হলদে পাখি পর্ব ০৪ (অন্তিম)

0
486

হলদে পাখি পর্ব ০৪ (অন্তিম)
#লেখিকা_তাসনীম_তুষার

দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। বিদ্যুৎ নেই, হারিকেন এর আলো আধারিতে অন্য রকম আবহ সৃষ্টি হয়েছে ঘরটাতে। চারদিক ভীষণ নিরব, দূরে ঝি ঝি পোকার শব্দ শোনা যাচ্ছে এবং মাঝে মাঝে কোলাব্যাঙ ও থেকে থেকে ডাক দিয়ে উঠছে। জুঁই চোখ কচলাতে কচলাতে তাকিয়ে দেখে যুথী পাশে ঘুমিয়ে আছে।

জুঁই ব্যাথা পাবার পর তার জ্বর চলে আসে গায়ে কাপুনী দিয়ে। মেহেরুন এবং মাহ্সিন দুজনে মিলে জুঁই এর ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে তাতে ব্যান্ডেজ করে দেয়। খাবার এবং জ্বরের ঔষধ খাইয়ে দুইবোন কে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। দিন পেরিয়ে সন্ধ্যায় জুঁইয়ের ঘুম ভাঙলে সে আলতো করে যুথী কে ফিসফিসিয়ে ডাকতে থাকে।

“যুথী, এই যুথী উঠো? পাখি কই? পাখিটাকি স্টোর রুমে আছে?”

যুথী ও বোনকে ফিসফিসিয়ে জবাব দেয়, “আমি জানিনা। আম্মু খুব বকা দিয়েছে। বলেছে স্টোর রুমে আর না যেতে।”

জুঁই তখন কাঁদোকাঁদো কণ্ঠে বলে উঠে, “পাখিটা তো ভয় পাবে অন্ধকার এ থাকলে।”

হঠাৎ দরজা খোলার শব্দে চমকে উঠে দুইবোন, দেখে মাহ্সিন ছানাটি নিয়ে তাদের ঘরে প্রবেশ করছে। ছানাটি সমেত তার ঘর টা তাক এর উপরে রেখে মাহ্সিন জুঁই যূথীর পাশে বসে বলে,

“আম্মু, তোমাদের আম্মু আর নানু ভাই খুব রাগ করেছে। বলেছে পাখি টাকে আর রাখা যাবেনা। আমি খুব বুঝিয়ে শুধু আজকের জন্য রেখেছি পাখিটা তোমাদের জন্য।”

যুথী তার বাবার কথায় মন খারাপ করে উঠে বসে। জুঁই ও উঠে বসতে চাইলেও ব্যাথার কারণে আবার তাকে শুয়ে পড়তে হয়। জুঁই কেদে বলে,

“বাবা, পাখিটা কোথায় যাবে তাহলে? ওকে যদি কাকে নিয়ে যায়?”

যুথী ও কেদে বলে, “বাবা পাখিটা থাকুক না আমাদের সাথে।”
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


“না বাবা আজকের রাত টুকুই, আর রাখা যাবেনা। তোমার নানুভাই কড়া নিষেধ করে দিয়েছে। তাই এখন ওকে নিয়ে এসেছি তোমাদের কাছে।” কথা গুলো শেষ করে ছানাটির ঘরটি তাদের কাছে দিয়ে মাহসিন চলে যায়।

দুবোন ছলছল চোখ নিয়ে পাখিটাকে আদর করতে থাকে। পাখিটি ও কি বুঝলো কে জানে, একবার জুঁই তো আরেকবার যুথীর গা ঘেঁষে বসে থাকে আর তাদের স্নেহ মাখা আদরে চোখ বন্ধ করে রাখে।

কখন ঘুমিয়ে পড়েছে হলদে পাখির ছানার সাথে খেলা করতে করতে সেটা দুবোন নিজেও বলতে পারবেনা। সকাল বেলা ঘুম থেকে জুঁই যুথী উঠে দেখে ছানা ও ছানার ঘর দুটোই তাদের কাছে নেই। নেই তো নেই, ঘরের কোথাও নেই। যুথী যতটুকু সম্ভব নানুভাই এর ঘরের আনাচে কানাচে খুঁজে দেখেছে। জুঁই ও চেষ্টা করেছিল বিছানা থেকে নেমে ঘরটায় খোঁজার জন্য কিন্তু ব্যাথা সহ্য করতে পারেনি বিধায় তাকে অগত্যা শুয়ে থেকে যুথীর উপরেই ভরসা করতে হয়।

নাহ্ যুথী কোত্থাও খুঁজে পেলনা ঘরের। জুঁই এর কাছে এসে ফুঁপিয়ে কেদে উঠলো যুথী। জুঁই ও ফুঁপিয়ে কাদতে শুরু করলো। এরই মাঝে মাহ্সিন ঘরে ঢুকলে দুবোন মাথা নিচু করে ফুঁপিয়ে কেদে চললো তবুও একটি বারের জন্য তাদের বাবার দিকে তাকালোনা। মাহ্সিন মেয়েদের পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরলো। সাথে সাথেই মেয়ে দুটো কষ্টে চিৎকার করে কান্না করে উঠলো বাবাকে জড়িয়ে ধরে।

মেয়েদের কান্নায় মাহ্সিন এর ও চোখ ভিজে আসে, চোখের পানি আটকে দুই মেয়ের চোখের জল মুছে তাদের কে উদ্দেশ্য করে বলে,

“আম্মু কাদেনা। জানো আজ কে অনেক মজার একটা পিঠা বানিয়েছে তোমাদের মামী। চলো সকালের নাস্তা করবে।”

জুঁই যুথী নিশ্চুপ থাকে মাথা নিচু করে। মাহ্সিন তখন বলে,

“তোমরা যদি এখন আমার সাথে আসো তাহলে তোমাদের কে পাখিটার সাথে দেখা করিয়ে দিবো।”

তাৎক্ষণিক ভাবে দুবোনের চোখে কৌতূহল দেখা যায়। জুঁই কে কোলে নিয়ে যুথীর হাত ধরে তাদের কে নিয়ে আসে পাকা দালানের বারান্দায়। সেখানে একটা বড়ো চৌকি পাতা এবং সেখানে একটা তোষক আর বালিশ রেখে জুঁই এর শোয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

“বাবা পাখিটা কোথায় বাবা?” যুথী প্রশ্ন করে তাদের বাবা মাহ্সিন কে।

“আগে লক্ষ্মী মেয়ের মতো খেয়ে নাও তোমরা মা। তারপর বলবো।”

জুঁই ও যুথী কে তাদের মা মেহেরুন এসে পরোটা গরুর গোস্ত খাইয়ে তারপর পাটিসাপটা পিঠা খেতে দেয়। জুঁই ও যুথী গপাগপ সব খেয়ে নেয় কারণ তাদের যে আর দেরি সহ্য হচ্ছেনা পাখিটিকে দেখার জন্য।

হঠাৎ দুবোন খেয়াল করে যে উঠোনে একটি কাপড় নেরে দেবার দড়িতে দুটো হলদে পাখি এসে বসেছে।

যুথী লাফ দিয়ে উঠনে নামে এবং অবাক হয় পাখি দুটি দেখতে থাকে। নাহ্ এদুটি পাখির একটি পাখিও তাদের টার মতো না। দুটো পাখিই আকারে বেশ বড়ো ও মোটাসোটা। জুঁই দুর থেকে দেখেই বলে বসে, “যুথী এটা আমাদের পাখি না।”

মাহ্সিন ইতিমধ্যে স্টোররুমে গিয়ে সেখান থেকে হলদে পাখির ছানাটির ঘর টি নিয়ে এসে তার দুই মেয়ের সামনে রাখে। ছোট্ট ছানাটি ও দুবোন কে দেখতে পেয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসে। জুঁই ও যুথী আনন্দে হেসে উঠে পাখিটিকে আদর করতে থাকে।

ওদিকে দড়িতে বসে থাকা দুটো হলদে পাখি তারাও কাছাকাছি এসে পাগলের মত উড়তে থাকে এবং কিচিরমিচির শব্দ করতে থাকে। হলদে পাখির ছানাটি ও ঐ দুটো পাখি কে দেখে ডানা ঝাপটানো শুরু করে দেয়। তখন মাহ্সিন দুই মেয়েকে বলে,

“জানো গতকাল থেকে দেখছি এই দুটো হলদে পাখি আমাদের বাড়ির উঠোনে উরাউড়ি করছে। তারা কি জানো? ওদের একজন হচ্ছে মা পাখি এবং আরেকজন বাবা পাখি। তারা দুজনেই তাদের এই ছানাটিকে খুঁজছে।”

জুঁই ও যুথী বড়ো বড়ো চোখে অবাক হয় তাদের বাবার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। তাদের বাবা তখনো বলে চলেছে,

“আর দেখো হলদে পাখির ছানাটি ও কত খুশি তার বাবা মা কে দেখে। এখন তোমরা বলো ছানাটি কে কি আমাদের খুশির জন্য আমাদের কাছে রাখা উচিত? নাকি ছানাটি খুশি থাকে তার বাবা মায়ের সাথে সেখানে দিয়ে দেওয়া উচিৎ?”

জুঁই ও যুথী চুপ করে থাকে। কিছুই বলেনা। তখন মাহ্সিন বলে,

“তোমাদের নানুভাই তো তোমাদের কে অনেক ভালোবাসে ও আদর করে, তাইনা? এখন ধরো আমি আর তোমাদের আম্মু আজ আমাদের বাসায় ফিরে যাই, এবং তোমাদের নানুভাই তোমাদের রেখে দিতে চায় তোমরা থাকতে পারবে আমাদের কে ছাড়া?”

জুঁই ও যুথী দুই দিকে মাথা নেড়ে তাদের বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলে,

“না বাবা তোমাদের কে ছাড়া থাকতে পারবো না বাবা।”

মাহ্সিন হেসে বলে, “তাহলে ছানাটির কার সাথে থাকা উচিৎ?”

দুবোন একসাথে সমস্বরে বলে উঠে, “ওর বাবা মায়ের সাথে।”

বাবা মেয়েরা যখন কথা বলছিল, তখন কিন্তু ছানা পাখিটা তার বাবা মাকে দেখে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে বেশ কয়েক বার উড়ার চেষ্টা করছিল। চেষ্টা করতে করতে ছানাটি বেশ খানিকক্ষণ উড়তে সক্ষম ও হয় কিন্তু আবার পড়ে যায়। একটানা প্রায় অনেকক্ষন চেষ্টা করার পর পাখি টিও মোটামুটি কিছুক্ষণ উরে থাকতে সক্ষম হয়। পাখির ছানাটি তার বাবা মায়ের সাথে কিছুক্ষণ উরে উরে আবার এসে বসে জুঁই যুথীর পাশে। তা দেখে জুঁই যুথীর খুশি যেনো আর ধরেনা।

জুঁই যুথীর সম্মতি ক্রমে ছানাটিকে তাদের বাবা মাহ্সিন যেই আম গাছটিতে তাকে পেয়েছিল সেখানে রেখে আসে আর মা ও বাবা পাখিটা ও মাহ্সিন এর পেছন পেছন যায়।

দেখতে দেখতে দুই দিন পার হয়। এ দুইদিনে জুঁই ও বেশ সুস্থ হয়ে উঠে। অন্যদিকে হলদে পাখির ছানাটি ও মোটামুটি উড়তে শিখে যায়। এ দুইদিন রোজ হলদে পাখির ছানাটি উরে উরে জুই যুথীর কাছে আসতো সাথে ছানাটির মা বাবা ও। জুঁই যুথীর সাথে যেনো ছানাটি ও তার পরিবারের সাথে এক মায়ার বাঁধনে জড়িয়ে যায়।

আজ যুথী ও তার পরিবার চলে যাবে ঢাকায়। হয়ত হলদে পাখির ছানাটি ও বুঝতে পেরেছে, তাই তো সারাক্ষণ জুঁই যুথীর সাথে সাথেই থাকছে। দু বোনের ভীষণ মন খারাপ। বিদায়ের আগে নানুভাই আর মামীকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দেয়।

নানুবাড়ির সীমানা পেরিয়ে বাড়ির সামনেই একটা বিশাল তেতুঁল গাছ। তার নিচে এসে জড়ো হয়ছে জুই যুথীর মামী ও নানু ভাই। সাথে এসেছে গ্রামের আরও চেনা মানুষ জন, সবাই বিদায় জানাতে এসেছে। তেতুল গাছের নিকটে একটা বেবিট্যাক্সি দাড়িয়ে আছে। নানুভাই ও মামী তৈরি করে অনেক খাবার ও দ্রব্যাদি দিয়ে দিয়েছে, যা মাহসীন তুলে রাখছে বেবিট্যাক্সি তে। সবার সাথে বিদায় নিয়ে একে একে জুঁই যুথী ও তার বাবা মা উঠে বসে তাতে। হঠাৎ চোখ পড়লো যুথীর তেতুঁল গাছের দিকে। ডালে বসে আছে তিনটে হলদে পাখি।

যুথী বললো, “জুঁই দেখো ওই যে আমাদের পাখি।”

দুজনে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানায় সবার উদ্দেশ্যে এবং পাখি গুলোকেও।

বেবিট্যাক্সি চলা শুরু করলে, হলদে পাখির ছানাটি ও তাদের পেছন পেছন উরে চলে আসে। কিছুদূর আসলে হলদে পাখির ছানাটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় তার মা ও বাবা পাখিটি। যতক্ষণ পর্যন্ত দেখা যায় নানুর গ্রামের বাড়ি ও পাখিটিকে ততক্ষণ জুঁই ও যুথী পেছনের দিকে তাকিয়ে রয়।

এই কদিনে যেনো পাখিটি ও তাদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যায়। আপনজন কে ছেড়ে যেমন কষ্ট হয়, ঠিক তেমনি কষ্ট হচ্ছে আজ দুবোনের পাখিটির জন্য। দুর থেকে জুঁই যুথী অশ্রুসিক্ত চোখে হলদে পাখির ছানাটিকে বিদায় জানায়, আবার কোনোদিন হয়তো দেখা হবে মনে এই প্রত্যাশা নিয়ে।

আগের পর্বের লিংক:

১.
https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/911358689294851/

২. https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/912235055873881/

৩. https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/913639949066725/

*** সমাপ্ত ***

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here