blind love পর্ব ৫

0
1999

#Blind_Love পর্ব-৫
#লেখায়ঃপ্রজাপতি(Nosrat Monisha)

পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারি হয়।সেই ভার যাতে বহন করতে না হয় তার জন্য অপারেশন থিয়েটারের বাহিরের করিডোরে জায়নামাজে বসে কান্না করছে তালহা।
সব কিছু হারিয়ে যাদের জন্য বেঁচে আছে আজ তারাই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে।আপনজনের লাশ বার বার কেন তাকেই বইতে হবে?এমন হাজারো প্রশ্ন নিয়ে আল্লাহর কাছে নিজর স্ত্রী-সন্তানের সুস্থতা চাইছে।
——-।।।——–।।।——।।।——–

দেয়ালে ঘুষি দিয়ে হাত থেকে রক্ত বের করে ফেললো সিফাত। মা-ছেলেকে সে ছুঁতেও পারছে না । সব আইন কেন শুধু যারা আইন মানে তাদের জন্য প্রযোজ্য ? আইরিন আর ফারাবির মতো শয়তানদের জন্য কেন কোন আইন নেই?
আলমারির পেছনের যে দরজা তখন সিফাতের টিমের নজর এড়িয়ে গিয়ছিল;সেই দরজা ভেঙ উদ্ধার করা হয়েছিল তোয়া আর পলিকে। সিফাতরা ভেতরে গিয়ে যা দেখেছিলো তার চেয়ে ভয়ংকর কিছু হয়তো পৃথিবীতে কেউ কখনো দেখে নি।আধমরা তোয়া’র হাতে হাতুড়ি দিয়ে ক্রমাগত আঘাত করে যাচ্ছে ফারাবি। পুলিশের দরজা ভাঙার শব্দ শুনে আইরিন পলির গলায় ছুরি চালিয়ে দেয়।
আশ্চার্যের বিষয় হলো,গ্রেফতারের সময় ওরা কেউই কোন প্রকার বাধাই দেয় নি,বরং নিজেরা গিয়ে পুলিশের গাড়িতে বসেছে।সিফাত পলি আর তোয়াকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছিলো।
সিফাতের ইচ্ছে করছিল মা-ছেলেকে এমন শাস্তি দিতে যাতে, কেউ এমন কিছু করার আগে মরে যাওয়া ভালো মনে করে।কিন্তু অপরাধী নিজের অপরাধ স্বীকার করছে এমনকি বাকি লাশগুলোর সন্ধানও দিয়েছে তাই তাদের গায়ে হাত তোলার অধিকার আইন দিচ্ছে না।
সিফাত যখন খুন করার কারণ জিজ্ঞেস করেছে তখন দুজনেই অদ্ভুত উত্তর দিয়েছে তাই আইনানুসারেই সাইক্রিয়াটিস্টকে ডেকেছে সে।
–দেয়ালে ঘুষি দিয়ে হাত ভাঙাও মানসিক অসুস্থতার লক্ষণ। (সিফাত পিছন ফিরে দেখলো চল্লিশোর্ধ ছিপছিপে গড়নের এক ভদ্র মহিলা কলাপাতা রঙের শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে।ইনিই হলেন সাইক্রিয়াটিস্ট রাবাব ফাতিমা)
–ম্যাম,আমার রোগ পরে ভালো করবেন। যাদের জন্য এসেছেন আগে তাদের থেকে অপরাধের কারন বের করুন।
–এতো রাতে ডেকেছেন তার উপর আপনার রাগ দেখে বুঝতে পারছি যে, ঘটনা সিরিয়াস।তাই ওদের অপরাধের বণর্না করুন।

সিফাত ততটুকু বললো যতটুকু সে জানে।তোয়া আর পলির অবস্থার কথাও বললো।
–ছেলেটা খুনের কারণ হিসেবে বলেছে,সে আনন্দ পেয়েছে। আর তার মা বলেছে ছেলেকে ভালো করার জন্য মেয়েদের এনে দিয়েছে আর পলি ম্যামকে নিজের মনের আনন্দের জন্য মেরেছে।(সিফাত)
–আমি আমার পুরো ক্যারিয়ারে এ ধরনের কেস দেখবো ভাবিনি।ছাত্রজীবনে এরকম কেস পড়েছিলাম কিন্তু ঘটনাগুলো ঘটে ছিলো বাহিরের দেশে।(চিন্তিত হয়ে ফাতিমা বললো)
–আপনি এদেশের সেরা দশ সাইক্রিয়েটিস্টদের একজন।তাই আপনাকে ডেকে পাঠানো। আমার মনে হচ্ছে মা ছেলে পাগলের অভিনয় করে শাস্তি থেকে বাঁচতে চাইছে।
–হুম চলুন আগে ছেলেটার কাছে যাই।

—–।।।—–।।।——।।।—

অপারেশন থিয়েটার থেকে পলিকে বের করে আই.সি.ইউ তে দেওয়া হয়েছে।তালহা অস্থির হয়ে ডক্টরকে জিজ্ঞেস করলো,
–আমার স্ত্রী ঠিক হয়ে যাবে তো ডক্টর?
–দেখুন আপাদত বিপদ কেটে গেছে।তবুও উনাকে আমরা ২৪ ঘন্টা অবজারভেশনে রাখছি।তবে একটা কথা জানিয়ে দেওয়া ভালো।
–কি কথা ডক্টর?
–আপনার স্ত্রী প্রাণে বেঁচে গেছে।কিন্তু উনার শরীরে যে ড্রাগ ইনজেক্ট করা হয়েছে তার থেকে উনার রিকভারি করা মুশকিল। প্রচুর রক্তক্ষরণের ফলে রিকভারি চান্স মাত্র ৪থেকে৫ পার্সেন্ট। উনার ফুল বডি প্যারালাইজড হয়ে গেছে।তাছাড়া
–আর কি?
–জিহ্বা কাটার ফলে উনি আর কোনোদিন কথা বলতে পারবেন না।
–লাগবে না।কিচ্ছু লাগবে না।আমি শুধু চাই মানুষটা বেঁচে থাকুক।

——-।।——-।।।——।।—-

সেল -২।
মুখোমুখি বসে আছে ফারাবি আর রাবাব ফাতিমা।
–একুশটা খুন করেছো তুমি?
–হিসাবে ভুল করছেন আপনি।সংখ্যাটা বাইশ হবে।আজকের মেয়েটা মরলে তেইশ।(এত স্বাভাবিকভাবে কথাটা বললো ফারাবি যেন খুন করা পানি খাওয়ার চেয়ে সহজ)
–সেই মেয়েটা কে ছিলো তার লাশ কোথায়?
–সে মরে যাবার পর মা তার লাশ কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছিল।সে ছিলো আমার একমাত্র ভালোবাসা ছিলো রাফিদা।
–ভালোবাসার মানুষের গায়ে আঁচড় লাগলে কান্না আসে আর তুমি তাকে মেরে ফেললে?
–প্রথম রাগের ঘটনা আমি মনে করতে পারি, যখন রাগ করে ফুলের গাছ নষ্ট করে ছিলাম। আম্মু পরদিন নতুন একটা গাছ এনেছিলো হুবহু একই।আদরের বিড়াল মেরে ফেলার পরও একইরকম বিড়াল এনেছিলো।
–তাই তুমি ভেবেছো আরেকটা রাফিদাও নিয়ে আসবে?
–এনেছে তো আজকের মেয়েটা অবিকল রাফিদার মতো।কি নিষ্পাপ চেহারা।ভেবেছিলাম মারব না কিন্তু সে নিজের বাড়ি যেতে চাইছিলো।
–কেনো মেরেছিলে রাফিদাকে?
–বড্ড খিটখিটে হয়ে গিয়েছিল সে।আম্মু আমাকে সবসময় একটা জিনিস শিখিয়েছে কোন প্রশ্ন নয় আর যদি কেউ উত্তর না দিতে চায় ভুলেও ২য় বার প্রশ্ন নয়।কিন্তু রাফিদা সেই কাজটাই বারবার করত। একদিন সব ঝগড়া থামলো তাও সে আবার প্রশ্ন করলো।রাগের মাথায় থাপ্পড় দিলাম।তাতেই বলে আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।তাই তাকে রড দিয়ে মারলাম। খুব মজা লাগছিলো ওর রক্ত দেখে।কিন্তু কখন যে মরে গেল বুঝতে পারি নি।
–আর বাকিদের?
–তাদের দেখলে আমার গা জ্বলে ওঠতো। কেউ রাফিদার মতো ছিলো না।কিন্তু ওদের যন্ত্রণামাখা চিৎকারে আমার ভালো লাগত।
–তোমার কখনো খারাপ লাগে নি?
–আমার শুধু রাগ হয়।খারাপ লাগা কি তা আমি বুঝি না।
–তোমার যদি ফাসি হয়।
–আমার মা আমাকে বাচিয়ে আনবে।
–সেই মায়ের যদি ফাসি হয়?
–তো?তাতে কি? মা মরে গেলে ভালো হবে।
–কেন?
–মা আমাকে কখনো কারো সাথে কথা বলতে দিতো না।কথা বললে শাস্তি দিতো।এখন মা মরে গেলে সবার সাথে কথা বলবো। (বলে ফারাবি হাসতে লাগলো আর হাততালি দিতে লাগলো)
–হুম। আচ্ছা মা তোমাকে মারতো?
–না। শুধু কথা বলত না আর খাবার দিতো না।
–আচ্ছা আজ আমি যাই।
–ঠিক আছে।
সেল থেকে বের হলেন রাবার ফাতিমা।

–ছেলেটা অভিনয় করছে, তাইতো ম্যাম?(সিফাত)
–কিছু বলা যাচ্ছে না।কোন সিদ্ধান্তের নেওয়ার আগে আমি ওর মায়ের সাথে কথা বলবো।
–চলুন ওইদিকে।
—।।—–।।।——।।—–
তোয়া’র অপারেশন চলছে পাঁচ ঘন্টা ধরে।যে-ই ভেতর থেকে বের হচ্ছে তাকেই তালহা জিজ্ঞেস করছে আমার মেয়ে কেমন আছে।সবার একই উত্তর এত জঘন্য অত্যাচার হয়েছে ওর উপর যে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ডক্টর বের হলো অপারেশন শেষে।
–স্যার আমার মেয়ে?
–এখন কিছু বলা যাচ্ছে না। ওকে এখনকার মতো আই.সি.ইউ তে ৭২ঘন্টা অবজারভেশনে রাখছি।জীবনের মালিক আল্লাহ, দোয়া করুন।
——-।।—–।।।——-।।—–
সেল-১
–আমি কতবার বলবো আমি যা করেছি আমার ছেলেটাকে ভালো করার জন্য করেছি।(চিৎকার করে বলে উঠলো আইরিন)
–আইরিন চিৎকার করলে মিথ্যেটা সত্যিতে পরিণত হয়ে যায় না।আমি কোন পাঁচ বছরের বাচ্চা নই যে আপনার মিথ্যেগুলো বিশ্বাস করব। দুনিয়ার কোন সাইক্রিয়াটিস্ট বলবে না বাচ্চা কোন কিছু নষ্ট করলে আরেকটা এনে দিতে।ভুল করলে সে ভুল না শোধরে,তাকে আরও ভুল করার উৎসাহ দিতে।সত্যিটা বলুন।
–আজ অবধি সবাই বিশ্বাস করেছে।এমনকি ঐ মেয়েটাও। তাহলে তোর সমস্যা কি?
–আমার সমস্যা আমি একজন সাইক্রিয়াটিস্ট। আপনার মিথ্যেগুলো আমার কাছে ধরা পরে গেছে।
–হ্যাঁ।।হ্যাঁ।।।হ্যাঁ, আমি কোন দিন ছেলের জন্য কোন মানসিক ডাক্তারের কাছে যাই নি।আমার ছেলের যখন যা প্রয়োজন সব দিয়েছি।কোন কিছু নষ্ট করে মন খারাপ করলে আবার এনে দিয়েছি। মেয়েগুলোও সে জন্যই।তাছাড়া ওরা পতিতা আর আমি টাকা দিয়েছি।
–জীবন টাকা দিয়ে কেনা যায় না,আইরিন।সেটা আপনি বুঝবেন কি-না বলতে পারছি না।কিন্তু তোয়া আর পলির উপর আপনি আপনার ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটিয়েছেন তাই-না?
–যে জীবনটা আমার হবার কথা ছিলো সেই জীবন তালহা পলির সাথে উপভোগ করছিলো।সেদিন স্কুলের বাইরে ওদের তিনজনকে হাসতে দেখে আমার পুরোনো ঘা তাজা হয়ে ওঠে।তাই আমি তালহার মেয়েটাকে ফলো করি।মেয়েটা খুব হেল্পফুল।তাই অসুস্থ হবার ভান করি ওকে বাসায় পৌঁছে দিতে বলি। কিন্তু একটা বাচ্চা পিছনে ডাকায় রিকশায় বসে তোয়াকে অজ্ঞান করে ফেলি আর বাসায় নিয়ে আসি।তারপর আমার ছেলের হাতে তুলে দেই।
–কি আছে আপনার আর ওদের দুজনের অতীতে?
আইরিন দাঁত বের করে বিদঘুটে হাসি দিয়ে বললো,
–সেটা আপনাকে ওদের মুখ থেকে শুনতে হবে।ওহ!! পলি তো নিজের মুখে আর কিছু বলতেই পারবে না।তালহাকে জিজ্ঞেস করুন ও যদি নিজের কালো অতীত আপনাকে বলে।

ফাতিমা বুঝতে পারল এখানে আর কথা বলে লাভ নেই। তাই বেরিয়ে এলো।

–তালহা সাহেব কি হাসপাতালে?
–বউ বাচ্চার এমন অবস্থায় মানুষটা আর কোথায় থাকবে?কেন?
–চলুন হাসপাতালে যাই।
–এই মাঝরাতে?তাছাড়া এই পরিস্থিতিতে কি স্যারের সাথে কথা বলাটা কি ঠিক হব?
–দেখুন ঐ বাচ্চার সাথে কেন এমন হল তা আমাকে আজকেই জানতেই হবে।সেজন্যই আমাকে আাগে ওদের অতীত জানতে হবে।
–কিন্তু?
–কোন কিন্তু নয়। আপনি সাথে না গেলে আমি একাই যাবো।
–না আমিও যাচ্ছি চলুন।
—-।।——।।।——।।—–

আই.সি.ইউ ‘র বাইরে দাঁড়িয়ে চোখের পানি ফেলছে তালহা।ভাবছে সেদিন যে কথা পলিকে দিয়েছিলো তা সে রাখতে পারেনি।পলিকে বলেছিল ওর আর কোন ক্ষতি সে হতে দিবে না কিন্তু আজ সে ব্যর্থ।
ওর উচিত ছিলো আইরিনকে শাস্তি দেওয়া । তাহলে হয়তো তোয়ার সাথে এমন কিছু ঘটতো না।
–স্যার…..(সিফাতের ডাকে তালহার ভাবনায় ছেদ পড়লো)
–আপনি।একি মিসেস রাবাব ফাতিমা আপনি এতো রাতে এখানে?
–স্যার আসলে আমি উনাকে আটকাতে চেয়েছিলাম কিন্তু একপ্রকার জোর করেই চলে এসেছেন।
–আচ্ছা।এখন আমাকে বলতে দিন।আপনার স্ত্রী আর তোয়া কেমন আছে?(ফাতিমা)
–অপারেশন শেষ।পলি বিপদমুক্ত কিন্তু তোয়া’র কথা বলা যাচ্ছে না।
–তালহা সাহেব আমি অতীতটা জানতে চাই এক্ষুনি।নাহলে খুনিদের শাস্তি দেওয়া কঠিন হয়ে যাবে।(ফাতিমা)
–চলুন করিডরে।সিফাত আপনি একটু থাকুন কখন কি লাগে।
–স্যার আপনি ভাবেবন না আমি আছি। কোন কিছু হলেই খবর দিবো।

তালহা আর ফাতিমা হাসপাতালের করিডোরের দিকে যাচ্ছে ;পলি, তালহা আর আইরিনের অতীতের দরজা খুলতে।

চলবে–?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে