অব্যক্ত

0
32

অনামিকা একটু অস্বস্তিতে আছে। শাড়িটা পরা উচিৎ হয়নি। কড়া লাল রঙের শাড়ি। সবার চোখে লাগে। অনামিকা বিরক্ত হয়। হাসপাতালে কি মানুষের সেজেগুজে আসতে নিষেধ আছে?
এমনভাবে সবাই ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকবে কেন? অনামিকার গা ঘিন ঘিন করে উঠলো। সে অবশ্য বেশি সাজেনি। হালকা সাজ বলে এটাকে। কপালে টিপ, হাতে চুড়ি। অস্বস্তি এগুলো নিয়ে নয়, শাড়িটা নিয়ে। এমন কড়কড়ে রঙের শাড়ি পরা মোটেও উচিৎ হয়নি তার, তাও আবার হাসপাতালে আসার সময়। এমন কোনো রঙের শাড়ি পরা উচিৎ ছিলো, যেটা হাসপাতালের দুঃখ দুঃখ ভাবের সাথে খাপ খেয়ে যায়! সেটা কি রঙ?
অনামিকা ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে আসে। পা কেটেছে ওর এক বন্ধুর। কলেজ লাইফের বন্ধু। দেখতে এসেছে, বন্ধু ভীষণ খুশি। কাটা পা কে পাত্তা না দিয়ে দিব্যি হাসিমুখে চিৎকার করছে, ভীষণ খুশি হয়েছে সে তাকে দেখে, এটা নানানভাবে প্রকাশ করার চেষ্টা করছে। অবশ্য কলেজ লাইফে এই বন্ধুটার সাথে অনামিকার কখনো ‘হাই’, ‘হ্যালো’ ছাড়া অন্য কোনো কথা হয়নি। অনামিকা কখনো ভাবেনি এই বন্ধুর সাথে তার কখনো দেখা হবে আর, কথা হবে, বন্ধু তাকে দেখামাত্রই চিনতে পারবে এটাও কখনো কল্পনা করেনি সে। বন্ধুর পা কাটার খবর দিয়েছে রুদ্র। সকালেই ফোন করে চিৎকার করলো,
‘দোস্ত…’
অনামিকা মুখে প্রচন্ড বিরক্তি ধরে রেখে মোবাইল কান থেকে সামান্য দুরে নিয়ে গিয়ে বলে,
‘চুপ। একদম আস্তে। একদম আস্তে আস্তে কথা বলবি.. আর একবার যদি জোরে চিৎকার করে দোস্ত বলিস, দেখা হইলেই তোর কান ছিঁইড়া নিমু আমি।’
রুদ্র ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়, তারপর খুব সাবধানে আস্তে আস্তে কথা বলার চেষ্টা করে,
‘দোস্ত.. তোর “ঝাপসা”র কথা মনে আছে?’
‘কোন ঝাপসা?’
‘আরে ঐ যে, ঝাপসা কবির।’
অনামিকার হুট করে মনে পড়লো কবিরের কথা। ওকে কলেজ লাইফে সবাই ঝাপসা কবির নামেই ডাকতো। ভোলা ভোলা চেহারা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। চুল থাকতো পরিপাটি, স্টাইলের ধারেকাছেও না। কথিত আছে, কোনো এক অদ্ভুত কারণবশত কোনো ক্যামেরায়ই তার ছবি পরিষ্কার আসতো না। ডিএসএলআর’ও নাহ। এজন্যেই নামটা। অনামিকা জিজ্ঞেস করলো,
‘হ্যাঁ। মনে পড়ছে। কি হইছে ওর?’
‘এ্যাক্সিডেন্ট করছে। পা কেটে ছেঁটে উরাধুরা অবস্থা। যাবি দেখতে? আমি দেখে আসছি কিছুক্ষণ আগে। তোর ফোন অফ ছিলো, তখন বলতে পারিনাই। একবার ভাবলাম তোর বাসায় যাই, পরে ভাবি না থাক। ফোনে ট্রাই করি। তুই দেখে আয়, খুশি হবে দেখলে। তোর বাসা থেকে কাছেই।’
বন্ধু যে ওয়ার্ডে আছে, সে ওয়ার্ড থেকে অনামিকা বের হয়ে আসলো। ডাক্তার রাউন্ডে আসছে, ওয়ার্ডে রোগীর পাশে একজনের বেশি থাকতে দিচ্ছেনা।
অনামিকা নিচে নেমে আসলো। এখানে বসার জায়গা আছে প্রচুর, অনেক লোকজন বসে আছে। কেউ অপেক্ষা করছে, বিশ্রাম নিচ্ছে, সময় কাটাচ্ছে। টিভিও আছে সামনে। অনামিকা গিয়ে খালি একটা চেয়ারে বসলো, কাঁধ থেকে ব্যাগ নামিয়ে রাখলো পাশের চেয়ারে।
অনামিকার ডানপাশে যে মহিলা বসে আছেন, তার বাচ্চাটা ভয়ংকর দুষ্টু। অনামিকার ভীষণ আদর করতে ইচ্ছে হলো বাচ্চাটাকে। কিন্তু বাচ্চাটা এক জায়গায় স্থির থাকছেনা। কখনো শক্ত চেয়ার ধরে টানছে, কখনো মায়ের আঁচল ধরে টানছে.. কখনো আশেপাশের ব্যস্ত মানুষের শার্টের হাতা ধরে টানছে। অনামিকার হাসি পেলো। মাকে দেখা গেলো, বিব্রত মুখে বাচ্চাকে সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। অনামিকা বামপাশে তাকালো। তার থেকে দু’চেয়ার পর একটা অফিস ব্যাগ রাখা আছে পাশের চেয়ারে। চেয়ার পেছনে রেখে সামনে দাঁড়িয়ে ওদিক ফিরে কারো সাথে যিনি প্রচন্ড মনোযোগ দিয়ে কথা বলছেন, ব্যাগটা কি তার?
মানুষটাকে ভীষন চেনা মনে হচ্ছে, পেছন থেকে। আজকাল এমন মনে হচ্ছে খুব। মাঝে মাঝে রাস্তায় বের হলে, রাস্তায় হাঁটা প্রত্যেকটা মানুষকে ভীষণ পরিচিত মনে হয় ওর। হয়তো চুলের স্টাইলটা চেনা লাগে, টাই চেনা মনে হয়। চোখ, দৃষ্টি, হাঁটা, কথা বলা, হাই তোলা, সিগেরেট খাওয়া সব চেনা মনে হয়। যেন অনেক আগে কোথাও দেখেছিলো সে, কথা বলেছিলো। চেনা কাউকে চিনতে না পারাটা রোগ, এটাও কোনো মানসিক রোগ টোগ নয়তো! উল্টো কোনো রোগ!
অনামিকা কালো রঙের অফিস ব্যাগ থেকে চোখ সরাতে পারেনা। কালো অফিস ব্যাগের উপরে একটা ডায়েরী রাখা আছে, নীল রঙের ডায়েরী। অনামিকা নীল রঙটা থেকে চোখ ফিরিয়ে আনলো। সময় কাটানোর জন্যে কিছু একটা করা দরকার। নিজের ব্যাগ খুলে একটা ডায়েরী বের করলো সে। ঐ নীল রঙের ডায়েরীটা দেখে ডায়েরী পড়তে ইচ্ছে করছে খুব। এটা নীল নয়, কালো রঙের কভার, ডায়েরীর উপরে সাদা রঙের ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরে স্পষ্ট করে লেখা, “অব্যক্ত!” ওরই লেখা। ডায়েরীটা একমুহূর্তের জন্যেও হাতছাড়া করেনা সে। সবসময় ব্যাগের ভেতরে থাকে। ডায়েরীর পাতা উল্টালো সে। ছোট ছেলে একটা এসে সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে অনামিকাকে উদ্দেশ্য করে হাত উঁচু করে ডাকলো,
‘অনামিকা আন্টি..’
অনামিকা ডায়েরীর পাতা থেকে চোখ তুলে তাকালো, ছেলেটা কবিরের ভাগ্নে। ডাকছে কেন?
ছেলেটা কাঁদছে। চোখে জল। এখানে আসছে পর্যন্ত ছেলেটিকে কাঁদতেই দেখেছে শুধু। তবুও অনামিকার বুকটা ধক করে কেঁপে উঠলো। হাসপাতালে কান্নাকাটি স্বাভাবিক। এদিক ওদিক কান্নার আওয়াজ আসবে, হা হুতাশ করবে কেউ.. অথচ এই জায়গায় কেউ কাঁদতে দেখলে সবচেয়ে বেশি বুকে এসে লাগে কান্নাটা। এই বুঝি কেউ কাউকে হারিয়ে ফেললো চিরজীবনের জন্যে।
অনামিকা ছেলেটার দিকে হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকিয়ে ব্যাগের উপরে ডায়েরীটা রেখে ব্যাগটা চেয়ারে রেখে এগোয় সামনে, সিঁড়ির কাছে। অনামিকা যখন সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ক্রন্দনরত ছেলেটার সাথে কথা বলছে, তখন পেছনে একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে গেলো। অনামিকার ডানপাশের সেই “বাচ্চা ভয়ংকর” অনামিকার কালো রঙের ডায়েরী আর বামপাশের চেয়ারে রাখা অফিস ব্যাগটা টেনে নিয়ে আসলো। বাচ্চার মায়ের খেয়াল ছিলোনা, খেয়াল হতেই বাচ্চাকে ধমকিয়ে ব্যাগটা আগের জায়গায় রেখে আসলেন তিনি এবং ছোট্ট একটা ভুল করে এলেন। চেয়ার থেকে নিচে পড়ে যাওয়া নীল রঙের ডায়েরীটা অনামিকার ব্যাগের উপরে রাখলেন, কালো রঙের ডায়েরীটা রাখলেন ঐ কালো রঙের অফিস ব্যাগের উপর।
অফিস ব্যাগের মালিক ভদ্রলোক কেউ একজনের সাথে কথা বলছিলেন এতোক্ষণ, আর কথা বলতে বলতেই অন্যমনস্কভাবে ব্যাগ খুলে ডায়েরী ভেতরে রেখে দিয়ে কাঁধে তুলে নিলেন ব্যাগ।
কবিরের ভাগ্নে অনামিকার জন্যে একটা খবর নিয়ে এসেছে। কবির তাকে ডাকছে। তাড়াতাড়ি যেতে বলেছে।
ডাক্তারের রাউন্ড শেষ ঐ ওয়ার্ডে। ভাগ্নে এই কয়েকটি কথা বলতে গিয়ে কেঁদেমেদে শেষ। মামাকে বড্ড ভালোবাসে। এতক্ষণ মামার পাশেই বসে ছিলো। মামার কাটা পা দেখে কেঁদেছে অনেকক্ষণ। মামা যখন বললো, আন্টিকে ডেকে দিতে তখনও সে কাঁদছিলো। অনামিকার ভীষণ ইচ্ছে করলো, ছোট্ট ছেলেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতে, কেঁদোনা, ছেলেরা এতো কাঁদেনা বাবু..। তা না করে সে বললো,
‘আমি যাচ্ছি তোমার মামার কাছে, তুমি ঐ চেয়ারে রাখা আন্টির ব্যাগটা নিয়ে আসো…’
.
তানভীর বই নিয়ে আধশোয়া হয়ে আছে বিছানায়। পাশে ঘুমুচ্ছে স্ত্রী। এপাশ ফিরে। তানভীর বইটা রেখে অনেকক্ষণ পর্যন্ত তাকিয়ে থাকে স্ত্রীর দিকে। একবার গায়ে হাত রেখে কানের কাছে মুখ এনে ফিসফাস করে বললো ও,
‘অনি, এ্যাই… এ্যাই অনি.. জেগে আছো?’
অনামিকা গা থেকে হাত সরিয়ে দিলো। তানভীর চুপ করে তাকিয়ে রইলো, মুগ্ধ দৃষ্টিতে। বিয়ের এতো বৎসর পরেও তার মুগ্ধতা আগের মতোই আছে। এখনও সে একিই মুখ দেখে বারবার মুগ্ধ হয়। অবশ্য বৌয়ের প্রতি মুগ্ধতা ছাড়াও তার চাপা অভিমান আছে। অনামিকা কখনো মুখে বলেনি তাকে, ভালোবাসি। যদিও এর পক্ষে সে প্রমান পেয়েছে প্রচুর। তবুও একটা চাপা অভিমান কাজ করে তানভীরের মনে।
সে চায়, অনামিকা তাকে স্পষ্ট স্বরে একবার বলুক, ভালোবাসি। সে খাদক নয়, বিছানায় শরীর নয়; শুধু অনামিকা নয়, ভেতরের অনিটাকেও চায় সে। অনামিকা যখন প্রচন্ড আবেগে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে তাকে, সে অনুভব করে ‘ভালোবাসি’ শব্দটা।
তবুও কেন এতো চাপা অভিমান তার, সে নিজেও বোঝেনা।
অনামিকা ঘুমের ঘোরেই অন্যপাশে ফিরলো, তানভীর বই রেখে বারান্দায় গেলো। একটা সিগেরেট খাবে এখন সে। তারপর ঘুমুবে। বারান্দায় দু’টো চেয়ার থাকে সবসময়, দু’জনের জন্যে। তানভীর একটায় গিয়ে বসে, অন্ধকার বাইরে। অনামিকার অদ্ভুত সব স্বভাব। মানুষ জোৎস্নায় বাইরে হাঁটে, ছাদে যায়। অনামিকার পছন্দ অন্ধকার। চাঁদের আলোয় তাকে কখনো বাইরে বের হতে দেখেনি তানভীর, ছাদেও না।
সিগেরেট জ্বালিয়ে তানভীর পড়ার জন্যে কিছু একটা খুঁজে। পেপার ম্যাগাজিন যেকোনো কিছু একটা হলেই চলে। এই বাজে অভ্যাসটা ধরিয়ে দিয়েছে ওর অফিসের এক কলিগ। সিগেরেট হাতে নিয়ে বই পড়ার নাকি অন্যরকম মজা আছে। একবার ট্রাই করেছিলো, ব্যস। এরপর থেকে ছাড়তে পারেনি। অভ্যাসটা এতোই বাজে যে, বাইরে টং দোকানে দাঁড়িয়ে সিগেরেট খাওয়ার সময়ও আজকাল হাতে পড়ার কিছু না থাকলে অস্বস্তি লাগে ওর।
সিগেরেট বারান্দায় রেখে রুমে ঢুকে একটু আগের পড়া বইটা হাতে নিলো সে, তারপর আবার রেখে দিলো। পড়া হয়ে গেছে ওটা। নতুন কিছু কি নেই? বুকশেলফের তাকে চোখ বুলাতেই চোখ পড়লো ‘দত্তা’য়। অনেক আগে পড়েছে, আরেকবার পড়া যাক। হাতে নিয়ে বারান্দায় গিয়ে লাইট জ্বালিয়ে বই খুলতেই আরেকবার উঠতে হলো তাকে। কলম নিয়ে আসা হয়নি। এই অভ্যাসটাও ঐ কলিগ থেকে প্রাপ্ত। অবশ্য এটা বাজে নয়, ভালো অভ্যেস। বইয়ের কোনো স্পেশাল লাইনগুলোয় দাগ দিয়ে রেখে বারবার পড়া। মগজে গেঁথে যায়। পরবর্তীতে ঐ বই সম্পর্কে যেকোনো তথ্য সংগ্রহে এই মগজে গেঁথে যাওয়া লাইনগুলো সবচেয়ে বেশি সাহায্য করে। তানভীরের মেজাজ আস্তে আস্তে গরম হয়ে উঠছে, পুরো ঘর খুঁজেও একটা কলম পাচ্ছেনা সে। কি অদ্ভুত। কালই সে তিনটে নতুন কলম এনে রুমের তিন জায়গায় রেখেছে, যাতে একটা হারালে আর একটা পাওয়া যায়। তিনটাই হারিয়েছে।
