Friday, June 5, 2026







বর্ষণের সেই রাতে- ২ পর্ব-১৮+১৯

#বর্ষণের সেই রাতে- ২
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল

১৮.

হালকা হালকা হাওয়া বইছে চারপাশে। সেই বাতাসের মৃদু শো শো শব্দ ছাড়া আর কোন আওয়াজ নেই। মুগ্ধ হয়ে আদ্রিয়ানের গান শুনতে শুনতে কখন যে আদ্রিয়ানের কাঁধে মাথা দিয়ে ফেলেছে বুঝতে পারেনি অনিমা। আদ্রিয়ান টের পেলেও কিছু বলল না। কারণ ব্যাপারটা ওর মন্দ লাগেনি। গান বন্ধ হওয়ার পরেও অল্প কিছুক্ষণ অনিমা একটা ঘোরে ছিল। যখন টের পেল আদ্রিয়ান থেমে গেছে অনিমা চোখ খুলে তাকাল আদ্রিয়ানের কাঁধে মাথা এলিয়ে রেখেই তাকাল আদ্রিয়ানের দিকে। মাথা তুলতে মোটেও ইচ্ছা করছেনা ওর। তাই লজ্জা সংকোচ সব ভুলে আদ্রিয়ানের চোখে চোখ পরার পরেও মাথা না সরিয়ে বলল,

” আপনার ভয়েজে ম্যাজিক আছে জানেন। শুনলেই মন ফুরফুরে হয়ে যায়। এই জন্যেই সবাই আপনাকে এতো ভালোবাসে।”

আদ্রিয়ান ঠোঁটে হালকা হাসি ঝুলিয়ে বলল,

” সবাই?”

” হ্যাঁ সবাই।”

” তারমানে তুমিও ভালোবাসো।”

” হ্যাঁ বাসিতো।”

কথাটা বলে সাথেসাথে জিবে কামড় দিয়ে আদ্রিয়ানের কাধ থেকে মাথা সরিয়ে ফেলল। ও তো ওতোকিছু ভেবে চিন্তে বলেনি। মুখ ফসকে বলে ফেলেছে। এখন তাকাতেও লজ্জা করছে আদ্রিয়ানের দিকে। আর আদ্রিয়ান ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ঝুলিয়ে তাকিয়ে আছে অনিমার দিকে। ব্যাপারটায় খুব মজা পেয়েছে ও। তাই একটু খোঁচা মেরেই বলল,

” সিরিয়াসলি? ইউ লাভ মি?”

অনিমা এবার আরও লজ্জা পাচ্ছে। গলা দিয়ে আওয়াজ বেড় হওয়াটাও এখন মুসকিল হয়ে যাচ্ছে। অনেক কষ্ট করেই বলল,

‘ না আ-আসলে অামিও আপনার একজন ভক্ত। তাই আপনার সব ভক্তরা আপনাকে যেভাবে ভালোবাসে সেভাবেই..”

আর কিছুই বলতে পারলনা কারণ গলার স্বর আটকে আসছে। চরম একটা অস্বস্তিকর অবস্থায় পরে গেছে ও। আদ্রিয়ান একটু গলা ঝেড়ে বলল,

” সবাই যেরকম ভালোবাসে, তুমিও কী সেরকমই ভালোবাসো নাকি..”

আদ্রিয়ান অার বলতে না দিয়ে অনিমা উঠে চলে যেতে নিলো। কিন্তু ও যাওয়ার আগেই আদ্রিয়ান হাত ধরে ফেলল। অনিমা স্বাভাবিকের চেয়ে খানিকটা জোরে শ্বাস নিচ্ছে। আদ্রিয়ান নিজের সেই বিখ্যাত আড়াআড়ি স্টাইলে ভ্রু বাঁকিয়ে বলল,

” মায়াবিনী, তুমি জানো তোমার এই লজ্জামাখা মুখেও কতটা মায়া থাকে। উফ! ঘায়েল করা মায়া। এতো মায়া নিয়ে বেঁচে আছো কীকরে বলোতো? তোমাকে যদি কোন মায়া সম্রাজ্যে সম্রাজ্ঞীও ঘোষণা করে দেই সেটাও কম পরে যাবে।”

আদ্রিয়ান এরকম কথায় অনিমার লজ্জার মাত্রা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে পুরো। যাওয়ার জন্য হাত ছাড়াতে চাইলে আদ্রিয়ান আরো শক্ত করে হাত ধরে বলল,

” যাচ্ছো কোথায়?”

অনিমা পেছনে না তাকিয়েই বলল,

” নিচে।”

” কোথাও যেতে হবেনা চুপচাপ বসো।”

অনিমা অসহায় দৃষ্টিতে একবার আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে চুপচাপ ওর পাশে বস পরল। কারণ অনিমা এটা ভালোভাবে জানে আদ্রিয়ান যখন একবার বলে দিয়েছে বসতে তখন ওকে বসতেই হবে সেটা যেকোন কিছুর মূল্যেই। ছেলেটা এমনই একটু জেদি টাইপ। এমনিতে জোর খাটায় না, কিন্তু যখন খাটায় ভালোভাবেই খাটায়। আদ্রিয়ান ছোট্ট শ্বাস ফেলে বলল,

” তোমাকে নিয়ে কোথাও এখনও ঘুরতে যাওয়া হয়নি। সবসময় বাড়ি টু ভার্সিটি। ভার্সিটি টু বাড়ি। বোর হচ্ছো নিশ্চয়ই? যাবে কোথাও?”

অনিমা অবাক হয়ে তাকাল আদ্রিয়ানের দিকে। অবাক কন্ঠেই বলল,

” আমি?”

আদ্রিয়ান আশেপাশে কাউকে খোঁজার ভান করে বলল,

” এখানে আর কেউ আছে?”

” না মানে। আপনি আমায় নিয়ে বেড় হলে সবাই তো দেখে ফেলবে। নিউসও করে ফেলতে পারে।”

আদ্রিয়ান কথাটায় পাত্তা না দিয়ে বলল,

” চিন্তা করোনা। কেউ চিনবেনা আমাকে।”

” আপনাকে চিনবেনা? সেটাও হয়?”

” হয় বেবি। জাস্ট একটু টেকনিক ইউস করতে হয়। যেটা ইউস করে আমি এর আগেও অনেক জায়গায় গেছি দরকারি কাজে। কালকে তো ভার্সিটি অফ আছে না? কালকেই দেখতে পাবে।”

অনিমা কিছু না বলে চুপ করে রইল। এই ছেলের এতো রহস্য এতো হেয়ালি বোঝার ক্ষমতা ওর নেই। তাই চুপ থাকাটাই আপাতত শ্রেয়। কিছুক্ষণ আড় চোখে আদ্রিয়ানকে দেখে হঠাৎ কিছু একটা ভেবে অনিমা বলল,

” আচ্ছা আপনিতো এতো বড় একজন সেলিব্রিটি, গার্লফ্রেন্ড আছে নিশ্চয়ই?”

আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে বলল,

” এটা কোথায় লেখা আছে যে সেলিব্রিটিদের গার্লফ্রেন্ড থাকতেই হবে।”

অনিমা হেসে দিয়ে বলল,

” না তা লেখা নেই কোথাও। কিন্তু ভালোলাগার বা ভালোবাসার কেউ নিশ্চয়ই আছে?”

অাদ্রিয়ান হালকা একটু হেসে বলল,

” হ্যাঁ তা আছে। প্রথম দেখা থেকেই আমার ক্রাশ। আর নাও আই থিংক আই নিড হার ব্যাডলি। ভালোবাসাও বলতে পারো।”

অনিমা চমকে উঠল। সাথেসাথে বুক ভার হয়ে উঠল ওর। এটা কী বলল আদ্রিয়ান? অন্যকাউকে ভালোবাসে সে? অনিমা একটা ঢোক গিলে বলল,

” কিছুক্ষণ আগের গানটা কী তার জন্যেই ছিল?”

” অবশ্যই। ওসব কথা আমি তাকে ছাড়া অন্যকাউকে ডেডিকেট করার কথা ভাবতেও পারিনা। আমার অস্তিত্বের সবকিছুতেই ধীরে ধীরে মিশে যাচ্ছে ও। ওকে ছাড়া থাকার কথা এখন আর চিন্তাও করতে পারিনা আমি।”

অনিমার গলাটা ধরে আসছে এবার। আদ্রিয়ানও কাউকে এভাবে ভালোবাসে? কিন্তু এতোদিনতো সেরকম কিছু বোঝেনি। বরং আদ্রিয়ানের ব্যবহারে তো ও অন্যকিছু ভেবে ফেলেছিল। অনিমা কাঁপা কন্ঠে বলল,

” কে সে? ইন্ডাস্ট্রির কেউ?”

” সে..”

আদ্রিয়ান আর কিছু বলবে তার আগেই আদ্রিয়ানের ফোন বেজে উঠল। হঠাৎ এমন করে ফোন বেজে ওঠায় অবাক হয়ে গেল আদ্রিয়ান। এইসময় পার্সোনাল নাম্বারে কে কল দেবে। ফোনটা বের করে স্ক্রিনে তাকিয়ে অনিমার দিকে তাকাল। অনিমাও দেখতে পেলো যে স্ক্রিনে স্মৃতি নামটা ভেসে উঠছে। আদ্রিয়ান অনিমাকে বসতে বলে আদ্রিয়ান উঠে একটু দূরে গিয়ে রেলিং এর কাছে গিয়ে ফোন রিসিভ করে কথা বলতে শুরু করল। অনিমা তাকিয়ে আছে আদ্রিয়ানের দিকে। হেসে হেসেই কথা বলছে। এমন মনে হচ্ছে কলটা পেয়ে খুব খুশিই হয়েছে। বেশ অনেকটা সময় কেটে গেলেও আদ্রিয়ান কথা বলেই যাচ্ছে। ওর কী খেয়াল নেই অনিমা একা বসে আছে ওখানে। আদ্রিয়ানকে এতো রাতে একটা মেয়ে কেন ফোন করল? তাও এতো কী কথা বলছে? এটাই হয়তো আদ্রিয়ানের সেই প্রেমিকা। আর তাহলে তো এতক্ষণ কথা বলাটাও স্বাভাবিক। ভালোবাসার মানুষটার সাথে কথা বলতে তো সবারই ভালো লাগে। আদ্রিয়ানেরও লাগছে হয়ত। কিন্তু ওর এমন কেন লাগছে? নিশ্বাস ভারী হচ্ছে কেন? ও কী আদ্রিয়ানের প্রতি দূর্বল হয়ে পরেছে? হয়ত পরছে। ওও তো ভেবে নিয়েছিল যে আদ্রিয়ানও ওর প্রতি দূর্বল। কিন্তু এখন বুঝতে পারছে এসব আকাশ-কুসুম ভাবনা ছিল। কোথায় ও আর কোথায় আদ্রিয়ান। ওর মত মেয়েকে আদ্রিয়ান ভালোবাসবেই বা কেন? বাড়িতে থাকতে দিয়েছে, সহানুভূতি দেখিয়ে ভালো করে কথা বলছে, হয়ত একসাথে থাকছে বলে মায়াও পরে গেছে। কিন্তু তারমানেতো এটা না যে আদ্রিয়ানের মনে এরকম কোন অনুভূতি থাকবে। এসব ভেবে আবারও আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখল ও এখনও কথা বলছে। এখানে আর থাকতে ভালো লাগছে না অনিমার। তাই উঠে নিচে এসে নিজের রুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর দিয়ে বন্ধ করে দিল। তারপর ড্রয়ার খুলে একটা স্লিপিং পিল খেয়ে চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পরল। চোখ দিয়ে একফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পরল। সেটা দ্রুত মুছে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করতে লাগল। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়েও গেল।

_____________

রাত সাড়ে তিনটা বাজে। রিকে মেজাজে আজ ভীষণ খারাপ। চৌধুরী বাড়িতে আজ ছোটখাটো একটা টর্নেডো হচ্ছে। রিক নিজের রুমের সবকিছু ভেঙ্গে ফেলে দিচ্ছে। এতো রাতে এরকম ভাঙচুর এর আওয়াজে পেয়ে সবার ঘুম ভেঙ্গে যায়। রঞ্জিত চৌধুরী, মিসেস চৌধুরী, স্নিগ্ধা সবাই উঠে চলে এলে, সার্ভেন্টগুলোও আড়াল থেকে লুকিয়ে দেখছে। কিন্তু রিকের কাছে যাওয়ার সাহস কেউ পাচ্ছেনা। ইতিমধ্যে কবির শেখকে ফোন করা হয়ে গেছে। কেউ থামাতে পারবেনা তাই আস্তে আস্তে চলে গেল সবাই স্নিগ্ধা বাদে। আজ স্নিগ্ধাও সাহস পাচ্ছেনা রিকের ধারেকাছে যেতে। তবুও অনেক সাহস নিয়ে ভেতরে গিয়ে বলল,

” রিক দা এমন কেন করছ। শান্ত হও প্লি..”

স্নিগ্ধা কথাটা শেষ করার আগেই রিক একটা শো পিচ নিয়ে স্নিগ্ধার পায়ের কাছে ভাঙল। স্নিগ্ধা ভয়ে লাফিয়ে উঠল। রিক গিয়ে স্নিগ্ধার হাত ধরে কাছে নিয়ে এসে হাত মুচড়ে ধরে বলল,

” তোকে বলেছিলাম যে বেশিদিন থাকিস না তোদের বাড়িতে কিন্তু তুই শুনলিনা। তুই থাকলে আজ ঐ মেয়েটা পালাতো না। নিজের বাড়িতে কদিন কম থাকলে মরে যেতি?”

স্নিগ্ধার ভীষণ লাগছে, রাগও হচ্ছে। ইচ্ছে করছে রিককে কয়েকটা কড়া কথা শুনিয়ে দিতে। কিন্তু এখন সে খুব বেশিই রেগে আছে তাই আগুনে ঘি ঢালা যাবেনা। তাই ঠোঁট চেপে ধরে চোখ বন্ধ করে ফেলল। রিক স্নিগ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল স্নিগ্ধার চোখে কোণে জল জমেছে। চোখ মুখ কুচকে আছে ব্যাথায়। রিক ঝাড়া দিয়ে স্নিগ্ধাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,

” যা এখান থেকে।”

স্নিগ্ধা ভাঙা গলায় বলল,

” প্লিজ একটু..”

” যেতে বলেছি আমি তোকে।”

রিকের ধমক খেয়ে স্নিগ্ধা আর কিছু বলতে পারল না। মাথা নিচু করে চলে গেল ওখান থেকে। রিক বিছানায় বসে দুহাতে নিজের মুখ চেপে ধরল। কিছুই ভালো লাগছেনা ওর। এই মুহূর্তে অনিমার জন্য ওর কষ্টের চেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে। ওই মেয়েটাকে এখন হাতের কাছে পেলে কী করত সেটা ও নিজেও ভাবতে পারছেনা। হঠাৎ কেউ বলে উঠল,

” বাবাই আসবো।”

রিক সেদিকে না তাকিয়েই দুহাতে মুখ চেপে ধরে রেখে বলল,

” এতো রাতে এখানে কেন এসছো?”

কবির শেখ ভেতরে এসে রুমের চারপাশে চোখ বুলিয়ে রিকের পাশে গিয়ে বসে বলল,

” আবার ভাঙচুর করেছ?”

রিক নিজের চুল টেনে ধরে বলল,

” মামা প্লিজ চলে যাও। আমি চাইনা তোমার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে।”

” সেটা করে যদি তোমার মাথা ঠান্ডা হয়, তাহলে করো।”

” মামা প্লিজ।”

” বাবাই, শান্ত হও।”

রিক এবার মাথা তুলে কবির শেখের দিকে তাকিয়ে তাঁর দুইহাত ধরে বলল,

” মামা প্লিজ ওকে এনে দেওনা। যেখান থেকে পারো, যেভাবে পারো এনে দাও। ড্যাড ওকে লুকিয়ে রেখেছে না? আচ্ছা ফাইন। তোমরা যা বলবে আমি তাই করব। পার্টি জয়েন করতে হবে তো? করব, ইভেন ড্যাড যা যা করতে বলবে তাই করব। বলোনা ও কোথায়?”

” তোমার কী মনে হয় আমি জানলে এভাবে বসে থাকতাম।”

রিক একটা হতাশ নিশ্বাস ত্যাগ করে বিছানায় গা এলিয়ে দিল। এখন ওর অবস্থা ঠিক সেরকমই হয়েছে যেরকম কোন নেশাখোর ব্যাক্তি হঠাৎ নেশার বস্তু না পেলে হয়। আর এরকম অবস্থায় মানুষদের দিয়ে যা খুশি করিয়ে নেওয়া যায়। সেটা কবির শেখ জানেন। আর সেই সুযোগটাই কাজে লাগাতে চাইছেন উনি।

_____________

মুখে রোদের তীব্র আলো এসে পরার পরেই সকালে ঘুম থেকে উঠে পরল। চোখে ঘুম আছে এখনও। কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে দেখে বেশ বেলা হয়ে গেছে। রাতে ঘুমের ঔষধ খেয়ে ঘুমিয়েছে তাই সকালে উঠতে এতো দেরী। আস্তে আস্তে উঠে ও একেবারে ফ্রেশ হয়ে বেড় হল। নিচে গিয়ে দেখে আদ্রিয়ান সোফায় বসে জুস খেতে খেতে টিভি দেখছে। অনিমা দুটো শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলে নিল। আদ্রিয়ানের প্রতি আর নিজেকে দূর্বল হতে দেবেনা। যেখানে লোকটা অন্যকাউকে ভালোবাসে যেখানে ও কেন কাবাবে হাড্ডি হবে? ও নিচে গিয়ে সোজা কিচেনে চলে গেল। আদ্রিয়ান একপলক অনিমার দিকে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে মনোযোগ দিল। কিছুক্ষণ পর অনিমা এক কাপ চা নিয়ে এসে টি-টেবিল থেকে নিউসপেপারটা হাতে নিল। আদ্রিয়ান গম্ভীর মুখে বসে আছে। অনিমার দিকে আর তাকায় নি। অনিমা ভ্রু কুচকে তাকাল আদ্রিয়ানের দিকে। কাল কিছু না বলে রুমে চলে এল আর আদ্রিয়ান কিছুই জানতে চাইল না? ভালোই হয়েছে। আদ্রিয়ান ওর সাথে যত কম কথা বলবে ওর জন্যে ততোটাই ভালো। একটা শ্বাস ফেলে চলে যেতে নিলে আদ্রিয়ান বলে উঠল,

” যদি বাইরে ঘুরতে যেতে চাও তো রেডি হয়ে এসো। ফাস্ট।”

অনিমা কিছু না বলে ওপরে চলে গেল।

রুমে অনিমা সারারুমে পায়চারী করতে করতে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে আর ভাবছে যে। আদ্রিয়ান বেশি কথা বলল না কেন? কোন কারণে রেগে আছে ওর ওপর? কিন্তু রাগবে কেন? ও কী করেছে? আচ্ছা আজ তো আদ্রিয়ানের ওকে নিয়ে ঘুরতে যাওয়ার কথা ছিল? ও এত দেরী করল বলেই কী আদ্রিয়ানের রাগ? আচ্ছা ও এতো রিঅ‍্যাক্ট করছে কেন? আদ্রিয়ান অন্যকাউকে ভালোবাসে সেটাতো আদ্রিয়ানের দোষ না। তাই ওর উচিৎ আদ্রিয়ানের সাথে নরমাল হয়েই বলা। ওর মনে যেটুকুই অনুভূতি ছিল সেটা মনেই চাঁপা থাক। না, তাই এখন রেডি হয়ে নেওয়াই ভালো। ও রেডি হয়ে আবার নিচে গেল। গিয়ে দেখে আদ্রিয়ান ফোনে কথা বলছে। তাই ও ফিরে আসতে নিলেই শোনে,

” আরে বলছিতো আসব।”

ওপাশ থেকে কিছু বলল যার উত্তরে আদ্রিয়ান বলল,

” হ্যাঁ আজকেই আর এক্ষুনি বেড় হচ্ছি।”

ওপাশ থেকে আবার কিছু বলল। অাদ্রিয়ান বলল,

” শুধু তোমাকেই ভালোবাসি।”

বলে হেসে দিলো। অনিমার এবার বিরক্ত লাগছে। ভালোবাসে ভালো কথা। বাসুক! যতখুশি বাসুক। এভাবে বলার কী আছে? আদ্রিয়ান হাসি থামিয়ে বলল,

” নো নেক্টস লাই..”

এটুকু বলতেই আদ্রিয়ানের চোখ অনিমার ওপর পরতেই ও থেমে গেল। ‘এসে কথা বলছি’ বলে ফোনটা রেখে দিল। তারপর অনিমাকে আগা গোড়া একবার স্কান করল। অনিমা ঘুরতে যাওয়ার কথা বলবে তার আগেই আদ্রিয়ান বলল,

” সরি আজ যেতে পারবনা। আমায় একটু বেড়োতে হবে। কাজ পরে গেছে।”

বলে আদ্রিয়ান টি-টেবিল থেকে ওয়ালেট বেড় করে পকেটে নিয়ে যেতে নিলেই অভ্র এসে বলল,

” স্যার আমি যাবোনা?”

” না, তুমি থাকো। আমি আজ একাই যাবো।”

অনিমা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে। এতো কষ্ট করে সেজে গুজে রেডি হয়ে এলো। আর লোকটা এভাবে চলে গেল। নাই যদি নেবে তাহলে রেডি হতে বলল কেন? সোজাসাপ্টা অপমান করল এককথায়। কাজ আছে? হুহ! কী কাজ সেটাতো জানাই আছে। নিশ্চয়ই ডেটিং এ যাচ্ছে। অনিমা রাগে গজগজ করতে করতে পার্স থেকে ফোনটা বেড় করে তীব্রকে ফোন করে বলল বেড় হতে আর অরু আর স্নেহাকেও ডেকে নিতে। রেডি যখন হয়েছে ঘুরেই আসবে। তীব্র কেন জিজ্ঞেস করায় এক ধমক দিয়ে বসিয়ে দিয়েছে। অনিমা বেড়োতে নিলেই অভ্র বলল,

” ম্যাম আমি ড্রপ করে দিয়ে আসব?”

অনি ভ্রু কুচকে অভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,

” আমি অপনার বস, টিচার, কোচ বা এইটাইপ কিছু লাগি?”

” না তো।”

অনিমা এবার উঁচু গলায় বলল,

” তাহলে সারাদিন ম্যাম ম্যাম করেন কেন?”

অভ্র মুখ ছোট করে বলল,

” তাহলে কী বলব?”

” নাম ধরে ডাকবেন। অ নি মা। বাংলা বোঝেন নিশ্চয়ই?”

অভ্র অবাক হয়ে বলল,

” নাম ধরে? আপনাকে। বেসম্ভব?”

অনিমা চোখ ছোট করে বলল,

” অসম্ভব শুনেছি, বেসম্ভব কী ভাই?”

অভ্র একটা বোকা হাসি দিয়ে বলল,

” অসম্ভবের ওপরে যেটা হয় সেটাই বেসম্ভব।”

” বেসম্ভব অব্ আই মিন অসম্ভব কেন?”

” পাপ হবে পাপ। তারওপর স্যার আমার গর্দান নিয়ে নেবে। না আসলে স্যার কে স্যার ডাকিতো তাই।”

অনিমা অভ্রর দিকে হতাশভাবে একবার তাকিয়ে বেড়িয়ে গেল। অভ্র চেয়েও যেতে পারল না অনিমার সাথে। ওর কপালটাই এমন। এতদিন আদ্রিয়ান অন্যের রাগ অভ্রর ওপর ঝাড়তো। এখন অনিমাও তাই করা শুরু করে দিয়েছে। যেমন মিয়া তার তেমন বিবি। এসব ভেবে মুচকি হাসল অভ্র।

কফিশপে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে অনিমা, অরুমিতা, তীব্র, স্নেহা রাস্তার সাইড দিয়ে হাটতে হাটতে এগোচ্ছে। অরুমিতা ওদের সাথে স্বাভাবিক থাকলেও মন ভালো নেই ওর। আশিস কাল ফোন দিয়েছিল। নম্বর কোথায় পেল জানেনা, কোনভাবে জোগাড় করেছে হয়ত। অরুমিতা যদিও কয়েকটা কথা শুনিয়ে কেটে দিয়েছে। কিন্তু কী চায় এই ছেলে। তিনবছরে তো ভুলেই গেছিল ওকে তাহলে আবার কেন? তীব্র আর স্নেহা বরাবরের মতই টম এন্ড জেরির মত ঝগড়া করছে। একজায়গায় ভীর দেখে তীব্র বলল,

” ওখানে কী হয়েছে বলতো?”

ওরা কৌতূহল নিয়ে একটু এগিয়ে দেখল আদ্রিয়ান আর একটা মেয়ে একসাথে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটা একজন সঙ্গীতশিল্পী, স্মৃতি। দেখতে বেশ ভালোই। দুজনেই লোকেদের সাথে সেলফি তুলছে, অটোগ্রাফ দিচ্ছে। একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়ালেও দেখে প্রথমে যে কেউ কাপলই ভাববে। ফাঁকে ফাঁকে দুজনেই দুজনের সাথে ফিসফিসিয়ে কথা বলছে। বাহ! এই তাহলে তার সেই ইমপর্টেন্ট কাজ। অরু বলল,

” আদ্রিয়ান ভাই না?”

স্নেহা বলল,

” সাথেতো স্মৃতি ম্যামও আছেন।”

অনিমা শক্ত কন্ঠে বলল,

” তীব্র আমাকে একটু বাড়ি পৌঁছে দিবি?”

তীব্র হেসে বলল,

” আরে আদ্রিয়ান ভাইতো আছেই এখানে। চল ওনার সাথে..”

অনিমা চেঁচিয়ে বলল,

” আমি তোকে বলেছি। পারলে পৌঁছে দে নয়তো আমি একাই পারব।”

বলে অনিমা উল্টো হাটা দিল। তীব্র ওরা বোকা বনে গেল পুরো। এরপর অনিমা পেছনে দৌড় লাগালো। অনিমা খুব জোরে হাটছে। রাগটা যেন রাস্তার ওপর দেখাচ্ছে। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে ওর। যদি অন্যকাউকে এতোই ভালোবাসে তাহলে ওর এতো কাছে কেন এসছিল? এতো হৃদয়গ্রাসী বাক্য বলে বলে বারবার ওকে আহত কেন করেছিল? কীসের জন্যে? কীসের টানে? কী প্রয়োজন ছিল এসবের?

#চলবে…

#বর্ষণের সেই রাতে- ২
#লেখিকা: অনিমা কোতয়াল

১৯.

আদ্রিয়ান আজ একটু রাত করেই বাড়িতে এলো। চোখে মুখে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। ড্রয়িং রুমে এসে দেখল অভ্র সোফায় শুয়ে শুয়ে গান শুনছে। আদ্রিয়ান আশেপাশে চোখ বুলিয়ে আবার অভ্রর দিকে তাকালো। অাদ্রিয়ানের আসার আওয়াজ পেয়ে অভ্র তাড়াতাড়ি হেডফোন কান থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

” স্যার চলে এসছেন?”

আদ্রিয়ান আবার চারপাশে চোখ বুলিয়ে বলল,

” বাকি সবাই কোথায়?”

অভ্র বুঝতে পারল যে আদ্রিয়ান অনিমাকেই খুঁজছে তবুও একটু দুষ্টুমি করে বলল,

” জাবিন তো নিজের রুমেই ঘুমোচ্ছে। আর সার্ভেন্টরা সবাই আছে, আপনি বললেই চলে আসবে।”

” আর সবাই?”

অভ্র বুঝতে পারেনি এমন একটা ভাব করে বলল,

” আর কে?”

আদ্রিয়ান বুঝতে পারল যে অভ্র দুষ্টুমি করছে। তাই চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই অভ্র একটু হকচকিয়ে গিয়ে বলল,

” রুমে, হ্যাঁ রুমেই আছেন ম্যাম। ঘুমোচ্ছে মনে হয়।”

আদ্রিয়ান ভ্রু কুচকে ওপরের দিকে তাকিয়ে আবার অভ্রর দিকে তাকিয়ে বলল,

” সবাই খেয়েছে?”

” জি স্যার, আমি আর আপনি বাদে।”

আদ্রিয়ান এবার একটু বেশিই অবাক হলো। যত রাতই হোক অনিমা ও ফেরার আগে রাতে খায়না আর ওপরেও যায়না। আজ কী হল? শরীর খারাপ না-কি? নানারকম ভাবনা ভাবতে ভাবতে আদ্রিয়ান অভ্রকে বলল,

” তুমি খাবার সার্ভ করতে বলে টেবিলে বসো আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

অভ্র মাথা নেড়ে চলে গেল। অভ্র একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। এই লোকটা যেমন ভয়ানক তার বোনটাও তেমন। কিছুক্ষণ আগেই জাবিন যেচে পরে ঝগড়া করেছে এসে ওর সাথে। আসলে ও সিঁড়ি দিয়ে উঠছিল আর জাবিন নামছিল। জাবিনকে নামতে দেখে অভ্র সাইড দিয়েই যাচ্ছিল কিন্তু কীকরে জাবিনের সাথে ধাক্কা লাগলো নিজেই বুঝে উঠতে পারল না। আর তখনই জাবিনের বিখ্যাত হুমকি ধমকি শুরু হয়ে গেল। রাগী গলায় বলল,

” কী সমস্যা হ্যাঁ? সুন্দরী মেয়ে দেখলেই খালি গায়ে পরতে ইচ্ছে করে না?”

অভ্র অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল জাবিনের দিকে। মেয়েটা সুন্দরী সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু কেউ যে সেটা এতো দম্ভের সাথে বলে বেড়াতে পারে সেটা ভাবেনি। অভ্র একটু গলা ঝেড়ে বলল,

” ইচ্ছে করে দেই নি লেগে গেছে।”

” বললেই হল হ্যাঁ? আপনি ইচ্ছে করেই দিয়েছেন। এসব বলে এখন আমায় বোকা বানাতে আসবেন না ঠিকাছে? আপনাদের মত ছেলেদের চেনা আছে। হুহ।”

অভ্রর এবার সত্যিই একটু রাগ হলো। তাই ও জাবিনের দিকে এগিয়ে গিয়ে ওর কোমরে স্লাইড করে হাত রেখে একটানে নিজের দিকে এনে বলল,

” যদি ইচ্ছে করে ছোঁয়ার হত তো এভাবে ছুঁয়ে দিতাম। ওভাবে নয়।”

বলে জাবিনকে ছেড়ে দিয়ে ওপরে চলে গেছিল। জাবিনও বোকার মত কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল ওখানে। এই প্রথম কোন অন্য ছেলে ওকে এভাবে টাচ করেছে। যদিও নামার সময় ধাক্কাটা ও ইচ্ছে করেই দিয়েছিল। কারণ অভ্র ডোন্ট কেয়ার ভাবটা। মানছে ছেলেটা একটু সুন্দর টাইপ ছেলেদের দলেই পরে তাই বলে এতো ভাব নেওয়ার কী আছে? কিন্তু ওর চালটা যে অভ্র ওর দিকেই এভাবে ঘুরিয়ে দেবে সেটা ভাবতে পারেনি ও।

আদ্রিয়ান ওপরে গিয়ে আগে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে নিল। এরপর অনিমার রুমে গিয়ে হালকা করে দুবার নক করল। কিন্তু কোন সাড়া না পেয়ে চাবি বের করে দরজাটা আর্ধেক খুলে উঁকি দেখল অনিমা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে, ঘুমিয়ে পরেছে নিশ্চয়ই? আদ্রিয়ান ভেতরে ঢুকে অনিমার কাছে গিয়ে ওর মাথায় হাত রেখে দেখল জ্বর এসছে কি-না। কিন্তু সবটা স্বাভাবিক দেখে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। মনটা খারাপ হয়ে গেল হঠাৎই। কালরাতের পর থেকে মেয়েটার সাথে ভালোভাবে কথাও বলতে পারছেনা। আর মেয়েটাও কেমন পালাই পালাই করছে। সমস্যা কী হল সেটাই বুঝতে পারছেনা। ঔষধের বক্সটা চেক করে দেখল যে ঔষধ খেয়েছে। অনিমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আলতো করে দুবার ‘অনি’ বলে ডেকেছিল কিন্তু অনিমা কোন রেসপন্স করেনি। কিছুক্ষণ ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে ছোট্ট একটা শ্বাস নিয়ে উঠে চলে গেল আদ্রিয়ান। আদ্রিয়ান চলে যেতেই অনিমা চোখ খুলে তাকাল। ইচ্ছে করেই ঘুমের ভান করছিল। খুব বেশি দরকার না থাকলে যাবেইনা ও আর আদ্রিয়ানের কাছে, কথাও বলবেনা। মনের ভেতরে কিছু অন্যায় অনুভূতিতে জায়গা দিয়ে ফেলেছে, সেগুলো আগে মেটাতে হবে। বেশি বেশি ভেবে নিয়েছিল ও। তাই হয়তো এভাবে ধাক্কাটা খেতে হলো। উনি যখন স্মৃতিকেই ভালোবাসে তো ওর কাছে কেন আসে? থাকুক না স্মৃতিকে নিয়েই। ও আর যাই হোক কারো লাভ স্টোরির ভিলেন হতে পারবেনা। এরকম সব চিন্তা করতে করতে ঘুমোনোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে শুরু করল।

_____________

নিজের কেবিনে টেবিলে হাত রেখে গভীর ভাবনাতে মজে আছেন রঞ্জিত চৌধুরী। নিজের অতীত বর্তমানের হিসেব মেলাচ্ছেন উনি। যেখানে দেশের এত বড় বড় মাথারা ওনার কাছে কিছুই না। সেখানে ঐ পিচ্ছি একটা মেয়ের ভয়ে থাকতে হচ্ছে ওনাকে। কখন কী করে বসে ঠিক নেই। ও যদি এখন ঠিক থাকে আর কোনভাবে ঐ মহিলার কাছে পৌঁছে যায় তাহলে খুব বড় ক্ষতি হয়ে যাবে ওনার। ঐ মহিলাটাও কোথায় লুকিয়ে আছে সেটাও তো জানেনা। এরমধ্যেই কবির শেখ এসে বসল রঞ্জিত চৌধুরীর সামনের চেয়ারে। ফলের ঝুড়ি থেকে একটা আপেল নিয়ে সেটাতে কামড় বসিয়ে বলল,

” কী এতো ভাবছেন?”

রঞ্জিত চৌধুরী দুইহাতের একত্রিত আঙ্গুলগুলো নাড়াতে নাড়াতে বলল,

” মেয়েটা কী হাওয়ায় মিলিয়ে গেল না-কি?”

” এমনও হতে পারে বেঁচেই নেই।”

রঞ্জিত চৌধুরী চমকে তাকাল কবির শেখের দিকে। কবির শেখ বললেন,

” দেখুন। দিনকাল খারাপ। ওর যাওয়ারও জায়গা নেই। এমনিতেও একটা মেয়েকে এরকম একা পেয়ে ছেড়ে দেবে? এতো ভালো মানুষ আছে না-কি?”

” যদি সেটা হয় তাহলেতো বেশ ভালোই।”

রঞ্জিত চৌধুরী চিন্তিত মুখ করে বললেন,

” কিন্তু যদি সেটা না হয়? তাহলে কী হবে?”

” কী না হলে কী হবে?”

দুজনেই চমকে তাকিয়ে দেখে দরজার কাছে রিক দাঁড়িয়ে আছে। ওনারা নিজেদের সামলে নিয়ে একটু ঠিকঠাক হয়ে বসল। রঞ্জিত চৌধুরী কথা ঘুরিয়ে বললেন,

” যাক অবশেষে এলে তুমি?”

রিক চেয়ার টেনে বসে বলল,

” শর্ত একটাই ড্যাড। অনিকে আমি খুঁজে আনার পর ওর সাথে পাবলিকলি আমাদের বিয়ে হবে এন্ড তুমিও কোন ঝামেলা ছাড়াই সেটা মেনে নেবে। এন্ড ওকেও নরমালি নিজের পুত্রবধু হিসেবে মেনে নেবে।”

রঞ্জিত চৌধুরী কবির শেখের দিকে তাকাতেই সে চোখের ইশারা করল। রঞ্জিত চৌধুরী হেসে বলল,

” আরে সেটা তো অনেক আগেই আমি মেনে নিয়েছি।”

রিক চোখ ছোট ছোট করে তাকাল রঞ্জিত চৌধুরীর দিকে। কবির শেখ ব্যাপারটা সামলাতে বলল,

” পেয়েছো মেয়ে..মানে অনিমাকে?”

” এখনও না। জানিনা কোথায় চলে গেছে। তারচেয়ে বড় কথা ও ঠিক আছে কি-না।”

বলে রিক নিজের ভাবনায় মগ্ন হয় গেল। কবির শেখ আর রঞ্জিত চৌধুরী একে ওপরের চোখের দিকে তাকিয়ে এরপর নিজের কাজে মনোযোগ দিল।

____________

আজকে ক্লাস নেই। অনিমা সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে আজ আর আদ্রিয়ানকে কফি দিতে যায়নি। সার্ভেন্ট দিয়ে পাঠিয়ে দিয়ে রুমে এসে বসে ছিল। অনেক সময় পর নিচে আসার সময় সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখল। আদিব আর রাইমা এসছে। আদ্রিয়ান, অভ্র, জাবিনও বসে আছে সোফাতে। অনিমা নিচে নামতেই জাবিন বলল,

” ঐ তো অনি আপু এসে গেছে।”

এটা শুনে সবাই তাকালো অনিমার দিকে। অনি একটু এগোতেই রাইমা উঠে এসে জড়িয়ে ধরল ওকে, ওও হেসে রাইমাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

” কেমন আছো?”

” আমি ভালো। তুমি ভালো আছো আপু?”

” একদম।”

রাইমা অনিমাকে নিয়েই সোফায় বসল। আদ্রিয়ান সুক্ষ্ম চোখে তাকিয়ে আছে অনিমার দিকে কিন্তু অনিমা একবারও তাকায় নি। অনিমা আদিবের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

” ভালো আছেন ভাইয়া?”

” আলহামদুলিল্লাহ্।”

” আশিস ভাইয়া আসেন নি?”

” না ওর আজ একটু কাজ আছে।”

” আচ্ছা।”

” শোনো, সামনের পনেরো তারিখ আমার আর রাইমার বিয়ে। তোমারও ইনভেটেশন রইল কিন্তু। একটা বাংলো বুক করে নিয়েছি, তেরো তারিখে আদ্রিয়ানের সাথে চলে আসবে। যদিও আদ্রিয়ানকে বলা মানেই তো তোমাকে বলা।”

অনিমা মুচকি হেসে বলল,

” না ভাইয়া উনি আর আমি দুজন পুরোটাই আলাদা মানুষ। তাই ওনাকে বলা আর আমায় বলা কোনদিন এক হতে পারেনা। তবুও যখন আপনি আমাকে বলেছেন, অবশ্যই যাবো।”

সবাই একটু অবাক হল অনিমার কথায়। আদ্রিয়ানও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। আদিব একটা মেকি হাসি দিয়ে বলল,

” আর হ্যাঁ। অরু, তীব্র, স্নেহা ওদেরকেও বলতে হবে কিন্তু। তাই ঠিক করেছি একটা ট্রিট এর আয়োজন করব তাড়াতাড়ি ওখানেই ওদের সাথে কথা হয়ে যাবে কী বল?”

” আপনি যেটা ভালো মনে করেন।”

এরপর ওরা সবাই ব্রেকফাস্ট করতে বসল। অনিমা রাইমা ওদের সাথে বিভিন্ন কথা বলছে আর খাচ্ছে। কিন্তু আদ্রিয়ান খাচ্ছে কম অনিমাকেই বেশি দেখছে। এটুকু বুঝতে পেরে গেছে যে অনিমা ইচ্ছে করেই ওকে ইগনোর করে যাচ্ছে। কাল রাতে যে অনিমা জেগে ছিল সেটাও জানে ও আসার সময় ওকে পেছন ঘুরে তাকাতে দেখেছে, সকালে কফিটা অবধি দিতে আসেনি। এভাবে ইগনোর করার কারণটা বুঝতে পারছেনা ও। আদিব বলল,

” জাবিন এখানেই ভর্তি হয়ে যাবে?”

” হ্যাঁ ভাইয়া। এখানেই থাকব এখন থেকে।”

কথাটা শুনে অভ্র বিষম খেল। এই মেয়ে এখানে পার্মানেন্ট হয়ে গেলে ওর কী অবস্থা হবে? খাওয়া দাওয়া শেষে ওদের বিদায় দিয়ে অনিমা কিচেনে গিয়ে সব ঠিক করে দেখল আদ্রিয়ান পকেটে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অনিমা বলল,

” কিছু লাগবে আপনার?”

” না।”

অনিমা পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই আদ্রিয়ান বলল,

” শোনো।”

” আমার কাজ আছে।”

বলে অনিমা দ্রুত পায়ে ওখান থেকে চলে গেল নিজের রুমে। আদ্রিয়ান পেছন থেকে কয়েকবার ডাকার পরেও শোনেনি ও। আদ্রিয়ান রেগে দেয়ালে একটা লাথি মারলো। অনিমা রুমে গিয়ে অরুমিতার সাথে কথা বলল। যদিও বেশিক্ষণ কথা বলেনি। কিন্তু অরুমিতার কন্ঠটা কেমন যেন লাগল ওর কাছে। অরুমিতা ফোন কেটে ম্যাসেঞ্জারে মেসেজ রিকোয়েস্ট চেক করতে গিয়ে দেখে আশিসের আইডি থেকে মেসেজ এসছে ‘কেমন আছো?’ অরুমিতার এবার রাগ হল। ও কেমন আছে সেটা জেনে ঐ লোকটা কী করবে? সব ভুলে যখন নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে ভালো থাকতে শিখেছে তখনই আসতে হল একে ওর শান্তি নষ্ট করতে? ও একবার ভাবল ব্লক করে দেবে। পরে ভাবল যে যেখানে ঐ মানুটাই ওর কাছে মেটার করেনা। সেখানে এসব কেন করবে? তাই ওভাবেই রেখে দিল। আর ওর সেই প্রথম দিনের কথা মনে পরল। সেদিন আশিস নামক ব্যাক্তিটি এসছিল ওর জীবনে। এরকমই একসময়। রিল্যাক্স মুডে মেসেজ রিকোয়েস্ট চেক করতে গিয়েই চোখে পরেছিল আশিস নামক আইডিটি। আর একটা মেসেজ যেখানে লেখা ছিল শুধু ‘হাই’। যদিও অপরিচিত আইডি বলে অরুমিতা রিপ্লে না করে ওভাবেই রেখে দিয়েছিল। কথাটা ভেবে ছোট্ট শ্বাস ফেলে ফোন স্ক্রোলিং এ মনোযোগ দিল ও।

____________

আরও একটা দিন কেটে গেছে। অনিমা আদ্রিয়ানকে এভাবেই ইগনোর করে যাচ্ছে। ও ওর সময়মত ভার্সিটি থেকে এসে নিজের মত সময় কাটাচ্ছে, জাবিনের সাথে গল্প করছে। নিজের হাতে আদ্রিয়ানকে আর কফি করে দেয়নি। আদ্রিয়ান এতো কথা বলার চেষ্টা করছে কিন্তু অনি শুধু জরুরি কথারই উত্তর দিয়েছে বেশি কথা বলেনি। আদ্রিয়ানের মন মেজাজ সবকিছুই প্রচন্ডরকম খারাপ হয়ে আছে এইজন্য। এতক্ষণ ঠান্ডা মাথায় সামলাতে চাইলেও এবার রাগ হচ্ছে।

রাতের খাবারের পর অনিমা কারো সাথে কথা না বলেই চলে গেল। মন এমনিতেই ভালো নেই ওর। নিজের ওপরই রাগ হয়। কী দরকার ছিল আদ্রিয়ানকে নিয়ে আগে আগেই এতো বেশি চিন্তা করে ফেলার। এখন নিজেই কষ্ট পাচ্ছে। বিষন্ন মনে বিছানাটা গুছিয়ে যেই শুতে যাবে। তখনই দরজা লাগানোর শব্দে একটু চমকে পেছনে তাকালো। তাকিয়ে দেখে আদ্রিয়ান অনেকটা রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। ও আদ্রিয়ানের চোখ মুখ দেখে ভয় পেলেও বালিশটা রেখে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে তোতলানো কন্ঠে বলল,

” ক-কিছু বলবেন? এতো রাতে এখানে কেন এসছেন?”

আদ্রিয়ান এগিয়ে আসতে আসতে বলল,

” এটা আমার বাড়ি তাই এই বাড়ির প্রতিটা কর্ণারে যাওয়ার রাইট যেমন আমার আছে তেমনই এ বাড়িতে যারা থাকে তাদের ওপরও অধিকার আছে আমার।”

অনিমা নিজেকে সামলে বালিশ সামলে বালিশ ঠিক করতে করতে বলল,

” আদ্রিয়ান এখন আমার ঘুম পাচ্ছে খুব। পরে কথা বলব।”

হঠাৎ করেই আদ্রিয়ান অনির হাত ধরে টান নিয়ে নিজের কাছে নিয়ে দুই বাহু শক্ত করে চেপে ধরল। চোখে সত্যি এবার লালচে আভা এসছে আদ্রিয়ানের। অনিমা ভীত আর হতভম্ব দৃষ্টিতে দেখছে ওকে।

#চলবে…

গল্প পোকা
গল্প পোকাhttps://golpopoka.com
গল্পপোকা ডট কম -এ আপনাকে স্বাগতম......
RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -

Most Popular

Recent Comments

Md masrur Hasan mahi على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
আমিনুল ইসলাম على প্রয়োজন পর্ব: ৩০ ( অন্তিম)
সাজিবুল ইসলাম على ধর্ষিতাবউ২ ৯ তথা শেষ পর্ব
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
শাহিদুল ইসলাম على জীবন সঙ্গী ১ম পার্ট
Nita Sarkar على স্বপ্নীল ৬৮
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على রহস্য শেষ_পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على অলক্ষ্যে তুমি পর্ব-০৬ এবং শেষ পর্ব
Nazmun Nahar Akhi على Psycho_is_back? part_7
Nazmun Nahar Akhi على Dangerous_Villian_Lover part 2
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على জানালার ওপারে পর্ব-১৭ এবং শেষ পর্ব
শিয়াসা ইসলাম হুরিজিহান على লীলা বোর্ডিং ১২১৫ পর্ব-১১ এবং শেষ পর্ব
মিজানুর রহমান রাহুল على সেই তুমি পর্ব-০১
@feelings على প্রহেলিকা
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Anamika Basu على সে পর্ব-১২
Nusrat jahan على coffee & vanilla Part-10
Pallabi Roy على স্বপ্নীল ৬৮
M.D Mahabub على The_Villain_Lover Part_2
Labani sarkar على Dangerous_Villain_Lover part 23
MD Akas Apc على বিবেক
Tanisha Ahmed على Devil love part-18 
Aius Barmon shorob على নারীর দেহকে নয়
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Chandan roy على স্বপ্নীল ৬৮
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Priya Banerjee على devil love married life last part
Riya Biswas على তুমি রবে ৬০
Riya Biswas على তুমি রবে ৫২
Mohammad Adib على তুমি রবে ৬০
Avni Ayesha على তুমি রবে ২৮
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
সুমিত على তুমি রবে ২৮
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
TANJIBA ZENIFAR على তুমি রবে ৫০
Samiah Begum على তুমি রবে ৫১
biddut das rocky على নর নারী
গল্প পোকা على নষ্ট গলি শেষ পর্ব
Md Jobayer Hossain Shohag على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على দুই অলসের সংসার
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤৪২.
A.J.S Rakib على মন ফড়িং ❤৪২.
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
গল্প পোকা على গল্পঃ ভয়
Samiya noor على গল্পঃ ভয়
Sadikul على গল্পঃ ভয়
Samia Islam على গল্পঃ ভয়
শূন্য মায়া على মন ফড়িং ❤ ৪০.
Sutapa biswas على মন ফড়িং ❤৩৯.
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৮.
sutapa biswas على মন ফড়িং ❤ ৩৭
Foysal Mahmud على My_Mafia_Boss_Husband Part: 16
Siyam على বিবেক
Sudipto Guchhait على My_Mafia_Boss পর্ব-৯
saptami karmakar على devil love married life last part
saptami karmakar على devil love married life last part
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ৩০.
মায়া على মন ফড়িং ২৬.
Shreyashi Dutta على  বিয়ে part 1
Sandipan Biswas على  বিয়ে part 1
Paramita Bhattacharyya على অনুরাগ শেষ পর্ব
জামিয়া পারভীন তানি على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
মায়া على মন ফড়িং  ২২
সুরিয়া মিম على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على মন ফড়িং ২১
গল্প পোকা على নষ্ট গলি পর্ব-৩০
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على Love At 1st Sight Season 3 Part – 69
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
Sahin ssb على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ২১
মায়া على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ২০.
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
গল্প পোকা على খেলাঘর /পর্ব-৪২
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৮. 
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৭.
Jannatul Ferdous على খেলাঘর পর্ব-৩৫
গল্প পোকা على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ফাল্গুনের_ফুল last_part_8
মায়া على মন ফড়িং ❤ ১৬. 
গল্প পোকা على ছাত্রী যখন বউ পাঠঃ ১
গল্প পোকা على বাজির প্রেম পাঠঃ ১
Foujia Khanom Parsha على মা… ?
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৮
HM Ashraful Islam على অবুঝ_বউ পার্ট: ৫
Ibna Al Wadud Shovon على স্বার্থ