প্রয়োজন পর্বঃ ১২

0
1255

#গল্প_পোকা_ধারাবাহিক_গল্প_প্রতিযোগিতা_২০২০
প্রয়োজন পর্বঃ ১২
লেখায়ঃ তানিয়া তানু

নিয়নের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললাম,
উনার হাত থেকে আমাকে বাঁচানোর জন্য আপনাকে অগণিত ধন্যবাদ।

ধন্যবাদের প্রতিউত্তরে যে স্বাগত বলতে হয় সেটা তিনি বললেন না। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,

~আপনি ঐ রুমে উঁকি দিয়েছিলেন কেন?
উনার প্রশ্ন শুনে নীরব হয়ে খানিক অসহায়ের দৃষ্টিতে মেঝের দিকে মাথা নিচু করে রইলাম। আমার উত্তর না পেয়ে উনি কিছুক্ষণ পর আরেকবার বললেন,

“আপনি কী ছাদে যাচ্ছেন?”
উনার এই প্রশ্নে খুশি হয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি রেখে বললাম,
“হুম”
“চলুন তাহলে যাওয়া যাক”
“আপনিও যাবেন নাকি?”
“আপনার সঙ্গে গেলে বুঝি সমস্যা হবে?”
“আপনার আড্ডা যে রইলো।”
“ও খানিক পর শেষ হবে।”
“অহ। তো চলুন।”

দুজনে চলে গেলাম ছাদে। ছাদে ডেকোরেটররা সাজানোতে ব্যস্ত। এই ছাদেই গাঁয়ে হলুদের অনুষ্ঠান অনুষ্টিত হবে। একপাশে মানুষ নেই বলে দুজনে সেদিকে গেলাম। ছাদে দাঁড়িয়ে আকাশ খুব সুন্দর করে দেখা যায়। আকাশে আজ মেঘ জমেছে। তবে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।

“আকাশের আজ ভারি মন খারাপ। তাই না?”

উনার কথা শুনে আকাশের দিকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“আকাশ কিন্তু মন খারাপেই বেশ সুন্দর।” আমার জবাবের সাথে সাথেই বললেন,
“ঠিক আপনার মতো”
“মানে?”
“আপনার চেহারায়ও সব সময় মেঘের ছায়া থাকে। হাসেন না কেন? হাসলে তো আপনায় দারুন লাগে।”
“কারোর হাসি না দেখে তার হাসির ধরণে মন্তব্য করা অনুচিত। এতে তাকে মিথ্যে প্রশংসার দাবিদার করা হয়।”

“হাসি দেখেই মন্তব্য করেছি। তাই বলেছি আপনার উচ্চস্বরের হাসিতে আমি মুগ্ধ।”

উনার কথায় ভারি আশ্চর্য হলাম। কারণ আজ পর্যন্ত উনার সামনে যতবার পড়েছি ততবার হাসিমুখে কখনো ছিলাম না। তাহলে উনি আমার হাসি দেখলেন কী করে? তাও আবার উচ্চহাসি।

“আমার হাসি দেখলেন কীভাবে?”

“প্রতিদিন নিয়নের সাথে খেলায় মেতে উঠে খিলখিল হাসি প্রতিবারই শুনি। তবে প্রথম যেদিন নিয়নের সাথে খেলছিলেন। সেদিনেই দেখেছিলাম।”

“তার মানে আপনি প্রতিদিন লুকিয়ে লুকিয়ে আমার হাসি দেখেন।”
“মুটেই না। আমি প্রতিদিন শুনি। প্রথম দিন শুধু দেখেছিলাম। কারণ হঠাৎ উচ্চস্বরের হাসি শুনে অবাক হয়েছিলাম। তাই কারন জানতে দরজার আড়ালে থেকে দেখেছি।”
উনার কথার প্রতিউত্তরে কথা আর বললাম না। দুইজনই নীরব রইলাম। যেন নীরবতা নামের মানুষটি আজ আমাদের শহরে ঘুরতে এসেছে। তার এই শহরটা এতই ভালো লাগছে যে এখান থেকে যেতেই যাচ্ছে না। তবে অতিথি তো এক সময় যেতেই হয়। তবে তাকে আমি নয়। উনিও বিদায় করলেন। মনে হয় ওর অত্যাচারে বেশ বিরক্ত হচ্ছেন। তাই বিদায় দিয়ে বললেন,

“আসি। ভাইটা বন্ধুদের কাছে বসে আছে। আমায় না দেখে খুঁজতে পারে।”

“হুম। আমিও চলে যাবো। বেবলি তো নিলার কাছে। না জানি কী করছে!”

“বেবলি!”
“উহু,স্মৃতি ওর নাম। আমার বোন।”
“তাহলে বেবলি কেন ডাকেন?”
“ও একটু অবুঝ টাইপে। রাখি-বন্ধনের বেবলির মতো।”
“তাই স্মৃতির মতো এত সুন্দর নামে না ডেকে বেবলি ডাকেন।”
“জি।”
“পরে না হয় এই অবুঝ বালিকাকে দেখে আসবো। চলুন এখন এখান থেকে যাওয়া যাক।”

সিঁড়ি দিয়ে দুজনে নামার সাথে নিচ থেকে অনেক ডেকোরেটররা উপরে উঠছে। আর আমরাও নিচে নামছি। আমি ডান পাশে এক সাইডে আছি। ছেলেরাও দলে দলে আসছে। বেশি মানুষ জায়গাও হচ্ছে না। বার বার উনার সাথে ধাক্কা লাগছে। কী করবো বুঝে উঠতে পারছি না।

হঠাৎ হাতে কারোর হিম শীতল হাতের স্পর্শ পেলাম। পুরো শরীর যেন অজানা এক অনুভূতিতে কেঁপে উঠলো। হাতের মালিক ছিলো পাশে থাকা মানুষটি। উনি আমায় বাম পাশে নিয়ে নিজে ডান পাশে চলে আসলেন।

সিঁড়ি দিয়ে নামার পরক্ষণে দুজন দুদিকে চলে গেলাম। হাতে থাকা টাকাটা এখনো দেওয়া হলো না ভেবে আফসোস হলো।

“আপা, এই বিয়ে বাড়িতে একলা আমায় রেখে যেতে পারলি?”

এসে দেখি নিলার পাশে মুখ ভারী করে বসে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে ভীষণ রাগ করেছে। তাই ওর পাশে গিয়ে বললাম,

“ওরে, আমার বনু রে। আর কক্ষণো তোরে একলা ফেলে যাবো না।”(গাল দুটো টেনে টেনে)”

“দীপ্তি, তুই এতক্ষণ কোথায় ছিলি?”
নিলার প্রশ্নে বেবলির পাশ থেকে উঠে নিলার কোলে মাথা রেখে বললাম,

“তুই তো চলে যাবি। তাই ছাদে গিয়ে একটু কেঁদে আসলাম।”
“আহা! কী প্রেম।”
” তোর বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে না?”
“কী করে বিশ্বাস করবো বলো। এতদিন তো তোমার প্রেমটা দেখিনি।”
“কী করে দেখবি বল? সারাদিন তো টাইম পাসের প্রেমে ব্যস্ত ছিলি।”
টাইম পাসের প্রেমের কথা মনে পড়ার কারণে মনে পড়ে গেল রনি ভাইয়ের কথা। বিদায় অনুষ্টানে কী কান্নাটাই না নিলার জন্য কেঁদেছিলো। ওর কান্না দেখে তো আমি নিজেই একটা বালতি সমবেদনা হিসেবে দিয়ে এসেছিলাম।।দেওয়ার সাথে সাথে বলেছিলাম কান্নাগুলো এখানে জমিয়ে গোসল সেরে ফেলো। গাঁয়ে থেকে কী দুর্গন্ধ বের হচ্ছে!
আমার কথা শুনে কান্না থামিয়ে বালতি নেবার বদলে মুখ ভ্যাংচি দিয়ে লাগলো। আহা! এইটা যেন পরের ব্যথায় ব্যথী হওয়ার ফলসরূপ পেলাম।

“কোথায় হারালি?”
“রনি ভাইয়ার জগতে?”
“মানে?”
“নিলা, রনি ভাই জানে তর যে কাল বিয়ে?
“নিচে গিয়ে দেখ।”
“কী?”
“বাগানে রনি ভাই নতুন গার্লফ্রেন্ডের সাথে প্রেম করতে ব্যস্ত।
“জিএফ কই পাইলো।”
“আমার বিয়েতে এসে জুটিয়েছে।
“হায়! তুই সেদিন কীভাবে সামলিয়ে ছিলি।”
“এটা আমার কড়ে আঙ্গুলের কাজ”
____________________________________

রাত যত আয়োজন যে ততই গাঢ় হচ্ছে। মেয়েরা সাজুগুজুতে ব্যস্ত হচ্ছে। ডেকোরেশন সব শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধু কনে আসার অপেক্ষা। নিলাকে বিউটিশিউয়ানরা সাজানোতে ব্যস্ত। আর আমি ব্যস্ত আমার বোন বেবলিকে সাজাতে। সাজাতে এক্সপার্ট নই। তবুও যা পারছি সাজাচ্ছি। আমরা দুই বোন যে রুমে সেখানে আর কেউ নেই। বেশ কয়েকটা মেয়ে ছিলো। আকস্মিক দরজায় টুকটুক শব্দে দুই বোনই সেদিকে দৃষ্টিপাত করলাম। আমি গিয়ে দরজা খুলে দেখলাম আকাশ ভাইয়া এক হাত দেয়ালে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমায় দেখে বললেন,
“তোরা এই রুমে কী করছিস?”

প্রশ্ন শুনে অবাক হলাম। এ আবার কেমন প্রশ্ন। প্রত্যেক মেয়েরা সাজছে। আর আমরা দুই বোন সাজছি।
“তোর কী কোনো অসুখ হয়েছে নাকি?
অসুখ! হ্যাঁ একটা অসুখ খুব প্রবল ছিলো। তোমাকে দেখার অসুখ। মন ছটফট করতো তোমার শহরে এসে তোমার দেখা না মিললে। তবে সে অসুখ সেরে গেছে। মনে হয় না আর কোনোদিন এই অসুখে ভোগবো। তবে তোমায় দেখলে হৃদয়ের বেশ খানিক জায়গা পুড়ে। সারাক্ষণ একটা শুন্যতা অনুভব করি। তাই মৃদু হেসে জবাবের প্রতিউত্তরে বললাম
“আমার কেন অসুখ হবে?”
“অসুখ না হলে সারাক্ষণ চিন্তায় মগ্ন কেন থাকিস?
জবাব দিলাম না। কেন দেব? সব প্রশ্নের উত্তরই বা কেন দিতে হবে? আমার উত্তর না পেয়ে দীর্ঘশ্বাস পেলে বললো,
“স্মৃতি কোথায়?”
“ভেতরে”
তারপর ভাইয়া ভিতরে উঁকি দিতে স্মৃতির অবস্থা দেখে বললো,
“ওরে পেত্নী কে সাজয়েছে?
পেত্নী! আমি আমার বোনকে পেত্নী সাজিয়েছি। আমার সাজ কী তবে এতই বাজে। রাগে আমি অন্যদিকে ভাব নিয়ে বললাম,”আমি সাজিয়েছি। সুন্দর না?
“ধুরু! একেবারে তালগাছের ঝুলন্ত পেত্নী লাগছে।”
“তাও ভালো। পেত্নী তো আর কেউ সাজাতে পারে না।”
“সেটাও ঠিক। এক পেত্নী তো আরেকজনকে পেত্নী সুন্দর করেই সাজাতে পারে। তাই না?”
“মানে?”
“তোরা দু বোন এখানে কেন সাজছিস? তোদের সাজার জন্য তো বিউটিশিউয়ান আছে।”
“এটা মানের উত্তর বুঝি?”
“এইটা টপিক বাদ। নিচে যাহ্। বিউটিশিউয়ানরা আছে।”
“আমি যেতে পারবো না। বেবলিকে যাবে।”
“তুই ও যাবি।”
উনার এই অধিকারবোধ দেখে পিত্তি জ্বলে উঠলো। কত সুন্দর করে বলছেন, তুই ও যাবি। হু।
“থাক। তুই চিন্তায় মগ্ন হ। স্মৃতিই সাজুক। তুই আবার বেশি সাজলে প্রেত এসে নিয়ে যাবে। তখন আমি একলা হয়ে যাবো।”
ভাইয়ার কথা না বুঝে মানে বললে খানিক নীরব থাকলেন। তারপর হন্তদন্ত হয়ে বেবলির কাছে গিয়ে ওরে টানতে টানতে নিয়ে গেল। বেচারা বেবলি কাজল লেপ্টে যাওয়ায় ঠিক করতে ব্যস্ত ছিলো। হঠাৎ কারোর ধাক্কা পেয়ে যেন ঠাওর করতে পারলো না। পরে বোধয় পেরেছে। তবে সেটা আমার জানা নেই।

চলবে„„„„„„„„„„„„„„

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে