ডুমুরের ফুল ৩০.

0
1815
ডুমুরের ফুল ৩০. ঢাবির ক ইউনিটের এক্সামের জন্য হেমলতাকে ঢাকায় আসতে হলো। দূর সম্পর্কের এক মামার বাসায় থাকতে হলো হেমকে। জয়নাব অসুস্থ আর মনোজের অফিসে প্রচুর কাজ তাই দুজনের একজনও হেমের সাথে আসতে পারেনি। হেম আর মিম্মা একসাথেই ঢাকায় এসেছে। মিম্মা তার বড় চাচার বাসায় উঠেছে। প্রায় ৩ মাস পরে হেমকে দেখবে এই আনন্দে জাদিদের রাতের ঘুম হারাম। তাদের কোচিং-এ ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে অনেকেই জিএফ নিয়ে গল্প করে। ছেলেরা এসব ব্যাপারে বেশ খোলামেলা ভাবে আলোচনা করতে পছন্দ করে। কে কীভাবে জিএফকে প্রথম চুমু দিয়েছে থেকে শুরু করে ফার্স্ট ডেট কোথায় গেছে, কী কী করেছিলো, রাতে কীসব কথা বলে সব শেয়ার করে। জাদিদের পালা আসলে কেউই বিশ্বাস করতে চায়না তাদের মাঝে কথাবার্তা খুবই নরমাল ধরনের হয়। রাফিন তো একবার বলেই বসলো – শালা তুমি চাপাবাজী করে নিজেকে সাধু বানাও? চেহারা তোমার ভদ্র হলেও ভেতরে তুমি একটা লুচু। জাদিদ কী বলবে ভেবে পাচ্ছিলো না। ওতো সত্যিই বলেছে। হেমকে সে প্রথমদিন কয়েকটা চুমু দিয়েছিলো আর জড়িয়ে ধরেছিলো। এ বাদে তো তাদের মাঝে আর তেমন কিছুই হয়নি। তার মাথায়ও আসেনা ওসব। তার শুধু একটা মানুষ চাই। যার কাছে সারাদিনের ক্লান্তি দূর করা যায়। হেম সেরকমই একজন। আর হেমকে সে কী নোংরা কথা বলবে? সে ঝাড়ি খেয়ে চুপ থাকলেও ওসব কথায় চুপ থাকবেনা। শেষ মেষ একেও হারিয়ে ফেলবে সে। রাফিনকে সে আর কিছুই বলেনি। যে বিশ্বাস করার করবে আর যে না করার করবেনা।
ঢাবির এক্সাম হলে হেমলতা আর মিম্মা একসাথেই এলো। জাদিদের সিট পড়েছে আইটি ভবনে আর ওদের বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে। হেমলতা বলেছিলো, এক্সাম হলে যাওয়ার আগে অন্ততপক্ষে একবার জাদিদকে দেখবে। কিন্তু জাদিদ রাজি হয়নি। এতোদিন পরে হেমকে দেখলে তার মন থেকে এক্সামের যে প্রেশার ছিলো সেটা কেটে যাবে। জাদিদের অনেক অনেক কথা বলার আছে সেসব তখনই বলতে ইচ্ছা করবে। এক্সাম হলে যাওয়ার ইচ্ছাটাই মরে যাবে। সবার সাথেই মা, বাবা অথবা অন্য কোনো আত্মীয় এসেছে। মিম্মার মা আসতে পারেননি কিন্তু চাচী এসেছেন। হেমলতার মন খারাপ হয়ে গেলো। বাবা কি একটুও সময় বের করতে পারেনি? একটা বার ফোনও করেনি। প্রিপারেশন কেমন বা টেনশন না করতে বা খোঁজ নিতেও ভুলে গেছে। আর নানী তো একদমই পছন্দ করছেনা তার এডমিশন টেস্টের বিষয়টা। চান্স না হলে কতো কথা যে ইনিয়ে বিনিয়ে শুনাবে তার হিসেব নেই। লাঈলী বানু তো আছেনই ফোড়ন কাটার জন্য। আজ তার মা থাকলে এসব কথা শুনতে হতোনা। জাদিদ হাতের রেডিয়াম ঘড়িতে সময় দেখলো ৯ টা ৫ বাজে। হাতে এখনো ২৫ মিনিট আছে। ফিজিক্সের কিছু সূত্র গতকাল রাতে রিভিশন দিতে ভুলে গেছে। তার কেনো যেন মনে হচ্ছে প্রিপারেশন নেয়ার জন্য আর একটা সপ্তাহ যদি বেশি পেতো! ফিজিক্সের সূত্রের খাতাটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো। হামজা পাশ থেকে বললো – দোস্ত তোর হয়ে যাবে শুধু শুধু টেনশন নিচ্ছিস। আর একটু কম পড় ভাই। এতো পড়লে সব গোলাবে। জাদিদ খাতা থেকে চোখ না সরিয়ে বললো – তুই চুপ থাক ব্যাটা। – হাবিব স্যার তোকে ফোন করতে বলেছে। – এক্সাম শেষ করে ফোন দিবানি। এখন ওসবের সময় নেই। – আরে স্যারের কাছে দোয়া চাইবিনা? – রাতে কথা হয়েছে সব স্যারের সাথে। সুকান্ত স্যার তো সেই ঝাড়ি দিলো। – কী বললো তোকে? – আমি সালাম দিয়ে পরিচয় দিলাম। স্যার বললো, কী খবর? আমি বললাম, স্যার আগামীকাল ঢাবির ক ইউনিটের এক্সাম। দোয়া কইরেন। স্যার ঝাড়ি দিয়ে বললো, না পইড়া দোয়া চাইলে হইবোটা কী? এক্সাম হলে কি ওহী নাজিল হবে? আমি আমতা আমতা করে বললাম, স্যার পড়ছি অনেক। তাইলে আর দোয়া চাওয়া লাগবেনা। যারা পড়ে তাদের জন্য স্যারদের মন থেকে দোয়া একাই চইলা আসে। এখন যাইয়া পড়তে বয়। – তোকেই এতো বড় লেকচার দিলো। আমি ফোন দিলে কী করতো? দীর্ঘ এক ঘণ্টার লেকচার শোনাতো। এক্সাম হল থেকে বের হয়ে হেমলতা মিম্মাকে খুঁজতে লাগলো। সে বলেছিলো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে কিন্তু মিম্মার কোনো নাম গন্ধই নেই। ও কি রেখে চলে গেলো? ঢাকার কিছুই চেনে না সে কীভাবে বাসায় ফিরবে? মোবাইলটাও বাহিরে এক আংকেলের কাছে রেখেছিলো তাকেও খুঁজে পাচ্ছেনা হেমলতা। অনেক কষ্টে একটা মোবাইল তার কপালে জুটেছিলো। সেটাও কি হারাবে সে? পাগলের মতো হেমলতা পুরো ফ্যাকাল্টির এরিয়া টা খুঁজে দেখলো। প্রায় আধা ঘণ্টা হয়ে গেছে চেনা কাউকেই দেখতে পেলো না। খুঁজতে খুঁজতে একসময় হেম খেয়াল করলো অনেকটা দূরে সে চলে এসেছে। আশেপাশে কোনো মেয়ে নেই। বেশিরভাগ ছেলে সিগারেট টানছে মনের সুখে। এক হাতে ফাইল আরেক হাতে সিগারেট। হেমলতার হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে। তরতর করে ঘামতে শুরু করেছে। কী করবে বুঝতে পারছেনা। পা নাড়াতে পারছেনা। ছেলেগুলো ওর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলছে। আজকে কি ওর সাথে খারাপ কিছু হবে??? তাকে কি তনুর মতো রেপ করে ফেলে রাখবে? ভাবতেই হেমলতার গলা শুকিয়ে গেলো। চোখে অন্ধকার দেখছে হেম। হঠাৎ মনে হলো কেউ একজন তার ডান হাত ধরে হ্যাচকা টান দিয়ে জড়িয়ে ধরলো। চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল গড়িয়ে পড়লো গালে। চেনা কারো বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে হেমলতা স্থির হবার চেষ্টা করলো। হেমলতাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে জাদিদ নরম ভাবে বলার চেষ্টা করলো – একটু ধীর স্থির হলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যায় হেম? যদিও জাদিদ নরম ভাবে বলার চেষ্টা করেছিলো কিন্তু হলো উল্টোটা। জাদিদ, মিম্মা, হামজা মিলে পাগলের মতো ওকে খুঁজছে। জাদিদের অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে গেছিলো। এতো দিন পরে দেখা হবার কথা আর যদি খারাপ কিছু ঘটে যায়। তখন? হেমলতার মনে হলো কেউ একজন তার কথা গুলোকে গলার কাছে আটকে ধরেছে। সে হাসফাস করতে লাগলো জাদিদকে কিছু বলার জন্য। জাদিদের বুকে মুখ লুকিয়ে পড়ে রইলো হেম। উত্তেজিত স্নায়ু ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে লাগলো। চলবে….. ” লেখিকা মারিয়া কবির এর সকল লেখা দ্রুত পেতে অবশ্যই এ্যাড হোন তার ফেসবুক পেইজ ‘Maria Kabir -মারিয়া কবির’(এখানে পেইজ লিংক) এর সাথে। ~ Maria Kabir

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে