উত্তরাধিকার (১৬-শেষপর্ব)

0
1634

উত্তরাধিকার (১৬-শেষপর্ব)
লেখাঃ-মোর্শেদা রুবি
***********************
প্রান্তিক আজ দেশে ফিরেছে।
ওর ওয়ালিমার যাবতীয় আয়োজন প্রায় সম্পন্ন।আর এসব একহাতে করতে গিয়ে শাজিয়ার নাভিশ্বাস উঠছে।তবু এই কষ্টের মধ্যে একধরনের আনন্দ মিশে আছে।আনন্দটাতে আরো বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে তার আদরের মেয়ে প্রিয়ন্তীর ফোনটা।
গতকালই ফোন করেছিলো সে।
এই প্রথম প্রিয়ন্তীর কন্ঠে এতো উচ্ছাস শুনেছেন শাজিয়া।ও জানিয়েছে,ফারিক এখন আগের চেয়ে অনেক সুস্থ।ওকে মেলবোর্নের নামকরা স্কিন স্পেশালিষ্ট দেখানো হয়েছে।চাঁদের কলঙ্কগুলো নাকি ধীরে ধীরে মুছতে শুরু করেছে!
প্রিয়ন্তী আরো জানালো,ফারিক নাকি অসম্ভব বদলে গেছে।সে এখন নিয়মিত নামাজ পড়ে,প্রিয়ন্তী ঠিকমতো পড়ে না বলে রাগ করে!
ও বলে,এই অসুখটা আমাকে জানোয়ার থেকে মানুষ বানিয়েছে,সত্যমিথ্যার পার্থক্য করতে শিখিয়েছে।আপন পরকেও চিনে নিয়েছি।আপন রবের মহিমা বোঝার তৌফিক হয়েছে।
জীবনে আর ভুলের পথে হাঁটতে চাইনা!
সব শুনে শাজিয়ার মনে আনন্দের জোয়ার।
সত্যি, পরম প্রভু মহান আল্লাহতাবারাকাল
্লাহু তা’লার দরবারে নিজেকে সঁপে দেবার মতো শান্তি জীবনে আর দ্বিতীয়টি নেই!
প্রান্তিক এবার ওয়ালিমা শেষে বউ নিয়ে মালয়েশিয়া ফিরবে বলে সেরকমভাবেই সব কিছু গোছানো হচ্ছে !
ওয়ালিমার আর মাত্র চারদিন বাকী।
তবু প্রান্তিকের মন মানছেনা।
জান্নাতের সাথে দেখা হওয়া দরকার।
যেমন ভাবা তেমন কাজ,জান্নাতকে কাঁটাবন বুক মার্কেটে আসতে বললো,বই কিনবে বলে।
অবশেষে জান্নাত এলো!
প্রান্তিক কাঁচঘেরা দোকানের ভেতর থেকে ওকে রিক্সা থেকে নামতে দেখে তাকিয়ে রইলো!
তাকিয়ে থাকতে অসম্ভব ভালো লাগছে ওর।
কেন এতো ভালো লাগছে ও নিজেও জানেনা!
সম্ভবতঃ কখনো কোনো মেয়ের দিকে না তাকানোর এটা নগদ পুরস্কার।
চুরি করে নজরমারা আর একান্ত নিজের হালাল জিনিসের প্রতি দৃষ্টিপাত করার পরিতৃপ্তিই অন্যরকম।
বুকষ্টলের নামটা ওকে আগেই বলা ছিলো।জান্নাতকে ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের এপাশ থেকে দেখতে বেশ মায়াবী লাগছে।ওকে দরোজা খুলে ঢুকতে দেখেই প্রান্তিক পাঁই করে ঘুরে দাঁড়ালো।খুব মনোযোগ দিয়ে বই দেখছে।জান্নাত চারপাশ তাকিয়ে ওকে খুজছে।
দেখেই এগিয়ে এসে সালাম দিলো!প্রান্তিক মুচকি হেসে সালামের জবাব দিলো!তারপর কিছু কুশল বিনিময়ের পর প্রান্তিক ওর পছন্দের কিছু বই কিনলো!
জান্নাতের কাছে শাইখ আতিকউল্লাহর লেখা নাকি খুব ভালো লাগে!
শুনে প্রান্তিক তাঁর কয়েকটা বই কিনলো!
জান্নাতের জন্য সুন্দর বোরকাও কিনে ফেললো!
জান্নাত অবশ্য বারবার আপত্তি করছিলো!
‘বিয়েতে তো সব দিচ্ছেনই!
আবার আলাদা করে বোরকা কেন কিনছেন ?
বই না দেবেন বললেন?”
প্রান্তিক মৃদু ধমকের সুরে বললো-“বই তো কিনবোই,বই সাথে করে নিয়ে ধীরে সুস্থে পড়া যাবে!আর বোরকাটা তুমি এখন থেকেই পড়বে।দুটো কি এক হলো?”
কেনাকাটা শেষে দুজনে আইসক্রিম পার্লারে ঢুকে আইসক্রিম খেলো!
প্রান্তিক নিজের জীবনের কিছু পরিকল্পনার কথা ওকে জানালো!
‘ঘর ভর্তি বাচ্চাকাচ্চা চাই,উম্মতের পরিমাণ বাড়াতে হবে!’জান্নাত যখন লজ্জায় লাল নীল বেগুনী হচ্ছিলো তখন প্রান্তিকের শেষ কথাটা ওকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচালো!
-“আমাদের সবগুলো ছেলেমেয়েকে আলেম বানাবো!কারন আলিমের মর্যাদা আবেদের চেয়ে অনেক বেশী!”
ঘোরাফেরা শেষে জান্নাতকে ওর বাড়ীর কাছে নামিয়ে দিয়ে প্রান্তিক বাড়ী ফিরলো!



রাফিজ একমনে গাড়ী চালাচ্ছে!
নাযিয়াত নিঃশব্দে বাইরে তাকিয়ে আছে!
রাফিজ মাঝেমধ্যেই ওর দিকে তাকাচ্ছে।ডান পাশ থেকে ওর হিজাব নিকাব করা মুখের একপাশ দেখা যাচ্ছে।
স্কুল থেকে বাসার দুরত্ব বেশী নয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওরা পৌঁছে গেলো!
নাযিয়াত নেমে যাবার আগমুহূর্তে রাফিজের দিকে তাকিয়ে বললো-“কই,ভেতরে আসুন।
রাফিজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো-
-“যাক্,অবশেষে ডাকলে! আমি তো ভেবেছি তুমি আমাকে গেট থেকেই বিদায় দিয়ে দেবে…..চলো!”
গেট লক করে নাযিয়াতের সাথে ওদের বাড়ীতে ঢুকলো!
রাফিজকে দেখে ওর শ্বাশুড়ী অত্যন্ত খুশি হলো।রাফিজ তাকে সালাম দিয়ে কথা বলার ফাঁকে নাযিয়াত ভেতরে চলে গেলো!
কিছুক্ষণের মধ্যেই এক ফুটফুটে শিশুকে নিয়ে নাযিয়াতের পুনরাগমন ঘটলো।
রাফিজের বুকের ভেতর যেন হাতুড়ীর ঘাই পড়ল !ও নিজের জায়গাতেই স্থির হয়ে গেলো যখন ‘রণ’কে দেখলো।তার পাশাপাশি নাযিয়াতকে ঘরোয়া পোশাকে দেখলো।
অপূর্ব দেখাচ্ছে ওকে রাফিজের চোখে!দুটো অভূতপূর্ব দৃশ্য রাফিজকে ভাবাবেগে কাবু করে ফেললো প্রায়।ওর চোখ ছলছল করে উঠলো!রাফিজ ‘রণ’ কে দেখলো!
কি ছোট্ট মায়াবী মিষ্টি একটা মুখ।
নাযিয়াত কাছে এসে ‘রণ’কে ওর কোলে তুলে দিলো।রণ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।রাফিজের চোখ ভর্তি পানি !
বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে বললো-
“ও কি কথা বলতে পারে নাযিয়াত ?”
নাযিয়াত হেসে বললো-
-“নাহ্,কেবল বাবা আর মা এদুটো শব্দ কোনোরকম বলতে পারে।মাত্র তো সাত মাস বয়স।কথা আরো পরে বলবে!”(বলে নাযিয়াত ‘রণ’র দিকে তাকিয়ে বললো)
-“আব্বু,এটা বাবা! বলো বাবা…বলো!!
‘রণ’ আধো আধো বুলিতে বলে উঠলো–“বাব্বা…বাব্বা…বাবাবা!”
রাফিজ ‘রণ’কে বুকে জড়িয়ে ধরলো!ওর চোখের কোল বেয়ে পানি নেমে এলো! নাযিয়াতের মা আঁচলে চোখ মুছে ভেতরে চলে গেলেন নাস্তার ব্যবস্থা করতে।
নাযিয়াত মৃদু স্বরে বললো-“আম্মা কেমন আছেন ?”
রাফিজ ‘রণ’র মাথায় কপালে গালে চুমু দিচ্ছে বারবার!
–“তোমার কথা খুব বলেন! আর দুঃখ করেন।এখন আফসোস করাই তার একমাত্র কাজ!”
শুনে নাযিয়াত মুখ নামিয়ে নিলো।
‘রণ’ বিছানায় পড়ে থাকা একটা খেলনা দেখে সেটা নেবার জন্য ঝুঁকে গেলো!রাফিজ ‘রণ’কে আস্তে করে বিছানায় বসিয়ে ছোট্ট খেলনাটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে সোজা হলো।
-“একটু বসুন…আমি এক্ষুণি আসছি!”বলে নাযিয়াত দরোজার দিকে পা বাড়াতেই রাফিজ ডাকলো-“নায্…এক মিনিট!”
নাযিয়াত ঘাড় ফিরিয়ে তাকাতেই রাফিজ একপা বাড়িয়ে ওর ডানবাহু চেপে ধরলো! তারপর ওকে নিজের দিকে টানলো।
নাযিয়াত কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর ঠাঁই হলো রাফিজের বুকে!
রাফিজ সর্বশক্তিতে ওকে দুহাতে জড়িয়ে ধরেছে !যেন সে এই ক্ষণটির অপেক্ষাতেই ছিলো!ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো-
-“কিভাবে পারলে আমাকে ছেড়ে এতোদিন থাকতে?বলো…আমাকে কি একবারো দেখতে ইচ্ছে করেনি,কথা বলতে ইচ্ছে করেনি?আমার ফোন নম্বর তো তুমি জানতে,একটা ফোনও তো করতে পারতে!”
নাযিয়াত রাফিজের বুকে মুখ গুঁজে বললো-
-“অনেকবার চেয়েছি কিন্তু সাহস পাইনি,ভেবেছি….রাফিজ দুহাতে ওর মুখ তুলে ধরে ওর কথা থামিয়ে দিয়ে বললো-
–“অনেক কষ্ট দিয়েছো আমাকে।জানো,এতোদিন বেঁচেও মরে ছিলাম!”
রাফিজ মুখ নামাতে গেলে নাযিয়াত মৃদু ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বললো-
–“আম্মা,নাস্তা নিয়ে আসছে !”
রাফিজ নাযিয়াতকে ছেড়ে রণ’র দিকে মন দিলো!-“আমার বাবাটা কি করে?”বলে রাফিজ পরম যত্নে রণকে কোলে তুলে নিলো!

রাতে খাবার টেবিলে রাফিজ বেলা চৌধুরীকে জানালো সে আগামীকাল নাযিয়াতকে বাড়ী আনতে যাচ্ছে।
বেলা চৌধুরী অবাক বিস্ময় বললেন-“মানে?কোত্থেকে?ও কোথায় তুই জানিস?”
-“আমি ওদের নতুন বাসার সন্ধান পেয়েছি!”রাফিজ সংক্ষেপে জানালো।
বেলা চৌধুরী ছটফটিয়ে উঠে বললো-“তুই একা ওকে আনতে যাবি,আমাকে নিবি না?”
–“তুমি যাবে?”
বেলা অভিমানাহত স্বরে বললো-“দোষটা তো আমিই করেছিলাম ওর সাথে।আমারই তো যাওয়া উচিত।আচ্ছা,ওর তো বাবু হবার কথা ছিলো!কি হয়েছে?আমার নাতী না নাতনী হয়েছে?”ব্যগ্র কন্ঠে জানতে চাইলেন বেলা!
রাফিজ স্বাভাবিক সুরে বললো-“নাতি/
নাতনী না হলে বুঝি তুমি নাযিয়াতকে আনতে যাবেনা?তোমার শুধু নাতি নাতনীই চাই??আমার সুখটা তোমার কাছে কোনো ফ্যাক্ট না?”
-“তুই এভাবে কথা বলছিস কেন?আমি কি বলেছি যে ফ্যাক্ট না বরং আমি তো মনকে বুঝিয়েছি,এবার আর নাতি নাতনীর জন্য আমি নাযিয়াতকে কষ্ট দেবোনা।ও খুব ভালো মেয়ে!আল্লাহ আমার ভাগ্যে নাতি নাতনী না রাখলে নাই! সম্পত্তি সব চ্যারিটি ফান্ডে দান করে দেবো!”
রাফিজ আর কিছু বললো না।

পরদিন বেলা চৌধুরী সহ রাফিজ নাযিয়াতদের বাসায় এলো!
নাযিয়াত এসে সালাম দিতেই বেলা চৌধুরী ওকে জড়িয়ে ধরে ক্ষমা চাইলেন।দুহাতে ওর মুখ ধরে কপালে চুমু খেলেন।
এমন সময় আধো সুরের “দাদাদাদাদা….”শুনে চমকে তাকিয়ে দেখলেন রাফিজের কোলে একটা ফুটফুটে বাচ্চা।রাফিজই রণর কানের কাছে মুখ রেখে দাদা বলতে শেখাচ্ছিলো।
বেলা বাকরুদ্ধ হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলেন।তার মনে হচ্ছে এক ঝটকায় তার বয়স ত্রিশ বছর কমে গেছে।কারন তিনি স্বচক্ষে তার ছোট্ট রাফিজকে দেখতে পাচ্ছেন।ঠিক এভাবেই একদিন রাফিজকে কোলে ণিয়ে ওর বাবা দাঁড়িয়ে ছিলো।
তারপর একদিন…রাফিজকে বেলার কোলে দিয়ে মানুষটা চিরতরে হারিয়ে গেলো!
বেলার চোখ ভিজে উঠলো।দুহাত বাড়িয়ে রণ কে কোলে নিয়ে আবেগে কেঁদে ফেললেন তিনি আপন উত্তরাধিকারীকে দেখে!
রাফিজ মৃদুস্বরে বললো-“পুরো সম্পত্তির সব চ্যরিটি ফান্ডে দেবার আগে তোমার নাতির চকলেটের পয়সাটা রেখে নিও!”
বেলা মুখ ঝামটে বলে উঠলো-“চ্যারিটি ফান্ডে কেন দিতে যাবো? আমি কি আঁটকুড়ে নাকি?আমার ওয়ারিশ আছে না?”
এমন সময় নাযিয়াতের মা আর ছোট বোনেরা প্রবেশ করলো!বেলা তাদের হাত ধরে আন্তরিক ভাবে ক্ষমা চাইলেন।
বেলাশেষে বেলাচৌধুরী তার বহুকাঙ্খিত ওয়ারিশ নিয়ে ঘরে ফিরলেন।



রণ কে বেলার কাছ থেকে নেয়াই যাচ্ছেনা।
বাড়ী আসার পর থেকে ওকে নিয়ে সেই যে তিনি ঘরে ঢুকেছেন বেরোনোর আর নাম নেই! নাযিয়াত দুবার গিয়ে জিজ্ঞেস করে এসেছে রণ খাবে কিনা।
এদিকে রণও যেন বুঝে ফেলেছে এটা তার নিজের বাড়ী,নিজের ঘর।সে স্বচ্ছন্দে বেলা চৌধুরীর ঘাড়ে মাথায় পা রাখছে,উঠছে,নামছে…. আবার নরম বিছানায় গড়িয়ে পড়ছে আর বেলা চৌধুরী শিশুদের মতো হাসছেন ওর কান্ড দেখে।
নাযিয়াত নিরবে দুই শিশুর কান্ড দেখলো খানিকক্ষণ।
তারপর পেছন থেকে রাফিজের কথা শুনে ঘাড় ফেরালো-“চলো তোমার ঘরে চলো!”
রাফিজের ‘তোমার ঘরে’ শব্দটা নাযিয়াতের বুকে বাজলো!
রাফিজ ওকে নিয়ে ঘরে ঢুকে দরোজা আটকে দিলো।তারপর নাযিয়াতকে হাত ধরে নিজের মুখোমুখি বসালো।
কাতর স্বরে বললো-
-“তোমার কাছে ক্ষমা চাইবার ভাষা আমি খুঁজে পাচ্ছিনা।অন্যায়টা অনেক বড় হয়ে গেছে নায্।
*নতুন নতুন রোমান্টিক গল্প পেতে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজ: “নিঃস্বার্থ ভালোবাসা”*

আমি বুঝতে পারিনি ব্যপারটা এদিকে টার্ণ করবে।তারপরে তোমাকে পাগলের মতো খুঁজেছি।তোমার চিঠির মর্ম উদ্ধার করতেই লেগেছে একমাসেরও বেশী।তারপর মা’কে নিয়ে বিক্রমপুর গেলাম সেখানেও কাউকে পেলাম না।তারপর তুমি হারিয়ে গেলে আমার জীবন থেকে।কত যে খুঁজেছি তোমায়।”
-“আমাকে ক্ষমা করুন,আমি আসলে আপনাকে ফোন করতে গিয়েও আম্মার সাথে দেয়া ওয়াদার কারনে ফোন করিনি!”
-“অন্যায় ওয়াদাও কি রাখতে হয়?ভবিষ্যতে আমি তোমার জীবন থেকে সরে যেতে চাইলেই তুমি দেবে? আমাকে আটকাবে না?এ তোমার কেমন ভালোবাসা নায্?আজ যদি আমি মরে যেতাম…..?”
নাযিয়াত দ্রুত নিজের ডান হাত রাফিজের ঠোঁটের উপর রাখলো।তারপর মুচকি হেসে দুহাতে নিজের কান ধরলো-“স্যরি…আর এমন হবেনা,ইনশাআল্লাহ্ !”
রাফিজ ওর হাত নিজের মুঠোয় টেনে নিয়ে বললো-“শাস্তি পাওনা হয়েছে তোমার।তবে সেটা একদিনে দেবোনা।ধীরে ধীরে প্রতিদিন দেবো!”
-“আচ্ছা, দেবেন নাহয় !তবে একটা কথা না বলে পারছিনা,দাঁড়ীতে কিন্তু আপনাকে বেশ লাগছে।সেইরকম!”
-‘”আর তোমাকে কেমন লাগছে জানো!কাছে এসো কানে কানে বলি!”
-“জ্বী,না ধন্যবাদ।আ’ম কোয়াইট কমফোর্টেবল হিয়ার!”
রাফিজ গম্ভীর সুরে বললো-‘”পঁচিশেও তুমি সুন্দর ছিলে কিন্তু সাতাশে তুমি কি হয়েছো, তা তুমি নিজেও জানো না।বিয়ের পরপর তোমার রুগ্ন স্বাস্হ্যের জন্য শাড়ী পড়লে মনে হতো শাড়ীটা হ্যাঙ্গারে ঝুলছে।আর এখন মনে হয়…..!”
নাযিয়াত ঝট করে উঠে দাঁড়াতে গেলে রাফিজ ওর হাত ধরে টান দিয়ে ওকে নিজের কোলে বসিয়ে বললো-“বেলা চৌধুরীর সম্পত্তিগুলো চ্যারিটি ফান্ডে না দেবার জন্য কমপক্ষে এক হালি উত্তরাধিকারী দরকার।একজনে খেয়ে শেষ করতে পারবেনা।বাকীগুলোকে আনতে হবেনা?”
নাযিয়াত রাফিজের ঘাড়ে মুখ লুকালো!
★★★
কয়েক বছর পরের কথা……
জেদ্দা বিমান বন্দরে রাফিজ যখন ইহরামের কাপড় পড়ে নামলো তখন দেখা গেলো ওর ঘাড়ের উপর একটা বাচ্চা ওর দুকান ধরে আছে।আরেকটু ছোটটা ওর গলা জড়িয়ে ধরে বুকের সাথে লেপ্টে আছে।ওদিকে নাযিয়াতের হাত ধরে হাঁটছে ওদের দ্বিতীয় সন্তান নাশরাহ চৌধুরী।এই একটাই মেয়ে নাযিয়াতের।বাকী তিনজন পুত্র।
আর তাদের সবার পেছনে লাঠি হাতে চলেছেন বেলা চৌধুরী আর তার হাত ধরে হাঁটছে তাঁর বড় নাতি “রণবীর চৌধুরী”!
রাফিজ যখন তার বরকতময় পরিবার নিয়ে এগোচ্ছিলো তখন মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলো প্রান্তিকের সাথে।
প্রান্তিক রাফিজকে দেখেই সশব্দে সালাম দিয়ে বললো-“ভাই,কোলাকুলি করার তো জায়গা নাই,বুক পিঠ সবতো দখলদার বাহিনীর কবলে।
হাহাহা করে হেসে উঠলো দুজন।
প্রান্তিক ইশারায় তার নিজের বাচ্চাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো!এক ছেলে,দুই মেয়ে!
জান্নাত এগিয়ে গিয়ে নাযিয়াতের সাথে মুসাফাহা করলো।
প্রান্তিক আজ ওমরা শেষে মালয়েশিয়া ফিরে যাচ্ছে।সে এখন সপরিবারে সেখানেই স্থায়ী হয়েছে।



ফারিক এখন পুরোদস্তর মুসলমান।কিছুদিন আগেই সে অষ্ট্রেলিয়ার মুসলিম কমিউনিটির চীফ এ্যাডভাইজরও নির্বাচিত হয়েছে।
তার নিজের এখন দুই সন্তান। দুটোই কন্যা।সে অকপটে প্রিয়ন্তীকে বলে,সারাজীবন মেয়েদের অমর্যাদা করেছি তো,আল্লাহ আমাকে দু’ দুটো মেয়ের বাপ বানিয়ে দিয়েছে।
আমাদের প্রথম সন্তান নষ্ট হয়ে গিয়েছে,ওটাও আমাদের জন্য কল্যানকরই ছিলো। কারন ওটা ছিলো আমাদের বিবাহপূর্ব জেনার সন্তান।
আর যেনা হারাম।
আলহামদুলিল্লাহ্।
দুটো পাক্ কন্যা সন্তান তিনি আমাকে দান করেছেন!গুনাহ মাফের কতবড় সুব্যবস্থা মা’বুদ আমাকে করে দিয়েছে।কন্যা সন্তান উপযুক্তরূপে লালন পালন করে তাদের যথাসময়ে পাত্রস্থ করতে পারলে সেই ব্যাক্তির জন্য জান্ন্তের সুসংবাদ রয়েছে!
অথচ দেখো,পুত্র সন্তান পালনকারীর জন্য এই সুসংবাদটা নাই।”
প্রিয়ন্তী ওর কথাশুনে মুচকি হেসেছে।
সব কিছুতে রাব্বুল আলামীনের অপূর্ব হিকমা রয়েছে।
আমরা মহামূর্খের দল তার কতটুকুই বা বুঝি!”
সমাপ্ত
▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬▬

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে