বেলা শেষে আলো পর্ব-০৭(অন্তিম পর্ব)

0
303

#বেলা শেষে আলো
#৭+অন্তিম পর্ব
#ইসরাত_জাহান_এশা

তনিমা একদিকে বাবার মৃত্যুতে শোকে কাতর অন্য দিকে কালোজাদুর প্রভাব তনিমাকে আবার আগের মতো করে ফেলে। তনিমার সাথে ইদানীং ভয়ংকর কিছু কাহীনি হচ্ছে যাতে তনিমার পাগলের মতো অবস্থা। তনিমা সব সময় একটা ভয় নিয়ে থাকত খাওয়া দাওয়া সব অফ। রাতে ঘুমালে মনে হতো কোনো একটা ছায়া সব সময় তনিমাকে ফলো করছে।
একদিন রাতে তনিমা মেয়েকে নিয়ে শুয়ে আছে হটাৎ মশারীর উপর একটা মেয়ের প্রতি ছবি দেখতে পেলে। তনিমা লাফিয়ে উঠে। ভয় না পাওয়ার চেষ্টা করে সামনে আগানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তনিমা সামনে গিয়ে প্রতি ছবিকে ছোঁয়ার আগেই তনিমা অজ্ঞান হয়ে পরে। রিশা মায়ের কোনো নড়াচড়া না দেখে জোরে জোরে চিৎকার শুরু করে।

রাসেলঃ— কি এক ঝামেলা ঘারে চাপছে শান্তিতে ঘুমাতে পর্যন্ত পারছি। তনিমা তোর মেয়েকে থামা আমাদের একটু শান্তি দে। ঘুমাতে পারছি না।।

তনিমার মাও অনেকক্ষন ধরে বলছে তনিমা মেয়েটারে থামা। কিন্তু তনিমার তো কোনো সারা শব্দ আসছে না। তনিমার মা এবার উঠে তনিমার রুমের যায়। তনিমার মা তনিমার রুমে গিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে উঠে।
তনিমা______

রাসেল দৌড়ে এসে দেখে তনিমার অর্ধেক শরীর বিছানায় আর অর্ধেক বিছানা থেকে বাইরে শুধু মশারীর জন্য মাথায় আঘাত লাগেনি। তনিমার মা রিশাকে কোলে নেয়৷ রাসেল তনিমাকে বিছানা থেকে নামিয়ে কোলে নিয়ে সামনের রুমে নিয়ে শুয়ে দেয়।

অনেক চেষ্টা করার পড়েও তনিমার হুঁশ ফিরছে না। এতো রাতে কাউকে ডাকলে তাও তো কেউ আসবে না। তাও রাসেল হুজুর কে ডেকে নিয়ে আসে। উনি তনিমাকে পানি পড়া দিলে তনিমার হুঁশ আসে তবে কারো সাথে কথা বলে না।
শুধু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে।

হুজুর— শোনো রাসেল আমার মনে হয় তনিমার উপর হয়ত জ্বিনের আসর লাগছে আর না হয় কেউ ওর উপর জ্বীন চালান করছে।
তুমি দ্রুত বড় কোনো হুজুরের সাথে আলাপ করো। নাহলে খুব খারাপ হয়ে যাবে।
রাসেল— আচ্ছা।

হুজুর রাসেলকে ভালো হুজুরের পরামর্শ দিয়ে চলে যায়। তনিমা কিছুক্ষন পর পর থেমে থেমে কান্না শুরু করে। তনিমার মা সারারাত তনিমার পাশে বসে থাকে।তনিমার এতো অসুস্থতার কথা শুনে রাতুল প্রথমবারের মতো আসে শশুর বাড়িতে। এসে তনিমাকে নিয়ে যেতে চায়। তবে তনিমার মা রাতুলের হাতে তনিমাকে দিতে নারাজ এরপর অনেক কথা কাটাকাটিও হয়। তবুও তনিমার মা তনিমাকে রাতুলের হাতে দেন না৷ তনিমা আর রিশাকে নিজের কাছে রেখে দেয় আর অপমান করে পাঠিয়ে দেয়।

তনিমাকে ভালো একজন হুজুর দেখানো হলে তনিমা কিছুটা সুস্থ হয়। তবে হুজুর বলে দিয়েছেন এতো তারাতারি জাদুর প্রভাব কাটবে না। সামনে আরো সমস্যা হবে। আপনাদের সচেতন ভাবে থাকতে হবে আর আমি যা দিয়েছি এগুলো যদি ঠিক মতো না ব্যবহার করা হয় তাহলে সমস্যা আরো বাড়বে।

তনিমা একটু ভালো হলে রাতুল তনিমাকে নেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লাগে। তনিমাও যেতে চায়, কারন তনিমার মা তনিমাকে দিতে চাননা আর রিশাকে রাখতে চান না। রিশাকে বলতে গেলে সহ্যও করত না। তাই তনিমা নিজের মেয়ের কথা চিন্তা করে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নেয়।
রাতুল যেদিন আসার কথা ছিলো তনিমা সেইদিন আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে নাক, মুখ দিয়ে রক্ত বের হতে শুরু করে। তনিমা জোরে জোরে চিৎকার দিতে শুরু করে মা আমার নাড়িভুড়ি সব জ্বলে যাচ্ছে।মা আমাকে বাঁচাও আমি আর সহ্য করতে পারছি না!

তনিমার অবস্থা খুবই খারাপ একদিনের মধ্যে তনিমার চেহারা কালো হয়ে যায়। এতোটাই খারাপ অবস্থা ছিলো মনে হচ্ছে অনেক দিন না খাওয়া রুগী।
রাতুল তনিমাকে নেওয়ার মতো আর সাহস করে না। আর ডাক্তার দেখানোর জন্য কখনোই কোনো খরচ দেয় না। তনিমার মা রাতুল কে স্পষ্ট মুখের উপর বলে দেয়৷ এই যে এতোবার মেয়েটা অসুস্থ হয় তুমি কখনো খরচ দিয়েছো? বার বার শুধু মেয়েটাকে নিতো আসো।

রাতুল কোনো উত্তর না করেই চলে যায়। রাতুল চলে যাওয়ার কয়েক দিনে তনিমার আর কোনো খোঁজ নেয়না। এবার তনিমার মা স্পষ্ট ভাবে তনিমাকে জানিয়ে দেয় হয় মেয়ে আর তুই দুজনেই মরে যা। আর না হয় মেয়ের ভালোর জন্য মেয়েকে ওর বাবার কাছে দিয়ে দে আর তুই ওর থেকে চলে আয়। আর একটু বাঁচার চেষ্টা কর।
না হলে তোকে কখনোই বাঁচতে দেবে না৷ তোর সাথে তোর বাচ্চাকেও মেরে ফেলবে।
তনিমা গভীর ভাবে চিন্তা করে আমার জন্য মেয়েটা মরে যাবে? আমি তো মেয়েটার কোনো যত্নই করতে পারিনা। নিজেই উঠে দাড়াতে পারিনা ওর কিভাবে খেয়াল করব। তার চেয়ে ওর বাবার কাছে দিয়ে দেই ওরাও ভালো থাকুক। আমার মা,ভাইও ভালো থাকুক। আমার জন্য সৃষ্টিকর্তা যা রাখছেন তাই হবে।

তনিমার অবস্থা খুবই খারাপের দিকে যায়। সবাই তনিমাকে দেখে বলছে তনিমা বেশিদিন আর বাঁচবে না।তনিমার মা তনিমাকে আবারো বুঝায় দিয়ে দে তোর মেয়েকে তুই মরে গেলে ঐ শয়তান আর ওর খোঁজ নিবে না। তারচেয়ে ওকে আমরা দশজন ডেকে যার মেয়ে তার হাতে দিয়ে দেই। তনিমার চোখ থেকে অনাবরত পানি ঝড়ছে। তনিমা এবার নিজেকে শক্ত করে। এর পর মা কে জানিয়ে দেয়। তোমাদের যা খুশি করার করো৷

কিছুদিন পর দশজন ডেকে রাতুলের হাতে রিশাকে দিয়ে দেয়। আর তালাক নিয়ে নেয়। তনিমাকে তালাক দেওয়ার সময় রাতুল খুব কান্না করে। তনিমা কে আবারো ভাবতে বলে। কিন্তু তনিমা রুগ্ন গলায় কঠোর ভাবে জবাব দেয় ভাবার কিছু নেই। আমি বাঁচি না মরি তার ঠিক নেই। আপনি মেয়ে নিয়ে যান ওর খেয়াল রাখবেন। আমি চাই না আমার জন্য আমার মেয়ের ক্ষতি হোক।

শেষ পর্যন্ত রাতুল আর তনিমার তালাক হয়ে যায়।

রাতুল বাড়িতে গিয়ে পৌঁছে রিমাকে ডাক দেয়। রিমা রিশাকে দেখে প্রচুর ভয় পেয়ে যায়। রিমা ভেবেছে হয়ত তনিমা আবার এসেছে।
— কি সেই তো আবারো নিয়ে এসেছেন।
— চুপ!
— চুপ কেনো করব কখনো ভালো হবি না তুই।
— তুই খুশি হয়েছিস তো একটা মেয়েকে মৃত্যুর মুখে ঢেলে দিয়ে। আমি জানি তনিমার আজ এই অবস্থার জন্য শুধু তুই দাই। যাইহোক তোর পথের কাটা আজ সরে গেছে। তবে এই মেয়ে আমার মেয়ে রিশা। তনিমার চিহ্ন আমার রক্ত এর যদি কোনো ক্ষতি হয় তোকে সেদিন নিজ হাতে শেষ করব। রাইমাকে তুই যতোটা অধিকার দিবি রাইমা সব কিছুর ভাগ যেমন পাবে তুই ওরেও তেমন চোখে দেখবি। যদি এর নড়চড় হয়না দেখিস কি হয়।
রাতুল রিশা কে রিমার হাতে তুলে দিয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। আর রিমা তনিমা চলে যাওয়ায় খুব খুশি হয়ে। আর রাতুলের ভয়ে রিশার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করেনি।

তনিমা মেয়েকে দিয়ে দেওয়ার পর থেকে আরো অসুস্থ হয়ে পরে। বিছানা তনিমাকে জাপ্টে ধরে বসে। তনিমা দির্ঘ্য একবছর পর বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়ায়। তনিমাকে দাঁড়াতে দেখে তনিমার মার যেনো খুশি আর ধরে না। অনেকদিন পর মেয়ে বিছানা ছেড়ে উঠেছে। তনিমা আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করে। তবে মেয়ের জন্য মন সব সময় উদাসীন থাকত। শুধু একটি বার ইচ্ছে করত মেয়েটার সাথে যোগাযোগ করতে। কিন্তু দূর্ভাগ্য সেটা আর কখনোই সম্ভব না৷

তনিমার মা তনিমাকে আবারো বুঝায় আগের মতো স্বাভাবিক হতে। আবারো ভালো ঘর দেখে তনিমাকে বিয়ে দিতে। তনিমা এবার জোর গলায় না করে দেয়। আর কখনো বিয়ে বসবে না। নিজে রোজকার করবে নিজের পায়ে দাড়াবে।

বছর আরো একটি চলে গেলো। এবার তনিমার মা কাজে যাওয়ার জন্য তনিমাকে প্রেশার দিচ্ছে। তনিমা তনিমার এক চাচাতো বোনের সাথে ঢাকায় যায় সেখানে কাজ খুজে নেয়। কিন্তু তনিমার কপাল খারাপ কিছু দিন কাজ করার পরেই তনিমার উপর ছেলেদের নজর পড়া শুরু করে। তনিমা নিজের ইজ্জত বাঁচানোর জন্য বাড়িতে ফেরত আসে।
আর কাজে যাওয়া ইচ্ছে প্রকাশ করে না।

মাঝখানে রাসেলের একটা কাজের ব্যবস্থা হয়। তাই রাসেল তনিমাকে কাজে বের হতে বারন করে। এক বেলা কম খেলে কিছু হবে না। তবে ইজ্জত একবার চলে গেলে সেটা কখনো ফেরত পাওয়া যাবে না। বাড়ির মেয়ে বাড়িতেই থাক। তনিমাও আর বাইরে বের হতে চায় না। তনিমা নামজ রোজা করা শুরু করে। সারাক্ষণ বই পড়া আর নামাজ রোজা নিয়ে ব্যস্ত থাকত৷

এমন করতে করতে আরো তিন বছর অতিবাহিত হয়৷তনিমার বর্তমানে আঠাশ বছর চলছে। তনিমার মা তোমাকে আবারো বিয়ে দেওয়া চেষ্টা করে৷ কিন্তু তনিমা রাজি হয়না। তখন তনিমার মা তনিমাকে কথা শুনায় আর কত?
আর কতদিন এই ভাবে ভাইয়ের ঘারে খাবি ওরে বিয়ে করাতে হবে না? ওর বিয়ে দিলে ওর বউ তোরে দেখবে? তখন তো লাথি মেরে বের করে দিবে। আমি বা কয়দিন বাঁচব।

তখন তনিমা মায়ের কথায় আবারো রাজি হয়। নানা জায়গা থেকে তনিমার সমন্ধ আসে কিন্তু কোথাও বিয়ে ঠিক হয় না। এবারেও তনিমা আসে ছেড়ে দেয়। মা আর কতো? সেই তো তোমার ঘারেই খাচ্ছি। যার কপালে সূখ নেই তাকে নিয়ে বার বার সুখের চিন্তা করে কি লাভ।
তনিমার মা খুব হতাশ হয়ে পড়ে।তনিমাকে অপয়া বলে সব সময় দোষ দিতে থাকে৷ তনিমা আত্মহত্যা মহাপাপ শুধু এই ভয়ে আত্মহত্যার চিন্তা করে না৷ সবটা সহ্য করে নেয়।

একদিন হটাৎ করেই বড় একটা ঘর থেকে তনিমার জন্য সমন্ধ আসে। তবে ছেলে অনেক বয়স্ক তানিমার বাবার চেয়েও বয়সে বড়। প্রথম স্ত্রী মারা গেছে বছর ঘুরেছে৷ দুইটা মেয়ে ছিলো দুইটার বিয়ে হয়ে গিয়েছে এখন দেখাশুনা করার জন্য কাউকে দরকার৷ সব পছন্দ হলেও তনিমার মা রাজি হয় না কারন ছেলে বয়স্ক৷
কিছু দিনের জন্য তনিমার এই সমন্ধটা স্থগিত থাকে৷

একদিন তনিমার চাচাতো চাচা তনিমাকে ডেকে নিয়ে বলে তনিমা____

— আমি তোকে চাচা হয়ে একটা কথা বলছি৷ দেখ জিবীনে তো অনেক ভালো খুঁজেছিস৷ ভালো ভালো করে সেই পঁচা শামুকেই পা কেটেছিস৷
— কি বলতে চান চাচা?
— এটাই বলতে চাই তোরা যে বয়স বেশী বলে সমন্ধ বাদ করে দিচ্ছিস কেনো? ছেলে হিসাবে অনেক ভালো আর বংশ ভালো জায়গা জমি আছে কখনো তোর ভাতের অভাব হবে না। লেকটার ছেলে নেই নাম ডাক খুব ভালো৷ বয়স দিয়ে এতো সমস্যা কেনো আল্লাহ যার যতদিন হায়াৎ রেখেছেন সে ততদিনই বাঁচবে।

তনিমার চাচা তনিমাকে অনেক বুঝায়। যে ছেলের বয়স হতে পারে বেশি তবে আমি গ্যারান্টি দিচ্ছি এখানে আল্লাহ চাইলে তুই সুখি হবি। কখনো এমন ঘর থেকে সমন্ধ আসবে না। তাই ঐ লোকের বিয়ে হওয়ার আগে তুই রাজি হয়ে যা।

তনিমা বাসায় গিয়ে অনেক ভাবনা চিন্তা করে৷ কি থেকে কি করবে কি করা উচিৎ। তনিমা চিন্তা করে হোক বয়সে অনেক বড় তাতে কি? সতীনের সংসার তো হবে না। বয়সে বড় রোগ ব্যাধি হবে অসুস্থ হবে? হোক স্বামীর সেবা করে দেখি জান্নাতের পথ সহজ করা যায় কিনা।
আল্লাহ যদি চান আমার কল্যান হয়ত ঐখানেই আছে। ভালো ভালো করে তো কোথাও সুখ পেলাম না। এবার না হয়___
দুই দিন পর তনিমা চাচাকে জানায় তনিমা এখানেই বিয়ে করতে চায়। তনিমার চাচা নিজে মাঝখানে পড়ে তনিমার বিয়ে দিয়ে দেন।

তনিমার এই স্বামীর নাম তুষার। তুষারের বর্তমান বয়স পঞ্চান্ন বছর। আর তনিমার আঠাশ! মানে দুইজনের বয়ষের ডিফারেন্স ছিলো অর্ধেক। তনিমা তুষারের দুই মেয়েরই ছোট ছিলো।
কিন্তু তুষার মনের দিক থেকে যেমন ভালো ছিলো তেমন বুঝাপড়ায় খুব ভালো ছিলো সমাজে ছিলো তুষারের অন্যরকম একটা সম্মান।

তনিমা আর তুষারের বয়ষের ডিফারেন্স অনেক থাকা সত্বেও ওদের মাঝে বুঝাপড়া খুব ভালো ছিলো। তুষার তনিমাকে প্রথম রাতেই একটা কথা বলেছে।

শোনো তনিমা- তুমি আমার কাছে কখনো কিছু লুকাবে না। তোমার সম্মান রক্ষা করা যেমন আমার দায়িত্ব, আমার সম্মান রক্ষা কারাও তোমার দায়িত্ব।
আমি জানি কোনো মেয়ে ভাতের অভাবে বিয়ে করে না। প্রতিটা মেয়ে বিয়ে করা বা বিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য হলো মেয়েটার মান-সম্মান , ইজ্জত যেনো হিফাজতে থাকে।
তোমার বাড়িতে কি ভাতের অভাব ছিলো বলো? ছিলোনা যদি থাকত তোমার মা তোমাকে এতোদিন তার কাছে রাখত না। অনেক আগেই ছুড়ে ফেলে দিতো। তিনি তোমাকে আজ আমার হাতে তুলে দিয়েছেন তোমার সম্মান আর ইজ্জত কে হিফাজত করার জন্য। আমার কি টাকার অভাব আছে? তবুও আমি আমার মেয়েদের বিয়ে দিয়েছি। কেনো দিয়েছি? তাদের মান সম্মান ইজ্জত রক্ষা করার জন্য। প্রত্যেকেরি তার অবস্থান অনুযায়ী একটা সম্মান আছে।
আশা করি তুমি আমার কথা গুলো বুঝতে পেরেছো?
—জ্বী,আমি চেষ্টা করব আপনার সম্মান রক্ষা করার জন্য।

এর পর থেকে শুরু হয় তনিমার সংসার জীবন,সূখের জীবন। তনিমার জমজ দুইটি কন্যা হয়। তুষারের খুব আসা ছিলো এই বয়সে হয়ত ছেলে হবে কিন্তু না জমজ দুইটি কন্যা সন্তান হয়। তবে তুষার এতে নারাজ হয়নি একটু মন খারাপ ছিলো কিন্তু কিছু দিন পর সব ঠিক হয়ে যায়। মেনে নেয় আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।
তনিমাকে তনিমার আগের মেয়েরাও অনেক ভালোবাসে দুই বোনকেও তারা আপন বোনের মতই দেখে কখনো বুঝতে দেয়নি ওরা ওর সৎ বোন ছিলো৷

একদিন তনিমা নিজ থেকেই তুষারের সাথে নিজের জীবনের কথা শেয়ার করে৷তুষার তনিমার কথা শুনে খুব কষ্ট পায় বেশি কষ্ট পায় রিশার কথা ভেবে দুনিয়া কতো নিষ্ঠুর মা থাকতেও মায়ের আদর থেকে বঞ্চিত।তুষার তখন চিন্তা করে আজ যদি তনিমার সাথে ঐ মেয়ের যোগাযোগ না করিয়ে দেই তাহলে হয়ত হাশরের দিন তনিমাকে ঐ মেয়ে জান্নাতে যাওয়ার আগে তার মাতৃত্বের অধিকার চায় তখন তনিমা কি করবে? পরিস্থিতি যাই হোক কিন্তু মায়ের দায়িত্ব থেকে তো তনিমা সরে এসেছিলো৷ তখন থেকে তুষার চিন্তা করে মৃত্যুর আগে যদি তনিমার মেয়ের সাথে তনিমার একটু যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারি তাহলে একটা শান্তি পাবো।

এরপর থেকে তুষার গোপনে ঐ মেয়ের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। মেয়ের ইস্কুলে খবর নেয়। খবর নিলে জানতে পারেন রিশা এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। রাতুল এতোটাই পাষান ছিলো যে রিশাকে জানিয়েছে ওর মা মারা গেছে আর ইস্কুলে কখনো একা আস্তে দেয়নি রাতুল নিয়ে আসত আবার নিয়ে যেতো তাও শুধু পরিক্ষার সময়। কখনো উঠোনের বাইরে রিশাকে যেতে দেয়নি৷

তুষার খুব চিন্তায় পরে যায় এ তো অনেক সমস্যা। রাতুল কেনো রিশাকে বের হতে দেয় না। তুষার আরো গভীর ভাবে ভাবতে থাকে পরে তুষার রাতুলের আত্মীয় স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করে৷
তুষার তখন রিশার বড় ফুফুর সাথে যোগাযোগ করে। রাতুলের সাথে রাতুলের বড় বোনের মাঝে ছিলো একটু ঝামেলা কেউ কাউকে পছন্দ করত না।

তখন রিশার বড় ফুফু তুষার কে বলে। হ্যাঁ রিশা জানে ওর মা বেঁচে নেই। আর রিশাকে আমার ভাই কখনো কোথাও একা যেতে দেয় না। ও রিশাকে খুব ভালোবাসে আর সব সময় ভয় পায় যদি কখনো তনিমা ওকে নিয়ে যায়। ও তনিমাকে কখনো রিশাকে দেখতে দিবে না। যদি কোনদিন তনিমা রিশাকে দেখে ও শোনার সাথে সাথে রিশাকে শেষ করে দিবে।

তখন রাতুল অনেক রিকুয়েষ্ট করে রিশার বড় ফুফুকে যেনো রিশার সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেয়। কেউ জানতে পারবে না যদি আপনি বিষয়টি চেপে যান।

রাতুলের কথা শুনে রিশার সাথে রিশার ফুফু তনিমার যোগাযোগ করায়। আর সেদিন প্রথম জানতে পারে রিশা যে ওর মা বেঁচে আছে। তবে রিশা কখনো মায়ের প্রতি অভিযোগ করেনি রিশা একটা কথাই বলেছে আপনি এই নরক থেকে বেড়িয়ে গেছেন আমাকে সাথে না নিতে পারছেন মেরে ফেলতেন কিন্তু এই নরকে কেনো ফেলে গেছেন৷
— তোমার বাবা এখন কি অবস্থায় আছে? এখানো কি সেই টাকার গরম আছে?
— খারাপ মানুষ কি কখনো ভালো হয় মা? টাকার গরম নেই অধঃপতন হয়েছে। ফুফুর কাছে আপনার সবটাই শুনেছি খুব কেঁদেছি এতোটা খারাপ হয় মানুষ । আর মাও(রাইমার মা) কিভাবে পারল আপনার এতো ক্ষতি করতে।
— রিশা যাইহোক শোনো রাইমার মা আমার সাথে যাই করুক তোমাকে তো ভালোবেসেছে আগলে রেখেছে। তুমি ওনার সাথে কখনো খারাপ ব্যবহার করবে না।
তনিমা রিশা কে অনেক বুঝায়।রিশাও নিজের মাকে পেয়ে খুব খুশি। আর এভাবেই ওদের মাঝে মাঝে কথা হতো।

তনিমা তুষার কে দেখে সব সময় বলত শেষে আমার ভাগ্য এতোই ভালো ছিলো? যে এতো ভালো একজন স্বামী আমার কপালে ছিলো। প্রথম জীবনে যতই কষ্ট পাই আর করিনা না কেনো শেষ জীবনে এসে ওনার স্ত্রী হতে পেরে পুরো জীবনটাই স্বার্থক মনে করি।এমন একজন স্বামী যে মেয়ে পাবে সে প্রতিটি মূহুর্তের জন্য নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করবে।

(সমাপ্ত)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে