তোমাতেই পূর্ণ আমি পর্ব-০৪

0
1916

গল্পের নামঃতোমাতেই পূর্ণ আমি❤
পর্বঃ০৪
লেখিকাঃজিন্নাত চৌধুরী হাবিবা

হঠাৎ দরজা বন্ধ করার আওয়াজ কানে আসতেই মিনি পেছন ঘুরে দেখে স্পর্শ ওর দিকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

এইরে এবার কি হবে…? লোকটাতো আমায় চিবিয়ে খাবে মনে হচ্ছে ( মনে মনে বলল মিনি) জোরপূর্বক হেসে মিনি বলল,ওমা আপনি চলে এসেছেন।

আমি কি এসেছি…? আমি তো এখনো হলরুমেই আছি ভাবুক ভঙ্গিতে বলল স্পর্শ তারপর শক্ত দৃষ্টিতে দাঁতে দাঁত চেপে মিনির দিকে এগোতে এগোতে বলল আমাকে ওই বিচ্যু বাহিনীর মাঝে দেখে খুব মজা পেয়েছো তাই না…?

মিনি ভয়ে পেঁচাচ্ছে
এখন কি করি এই লোক কি আমাকে মারবে…? নানা কিসব ভাবছি আমি, মারবে কেনো,
এদিকে স্পর্শ ক্রমশ এগিয়ে আসছে দেখে মিনি তোতলানো কন্ঠে বলল,

আপনি এগোচ্ছেন কেন…?

তুমি পেঁচাচ্ছ কেন…?

দেখুন মিঃটাচ আর এক পা এগোলে ভালো হবে না বলে দিলাম।

স্পর্শ ভেবাচেকা খেয়ে গেলো কি বলে এই মেয়ে মিঃটাচ🤔
এই তুমি কাকে মিঃটাচ বলছো….?

কেন আপনাকে….?

হোয়াট….? আমার নাম টাচ..? স্পর্শ বিষ্ময়ে থ,,,

তা নয় তো কি টাচ মানে স্পর্শ,,, স্পর্শ মানে টাচ(মিনি)

এবার স্পর্শ দুষ্টু হেসে বলল,তাহলে তুমি কি বিড়াল…? না মানে বিড়ালকেই তো মানুষ আদর করে মিনি বলে ডাকে।

এই এই একদম উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না আমি বিড়াল হতে যাবো কেন,,আর আপনিতো দেখছি কিছুই জানেন না কিভাবে বাবার ব্যবসা সামলান..?মিনি মানে ছোট,, আপনি দেখেন না যেকোনো জিনিসের মিনি প্যাক থাকে..? যেমনঃশ্যাম্পু,

ওওওহ তাহলে তুমি বলছো তোমাকে মিনি প্যাক বলে ডাকতে…?

মিনি রেগে কটমট করে কিছু বলবে তার আগেই দরজার অপর পাশ থেকে মিনির মা ডেকে উঠেন,,

কিরে মিনি এতক্ষণ লাগে…? জামাইয়ের নাস্তা করা লাগবে না তাড়াতাড়ি নাস্তা নিয়ে যা।

স্পর্শ গা জ্বালানো হাসি দিয়ে বলল,যাও যাও
হাসবেন্ডের একটু খাতির যত্ন করো।
তারপর ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।

এদিকে মিনির রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে,লোকটা আস্ত একটা অসভ্য,তারপর ধপাধপ পা ফেলে স্পর্শের চৌদ্দ গোষ্ঠী উদ্ধার করতে করতে মায়ের কাছে গেলো নাস্তা আনতে।

দুপুরে সবাই এক সাথে লাঞ্চ করে যে যার রুমে রেষ্ট নিচ্ছে এমন সময় মিনির কাজিনরা সবাই মিনির রুমে ঢুকে স্পর্শকে চেপে ধরে ট্রিট দেওয়ার জন্য। ট্রিট না দিলে ওরা স্পর্শকে ছাড়বেনা।বেচারা স্পর্শ এসেছে একটু রেষ্ট করবে তা না এখন এদেরকে ট্রিট দিতে হবে।কিছু করার নেই তাই উঠে পড়লো। মিনিকে যাওয়ার কথা বলতেই মিনি না করে দেয়।স্পর্শ ও আর কিছু না বলে ব্যাটেলিয়নদের নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

সূয্যি মামা পশ্চিম দিকে হেলে পড়েছে অনেক আগেই। লাল আভা ছড়িয়ে অস্ত যাওয়ার অপেক্ষা। লম্বা সিল্কি চুলগুলো কোমর অব্দি ছাড়িয়ে ছাদের রেলিং হাতলে দাড়িয়ে আছে মিনি। একটু আগে শাশুড়ীর সাথে ফোনে কথা বলে নিয়েছে।
স্পর্শ আর ওর কাজিনরা এখনো ফেরেনি।মিনির কাজিন গুলো প্রচন্ড দুষ্টু।এখানে যারা আছে সবাই মিনির ছোট।মিনি ভালোই বুঝতে পেরেছে এরা আজ স্পর্শের হাল বেহাল করে ছাড়বে।

নিচে যেতেই মিনি দেখলো ওর কাজিনরা সব হলরুমে সোফায় বসে আছে।মিনিকে দেখেই বলল,আপি ভাইয়া অনেক ভালো জানিস আমরা যা বলেছি তাই শুনেছে।ওদের কথায় মন না দিয়ে মিনি চলল নিজের রুমে।
রুমে গিয়ে দেখে স্পর্শ শাওয়ার নিয়ে কোমরে তোয়ালে পেঁচিয়ে বেরিয়েছে মাত্র খালি গায়ে দাড়িয়ে হাত দিয়ে ভেজা চুল গুলো নাড়ছে।মিনি এক নজর তাকিয়ে চোখ সরিয়ে নিলো।

অন্যদিকে তাকিয়ে স্পর্শকে উদ্দেশ্য করে বলল আপনি এখন শাওয়ার নিলেন যে…?

তোমার বিচ্যু ভাইবোন গুলো আমাকে দিয়ে যা ইচ্ছা হয়েছে পূরন করে নিয়েছে না করতে ও পারলাম না।আমাকে পাগল করে ছেড়েছে।অস্হির হয়েই এখন শাওয়ার নিলাম বলতে বলতে মিনির দিকে তাকিয়ে বলে তুমি ওই দিকে তাকিয়ে আছো কেন…?

মিনি ইতস্তত কন্ঠে বলল, আপনি ড্রেস পরে নিন।

নিজের দিকে খেয়াল হতেই স্পর্শ তাড়াতাড়ি একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার নিয়ে পরে ফেলে।

আদিল হসপিটাল থেকে বাসায় এসে সোজা মিনির ঘরে ঢুকে।উদ্দেশ্য তার কলিজার টুকরা বোনকে দেখা।স্পর্শকে বসে থাকতে দেখে ওর সাথে কথা বলে মিনির কথা জিজ্ঞেস করতেই স্পর্শ ব্যালকনিতে দেখিয়ে দিলো।

পিছন থেকে দুটি হাত মিনির চোখ চেপে ধরার দেরি মিনির বুঝতে দেরি হয়না হাত দুটি কার।চোখ থেকে হাত দুটি ছাড়িয়ে মিনি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আদিলকে।ভাই-বোনের কিছুক্ষণ খুনসুটির পরেই আদিল মিনির হাতে দুটো চকলেট ধরিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে।ব্যস্ততার কারনে রিয়াকে টাইম দিতে পারছেনা এখন একটু মেয়েটার সাথে কথা বলবে।(রিয়া আদিলের ভালোবাসার মানুষ অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ে)।

ফ্রেশ হয়ে এসে মোবাইল হাতে নিয়েছে আদিল উদ্দেশ্য রিয়াকে কল করা।হঠাৎই আকাশ থেকে ঝপাঝপ বৃষ্টি পড়া শুরু হয়।এতক্ষণ বৃষ্টি হওয়ার কোনো আভাস ছিলোনা হঠাৎই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে।আদিল রিয়াকে কল দিয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে নেয়।এক পর্যায়ে রিয়া বলল,কবে বিয়ের কথা বলবে বাসায় বাবা তো পারে না আমাকে আজই বিয়ে দিয়ে দেয়।ওর কথায় আদিল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল আমি খুব শীঘ্রই বাবা মাকে নিয়ে তোমাদের বাসায় যাবো বিয়ের কথা বলতে।এভাবে কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দেয় আদিল।

বৃষ্টির তোড়জোড় যেন বেড়েই চলেছে।মিনি ব্যালকনিতে এখনো দাড়িয়ে আছে। স্পর্শ ঘুমিয়ে আছে। জোরে জোরে বাজ পড়ার শব্দে ঘুম ভাঙলো স্পর্শর পাশে তাকিয়ে মিনিকে না দেখেই কপাল কুচকে যায় স্পর্শের। তারপর কিছু একটা ভাবতেই স্পর্শ দৌড়ে ব্যালকনিতে যায়। গিয়ে দেখে মিনি দিব্যি দাড়িয়ে আছে। স্পর্শ ভেবেছিলো মিনি হয়তো ভয়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকবে।কিন্তু না এই মেয়ে তো কি সুন্দর করে দাড়িয়ে আছে।

মিনি পাশে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে বুঝলো এটা স্পর্শ।কারণ এতো রাতে অন্য কেউ ওর রুমে আসবেনা।স্পর্শের দিকে না তাকিয়েই মিনি বলল,উঠে পড়লেন যে….?

স্পর্শ মিনির কথার জবাব না দিয়ে অবাক কন্ঠে মিনিকে উল্টো প্রশ্ন করলো,

এতো জোরে বাজ পড়ছে তুমি ভয় পাচ্ছো না….?

বাজ পড়লে ভয় পাওয়া কি বাধ্যতামূলক নাকি…?

স্পর্শ ভেবাচেকা খেয়ে গেলো মিনির প্রশ্নে,তারপর আমতা আমতা করে বলল,না মাহিরা অনেক ভয় পায় বাজ পড়লে তাছাড়া অন্যান্য মেয়েরাও ভয় পায় তাই আমি ভাবলাম তুমি ও হয়তো,,,,,

স্পর্শকে আর কিছু বলতে না দিয়ে মিনি বলল,আমি বাজ পড়া ভয় পাই না বাট অন্য কিছু ভয় পাই।

স্পর্শ কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলো সেটা কি,,,

উত্তরে মিনি বলল,বলা যাবেনা “সিকরেট”

“পরেরদিন বিকাল”

মিনি আর স্পর্শ রওনা দিয়েছে স্পর্শদের বাড়ির উদ্দেশ্যে।রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম হওয়ায় স্পর্শদের গাড়ি সহ আরো অনেক গাড়ি থেমে আছে।বিরক্তি নিয়ে বসে আছে মিনি আর স্পর্শ।হঠাৎ মিনি বলল,গাড়ির গ্লাসটা নামিয়ে দিন,স্পর্শ কোনো রকম দ্বিরুক্তি না করেই গ্লাস নামিয়ে দিলো।মিনি মাথা বের করে চারপাশ দেখতে থাকে।

পাশের গাড়ির একটা ছেলে বারবার মিনির দিকে তাকাচ্ছে যা মিনি ছেলেটির দিকে না তাকিয়েই বুঝতে পারলো।এবার মিনি ছেলেটির দিকে নজর দিতেই ছেলেটি মিনির দিকে তাকিয়ে গায়ের টি-শার্ট খুলে নড়েচড়ে নিজের বডি দেখাচ্ছে।

ছেলেটিকে উদ্দেশ্য করে মিনি বলল,বডি শো করে আমাকে ইমপ্রেস করতে চাইছেন…?ইচরে আপনার বডি একটুও সুন্দর নাই কেমন পেটের দিকে ঝুলে আছে,ইয়াক থু।

মিনির কথায় ছেলেটি রেগে বোম।হবে নাই বা কেন ওর কতো সুন্দর বডি আর এই মেয়ে বলে কিনা ইয়াক থু।

আসলে মিনি যা বলেছে সবটা ইচ্ছে করেই বলেছে।হয়তো ছেলেটার একটু সিক্সপ্যাক বডি আছে তাই বলে মিনিকে কেন দেখাবে……?

স্পর্শ এতক্ষণ সবকিছু খুব মনোযোগ সহকারে
পর্যবেক্ষণ করছিলো আর মিনির কান্ডে মিটিমিটি হাসছিলো।জ্যাম ছেড়ে দেওয়ায় স্পর্শ গাড়ি স্টার্ট দিলো। গাড়ি চলছে তার আপন গতিতে।মিনি ব্যাগ থেকে একটা চকলেট বের করে খেতে লাগলো। এগুলো কাল আদিল দিয়েছে।

মিনি আপন মনে চকলেট খাচ্ছে।স্পর্শ গাড়ি চালানোর ফাঁকে ফাঁকে মিনিকে দেখছে আর মনে মনে বলছে এই মেয়েটা নিজেকে যতটা ম্যাচিউর দেখাতে চায় তার ছিটে ফোঁটা ও ওর মধ্যে নেই সবটাই বাচ্চামি।

গাড়ি থেকে নেমেই মিনি তাহমিনা চৌধুরীকে জড়িয়ে ধরে মিষ্টি হেসে বলে,কেমন আছেন মা….?

তাহমিনা চৌধুরী ও মিনিকে দুহাতে আগলে বললেন, তোকে ছাড়া ভালো ছিলাম না এখন ভালো আছি।মিনি মাহিরার কথা জিজ্ঞেস করতেই তহমিনা চৌধুরী বলল ও ঘরেই আছে।

মিনি ভাবতে থাকে এই মেয়েটা দিনের বেশির ভাগ সময়ই ঘরে থাকে বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া নিচে আসে না। সারাদিন ঘরে করেটা কি ভাবতে ভাবতেই রুমের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

কাল থেকে স্পর্শকে অফিস যেতে হবে। এ কয়দিনের অনেক কাজ জমা হয়ে আছে। তাই সময় নষ্ট না করে শুয়ে পড়ে।মিনি ও ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে ঘুম ভাঙতেই স্পর্শ তার বুকে ভারি কিছু আবিষ্কার করে।
মাথাটা নিচু করে দেখতে পায় মিনি ওর বুকে গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। অবাক হয়না স্পর্শ কারণ একই ঘটনা কাল মিনিদের বাসায় ও ঘটেছে। স্পর্শ কিছু বলে নি চুপচাপ মিনিকে তার বালিশে শুইয়ে উঠে পড়েছে। আজও তার ব্যতিক্রম নয়।

মেয়েটা ঘুম থেকে উঠে এই অবস্থা দেখলে ঘুমের রেশ ধরেই স্পর্শকে উল্টোপাল্টা কিছু বলে দিবে।হয়তো সেই দিনের ধাক্কাটা পূনরায় রিপিট করবে ভেবেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্পর্শ। ও মেয়েটাকে ৩/৪ দিনে ভালোই চিনেছে।

স্পর্শ ওয়াশরুমে ঢোকার কিছুক্ষণ পরই মিনি উঠে পড়ে।স্পর্শ বেরুতেই মিনি ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।

সবাই ব্রেকফাস্ট করছে।স্পর্শ একেবারে সুট-বুট পরেই নিচে নেমে এলো।খেয়েই অফিসের জন্য
বেরিয়ে পড়বে।খাওয়ার এক পর্যায়ে মামুন চৌধুরী মিনিকে বলে উঠলো কাল থেকে কলেজ যাওয়ার জন্য।বই পত্র সব ড্রাইভারকে পাঠিয়ে নিয়ে আসতে।

কলেজ যাওয়ার কথা শুনে মিনিতো খুশিতে আত্মহারা।কি ভাবছেন পড়ালেখা করতে পারবে বলে খুশি…?উহু বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে পারবে বলে খুশি। যদিও মিনি এতটা খারাপ স্টুডেন্ট নয় আবার টপার ও নয় মাঝামাঝি সারির স্টুডেন্ট।মিনি এতোটাই খুশি যে খুশির চোটে গ্লাস ভেঙে ফেলে।গ্লাসের সব পানি ছিটকে স্পর্শের গায়ে পড়ে।

স্পর্শ রাগে কটমট চোখে তাকিয়ে আছে মিনির দিকে যেন এখানে কেউ না থাকলে মিনিকে চিবিয়ে খেতো।
ওদের কান্ড দেখে মা,বাবা, মাহিরা মিটিমিটি হাসছে।

চলব………

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে