসবের কারণেই শেষে তাঁর প্রার্থনা কবুল হয়। তিনি তোকে পেয়েছেন। কিন্তু আরেকদিকে বাবা আমাকেও পেয়েছিলেন।
দুইপক্ষের লুকাচুরি খেলা আর কতদিনই বা চলত? শাহানা মা সত্যটা জানার পর অভিমানে বাবাকে ত্যাগ করেছেন। তিনি বাবাকে কখনও তাঁর মুখ দেখাতে নিষেধ করে দিলেন। শাহানা মা নিজের অভিমান নিয়ে নিজের বাপের বাড়িতে থেকেছিল। এদিকে বাবা নিরুপায় হয়ে আমাদের নিয়েই সংসার শুরু করেছেন।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

তিনি স্কলারশিপ পেয়ে আমেরিকায় চলে যান। তার অর্জিত অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দেশে এই বাড়িটি বাঁধতে দেন। মাই সবকিছু দেখাশোনা করত। বাবা দশটা বছর দেশে আসেননি। হয়তো তিনি একজনকে দুঃখে রেখে আরেকজনকে সুখ দিতে পারছিলেন না। এই সময়, আমাদের অনেক টাকা হয়ে যাওয়ায় বাবা একেবারে চলে আসেন। এসে জায়গা ফ্যাক্টরি অনেককিছুই কিনলেন। সেগুলোতে ভাড়ার মাধ্যমে টাকার ইনকাম চলে। বাবা চলে আসার পর কী ভেবে আমার জন্য যেটুকু সম্পত্তি লিখে রেখেছিলেন, তাঁর সম্পত্তি থেকে সেটুকু তোর জন্যও লিখলেন। এমন সময় মায়ের অসুস্থতা ধরা পড়ল। কিন্তু অনেক দেরি হয়ে যায়। তার কাছে পৃথিবী ত্যাগ করতে হয়েছে।
আমাকে নিয়েই বাবা থাকতে শুরু করলেন। অপরদিকে, তোদের আগের বাড়ির মহিম নামের এক ভদ্রলোকের মাধ্যমে তোদের খোঁজখবর রাখতেন। বাবা কিন্তু অনেকবার শাহানা মাকে ফিরে আসতে বলেছেন। তিনি কিছুটা অদ্ভুত আচরণ করতেন। বাবাকে তিনি দুই চোখের বিষ ভাবতেন। বাবা অসহায় ছিলেন। আমি একা নিঃসঙ্গ থাকতে খুব কষ্ট পেতাম। শাহানা মায়ের যাওয়ার পর তোকে নিয়ে এসে তিনি আমাদের দুইজনেরই প্রয়োজন মেটান। আমার ভাবতেই অবাক লাগে, তুই এমন মানুষটাকে এতটা অসম্মান করিস। আসলে ভুল আমাদের মায়েদের ছিল। আমার মা কেবল নিজের কথাই ভাবতেন। আর শাহানা মা বাবাকে বুঝার চেষ্টা করেননি।
এসব বলার পরও যদি তুই বাবাকে অসম্মান করিস, তবে আমার করারই বা কী আছে। ভালো থাকিস। নিজের খেয়াল রাখিস। অবশ্য আমি তোর রক্ষার জন্য পাশেই আছি।’
আমার গালটা ইতোমধ্যে এতটুকুই ভিজে গেল যে, মনে হয়, গালের একটা অংশও শুকনো নেই। বাবা। আসিয়া। সরি, আসিয়া। আমি বাবাকে বুঝিনি। আমার কী হয়েছে আমি জানি না। তাঁর প্রতি থাকা ঘৃণাটাই পরবর্তীতে তীব্র হয়েছিল। আর কিছুই না। প্লিজ, আমায় ক্ষমা করে দে। এসব সত্যিই আমি করছি কিনা বুঝতে পারছি না। আমার কাণ্ড দেখে আমি নিজেও কম অবাক হই না। চিঠিকে আসিয়া ভেবেই যেন ভাবলাম। আর আসিয়া কী কারণে আমার কাছে আসতে পারছে না?
আমি বাইরে বেরিয়ে বাবার পাশে ব্রেকফাস্ট করতে বসি। তিনি কেবল আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়েছিলেন। আমি তার পাউরুটিতে জেলি লাগিয়ে দেই। তিনি অবাক হয়ে তাকাচ্ছেন। আমি একটু হাসার চেষ্টা করলাম। তারপর নিজেও খেলাম। জেলির মিষ্টি স্বাদটা আমার অনেক পানসে লাগছে। মুখ কুঁচকে মজিদ ভাইকে বললাম, “আজ ঝাল পাকুরা করেননি?”
“আমিই নিষেধ করেছি।” বাবা বললেন, “এতটা ঝাল খাবার খাও! মুখ জ্বলে যাওয়ার মতো। তোমার স্বাস্থ্যের জন্য এসব মোটেও ভালো না।”
কথাটি শুনে আমার ভেতরের চিনচিনে রাগটা উবলে উঠতে শুরু করছে। আমি নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করি। আমি এই আচরণের বিরুদ্ধে লড়ার চেষ্টা করলাম। ধ্রুব হয়তো এটার কথাই আন্দাজ করেছিল। আমি রাগটা সংবরণ করতে চাই। বাবার সাথে আর খারাপ ব্যবহার করতে চাই না। তাই হাতের চামচটা চেপে ধরলাম।
খাবার কোনোভাবে গলাধঃকরণ করে উঠে ঘরে চলে এলাম। আসার সময় বাবার রিয়্যাকশন একটুখানি দেখেছিলাম, তিনি ওই চামচটিকে বাঁকানো দেখে আমার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়েছিলেন। আমি সত্যিই জানি না, একহাতে আমি কীভাবে ওই চামচকে বাঁকা করেছি। কেবল জানি, সে সময় আমার হাতে অমানবিক এক অসুর শক্তি কাজ করছিল।
আমার কলেজে না যাওয়ার কথা বাবাকে জানালাম। কলেজ না থাকায় অনেক নিয়মই নির্দিষ্ট হয়ে গেছে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, সাবিলাদের বাড়িটায় যাওয়া, তার সাথে আড্ডা দেওয়া, আবিরদের ইনভেস্টিগেশনের প্রসেসিং দেখা। মাঝে মাঝে আসিয়াকে আমি দূর থেকে দেখি। সে হাসে। হয়তো বাবার প্রতি আমার কন্ট্রোল দেখে সে সুখী। আবিররা ইনভেস্টিগেশনের জন্য আসে। তারা কোনো ক্লুই পাচ্ছে না। কেসটা অনেক কঠিন। এমন সময় খুনটা হয়েছে যে, কাউকেই পুরোপুরি সন্দেহ করা যাচ্ছে না। পার্টিতে উপস্থিত থাকা অতিথিদের লিস্ট আমার কাছ থেকে নিয়ে তারা একটি সপ্তাহ তদন্ত করেছে। সবার স্বভাবের সম্বন্ধে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কিছুই পেলেন না।
আরিয়ান স্যারের কাছে ইতোমধ্যে আরেকটা কেস এসে পড়ল। তাই বাবা কেবল আবির স্যারকেই প্রাইভেটলি ইনভেস্টিগেশন করতে বললেন। তিনি কেবল আসিয়ার খুনিদের শাস্তি দিতে চান। আর আবির কোনো ক্লু পেলে আরিয়ান স্যারও আসবে বলেছে। এরই মাঝে আমি সাবিলার কাছ থেকে তাদের বিগত জীবনে ঘটে যাওয়া এডভেঞ্চারের সম্বন্ধে জানতে পারি। এও জানতে পারি, তার জন্ম কী করে হয়। অনেক চমৎকার একটা সিচুয়েশন। ডানার সন্ধিস্থলে ব্যতীত পরীদের আর রক্ত নেই। তবু সাবরিনা মানুষের মেয়ে সাবিলাকে জন্ম দিতে পেরেছে। শুনেছি, অনুমানের ভিত্তিতে তাদের ক্রোমোজোম সংখ্যা আমাদের চেয়েও বেশি। এজন্য তাদের অনুভূতি শক্তিও অনেকটাই তীব্র। এসব তত্ত্ব যদি কোনো বিজ্ঞানীর হাতে ধরা পড়ে, তবে অনেক তোলপাড় হবে।
সাবরিনাদের জগতে প্রজনন পুরোপুরিই ভিন্ন। এটার কথা তিনি কাউকেই জানাননি। তবে সাবিলা এটুকু বলেছে, তারা কেবল একটি মাসের জন্যই গর্ভধারণ করে। গর্ভাবস্থায় মানুষের মতো তাদের কোনো পীড়ায় পড়তে হয় না। তবে সাবরিনার কিছুটা পড়তে হয়েছিল। সাবিলাকে ধারণ করার সময় তিনি সাবিলার মৃদু ভার দুইমাস বহন করেছিলেন। অথচ তাদের জগতে প্রজন্মদেরও ভার থাকে না। সাবিলার শরীরে রক্ত জোগানোর জন্য আমাদের মনুষ্য খাদ্য তার কাছে অখাদ্যরূপে খেতে হয়েছে। পানির প্রতি তাদের অনেক দুর্বলতা হওয়ার সত্ত্বেও চোখ বুজে সাবিলার জন্য পানি পান করতে হয়েছে। আর তিনি এক্ষেত্রে দারুণ এক পন্থা অবলম্বন করেছিলেন। তাদের পরিপাক হয় না বিধায় তিনি খাবার খাওয়ার পর তার ক্ষমতাপূর্ণ চোখের ইশারায় খাবারকে তার অভ্যন্তরে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছিলেন, যেন খাবারগুলো কেবল সাবিলার জন্যই সরবরাহ করা হয়েছে। আর সাবিলাও খুব ম্যাচিউর ছিল। সে খাবারগুলো ছয়মাসি এক বাচ্চার ন্যায় গর্ভেই খেয়েছে। আরও শুনেছি, তাদের ডানার সন্ধিস্থলের রক্তগুলো বারবার রিজেনারেট হয়, যাতে ডানাগুলোকে তারা চাইলেই তাদের দেহের চেয়ে অধিক শক্তিসম্পন্ন করতে পারে। আমি আরও জানলাম, সাবরিনারা ঘুমায়। অবশ্যই। তাদের তো কোনো তাগিদ নেই। সংগ্রাম নেই। উপার্জন নেই। কাজ থাকে না।
আরেক সপ্তাহ কেটে যায়। এই দুই সপ্তাহে আমার মাঝে নতুন এক পরিবর্তন এসেছে, যার সম্বন্ধে আসিয়াই লিখেছে। আমি নাকি আজকাল একটু বেশিই বেলকনীতে সময় কাটাচ্ছি। মুখে অযথা বিড়বিড় করি। আমি জানি, আমি কেবল মস্তিষ্ককে পরিশ্রম করতে না দিয়ে, চিন্তা করতে না দিয়ে মুখেই বিড়বিড় করে কথা বলি। নিজেকেই বলি, নিজের অস্বাভাবিকতার কথা, আমার জীবনে আসা এক আমূল পরিবর্তনের কথা। আমি আবারও দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, আমি এই বাড়িতে আসার আগে মায়ের মৃত্যুর পর থেকে যে স্বপ্নটা অনেকবার দেখে এসেছি। রাতে আমি ভয়ে ঘুমাই না। কারণ দুঃস্বপ্নে আমি ওই বীভৎস লোকটিকে দেখতে পাই, যার শরীর থেকে দুর্গন্ধ বেরুয়।
আমূল পরিবর্তনটা হলো, আমি তাকে এখন সরাসরিও দেখতে পাচ্ছি। সে নগ্ন অবস্থায় থাকে। সে যখনই আমার নজরে পড়ে, তাড়াতাড়ি আমি চোখ সরাই। আমি সিওর, আমি এখনও ঘৃণায় তার মুখটাও ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করিনি। তাই কেবল এটাই বলতে পারি, ওই জিনিসটা একটা বীভৎস লোকই। জিনিসটা আমায় অনেক বিরক্ত করছে। এই দুই সপ্তাহে আমি অনেকবারই তাকে দেখেছি। এবং যেই দেখেছি, তাকে দূর করার জন্য ফুলদানি কিংবা গ্লাস যাই হাতের নাগালে পেয়েছি, ছুঁড়ে মেরেছি। আওয়াজ পেয়ে বাবারা দৌড়ে আসে। আমি জবাব না দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকি। ধ্রুব যেদিন কলেজে যায় না, সেদিন আমায় দেখতে আসে। আমি ওর সাথে দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলি। সেও লক্ষ করেছে, আমার মাঝের পরিবর্তন। সে একবার জিজ্ঞেসও করল, “তুমি কি ঘুমাও না? তোমার চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল হয়েছে। তুমি কি আবারও দুঃস্বপ্ন দেখছ?”
আমি কেবল মাথা নাড়ি। আমার মাথা এতটা ব্যথা করে যে, তার সাথে তেমন কথা বলারও শক্তি থাকে না। হ্যাঁ, আমি আমার ভেতরের অসুর শক্তির প্রভাবটার বিরুদ্ধে লড়ার চেষ্টা করছি। ধ্রুবদের সুগন্ধ অতিষ্ঠ লাগায় তাদের আশেপাশে কম যাই, যাতে রাগে তাদের কিছু করে না বসি। আমি ওই সুগন্ধটার আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করি।
বাবা দূরে দূরে থেকে আমার খেয়াল রাখার চেষ্টা করছেন। মজিদ ভাইও চেষ্টা করে যান, আমি যাতে কোনোভাবে না রাগি। আমি নিজেকে শান্ত রাখার একটা পথও খুঁজে পেয়েছি। আসিয়ার কথা ভাবলে আমি অনেকটাই স্বাভাবিক থাকি। আমি তার ঘরে প্রতিদিন যাই। আগের দিনের কথা মনে করি, যখন তাকে জড়িয়ে ধরে আমি ঘুমাতাম।
কিন্তু আজ আমার এই শান্তিটাও ছিনিয়ে নেওয়া হবে তা আমার জানা ছিল না!
আমি আসিয়ার ঘরে ঘণ্টাখানেক আগে এসেছিলাম। লম্বা ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে বসে রয়েছিলাম। এমন সময়ই আমি ওই বীভৎস লোকটিকে আয়নায় দেখতে পাই। অমনিই আমি চোখ বন্ধ করি। আমার রাগ উঠছে। আসিয়ার ঘরেও সে আমাকে বিরক্ত করতে শুরু করেছে!
আমি রাগের বশে হাতরিয়ে একটি মেকাপ বক্স পেলাম। সেটিই আয়নার দিকে অসুর শক্তি নিয়ে ছুঁড়ে মারি। আয়না ভেঙে গিয়ে ওই প্রতিবিম্ব নষ্ট হয়ে গেল। কিন্তু আমার দৃষ্টি মেঝেতে ভাঙা টুকরোর উপর নয়, বরং সামনের দিকে! হ্যাঁ, আয়নার ওপাশে দেয়াল থাকার কথা। কিন্তু ওখানে অন্ধকার দেখা যাচ্ছে! কী করে সম্ভব? ওখানে কি দেয়াল নেই? আমি খেয়াল করলাম, এই নতুন উদ্বিগ্নতার কারণে আমি নিজের পবিত্র আত্মাকে খুঁজে পেয়েছি। সেই রাগটা নেই, কোনো জেদ নেই, কোনো…. অসুর শক্তিও নেই। আসিয়া তো এটার সম্বন্ধে কিছু বলেনি। আমি তড়িঘড়ি করে ড্রেসিং টেবিলটা সরাতে লেগে পড়ি। কিন্তু এখন আমার শক্তি একটা সাধারণ মেয়ের মতোই।
ভাঙচুর আমাদের বাসায় রীতিমতো হওয়ায় বাবা এবার দৌড়ে আসেনি। আমি তড়িঘড়ি করে ধ্রুবকে আসিয়ার ফোন থেকে কল দেই। সেই সাথে আবিরকেও জানাই। কারণ আমার একটা দিনের কথা মনে পড়ে গেছে। হোক না হোক, এটাই তাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
ধ্রুব আর আবির একই সাথে এলো। ধ্রুব ইতস্তত করে আমায় ফিসফিসিয়ে বলল, “তোমায় বলেছি না, আবির স্যারদের পাশে থাকতে চাই না?”
আবির ওর দিকে তাকাচ্ছে। ধ্রুব দাঁতের ফাঁকে ফিসফিসিয়ে বলল, “দেখ, তিনি আমার রূপে আমায় সন্দেহ করছেন।”
আমি এসব বাদ দিয়ে তাদের দুইজনকেই আরেক বিষয়ের দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করি। দুইজনকেই আয়নাটির কথা বললাম। আবির ড্রেসিং টেবিলটা সরাল। এখানে সত্যিই একটা গোপন পথ আছে। আবিরকে অবাক করিয়ে দিয়ে বললাম, “আসিয়ার জন্মদিনে সে অসুস্থ থাকার সত্ত্বেও শপিং করার জেদ ধরেছিল। কিন্তু বাবা ওকে যেতে দিচ্ছিল না। সে আমায় বাইরে অপেক্ষা করতে বলে ঘরের দরজা বন্ধ করে দেয়। বাইরে গিয়ে আমি অবাক হয়ে দেখি, সে আমার আগেই নিচে পৌঁছে গেছে। অথচ বাবা সোফায় ছিলেন। তাকে তিনি দেখেননি। আসিয়া বলল, এটা একটা সিক্রেট। আমায় তা পরে বলতে চেয়েছিল। কিন্তু…”
আবির আমায় বকা দিলো, “শিট! এটাই মেইন ক্লু। তুমি আমাদের আগে জানাওনি কেন? ক্লু’টা আমাদের নাগালেই ছিল। আমরা কিনা দুই সপ্তাহ এমনিই ওয়াস্ট করেছি।”
বলতে বলতেই তিনি ওই ছোট সাইজের পথ দিয়ে ঢুকে পড়লেন। কিন্তু ঢোকার পর তাকে আর মাথা নিচু করে থাকতে হলো না। ক্রমে আমরাও তাকে অনুসরণ করলাম। আবির শুরুতেই বলল, “এই কাঁচগুলো কিসের?’
“হয়তো আয়নার।”
তাকে চিন্তিত দেখাল, “না, আয়নার টুকরো তো এদিকে পড়েনি। ওদিকেই টুকরোগুলো পড়েছে। আয়না ভাঙার পর পেছনের বোর্ডটিও পড়ে যাওয়ায় তুমি এই জায়গাটি দেখতে পাও। এগুলো অন্যকিছুর কাঁচ।”
“আবির, আমরা এগুলো পরে না হয় দেখব। এখন সামনের দিকটা দেখি। আমি খুব কিউরিয়াস।”
“ওহ্, তাইতো। আমিও।”
ধ্রুবও উদ্বিগ্ন। সে আমার পেছনেই। আবিরের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। আমি উদ্বিগ্নতার কারণেই নিজের পবিত্র আত্মাকে ফিরে পেয়েছি। আমি ধ্রুবের সুগন্ধটা পাচ্ছি। এটা খুব ভালো এবং আমার খুব প্রিয়। এটা এতই সুস্বাদু, মুখে এতই পানি আনছে যে, পারলে আমি এখনই ধ্রুবকে কোনো খাবার ভেবে কামড় বসাতাম। সে আমার বাহুর পাশে আমাকে না ছুঁয়ে হাত আগলে রেখেছে, যাতে অকস্মাৎ কিছু হলে আমাকে সে রক্ষা করতে পারে। আমার এটা খুব ভালো লাগল। সে সত্যিই আমার কেয়ার করে।
ভেতরে ঘন আঁধার। সুড়ঙ্গটা একজনের সাইজেরই। আবির ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়েছে। আমরা তাকে অনুসরণ করে চলছি। জায়গাটা নিচু হলেও হাঁটার যোগ্য, যদিও মাথা এখন খানিকটা নিচু করে হাঁটতে হচ্ছে। আবির আমাকে একটা জিনিস দেখালে আমি আঁতকে উঠি।
“দেখ, রক্ত।”
এগুলো হয়তো আসিয়ারই। আমার চোখে পানি চলে এলো। জিভ কামড়ে রাখলাম। ধ্রুব আমার ঘাড়ে তার হাত ঘঁষে বলল, “কাম ডাউন। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আমরা চলতে লাগলাম। চিকন সিঁড়ি করা আছে। আশ্চর্য হয়ে মনে করি, এমন গোপন একটা পথের ধারণা আমি কখনও করিনি। আবির বলল, “এই জায়গাটার কথা আসগর সাহেব আমাদের জানাননি কেন?”
“হয়তো বাবা নিজেই জানেন না। বাড়িটি তিনি বিদেশে থেকে বাঁধিয়েছিলেন। হয়তো..”
“আসিয়া আর তার মাই জানত।”
অর্ধেকের পর আমাদের কুঁজো হতে হলো। বিকর্ষণ সত্ত্বেও আমি ধ্রুবের হাত ধরে থাকি। হোঁচট খেতে গেলে সে বারবারই বলছিল, “আলিয়া, বি কেয়ারফুল।”
সে নিজে কথাটা বলতে গিয়ে তেলাপোকা দেখে ‘ইয়াক’ বলে লাফিয়ে উঠে আমার ঘাড়ে পড়েছে। আমি তৎক্ষণাৎ ঘুরে তাকে ধরে ফেলি। হা হা। আমি হাসলাম। কারণ সে অনেক হালকা। বোধ হয়, এতবড় সুপুরুষটিকে আমি শূন্যে তোলে ফেলতে পারব। ইচ্ছেও হলো। কিন্তু আবির থাকায়… ধ্রুব কাউকে দেখাতে চায় না, কে সে। ধ্রুবও হাসল। সে জানে না এই হাসিটি আমার হৃদস্পন্দন কতগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।
আবির সমানে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা মাত্র কয়েক মিনিটেই পথটির শেষ অবধি পৌঁছলাম। পথটার মুখ কিছু একটা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আর পথটা এতই ছোট যে, আর দাঁড়িয়ে কিংবা কুঁজো হয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। হামাগুড়িই দিতে হবে। আবির ঢাকনাটি ঠেলে দেখল।
“এই ঢাকনাটি নড়ছে। কিন্তু সরাতে তো পারছি না। অপর পাশ থেকে সাহায্য লাগবে। আমরা এক্সেক্টলি কোথায় পৌঁছেছি তাই তো বুঝছি না।”
“আমি দেখি তো।” এগিয়ে গিয়ে আমি পিচবোর্ডটা ছুঁয়ে দেখলাম। নড়ানো যাচ্ছেও বটে। এটি কী হতে পারে.. কী হতে পারে.. “আবির, আমরা গ্যারেজে এসেছি।”
“হোয়াট?” দুটো গলার আওয়াজ একত্রে শুনলাম।
“হ্যাঁ, আমি গ্যারেজে গ্লাস করা লুবনা মায়ের পরিত্যক্ত একটি স্ক্র‍্যাচ দেখেছিলাম। আই থিংক, ওটাই।”
(চলবে…)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share