হলুদ খাম।

0
1300

হলুদ খাম।

সেই সকাল ৮ টায় বের হয়েছি। জ্যামের কারণে সিএনজি তে বসে আছি ১.৩০ ঘণ্টা যাবত। ১০ টায় মিটিং এবং কম্পানির নতুন মালিকের সাথে সবার পরিচয় পর্ব। এমডি পদে বর্তমানে আমি কাজ করছি। এক সপ্তাহ আগে কম্পানির পূর্বেকার মালিক দেনার হাত থেকে বাঁচার জন্য বিক্রি করেছেন। নতুন মালিকের নামটা বার বার মনে পড়ছে। নামটা অনেক চেনা, অনেক মায়ায় জড়িত। মানুষ টাও আমার চেনা শুধু আমিই তার কাছে অচেনা।
অরিত্র সেলিম খান।
বাবার খুব কাছের বন্ধুর ছেলে। আমার আকিকার দিন অরিত্রের বয়স ছিলো ৩ বছর।
সেইদিন বাবা আর তার বন্ধু রাহিম কাকু আমাদের বিয়ে ঠিক করেন।
কী ভেবে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো আমার জানা নেই। বাবাকে কখনো জিজ্ঞেস করা হয়নি। বাবা রসিক মানুষ ছিলেন। আমি যখন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলাম সেদিন হালকা হলুদ রঙের খাম এনে আমার হাতে দিয়ে বললেন
– লাইলি তোমার মজনুর ছবি।
বাবা প্রায় রসিকতা করে কিন্তু এই ধরণের রসিকতা আমার সাথে প্রথমবার করলেন। আমি কিছু বলার আগেই বাবা চলে গেলেন।
খাম খুলে একটা ছবি পেলাম।
খুব হাসিখুশি চেহারার একটা ছেলের ছবি। শ্যাম বর্ণের এই ছেলেটার প্রথম দেখাতে আমি তার মায়ায় জড়িয়ে পড়ি।
ভাসা ভাসা চোখ, চোখা নাক, পাতলা ঠোটে ছেলেটাকে অনাবিল সুন্দর লাগছে। তার চেয়েও বেশি ভালো লাগছে তার কালো চুল গুলো। হাসির স্টাইল টা অদ্ভুত ছিলো। পুরো ছবিটা জুড়ে আমার চোখ ঘুরাঘুরি করছিলো।
জীবনের প্রথম ভালবাসার অনুভূতি টা আসলেই অন্যরকম ছিলো। এখনো অনুভূতি টা মাঝেমাঝে জেগে উঠে গভীর রাতে। চোখেরজল হয়ে গড়িয়ে পরে।
নামটা পুরোপুরিভাবে মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অনেক ছেলের সাথে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে কিন্তু ওর প্রতি যে ভালোলাগা টা ছিলো সেটা কমেনি। ওর সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিলো যখন আমি অনার্স ২য় বর্ষে পড়ি। বাবার ইচ্ছে ছিলো অনার্স এ পড়া অবস্থায় আমার যেন বিয়ে হয়ে যায়। ততদিনে অরিত্রের গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট।
বাবার ব্যবসায় দেখাশোনা করা ছাড়া উপায় তার নাই কারণ সে ছাড়া তার মা বাবার আর কোনো সন্তান নেই।
ছোটবেলায় তাকে ইউকে তার বড় চাচার কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছিলো পড়াশোনার জন্য। ছোটবেলায় যে তার সাথে আমার দেখা হয়েছিলো সেটা আমার মনে নেই।
সেইদিনটা ছিলো শুক্রবার। সকাল থেকেই আমার মন প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছিলো। এতদিন তাকে ছবিতে দেখেছি আজকে তাকে সামনাসামনি দেখবো।
ছবিতে যাকে দেখেছি তার হাসিতে মনে হয় সে যেন আমার কতো চেনা।
সময়টা ছিলো বিকাল ৫ টা।
আমাদের বাসায় ছোট খোলা বেলকনির ডান পাশে মাঝারী আকারের টেবিল আর দুটো চেয়ার পাতা আছে। আমাকে একটি চেয়ারে বসিয়ে রেখে কানে কানে ফিসফিস করে মুক্তা বলল
– তোমাকে যা লাগছে ভাইয়া পাগল না হয়ে যায়।
কথাটা বলেই ও দৌড়ে চলে গেলো।
আমার মেজো বোনটা বাবার মতো রসিকতা করতে শিখেছে।
কিছুক্ষণ পরে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পেলাম। শব্দটা অচেনা এবং আমার এখানেই যে আসছে বুঝতে পারলাম। বুকের মধ্যে ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো ভূমিকম্প হচ্ছে।
দরজাটার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। খুব দোটনায় পড়েছিলাম সেদিন। তাকাবো নাকি তাকাবো না?
মাথা নিচু করে বসে রইলাম। আড় চোখে দেখলাম কালো প্যান্টশার্ট পড়া সেই শ্যাম বর্ণের মানুষ টা। যার ছবি আমি চারটে বছর যাবত সযত্নে রেখে দিয়েছি।
অরিত্র বলল
– বসতে পারি?
আমি মাথা নিচু রেখেই বললাম
– জি।
তারপর সে চেয়ার টেনে বসলো।
খাবারের ট্রে নিয়ে বড় ফুপু এলেন। ট্রে রেখে আমাদের খেতে বলে চলে গেলেন।
চা ঠাণ্ডা হচ্ছিলো বলে আমি তাকে বললাম
– চা ঠাণ্ডা হচ্ছে।
সে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল
– আপনিও খান।
আমি চায়ের কাপে চুমুক দিলাম। চা টা আজকে বেশ ভালো হয়েছে।
অরিত্র বলল
– একটা জরুরি কথা ছিলো আপনার সাথে।
– জি বলুন।
– কীভাবে বলবো বুঝতে পারছি না। আমি যা বলবো সেটা ভালোভাবে শুনবেন আর পজিটিভ ভাবে নিবেন।
তার চেহারায় হতাশা খেলা করছে। এতক্ষণ যে হাসিখুশি ভাবটা ছিলো তার মাঝে এখন সেটা নেই।
আমি বললাম
– বলেন।
তারপর সে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে বলল
– আসলে আপনি ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝের সময়কার মতো।
আমি একটু অবাক হলাম কথাটা শুনে।
আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরে বলল
– আসলে আমি খারাপ কিছু বলছিনা। আপনার চাল চলন, জামা কাপড় সব কিছুই পুরাণ স্টাইলের। আমার আসলে ফ্যাশনাবল মেয়ে পছন্দ। এমন মেয়ে যে আমার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে। আপনি তো মনে হয় কোনোদিন পার্লারে পর্যন্ত যান নি?
এতো গুলো কথা একসাথে বলল আর যা বলল তাতে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেলো। আমি প্রশ্নটার উত্তর দেয়ার জন্য চেষ্টা করলাম কিন্তু আজব কোনো শব্দ হচ্ছে না কেন?
সে আমার ঠোঁটের নাড়াচাড়া তে বুঝতে পেরেছিলো উত্তর না হবে।
তারপর সে বলল
– রান্নাবাড়ার জন্য তো আমি বিয়ে করতে চাই না। আমি চাই যে আমার সাথে ব্যবসায় সাহায্য করবে, আমার বন্ধুমহলে সহজে মিশতে পারবে।
স্মার্ট মেয়ে আমার পছন্দ। আর আপনি এগুলোর একটাও করতে পারবেন না। কারণ আপনি অন্য জগতের মানুষ।
আমার আর আপনার মাঝে অনেক অনেক পার্থক্য। কোনো মিল নেই। সংসার করার জন্য মিল থাকা জরুরি, মতের মিল থাকতে হয়।
কিন্তু আপনার সম্পর্কে যা শুনেছি তাতে আমার বিশ্বাস আপনার সাথে আমার সংসার টিকবে না।
আসলে আমার আপনাকে স্ত্রী হিসেবে মেনে নেয়াটা সম্ভব না।
কথা গুলো যখন বলছিলো তখন তার মুখ খুব গম্ভীর হয়ে ছিলো।
এই মানুষ টার মন ক্ষণে ক্ষণে পরিবর্তন হয়।

আমার লালন করা স্বপ্ন গুলো চোখের সামনে ঝড়ে যেতে দেখলাম।
মাথা নিচু করে বসে রইলাম। অরিত্র চলে গেলো।
জীবনের সব থেকে বড় কষ্টটা পেলাম।
বাবা জিজ্ঞেস করেছিলো
– তোমার ছেলে পছন্দ হয়নি?
আমি মিথ্যা বলেছিলাম।
– না, পছন্দ হয়নি।
মুক্তা দরজার আড়াল থেকে বের হয়ে এসে বলল
– বাবা ও মিথ্যা বলছে। ওই ছেলে ওকে না বলছে।
কথা গুলো বলার পর আমি মেঝেতে বসে পড়লাম।
চেপে রাখা কান্নাটা থামাতে পারলাম না।
অরিত্র যা বলেছিলো সেগুলো ঠিকি বলেছিলো। ছোট বোনটার জন্মের সময়ম মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মেজো আর ছোট টাকে মা বেশি খেয়াল করতে পারতেন না। মা সারাদিন বিছানায় শুইয়ে থাকেন। বাবা সরকারী কলেজের অধ্যাপক। মার চিকিৎসায়, সংসারের খরচ আরো অন্যান্য বিষয়ে সব টাকা খরচ হয়ে যেত। কলেজের ক্লাস টাইম বাদে স্টুডেন্ট পড়িয়ে যা অল্প কিছু পেতেন তাতে কাজের বুয়ার বেতন টা হতো। ছোট দুজনকে খেয়াল রাখার জন্য কোনো কেয়ার টেকার রাখার মতো বাবার আর্থিক অবস্থা ছিলো না। আমি তখন ক্লাস ৬ এ পড়ি। ওই বয়সে আমি পড়াশোনা সহ সংসারের ভার আর বোনদের ভার তুলে নিলাম কাঁধে।
এতো কাজের ফাঁকে কখনো সময় পাইনি পার্লারে যাওয়ার। কখনো সময় পাই নেই নতুন ফ্যাশনের কাপড় বানানোর। কখনো সময় হয়নি নিজেকে একবিংশ শতাব্দীর মেয়ে হিসেবে গড়ে তোলার। বড় ফুপু আমাদের জামা কাপড় বানিয়ে দিতেন। তিনি আগের যুগের মানুষ তাই আমার জামা কাপড় ও আগের যুগের।
কখনো সময় পাই নেই ফ্রেন্ডদের সাথে আড্ডা দেয়ার।
বাহিরের জগত সম্পর্কে জ্ঞান খুব কম।
সে ঠিকি বলেছিলো। তার কোনো ভুল নেই। ভুল কারো হয়নি। পরিস্থিতি এমন ছিলো।

বাবার মুখেই শুনেছি ওর বিয়ের কথা। খুব সুন্দরী আর ফ্যাশনাবল মেয়ে বিয়ে করেছে। ওর মনের মতো কাউকে জীবন সংগী হিসেবে পেয়েছে এতেই আমার সুখ।
তারপর নিজেকে গুছিয়ে নিলাম। এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলাম। এই ঘটনার পর মা নিজেকে অনেক দোষ দিতো।
আমার স্বপ্নটা এভাবে নষ্ট হয়ে যাবে বুঝিনি। বুঝলে স্বপ্ন সাজাতাম না। সেই হালকা হলুদ খামটা এখনো আমার ড্রয়ারে আছে। খুব যত্নে রেখেছি।
মানুষ টাকে তো পেলাম না। তার ছবিটা তো পেয়েছি। মানুষ টা আমার অচেনা কিন্তু ছবিটা অনেক চেনা।
সিএনজি ওয়ালার ডাকে আমার চিন্তায় ছেদ পড়লো। অতীত আমাকে এখনো তাড়া করে ফিরছে।
ভাড়া মিটিয়ে অফিসের বিল্ডিং এর সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে স্বাভাবিক থাকার জন্য আদেশ করলাম।
সে আমাকে ভালবাসেনি তো কী হয়েছে? আমি তো ভালবেসেছি। ভালবাসার মানুষ টাকে যে নিজের হতে হবে এমন নিয়মে আমি বিশ্বাসী না। তার সুখই আমার সুখ। সে যদি আমাকে ছাড়া সুখে থাকতে পারে, তার সেই হাসিটা যদি লেগে থাকে তার ঠোঁটের কিনারায় তাহলে আমি তাতেই সুখী।
আমার ক্ষুদ্র জগতে যে তাকে পেয়েছি ভালবাসার জন্য এটাই অনেক।
ভালবাসাটা ওর প্রতি যেমন ছিলো আজও তেমনি আছে। শুধু সময় টা বদলে গেছে।
শুধু বদলায়নি হলুদ খাম টা আর ওর প্রতি সৃষ্ট অনুভূতি গুলো।
এখনো জীবন্ত।।।

© Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here