ঘুমন্ত রাজপরী_পর্ব(০১)

0
2010
ঘুমন্ত রাজপরী
ঘুমন্ত রাজপরী_

ঘুমন্ত রাজপরী_পর্ব(০১)

ছাপ্পান্ন মিনিট পার হল। | ফিরােজ বসে আছে। কারাে কোনাে খোঁজ নেই। ঘুমন্ত রাজপুরীর মতাে অবস্থা। কোনাে শব্দটব্দও পাওয়া যাচ্ছে না, যা থেকে ধারণা করা যায় এ-বাড়িতে জীবিত লােজন আছে। সে যে এসেছে, এ-খবরটি ছাপ্পান্ন মিনিট আগে পাঠানাে হয়েছে। বেঁটেখাটো এক জন মহিলা বলে গেল—আফা আসতাছে। ব্যস, এই পর্যন্তই। ফিরােজ অবশ্যই আশা করে না যে, সে আসামাত্র চারদিকে ছােটাছুটি পড়ে যাবে। বাড়ির কর্তা স্বয়ং নেমে আসবেন এবং এনাকে চা দিতে এত দেরি হচ্ছে কেন? বলে চেচামেচি শুরু করবেন। তবে এক ঘন্টা শুধুশুধু বসে থাকতে হবে, এটাও আশা করে না। সময় এখনাে এত সস্তা হয় নি।
‘আপনি কি আমাকে ডাকছিলেন?
পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ফিরােজ মনে-মনে একটি দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলল । চমৎকার মেয়েগুলি সব এমন-এমন জায়গায় থাকে যে, ইচ্ছা করলেই হুট করে এদের কাছে যাওয়া যায় না। দূর থেকে এদের দেখে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলতে হয় এবং মনে-মনে বলতে হয়—আহা, এরা কী সুখেই না আছে। | ফিরােজ উঠে দাঁড়াল। সালামের মতাে একটা ভঙ্গি করল। এটা করতে তার বেশ কষ্ট হল। উনিশ-কুড়ি বছরের একটি মেয়েকে এ-রকম সম্মানের সঙ্গে সালাম করার কোনাে মানে হয়!
ফিরােজ বলল, আমি আপনার বাবার কাছে এসেছি।’ ‘বাবা তাে দেশে নেই, আপনাকে কি এই কথা বলা হয় নি?”
হয়েছে। ‘তাহলে? মেয়েটির চোখে-মুখে স্পষ্ট বিরক্তি। যেন কৈফিয়ত তলব করছে, কেন তাকে
ডাকা হল। ফিরােজ ঠাণ্ডা গলায় বলল, আপনার বাবা নেই বলেই আপনাকে খবর। দিতে বলেছি। গল্পগুজব করার উদ্দেশ্যে খবর দেয়া হয় নি।
অপালা পর্দা ছেড়ে ঘরের ভেতর ঢুকল। লােকটিকে চট করে রেগে যেতে দেখে তার বেশ মজা লাগছে। বয়স্ক মানুষেরা মাঝে-মাঝে খুবই ছেলেমানুষি করে।
| ‘আপনার বাবা আমাকে কমিশন করেছেন বসার ঘরটি বদলে নতুন করে সাজিয়ে দিতে। এই সাজ তাঁর পছন্দ নয়।
‘আপনি কি একজন আর্টিস্ট?
‘না। আর্টিস্টরা মানুষের ঘর সাজায় না। তারা ছবি আঁকে। আমার কাজ হচ্ছে আপনাদের মতাে পয়সাওয়ালাদের ঘর সাজিয়ে দেয়া।
‘বেশ, সাজিয়ে দিন।
‘আপনি জানেন তাে, আপনার বাবা ড্রইংরুমটা বদলাতে চাচ্ছেন? | ‘না, জানি না। বাবার মাথায় একেকটা খেয়াল হঠাৎ করে আসে, আবার হঠাৎ করে চলে যায়। আপনি বসুন।
ফিরােজ বসল। মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। এইসব পরিবারের মেয়েরা অসম্ভব অহঙ্কারী হয়। এক জন হাউস ডেকোরেটরের সঙ্গে এরা বসবে না। এতে এদের সম্মানের হানি হবে।
‘আমি ভাবছিলাম আজই কাজ শুরু করব।’ ‘করুন।”
‘আপনার বাবা আমাকে টাকাপয়সা কিছু দিয়ে যান নি। জিনিসপত্র কিনতে আমার কিছু খরচ আছে।
‘আপাতত খরচ করতে থাকুন। বাবা এলে বিল করবেন।
এত টাকা তাে আমার নেই। আপনি কি কোনাে ব্যবস্থা করতে পারেন? আমি কী ব্যবস্থা করব? | ‘আপনার বাবা বলেছিলেন, যে-কোনাে প্রয়ােজনে আপনাদের এক জন ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলতে-নিশানাথবাবু। কিন্তু তাঁর ঠিকানা আমাকে দিয়ে যান। নি।
‘আপনি অপেক্ষা করুন, আমি ম্যানেজার কাকুকে খবর দিয়ে নিয়ে আসছি। আপনাকে কি ওরা চা দিয়েছে?
‘চা পাঠিয়ে দিচ্ছি।
আপনার অসীম দয়া।
অপালা হেসে ফেলল। অসীম দয়া বলার ভঙ্গির জন্যে হাসল, না অন্য কোনাে কারণে, তা বােঝা গেল না। সে দোতলায় উঠে ম্যানেজার সাহেবকে টেলিফোনে আসতে বলল। নিশানাথবাবুকে এ-বাড়িতে সবাই ম্যানেজার ডাকে, তবে ম্যানেজারি ধরনের কোনাে কাজ উনি করেন না। উনি বসেন মতিঝিল অফিসে। গুরুত্বহীন কাজগুলি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে করেন। টাটকা মাছ কেনার জন্যে প্রায়ই ভােররাতে দাউদকান্দি চলে যান। এই জাতীয় কাজে তাঁর সীমাহীন উৎসাহ।।
অপালার টেলিফোন পেয়েই বললেন, এক্ষুণি চলে আসছি মা। এই ধর পাঁচ
মিনিট। এর সঙ্গে আরাে দু’মিনিট যােগ করে নাও, রাস্তাঘাটের অবস্থা তাে বলা যায়
না! ঠিক না মা?
‘তা তাে ঠিকই।’
‘এক মাইল চওড়া রাস্তা; এর মধ্যেও ট্রাফিক জ্যাম। দেশটার কী হচ্ছে, তুমি বল? একটা অনেস্ট অপিনিয়ন তুমি দাও … | নিশানাথবাবু বকবক করতে লাগলেন। তিনি দশ মিনিটের আগে টেলিফোন ছাড়বেন না। কথার বিষয় একটিই-দেশ রসাতলে যাচ্ছে। মুক্তির কোনাে পথ নেই। দেশের সব কটা মানুষকে বঙ্গোপসাগরে চুবিয়ে আনতে পারলে একটা কাজের কাজ হত ইত্যাদি।
| অপালা রিসিভার কানে নিয়ে সুযােগের অপেক্ষা করতে লাগল কখন বলা যাবে, কাকা, টেলিফোন রাখলাম।
| ফিরােজ ভেবেছিল একটি খুব সুদৃশ্য কাপে এক কাপ চা-ই শুধু আসবে। অন্য কিছুই থাকবে না। অসম্ভব বড়লােকরা এককথার মানুষ—যখন চায়ের কথা বলেন তখন শুধু চা-ই আসে, অন্য কিছু আসে না। অথচ প্রচণ্ড খিদে লেগেছে। ভাের সাতটায় পরােটা-ভাজি খাওয়া হয়েছিল, এখন বারটা দশ। খিদেয় নাড়ি পাক দিয়ে উঠছে। মেয়েটিকে দেখে মনে হচ্ছে সে এতটা হৃদয়হীন হবে না। সঙ্গে কিছু-না-কিছু থাকবে। এদের ফ্রীজ খাবারদাবারে সবসময় ভর্তি থাকে। চট করে চমৎকার একটা স্যাণ্ডউইচ বানিয়ে দেয়া এদের কাছে ছেলেখেলা। দু’টি রুটির মাঝখানে কয়েক টুকরাে পনির, শসার কুচি, এক চাকা টমেটো। ফ্রেঞ্চ ড্রেসিং-এর আধচামচ। গােলমরিচের গুড়। চমৎকার!
| কাজের মেয়েটি ট্রে নিয়ে ঢুকল। যা ভাবা গিয়েছে তাই। সুদৃশ্য কাপে চা এবং রুপপার একটা গ্লাসে এক গ্লাস হিমশীতল পানি। খিদে নষ্ট করার জন্যে ফিরােজ সিগারেট ধরাল। সেন্ট্রাল টেবিলে চমৎকার একটি অ্যাশটে। নিশ্চয়ই অনেক টাকা খরচ করে কেনা। একটি পরী নিচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পরীটির গা থেকে কাপড় খুলে যাচ্ছে। সে কাপড় সামলাতে ব্যস্ত। অগােছালাে কাপড়ের কারণে লজ্জায় তার গাল রক্তিম। এ জাতীয় অ্যাশট্রেগুলিতে কেউ ছাই ফেলে না। এতটা দুঃসাহস কারাে নেই। ফিরােজ ছাই দিয়ে সেটা মাখামাখি করে ফেলল। তার খুব ইচ্ছা করছে উঠে যাবার সময় এদের কোনাে একটা ক্ষতি করতে। কার্পেটের খানিকটা সিগারেটের আগুনে পুড়িয়ে দেয়া, কাপটা ভেঙে ফেলা। এ-রকম ইচ্ছা তার প্রায়ই হয়।
ম্যানেজার নামক জীবটির এখনাে কোনাে দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। মেয়েটি খবর দিয়েছে কি না কে জানে। নিজের ঘরে গিয়ে হয়তাে গান শুনছে কিংবা ভিসিআর-এ ‘আকালের সন্ধানে’ চালু করে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের চিন্তায় মগ্ন।
ফিরােজ কাপ হাতে নিয়ে জানালার পাশে এসে দাঁড়াল। ছাগল-দাড়ির এক লােক দু’টি অ্যালসেশিয়ানকে গােসল দিচ্ছে। সাবান দিয়ে হেভি ডলাডলি। কুকুর দু’টি বেশ আরাম পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। নড়াচড়া করছে না। লােকটি কুকুর দু’টির সঙ্গে ইংরেজি ভাষায় কথা বলছে। কাম কাম, সিট ডাউন, নটি বয়, বি কোয়ায়েট জাতীয় শব্দ শােনা যাচ্ছে। কুকুররা বিদেশি ভাষা এত ভালাে বােঝে কেন কে জানে। দেশি ঘিয়ে ভাজা কুত্তাকেও ‘কাম হিয়ার’ বললে কুঁই-কুঁই করে এগিয়ে আসে। ফিরােজের বাথরুম
পেয়ে গেল। কোনাে বাড়িতে গিয়ে ফট করে বলা যায় না—ভাই, আপনাদের বাথরুম কোথায় ? মালদার পার্টিদের ড্রইং রুমের পাশেই ব্যবস্থা থাকে। এখানে নেই। ড্রইং রুম নাম দিয়ে কুৎসিত একটা জিনিস বানিয়ে রেখেছে। ছাদ পর্যন্ত উচু শাে-কেসে রাজ্যের জিনিস। যেন একটা মিউজিয়াম। পয়সার সঙ্গে-সঙ্গে রুচি বলে একটা বস্তু নাকি চলে আসে। ডাহা মিথ্যে কথা। এই জিনিসটি সঙ্গে নিয়ে জন্মাতে হয়। | একটা পাঁচ বাজে। ম্যানেজারবাবুর দেখা নেই। ফিরােজের উচিত স্নামালিকম বলে উঠে যাওয়া। স্নামালিকুম বলারও কেউ নেই। অহঙ্কারী মেয়েটি এ-ঘরে আর ঢােকে নি। হয়তাে ভেবেছে এ-ঘরে ঢুকলেই থার্ড রেট একটি ছেলের সঙ্গে প্রেম হয়ে যাবে। আরে বাবা, প্রেম এত সস্তা নয়। হুট করে হয় না। হুট করে প্রেম হয় কনজারভেটিভ ফ্যামিলিগুলিতে। ঐ সব ফ্যামিলির মেয়েরা পুরুষদের সঙ্গে মিশতে পারে না, হঠাৎ যদি সুযােগ ঘটে যায়—তাহলেই বড়শিতে আটকে গেল। উপরতলার মেয়েদের এই সমস্যা নেই। কত ধরনের ছেলের সঙ্গে মিশছে! | ফিরােজ উঠে দাঁড়াল। শশা-কেসটির সামনে কিছুক্ষণ কাটানাে যায়। ভদ্রলােক দেশ-বিদেশ ঘুরে এত সব জিনিস এনেছেন, কেউ এক জন দেখুক। এই বাড়িতে যারা বেড়াতে আসে তাদের শাে-কেসও এ-রকম জিনিসে ভর্তি। এরা নিশ্চয়ই দেখার ব্যাপারে কোনাে উৎসাহ বােধ করে না। আর থাকা যায় না, চলে যাওয়া উচিত। ডেকোরেশনের ফার্মটা ভার হলে এতক্ষণে চলেই যেত। দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, ফার্মটা তার নয়। এক দিন যে এ-রকম একটা ফার্ম তার হবে, সে-রকম কোনাে নমুনাও বােঝ যাচ্ছে না।
ম্যানেজার বাবু ঠিক দেড়টার সময় এলেন। ফিরােজ প্রথম যে-কথাটি বলল, তা হচ্ছে—বাথরুমটা কোথায়, আপনার কি জানা আছে?
