পূর্ণিমা_সন্ধ্যায় পর্ব_৩২

0
823

পূর্ণিমা_সন্ধ্যায়
পর্ব_৩২
#লেখিকাTasneem Tushar

দুই মগ চা হাতে নিয়ে তিয়াশা এগিয়ে আসছে আদিলের দিকে। কাছে এসে একটি চায়ের মগ আদিলের হাতে দিয়ে পাশে বসতে নিলেই আদিল তিয়াশার হাত ধরে ফেলে,

“উহু, পাশে নয় আমার সামনে বসো। তোমাকে দেখে কথা বলতে ভালো লাগে।”

তিয়াশা কথা না বাড়িয়ে সামনে বসে। আদিলের কি যেন কি হয়, হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়।

“তিয়াশা, ঘরে নয়, চলনা তোমাদের বাড়ির পেছনে খোলা ডেক-এ যেয়ে বসি।”

“হুম, চলুন।”

দুজনে ডেক-এ থাকা টেবিলে মুখোমুখি চেয়ার টেনে বসে। বাইরে এই মেঘলা তো এই রোদ সাথে ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়া বইছে। তিয়াশার চুল উড়ে বারবার তিয়াশার মুখের কাছে চলে আসছে, আর আদিল নিষ্পলক তাকিয়ে আছে। তিয়াশা একটু হালকা কেশে নীরবতা ভেঙে বলে,

“আপনার কি অবস্থা হয়েছে দেখেছেন মিঃ আদিল? একদিনেই চোখ মুখ শুখিয়ে গেছে। চোখ ভেতরে ঢুকে গেছে, রোগা লাগছে আপনাকে খুব। এভাবে আপনাকে দেখবো কখনো ভাবিনি।”

“তুমি সাথে না থাকলে যে আমি এভাবেই শেষ হয়ে যাবো।”

“আপনি দয়া করে পাগলামি করবেন না। আর আপনার এই পাগলামি কিছুক্ষন পরে থাকবেও না।”
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



“আমার পাগলির জন্য আমি পাগলামি করবো তাতে তোমার কি?”

তিয়াশা অধর্য্য হয়ে বলে উঠে,

“মিঃ আদিল, আপনাকে আমার কিছু বলার আছে।”

“বলোনা। আই এম অল ইয়োরস।”

“আমার জীবনের একটি কালো অধ্যায় আছে।”

তিয়াশার মুখে যেন নিমিষেই অন্ধকার নেমে আসে। নিজের অতীতের কথা এভাবে প্রকাশ করে নিজের কষ্ট বাড়াতে চাইছেনা। কিন্তু না বলেও পারছেনা, নয়তো আদিলের সাথেও প্রতারণা করা হবে। আদিল কি বুঝলো কে জানে তিয়াশার দুহাত তার মুঠোয় ভরে শক্ত করে ধরে বলে,

“বলো। আমি শুনছি। তবে বলে রাখছি, তোমার অধ্যায় যতই কালো হোক না কেন, সেই কালো কাটিয়ে তোমার জীবন আমি আলোয় রাঙিয়ে দিব।”

তিয়াশা তাকিয়ে আছে আদিলের দিকে। কিছু না শুনেই এত দৃঢ়তার সাথে কিভাবে সে এগুলা বলতে পারে। নীরবে চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে তিয়াশার। তারপর বলে,

“কিভাবে শুরু করবো জানিনা।”

একটু থেমে আবার বলে,

“আমার জীবনেও প্রেম এসেছিল। দেখা মিলেছিল একটি সুপুরুষের। যার মধ্যে সেসব বৈশিষ্ট্য ছিল যা আমার চিন্তারও বাইরে। তাকে ঘিরে সাজিয়েছিলাম আমার স্বপ্নের দুনিয়া। ভালোবেসেছিলাম তাকে নিজের সবটুকু দিয়ে।”

“তারপর?”

“হুম, তারপর….।”

তিয়াশার গলা ধরে এসেছে। বহু কষ্টে কান্না চেঁপে ঠোঁটে হাসি ফুটিয়ে বলে,

“জানেন, কতশত স্বপ্ন দেখেছি একটি সুন্দর সংসারের। বিয়ের স্বপ্ন দেখেছি। কত কি প্ল্যান করেছি। খুব খুশি ছিলাম আমি। স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য এক ধাপ এগিয়ে যাই …।

আদিলের বুকের মাঝে ঝড় চলছে। সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তিয়াশার চোখে সে ছেলের প্রতি ভালোবাসা। কিন্তু এর মাঝেও তিয়াশার হাত সে ছাড়েনি। তিয়াশার কথার লাইনটা আদিল শেষ করে বলে,

“সেই স্বপ্নের প্রথম অধ্যায় বাস্তবায়িত হয় তোমাদের বিয়ের মাধ্যমে। কি ঠিক বললাম?”

তিয়াশার দুনিয়া যেন দুলে উঠে এক মুহূর্তে আদিলের কথা শুনে। প্রচন্ড বিস্ময় নিয়ে আদিলের দিকে তাকায় তিয়াশা।

“আ… আপনি জানতেন?”

বলেই আদিলের হাতের মুঠো থেকে হাত টেনে সরাতে নেয়, কিন্তু আদিল হাত দুটো আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলে,

“হুম, জানতাম।”

“কিভাবে?”

“তোমার মনে আছে কটেজে থাকাকালীন সময়ে আমার কাছে হঠাৎ একটা ফোন আসে? এবং আমি কাজ আছে বলে চলে যাই? সেদিন আমার কাছে একজনের ফোন আসে। এর আগেও কয়েকবার এসেছে পাত্তা দেইনি, কিন্তু সেদিন ফোনটা ধরে ফেলি। অনেক কিছু বলে তোমার সম্পর্কে, তোমার অতীত সম্পর্কে এবং আরও অনেক কিছু। সেদিনই আমি জানতে পারি তোমার বিয়ের কথা। খুব কষ্ট পেয়ে ছিলাম। সারাদিন ভেবেছি, পর্যবেক্ষণ করেছি। যাচাই করার জন্য তোমাকে অনেকভাবে খোঁচানোর চেষ্টা করেছি। কিন্তু তোমার সাথে মিশে বুঝেছিলাম তোমার নামে অনেক মিথ্যা গল্পও বানিয়ে বলেছে। অদ্ভুত ব্যাপার কি জানো? তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা বিন্দু মাত্র কমেনি। যত তোমাকে দেখেছি, বুঝেছি, চিনেছি, তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে।”

তিয়াশার চোখে এখনো জল। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছেনা আদিলের কথাগুলো। বলে উঠে,

“কে আপনাকে এসব বললো?”

“নাম পরিচয় কিছু তো বলেনি, শুধু বলেছে শুভাকাঙ্ক্ষী, এতে আমি, আমার পরিবার ক্ষতির হাত থেকে বাঁচবো।”

“আপনি বিশ্বাস করলেন? যাচাই করলেন না? সেই পরিচয়হীন মানুষের পরিচয় নেয়ার চেষ্টা করলেন না?”

“হুম করেছি, কিন্তু এখনো খুঁজে পাইনি। চেষ্টা চলছে। আর যাচাই সেটা তো করেছি।”

“বুঝলাম, কিন্তু আমি বিবাহিত জেনেও আপনি কেন আমাকে ভালোবাসবেন? আপনার তো বরং সরে যাবার কথা।”

আদিল একটু মাথা নেড়ে বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলে,

“মিস তিয়াশা, আপনার কথায় একটা ভুল আছে।”

“মানে?”

“মানে হচ্ছে, আপনি অতীতে বিবাহিত ছিলেন। বর্তমানে আপনি সিঙ্গেল।”

তিয়াশা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে,

“নাহ, সিঙ্গেল না। ডিভোর্সড বলতে পারেন।”

“তাতে আমার কোনো সমস্যা নেই।”

“আমার সমস্যা আছে।”

তিয়াশা একটু উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে যেয়ে বলে উঠে,

“কেন আপনি সব জেনে শুনে আমাকে ভালোবাসবেন? এই পৃথিবীতে আরও হাজারটা তিয়াশা আপনার জন্য দাঁড়িয়ে যাবে যারা পিওর সিঙ্গেল, যাদের আমার মতো কোনো অতীত নেই। যারা আরও যোগ্যতা সম্পন্ন।”

“শান্ত হও তিয়াশা।”

“আপনি ভুল করছেন। আপনি তো জানতেও চাইলেন না ডিভোর্স কেন হলো? হতেও তো পারে আমার কোনো দোষ অথবা সমস্যার কারণে বিয়েটা টিকেনি। হতেও তো পারে আমি মেয়েটাই খারাপ।”

আদিল এবার উঠে এসে তিয়াশার হাত ধরে নিয়ে ডেকের সিঁড়িতে যেয়ে বসে। তারপর বলে,

“তোমাকে সব বলবো। শান্ত হও আগে।”

“আমার আরও আগেই জানানো উচিত ছিল সব আপনাকে। ভেবেছিলাম আপনাকে এড়িয়ে চললে আপনি নিজ থেকেই সরে যাবেন।”

“আমি তোমার ডিভোর্সের কারণ জেনেছি অনেক আগেই।”

“কার কাছ থেকে জানলেন?”

“পৌষীর কাছ থেকে তোমার বিয়ে ও ডিভোর্সের আদ্যোপান্ত সব জেনেছি।”

“তাহলে?”

“তাহলে… কিছুনা। আমি তোমার মুখ থেকে এবার সম্পূর্ণটা জানতে চাই।”

“যদি আমি মিথ্যে বলি? আপনার কাছে ভালো সাজতে চাই।”

“আমার পরীক্ষা নিয়ো না তিয়াশা। তোমার মিথ্যা বলার হলে, আমার কাছে ভালো সাজতে চাইলে তা অনেক আগেই করতে। যখন জানলে আমি তোমাকে ভালোবাসি তখন আমাকে দূরে না সরিয়ে আপন করে নিতে। তুমি তা করোনি। এখন তুমি আমাকে নিজে সব বিস্তারিত জানাবে কেন ডিভোর্স হলো? কেন তোমার মত একটা সহজ সরল মেয়েকে এত কষ্ট পেতে হলো?”

“হুম বলছি।”

বলে তিয়াশা ডুবে যায় তার অতীতের স্মৃতিতে। তিয়াশা তখন সবেমাত্র হাইস্কুল থেকে বেরিয়ে ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হবে। সে বছর গ্রীষ্মের ছুটিতে এক আত্মীয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানে পরিচয় হয় আফরানের সাথে। আফরান তখন স্টুডেন্ট ভিসাতে আমেরিকাতে এসে ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ইউনিভার্সিটি থেকে সবে মাত্র মাস্টার্স শেষ করেছে বিজনেস এডমিনিষ্ট্রেশনের উপরে। তার আমেরিকাতে আপন বলতে আছেই এক দূরসম্পর্কের খালা আর সেও কোনো ভাবে তিয়াশাদের আত্মীয়ের পরিচিত। সেই সুবাদেই বিয়েতে আসা। সেখানেই পরিচয় হয় তিয়াশা ও তার পরিবারের সাথে আফরান ও তার খালার।

পরিচয়ের এক পর্যায়ে জানতে পারে, আফরান চাকরি খোঁজার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমেরিকাতে সিটিজেনশিপ অথবা পার্মানেন্ট রেসিডেন্সি না থাকলে চাকরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার, তাও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সেদিন বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখা হবার পর একদিন তিয়াশাদের বাড়িতে ছোট্ট একটা জন্মদিনের অনুষ্ঠানে আফরান ও তার খালা আমন্ত্রিত হয়ে আসে। তিয়াশার মা নীলিমা হাবিবের ভীষণ পছন্দ হয় আফরানকে তিয়াশার জন্য। ছেলেটার আচার ব্যবহার পড়াশোনা যোগ্যতা সবকিছু তাকে মুগ্ধ করেছে। তাদের পরিবারে কোনো বড় ছেলে নেই। তিয়াশার সাথে বিয়ে হলে আফরানকে এখানেই রেখে দিবে সেই সাথে একটা ছেলেও পাবে তিনি। সেসব ভেবে নীলিমা হাবিব তিয়াশাকে তার মনের কথা জানালে তিয়াশারও একটু একটু করে ভালোলাগা শুরু হয়। আফরান ও তিয়াশাকে বেশ পছন্দ করে। দুই পরিবারের সম্মতিক্রমে দুজনে দেখা সাক্ষাৎ করে এবং তিয়াশা অল্প বয়সে আবেগী হওয়াতে খুব দ্রুতই গভীর ভাবে আফরানের প্রেমে পড়ে যায়। আফরানও যথেষ্ট কেয়ারিং একটা ছেলে। তিয়াশাকে ভালোবেসে মাথায় তুলে রাখে।

সে বছরই শীতে ঘরোয়া ভাবে তিয়াশা ও আফরানের বিয়ে হয়ে যায়। বেশ হাসি খুশিতেই কাটছিল তাদের সংসার।

চলবে…

আগের পর্ব: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/947465892350797/

[বি.দ্র: তিয়াশার জীবনে বিয়ের যেই ঘটনাটি বলছি এবং সামনের পর্বে বলবো তা একজন/ একাধিক মেয়ের জীবনে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা অবলম্বন করেই বলা হচ্ছে। বলা বাহুল্য, মানুষের জীবন গল্পের চেয়েও কঠিন। আমি আমার এই গল্পে সংক্ষেপেই সেই কাহিনীটা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। নতুবা শুধু এই কাহিনীটা নিয়েই একটা উপন্যাস লিখা সম্ভব। কোনোদিন যদি আপনাদের অনুপ্রেরণা পাই তখন এই সত্য ঘটনাটি বিস্তর ভাবে আমার কোনো এক গল্পে তুলে ধরবো। গঠনমূলক মন্তব্য করে আপনারা আমার পাশে থাকুন। আপনারাই আমার অনুপ্রেরণা।ধন্যবাদ।]

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে