পূর্ণিমা_সন্ধ্যায় পর্ব_৩০

0
848

পূর্ণিমা_সন্ধ্যায়
পর্ব_৩০
#লেখিকাTasneem Tushar

ইদানিং তিয়াশা আদিলের ফোনকল এড়িয়ে চলছে, সেই কটেজ থেকে ফিরে আসার পর থেকে। না, আদিলকে অপছন্দ করে তার জন্য নয়, বরং অনেক বেশিই পছন্দ করে। হয়তো আদিলের সাথে কথা বললে তার ভালোবাসার অঝোর বৃষ্টিতে ভিজে যাবে তিয়াশা। তাই সে নিজেকে গুটিয়ে রাখছে।

মাঝে পেরিয়ে গেছে একটা মাস। এক সন্ধ্যায় হঠাৎ দমকা হাওয়া বইছে, ঝড় আসার পূর্বাভাস। তিয়াশা দ্রুত দরজা জানালা লাগাচ্ছে। হঠাৎ

তিয়াশার ফোনে একটা মেসেজ আসে আদিলের, তাতে লিখা

“একটাবার কি ফোন ধরবে আমার? বিশ্বাস করো, কোনো কথা বলবনা। শুধু তোমার নিঃশ্বাস শুনবো।”

লিখাগুলো পরে তিয়াশা নিজেকে ধরে রাখতে পারেনা। ফোনটি হাতের মুঠোয় চেপে বুকের কাছে ধরে বারান্দার দেয়াল ঘেঁষে বসে পরে। পোড়া চোখ দিয়ে পানি ঝরছে। মানুষটা তাকে আসলেই কি অনেক ভালোবাসে? বিশ্বাস হতে চায়না। সে যে তাকে এই এক মাসে অনেক কষ্ট দিয়েছে। কষ্ট নিজেও পাচ্ছে। তবুও সে কোনো বাঁধনে নিজেকে জড়াতে চায়না। কারন, ঘরপোড়া গরু এখন সিঁদুরে মেঘ দেখলেও ডরায়।

বার কয়েক তিয়াশার ফোন বেজে উঠে, ফোন ধরতে নিয়েও নিজেকে সামাল দেয়। ফোন ধরলে যে নিজের মনকে প্রশ্রয় দেয়া হবে। নিজের ফোনের সুইচ অফ করে রেখে দেয় সে।

“আপি, তোর ফোন।”

তিয়াশা চোখ মুছে তাকাতেই দেখে পৌষী দাঁড়িয়ে।

“কে ফোন করলো?”
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



“জানিনা, ধর।”

বলেই ফোনটি তিয়াশার হাতে ধরিয়ে দিয়ে চলে যায় পৌষী। তিয়াশা ফোন কানে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বিছানায় এসে বসে,

“হ্যালো।”

ওপাশ থেকে কোনো সাড়া নেই। শুধু বাতাস ও তুমুল বৃষ্টির শব্দ শোনা যাচ্ছে। এত শব্দের মাঝেও তিয়াশা ঢের বুঝে ফেলে নিঃশব্দে থাকা ওপারের মানুষটা আদিলই হবে। সেও নীরবে ফোন কানে নিয়ে বসে থাকে। মিনিট পাঁচেক পর ফোনে ভেসে আসা কণ্ঠ বলে,

“একটি বার বাইরে তাকাবে?”

তিয়াশা দ্রুত পায়ে এগিয়ে জানালা খুলে বাইরে তাকায়। বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে, এর মাঝে একটি ছেলে তিয়াশাদের বাড়ির সীমানার বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। দৃষ্টি নিবদ্ধ তার তিয়াশার জানালায়। তিয়াশার শরীরে যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। এক দৌড়ে নিচে ছুটে যায় রাস্তায়।

“একি অবস্থা হয়েছে আপনার? এভাবে বৃষ্টিতে ভিজছেন কেন? অসুস্থ হয়ে যাবেন তো?”

আদিলের চোখ ছলছল করছে, তিয়াশার কথার কোনো উত্তর না দিয়ে তিয়াশাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠে,

“আমাকে না ভালোবাসো না? তাহলে তুমি নিজেও কেন বৃষ্টিতে ভিজে ছুটে এলে আমার কাছে?”

নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে কান্নারত কন্ঠে আদিলের চোখে চোখ রেখে চাপা গলায় বলে উঠে,

“হুম ভালোবাসি। এই অবাধ্য মন আপনার ভালোবাসায় হার মেনে সত্যি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু…”

“কিন্তু কেন আমাকে পোড়াচ্ছ এভাবে?”

“আমি নিজেও যে পুড়ে ছাই হচ্ছি।”

“তাহলে কেন এই দহনের সমাপ্তি করছো না?”

“আমার প্রতি আপনার এই ভালোবাসা নিমিষে উড়ে যাবে যখন…”

আদিল বৃষ্টির মাঝেই রাস্তার ধারে বসে পরে। তিয়াশা আদিলের কান্ডে অবাক হয়ে যায়।

“কি পাগলামি করছেন? আপনি এখানে বসে পড়লেন কেন?”

তিয়াশা হাত ধরে উঠাতে গেলে আদিল হেলে পরে যেতে নেয়। তিয়াশা দ্রুত ধরে ফেললে অনুভব করে আদিলের শরীর ভীষণ রকমের গরম।

“আপনার তো জ্বর চলে এসেছে।”

আদিলকে কোনো রকমে ধরে তার বাসায় নিয়ে যায় তিয়াশা।

“পৌষী এদিকে আয়তো, একটু ধর উনাকে আমার সাথে।”

দুইবোন মিলে আদিলকে ড্রইংরুমের সোফায় শুইয়ে দিয়ে তোয়ালে দিয়ে হাত পা মাথা মুছিয়ে দেয়। তিয়াশার ছোট ভাই ইশরাককে দিয়ে আদিলকে বাথরুমে পাঠায় ড্রেস চেঞ্জের জন্য। আদিল কোনরকমে ড্রেস চেঞ্জ করে বাথরুম থেকে বের হলেই ইশরাক ধরে নিয়ে এসে সোফায় শুইয়ে দেয়।

তিয়াশা আদিলের পাশে বসে তার কপালে কাপড় ভিজিয়ে জলপট্টি দিয়ে দিচ্ছে। বেচারা জ্বরে জ্ঞান হারিয়েছে। তিয়াশা অস্থির হয়ে ভাবছে এখন কি করবে? তার মা নীলিমা হাবিবও বাসায় নেই। বান্ধবীর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছে, ফিরবে দুদিন পর। আচ্ছা আদনানকে কি ফোন দিবে? উড়িয়ে দেয় এই চিন্তা মাথা থেকে, আদনান জানতে পারলে হাজারটা প্রশ্ন করবে। তখনই পৌষী তিয়াশার কাঁধে হাত রেখে পাশে দাঁড়ায়। তার চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ছে।

“আপি? কেন কষ্ট দিচ্ছিস উনাকে? তুই জানিস প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে তিনি এই বৃষ্টিতে ভিজেছে। তোর সাথে একটি বার কথা বলবে বলে আমার কাছে কত শতবার অনুনয় করেছে?”

তিয়াশার মুখটা শুকিয়ে গেছে। সে অনুতপ্ত, কিন্তু সে তো চেয়েছে কষ্ট পেয়ে যেন আদিল সরে দাড়ায়। বরং উল্টো ঘটনা ঘটলো এখন। পৌষী বলে চলেছে,

“গত একটা মাসে ভাইয়াকে অনেক কষ্ট দিয়েছিস। দিনের পর দিন তাকে এড়িয়ে চলেছিস। অথচ তোর বিপদে সেই সবার আগে এগিয়ে এসেছে, তোর মুখে একটু হাসি ফুটানোর জন্য কত কি প্ল্যান করেছে। তোর ভয় দূর করার জন্য তার সেকি প্রচেষ্টা। যেই মানুষটা এত কিছু করলো তার ভালোবাসাটাই প্রত্যাখ্যান করছিস?”

“তুই তো জানিস আমি কেন এমন করেছি। আমার অতীত জেনে কেউ আমার পাশে থাকবেনা। আর যদি কেউ থাকেও সেটা হবে তার করুণা। আমি কারো করুণায় বাঁচতে পারবোনা।”

“পাগলামি করিস না আপি। উনাকে একবার তো বলে দেখ।”

“হুম। দেখি।”

“তুই একটু উনার পাশে বস। আমি গরম স্যুপ বানিয়ে আনি। স্যুপ খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিলে আশা করি আজ রাতের মধ্যেই জ্বর অনেকটা কমে যাবে।”

এরই মাঝে বাসার ল্যান্ডলাইনের ফোন বেজে উঠলে তিয়াশা রিসিভ করে বলে,

“হ্যালো।”

“তিয়াশা, বেশ কবার তোর সেলফোনে ট্রাই করছি কিন্তু বন্ধ পাচ্ছি।”

“কি হয়েছে আদনান? তুই এত অস্থির কেন?”

“কিভাবে বলবো বুঝতে পারছিনা। আচ্ছা শোন ভাইয়ার কোনো খোঁজ জানিস?”

তিয়াশার বুক ধড়াক করে কেঁপে উঠে। নিজেকে সামলে শান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

“কেন কি হয়েছে?”

“আর বলিস না, কি যে হয়েছে ভাইয়ার কিচ্ছু বুঝতে পারছিনা। আজ সারাদিন বাসায় ফিরেনি। সব জায়গায় খোঁজ নিয়েছি। কোথাও নেই। ইদানিং খুব অন্যমনস্ক থাকছে। কারো সাথে কথা বলছেনা। কিছু জিজ্ঞেস করলেও উত্তর দিচ্ছেনা। এদিকে বাবা ভাইয়াকে জোর করে তার কলিগের মেয়ের সাথে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছে। আজ সকালে ভাইয়া কাউকে কিছু না বলেই বের হয়ে গেছে। আম্মু কান্নাকাটি করছে। আম্মুই বললো তোকে একটু ফোন দিয়ে জানতে, তুই কোন খোঁজ জানিস কিনা।”

তিয়াশা ইতস্ততঃ হয়ে মিথ্যা বলে।

“না, আমি তো জানিনা। আমি খোঁজ পেলে অবশ্যই তোকে জানাবো। চিন্তা করিস না। হয়তো কোন বন্ধুর বাসায় গিয়েছেন।”

“হুম। দুঃখিত তোকে এসব বলে বিরক্ত করার জন্য।”

“আরে বন্ধু বন্ধুকে বলবে নাতো কাকে বলবে?”

“আচ্ছা রাখি। ভালো থাকিস।”

“হুম। তুইও ভালো থাকিস। বাই।”

“বাই।”

*

পরদিন সকালে তিয়াশা ঘুম থেকে উঠে আবিষ্কার করে নিজেকে সে সোফায় শুয়ে আছে। আরে যেখানে আদিল শুয়ে ছিল সেখানটিতে সে শুয়ে আছে কেন। আদিল গেল কোথায়? চারপাশে তাকিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে চোখ পড়ে আদিল বসে আছে ওর মাথার কাছে, আর তিয়াশা আদিলের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে।

হকচকিয়ে উঠে বসে তিয়াশা। আদিলের কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বর আছে কিনা। তারপর আবার ভালো করে চোখ কচলে পরিষ্কার করে বোঝার চেষ্টা করে স্বপ্ন দেখছে কিনা। তিয়াশার যতদুর মনে পরে, সে আদিলের খেয়াল রাখতে রাখতে সোফার পাশে ফ্লোরে বসেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু সে এখানে কিভাবে এলো।

তিয়াশার মনের সব চিন্তা যেন আদিল পড়ে ফেলে। ঠোঁটের কোণে হাঁসি ফুটিয়ে বলে উঠে,

“কি ভাবছেন? আপনি এখানে এলেন কি করে?”

চলবে…

আগের পর্ব: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/947465892350797

[বি:দ্র – গল্পটি আর বেশি বড় করবোনা। চেষ্টা করবো খুব শীঘ্রই শেষ করে দেবার জন্য পরবর্তী কিছু পর্বের মাঝেই। গল্পটির শেষ পর্যন্ত পাশে থাকবেন আশা করছি।]

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে