তোকে চাই❤ (সিজন-২) part: 68

0
3101

তোকে চাই❤
……. (সিজন-২) part: 68
#writer: নৌশিন আহমেদ রোদেলা❤

?

সকাল আটটা কি নয়টা বাজে। কারো হাসাহাসির শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো আমার। জোর করে চোখদুটো খুলে পাশ ফিরে তাকালাম। রুম একদম ফাঁকা। আওয়াজটা ড্রয়িং রুম থেকে আসছে বুঝতে পেরে আবারও চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম আমি। কয়েক মিনিট পর ভারি মাথা নিয়ে উঠে বসে ওড়নাটা গায়ে পেচিঁয়ে চলে গেলাম নিচে। শুভ্র, মামু, মামানি,আপু, অভ্র ভাইয়া,দিদা সবাই মিলে হাসাহাসি করছেন। আমি সিঁড়ি বেয়ে নিচে গিয়ে দাঁড়াতেই সবাই ড্যাবড্যাব করে তাকালো। আমি খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে বললাম,

— এনি প্রবলেম? কি হয়েছে?

আমার কথায় মামানি এগিয়ে এলেন। গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,

— আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না রে রোদ। এই বছরটা খুব লাকি আমার জন্য। দু’ দুটো নাতি পেয়েছি। এখন আরো একজন আসছে। এতোদিনের ফাঁকা ঘরটা পুরো করে দিলি তোরা দুই বোন। সুখী হ মা।

দিদাও এগিয়ে এসে জড়িয়ে ধরলেন আমায়। কপালে চুমু দিয়ে বলে উঠলেন,

— ছোট নাতবউ? বড় নাতবউয়ের চেয়ে সবকিছুতেই তো তুই ডাবল। কথাতে, কান্নাতে,হাসিতে,দুষ্টামিতে তো অতিথির বেলায়ও ডাবলই হবে,তাই না? রানু? তুই বরং সবকিছু চার সেট করে কিনে রাখ বুঝলি?

দিদার কথায় আবারও হেসে উঠলো সবাই। আমি লজ্জা লাল মুখ নিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মামুও মুচকি হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। এমন সময় কোথা থেকে সাহেল ভাইয়া এসে শুভ্রকে হুট করেই জড়িয়ে ধরলেন। পিঠে কয়েকটি চড় থাপ্পড় দিয়ে দাঁত কেলিয়ে বললেন,

— বাহ দোস্ত! আজ না খুব শান্তি শান্তি লাগছে। কনগ্রাচুলেশন বস। আজ থেকে দুই বন্ধু মিলে দুঃখের গল্প করবো। ভাবতেই এক্সাইটমেন্ট কাজ করছে।

শুভ্র অবাক হয়ে বললেন,

— মানে? দুঃখের গল্প! কিসের দুঃখ।

সাহেল ভাইয়া হেসে বলে উঠলেন,

— কিসের দুঃখ সেটা তো আজ থেকেই জানতে পারবি। বউ কতো প্যারাময় হতে পারে তা এই দশমাসে বুঝে যাবি। আমি তো এই পাঁচমাসেই শেষ! জীবন বের করে ফেলছে বন্ধু।

নাবিলা আপু সাহেল ভাইয়ার পেছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। সাহেল ভাইয়ার কথায় ভ্রু কুঁচকে বলে উঠলেন,

— সাহেল? তুমি কি বলতে চাইছো? আমি তোমাকে জ্বালাই?

সাহেল ভাইয়া হাসলেন। নাবিলা আপুর দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন,

— আমি কি বলেছি তুমি জ্বালাও? এই শুভ্র? আমি এমন কিছু বলেছি? আমার বউয়ের মতো লক্ষ্মী বউ এই তৃভূবনে নেই বুঝলি? সে আমাকে একটুও জ্বালায় না। তার তো শুধু রাত দুটোয় আইসক্রিম,ফুসকা,চটপটি,কাবাব,চিপস, কুলফি ইত্যাদি ইত্যাদি খেতে হচ্ছে করে। রাত ৩/ ৪ টার সময় লুডু খেলতে ইচ্ছে করে। মাঝরাতে হুট করেই মরাকান্না করতে ইচ্ছে করে। মাংস রান্না করলে বমি করে ভাসিয়ে দিয়ে তার মাছ খেতে ইচ্ছে করে। মাছ রান্না করলে মাংস খেতে ইচ্ছে করে। মাঝরাতে ৫/৬ বার করে বেডশিট চেঞ্জ করতে ইচ্ছে করে। বাগানে গেলে ফুল চিবিয়ে খেতে ইচ্ছে করে। আর…

সাহেল ভাইয়ার কথায় মুখ চেপে হেসে উঠলো সবাই। নাবিলা আপু রাগী গলায় বললেন,

— সাহেল! এতো জ্বালায় তোমায়? বেশ, এখন থেকে কিচ্ছু বলবো না। হ্যাপি?

সাহেল ভাইয়া মুচকি হেসে নাবিলা আপুকে নিজের কাছে দাঁড় করিয়ে বলে উঠলেন,

— আরে রাগ করে না। মজা করছিলাম তো। আমার বউটা আসলেই অনেক লক্ষ্মী।

মামু,মামানি, দিদা হালকা হেসে আমাদের রেখে যার যার রুমের দিকে হাঁটা দিলেন। আমি শুভ্রর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই বলে উঠলেন উনি,

— বাট আই উইল ম্যানেজ সাহেল। তোর জন্য নতুন হলেও আমার জন্য নতুন না।

উনার কথায় তিনজনেই চোখ বড়বড় করে তাকালাম। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে একসাথেই বলে উঠলাম,

— মানে?

শুভ্র থতমত খেয়ে বলে উঠলেন,

— তোরা এভাবে তাকিয়ে আছিস কেন? আমি তো রোদের কথা বলছিলাম। ও তো সবসময়ই এমনসব কাজ করে এটা তো নতুন কিছু না, এটাই বুঝাতে চাইছিলাম।

আমরা তিনজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে একসাথেই বলে উঠলাম,

— ওওওওওও।

শুভ্র যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। একটু আধটু কথা বলে সবাই মিলে সোফায় গিয়ে বসতেই দৌঁড়ে এলো চিত্রা। ব্যাগটা সোফায় ছুঁড়ে মেরে আমাকে টেনে দাঁড় করিয়েই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। এক্সাইটমেন্টে গলা বন্ধ হয়ে আসছে তার। তবুও লাফাতে লাফাতে বলে উঠলো,

— আমি বলেছিলাম, তখন তো থাপ্পড় লাগাইলি। এখন মিললো তো? মাঝে মাঝে বাংলা সিনেমাও কাজে লাগে বুঝলি? এনিওয়ে, আই এম সো হ্যাপি জানু। আমার বেস্টুর বেবি হবে। উফফ, আমার তো নাচতে ইচ্ছে করছে। এই শোন? আমি বরং কাজ করি। বাচ্চাদের নাম ঠিক করে ফেলি। পাঁচটা ছেলের নাম আর পাঁচটা মেয়ের নাম। ছেলের নামগুলো “র” দিয়ে হবে আর মেয়ের নামগুলো “শ” দিয়ে হবে। দা…

চিত্রার এক্সাইটমেন্টের মাঝেই বিস্মিত কন্ঠে প্রশ্ন করলেন সাহেল ভাইয়া,

— পাঁচটা পাঁচটা কেন?

উনার কথায় রেশ ধরে আমিও বললাম,

— হ্যাঁ। পাঁচটা কেন?

চিত্রা সোফায় আরাম করে বসলো। তারপর স্বাভাবিক কন্ঠে বললো,

— কেনো? কাল রাতে শুভ্র ভাইয়াই তো ফোনে বললো। “দশটা বাচ্চার নাম ঠিক করো চিত্রা। পাঁচটা মেয়ে, পাঁচটা ছেলে। কেবল তো শুরু কয়েকদিন পর দেখবে ভাগ্নে ভাগ্নি কোলে নেওয়ার জন্য কোনো হাত অবশিষ্ট থাকছে না। কেউ গলায় ঝুলে আছে তো কেউ পিঠে। দারুন না? ”

সবাই একসাথে শুভ্রর দিকে তাকালো। শুভ্র সবার দিকেই একবার করে তাকিয়ে বলে উঠলো,

— হোয়াট?

কেউ কিছু বললো না। সাহেল ভাইয়া হাসি চেপে বলে উঠলেন,

— নাথিং! ১০ টা কনগ্রাচুলেশন ভাই। আগেই দিয়ে রাখলাম পরে যদি এতো এতো ভাস্তে ভাস্তির ভীরে তোকে খুঁজে না পাই।

শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। ছোট্ট করে বললেন,”দাঁড়া তুই…” এটুকু বলতেই অট্টহাসি দিয়ে দৌঁড় লাগালেন সাহেল ভাইয়া আর তার পিছু নিলেন শুভ্র। ওদের যাওয়ার দিকে কয়েকসেকেন্ড তাকিয়ে থেকেই আবারও বকবক শুরু করলো চিত্রা। বই থেকে প্রেগনেন্সির উপর পাঁচ-ছয়টা বই বের করে বিজ্ঞদের মতো লেকচার দিতে লাগলো। আমি আর নাবিলা আপু শুধু অবাক চোখে তাকিয়েই রইলাম।

?

আজ নাবিলা আপুর ডেলিভারি। সবাই হসপিটালে গিয়েছে। আমার পাশে মাধবী আর রাহেলাকে বসিয়ে দিয়ে দশ মিনিট আগে শুভ্রও বেরিয়েছেন হসপিটালের উদ্দেশ্যে। জানালার পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি আমি। চারদিকে শেষ বিকেলের নরম আলো। সূর্যটাও পশ্চিমের দিগন্ত ছুঁই ছুঁই করছে। আমি চোখ বন্ধ করে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেললাম। দেখতে দেখতে প্রেগনেন্সির পাঁচ পাঁচটি মাস কেটে গেলো। আমাদের জীবনের পাতা থেকে সময়গুলো কতো তাড়াতাড়িই না হারিয়ে যায়। এখন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই অবাক চোখে দেখতে থাকি আমি। কেমন অদ্ভুত দেখতে লাগে আমায়। বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় এই ছোট্ট পেটটাতে আস্ত একটি জীবন টিকে আছে। ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে! এই পাঁচ মাসে শুভ্রকে খুব একটা জ্বালায়নি আমি। কারণ প্রেগনেন্সি জনিত তেমন কোনো প্রবলেমই হয় নি আমার। বমি,মুড সুয়িং, খাবারে অরুচি খুব কমই হয়েছে আমার। শুধু একটা জিনিস বেশি বেশি হয়েছে তা হলো ঘুম। সারাদিন পড়ে পড়ে ঘুমোনোই প্রতিদিনের রুটিন হয়ে উঠেছে আমার। তেমন কোনো সমস্যা না হলেও অফিসের কাজ কমিয়ে দিয়েছেন শুভ্র। এখন চারটার মাঝেই বাসায় ফিরেন উনি। আদ্র-রোদ্রও বেশ বড় হয়ে গিয়েছে এখন। বসে থাকতে পারে, একজন আরেকজনকে ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে চড় থাপ্পড়ও মারতে পারে। আপু আর চিত্রা প্রায় সারাক্ষণই আমার আশেপাশে থাকে এখন। চিত্রা প্রতিদিন বিকেলেই বাসায় এসে হাজির হয়। আমায় নিয়ে হাটাহাটি করে। তার ধারনা এই হাঁটাহাঁটিটা খুবই প্রয়োজন আমার নয়তো দিনদিন ফার্মের মুরগীর মতো ফুলে যাবো। ফোনের টোন কানে আসতেই ঘোর কাটলো আমার। জানালার বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে বিছানায় পড়ে থাকা ফোনটির দিকে তাকালাম। মাধবী দৌঁড়ে এসে ফোনটা হাতে দিয়ে গেল আমার। আমি মুচকি হেসে ফোনটা রিসিভ করে কানে নিতেই ওপাশ থেকে আগ্রহী কন্ঠে বলে উঠলেন শুভ্র,

— নাবিলার ছেলে হয়েছে রোদপাখি। মাশাআল্লাহ, বেশ কিউট হয়েছে। যদিও সব ছোট বাচ্চাকে আমার কাছে এক রকমই দেখতে লাগে।

— আলহামদুলিল্লাহ! আপনি আমায় সাথে নিলেন না কেন, বলুন তো? সবাই তো দেখে নিলো বাবু আমিই শুধু রয়ে গেলাম। কোলেও নিতে পারলাম না।

— মন খারাপ করছো কেন? এখানে এসেই কি লাভ হতো? নাবিলার নর্মাল ডিলেভারি হয়েছে কয়েক ঘন্টা পর রিলিজ করে দিবে। আসলে শুধু শুধু জার্নি হতো আর টেনশন করতে। হসপিটালের বাতাসটাই অসুস্থ বুঝলে? হসপিটালে ঢুকলে সুস্থ মানুষেরও নিজেকে মহারোগী বলে বোধ হয়। না এসেই ভালো করেছো, বুঝলে?

— হয়েছে। ফাউল লজিক দিতে হবে না। পিচ্চির কয়েকটা ছবি পাঠান আমি দেখবো। আর হ্যাঁ, বাসায় ফিরেই বাবু দেখতে নিয়ে যাবেন আমায়, প্রমিজ?

শুভ্র হাসলেন। হাসিমুখেই বললেন,

— ওকে প্রমিজ। বাট কাল সকালে। এই অবস্থায় রাতে তোমায় নিয়ে বের হচ্ছি না আমি।

— কিন্তু….

— নো আর্গিউমেন্ট। সকালে মানে সকালে। এখন বাই, রেস্ট নাও।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছুক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থেকেই ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে মারলাম। দিন যত বাড়ছে হুটহাট রাগটা ততই যেন বেড়ে যাচ্ছে আমার। চুলগুলো দু’হাতে হাতখোপা করে ধীর পায়ে বিছানায় গিয়ে বসলাম আমি। পা দুটো বেশ ব্যাথা করছে আমার। এ এক নতুন উপসর্গ দেখা দিয়েছে আমার। সন্ধ্যা হতেই দু পায়ে অসম্ভব রকম ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। এটা কি প্রেগনেন্সির কারণেই হয়? কে জানে! কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই মাধুবী-রাহেলা কে রুম থেকে চলে যেতে বলে শুয়ে পড়লাম আমি। কিছুক্ষণ পরই ঘুম ছুঁটে গেলো আমার। ঘুমের মাঝেও কারো গভীর দুটো চোখ তাড়া করছিলো আমার। চোখ মেলে তাকাতেই শুভ্রকে চোখে পড়লো। আমাকে তাকাতে দেখে মুচকি হেসে বললেন,

— শরীর কেমন?

আমি দুর্বল হাসি দিয়ে বললাম,

— পা ব্যাথা করছে।

উনি কপাল কুঁচকে তাকালেন। তারপর কি ভেবে বললেন,

— দাও, আমি টিপে দিচ্ছি।

কথাটা শুনেই লাফিয়ে উঠলাম আমি। উনি অবাক কন্ঠে বলে উঠলেন,

— কি হলো?

—পায়ে হাত দিবেন না। দূরে বসুন।

উনি আরো কয়েকগুণ বিস্ময় নিয়ে বলে উঠলেন,

— কেনো?

— আমার ভালো লাগে না তাই। প্লিজ পায়ে হাত দিবেন না। আমার অস্বস্তি লাগে।

— জাস্ট শাট আপ রোদু।

— আ আমার মাথা ব্যাথা করছে। পা ব্যাথা করছে না। আপনি আমার মাথাটা টিপে দিন তো। আহ! কি মাথা ব্যাথা।

শুভ্র ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। আমি আড়চোখে তাকাতেই হেসে উঠলেন উনি। আমি চুপচাপ তাকিয়ে আছি। উনার আকাঁবাঁকা দাঁতের টুল পড়া হাসি। ইশ! কি সুন্দর করে হাসেন উনি। উনার হাসিটা দেখলেই বুকে মোচড় দিয়ে উঠে। মনে হয়, এই বুঝি শেষ হলো দিন। ফুরিয়ে এলো বেলা! কেমন একটা অদ্ভুত চিনচিনে ব্যাথা সারা বুকজুড়ে….

#চলবে….

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে