সতীনকাঁটা পর্ব ৫

0
927

#সতীনকাঁটা পর্ব-৫
লেখায়ঃ(Nosrat Monisha)

-ও মা গো! কি সব্বনাশ অইলো গো।
সানজিদার চিৎকার শুনে সবাই বের হয়ে দেখে,
ঝড়ে উঠানের বড় জলপাই গাছটা উপড়ে গিয়ে গোয়াল ঘরের উপর পড়েছে। এতে সাত মাসের গর্ভবতী লাল গাভীটা জিহ্বা বের করে মরে পড়ে আছে।

সবার সাথে তানজিনা, রাফিয়া আর আজুয়াদও এলো।
সবার কষ্ট হচ্ছে। নিরীহ মৃত গরুর খোলা চোখ, পাষাণের চোখেও পানি এনে দিবে।

-এইগুলান হইতাছে তুমার লাইগ্যা ছোড বউমা।

তানজিনা অবাক হয়ে যায় শ্বাশুড়ির কথায়।

তানজিনার হয়ে জবাবটা আজুয়াদ দেয়,
-মা ঝড়ে গাছ ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে তানু এলো কিভাবে?
-নতুন বৌ হের লাইগ্যা কেওয়ার(দরজা) দইরা(ধরে) ঘুমাইলো। বাইত বালা কিছু অইবো কেমনে। অালিক্কী(অলক্ষী) একটা ।

-আম্মা বন্ধ করো । আমি নতুন বৌকে বাইরে রাখছি এতে তানুর, কি দোষ ?

আফিয়া বলে,
-আপনের কানে এইসব মন্তর(মন্ত্র) তো ছোটভাবীই দিছে ছোড ভাই।

-তা যা কইছো আফিয়া। বলি তানজিনা আফা অত বড় সব্বনাশটা না করলে তুমার শান্তি লাগতাছিন না, তাই-না?

আজুয়াদ অনেক রেগে যায়,
-আফিয়া আর একটা কথা বললে তোর হাড়-গোড় সব ভেঙে দিবো আমি।এই যে ভাবি আপনারে সাবধান করতেছি, তানুর সাথে এমন করে যদি আর কোনদিন কথা বলেন আমি আপনাকে দেখে নিবো। আমি এতদিন অনেক সহ্য করেছি আর না।

অন্য সময় হলে তানজিনা খুশিতে গদগদ হয়ে যেত, কারণ আজুয়াদ তার পক্ষ নিয়ে বাড়ির সবার সাথে ঝগড়া করছে। কিন্তু আজকে আজুয়াদের এই আদিখ্যেতা দেখে তার মেজাজ খারাপ হলো।

তাছাড়া এই গাভীর নির্মম মৃত্যুটা সে মেনে নিতে পারছে না, এই বাড়িতে ঐ জীবটাইতো ছিলো যে নিরবে তার সব দুঃখের কথা শুনতো। তানজিনা গরুটার একটা নামও দিয়েছিলো সুখী। এটা নিয়ে এবাড়ির সবাই কত ঠাট্টা করেছে।

তানজিনার সবসময়ই মনে হতো খান বাড়ির মানুষগুলোর চেয়ে এখানকার হাঁস-মুরগি আর সুখী তাকে বেশি ভালবাসে। তাই এদের নিয়ে তানজিনার খান বাড়িতে একটা আলাদা সংসার তৈরি হয়েছিল। সেই সংসারের একজন আজ তাকে ছেড়ে চলে গেছে।
তানজিনার চোখ ভরে কান্না আসছে, কিন্তু এদের সামনে কাঁদলে এরা মজা পাবে। তাই ঘরে চলে গেল।

ঘরে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাবতে লাগলো,
-আমি যাকেই ভালবাসি সেই কেন আামাকে ছেড়ে দূরে চলে যায়? গতকাল সকালেও তো সব ঠিক ছিলো।আমার জীবনটা সুন্দর সাজানো ছিল। এই ঝড়ে কেন সুখী মারা গেলো? গাছটা আমার উপর কেন পড়লো না?একবার তো ভেবেছিলাম মরে যাবো কিন্তু আমি এত ভীতু যে মরার জন্য যেটুকু সাহস লাগে তাও আমার নেই।

তারপর উপরের দিকে তাকিয়ে জোরে একটা চিৎকার দিয়ে বলে,
-আল্লাহ আমার জীবনটা কেন এমন হলো? তুমি আর কত কষ্ট দিবে আমায়?


-না বেয়াইসাব এইডা অয়না। আমরা বাড়ির মাইয়্যা হত্তীনের ঘর করব না। আফনে জামাইয়ের নতুন বউ ছাড়ানির(তালাক) বাউ (ব্যবস্থা) করুইন।
কথাটা বলছে তানজিনার বাবা।

কাল রাতে সানজিদার কাছ থেকে সব শুনে আজ সকালেই তানজিনার বাপের বাড়ির লোকেরা খান বাড়িতে হাজির হয়েছে।
তানজিনার বাবা জমির ভুঁইয়া আর চাচা কবির ভুঁইয়া আমজাদ খানের সাথে এসব নিয়েই তর্ক-বিতর্ক করছে।

আর এদিকে তানজিনার মা সাবিহা বেগম তানজিনার ঘরে একান্তে বসে মেয়ের সাথে কথা বলছে।

তিনি মেয়ের উপর ভীষণ রেগে আছেন।
-কবে তুমি এত বড় হয়ে গেলে তানু যে, এত বড়ো একটা ঘটনা নিজের মাকে জানানোর প্রয়োজন মনে করনি।

তানজিনা একটু গম্ভীর আর ভারাক্রান্ত স্বরে বল,
-সেইদিন আম্মু যেদিন তুমি আমাকে পর করে দিয়েছিলে। কসম দিয়েছিলে এ বাড়িতে যাই হোক না কেন, ঐ বাড়ি যেন ফিরে না যাই।

-পিটিয়ে তোমার পিঠের চামড়া তুলে নেবো আমি। এমনিতে তো মায়ের কোন কথা শুন না সেদিন রাগের মাথায় একটা কথা বলেছি আর সেটা ধরে বসে আছো তুমি? কবে বুঝবে, তোমার চেয়ে দামী আমার কাছে এই দুনিয়ায় আর কিছু নেই ।
তানজিনা মায়ের এই কথা শুনে আনন্দে কেঁদে দিলো।
-আম্মু!

সাবিহা বেগম মেয়েকে টেনে বুকে নিলেন।

একটু ধীর গলায় বলতে লাগলেন,
-যখন তুমি জন্মালে তখনই ঠিক করেছিলাম তোমার জীবনটা আমার মত হবে না। তুমি পড়বে, বড় চাকরি করবে,নিজের পায়ে দাঁড়বে । আর তুমি আজুয়াদের সাথে প্রেম করে সব নষ্ট করে দিলে।তোমার বাবা যখন তোমার বিয়ে ঠিক করে সেই বিয়ে ভাঙার জন্য আমি কি-না করেছি।

মায়ের এই কথা শুনে অবাক হলো তানজিনা।
মায়ের বুকে থেকে মুখ উঠিয়ে প্রশ্ন করে,
-আম্মু এইসব কথা তো তুমি আগে কখনো বলো নি।

সাবিহা বেগম একটু হাসলো।
-তুমি কখনো জানতে চেয়েছো?দোষ তোমার না। আসলে যে নারীর স্বামী তাকে সম্মান করে না সেই মেয়ে শ্বশুর বাড়ির মানুষ কিংবা তার সন্তানদের কাছ থেকে সম্মান পায় না।
তানজিনা অস্ফুটস্বরে বলে,
-আম্মু!

-কি হলো এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই। তানু এমন না যে তোমার বাবা, আমি কালো বলে আমায় ভালবাসে না। তিনি আমাকে খুব ভালবাসে। কিন্তু ভালবাসা আর সম্মান এক নয়। আর সেই জন্যই হয়তো তুমি কিংবা তোমার ভাই কেউই কোনদিন আমাকে সেই সম্মানটা দিতে পারনি যেটা পাওয়ার যোগ্য আমি।

মুখভার করে তানজিনা বলে,
-আম্মু, আমাকে কি মাফ করা যায় না?

-পাগল মেয়ে এখানে মাফ চাওয়ার প্রশ্ন কোথা থেকে আসছে?তোমরা দুইজন ছোটবেলা থেকে যা দেখেছো তাই শিখেছ । তোমার বাবা যদি আমাকে সম্মান দিতো তবে কখনো কারও সাহস হতো না আমাকে অপমান আর অসম্মান করার। কিন্তু তানু এখন এই বয়সে এসে বুঝতে পেরেছি যে ভুলটা আমার ছিলো।
ততক্ষণ সংসারে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করো যতক্ষণ সেখানে তোমার সম্মান বজায় থাকে। যদি নিজের সম্মান নষ্ট করে কিছু মেনে নিতে হয় তবে থেমে যাও।কারণ সম্মান এমন একটা জিনিস যে, কেউ তোমাকে যেচে দিবে না তোমার আাদায় করে নিতে হবে। আমার ভুলটা কোথায় ছিলো জানো?
আগ্রহ ভরে বাচ্চাদের মতো প্রশ্নটা করে,
-কোথায় আম্মু?

-তোমার নানার বাড়ির লোকের বরাবরই আমাকে নিয়ে অনেক চিন্তা ছিলো। কালো মেয়ের বিয়ে হবে কি করে? আমি ডাক্তারিতে ভর্তি হয়েছিলাম তখন তোমার দাদা আমার এক দূরসম্পর্কের আত্মীয়ার কাছ থেকে আমার বাবার বাড়ির টাকা-পয়সার কথা শুনে আমাকে ঢাকায় দেখতে যায়। মোটা যৌতুকোর লোভে তোমার দাদা বিয়ে করাতে রাজি হয়ে যায়। আমার ডাক্তারি পড়া মাঝপথে থামিয়ে অজপাড়াগাঁয়ে আমাকে বিয়ে দিয়ে দায় মুক্ত হয়েছিল তোমার নানা। বাবার মুখে কন্যা বিদায়ের আনন্দ দেখে আমি নিজের স্বপ্নকে মেরে ফেলি। আর তোমার দাদার বাড়িতে প্রতি পদে পদে মানিয়ে নিতে নিতে একসময় নিজের আত্মসম্মানটা ভুলে যাই৷
কিন্তু তুমি জন্মানোর পর সেই স্বপ্নটা আবার দেখতে শুরু করি। তুমি পড়াশোনায় ভালো তাই আমার স্বপ্নটা ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। আমি চেয়েছিলাম তোমাকে একটা ভাল জীবন দিতে। সেজন্য বাড়ির সবার বিরুদ্ধে লড়াই করে তোমাকে কলেজে পড়িয়েছি। কিন্তু আমার সব স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায় যখন তুমি আজুয়াদের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পরো।
তারপর তাকে আবার বিয়েও করলে। তানু তুমি এমন একটা মানুষকে বিয়ে করেছো যে তোমার ভালবাসা আর ত্যাগের কোন মূল্যই দিতে জানে না।

অনেকক্ষণ মা-মেয়ে কোন কথা বলে নি। তারপর সাবিহা বেগম নিরবতা ভেঙে প্রশ্ন করে,
-তুমি কি এখনো এই নরকে থাকবে?

-মা আমি। বলে তানজিনা হঠাৎ জ্ঞান হারায়।

এঘটনা আগেও কয়েক বার ঘটেছে এ নিয়ে সাবিহা বেগম তানজিনাকে ডাক্তারও দেখিয়েছিলো।তাই তিনি বুঝলেন মেয়ে হয়তো কাল থেকে কিছু খায় নি। তাই শরীরে গ্লুকোজ কমে জ্ঞান হারিয়েছে।

উনি জগ থেকে একটু পানি নিয়ে তানজিনার মুখে দিলেন। তানজিনার জ্ঞান ফিরলো।
তারপর একটু পানি খাইয়ে দিয়ে বলেন,
-কিছু না খেলে তো এমনই হবে।যে মানুষটা তোমাকে ঠকালো তার জন্য নিজেকে কেন শাস্তি দিচ্ছো তানু?

দুর্বল গলায় তানজিনা বলে,
-না,আম্মু খাবারের জন্য না। কিছুদিন হলো শরীরটা খুব দুর্বল আর খাবারগুলো গন্ধ লাগে। মাছ মাংস দেখলেই গা গোলায়।

একথা শুনে সাবিহা বেগম মেয়েকে আরও কিছু প্রশ্ন করলো। যেগুলোর জবাব দিতে তানজিনা সংকোচবোধ করছিলো।

তারপর বললো,
-চলো
-কোথায় আম্মু।
-তুমি প্রশ্ন শুধু আমাকেই করতে জানো। বাকি সবার বেলায় মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকো।

তানজিনা আর কিছু বললো না চুপচাপ মায়ের সাথে গেলো।

অন্যদিকে বসার ঘরে তুলকালাম চলছে। রেহানা খাতুন লম্বা ঘোমটার আড়ালে পায়ে-পা দিয়ে ঝগড়া করছে।

-সোয়ামীরে বাইন্দা রাখবার না পারলে আমরা কিতা করুম? আপনেগো মাইয়্যারে বিয়া কইরা আমার আজুর জেবনডা (জীবন) শেষ অইয়্যা গেছে।
-খোদারে এড্ডু ডরাইন বিয়াইন। আমার ভাইজির নামে অত বদনাম কইরেন না। আমনের (আপনার) ঘরেও একখান মাইয়্যা আছে।

-আমার মাইয়্যার লগে আপনেগো ভাইগ্যা বিয়া করা মাইয়্যার তুলনা দিবাইন না।

-আমার ভাইজিরে তো আপনের বাড়ির পোলায়ই ভাগাইছিলো।

জমির ভুঁইয়া ছোট ভাইকে থামিয়ে বলে,
-আহা! কবির থাম এলা। মাইয়্যা মাইনসের লগে তক্ক করস কিয়ের লাইগ্যা?

আমজাদ খানও রেহানা বেগমকে চোখ রাঙিয়ে চুপ করিয়ে দেয়।

-আমার মাইয়্যা হত্তীনের ঘর করবো না বেয়াইসাব এইডা পথমেত্তে(প্রথম থেকে) আমি কইতাছি অহন আবার কইলাম।

রেহানা বেগম স্বামীর চোখ রাঙানো উপেক্ষা করে বলে উঠে,
-তয় নিজেগো মাইয়্যারে লইয়্যা যান গা।

তখনই সাবিহা বেগম দরজা দিয়ে তানজিনাকে নিয়ে ভেতরে আসতে আসতে বলে,
-নিশ্চয়ই নিয়ে যাবো। এই নরকে তো আর নিজের মেয়েকে রেখে যাবো না আমি।

এবার আমজাদ খান ক্ষেপে যায়।এতক্ষণ নিজের স্ত্রীর উপরতো রাগ হচ্ছিলোই তার উপর সাবিহা বেগমের কথা বলায় রাগ তার চরমে পৌঁছে গেল ।
পুরুষ মানুষের মধ্যে মেয়েদের কথা বলা আমজাদ খানের একদম পছন্দ না।

মেয়েরা থাকবে ঘরের ভিতরে।

-তাই নাহি আমরা বাড়ি নরহক। যান তাঅইলে অক্ষণ নিজের মাইয়্যা লইয়া বাইরোয়্যা যাইন।
বলে গর্জে উঠে আমজাদ খান।

-হ্যাঁ, নিয়ে যাচ্ছি।
বলে সাবিহা বেগম আজুয়াদের সামনে গিয়ে দাঁড়য়।

– তুমি তালাকের কাগজ পেয়ে যাবে কিন্তু বাচ্চাটা হওয়ার পর। কারণ গর্ভাবস্থায় তালাক হয় না।

এক মুহূর্তে পুরো ঘরে নিরবতা ছেয়ে যায়।

আজুয়াদ নিরবতা ভেঙে প্রশ্ন করে,
-বাচ্চা মানে?
-তানজিনা সন্তান সম্ভাবা।

তানজিনা নিজের মায়ের মুখ হতে এই কথা শুনে সবচেয়ে বেশি অবাক হয়। সে এখন ঐ প্রশ্নগুলোর মানে খুঁজে পায়।

-এইডা কি হাছানি আবরারের মা?
রাগী গলায় স্ত্রীকে ধমকে উঠে আমজাদ খান।

-আমি কেমনে কমু? তয় কয়দিন দইরা দেকতাছি ছোড বউমার পোয়াতি অওয়ার লক্কন।

আমজাদ খানসহ সবাই বুঝতে পারে তানজিনা মা হতে চলছে।

-তাঅইলে অহন ছোড বউমার আর কুনোহানে যাওন অইবো না।

-তাহলে বেয়াই সাহেব, আপনি আপনার ছেলে আর নতুন বউয়ের তালাকের ব্যবস্থা করুন।
সাবিহা বেগমের কথায় জমির আর কবির ভুঁইয়া সায় দেয়।

কোন মতেই তাদের মানাতে না পেরে নিরুপায় হয়ে আমজাদ খান বলে,
-ঠিক আছে। আজু রাফিয়ারে তালাক দিবো। তয় আমার একখান শত্ত আছে?
-কি শর্ত

-আপনের মাইয়্যার পোলা পয়দা করুন লাগবো।

একটু অবাক হয়ে সাবিহা বেগম প্রশ্ন করে,
-আর যদি মেয়ে হয়।

-তয় হের যা খুশি করবো। তয় আজু আর রাফিয়ার তালাক অইবো না।যদদিন ছোড বউমার আইবোদ(বাচ্চা) না অইব তদদিন রাফিয়া এ বাইত থাকবো। হের পর পোলা না মাইয়্যা হেইডা দেইক্যা তালাক অইবো।

ভুঁইয়া বাড়ির সবাই ভাবছে কি করবে।

তখনই তানজিনা বলে,
-আম্মু এই সিদ্ধান্তটা আমি নেই?

– চলবে?

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে