“জ্যোৎস্নার ছল” পর্ব ৬

0
689

“জ্যোৎস্নার ছল” পর্ব ৬.

রঙধনুর কথা শুনে আসমা ভাবি বিস্মিত কম হননি। আচমকা আমাকে তিনি এমন একটি প্রশ্ন করলেন, যার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
‘আমারে তুমি পড়াইবা?’
‘আমি? পড়া.. ওখানে আমরা পড়াতাম না।’
‘হের লাইগা না। আমি এমনিই তোমার কাছে পড়তে চাই। বাপজান ক্লাস এইটের পর আর পড়ায় নাই। তবে পড়ার শখ ছিল।’
‘ঠিক আছে।’
‘তবে আমার একখান কথা আছে। তুমি আমারে আর আপনি আপনি কইবা না। মাস্টররা হইচ্ছে বড়। তুমি আমারে তোমার ছাত্র ভাইব্বা।’
‘ছাত্রী। তুমি ছাত্রী হবে।’
আমি মুচকি হাসলাম। রুবী ভাবি নিঃসন্তান হলেও, আসমা ভাবির চার বছরের একটি মেয়ে সন্তান আছে। সকাল থেকে সময়টা তার সাথে কীভাবে কেটে যাচ্ছে খেয়ালই নেই। তুষার দুপুরে বাসায় খাবার খায় না। তাদের দোকানের কাছাকাছি একটি ভাতঘর আছে। ওখানে সে সবসময় যায়। বিকেলে সে তার কথামতো তাড়াতাড়িই ফিরে এলো।
আমি চুল আছড়ানোর সময় সে বলল, ‘খোলা রেখ না। বেণি করো।’
‘বেণি?’
‘নদীর পাড়ে গিয়ে খুলে ফেলতে পারো।’
‘আমি বেণি করলে ঠিক হবে না।’
‘আমি করে দিচ্ছি।’
আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। সে বেণি করে দিলো। এরপর আমাকে সে যেতে যেতে বাড়ির কয়েকটি মহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। আমরা কিছুক্ষণ পর নদীর তীরে পৌঁছলাম।
নদীর পানি ছুঁয়ে আসা মন জোড়ানো বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল। আমি মুহূর্তের জন্য আমার জীবনের সব ধরনের বিভীষিকার কথা ভুলে গেলাম। ভুলে গেলাম আমি একা নই। তুষারের কর্কশ গলার আওয়াজে আমার হুঁশ হলো।
সে বলল, ‘আমি আর শরীফ এখানে প্রায় আসি। আর ওই গাছটির উপর বসে থাকি।’
‘কেন?’
‘শরীফের কথায়। সে এখানে উঠে ডাক্তারের চেম্বারের জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে। কী জন্য জানি না। অনেকবার জিজ্ঞেস করেছি। বলেনি।’
‘চলুন। গিয়ে দেখে আসি।’
‘ধুর ছাই। বাদ দাও। শরীফের মাথার ঠিক নেই। আর চেম্বারে আমি কখনও যাইনি।’
‘চলুন না। ভেতরটা এমনিই একটু দেখে আসি।’
চেম্বারটি খুব পুরনো দু’ঘরের পাকা বাড়ির মতো। ডাক্তার আজ আসেনি। তবে তার দুই সহকর্মী আছে। এক মহিলার সাথে আমার পরিচয় হলো। তাঁর নাম নির্মলা সেন। মাঝে মাঝে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ওষুধ-টিকা দিয়ে আসেন। আমি তার কাছে ডাক্তারের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। নির্মলা সেন বললেন, তিনি একজন মেয়ে ডাক্তার। কমবয়সী, খুব সুন্দর। তুষারের দিকে তাকিয়ে বললেন, কিছু বদ ছেলের কারণে এখানে প্রতিদিন আসেন না।
আমি আর তুষার নীরবে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম। তারপর একে অপরের দিকে চেয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লাম।
‘শরীফফারে আমি আজ ধরব। শালা নিজে উঁকিঝুঁকি মারে। আমাকেও এতে শামিল করেছে।’
‘তাহলে আপনার কখনও মেয়েদের দিকে তাকানোর ইচ্ছে হয়নি?’
‘মেয়ে মানে কী? আমরা ছেলেরাও যেমন মানুষ, তারাও তেমন মানুষের কাতারে পড়ে।’
এইজন্যই বুঝি তার ভাব-ভঙ্গি দেখে লাগে না, আমাকে আদৌ স্ত্রী ভাবে। এতে অবশ্য আমার ভালোই লাগল।
‘শরীফ ভাইকে এসব করতে নিষেধ করবেন। আসমা ভাবি জানলে কেঁদেকেটে তোলপাড় করবেন।’
‘তুমি দেখি একদিনেই তাকে চেনে ফেলেছ।’
‘তিনি সহজ-সরল একজন মানুষ।’
‘সারাজীবন সাথে থাকলেও আমার মনে হয়, একটা মানুষকে চেনা হয়ে উঠে না। যে আসমার কথা তুমি বলছ, সেই আসমাই দুই-তিনবার লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। সবাই বলে প্রেমিকের সাথে পালিয়েছে। বাকিটা শরীফই জানে। দু’জনের মাঝেই সীমাবদ্ধ এই কথা।’
‘আমি চলে যাব। আমার আর ভালো লাগছে না।’
‘কোনো সমস্যা হয়েছে কি?’
‘না।’
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

আমরা নীরবে বাসায় ফিরে এলাম। আমার কেন যেন মন ভালো নেই। তুষার কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, ‘কারও কথা মনে পড়ছে?’
‘ছোট মায়ের একটি মেয়ে আছে, সালমা। সে উদ্ভট অনেক প্রশ্ন করে।’
‘ঠিক আছে, আমিও একটি করি। আমাদের দুটো চোখ, দুটো ভ্রূ, দুটো ঠোঁট আছে। নাক কেন দুটো নেই?’
আমি হেসে বললাম, ‘এই ধরনের প্রশ্ন না। ওর প্রশ্নে লজিকও থাকে।’
‘আচ্ছা বলো, একটি মানুষ খালি পায়ে সামনের দিকে পাঁচ কদম হাঁটল। ওইভাবে পেছন দিকে পাঁচ কদম হাঁটল। তার কোনদিকে কষ্ট বেশি হবে?’
‘পেছন দিকেই। সামনের দিকে সে তাকিয়ে হাঁটতে পারছে। কিন্তু পেছন দিকে তেমন একটা তাকানো যায় না। কাঁটা ফোটার সম্ভাবনা থাকে। সহজ ছিল। তাছাড়া সালমার প্রশ্নগুলোর উত্তর সবাই দিতে পারে না। যেমন একবার সে জিজ্ঞেস করেছিল, চকলেটের প্যাকেটের দুইপাশে টুইস্ট কেন করা হয়? প্যাকেটের মাঝখানে চকলেট রেখে উপরে একবার টুইস্ট করলেই পারে।’
‘সাংঘাতিক। আজ তোমায় নদীর আশপাশ ভালো করে দেখাতে পারলাম না। অন্য কোনো সময় তোমায় নিয়ে যাব কেমন?’
সে নিত্য দৈনন্দিন কাজগুলো করে যেতে লাগল। আমি আবারও ডুবে পড়লাম আমার অতীতে। সেদিন আমার ভালো লাগছিল না।
বাসায় এক নতুন সদস্য আসবে। শাহনাজ আপা, ছোট মায়ের বিধবা বোনঝি। বাবার বিয়ের পর ছোট মায়ের সাথে যেবার তার বাপের বাড়ি গেলাম, সেবার তার সাথে দেখা হয়। তার জ্যোতির্ময় মুখটা এখনও আমার মনে আছে। কিন্তু তাকে আমার খুবই বিরক্তিকর লাগে। সবসময় উপদেশ আর নানা কাজে বাধা দিয়ে বেড়ান।
বর্তমানে যারা আছে তাদের উপর আমি কম অতিষ্ঠ নই। তার উপর আরেকজন! ছোট মায়ের আপন মেয়ে সালমা সবসময় উদ্ভট প্রশ্ন করে জ্বালায়। এই যেমন, একটু আগে জিজ্ঞেস করেছে, ডিমের কুসুম আর সাদা অংশ দুটোই তো নরম। তবে তারা মিশে না কেন? আমি একরাশ বিরক্তি নিয়ে ভাইয়ার ব্যাখ্যায় কান না দিয়ে খেতে লাগলাম।
আমি বললাম, ‘আমার মনে হয়, দুটোরই মিশে থাকা উচিত ছিল। সবদিকে তো দুটো অংশের মিশ্রণ লাগে।’
ভাইয়া বিরোধ করল, ‘না। ঠিকই আছে। এটা বৈচিত্র্যময় এক সৃষ্টি। সাদার মাঝে হলুদের অবস্থান। তাছাড়া ডিম ভেঙে তেলে ছেড়ে দিলে ডিমের যে সৌন্দর্যটা প্রকাশ পায়, তা গোলানো অবস্থায় থাকলে হতো না।’
সালমা বলল, ‘দু’জনের কথা ঠিক। আমার লাগছে, ডিমের মিশ্রণ প্রয়োজন হলে ডিমকে ভাঙার আগে শেক করে নিতে হবে। এতে গুলে যাবে। যদি গোলানো ডিমের প্রয়োজন না হয়, তবে ডিম যেভাবে আছে সেভাবেই ব্যবহার করা উচিত।’
সালমা ডিম নিয়ে আরও কিছুক্ষণ বকবক করল। এরপর আছে ছোট মা। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমাকে সবসময় মতি টাওয়ারে কেন দেখা যায়? কোচিং ছাড়া তোমার ওখানে কাজ কী?’
‘আপনি কি আমার আশেপাশে সিক্রেট কোনো বডিগার্ড লাগিয়ে রেখেছেন?’
‘এ কেমন কথা?’ বাবা বললেন, ‘এখানে ওর পরিচিত অনেকেই আছে। হয়তোবা তারা দেখেছে এইজন্য বলেছে।’
‘আমার তো লাগছে আপনার মেয়ে কিছু একটা করছে।’ ছোট মা বললেন, ‘নইলে আমি এই ধরনের কথা কেন শুনব?’
‘কী বলছ? অনু, তুমি কেন যাও ওখানে? উল্টাপাল্টা কিছু করছ না তো?’
‘বাবা, আমি বাসায় বলে যাই না, তার মানে এই না যে আমি উল্টাপাল্টা কিছু করছি। আপনি ভাবতেও কীভাবে পারলেন?’
ছোট মা তাঁকে বললেন, ‘দেখেছেন, আমার মুখের উপর তো কথা বলেই, আপনার উপরও বলতে শুরু করেছে। এরকম অশৃঙ্খল মেয়ে আমি আর কখনও দেখিনি।’

‘এখানে অশৃঙ্খল হওয়ার মতো কিছু বলিনি। আমি উনার মেয়ে হিসেবে আমাকে তাঁর বিশ্বাস করার কথা। তা না করে তিনি আপনার কথায় আমাকে বিচার করে বসলে তা বলতেও পারব না?’ বাবা ধমকে উঠতে চাইলেন, তার আগেই আমি বলে উঠলাম, ‘বাই দ্যা ওয়ে, আমি “যুগ খারাপ হয়েছে”, “ওল্টাপাল্টা” এই টাইপের কিছু করছি না। স্বপ্নার সাথে একটি সংঘ চালাই। তাতে সময় দিই। আপনারা চাইলে ফরহাদ ভাইয়ার কাছে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তিনিও ওখানের একজন মেম্বার।’ বাবাকে অজান্তে রাগের বশেই বলে দিলাম, ‘আর হ্যাঁ, আপনার মেয়ে অন্তত আপনার মতো নয়।’
এতটুকু তো অবশ্যই জানি, বাবা এখন থেকে আমার সাথে কয়েকদিন কথা বলবেন না। আমি তাঁকে ইচ্ছাকৃত ভাবে কথাটি বলিনি। কিন্তু আসলেই আমি তার মতো নই। তিনি যেভাবে মাকে ভুলে গিয়ে নিশ্চিন্তে নতুন সংসার করছেন, সেভাবে আমি কখনও করতে পারতাম না। যদিও মা আর তিনি ছিলেন একে অন্যের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা, তবু তাদের দীর্ঘ আঠারো বছরের সংসার কি কোনো গুরুত্ব বহন করে না? বাবার কি কখনও মন বলে উঠে না, এই দিক থেকে আরমিনের নীলুর মতো হওয়া উচিত ছিল অথবা এই কাজটি নীলুই ভালোভাবে করতে পারত? আমি বাবার মতো এমন নিষ্ঠুর আর বেপরোয়া নই।
(চলবে…)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here