অনেকক্ষণ থেকেই টেলিফোন বাজছে। | অপালা বারান্দায় ছিল, শুনতে পায় নি। ঘরের দিকে রওনা হওয়ামাত্র শুনল। টেলিফোন বেজেই যাচ্ছে, আহানা জনি কে টেলিফোনের রিং হলেই অপালার কেন জানি মনে হয়, কেউ ব্যাকুল হয়ে ডাকছে। তার খুব একটা বড় সমস্যা। এই মুহূর্তেই তার কথা শােনা দরকার। এক বার সত্যি-সত্যি হলও তাই। রিসিভার তুলতেই ভারি মিষ্টি গলায় একটি মেয়ে বলল, ‘সালাম ভাইকে কি একটু ডেকে দেবেন? আমার খুব বিপদ।’
অপালা বলল, ‘সালাম ভাই কে? ‘আপনাদের একতলায় থাকে। প্লীজ, আপনার পায়ে পড়ি। আমাদের একতলায় তাে সালাম বলে কেউ থাকে না। ‘তাহলে এখন আমি কী করব?
বলতে-বলতে সত্যি-সত্যি মেয়েটি কেঁদে ফেলল। অপালা নরম স্বরে বলল, আপনার রং নাম্বার হয়েছে, আবার করুন, পেয়ে যাবেন। আমি রিসিভার উঠিয়ে
১০
রাখছি, তাহলে আর এই নাম্বারে চলে আসবে না।’
মেয়েটি ফোঁপাতে-ফোঁপাতে বলল, নাম্বার ঠিক হলেও লাভ হবে না। ওরা ডেকে দেয় না।’
‘তাই নাকি?
‘হ্যা। শুধু যূথী বলে একটা মেয়ে আছে, ও ডেকে দেয়। কে জানে, আজ হয়তাে যূথী নেই।
‘থাকতেও তাে পারে, আপনি করে দেখুন। | ‘আমাকে আপনি-আপনি করে বলছেন কেন? আমি মাত্র ক্লাস টেনে উঠেছি। আমাকে তুমি করে বলবেন।
| মেয়েটির সঙ্গে তুমি-তুমি করে কথা বলার আর সুযােগ হয় নি। তার টেলিফোন নাম্বার জানা নেই। মেয়েটিও অপালার নাম্বার জানে না। রং নাম্বারের একটি ব্যাপারে অল্প পরিচয়। কত দিন হয়ে গেল, এখনও সেই মিষ্টি গলার স্বর অপালার কানে লেগে আছে। টেলিফোন বেজে উঠলেই মনে হয়, ঐ মেয়েটি নয়তাে?
, ঐ মেয়ে না। সিঙ্গাপুর থেকে অপালার বাবা ফখরুদ্দিন টেলিফোন করেছেন। ‘কেমন আছ মা? ‘খুব ভালাে। ‘তােমার মা’র কোনাে চিঠি পেয়েছ?
আজ সকালেই একটি পেয়েছি। মা এখন প্রায় সুস্থ। সেকেও অপারেশনের ডেট পড়েছে? সে-সব কিছু তাে লেখেন নি। ‘এই মহিলা প্রয়ােজনীয় কথাগুলি কখনাে লেখে না। তুমি সন্ধ্যা সাতটা-সাড়ে সাতটার দিকে টেলিফোন করে জেনে নিও। এখানে সন্ধ্যা সাতটা মানে লণ্ডনে ভাের ছয়টা।
‘আচ্ছা, আমি করব।’ ‘খুব একা-একা লাগছে নাকি?” “না, লাগছে না। তুমি আসছ কবে? ‘আরাে দু’দিন দেরি হবে। কোনাে খবর আছে?
না, কোনাে খবর নেই।’ বসার ঘরটা নতুন করে সাজাতে বলে গিয়েছিলাম। কিছু হচ্ছে? ‘হা, হচ্ছে। ভীষণ রােগা আর লম্বা একটা ছেলে রােজ এসে কী—সব যেন করছে। তার সাথে মিস্ত্রি-টিস্ত্রিও আছে।”
কাজকর্ম কতদূর এগােচ্ছে? ‘তা তাে জানি না বাবা! আমি নিচে বিশেষ যাই না।
একটু বলে দিও তাে, যাতে আমি আসার আগে-আগে কমপ্লিট হয়ে থাকে। আমি এক্ষুণি বলছি। আর শােন, তােমার মাকে কিছু জানিও না। সে এসে সারপ্রাইজড় হবে। ‘আচ্ছা।’
ঐ ছেলেটার নাম কি?
কোন ছেলেটার? ‘কাজ করছে যে। ‘নাম তাে বাবা জানি না। জিজ্ঞেস করি নি। নাম দিয়ে তােমার কী দরকার?
‘কোনাে দরকার নেই। মতিন বলে একটা ছেলেকে দিতে বলেছিলাম। ওর কাজ ভালাে। কিন্তু তুমি তাে বলছ রােগা, লম্বা। ঐ ছেলে তাে তেমন লম্বা নয়।
‘আমি নাম জিজ্ঞেস করব। যদি দেখি ও মতিন নয়, তাহলে কী করব?
‘কাজ বন্ধ রাখতে বলবে। আমি স্পেসিফিক্যালি বলেছি মতিনের কথা। তােমার পরীক্ষা কেমন হচ্ছে মা?
‘তালাে হচ্ছে না।
খুব বেশি খারাপ হচ্ছে? ‘কেমন যেন মাঝামাঝি হচ্ছে! মাঝামাঝি কোনাে কিছুই আমার ভালাে লাগে না।
ফখরুদ্দিন সাহেব উঁচু গলায় হাসতে লাগলেন। অপালার এই কথায় হঠাৎ করে । তিনি খুব মজা পেলেন।
‘আচ্ছা মা, রাখলাম। ‘তুমি ভালাে আছ তাে বাবা? ‘অসম্ভব ভালাে আছি। খােদা হাফেজ।
অপালা নিচে নেমে এল। ঐ ভদ্রলােক বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে আছেন। তার সঙ্গের দু’ জন লােক করাত দিয়ে কাঠ টুকরাে করছে। অপালা বসার ঘরে উকি দিল। সমস্ত ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে আছে। পেইনটিংগুলি নামিয়ে রাখা হয়েছে, শাে-কেসটি নেই। কার্পেট ভাঁজ করে এক কোণায় রাখা। অপালা বলল, আপনি কেমন আছেন?
ফিরােজ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। ‘আমাকে বলছেন? ‘হ্যা, আপনাকেই। আপনার নাম কি মতিন? ‘আমার নাম মতিন হবে কী জন্যে? আমার নাম ফিরােজ। ‘আপনার নাম ফিরােজ হলে বড়াে রকমের সমস্যা কাজ বন্ধ।’
কাজ বন্ধ মানে?’ ‘কাজ বন্ধ মানে হচ্ছে আপনি আপনার জিনিসপত্র গুছিয়ে বাড়ি চলে যাবেন।
ফিরােজের মুখ হাঁ হয়ে গেল। যেন এমন অদ্ভুত কথা এর আগে সে শশানে নি। অপালা হেসে ফেলল। সে অবশ্যি হাসি মুহুর্তের মধ্যেই সামলে ফেলল। শান্ত গলায় বলল, ‘বাবা টেলিফোনে বললেন, মতিন নামের একজনের নাকি কাজটা করার কথা।
| কিন্তু আমি তাে ঠিক তার মতােই করছি।
‘আপনি করলে হবে না।’ ‘মতিন এখন ছুটিতে আছে। তার বড়াে বােনের অসুখ। বরিশাল গেছে।
বরিশাল থেকে ফিরে এলে আবার না-হয় করবেন। | ফিরােজ সিগারেট ধরাল। মেয়েটির কথা তার এখন বিশ্বাস হচ্ছে না। মনে হচ্ছে সে ঠাট্টা করছে। যদি ঠাট্টা না হয়, তাহলে তার জন্যে বড়াে ধরনের ঝামেলা অপেক্ষা করছে। এই কাজটি সে জোর করে হাতে নিয়েছে। করিম সাহেবকে বলেছে, কোনাে
অসুবিধা নেই, মতিনের চেয়ে কাজ খারাপ হবে না। করিম সাহেব বিরক্ত হয়ে বলেছেন, “আরে না। ভদ্রলােক মতিনের কথা বলেছেন।
| ‘আমি নিজে তাঁর মেয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। সে বলেছে, আমি করলেও চলবে। কাজ ভালাে হলেই চলবে। | ‘দেখেন, পরে আবার ঝামেলা না হয়। বড়লােকের কারবার। মুডের উপর চলে। মাঝখানে যদি বন্ধ করে দেয়…..’
‘পাগল হয়েছেন! কাজ দেখে চোখ ট্যারা হয়ে যাবে।

চলবে……