ডুমুরের ফুল ২৬.

0
1285

ডুমুরের ফুল ২৬.

শূন্যতার আলাদা একটা অর্থ আছে। সেই অর্থ জানার জন্য শূন্যতাকে নিজের মধ্যে ধারণ করতে হয়। যদিও প্রসেসটা বেশ কঠিন। মনোজ সাহেব কিছুক্ষণ ভেবে পা বাড়ালেন বাড়ির দিকে। ছোটো মেয়েটা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে, বাবা আসবে। মেয়েটার জন্য তাকে বাড়ি ফিরতে হবে।
চার দিন কেটে গেলো জাদিদের সাথে হেমলতার কথা হয়না। প্রথম দু’দিন খুব অস্থিরতায় কেটেছে। তৃতীয় দিন থেকে কিছুটা কম খারাপ লাগছে। ধীরে ধীরে খারাপ লাগাটা আর কাজ করবেনা। ভালোই হয়েছে হয়তোবা একদিক থেকে।
শাম্মীর সাথে আজকাল তার ভালো সখ্যতা গড়ে উঠেছে। মেয়েটাকে প্রথমে তার খারাপ মনে হয়েছিল কিন্তু যতোই ক্লোজ হচ্ছে ততোই মেয়েটা সম্পর্কে তার ধারণা বদলে যাচ্ছে। দূর থেকে কখনো কোনো মানুষকে বিচার করা ঠিক না।

বিকেলে জাদিদ ঘুম থেকে উঠে চায়ের জন্য পানি চুলোয় দিবে তখন শাম্মীর ফোন আসলো।
– বলো শাম্মী
– ফ্রী আছো নাকি?
– ফ্রী আছি বলো।
– চলো ধানমণ্ডি লেকে ঘুরে আসা যাক। গল্পও করা হবে আর সাথে ফুসকা খাওয়াও হবে।
– প্ল্যানটা খারাপ না। আমি কি তোমাকে তোমার বাসা থেকে নিয়ে যাবো নাকি তুমি একাই পারবে?
শাম্মী কিছু একটা ভেবে বললো
– আমি একাই পৌঁছে যাবো তবে তুমি আসলে মন্দ হয়না।
জাদিদ হেসে বললো
– সরাসরি বললেই পারো যে, জাদিদ আমাকে নিয়ে যাও।
– এটুকু বুঝে নিতে হয়।
– সায়েন্স নেয়ার পর থেকে তো বুঝেই যাচ্ছি আর কতো বুঝবো বলো?
– এখন থেকে আমাকে বুঝবে, বুঝেছো?
– তা নাহয় বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে বুঝে আমার কী লাভ?
– কেনো আমাকে পা…..
শাম্মীর মুখে শেষ শব্দটা আটকে গেলো। জাদিদ শেষ শব্দটা শোনার জন্য জিজ্ঞেস করলো
– কী বললে? আবার বলো তো?
– জাদিদ লেট হচ্ছে।
– একটা শব্দ বলতে ম্যাক্সিমাম ১০ সেকেন্ড লাগবে। এইটুকু সময়ের জন্য লেট হবার কথা না।
– হবে অনেক লেট হবে।
শাম্মী ফোন কেটে দিলো। জাদিদ তাকে প্রশ্ন করে করে ত্যক্তবিরক্ত করে উত্তর ঠিকই বের করে নিবে। এরচেয়ে ফোন কেটে দেয়াই বেটার সলিউশন।

হেমলতার সাথে দেখা করতে মিম্মা এসেছিলো জাদিদের সাথে কথা বলার পরের দিনই। কিন্তু লাঈলি বানু দুজনের সাথে একদম আঠার মতো লেগেছিল। মিম্মা কোনোভাবেই জাদিদের কথা তুলতে পারেনি।
মিম্মা ব্যর্থ হয়ে শেষ মেষ চলে গেলো। মিসেস জয়নাব মিম্মাকে দেখেও না দেখার ভান করে রুমে শুয়ে রইলেন।
হেমলতার ঘুম হয়না ঠিকঠাক। রাতে বারবার ঘুম ভাঙে। দিনেও ঘুমাতে পারেনা। নানীর মোবাইল নেয়ার অনেক চেষ্টা করেছে কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থ।
কাঁদতে কাঁদতে চোখও তার এখন বিরক্ত। চার চারটা দিন সে কীভাবে যে পাড় করেছে একমাত্র সেই জানে।
মিসেস জয়নাব বিছানায় আধশোয়া হয়ে খবরের কাগজ পড়ছিলেন।
হেমলতা অনেক সাহস নিয়ে নানীর সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।
মিসেস জয়নাব খবরের কাগজ থেকে চোখ না সড়িয়ে বললেন
– কোনো প্রয়োজন?
– হ্যাঁ
– বলে ফেলো।
– আমার মোবাইলটা নষ্ট হয়ে গেছে।
– শুনেছি।
– নতুন একটা যদি কিনে…..
– আপাতত কোনো মোবাইল তোমার দরকার নেই।
– সময় কাটতে চায়না।
– ঘরে অনেক গল্পের বই আছে। সেগুলো পড়তে পারো। টিভি দেখতে পারো। আর পুরাতন গুলো যদি পড়তে ইচ্ছা না হয় তাহলে আমি নতুন বই কিনে এনে দিবো।
– তারপরও মোবাইলটা যদি…
জয়নাব ধমকে উঠে বললেন
– আমি যা বলেছি সেটাই হবে। বুঝতে পারছো কী বলেছি?
হেমলতা ধীর পায়ে নানীর রুম থেকে বের হয়ে গেলো। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। জাদিদের সাথে হয়তোবা আর কোনোদিন কথা হবেনা তার।

– মামা একটাতে ঝাল বেশি দিবেন আরেকটাতে ঝাল দিবেন না।
জাদিদ দুষ্ট হাসি দিয়ে বললো
– তুমি ঝাল খেতে পারোনা? ন্যাকা মেয়ে!
শাম্মী জাদিদকে চিমটি দিয়ে বললো
– আমার জন্যই ঝাল বেশি দিতে বলেছি আর তোমার জন্য ঝাল ছাড়া।
– আমিও অনেক ঝাল খেতে পারি। মামাকে বলো আমারটাতেও ঝাল দিতে।
– সত্যি পারবে তো? দেখা যাবে ঝাল খেয়ে তোমার চোখ মুখ লাল হয়ে যাবে। তখন তোমাকে লাল টমেটোর মতো লাগবে দেখতে।
কথাটা বলেই শাম্মী হাসতে শুরু করলো। জাদিদ হা করে মুগ্ধ চোখে শাম্মীর হাসি দেখছে। মেয়েটার হাসি অসহ্য রকমের সুন্দর।
লেক পাড়ে বসে গল্প করতে করতে কখন যে সন্ধ্যা পার হয়ে রাত নেমে এসেছে জাদিদ খেয়াল করেনি।
শাম্মী হাত ঘড়ি দেখে বললো
– আমাদের এখন ওঠা উচিৎ।
– আর একটু বসে যাই?
– কাল কোচিং আছে। তোমার সব পড়া শেষ?
জাদিদের টনক নড়লো।
– না, ফিজিক্সের কয়েকটা ম্যাথ এখনো সলভ করা হয়নি।
– সেগুলো তাহলে কে করবে?
– আমাকেই করতে হবে।
শাম্মীকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে জাদিদ রাতে খাবার জন্য এক প্যাকেট বিরিয়ানি, কোকাকোলা নিয়ে বাসায় ফিরলো।
শাম্মীকে বাসায় ঢুকতে দেখে নাসিমা বললেন
– এতো তাড়াতাড়ি আসা হলো আজ?
শাম্মী কোনো উত্তর না দিয়েই তার বেডরুমে ঢুকে গেলো। বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, অপদার্থ মহিলা। শুধু জানে ব্যঙ্গ করে কথা বলতে।
নাসিমা তার স্বামীকে ফোন দিয়ে জানালো, মেয়ে রাত করে বাড়ি ফিরেছে।
তার স্বামী নিরলস কণ্ঠে বললেন
– তাও তো ফিরেছে। এটাই অনেক না?

চলবে…..

~ Maria Kabir

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here