গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব-১৮

0
988

#গল্পপোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
গল্প: বিস্মৃতির অন্তরালে পর্ব-১৮
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

সেবার পরীক্ষা দেবার পর থেকে নিশান ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হবার কারণে তার সাথে আমার কথা বলা একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । তবে তার মধ্যে বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলাম। সব সময় হাসিখুশি থাকা মানুষটা হুট করে গোমড়ামুখো হয়ে গেল। গিটার বাজাতো না, গান করত না, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেওয়া পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। আমার তাকে ওভাবে দেখতে খুবই খারাপ লাগত। তবে, আমিও কেন যেন তার মতো একগুঁয়ে হয়ে গিয়েছিলাম! তাই কথা বলতে চেয়েও পারছিলাম না। নেহার সাথেই কেবল গল্পগুজব চলতো। খাওয়া আর ঘুমানো ছাড়া তেমন কাজ ছিল না। এভাবেই কাটছিল দিনকাল।

পরেরদিন আমাদের রাঙ্গামাটি বেড়াতে যাবার কথা ছিল। তাই রাতেই কাপড়-চোপড় গুছিয়ে নিয়েছিলাম। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে আমি ফ্রেশ হয়ে নিই। ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখলাম সবাই রেডি হয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আমি গিয়ে দাঁড়াতেই ফুফু বললেন, ‘তাড়াতাড়ি নাশতা করে নে। আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই রওনা হব। নিজস্ব গাড়ি নিয়ে যাব এবার। তাই ধকল পোহাতে হবে না।’

আমি শুনে খুশিই হলাম। তারপর চুপচাপ নাশতা করে নিলাম। আশেপাশে চোখ বুলিয়ে নিলাম কিন্তু নিশান ভাইকে কোথাও দেখলাম না।

আমরা ছিলাম চারজন । নিশান ভাই ভালো ড্রাইভ করতে পারে। ফুফা বলেছিল যাতে ড্রাইভার নেয় কিন্তু নিশান ভাই বলল ড্রাইভারের কোনো প্রয়োজন নেই। পেছনের সিটে বসল ফুফু, ফুফা আর নেহা। আমাকে সামনে নিশান ভাইয়ের সাথেই বসতে হলো। আমার খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। আবার মনের মধ্যে কেমন যেন একটা অদ্ভুত ভালোলাগা কাজ করছিল। আমি নিজের অনুভূতির বেড়াজালে নিজেই আটকে পড়ছিলাম। একই সাথে, একই মুহূর্তে এমন ভিন্ন রকমের অনুভূতি হচ্ছিল কেন বুঝে উঠা মুশকিল হচ্ছিল! আমি চুপচাপ বসেছিলাম। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠল। মোবাইল হাতে নিতেই দেখলাম ইমরান কল করেছে। আমি কিছুক্ষণ বিভ্রান্ত ছিলাম এই নিয়ে যে এই ঝগড়াটের সামনে কল রিসিভ করব কি না! ভাবতে ভাবতেই কলটা কেটে গেল। আবার কল আসল। এবার কোনোকিছু না ভেবেই রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে একটু চেঁচানোর ভঙ্গিতে অভিযোগের সুরে ইমরান বলল, ‘তুই রাঙ্গামাটি যাবার আগে একবার আমাদের সাথে দেখা করবি না? এই তোর বন্ধুত্ব? ‘

আমি শান্ত স্বরে বললাম, ‘দোস্ত বিশ্বাস কর, সুযোগ ছিল না দেখা করার।’

‘হুম, সুযোগ তো থাকবে না। এটাই স্বাভাবিক । আমরাই তোর কাছ থেকে বেশি আশা করে ফেলেছি।’ ইমরানের কণ্ঠে অনুযোগের সুর।

‘একদম সত্যি বলছি রে। বিশ্বাস কর। আর আমিতো কিছুদিনের মধ্যেই চলে আসব। তখন ইচ্ছেমতো দেখা করব। ঠিক আছে?’ আমি অনুনয় ভরা কণ্ঠে বললাম।

‘তোর আর দেখা করতে হবে না।’

‘আচ্ছা তুই কোথায় এখন বলতো?’

‘তোর জানা লাগবে না।’ কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার নিজে থেকেই বলল, ‘তোদের বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছি। দারোয়ান বলল তোরা এই মাত্র বের হয়েছিস।’

‘ঠিকই বলেছে। আর একটু আগে আসলে কিন্তু দেখা হয়ে যেত।’

পেছনের সিট থেকে একট বিরক্তিসূচক ‘চ’ কারান্ত শব্দ শুনে আমি সতর্ক হয়ে গেলাম । ইমরানকে বললাম, ‘দোস্ত বাসায় পৌঁছে তোকে কল দিব।’ ইমরানকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কলটা কেট দিলাম। ফুফার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তিনি সিটে হেলান দিয়ে বিরক্তিসূচক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। ফুফু ঘুমেই আছেন। নেহা চোখ বন্ধ করে কানে হেডফোন গুঁজে গান শুনছে। হঠাৎ ফ্রন্ট মিররে চোখ পড়তেই দেখলাম নিশান ভাই আমার দিকে ড্যাবড্যাব চোখে তাকিয়ে আছে। আমি তার দিকে সরাসরি আর তাকালাম না। মোবাইলটা বন্ধ করে ফেসবুকে লগ ইন করলাম । দেখলাম তুলি অনেকগুলো মেসেজ করেছে। এখন রিপ্লাই দিব। গাড়িতে বসে বসে আর কিইবা করার আছে। তাই মোবাইল সাইলেন্ট করে মেসেজ করছি। কিন্তু তাতেও আমি ঠিক বুঝতে পারছি নিশান ভাই একটু পর পর আমার দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে।

রাঙ্গামাটি আসার পর পরেই আমরা সবাই সব টুরিস্ট স্পটে ঘুরলাম। পর্যটন, শুভ লং ঝরনা, পেদা টিং টিং বনবিহারসহ সমস্ত টুরিস্ট স্পট। খাবার আমরা নিজেরাই বাসা থেকে বানিয়ে নিয়ে গিয়েছি। টোটাল সাতদিনের ঘোরাঘুরির পর ঢাকাতে ফিরে আসতে চাইলেন ফুফা। ফুফু তো আর ফুফার মতের বিরুদ্ধে কিছু করেন না। তাই তিনিও ঢাকাতে ফিরে আসবেন বলে মনস্থ করলেন। কিন্তু নিশান ভাই মাঝখান থেকে বলে বসল সে এখন যেতে পারবে না। ফুফা কারণ জানতে চাইলে বলল যে তার কয়েকজন বন্ধু এখানে বেড়াতে আসছে। তাই তাদের গাইড করার জন্য থাকতে হবে। ফুফা বেশ আপত্তি করলেন । তারপরেও যখন নিশান মানল না। তখন তিনি হাল ছেড়ে দিলেন।

ওরা চলে যাবার পর আমি পুরাই ফ্রি। তেমন কোনো কাজ নেই। হালকা একটু রান্নাবান্না করি, আর আমার গাছগুলোর পরিচর্যা করি। একদিন ছাদে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আমার গাছগুলোতে পানি দিচ্ছিলাম । তখন নিশান ভাই হুট করে এসে পেছন থেকে বলল, ‘তুই তাহলে এখন গানও গাইতে পারিস ? তো এই গানের উৎপত্তি কোথা থেকে?’

আমি ভীষণ অবাক হয়ে বললাম, ‘আমি গান কখন গাইলাম? শুধু একটু গুনগুন করছিলাম । এই তো।’

‘ওই তো যেই সেই একই কথা । বল কি চলছে তোর মনে?’ নিশান ভাই দুহাত সম্প্রসারিত করে প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকিয়ে সন্দিগ্ধ কণ্ঠে জানতে চাইল।

‘আমার মনে আবার কী চলবে?’ আমার পাল্টা প্রশ্ন।

‘সেটাই তো জানতে চাইছি।’ নির্বিকারভাবে বলল নিশান ভাই।

আমি কপট রাগ দেখিয়ে বললাম,’ বলব না তোমাকে। তোমার সাথে তো আমি কথা বলি না। মনে নেই?’

‘হুম, বেশ মনে আছে। কিন্তু এখন আমি কথা বলতে চাই।’ নিশান ভাই প্রগাঢ় কণ্ঠে বলল।

‘তুমি চাইলেই যে সব হবে এমন কি কোথাও লেখা আছে নাকি?’

‘অবশ্যই আছে। তোর সব কিছুর ব্যাপারেই আমার অধিকার আছে, থাকবে।’ তার কণ্ঠে অদৃশ্য এক অধিকারবোধ ।

আমি প্রচণ্ড অবাক হলাম। এতই অবাক যে আমি বলার জন্য কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শুধু নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলাম। মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে যাচ্ছিল তখন। বেলি ফুলের মনমাতানো ঘ্রাণ আসছেল বাতাসের ভেলায় চড়ে। এক অদ্ভুত মাদকতা কাজ করছিল আশেপাশের বাতাস জুড়ে। হয়তো মনেও ছড়িয়ে পড়ছিল সেই মাদকতা ধীরে ধীরে , চুপিসারে, খুব গোপনে!

নিশান ভাই এক পা , দু’পা করে আমার খুব কাছে এলেন। বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো করে দিচ্ছিল। খুব সুন্দর দেখাচ্ছিল তাকে। হঠাৎ আমি তার হাতের ছোঁয়া অনুভব করলাম। নিশান ভাই তার হাত দিয়ে আলতো করে আমার মুখের সামনে আসা চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিলেন । তারপর আমার দুগালে তার হাত দুটো রেখে করুণ কণ্ঠে বললেন, ‘আচ্ছা তুই কি কিছুই বুঝিস না?’

আমার দৃষ্টিতে রাজ্যের বিস্ময় । মনে মনে ভাবছি তবে কি আমার ধারণাই ঠিক? ঠিক কত সময় ওভাবেই তাকিয়ে ছিলাম জানা নেই। নিশান ভাই আবার বললেন, ‘কিছু জিনিস কি তুই নিজে থেকে বুঝে নিতে পারিস না?’

আমি বিস্ময় কাটিয়ে তৎক্ষনাত বললাম, ‘আমি না হয় বুঝি না । তুমি কি বলতে পার না?’

‘আমি বলতে পারি না। তাই তো বলছি তোকে বুঝে নিতে।’

‘আমিও তো তোমাকে একদম বুঝতে পারি না। তুমি পুরোটাই আনপ্রেডিক্টেবল।’ আমি বললাম, অভিযোগের সুরে।

‘আনপ্রেডিক্টেবল এই আমাকে প্রেডিক্টেবল করাটা কি এতটা কঠিন?’ একটা ভ্রু উঁচিয়ে প্রশ্ন করল নিশান ভাই।

‘কঠিন বা সহজ বড় বিষয় না। সুযোগ বলে একটা ব্যাপার আছে তাই না?’

হঠাৎ করেই নিশান ভাই আমাকে তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিলেন। আমি চরম বিস্ময়ে বিস্ময়াভূত! মস্তিষ্ক যেন তার চিন্তা থামিয়ে দিয়েছে। কেবল মন বলছে এটাই সঠিক। তাই আমিও আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম নিশান ভাইকে। মনের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে স্থান পেল এক অকৃত্রিম হাসির রেখা। প্রকৃতি যেন আমাদের সেই মুহূর্তটিকে বেশ ভালোভাবেই গ্রহণ করেছে । হুট করেই স্নিগ্ধ মনমাতানো বাতাসের ভেলায় চড়ে আসছে এক সুন্দর সুর, বেলি ফুলের ঘ্রাণ আর বাতাসের গুণগুণ শব্দ । যা শুধু অনুভব করা যায়। আমি করছি। হয়তো নিশান ভাইও অনুভব করছেন!

চলবে…ইন শা আল্লাহ্

আগের পর্বের লিংক:

https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/959279834502736/

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে