অবেলায় ভালোবাসা  পর্ব-৩

13
400
অবেলায় ভালোবাসা  পর্ব-৩
অবেলায় ভালোবাসা  পর্ব-৩

অবেলায় ভালোবাসা  পর্ব-৩

 

লেখা –সুলতানা ইতি

 

চুহেস কফিশপ থেকে বেরিয়ে গেলো
রেস্ট হাউজে এসেই বিছানার উপর এলিয়ে দিলো নিজেকে

নিহার – স্যার ডিনার রেডী আপনি আসুন
চুহেস- আমি খাবোনা আজ, নিহার তুমি যাও
নিহার- স্যার না খেলে শরির খারাপ করবে

নিহারের কথা শুনে চুহেস রেগে যায়
– এই ছেলে তোমার কি আমাকে কোন দিক দিয়ে বাচ্ছা মনে হয়,আমাকে বাচ্ছাদের মতো বুঝাচ্ছো, না খেলে শরির খারাপ করবে, আমি তোমার থেকে সব কিছু ভালো বুঝি যাও এখান থেকে

চুহেসের এসব কথা নিহারের কাছে নতুন নয় তবু ও গ্রামে আসার পর এই প্রথম রাগ দেখালো সেই ভেবে একটু অবাক হলো নিহার দরজার বন্ধ করে নিহার বেরিয়ে যায়

চুহেস চোখ বন্ধ করে ভাবতে থাকে আজকে কফি শপের মেয়েটা কে কোথায় যেন দেখেছি,হা সকাল বেলার ওর সাথে আমার দেখা হয়েছে কিন্তু সকালে আমি তার দিকে এতো খেয়াল করিনি,
আজ সন্ধায় যখন ওর চোখের দিকে নজর পড়লো মনে হলো ঐ চোখ আমার খুব পরিচিত কিন্তু এমন মনে হলো কেনো, ওর সাথে কি আমার পূর্বের কোন যোগসাজশ আছে মনে পড়ছে না,
আচ্ছা মেয়েটার নাম কি? নাম টা ও তো জানা হলো না, ইসস আবার যদি দেখা হতো তা হলে নাম টা যেনে নেয়া যেত

এই সব ভাবনার মধ্যে দিয়ে চুহেস কখন যে ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে গেলো টের ফেলো না,, সকালে ঘুম ভাংলো নটা বাজে
তা ও নিহার এসে জাগিয়েছে

চুহেস ঘুমের আড়মোড়া ভেঙে বল্লো, আর ও আগে ডেকে দাওনি কেনো নিহার, তোমাকে বলেছিনা গ্রামে যতো দিন থাকবো সকাল সকাল উঠে হাটতে বের হবো

নিহার অপরাধির মতো উত্তর দিলো,আসলে স্যার কাল রাতে আমার মনে হলো আপনার শরির ভালো নেই তাই আর জাগাইনি এতো সকাল সকাল

চুহেস -ঠিক আছে আমি ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছি একটু গ্রাম্য বাজার টাতে ঘুরতে যাবো তুমি ও যাবে আমার সাথে সো রেডী হয়ে নাও

চুহেস ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়লো নিহার কে নিয়ে
নিহার- স্যার আপনি কিন্তু নাস্তা করেন নি কাল রাতে ও না খেয়ে ঘুমালেন
চুহেস- হুম গ্রামের বাজারে কোন একটা দোকানে বসে কিছু খেয়ে নিবো
নিহার- কি বলছেন স্যার আমি যতোটুকু জানি গ্রামের এই সব দোকানে অসাস্থকর পরিবেশে খাবার তৈরী হয় এগুলা খেলে শরির আর ও খারাপ করে

চুহেস নিহারের কথা শুনে মৃদু হাসলো, বল্লো আজ না হয় খেয়ে দেখবে শহরের ঐ দামি রেস্টুরেন্ট এর খাবারের ছেয়ে গ্রামে রাস্তার পাশের দোকানের খাবার অনেক সুস্বাদু

নিহার- স্যার কিছু মনে করবেন না একটা কথা জানার খুব ইচ্ছে

চুহেস- বলো
নিহার- গ্রামে আসার পর আপনাকে দেখে গ্রামের সব কিছুর প্রতি আপনার টান দেখে মনে হচ্ছে আপনার ছোট বেলা কেটেছে এই রকম ই কোন একটা গ্রামে

নিহারের কথা শুনে চুহেস গম্ভীর হয়ে বলে
-উওর টা যে তোমার পেতেই হবে এটা কোন জরুরী নয়

চুহেসের গম্ভীর কন্ঠ শুনের নিহার আর কথা বাড়ানোর সাহস ফেলো না
ওরা গিয়ে রাস্তার পাশে একটা টং দোকানে বসেছে

দোকানে চা কেক কলার ওয়ার্ডার দিলো চুহেস,
চুহেস এগুলা ওয়ার্ডার দিয়েছে দেখে নিহার বড় বড় চোখ করে চুহেসের দিকে তাকায়, তার মুখে কোন কথা নেই সে সত্যি বোবা হয়ে গেছে মনে হয় মেহেরা ফ্যাশন শো এর মালিক এখন সাধারণ খাবার খাবে তা ও রাস্তার দ্বারে টং দোকানে বসে(কথা গুলো নিহার মনে মনে বলছিলো)

চুহেস- ও ভাবে তাকানো কিছু নেই নিহার আমরা সবাই মানুষ এক মাটিতে তৈরী আল্লাহ আমাদের মাঝে কোন বেঁধা বেধ সৃষ্টি করে দেয় নি,আমরা নিজেরা ই নিজের মধ্যে এতোটা দূরুত্ব সৃষ্টি করেছি,
এই খাবার যদি একজন দিন মুজুর মাঠে কাজ করা লোক খেতে পারে টঙ দোকানে বসে
তা হলে আমি কেনো পারবো না,
ঘৃনার চোখে নয় নিহার ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখো সব কিছুই আপন মনে হবে

নিহার যেন আবার ও বড় দরনের ধাক্কা খেলো চুহেসের কথাগুলো দোকানি মন দিয়ে শুনছিলো,
এতোক্ষনে চুহেস ছোট বেলার মতো করে চায়ের মধ্যে চুবিয়ে বন খেতে লাগলো নিহার খাওয়া ভুলে গিয়ে চুহেসের দিকে তাকিয়ে আছে, ওর চোখ যেন বিশ্বাস করতে পারছে না,সামনে বসে থাকা লোকটি তার বস

চুহেস খাওয়া শেষ করে নিহারকে বল্লো তুমি তো কিছুই খেলেনা, তুমি কি এখানে খাবে নাকি বড় মার্কেটে গিয়ে কোন একটা রেস্টুরেন্ট এ খাবে
নিহার- না স্যার আমি এখানেই খাবো আপনি খেয়েছেন যখন তখন আমি ও খেতে পারবো

এতোক্ষনে দোকানি কথা বল্লো,দোকানি মাঝ বয়সের তিনি বল্লো কিছু মনে করোনা বাবা তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে তোমরা আমাদের গ্রামের নয়

চুহেস- জ্বী চাচা আমরা আপনাদের গ্রামে বেড়াতে এসেছি
দোকানী – কিন্তু বাবা তুমি কি এ গ্রামে আগে কখনো এসেছো
চুহেস- কিছু বল্লোনা

কিছুক্ষন পর দোকানী আনন্দে চিৎকার করে উঠে বল্লো,-তোমাকে ছিনতে পেরেছি আমি, তুমি আবরারের ছেলে তাই না, কি যেনো একটা নাম ছিলো তোমার মনে পড়ছে না

চুহেস- মাথা নিছু করে বল্লো জ্বী আপনি ঠিক ধরেছেন আমি আবরার মেহেরার ছেলে চুহেস মেহেরা

দোকানী চুহেস কে জড়িয়ে ধরলো বল্লো তোমার বাবা খুব ভালো মানুষ ছিলো আল্লাহ ভালো মানুষদের
খুব তাড়া তাড়ি নিয়ে যায় যার দৃষ্টান্ত তোমার বাবা আর মা রেখে গেছে

তা বাবা আহমদের খবর কি কিছু জানো
চুহেস- না চাচা তাদের সাথে কোন যোগাযোগ রাখিনি,আর কেমন করে রাখবো সব কিছু না জানলে অল্প কিছু তো আপনারা জানেন

দোকানীরর নাম রহিম তিনি বল্লেন- হুম তা ঠিক, তোমার জেঠিমা তো দু বছর আগে পৃথিবী ছেড়েছে,
শ্রুতির বিয়ে হয়েছে খুব ভালো জায়গাতে, আদনান বিয়ে করেছে একটা মেয়ে আছে

আহমদ এখন চলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছে সারাদিন বাড়ির পাশে একটা চেয়ারে বসে রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে মনে হয় কারো পথ ছেয়ে বসে আছে

চুহেসেরর রহিম চাচার কথা শুনে চোখে পানি চিক চিক করছে, তবু ও অন্য দিকে তাকিয়ে পানি লুকানোর বৃথা চেষ্টা করলো, তার পর বল্লো
-চাচা বাবুই কেমন কেমন আছে সে এখন কতো বড় হয়েছে বলতে পারেন

রহিম হেসে জবাব দিলো পারবো না কেনো, ওতো একটা লক্ষি মেয়ে।এবার কলেজে উঠেছে শুনেছি, এই তোমরা আসার আগে আমার দোকানে এসে ছিলো

চুহেস আর কিছু বল্লো না
কিছুক্ষন চুপ থেকে বল্লো চাচা আপনি আমার কথা টা একটু গোপন রাখবেন

রহিম- তা কেনো বাবা,তোমার কি এখন উচিত নয় সব ভুলে তোমার জেঠুর সাথে দেখা করা উনি যা করেছে তার শাস্তি উনি পেয়েছেন এবার তো তার কাছে ফিরে যাও

চুহেস কিছু না বলে, বল্লো আসি চাচা,
এতোক্ষন নিহার এদের মাঝে নিরব একজন দর্শক এর মতো সব কথা শুনছিলো, শুনে চুহেস কে সকালে করার প্রশ্ন গুলোর উত্তর পেয়ে গেছে

চুহেস দোকান থেকে বেরিয়ে গেছে তার পিছু পিছু নিহার ও হাটছে
নিহার- স্যার এবার কোথায় যাবেন ভাবছেন
চুহেস- আনমনা হয়ে বল্লো,চলো দিঘীর পাড়ে যাবো এখন অবশ্য দিঘীটা নেই তবে জায়গাটার নাম পরিবর্তন হয়নি

নিহার- ওখানে কেনো স্যার
চুহেস কিছু বল্লোনা নিরবে হাটতে শুরু করলো উদ্দেশ্য যদি একবার বাবুই কে দেখতে পায়

কদমতলী দিঘীর পাড়ে এসে চুহেস দাড়িয়ে আছে ভাবছে এক সময় এখানকার পঞ্চাশ একর জমির মালিক ছিলো আমার দাদা, দাদার মারা যাওয়ার পর বাবা আর জেঠু মালিক হয়,

তার পর একদিন এক ভয়াবহ এক্সসিডেন্টে বাবা কে হারাই আমি তখন খুব ছোট আমি আর মা দুজনের কোন ভাবে দিন চলে যেতে বাবাকে হারানোর ধাক্কাটা হয়তো মা সইতে পারেনি,

এমন সময় নিহার কিছু একটা বল্লো,চুহেস ও ভাবনার জগত থেকে ফিরে আসে
চুহেস- কিছু বল ছিলে নিহার
নিহার- হুম স্যার হাটতে হাটতে অনেক দূর এসেগেছি কোথায় যাবেন

চুহেস নিহারের কথা শুনে আসে পাশে তাকিয়ে দেখলো হুম ঐ তো বাড়িটা দেখা যাচ্ছে
নিহার- এই বাড়িটা কার?
চুহেস- কিছু বল্লোনা আনমনে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে আছে একটু পরে দেখলো একজন বৃদ্ধা উঠোনে চেয়ার পেতে বসলো

এমন সময় একটা মেয়েলি কন্ঠে কথা কানে এলো চুহেসের তাকিয়ে দেখলো সেদিনের সেই মেয়েটি

মেয়েটি- এই নিয়ে আপনার সাথে তিন বার দেখা হচ্ছে আপনি কে আপনাকে তো আগে দেখেছি বলে মনে হচ্ছে না

চুহেস- হুম আমরা পরশু গ্রামে এসেছি এই তো গুরা ঘুরি করবো এই আরর কি

মেয়েটি বল্লো- তা আমাদের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন কেনো

মেয়েটির কথা শুনে চুহেসের হৃদয়ের সাগরে চলাত করে উঠলো, তার পর নিজেকে সামলে নিয়ে বল্লো – ওহ বাড়িটা বুঝি আপনাদের

মেয়েটি- হুম,কিন্তু আমাদের এতোবার দেখা হয়েছে আমি এখনো আপনার নামটা ই জানতে পারেনি
– ওহ তাই তো,আমি চুহেস আর ও নিহার
– আমি গাইথি

চুহেস নামটা শুনে চমকে উঠে, মনে হচ্ছে তার মনের মধ্যে ঢেউ বয়ে গেলো

গাইথি- কি ভাবছেন
চুহেস নিজেকে সামলে নিয়ে বল্লো কিছু না,

গাইথি- চলুন আমাদের বাড়িতে গিয়ে বসবেন

চুহেস- না আজ না অন্য একদিন এই বলে উলটো দিকে হাটা দরলো
গাইথি নির্বাক দৃষ্টিতে চুহেসের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে
to be continue

Comments are closed.