বৃষ্টি ভেজা রাত পর্ব-০২

0
2153

#বৃষ্টি_ভেজা_রাত💖
#মেহেদী_হাসান_রিয়াদ💖

#পর্বঃ__২

ঘরে প্রবেশ করতেই কোমরে বাধা ওড়নাটা খুলে নিলো বৃষ্টি। শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ গুলো স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে পাজামায়। দ্রুত পায়ে নিজের রুমের দিকে হাটা ধরলো সে। পেছন থেকে ডাক দিলো তার মা। রান্না ঘরে কাজ করছে সে।
– এতোক্ষন কোথায় ছিলি বৃষ্টি।
– ওইতো মা মিমদের বাসায় গিয়েছিলাম কিছু নোটস আনতে। সামনে তো পরিক্ষা তাই।
– ফ্রেশ হয়ে আয় নাস্তা রেডি করছি। নাস্তা করে সোজা পড়তে বসবি।
রান্না ঘর থেকেই কথাগুলো বললো বৃষ্টির মা। লক্ষি মেয়ের মতো নিজের রুমে চলে গেলো বৃষ্টি।
ব্যাগ রেখে জামা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায় সে।লম্বা একটা সাওয়ার নিয়ে চুল মুছতে মুছতে বেড়িয়ে আসে। জামা কাপর গুলো ধুয়ে শুকাতে দেয়।
মায়ের ডাকে চলে যায় নাস্তা করতে। ওদিকে রুমে সোফায় বসে আছে বর্ষা। মাথায় চিন্তার ভার। কানে আসছে মায়ের বর্ষা বর্ষা বলে গলা ফাটানো ডাক।
,
,
আজ বর্ষাকে দেখতে আসবে রাতের বাড়ির লোকজন। এর আগে শুধু তাদের সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে কথা দিয়ে রাখা হয়েছিলো।

রাতের মা বাবা ও তার ছোট বোন এসেছিলো আজ। কথা বার্তা পাকা করে গেছে তারা। ওদিকে বর্ষাও মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছেনা কাউকে।
রাত বার বার ফোন দিয়ে বর্ষার নাম্বার বিজি পেলো। কার সাথে এতো কথা বলছে বর্ষা?

বসে বসে ফোন ঠিপছে বর্ষা। তখনই বৃষ্টি এসে বসলো তার পাশে।
– কিরে কিছু বলবি?
– রাত ভাইয়া ফোন দিয়েছিলো। বললো, তুমি নাকি ফোন ধরছোনা।
– ওহ্। আর শুন, ছোট মানুষ এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে আসবিনা।
– আচ্ছা আপু, ইদানিং তোমাকে কেমন চিন্তিত মনে হয়, তুমি কি নিয়ে এমন চিন্তিত একটু বলবে?
হটাৎ বর্ষা বৃষ্টির দু,গালে হাত রেখে বলে উঠে,
– আমায় ভালোবাসিস?
– এটা আবার কেমন প্রশ্ন অবশ্যই বাসি।
– আমার জন্য কি করতে পারবি?
– সব।
– যা ঘুমিয়ে পর।
– কিন্তু আপু হটাৎ এমন প্রশ্ন করার কারণ?
– কিছুনা এমনি, যা ঘুমা অনেক রাত হয়েছে।
– তুমি ঠিক আছো তো আপু?
– লাইট টা অফ করে যা শুয়ে পর।
বর্ষার এমন আচরণ বুজে উঠতে পারছেনা বৃষ্টি। লাইট অফ করে নিজের রুমে গিয়ে শুয়ে পরলো সে ও।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে এলো। রাত ইদানিং বর্ষার মাঝে কিছুটা পরিবর্তন খুজে পেলেও সব স্বাবাভিকই মনে হয়েছে তার।

আজ গায়ে হলুদ। রাতকে ফোন দিয়ে আসতে বললো বর্ষা। কিছু ইনফর্টেন্ট কথা আছে তার সাথে।
রাতও বর্ষা দাড়িয়ে আছে একে অপরের সামনে।
– রাত তোমাকে আমার কিছু বলার আছে। যা আমার আরো আগে বলা উচিৎ ছিলো।
– ওফ বর্ষা, আমি তো শুনতেই এসেছি তাই না? আর কি এমন কথা যা বলার জন্য এই সময়ে আমায় ডেকে এনেছো। ওদিকে হয়তো বাসায় আমায় খুজতেই শুরু করে দিয়েছে।
– রাত আমি….
তার আগেই রাতের ফোনটা বেজে উঠলো। রাতে ছোট বোন আর্শির ফোন।
– হ্যালো ভাইয়া, কই তুই? এদিকে সবাই তোকে খুজতেছে।
– এইতো একটু দরকারে বাইরে এসেছি। এক্ষুনি চলে আসছি।
রাত ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে বলে উঠে,
– ওফ বর্ষা এতো নার্ভাস হলে কি চলে? আমার সামনে নিঃসংকোচে কথা বলার অধিকারটা তোমার এখন আছে।
– আসলে নার্ভাস না আমি কথাটা কিভাবে শুরু করবো বুঝতে পারছিনা। আর এটাও বুঝতে পারছিনা কথাটা শুনার পর তোমার রি-একশানটা কেমন হবে?
এবার একটু কপাল কুচকে বর্ষার দিকে তাকায় রাত। তখনি বৃষ্টি সহ কয়েকজন মেয়ে আসে বর্ষার কাছে।
– আরে আপু তুই এখানে? সেই সারা বাড়ি খুজে বেড়াচ্ছি তোকে। আর রাত ভাইয়া, কথা বলার জন্য তো সারা জীবন সময় পাবেন। এই মিলি এক কাজ কর রাত ভাইয়াকেও ধরে নিয়ে আপুর সাথে হলুদ মাখিয়ে দিই, কি বলিস?
পরিস্থিতি খারাপ দেখে এক দৌড়ে সেখান থেকে বেড়িয়ে রাস্তায় চলে এলো রাত। ওদিকে বৃষ্টির হেসে গড়াগড়ি খাওয়ার অবস্থা।

বিয়ের দিন রাতে,
একটা বিয়ের শাড়ি ও কিছু গহনা নিয়ে রুমে আসলো বর্ষার মা। বারান্দায় ফোন কানে নিয়ে দাড়িয়ে আছে বর্ষা। মাকে দেখেই ফোন কেটে একটা হাসির রেখা টানলো।
– এখানে কি করছিস? রুমে আয়, পার্লারের লোক এসে গেছে। আর পাত্র পক্ষও চলে আসবে একটু পর।

বাইরে কাজ ও মেহমানদের আপ্যায়নে দৌড়া দৌড়ি করছে বৃষ্টি। বড়ো বোনের বিয়েতে তারও কিছু দায়িত্ব আছে। তাছারা বরের জুতা চুরির প্লেন তো আছেই।
বর্ষাকে সাজিয়ে রেডি করে ফেলেছে। ওদিকে পাত্র পক্ষও চলে এসেছে। সবাইকে রুম তেকে বের করে এদিক ওদিক পায়চারি করছে বর্ষা। বার বার তিহানের নাম্বারে ফোন দিয়ে চলছে সে।

বিয়ের সব রেডি। হটাৎ ভেতর থেকে আওয়াজ এলো বর্ষাকে কোথাও খুজে পাওয়া যাচ্ছেনা। সারা ঘর খুজেও বর্ষার কোনো দেখা পেলোনা কেও। সবাই মিলে খুজেও কোনো হদিস পেলোনা বর্ষার। পেয়েছে শুধু টেবিলে একটি চিরেকুট।
হতাশা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বর্ষার বাবা। সবাই একে অপরের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছে।বিয়ের দিন কনে পালিয়ে যাওয়া তাও আবার লাব এ্যারেজ মেরেজে। পাগড়িটা হাতে নিয়ে স্তব্দ হয়ে দাড়িয়ে আছে রাতও।
বৃষ্টি বার বার ফোন দেওয়ার চেষ্টা করছে কিন্তু বর্ষার ফোন বন্ধ।
রাতের বাবা রুদ্র ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। ঠন্ডা মাথায় বৃষ্টির বাবাকে বলে উঠে,
– আমাদের ডেকে এনে এভাবে অপমান না করলেও পারনে। আপনার জদি ফোনে আপনাদের মতামত জানিয়ে দিতেন তাহলে আমরা কখনোই আসতাম না এখানে।
বর্ষার বাবা হাত দুটি জোড় করে বলে উঠে,
– আজ আমি নিজে আপনাদের সামনে লজ্জিত। নিজের মেয়ে যে এমন একটা কাজ করবে তা ভাবতেি পারিনি আমি।
পাশ থেকে রাতের মা বলে উঠে,
– এমন একটা মেয়েকে নিজের পূত্র বধু বানাবো ভেবেছিলাম ভাবতেও লজ্জা হচ্ছে আমার। ছি ছি।
হটাৎ রুদ্র চৌধুরি বলে উঠে,
– দেখুন এতো লাকজনের সামনে এখন আমাদের দুই ফ্যামিলিরই মান সম্মান নিয়ে টানাটানি পরছে। তাই আপনার জদি কোনো আপত্বি না থাকে, তাহলে আমটা আপনার অপর মেয়েকেই বৌ হিসেবে নিয়ে যেতে চাই।
কথাটা শুনা মাত্রই যেনো আকাশ থেকে পরলো বৃষ্টি। মাথাটাও ধরে গিয়েছে সাথে সাথে। বোনের বিয়েতে আজ কতো আনন্দ কতো মজা বরকে নিয়ে কতো কিছুই প্লেন করে রেখিছিলো বৃষ্টি। আর শেষে এমন একটা পরিস্থিতিতে পরতে হবে তা কখনো ভাবতেও পারেনি বৃষ্টি। আপু তো এই ব্যাপারে আমাকেও কিছু বলেনি।আর কিছু ভাবতে পারছেনা বৃষ্টি, আশে পাশে পরিস্থির দিকে তাকিয়ে থাকা ছারা আর এই মুহুর্তে কিছুই মাথায় আসছেনা তার।
পাশ থেকে রাতের মা বলে উঠে,
– অসম্ভব, রাত এটা কিছুতেি মেনে নিবেনা। কারণ লাইফটা রাতের, আমরা সিদ্ধান্তের উপরে রাতের উপর চাপ প্রয়োগ করতে পারিনা।
তখনি পাশ থেকে রাত বলে উঠে,
– আমি রাজি।
এটা বলেই সেখান থেকে সরে গেলো রাত। চোখ দুটি লাল হয়ে আছে, রাগে কাপছে ঠোট জোড়া। বুঝাই যাচ্ছে এই সিদ্ধান্তটা সে মন থেকে নয়, রাগের ক্ষোপ থেকেই নিয়েছে। মান সম্মানের কথা চিন্তা করে রাজি হয়ে যায় বৃষ্টির বাবাও।
বৃষ্টির কাছে গিয়ে বলে উঠে,
– মারে, আমি জানি তোর উপর অন্যায় হচ্ছে এটা। তবুও এটা একটা মান সম্মানের প্রশ্ন। আজ এতো মানুষের সামনে আমার সম্মানটা নিচু করিস না মা। বাবা হয়ে তোর কাছে অনুরুধ করছি আজ। দেখিস অনেক সুখি হবি তুই জীবনে। প্লিজ মা আজ কথাটা পিরিয়ে দিসনা তুই।
বৃষ্টি বাবার হাত দুটি ধরে বলে উঠে,
– আমার কারণে জদি তোমরা সম্মার ফিরে পাও তাহলে আমার কিছু বলার নেই বাবা তোমরা যেটা ভালো মনে করো সেটাই করো।

কবুল বলার পর মুহুর্তে নিজেকে একটা নতুন মানুষ হিসেবে আবিস্কার করলো বৃষ্টি। আজ থেকে নতুন পরিচয় তার। আজ থেকে নিজের সব দায় দায়িত্ব একটা নতুন মানুষের। রাতের মুখেও কোনো কোনো হাসির আভাস নেই। একটু আগে শুধু কবুল বলার আগ মুহুর্তে একটা তাচ্ছলের হাসি দিয়েছিলো সে।
বৃষ্টি ভালোই বুঝতে পারছে এই হাসিতে তার সুখ নয়, জীবন তছনছ হওয়ার হাসি এটা।

To be continue…….

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে