গল্প: ছোঁয়ার শিহরণ পর্ব -১৩

0
772

গল্প: ছোঁয়ার শিহরণ পর্ব -১৩
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

অতল আজ মহাখুশি। বহ্নি নিজ হাতে তাকে চিঠি লিখে দিয়েছে। অতল ভাবছে–এবার নিশ্চয় কাজ হবে। পরমুহূর্তেই আবার মনের মণিকোঠায় প্রশ্নেরা ছুটোছুটি করছে। ছোঁয়া কি তাকে হ্যাঁ বলবে? তাকে কি সম্মতি দিবে? তার দিকে কি তাকাবে ভালোবাসার দৃষ্টিতে?

প্রশ্নের উঁকি ঝুঁকি ক্রমাগত চলছেই অতলের হৃদয়ের গহীনে। ভালোবাসা বড্ড পোড়ায়। ভালোবাসা না পাওয়ার চিন্তা মানুষকে পাগল করে দেয় । মাঝেমাঝে কেউ কেউ হয়ে উঠে হিংস্র। কেউ কেউ দানবীয় রূপ ধারণ করে। ঠিক সেই মুহূর্তে সে পিছপা হয় না ভালোবাসার মানুষকে আঘাত দিতেও । পিছপা হয় না সেই ভালোবাসার মানুষটির জীবন নষ্ট করতেও। আবার কিছু কিছু মানুষ সমস্তটা উজাড় করে দেয় ভালোবাসার মানুষের কারণে। তাদের কাছে ভালোবাসা পবিত্র। সেই পবিত্রতার আশেপাশে নেই কোনো কলুষতা, নেই কোনো পঙ্কিলতা। আছে শুধু হৃদয় জুড়ে ভালোবাসা আর ভালোলাগার অস্তিত্ব ।

অতল দ্বিতীয় শ্রেণীর। সে দূর থেকে কষ্ট পায় ভালোবাসার মানুষের কষ্ট পাওয়াতে আবার একই সাথে খুশি হয় ভালোবাসার মানুষের আনন্দমাখা মুখ দেখে। তাই তো লোকে বলে মানুষ এই পৃথিবীর সবচাইতে বড় বিচিত্র প্রাণী । যারা ক্ষণে ক্ষণে পাল্টায়, ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদলায়।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


অতল মনে মনে খুব‌–খুব রোমাঞ্চিত । সে স্কুলের গেইটের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে করতে আকাশ পাতাল নানান চিন্তা করছে। ক্লাসে প্রবেশ করেই সে আগের মতো ছোঁয়ার তিন বেঞ্চ সামনে বসল। আজো শিহরণ তার পাশেই বসেছে। ছোঁয়া চুপচাপ বসে আছে। মাঝেমধ্যে মৃদু হাসছে। তার বান্ধবী মায়া অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে। আর ছোঁয়া তার কিছু কথার উত্তর মাথা দুলিয়ে দিচ্ছে। অতল মনে মনে একবার ভাবল। আচ্ছা ছোঁয়ার অভিধানে কি শব্দের অভাব! এত কম কথা বলে কেন মেয়েটা? একবার হ্যাঁ বলো আমায় তারপর তোমাকে তো আমি গ্যারুলাস(অতিভাষী) বানিয়ে ছাড়ব।

শিহরণ অতলের কাঁধ ঝাঁকি দিয়ে প্রশ্ন করল,’ভাবুক মশাই, স্যার লিখতে বলেছেন। আপনি কি আপনার চিন্তার রাজ্য থেকে প্রস্থান করে এ ধরায় অবতীর্ণ হবেন?’

অতল বিস্ময়ে তাকাল শিহরণের দিকে। তারপর অবিশ্বাসের সুরে বলল,’আমি যে এ ধরায় নাই দোস্ত!’

‘রাখ তোর ভাবনা তোর বুক পকেটে। স্যার দেখলে কিন্তু দারুণ ধোলাই দিবে! তখন আকাশ ফেটে হলেও তোকে এ ধরাতেই পড়তে হবে।’

কথার গুনগুন শব্দ শুনতে পেয়েই স্যার দিলো এক হুংকার। চেঁচিয়ে বলল,’কে কথা বলছে? স্ট্যান্ড আপ।’

স্যার এর হুংকার শুনে এবার সমস্ত গুনগুন শব্দ থেমে গেল। পুরো ক্লাস জুড়ে একদম পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। স্যার আবারো বললেন,’ফের কথা শুনলে একেবারে ক্লাসের বাইরে কান ধরিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখব।’

এই ধমকটা জরুরি ছিল। স্যার ক্লাসে আসলে সমস্ত মনোযোগ সেই শিক্ষকের প্রতি নিবদ্ধ করা বাঞ্ছনীয় । শিক্ষক ক্লাসে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও অযথা অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা মানে হলো শিক্ষককে হেয় করা , তাঁকে গুরুত্ব না দেয়া। যেটা নৈতিকতা পরিপন্থী । তবে এখনকার ক্লাস রুম জুড়ে দেখা যায় এক অন্যরকম চিত্র। ছাত্রছাত্রীরাও এখন শিক্ষককে সম্মান জানাতে ভুলে গেছে। আর শিক্ষকরাও সম্মান পেতে চেষ্টা করেন না। যেই মানুষটার কাছ থেকে আমরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান আহরণ করি তাকে সম্মান জানানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব । এতে মানব চরিত্রের মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ যেমন থাকে তেমনি থাকে শ্রদ্ধা করার মানসিকতা। আর সম্মান যদি আমি কাউকে নাই দিতে পারি তবে আমি নিজেও সম্মান পাওয়ার অধিকার রাখি না।

ক্লাস শেষে অতল অপেক্ষায় ছিল ছোঁয়ার জন্য। অজকে সে ক্লাস থেকে বেরুচ্ছেই না। কি যে করছে কে জানে! অতল দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে তার পা ব্যথা করছে। ইচ্ছে করছে তার ওখানেই মাদুর বিছিয়ে বসে পড়তে। কিন্তু…!

কিছুক্ষণের মধ্যেই অতল ছোঁয়াকে দেখতে পেল। তার সাথে মায়া আছে। তারা দুজন কোন একটা বিষয়ে কথা বলছে। অতল দূর থেকেই হাত নেড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ছোঁয়া আর মায়া তার কাছাকাছি আসতেই সে বলল,’ছোঁয়া একটু দাঁড়াবে, প্লিজ। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।’

ছোঁয়ার অদ্ভুত অনুভূতি হলো। সে বুঝতেই পারছে না এই পরিস্থিতি সে কীভাবে এড়াবে। সে আমতা আমতা করে বলল,’ হ্যাঁ, বলো।’

ছোঁয়ার পাশে মায়া দাঁড়িয়ে আছে। অতল পড়ে গেছে বেশ অস্বস্তির মধ্যে । তার মুখ দিয়ে শব্দ গুলো বেরই হচ্ছে না। মায়া অতলের অবস্থাটা বুঝতে পারছে। সে বুঝতে পারছে অতল কী বলতে চাইছে। তার মনে তখন একটা কথাই আসল যে খুব বড় একটা মেস(গণ্ডগোল) হতে চলেছে। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,’ ছোঁয়া , আমার তাড়া আছে রে। তুই কথা বল। আমি আসছি। কাল কথা হবে।’

ছোঁয়া অসহায় মুখ করে বলল,’একটু দাঁড়া না। একসাথেই যাব।’

মায়া বলল,’না রে। আমার সত্যিই কাজ আছে।’
এই বলে মায়া হাঁটা ধরল। অতল আর ছোঁয়া তার চলে যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল। অতল মনে মনে ভাবল,’মেয়েটা আমাকে বাঁচাল ।’

তারপর মনে মনে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বলল,’অনেক ভালো একটা বর পাও তুমি । দোয়া রইল আমার।’

ছোঁয়া এবার অতলের দিকে তাকিয়ে বলল,’অতল, তাড়াতাড়ি বলো কি বলবে?’

ছোঁয়ার মুখে নিজের নাম শুনে অতলের মনে হলো সে হার্টের একটা বিট(স্পন্দন) মিস করল। তার মনের মধ্যে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ভালোলাগার অনুভূতিদের গুঞ্জন। মধুমক্ষীরা যেন এসে ভীড় করেছে তার হৃদয়ের প্রান্তরে! সে শুনতে পাচ্ছে তাদের গুঞ্জন । খুব সূক্ষ্ম অথচ কী শ্রুতিমধুর সেই গুঞ্জন ! অতলের মনে হলো চলতে থাকুক এই গুঞ্জন আজীবন! আর সে শুনতে থাকবে সারাজীবন!

ছোঁয়া পুনরায় বলল,’কী বলবে বলছ না কেন? ভাবার জন্য বাসায় কি সময়ের অভাব পড়ে যায় যে এখানে আমার সামনে দাঁড়িয়েও ভাবছ?’

সম্বিৎ ফিরে পেতেই অতল ভ্যাবাচ্যাকা খেলো।সে আমতা আমতা করে বলল,’ছোঁয়া, আমার আসলে তোমাকে খুব ভালো লাগে।’

বলার সাথে সাথেই অতলের মনে হলো তার মতো গর্দভ বুঝি এ ধরায় আর নেই । কেমন একটা কথা সে বলে ফেলল । ভালো লাগা একটা বলার কথা হলো। ভালো তো যে কাউকেই লাগতে পারে। কি পারে না? মনে মনে আবার নিজেকে সে প্রশ্ন করল।

ছোঁয়ার বুকে হঠাৎ ধক করে উঠল। সে বুঝতে পারছে অতল কী বলতে চাইছে। কিন্তু তার পক্ষে প্রস্তাবে সায় দেয়া কখনোই সম্ভব নয়। আবার সরাসরি কীভাবে না বলবে সেটাও একটা কঠিনসাধ্য ব্যাপার। সে বলল,’ভালো তো লাগতেই পারে এখানে বলার কি আছে?’

অতল ভেবে পাচ্ছে না সে ছোঁয়াকে কীভাবে বলবে তার ভালোবাসার কথা। কেমন যেন কথাগুলো গলা পর্যন্ত এসে আটকে যাচ্ছে। অতল তো বেশ ভালোই কথা বলতে পারে । তবে কেন এমন হচ্ছে ছোঁয়ার সামনে তা অতলের জানা নেই। অতল আবারো কিছু বলার জন্য মুখ খুলল। বলল,’ছোঁয়া! আই…।’

এরপর আরো কিছুক্ষণের নিস্তব্ধতা। ছোঁয়ার অবস্থা ভালো নয়। সে বুঝতে পারছে অতল কী বলতে চাইছে। কিন্তু ছোঁয়া তা শুনতে চায় না। তাই সে বলল,’তুমি না হয় পরে বলো। তোমার কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ কোনো কথা বলে মনে হচ্ছে না আমার। আমি যাচ্ছি।’ এই বলে ছোঁয়া দু এক কদম এগিয়ে গেল।

অতল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল । তারপর একটু দৌঁড়ে গিয়ে ছোঁয়ার সামনে গিয়ে দাঁড়াল । আর পকেট থেকে বহ্নির লিখে দেওয়া চিঠিটা বের করল। তারপর ছোঁয়াকে বলল,’আমি যা বলতে চাই তা এই চিঠিতে আছে। তুমি পড়ে তোমার মতামত জানাবে, প্লিজ।’

ছোঁয়া বিস্ফারিত চোখে তাকাল অতলের দিকে। অতল চোখের ইশারায় বলল চিঠিটা নেবার জন্য। তাই ছোঁয়া কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠিটা অতলের কাছ থেকে নিয়ে ব্যাগে রাখল । অতল অনুনয়ের সুরে বলল,’ছোঁয়া, চিঠিটা পড়বে প্লিজ । আমি উত্তরের অপেক্ষায় থাকব।’

অতলের এই কথা শুনে ছোঁয়ার অবস্থা আরো নাস্তানাবুদ হয়ে গেল। সে কী বলবে ? কীভাবে বলবে? কিছুই বুঝতে পারছে না সে। কেমন করে যে কী হবে? তার উপর কেমন একটা বাজে পরিস্থিতি । দুইবন্ধুর একজন তাকে ভালোবাসে অপরজনকে সে ভালোবাসে। অথচ সে ভালোবাসে না। এখন ছোঁয়া কী করবে? ছোঁয়া সত্যিই আর ভাবতে পারছে না!

শিহরণ তখন স্কুলের মেইন দরজা দিয়ে বের হচ্ছিল। তার লাইব্রেরিতে কাজ ছিল। তাই আজ বেরুতে দেরি হয়ে গেল। তাছাড়া ছোঁয়াকে বলেছিল লাইব্রেরিতে তার সাথে দেখা করার জন্য । কিন্তু সে যায়নি। তার প্রচণ্ড রাগ হয়েছিল ছোঁয়ার উপর। তার উপর অতল আর ছোঁয়াকে একসাথে দেখে তার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সে বুঝতে পারছে না কী করবে। এমন কেন হচ্ছে তার সাথে ? কেন? শিহরণ এই অনুভূতির সাথে পরিচিত নয়। কেমন মাতাল করা অনুভূতি! ইচ্ছে তার সমস্ত কিছু ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিতে। ইচ্ছে করছে সব কিছু ভেঙ্গে চুরমার করে দিতে। প্রচণ্ড রাগে শিহরণের কপালের শিরাগুলো দপদপ করছে। তার হাত আপনা আপনি মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো ।

চলবে…..ইন শা আল্লাহ্

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here