পূর্ণিমা_সন্ধ্যায় পর্ব_২৬

0
993

পূর্ণিমা_সন্ধ্যায়
পর্ব_২৬
#লেখিকাTasneem Tushar

কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছে তিয়াশা। কারো ডাকেই সারা দিচ্ছেনা। একবার ধরফড়িয়ে উঠে ঘুমের ঘোরে এদিক সেদিক তাকিয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়ে সে। আবার ডাক দিলে, তিয়াশা ঘুমের ঘোরেই বলে উঠে,

“আম্মু, আরেকটু ঘুমাই। আজকে তো উইকেন্ড।”

“আপি, আম্মু নাতো। আমি.. পৌষী। উঠো এখন।”

“পৌষী একদম জ্বালাবি নাতো। ঘুমোতে দে।”

বারংবার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে পৌষী। প্যাট্রিসিয়ার ডাকেও কোনো কাজ হয়নি। এই মেয়ে আজকে বোধহয় উঠবেনা। আজকের সারাদিনের প্ল্যান পন্ড করে ছাড়বে। এদিকে সকাল প্রায় ১০টা। সবাই অপেক্ষা করছে একসাথে সকালের নাস্তা করবে বলে। বোধহয় অনেক বেশি ধকল গিয়েছে গতকাল তার উপর দিয়ে, তাই উঠতে পারছেনা।

একটু পরেই একটা বাজ খাই গলার আওয়াজে তিয়াশা ধরাম করে উঠে বসে চোখ কচলাতে থাকে। আসে পাশে তাকিয়ে দেখে সে বাংক বেডের দোতলায় শুয়ে আছে, পরিবেশটাও অচেনা লাগছে। বোধহয় স্বপ্নই দেখছি এই ভেবে যেই শুতে নিবে, ঠিক তখনই একটি হাত তিয়াশাকে ধরে ফেলে।

তিয়াশা এবার চোখ খুলে অবাক হয়ে বলে উঠে,

“আদিল… আপনি? উফ, আপনি কি আমার স্বপ্নেও হানা দিবেন?”

“হুম তাতো দিবই। কিন্তু আপাতত স্বপ্ন নয়, সত্যি। এবার উঠুন। সবাই অপেক্ষা করছে আপনার জন্য। না উঠলে এবার আপনাকে তুলে নিয়ে সুইমিং পুলে ফেলবো।”

তিয়াশা তাকিয়ে দেখে পৌষী মিটিমিটি করে হাসছে প্যাট্রিসিয়ার পাশে দাঁড়িয়ে। নাহ এটা কিভাবে সম্ভব একই বাসায় প্যাট্রিসিয়া পৌষী আবার আদিল ও, এটা স্বপ্ন ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ভেবে আবার বালিশে মাথা দিতে গেলেই তার হাতে আবার টান পরে। এবার তিয়াশা ভীষণ বিরক্ত হয়, উঠে বলে

“উফ কি শুরু হলো? একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারছিনা।”

রাগ করে বেড থেকে নামতে নিয়ে দেখে বেডটা অনেক উঁচু। তিয়াশা এবার চিন্তায় পরে যায়। চারপাশটা ভালো করে তাকিয়ে দেখতে দেখতে আদিলের দিকে চোখ পরতেই তার গতকালের সব ঘটনা মনে পড়ে যায়।

ভ্রু কুঁচকে আদিলের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

” একটু সরুন । নিচে নামবো।”

আদিল সরে দাঁড়ালে বাংক বেডের মই বেয়ে নীচে নামতে যেয়ে হটাৎ পা পিছলে তাল সামলাতে না পেরে পরে যেতে নিলে আদিল ধরে ফেলে তাকে। তিয়াশা নিজেকে অপ্রত্যাশিত ভাবে আদিলের কোলে আবিষ্কার করে ভীষণ লজ্জা পেয়ে যায়। একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

“ধন্যবাদ।”

“কেন?”

তিয়াশার ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি দেখা দেয়।

“জানিনা।”

বলেই তিয়াশা দ্রুত তার রুম প্রস্থান করে। আর পেছনে আদিল বুকে হাত দিয়ে গুনগুন করে গান ধরে,

“ভোলিসি সুরাত
আয় হায়ে।

ভোলিসি সুরাত, আখমে মাস্তি
দূর খারি শারমায়ে

আয় হায়ে।
“এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি সাপ্তাহে জিতে নিন বই সামগ্রী উপহার।
আমাদের গল্প পোকা ডট কম ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এখানে ক্লিক করুন



এক ঝালাক দ্বিখলায়ে কাভি
কাভি আচাল মে ছুপ যায়ে।”

তিয়াশা যেতে যেতে সবটাই শুনে। আদিল জানালার পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে তিয়াশার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে গুনগুন করছে। তিয়াশা এক ঝলক পেছনে তাকায় আদিলকে দেখার জন্য। তার ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি, কিন্তু চাহনিতে অভিমান গতকালের ঘটনার জন্য।

*

কটেজেই রান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। কটেজ তো নয় যেন বিলাস বহুল একটা বাসা। সবই রয়েছে এতে।

খাবার টেবিলে বসেছে সবাই। তিয়াশা রান্নাঘরে ঢুঁ মেরে দেখতে পায়, আদনান সকালের নাস্তা তৈরি করছে সবার জন্য। আসলে আদনানের উদ্দেশ্য তিয়াশাকে রান্না করে খাওয়ানো। তিয়াশাকে দেখতে পেয়েই আদনান বলে উঠে,

“শুভ সকাল হে জন্মদিনের কন্যা।”

তিয়াশা হেসে দেয়। পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

“শুভ সকাল।”

একটু উকি দিয়ে বলে,

“আরে করছেন কি? রান্না পারেন আপনি? দিন আমি করি।”

“কেন নয়?”

“না…মানে রান্না তো মেয়ে…”

আদনান থামিয়ে দিয়ে বলে,

“উহু, রান্না একটি কাজ অথবা শিল্প বলতে পার। এই কাজের কোনো লিঙ্গ ভেদাভেদ নেই।”

“কিভাবে? সারাজীবন বাঙালির মুখে এটা শুনে বড় হলাম, রান্না, ঘর সংসার সব মেয়েদের কাজ।”

“মজার ব্যাপার কি জানো? আমার মা আমাদের তিনভাই বোনকে সমানভাবে ঘর সংসার সহ বাইরের সব কাজ শিখিয়েছে। কোনো কাজে ভেদাভেদ শেখায়নি। কারণ কখনো যেন কারও উপরে নির্ভরশীল হতে না হয়।”

“আন্টি কিন্তু ভীষণ স্মার্ট।”

“আমার আম্মু ভুক্তভোগী ও।”

“বুঝলাম না।”

“শোনো। এখন তো মেয়েরাও বাইরের কাজ করছে, পাশাপাশি ঘর সামলাচ্ছে। একটা মেয়ে যদি এত কিছু পারে তাহলে আমরা পারবোনা কেন?একটা মেয়ে যদি আত্মনির্ভরশীল হয়ে ছেলেদের সাথে তাল মিলিয়ে বাইরে কাজ করে রোজগার করে, তাহলে আমরা ছেলেরা কেন ঘরের কাজে সহায়তা করতে পারবোনা? আমরা এদিক থেকে পিছিয়ে গেলাম না? ছেলেরা নির্ভরশীল হয়ে গেলো না?”

তিয়াশা মনোযোগ দিয়ে শুনছে। আসলেই তো এভাবে তো কোনদিন ভেবে দেখেনি।

আদনান ডিম পোচ করতে করতে বলতে থাকে,

“অন্যভাবে বললে ছেলেরা মেয়েদের উপর বোঝা স্বরূপ হয়ে দাঁড়ায়। আমার আম্মু চেয়েছে তার প্রত্যেকটা ছেলেমেয়ে সব কিছুতে স্বনির্ভর হোক, যেন কোনো কিছুতেই কারো উপর নির্ভরশীল হতে না হয়। না আর্থিক ভাবে, না ঘর সংসারের কাজে।”

“আন্টিকে সালাম জানাই।”

আদনান হেসে দিয়ে বলে,

“অফকোর্স। মাই মম ইস দা বেস্ট মম ইন দিস ওয়ার্ল্ড।”

আদিল পেছন থেকে দাঁড়িয়ে সব শুনছিলো সে এসে কথায় যোগ দিয়ে বলে,

“আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস তুই মিস করেছিস আদনান।”

“কি সেটা ভাইয়া?”

“এই যে প্রত্যেকটা ছেলে ও মেয়েদের আল্লাহ নিজস্ব কিছু গুণাবলী দিয়ে দিয়েছেন। যেমন ধর, মেয়েদের বেবি হয়, ইনবিল্ট ঘর পরিচালনার বৈশিষ্ট আছে। আবার অন্যদিকে ছেলেদের শারীরিক শক্তি বেশি যাতে কঠোর পরিশ্রম করতে পারে। তাই বলে এই বৈশিষ্ট গুলোর জন্য এই জগৎ সংসারের কাজগুলো দুটো নির্দিষ্ট ধারায় ফেলে দেয়াটা ঠিক নয়। বরং ছেলে মেয়ে নির্বিশেষে আমরা মানুষ আর জীবনে বেঁচে থাকতে হলে আমাদের দৈনন্দিন অনেক কাজ করতে হবে। তাই মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত কেউ কারো উপর নির্ভরশীল না হয়ে স্বনির্ভর হওয়া এবং একজন আরেকজনের কাজের পরিপূরক হওয়া। একজন আরেকজনকে কাজে সাহায্য করা। বোঝা হওয়া নয়।”

তিয়াশা যে আদিলের উপর অভিমান করে আছে সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে বলে উঠে,

“কিন্তু এ নিয়ে তো অনেক মতবিরোধ আছে।”

আদিল বলে উঠে,

“মানুষের মূর্খতা, দৃষ্টিভঙ্গি ও মানসিকতা পরিবর্তন না হলে এই মতবিরোধ কোনোদিন যাবেনা।”

আদনান তাড়া দিয়ে বলে উঠে,

“ভাইরে আজকে থাম। অনেক গুরুগম্ভীর কথা হয়েছে। আমার খাবার ঠান্ডা হয়ে গেল। দয়া করে মহারানীকে নিয়ে খেতে চল।”

চলবে…

আগের পর্বের লিংক: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/permalink/947465892350797/

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে