প্রণয় স্রোতে পর্ব-০২

0
382

#প্রণয় স্রোতে
#পর্বঃ২
#লেখিকা আরোহি জান্নাত (ছদ্মনাম)

পাশাপাশি বেলকনি তাও কিছুটা দূ’র’ত্ব।চৌধুরি বাড়িটি দুতলা।সামনের দিকের ঠিক মাঝ বরাবর সিঁড়ি। আর ডান পাশের শেষে ও বাম পাশের শেষে বেলকনি।এক বেলকনি থেকে অন্য বেলকনি সরাসরি দেখা যায় তবে দূরত্ব টা কম না।ফুলে সাজানো ঘরটা অ’স’হ্য মনে হচ্ছিল বহ্নির কাছে তাইতো একটু শীতল বাতাস নিতে বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছিল বহ্নি।তবে এখানে এসে যে এমন অ’প্র’ত্যা’শি’ত কিছু দেখতে পাবে ভাবিনি।ইয়ারাবদের ঘরের আলো কিছুটা এসে পড়ছে বেলকনিতে ও।আর সেখানেই দুজন দাঁড়িয়ে গল্প করছে।বহ্নির হঠাৎই মনে পড়ে গেল ইয়ারাব এর সেই ই’চ্ছে’টার কথা।সে বলেছিল তাদের প্রথম রাত তারা গ’ল্প করে কাটাবে।একে অপরকে জানবে।বহ্নি ও সেটাই ভেবে রেখেছিল। কি’ন্তু ভা’গ্য কি করল?ইয়ারাব নিজের মনের ই’চ্ছে পূরণ করল তবে বহ্নি এর সাথে নয়, তানভি এর সাথে।

এক দৃ’ষ্টি’তে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যে কখন বহ্নি এর চোখ ঝা’প’সা হয়ে এসেছে সেটা বুঝতে পারল না বহ্নি।তবে দরজা খোলার শব্দ শুনে পেছনে ফিরে বুঝতে পারল সে চোখে ঝাপসা দেখছে।আর এ জন্য অ’শ্রু কণা দায়ী। আরাব বহ্নি কে খাটে দেখতে না পেয়ে একটু অবাক হলো ঠিকই তবে সাথে সাথেই নিজেকে সামলে নিলো।কারণ বেলকনিতে একটা না’রী’মূ’র্তির অবয় স্প’ষ্ট। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল আরাব। ত’ত’ক্ষ’ণে বহ্নি চোখ মুছে ফেলেছে। দৃ’ষ্টি রেখেছে শূন্যে। আরাব পাশে এসে দাঁ’ড়া’লো তবে কোনো শব্দ করল না। বহ্নি সবটা বুঝে ও কোনো সাড়া দিল না।

কেটে গেল কিছু মু’হূ’র্ত।দুজনেই চুপচাপ। নিরবতা ভেঙে আরাব বলে উঠল,

“আমার ভাই এর ওপর তোমার অনেক রাগ না?”

বহ্নি স্থি’র।দৃষ্টি তখনও কালোতে আবৃত আকাশপানে।

বহ্নি এর এমন গা ছাড়া ভাব পছন্দ হলো না আরাবের।তখন ও গাড়িতে তাকে ইগনোর করেছে আবার এখন ও তাকে ইগনোর করছে!আরাব বহ্নিকে নিশ্চুপ দেখে হঠাৎই হাত ধরে হেঁ’চ’কা টান দিলো।মূহুর্তেই বহ্নি টাল সামলাতে না পেরে আরাবের বুকের ওপর গিয়ে পড়ে। হঠাৎই এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনার জন্য দুজনেই অ’প্র’স্তু’ত হয়। জীবনে প্রথম কোনো ছেলের এত নিকটে এসে যেন দিশেহারা হয়ে পড়ল বহ্নি। নিজেকে ছাড়ানোর জন্য জোর দিল।তবে আরাব নি’র্বি’কা’র!বহ্নি এর অস্বস্তি টা যেন চোখে পড়ছে না তার।বহ্নি নিজের সাথেই চেপে ধরে রাখল আরাব।

“আমাকে ছাড়ো প্লিজ!”

বহ্নি এর কাতর স্বরে বলা কথাটা যেন ঠিক হৃদয়ে গিয়ে বিধল আরাবের।এমন কাতর স্ব’রে কেউ কখনো কোনোদিন আরাবের সামনে বলিনি।নাকি বহ্নি এর কথাটা আরাবের কাছে বেশি কাতর মনে হলো।উত্তর জানা নেই আরাবের। বহ্নি কে ছেড়ে একটু দূরে দাঁ’ড়ালো আরাব।

“সরি!একচুয়ালি আমি ওভাবে ধরতে চায়নি কিন্তু তুমি এমনভাবে ইগনোর করছিলে যে!”

আমতা আমতা করে বলে উঠল আরাব।তার নিজের হৃ’দ’পি’ণ্ড ও তো এখন দিশেহারা।এই প্রথম কোনো নারী জায়গা পেল তার ব’ক্ষ’স্থ’লে।আর অ’দ্ভু’ত’ভাবে শীতলতা ছুয়ে গেল আরাবের মনের মধ্যে।কিছুক্ষণ নিরব থেকে আরাব বলে উঠল,

“দেখ বহ্নি, যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। হয়তো তোমার সাথে যেটা হয়েছে সেটা ভালো কিছু না!তবে আমি চায় তুমি ভাইকে ক্ষ’মা করে দাও!”

আরাবের কথা শুনে তাচ্ছিল্য হাসল বহ্নি।তবে ওই বিষয়ে কিছু বলল না।কিছুক্ষণ মৌণ থেকে তারপর বলে উঠল,

“আমি তোমার সাথে বেড শেয়ার করতে পারব না।আই নিড টাইম।তুমি গিয়ে শুয়ে পড়ো।আমি বেলকনিতে থাকতে পারব!”

আরাব আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিল এমন কিছু হবে তবে তাই আর কথা বাড়ালো না।চলে এলো নিজের ঘরে। লাইট অফ করে শুয়ে পড়ল।পুরো ঘরে কোনো আলো নেই।সবটা আঁ’ধা’র। যেমনটা এখন বহ্নি এর মনের কোন।

দূর আকাশ এর দিকে তাকিয়ে বহ্নি বিরবির করে উঠল,

“আমি খুব খারাপ।আর তাই আমার সাথে বাকিরা ও খারাপ থাকবে।”

কথাগুলো বলতে বলতে দুচোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল বহ্নি এর।
_______________
সূর্য দি’গ’ন্তে বিরাজ করছে বেশ কিছুক্ষণ হলো।কিন্তু যখনই সূর্য নিজের তী’র্য’ক চাহনিতে পৃথিবীতে চাইলো তখনই সেই তীর্যক চাহনির রেশে ঘুম ছুটে গেল তানভি এর।নিজের অ’ব’স্থা’ন বুঝতে সময় লাগলো কিছুটা।

চোখ খুলে বেলকনি বাইরের দৃ’শ্য দেখে তানভি অবগত হলো তারা এখনো বেলকনিতে আছে। ইয়ারাব আর তানভি একে ওপরের কাধকে বালিশ বানিয়ে গ’ল্প করতে করতে বেলকনিতেই ঘুমিয়ে গেছে।নিরবে হাসল তানভি। এমন একটা দিন আসবে সেটা হয়তো কিছু দিন আগে ও তার অবগত ছিল না। ইয়ারাবকে ডেকে নিয়ে ঘরে চলে এলো তানভি।ফজরের ও’য়া’ক্ত আর বেশিক্ষণ নেই। জলদি নামাজ আদায় করতে হবে।
_________________
ফজরের ওয়াক্তে প্রতিদিন ওঠার অভ্যাস হওয়ায় আজ ও সকাল সকালই ঘুম ভাঙল বহ্নি এর।তবে ঘুম থেকে উঠে এত বড় সা’র’প্রা’ই’জ পাবে বহ্নি সেটা ছিল ক’ল্প’না’তী’ত।

আরাব বহ্নি কে আ’ষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে ধরে নি’দ্রা’ম’গ্ন হয়ে আছে।কিছুক্ষণের জন্য কিংকতব্যবিমূড় হয়ে যায় বহ্নি। এটা কি করে স’ম্ভ’ব?সে তো বেলকনিতে ছিল। তাহলে বেডে এলো কি করে? তানভি ও বহ্নি কে জড়িয়ে ধরেই ঘুমাতো সেজন্য ঘুমের মাঝে টের পায়নি বহ্নি। কি’ন্তু!

নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়ায় বহ্নি।প্রচন্ড রাগ হওয়া স্ব’ত্বে’ও কিছু বলল না। ফ্রেশ হয়ে নামাজ টা আগে আদায় করতে হবে! প্রশ্নের জবাব টা না হয় পরে নেবে সে।এগুলো ভেবেই এক রাশ ক্ষো’ভ নিয়ে সেখান থেকে প্র’স্থা’ন করল বহ্নি।
_____________
প্রতিদিনের মতো আজ ও বেলা করে উঠল আরাব।ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে ঘড়ির কাটা ৯ টা ছুঁইছুঁই। আশেপাশে বহ্নি কে না দেখতে পেয়ে অবাক হলো আরাব।তার ধারণা অনুযায়ী কিছু ঘটে নি। সে ভেবেছিল বহ্নি এর চেচামেচি তে ঘুম ভাঙবে তার।কারণ বহ্নি কে ঘুমন্ত অবস্থায় কাল বেলকনি থেকে ঘরে নিয়ে এসেছে সে।তা ও আবার কোলে করে! এত সহজে তো বহ্নি আরাবকে ছাড়বে না।ভাবতেই ঠোঁটের কোনে মি’ষ্টি হাসির রেখা ফুটে উঠল আরাব এর। তার বউটা যে নরমসরম বা দূর্বল নয়,সে আন্দাজ আগে থেকেই আছে আরাবের।এখন দেখার পালা তার দ’জ্জা’ল বউ এই অপরাধে তাকে কি শা’স্তি দেয়?

নামাজ পড়েই বহ্নি আরাবের ফুফির ঘরে গিয়ে বসে রইল।নানা রকম কথা বলল তার সাথে। কারণ একটাই! আরাব!কাল রাতে নিশ্চয়ই এমনি এমনি বহ্নি কে ঘরে আনেনি।কোলে করেই এনেছে! এটা মাথাতে আসলেই আরাবের মাথা ফাটিয়ে দিতে ই’চ্ছে করছে বহ্নি এর। তাইতো ফুফির ঘরে এসে বসে আছে সে।

ব্রে’ক’ফা’স্ট টেবিলে বসে আছে সবাই।আজ স’ন্ধ্যা’য় ওদের রিসিপশান।সেটা নিয়েই নিজেদের ফুফির সাথে টুকটাক কথা বলছে আরাব আর ইয়ারাব। বহ্নি চুপচাপ খাচ্ছে। তানভি ও তাই। তবে খাওয়ার মধ্যে মাঝে মাঝে ইয়ারাব এর দু’ষ্টু’মিতে খাবার গলায় আটকে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে তানভি এর।তবে সেদিকে কারো ল’ক্ষ্য না থকলে ও বহ্নি এর চোখ এড়ালো না কিছুই।

খাওয়া শেষে সকলে চা নিয়ে বসল। আরাব, ইয়ারাব দুজনেই ব্রে’ক’ফা’স্ট এর পরে চা খায়।সেজন্য বাকিরা ও শেষে চা নিলো।তবে চা মুখে দিতেই ইয়ারাব এর চোখমুখ কুচকে এলো।এটা চা নাকি করলার রস।বাকিরা নির্বিঘ্নে চা খাচ্ছে। শুধুমাত্র ইয়ারাব এর এমন অবস্থা। সকলের সামনে কিছু বলতে ও পারছে না।যতই হোক সামনে তার সদ্য বিয়ে করা বউ আর ছোট ভাইয়ের বউ আছে।তাই বাধ্য হয়ে চোখ মুখ বিকৃত করে কোনো রকম চা টা শেষ করে উঠল ইয়ারাব। তবে যাওয়ার আগে যদি একবার বহ্নি এর দিকে তাকাতো তাহলে চোখে পড়ত তার মিটিমিটি হাসি।

চলবে,

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে