#ভেজা_চুলে
#সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)
#পর্ব-১৫
রাত তখন শেষ দিকে। অর্ণির ঘরে হুড়মুড়িয়ে ঢুকলো মাধুর্য। অর্ণির গায়ে তখন হলুদের শাড়ি। আলুথালু বেশে দাঁড়িয়ে আছে তার ঘরের জানালার পাশে।
মাধুর্য তার কাছে দাঁড়িয়ে হাত ধরে বলল,
“চলো আমার সাথে।”
“কোথায়?”
“অর্ণি আপু কথা বলবে না। চলো। ওয়েট! বিয়ে ভেঙেছে তুমি জানো?কাল ভোর হলেই তালাক হবে।”
“জানি।”
“চুপ করে বসে আছো যে?এটা বসে থাকার সময় নয়।”
“কী করবো?আমি কী একা একা তার ঘরে গিয়ে উঠতে পারি?যেতে দিবে বাবা আমাকে?”
“বাঁশের কঞ্চি ভাঙতে হলে আগে বাকাতে হয়। এসো, এখন বসে থাকার সময় নয়।”
সে ভোর রাতে বৃষ্টির পরের দমকা হাওয়ায় সদ্য কাটা ধান ক্ষেতের আইল ধরে দৌড়াচ্ছিল দুজন মেয়ে। একজনের পরনে হলুদ শাড়ি, অন্য জন্যের পরনে একটা নরমাল পোশাক।
পিচ্ছিল কাঁদা মাটি দিয়ে দৌড়ে যখন তারা পাকা রাস্তায় উঠে এলো তখন খেয়াল হলো আগে থেকেই তিনটে বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন।
অর্ণির বুঝতে অসুবিধে হলো না এরা কারা।
ওয়াহেদ কে দূর থেকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছে সে।
তারপর এক দৌড়ে তার বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে কাঁদতে লাগলো।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক মিনিট সময় চলে গেলে অর্ণি মাধুর্যের হাত ধরে বলল,
“আমি ঠিক করছি তো?”
মাধুর্য তার দুই হাতে অর্ণির দুই হাত আবদ্ধ করে আশ্বাস দিলো।
অর্ণির পায়ের জুতো কোথায় পড়েছে তাই নিজের জুতো তাকে দিয়ে বাইকে উঠে বসতে বলল।
এই মুহুর্তে এর থেকে ভালো উপায় তার জানা নেই।
শয়ন কলে যখন প্ল্যান বলেছিল,মাধুর্যের ঘাম ছুটেছিল কিন্তু বোনের সুখের জন্য এটুক করা যায়।
হঠাৎ অর্ণি বাইক থেকে নেমে মাধুর্যের গলা ধরে কাঁদতে লাগলো।ও জানে এসব জানলে সবাই ওকে অনেক কষ্ট দিবে।
পরিস্থিতি ক্রমশ ভারী হয়ে উঠছে। এদিকে হাতে সময় খুব অল্প। তাই ইনহান বলল,
“ভাবী, কথা ছিল রাজার মতোন এসে নিয়ে যাব। এসেছি চোরের মতোন। ডাকাত হতে চাইলাম হতে দিলো না তোমার বোন।তাহলে তোমার বোনকে সহ চুরি করি কী বলো?”
বাড়িতে মোটামুটি জানাজানি হয়েছে অর্ণি নেই।মসজিদের ইমাম সাহেব দেখেছে ভোর রাতে ওয়াহেদের বাইকের পিছনে অর্ণিকে। তার সাথে ছিল অন্য বাইকে আরো তিন ভাই। বাহিরে বেশ হৈচৈ।
মাধুর্য তখন পা ধুয়ে বিছানায় গা এলিয়েছে। ঘুমে তার দুচোখ ভেঙে আসছে। আধোঘুমে তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো,
ফ্লোরে রক্ত জমে রক্তের আস্তরণ পড়েছে। মানুষের রক্তের আলাদা গন্ধ। সেই রক্ত খুব সহজেই কালচে বর্ণ ধারণ করেছে।
বন্ধ ঘরে, আলো নেই, বাতাস নেই সেই এক ঘুপচি ঘরে নিস্তেজ হয়ে পড়ে থাকা লতার পাশে তার শাড়ির আঁচলে শুয়ে হাত-পা নেড়ে কেঁদে চলেছে নবজাতক।
হঠাৎ কারো টানে তন্দ্রাভাব কেটে গেলো মাধুর্যের। এতক্ষণ সে স্বপ্ন দেখছিল।তার সামনে দাঁড়িয়ে তারেকা বানু।
কী বলছে কিছুই কানে যাচ্ছে না তার। সব কেমন ফাকা ফাকা লাগছে। হঠাৎ তাকে তারেকা বানু সজোরে ছেড়ে দিলো।তার মাথার পিছনটা খাটের পাশে লেগেছে। মাথা ঝিমঝিমিয়ে কানে অনুভূতি ফিরে এলো।
চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পেলো,
মাম্মাই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিচ্ছে তারেকাবানু কে। তাকে বেরিয়ে যেতে বলছে এ ঘর থেকে।দৌড়ে এসে কোলে তুলে নিলো মাধুর্যের মাথা৷
মাধুর্য শুধু চোখ বুজে রইল।নাহ্ রক্ত বের হয়নি।শুধু পিছনে যা একটু লেগেছে এই আরকি।
সাকিবের তামসীর মাথায় আঘাত লেগেছে এটা জানলে জেরিনের সাথে বিয়ে ভেঙে যাবে। কারণ তারেকাবানুকে সেই তো ওখানে পাঠিয়েছে। এদিকে ও বাড়ি থেকে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। সাকিব বাহির বাড়ি থেকে ভিতরে ঢুকতে নিলে জেরিন বলল,
“ওয়াহেদ ভাইয়ের বাড়ি যাওয়া দরকার।অর্ণি চলে গেলেও দায়িত্ব আছে।”
জেরিনের কথায় সাকিব বলল,
“জানি। তবে পরে এখন তামসীর কাছে যাচ্ছি।ও কিছু জানতে পারে।”
“ও জানে না। চলো।বরং আমি তুমি যাই।”
“তামসী কে নিলে সমস্যা কী?”
“আজব তো! এক বাইকে তিনজনের কষ্ট হবে না?ও থাকুক।দেরি করো না চলো।”
জেরিন কথাগুলো এমন ভাবে বলছিল যেন যাওয়াটা সত্যি প্রয়োজন তবে সাকিবের মন কু গাইছিল।ঠিক কার জন্য? অর্ণি না তামসীর জন্য?
রক্ত না বের হলেও মাধুর্য বেশ আঘাত পেয়েছে। তার মামীদের মধ্যে কেউ বাতাস দিচ্ছে, কেউ হাত পা মুছে দিচ্ছে।মাম্মাই মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো,
হঠাৎ মাধুর্য তার দু হাত ভরে বমি করে দিলো।
এক বার নয় দুই বার। ঠিক ওমন সময় একজন বলল,
“মাথায় আঘাত পাইয়া বমি করলে তো মানুষ বাঁচে না।এই মাইয়্যা কি বাঁচবো?”
চলবে
#ভেজা_চুলে
#সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)
#পর্ব-১৬
নরওয়ের আকাশে এখন সূর্যের আলো নেই অনেক দিন হয়ে এলো।ডিসেম্বর মাসের শীতের বেশ প্রকোপ।এখন এখানে ডার্ক পিরিয়ড চলছে।
নভেম্বর ২১ থেকে সূর্যের আলো নেই।দুই মাস চলবে এই অন্ধকার সময়। আকাশে তখন অরোরা বুরিয়ালের লাল,সবুজ রঙের আলোর খেলা। অসলো শহরের কোনো একটা ছাত্রীবাসে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে মাধুর্য।
তীব্র শীতে বিছানা তাকে বড্ড টানছে।
যেদিন প্রথম এই দেশে সে পা রেখেছিল!সে অবাক হয়ে তাকিয়েছিল এই এক টুকরো স্বর্গের দিকে। বইতে পড়েছিলএখানে না কী সূর্য ডুবে না অনেক দিন।
হ্যাঁ, এখানে আসার পর মাধুর্য দেখেছে জুলাই মাসে মধ্য রাতেও সূর্যের আলো।
হস্পিটালের গ্রিল ধরে দাড়িয়ে ভেবেছে তার গ্রাম,মাম্মাই,মামা সবার কথা।
ফোনের স্ক্রিনে তাদের দেখে নিজেকে শান্ত করেছে।
সেদিন সকাল হতেই তার অবস্থা বেগতিক হলে পাগল প্রায় তার মামীরা তাকে নিয়ে ছুটেছিলেন শহরে।
মাথার পিছনে আঘাত পেয়েছিল মাধুর্য।
তার ছটফটানি দেখে সবাই শাপ-শাপান্ত করলো তারেকা বানুকে।
ডক্টর বললেন দ্রুত সিটিস্ক্যান করাতে। মাথায় লাগা আঘাত ছিল বেশ মারাত্মক। যা সরাসরি ইফেক্ট করবে মাধুর্যের দৃষ্টি শক্তিতে।
মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে রক্তচলাচল তখন প্রায় বন্ধ। নিয়ে যেতে বলা হলো উন্নতমানের চিকিৎসার জন্য বাহিরের দেশে নিয়ে যেতে বলা হয়। এদিকে অর্ণির ঝামেলা অন্য দিকে মাধুর্য।
মাধুর্যের মামারা বসে সিদ্ধান্ত নিলেন প্রয়োজনে আবাদি জমি বিক্রি করে হলেও তার চিকিৎসা আগে প্রয়োজন। ধীরে ধীরে মেয়েটি নিস্তেজ হয়ে যাবে এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়।
সাকিব দিন রাত মাধুর্যের আশেপাশে থাকতো।দেশের সকল প্রকার চিকিৎসা এবং চিকিৎসকদের সাথে তার কথা বলা শেষ। সবার একই কথা ছিল।
তারেকা বানু তবুও যেন থামেনি। একদিন জেরিন ইনিয়েবিনিয়ে খুব কাঁদলো বাড়ির সবার সামনে। বাধ্য হলো সাকিব সেদিন জেরিনকে বিয়ে করতে। তবুও বিয়ের রাতে সে ছিল মাধুর্যের বাড়ি। বার বার গা কাঁপিয়ে জ্বর এলো মেয়েটার। পরদিন আবার হস্পিটালে ভর্তি করতে হলো।বলা হলো দ্রুত চিকিৎসা না করলে মাধুর্যের অন্য অঙ্গ বিকলাঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অর্ণি বা তার শ্বশুরঘরের কেউ এসব জানতে পারলো না।প্রায় এক মাস পর বিভিন্ন স্থান ঘুরে এসে তারা যখন এসব জানতে পারে তখন দ্রুত বোনের কাছে চলে এলো সে।
ইনহান চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল দরজার কাছে। মেয়েটা এজন্য বুঝি কল ধরতো না।সেদিন ও মাধুর্যের চুল থেকে টুপটুপ করে পানি ঝড়ছিল। যে ভেজা চুলে তাকে ভীষণ মায়াবতী লাগতো সেই মেয়ে বিছানায় মিশে আছে।
অর্ণিকে না মানার কোনো কারণ ছিল না কিন্তু তবুও অর্ণির মামারা তার সাথে কথা বললেন না। কিন্তু ওয়াহেদদের অসম্মান ও করলেন না। তাদের যথেষ্ট যত্নাতী করলেন।
মাধুর্যকে কোথায় কে নিয়ে যাবে এটা নিয়েই তাদের ব্যস্ততা। তখন আরহানের বাবা মাধুর্য কে দেখতে এসে তার বড় মামার সাথে অনেক কথা আলোচনা করলেন। তখন কথায় কথায় তিনি বললেন,
“বেয়াই সাহেব,আপনাদের কারো পাসপোর্ট নাই। আমরা সাধারণ মানুষ আমাদের ওসব লাগে না। কিন্তু এখন এই পাসপোর্ট করার সময় অনেক লাগবে।”
“কাজ চলতেছে। মেডিকেল পাসপোর্ট করার জন্য।এতে না কী সময় কম লাগে।”
“কিন্তু মেয়ের হাতে সময় নাই। আমার ছেলে পরশু নরওয়ে যাচ্ছে। ওইখানের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে তার চাকরি হয়েছে। যদি কিছু মনে না করেন আমার ছেলের সাথে ওখানে পাঠান। দ্রুত চিকিৎসা হবে।”
“বেয়াই আমরা সিংগাপুর পাঠাতে চাইছিলাম আরকি।”
“ওখানের চিকিৎসাও কিন্তু মন্দ না।একটু ভেবে দেখেন। মা মরা মেয়েটা।”
বড় মামা কথাটা সবাইকে বললে তারা রাজি হলেন। সাকিবের মন টানছিল না কারণ সিংগাপুর পাঠাতে পারলে বেশি ভালো হতো। এদিকে তার ছুটিও শেষের দিকে।
বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে জরুরী ভিত্তিতে মাধুর্যের মেডিকেল ভিসা এবং অন্যান্য কাগজপত্র তৈরী হলো।
যেদিন দেশ ছেড়েছিল সেদিন সাকিব পুরো সময় তার হাত ধরেছিল।এরপর টানা চারমাসের চিকিৎসার পর সুস্থ হয় মাধুর্য। সম্পূর্ণ সুস্থ না হলেও অনেকটা সুস্থ সে।
প্রতিনিয়ত সবার সাথে কথা হয়। এদিকে আরহান তার যথেষ্ট খেয়াল রেখেছে। প্রতিদিন হস্পিটালে এসে দেখা করেছে, সাহস জুগিয়েছে।
এরপর একদিন সাকিবের সাথে পরামর্শ করে মাধুর্য এখানে থাকতে এবং বাকী লেখাপড়া শেষ করতে যা যা কাগজপত্র ঠিক করা প্রয়োজন সব ঠিক করেছে৷
মাধুর্য এখন এখানে লেখাপড়া করছে সাথে একটা স্কুলে বাচ্চাদের ভায়োলিন শেখায়।
পত্রী,খুশবুকে খুব মনে পড়ে। মাম্মাই,মামা,রৌদ্রর জন্য রাতে বালিশ ভিজে যায়।
ইনহানের সাথে সবসময় যোগাযোগ হয়।
ইনহান এখনো তার মনের কথা মাধুর্যকে বলেনি। কারণ তারা বন্ধু এটাই কী অনেক নয়?খুব দ্রুত সে পারি জমাবে মাধুর্যের কাছে।
ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ না হয় সামনাসামনি চোখে চোখ রেখেই হবে।
সপ্তাহে একটা দিন আরহান মাধুর্যকে নিয়ে বের হয়। আজ সেই দিন।
হোস্টেল থেকে বেরিয়ে মাধুর্য দেখলো আরহান দাঁড়িয়ে আছে তার ব্যক্তিগত গাড়িতে হেলান দিয়ে।
মাধুর্য হেসে তার দিকে এগিয়ে যেতেই আবার দাড়ালো। ফিরে চলে এলো রুমে। এরপর একটা অর্কিড নিয়ে ছুট লাগালো আরহানের দিকে।
আরহান কে হাতে দিয়ে সে জানালো,
“শুভ জন্মদিন,সেঝ ল্যাডা ব্যাঙ।”
“রেস্পেক্ট মিস.আ’ম ইউর প্রফেসর”
“এখন নয়। এখন আপনি আমার বেয়াইমশাই। প্লিজ দ্রুত চলুন ক্ষুধা পেয়েছে। আজ আপনি ট্রিট দিবেন বলে কাল রাত থেকে খাইনি।”
“কখন বললাম ট্রিট দিবো?”
“আজ আপনার জন্মদিন না?আমি বুঝে নিয়েছি। জলদি চলুন।”
পুরোদিন একসাথে কাটিয়েছে তারা।আরহানের সাথে মাধুর্যের বয়সের পার্থক্য প্রায় নয় বছরের। তবুও তাদের বন্ডিং বেশ গভীর হচ্ছে। এদিকে এখানে চলে আসার পর এক দিনের জন্য কথা হয়নি সাকিবের সাথে। মাধুর্য চেষ্টা করেছিল, সাকিব নিজেই যেন হারিয়ে যেতে চাইছে।
দেখতে দেখতে পার হলো অনেক সময়। হঠাৎ একদিন ক্লাস শেষে ফেরার সময় মাধুর্য দেখলো জেরিন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে পাক্কা মেম সাহেব লাগছে। চোখের ভুল ভাবলেও পরক্ষণে বুঝতে পারলো এ আর কেউ নয় জেরিন।
কিছু দূরে সাকিব কে দেখা গেলো।আরহানের সাথে কথা বলছে।
মাধুর্য যেন বরফ হয়ে জমে পুতুল।একসময় সবাই এসে তার সাথে কথা বললেও সাকিব কিছুই বলছে না।আরহান হোস্টেল প্রধানের থেকে পারমিশন নিয়ে এলো। মাধুর্য আজ তাদের সাথে থাকবে বলে।
আরহানের সাথে কথা বললেও সাকিব মাধুর্যকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
আরহানের বাড়িতে আজ সব রান্না জেরিন,মাধুর্য করেছে। খাওয়ার সময় সাকিবের সামনাসামনি বসলেও সে উঠে তার তামসী কে এক টুকরো খাবার মুখে তুলে দিলো।খাওয়া শেষে জেরিনের মনে হলো আজ
অনেক মাস পর সাকিব যেন তৃপ্ত।
আরহানের ডাকে সাড়া দিয়ে মাধুর্য তার রুমে প্রবেশ করতেই বেশ কড়া চোখে তাকালো আরহান।মাধুর্যের ট্রিটমেন্টের পর থেকে তাকে বেশ নমনীয়তার সাথে রাখে সে।
তবুও আজ ক্ষিপ্ত হয়ে তার গাল চেপে ধরে বলল,
“ভাই সে, না হয় বুঝলাম। তবে কীসের এত প্রয়োজন? না খাইয়ে খাওয়া যায় না?তুমি কোন সাহসে খাবার মুখে তুলে নাও?লজ্জা শরম নেই না কী?তার বউ এখানে আর তুমি?”
“দাদা ভাই অনেক আগে থেকেই এমন করে। এটা উনার অধিকার।”
মাধুর্যের জবাবে দপ করে নিভলো আরহান।তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে যাচ্ছিলো তবে ফিরে এসে তার অধরে শক্ত কঠিন এবং ভয়ংকর চুমু খেয়ে বলল,
“তার অধিকার মুখে তুলে খাওয়ানো অবধিই এবং আমার অধিকার তোমার সর্বত্র।”
—-চলবে (এডিট করার সময় পাইনি।তাই ভুল ত্রুটিগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখিবেন)
#ভেজা_চুলে
#সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)
#পর্ব-১৭
সমাজটা বড্ড অদ্ভুত। যদি একটা মেয়ে ছেলেদের সাথে স্বাভাবিক ভাবেও কথা বলে তাকে বলা হয়
“মাইয়্যার স্বভাব চরিত্র ভালা না।সবার লগেই ঢলাঢলি করে।”
আবার সে মেয়েই যদি সমাজের মানুষের কথার ভয়ে পুরুষ মানুষকে এড়িয়ে চলে তবে লোকে বলে
“মাইয়্যার কী দেমাগ রে? দেমাগে মাটিতে পা পড়ে না।কি এমন রূপবতী হইছে রে?এত কিসের গড়িমা?”
নরওয়ের সমুদ্র তীরের বালিগুলো সবুজ। সবুজ বালি হাতে নিয়ে মাধুর্য এক মনে দেখে যাচ্ছে।
বাহ্ বাহ্ সবুজ বালিও হয়?
“এটা অলিভাইনের কারণে সবুজ।”
“শৈবাল নয়?”
“না। এক প্রকার স্ফটিক কণার জন্য।”
“আচ্ছা। সমুদ্রে পা ভেজাবেন?”
“আপনি আমাকে প্রশয় কেন দিচ্ছেন?”
“আপনিই তো বলেছেন,আমার সর্বত্র আপনার অধিকার।”
“ঝোকের বশে বলেছি।সাবিহার জায়গা কাউকে দেওয়ার নয়।”
আরহানের এমন কথায় মাধুর্য হাতের বালি ফেলে তার দিকে তাকায়। এগিয়ে আসে আরহানের দিকে।
পায়ের জুতো খুলে সম্পূর্ণ ভর আরহানের পায়ে দাঁড়িয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরলো।
ভর সামলাতে আরহান হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরে মাধুর্যের কোমর৷ চোখে চোখ রেখে মাধুর্য বলল,
“তাহলে কীসের এত জেদ আমায় নিয়ে?”
“যদি বলি সব’টা মায়া?”
“তাহলে বেধে ফেলুন না সেই মায়ায়।”
“নাহ্! তারপর একদিন হারিয়ে যাবেন।”
“যাবো না। অধিকার দিন সব দুঃখের ভাগ দিবেন। আগলে রাখতে দিবেন,ভালোবাসতে দিবেন, শাসন করতে দিবেন,আদর করতে দিবেন।আমার ইচ্ছে মতোন।”
“আর যদি না দেই?”.
” বালক তাহলে ডাকাতি করবো তোমার মনের শহরে।”
আরহান জবাব না দিয়ে মুচকি হাসে।কোমরে ধরে সামান্য উঁচু নয় অনেকটা উঁচু করে মাধুর্যকে।
প্রণয়ের অধরের বিষ ঢেলে দেয় মাধুর্যের অধরে।
পাশ থেকে তখন একদল শিষ বাজিয়ে উল্লাস করে ওদের প্রেমের প্রথম চুম্বনে।
পত্রীর ইদানীং কিছুই ভালো লাগে না।সব সময় মাথার বা দিকে চিনচিনে ব্যথা করে।দম বন্ধ হয়ে আসে।
কিছুক্ষণ পর তাকে যেতে হবে কলেজে।কলেজের নাম মনে হলেও ভয়ে কেমন মিইয়ে যাচ্ছে।
মাধুর্য দেশে নেই প্রায় ন’মাস হতে চলল।এদিকে অর্ণি খুব একটা আসে না।খুশবু নিজের লেখাপড়া সাথে মাধুর্যের কোচিং ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত।
মাস খানি সময় হলো তাদের দাদাভাই মাধুর্যকে দেখে এসেছে। সেসব ভাবতে ভাবতে
মুখে এক কোষ তেতুল পুরে দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে পত্রী।
কিছুক্ষণের মধ্যেই তার মা আসবে। এসেই শুরু হবে একদফা কথা বলবে৷
গা গুলানো ভাব কিছুইতেই কমছে না যে, আজ তাই কলেজে যাবে না পত্রী৷
কিছুক্ষণ পর তার মা এসে শুরু করে দিলো নিত্যকার কথা।মেয়ে মানুষ লেখাপড়া না করলে গতি আছে?আজ মাধু শিক্ষিত তাই এই বাড়ির মুখের উপর বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলে গেছে। কারো ধার ধারেনি। শুয়ে বসে থাকলে পারবে না কী?
মায়ের কথা শুনে খুব আস্তে শ্বাস ফেলে পত্রী। অনিচ্ছায় তৈরী হয়ে বের হয় কলেজের উদ্দেশ্যে।
রাস্তা দিয়ে একমনে হেঁটে যাচ্ছিলো সে। হঠাৎ হাতে হ্যাঁচকা টান লাগে।
মুখ তুলে তাকিয়ে দেখতে পায় আশিক দাঁড়িয়ে আছে।
চোখে মুখে বিরক্তির ভাব। হিসহিসিয়ে সে বলল,
“কল দিচ্ছি ধরো না ক্যান?”
“বাড়িতে ঝামেলা।”
“কল ধরতে ঝামেলা না কী আমিই ঝামেলা।”
পত্রী জবাব দেয় না। মাথা নিচু করে দাড়িয়ে থাকে। এদিকে রাস্তা ফাকা পেয়ে আশিক খুব বাজে ভাবে স্পর্শ করে পত্রীর কোমরে। পত্রী সরে গিয়ে চিৎকার করতে নিলে তার মুখে হাত দিয়ে চুপ থাকতে বলে।
পত্রী সরে যেতে চায়,ফুপিয়ে কাঁদে। আশিক ততই হিংস্র হয়। হঠাৎ বাইকের শব্দ। আশিক ভিতরের গলিতে ঢুকে।
ততক্ষণে পত্রী দু হাতে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদেই চলেছে।
বাইক থেকে কেউ একজন নেমে তুড়ি বাজিয়ে পত্রীর দৃষ্টিআকর্ষণ করে। তার সামনে শয়ন কে দেখে কিছুটা সাহস পায় পত্রী।
হেচকি তুলে বলল,
“ভাইয়া বাসায় যাবো।”
শয়ন কিছুটা আন্দাজ করতে পারে। কিছু না বলেই তাকে নিয়ে বাইকে উঠে।এরপর কলেজের পাশে ক্যাফেতে এসে বসেছে দুজন।
পত্রী এখনো হালকা ফুপিয়ে কাঁদছে।
“ছেলেটা কে পত্রী?”
“আমার পরিচিত।”
“প্রেমিক?”
“না।”
“প্রেমিক না হলে কী ওভাবে কেউ স্পর্শ করে?আর প্রেমিক হলেই কাঁদছিলে কেন?”
“বাড়িতে বলে দিবে।ওর সাথে কথা না বললে ও বাড়িতে সব বলে দিবে।”
“কি বলে দিবে?”
“ও বলবে আমি ওকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছি। আমাদের প্রেম আছে।”
“তুমি ওকে দাওনি?”
“না। ও আমার অন্য বান্ধবী কে পছন্দ করতো কিন্তু ভুলে আমার নাম্বার পায়। আমি ওর সাথে কথা বলতে চাইনি।শুরু থেকে আমাকে বলেছে আমি কথা না বললে বাড়িতে বলে দিবে আমার ছবি এডিট করে বাজে ছবি বানাবে।”
“এই জন্য তুমিও মেনে নিলে?”
“মা মারবে।”
এই পর্যায়ে শয়ন না হেসে পারে না।বাচ্চা একটা মেয়ে। তার থেকে কমপক্ষে বছর দশের ছোট হবে। বিয়ে বাড়ির বেয়াইন তথা সামনে বসে থাকা এই কলেজ ছাত্রীর সাহসে তফাৎ দেখে হাসি পাচ্ছে। কিছুটা গম্ভীর কণ্ঠে শয়ন বলল,
“ছেলের নাম্বার দাও। আর আজ থেকে একা আসবে না।নইলে পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিবো।”
আরহানের জন্য কফি বানিয়ে তাকে বার বার তাগাদা দিচ্ছে মাধুর্য। আজ তার রেগুলার চেকাপের কথা ছিল।তাই ক্লাস শেষে এখানে নিয়ে এসেছে আরহান।
অথচ সে এই যে ফোনে ব্যস্ত এদিকে তাকানোর নাম নেই। তার কপালের বা পাশের শিরা ফুলে উঠেছে। এটা তার রাগের লক্ষণ। মাধুর্য চুপচাপ কফির মগ রেখে আরহানের বাম হাত ধরে। আরহান তার দিকে না তাকিয়েই হাত ছাড়িয়ে খুব কাছে টেনে নেয় মাধুর্যকে। বাহিরে তখন বরফ পড়ছে। আকাশে নানা রঙের বাতি। মাধুর্য অনুভব করছে আরহান অস্থির। ফোনের অপর পাশ থেকে কেউ একজন কেঁদেই চলেছে। কন্ঠটা পরিচিত।
হঠাৎ মাধুর্যের হুশ হলো এটা অর্ণির গলা। মাধুর্য একটু উঁচু হয়ে শুনতে চেষ্টা করলেই শুনতে পেল,
“তোমার ভাই রুচিকে বিয়ে করে নিয়ে এসেছে। আমি কী তাহলে সত্যি ভুল করলাম পরিবারের বিরুদ্ধে চলে এসে?
চলবে