কলম হারানোর গিনেজ ওয়াল্ড রেকর্ড আছে ওর। মাসে বিশ-পঁচিশটা কলম হারায়। প্রায়ই রুমে ঢুকে কলম পাচ্ছিনা বলে চিৎকার- চেঁচামেচি করে, আর অনামিকা ব্যাগ থেকে কলম বের করে দেয়। ওর জন্যেই অনামিকা ব্যাগে পাঁচ ছয়টা কলম এক্সট্রা রাখে। অনামিকাকে দেখলো আরেকবার গিয়ে সে, ঘুমুচ্ছে মেয়েটি। জাগাতে ইচ্ছে করছেনা, আবার কলমও দরকার। ব্যাগের দিকে অপরাধী চোখে তাকালো, নিজের মানুষ, অথচ ওর ব্যাগ খুলতেও তানভীরের ভীষণ ভয় হয়। অনামিকা রেগে যাবেনা তো। ব্যাগ, আয়না, আর ওর কাপড় রাখার বক্সে কারো হাত দেয়া অনামিকা একদম সহ্য করেনা।
তানভীর জানে, তবে কেন সহ্য করতে পারেনা সেটা জানেনা, জানতে চায়ও নি। অনামিকার অদ্ভুত সব স্বভাবের সাথে সে পরিচিত, এগুলোও তার বাইরের কিছু না।
খুব আস্তে আস্তে, সন্তর্পণে ব্যাগ খুললো সে, একটা ডায়েরী ভেতরে। ভীষণ অবাক হলো, অনামিকা ব্যাগে কার ডায়েরী নিয়ে ঘুরছে! নিজের?
এতোদিন তবে সে কেন টের পায়নি? অনামিকা এত লুকোচুরি খেলে কেন?
তানভীরের মনটা ভীষণ খারাপ হলো, বারান্দায় বসে পরপর তিনটে সিগেরেট টেনে শেষ করে ফেলে ডায়েরী উল্টালো, নীল রঙের কভার, উপরে ছোট্ট ছোট্ট অক্ষরে লেখা, ‘অব্যক্ত!’ একটু অবাক হলো সে, এটা অনামিকার হাতের লেখা নয়।
.
January 11
পরীর সাথে আমার বিয়ে হয়েছে এক বৎসর হলো আজ। প্রথম বিবাহ বার্ষিকী আজ আমাদের। পুরো এক বৎসর পার হওয়ার পর এই প্রথমবারের মতো সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর তোমার কথা মনে পড়েনি একবারও আমার। ঘুম ভেঙ্গে চোখ খুলতেই মনে হয়েছে, আমার একটা পরী আছে। পরীটা রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আমায় শক্ত হাতে আঁকড়ে ধরে তারপরে ঘুমোয়, ভাব দেখে মনে হয়, কেউ এসে তার হাসবেন্ডকে কেড়ে নিয়ে যাবে তার থেকে। আর সেটা সে কখনোই হতে দেবেনা। প্রথম প্রথম এই শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ঘুমোনোটা কেমন যেন লাগতো আমার, অথচ এখন..।
পরীর আচরণ বাচ্চাদের মতো।
সারাদিন বসে বসে এগারোটা চিঠি লিখেছে, আমাকেও লিখতে হয়েছে। আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত আমরা কথা বলিনি। শুধু লিখেছি। অদ্ভুত না? পরী এমনই। অদ্ভুত সব স্বভাব তার। তোমার মতোই। এগারো সংখ্যাটা তার সবচেয়ে লাকি নাম্বার। এজন্যেই এগারোটা চিঠি। প্রত্যেকটা চিঠিতে একটা করে কবিতা। আর কিছু প্রশ্ন।
ও বিছানার একপাশে শুয়ে লিখে, আমায় বিছানার এপাশে শুয়ে উত্তর দিতে হয়।
শেষ চিঠিতে লেখা ছিলো, ‘আমি তোমার থেকে বেশি পূণ্য করেছি জীবনে, তাই তোমায় পেয়েছি…। তুমি এইদিক দিয়ে আমার পেছনে আছো। এটা তোমার জন্য ঈর্ষা করার মতোনই একটা ব্যাপার। তাইনা?’
February 23
পরী আজ আমায় একটা গিফট দিয়েছে। আমার একটা থ্যাংকস দেয়া উচিৎ ছিলো, কিংবা কপালে- ঠোঁটে দু’টো চুমু। কিছুই দেয়া হয়নি। কারণ গিফট’টা ছিলো, কাগজ দিয়ে বানানো একটা নৌকো। আমার বুকের কোণে ধক করে উঠেছিলো।
তোমার মনে আছে, তুমি আমায় প্রথম গিফট কি দিয়েছিলে?
একটা নৌকো। কালো রঙের কাগজ দিয়ে বানানো। কালো তোমার পছন্দের রঙ। আশ্চর্য হলেও সত্যি, পরীর দেয়া নৌকোটাও কালো রঙের কাগজ দিয়ে বানানো। এটা কি কোনো কাকতালীয় ব্যাপার?
March 07
পরী বড্ড বকবক করা মেয়ে জানো? তোমার একদম বিপরীত। তুমি চুপ করে থাকো, চাপা স্বভাব। আমিও ঠিক তাই। অথচ পরী ভীষণ সুখী, তার চোখ দেখেই আমি বুঝি! আর আমি আমায় বুঝিনা। চাপা স্বভাবের মানুষের বোধহয় ব্যক্তিগত খুশিও প্রকাশ করার পদ্ধতি জানা নেই।
April 22
পরী এখন বই পড়ছে। বই পড়ার সময় ওর সম্পুর্ণ মনোযোগ থাকে বইয়ের ভেতর। তাই আমি লিখতে পারছি। আমি ডায়েরী লিখি লুকিয়ে। আজ একটু গা গরম মনে হচ্ছে আমার। জানো, আমাদের দু’জনের দুরে সরে আসার পর আমি সবচেয়ে বেশি ভয় পাই জ্বরকে। জ্বরের ঘোরে আমি তোমার নাম বিড়বিড় করি। পরী অবশ্য কখনো এ নিয়ে কিছু বলেনি, প্রথমদিন শুধু জিজ্ঞেস করেছিলো, অনামিকা কে?
আমি হকচকিয়ে গিয়ে জবাব দিয়েছি, কলেজ লাইফের বেস্ট ফ্রেন্ড। এখন যোগাযোগ নেই। আমি কেন লুকোলাম? জানিনা।
পরী চুপ করে কিছুক্ষণ আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে কপালে একটা চুমু দিলো। এই চুমুর অর্থ ছিলো, ‘ভয় পেয়োনা, আমি সন্দেহ করছিনা।’
পরী পৃথিবীর সবচেয়ে নোংরা বিশ্রী বাজে একটা রোগ থেকে মুক্ত ছিলো, এই রোগে কখনো সে আক্রান্ত হয়নি আর দশটা মেয়ের মতো। রোগটা, সন্দেহ রোগ।
August 17
দুইমাস পর লিখছি। কাজের চাপ বেড়েছে। শত কাজের ভীড়েও দু’টি নাম আমার মনে পড়ে সবসময়। পরী, অনামিকা। ইদানিং পরী নামটা বেশি মনে পড়ছে। আগে শুধুই তোমার নাম মনে পড়তো। তোমায় ভুলে যাচ্ছি আমি আস্তে আস্তে। কষ্ট এবং আনন্দের মিশ্র অনুভুতি হচ্ছে। আমার জীবনের দু’টি তীব্র ইচ্ছার কথা বলেছিলাম তোমায়।
১. তোমায় প্রতিদিন দেখা।
২. পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটির চোখে একবারের জন্যে হলেও চোখ রাখা।
তুমি জানতে, দু’টো ইচ্ছার মধ্যেই তুমি ছিলে। আমায় পেলে তুমি পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি হতে, হতেনা?
তোমার ইচ্ছের কথাও আমার মনে আছে। পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি যে মানুষটিকে তুমি ভালোবাসো, এক অন্ধকার রাতে ছাদে তার হাত ধরে হাঁটা এবং ঠোঁটে শেষ সিগেরেট ধরিয়ে দেয়া।
তোমারও ইচ্ছেভর্তি আমি ছিলাম। আচ্ছা, এখনো কি আছি?
September 15
আজ আমার জন্মদিন। তুমি আমার জন্মদিনে সবসময় কড়কড়ে লাল রঙের শাড়ি পরতে। আমি বলতাম, আজ তোমার গায়ে আগুন ধরে গিয়েছে..! তুমি হাসতে। আজকে আমার জন্যে অনেকগুলো সারপ্রাইজ ছিলো। দু’টি ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে, পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষটির চোখে চোখ রাখা হয়েছে। ওটা পরী। মা হতে যাচ্ছে ও; আমি বাবা।
আর অন্যটি, তোমায় দেখা। শেষবারের জন্যে হলেও।
আমাদের দেখা হয়েছে অনামিকা। হাসপাতালে। তুমি লাল শাড়ি পরেছো আজ ও। জানিনা ইচ্ছা করে, নাকি কাকতালীয়। এইযে এখন লিখছি, তুমি হেঁটে গিয়েছো সামনে.. তোমার গন্ধ পেয়েছি। সেই মিষ্টি গন্ধ।
আগের মতোই আছো তুমি। মায়াবতী। আমাদের কথা বলা উচিৎ ছিলো। বলা হয়নি। বলা হয়না। আমরা বলিনা। কিছু কথা সবসময় অব্যক্তই থেকে যায়। না?
(ডায়েরী অংশ শেষ..)
.
তানভীর অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে বারান্দায়। হাতে ডায়েরী। একটি প্রশ্ন। অনামিকা তাকে ভালোবাসে তো?
ডায়েরীটা কিভাবে পেলো অনামিকা জানা নেই তার। একটু অবাকও হয়, তাদের তো কথা হয়নি। এটা সেই অনামিকা তো?
ডায়েরীতে যার কথা বলা আছে। নাকি কাকতালীয়? ডায়েরীটা নষ্ট করা দরকার। তানভীর ছাদে যায় ডায়েরী হাতে, তারপর খুব সাবধানে ডায়েরীর প্রত্যেকটি পাতা পুড়িয়ে ফেলে।
দশমিনিট পর রুমে ফিরে আসে, অনামিকা এখন এপাশ ফিরে আছে। তানভীর পাশে শুয়ে পড়ে, দু’জন মুখোমুখি, ওর চোখে জল জমে। একটি প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার ভীষণ। অনামিকা তাকে সত্যিই ভালোবাসে তো?
অনামিকা হুট করে চোখ খুলে, ভ্রুঁ কুঁচকে আসে তার। তানভীরের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘এ্যাই… কি হয়েছে?’
তানভীর বিব্রত হয়ে পড়ে, চোখ মুছে বলে,
‘না.. না। কিছুনা।’
অনামিকা ঘুম জড়ানো গলায় বলে,
‘কাঁদছো কেন?’
‘কই না তো..।’
‘ঘুমোওনি কেন?’
‘ঘুম আসছেনা।’
অনামিকা কিছুক্ষণ চুপ করে তানভীরের চোখে ডুবে থাকে। তারপর ওর ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ছুঁয়ে দিতে দিতে বলে,
‘ছাদে যাবা?’
তানভীর জলভরা চোখে তাকায়। অনামিকা চোখের কোনে আঙুল ছুঁয়ে দিয়ে নরম স্বরে বলে,
‘তোমার হাত ধরে একটু হাঁটবো। একটা সিগেরেট নেবে, আমি ধরিয়ে দেবো। শেষবারের মতো। এরপর থেকে সিগেরেট ছেড়ে দেবে।’
পরী আধশোয়া হয়ে বামপাশে তাকিয়ে আছে। মুনীর ঘুমোচ্ছে। এতো তাড়াতাড়ি সে ঘুমোয়না। আজ ঘুমিয়েছে। সুখী মানুষের ঘুম তাড়াতাড়ি আসে। মুনীরের চেহারায় নিরবতা ভাঁজ হয়ে লেপ্টে থাকে। পরীর ভীষণ মায়া লাগে, এই চুপচাপ স্বভাবের মানুষটিকে সে বড্ড ভালোবাসে। পরীর হাতে একটি ডায়েরী। এই ডায়েরীটি যিনি লিখেছেন, তাঁর নাম অনামিকা। পরী শুনেছে নামটা এর আগে। মুনীরের মুখেই। জ্বরের ঘোরে বিড়বিড় করেছে অনেকবার। পরীর কখনো মন খারাপ হয়নি এই নামটা শুনে। এখনও হচ্ছেনা। ডায়েরীর পাতাভর্তি তানভীর নামক এক ভদ্রলোকের কথা।
ভদ্রলোককে তিনি ভীষণ ভালোবাসেন, অথচ কখনো বলেননি। চাপা স্বভাবের মানুষের এই একটাই সমস্যা, কথা থেকে লিখে বেশি এরা।
পরীর বকবক স্বভাব। সে এটা থেকে মুক্ত। পরী পেটে হাত রাখে, এখানে একটি ভবিষ্যত। মুনীর আগে কার ছিলো জানতে চায়নি কখনো সে, জানতে চায়ও না। মুনীর এখন তার। শুধুমাত্রই তার।
পরী শুয়ে পড়ে। মুনীর ঘুমের ঘোরে গা চুলকায়, পরী তীব্র আবেগ নিয়ে মুনীরের চুলে বিলি কেটে নিচু স্বরে বলে,
‘তোমার অনেক কথাই অব্যক্ত মুনীর। গোপন। আমার শুধু একটাই। তুমি কখনোই জানবেনা, তোমার লুকিয়ে লেখা ডায়েরীর প্রত্যেকটি শব্দ আমার পড়া। এই কালো ডায়েরী তোমায় কষ্ট দেবে হয়তো, হয়তো না। তোমার ডায়েরী কোথায় আমি জানিনা, এই ডায়েরী কিভাবে তোমার কাছে এলো তাও জানিনা। তবে তুমি এটা আর পাবেনা। অব্যক্ত’রা অব্যক্তই থাকুক।’
.
তানভীরের ঠোঁটে সিগেরেট, কেন জানি তার মনে হচ্ছে তারা দুইজন হচ্ছে এই গ্রহের এই মুহূর্তে সবচেয়ে সুখী দু’টি মানুষ।
অনামিকা শক্ত করে তার হাত ধরে হাঁটছে। আবছা অন্ধকারেও ছাদের এক কোনায় হালকা বাতাসে ছাই উড়তে দেখা গেলো। অনামিকা অবাক হয়। জিজ্ঞেস করে,
‘ওটা কি?’
তানভীর সিগেরেটে টান দেয়, ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলে,
‘ওটা অতীত।’
অনামিকা মুচকি হাসে, বাচ্চাদের মতো খেলতে ইচ্ছে হয় তার। মুখে হাসি ধরে রেখে তারপর দুর আকাশের জ্বলজ্বলে নক্ষত্রের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলে,
‘আর ওটা কি?’
তানভীর সিগেরেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দিতে দিতে বলে,
‘ওটা ভবিষ্যত।’
অনামিকার ভীষণ ইচ্ছে হয় হাত ধরে রাখা মানুষটিকে চিৎকার করে বলতে, ভালোবাসি! কতবার ইচ্ছে হয়েছে, অথচ বলা হয়নি। তানভীর হঠাৎ করে অনামিকাকে সামনে দাঁড় করিয়ে কপালে চুমু দেয়, বলে,
‘আর এটা বর্তমান। কোনটা ভালোবাসো অনি?’
অনামিকার চোখে জল জমে, তীব্র ভালোবাসা প্রকাশ করতে না পারার কষ্টেও বুঝি চোখে এমন করে জল জমে।
অনামিকা দু’পায়ের আঙ্গুলে ভর করে একটু উঁচু হয়ে তানভীরের কপালে চুমু এঁকে দিয়ে বলে,
‘এটা।’
তানভীরের চোখে একরাজ্যের খুশি নেমে আসে। বলে,
‘পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর অব্যক্ত কথাটি কি জানো?’
‘না তো। কি?’
‘ভালোবাসি’
নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রাত বাড়ে। দু’জনের গায়ে লেগে থাকা অন্ধকার আরো ঘন হয়। শক্ত খোলস ভেঙ্গে বের হয়ে আসতে চায় কিছু অব্যক্ত কথামালা। যে কথা কখনো বলা হয়নি। যে কথা কখনোই বলা হয়না।
//
লেখাঃ Shakhawat Hossen (Sohag)

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here