“জ্যোৎস্নার ছল”পর্ব ৪.

0
1372

“জ্যোৎস্নার ছল”পর্ব ৪.

তুষার সন্ধ্যায় ফিরে এলো। চা আমি বানিয়েছি। সে কিছু বলেনি। তেতো চা সে চুপচাপ খেয়েছে। একটি বড় বালতি কিছুক্ষণ পর এক লোক নিয়ে এলো। তুষার বলল, ‘ও শরীফ। আমার বন্ধু।’
‘আসসালামু আলাইকুম ভাবি। ভালা আছেন তো?’
‘জ্বি। আপনি ভালো তো?’
‘আল্লায় রাখছে। তা কোনো অসুবিধে অইলে শরীফরে কইয়েন। যাই ভাবি। যাই কাসু।’
তিনি যাওয়ার পর বললাম, ‘কাসু অর্থ কী?’
সে হেসে বলল, ‘তুষার নামটা ওর ভালো লাগে না। এইজন্য কাসেদ দিয়েছে। মাঝে মাঝে কাসু বলে।’
‘তিনি কি নিজেকে এভাবেই শরীফ বলেন?’
‘হুম। অদ্ভুত তাই না?’
আমার অবসর পড়ে থাকলেও তার ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। সে বালতিটি পুরিয়ে এনে বাথরুমে রাখল। এরপর বামপাশের ঘরটিতে একটি দা নিয়ে তক্তা সাইজ করতে লেগে পড়েছে। দূরে কোথাও শঙ্খ বাজছে।
‘শুনুন এখানে কি কোনো হিন্দু বাড়ি আছে?’ সে না শোনায় আরেকটু জোরে বললাম।
‘হ্যাঁ, নদীর পাড়ে।’
‘এখানে নদী আছে?’
‘তোমাকে কী বলেছিলাম? এখানে কয়েকটি সুন্দর জায়গা আছে। তার মধ্যে নদীটাও একটা।’
‘আমাকে ওখানে নিয়ে যাবেন?’
‘ঠিক আছে। আমি কাল বিকেলে তাড়াতাড়ি ফিরে এসে তোমায় নিয়ে যাব।’
‘কোথায় যাবেন?’
‘কাজে।’
কোন কাজে যাবে আমার তা জানতে ইচ্ছে হলো না। তবু সে বলল।
‘তোমার ছোট মা কি বলেনি? আমি ফার্নিচারের দোকানে কাজ করি। ফার্নিচার বানাই।’
‘ভালোই তো।’
সে তক্তা সাইজ করায় মনোযোগ দিলো। মাঝখানে সে একবার চুলায় ভাত চড়িয়ে দিলো। আবার কাজ করতে বসল। সে তার কাজ শেষ করলে আমরা রাতের খাবার সারলাম। সে আমাকে দরজার কাছে নিয়ে বলল, ‘দেখি তক্তাটি হাতে নিতে পারো কিনা। ভার বেশি না।’
সে তক্তাটি আমার হাতে দিতেই ভার সইতে না পেরে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। সে আমাকে ধরে তুলল। সাদিক হলে নিশ্চয় এটা দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেত। তুষার বলল, ‘হুহ। আরেকটু কাটতে হবে। তুলতেই যদি না পারো দরজা বাঁধবে কী করে।’
খাটের বিপরীত দেয়ালে একটি ছোট গোল ঘড়ি টাঙানো আছে। আমার পাশে সে শুবে ভেবে অস্বস্তি লাগতে শুরু করল। ঘণ্টার কাঁটা এগারোতে এলে তার কাজ শেষ হয়। সে ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরে গেল।
‘অ্যাই, এই সময় কোথায় যাচ্ছেন?’
‘আমি এখানেই ঘুমাব।’
‘ওখানে? বাইরে?’
‘হ্যাঁ।’
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

সে তক্তাটি দরজার পাশে রেখে দরজা খানিকটা ভেজিয়ে সামনের বেতের খাটে শুল। খাটটি তারই সাইজের। সেই হয়তোবা এই ফার্নিচারগুলো বানিয়েছে। আমাকে দরজার কাছে দেখে বলল, ‘চিন্তা করো না, আমার এখানে ঘুমুতে ভালো লাগে। আর আমি ওখানে না ঘুমালে তোমারই তো লাভ।’
ভেতরে চলে এলাম। লোকটির প্রতি আমার মনে শ্রদ্ধা জাগল। আমি শোয়ার পর পর ঘুমিয়ে গেলাম। মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। আমি চিৎকার করে উঠলাম।
‘অ্যাই চিৎকার করো না। আমি, তুষার। তুষার।’
আমি নিজেকে নিশ্চিন্ত করার চেষ্টা করলাম। হঠাৎই নতুন জায়গায় এমন হওয়ায় ভেবেছিলাম, কোনো এক আগন্তুক বুঝি ঢুকে পড়েছে।
‘আপনি এখানে কী করছেন?’
‘পানি খেতে এসেছিলাম।’
‘ঘুমাননি?’
‘ঘুম আসছে না। তুমি ভয় কেন পাচ্ছ? আমি আছি তো। ঘুমিয়ে পড়।’
‘আমার আর ঘুম আসবে না। দুপুরে খুব ঘুমিয়েছি।’
‘তাহলে চলো। কিছুক্ষণ বাইরে বসে থাকি।’
ভেতরে নিকষ কালো অন্ধকার হলেও বাইরে চাঁদনী আলোয় চারিদিকটা দুধের মতো সাদা। এই আলো দেখে আমার ভয়টা নিমিষে কেটে গেছে।
‘তুমি ঢালা শাড়ি পরোনি কেন?’
‘পরতে জানি না।’
‘আমি আসমা ভাবিকে কাল সকালে আসতে বলব। সে তোমায় ঢালা শাড়ি পরা শিখিয়ে দেবে। ওটা খুব সহজ, দেখতেই মনে হয়, পরতে সময় লাগে না।’
সে খুব আলগাভাবে কথা বলে। কিছুই বলতে সে হয়তো দ্বিধা করে না। সে কবে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে শুরু করল আমি টের পাইনি। আমার চোখগুলো খুব করে জ্বলছে। গাল গড়িয়ে পানি পড়ছে। আমি তা মুছে নিলাম। তুষার তাড়াতাড়ি আঙুল দিয়েই সিগারেটের মুখের আগুন নিভিয়ে মাটিতে ফেলে দিলো।
‘সরি। আমি জানতাম না।’
আমি তার দিকে তাকালাম। কিন্তু কিছু বললাম না।
‘কাউকে কি মিস করছ?’
‘না।’
‘তবে?’
‘আমার ভালো লাগছে না।’
‘ওহ্, আমি কি কিছু করতে পারি?’
‘আমার একটি সময়ের কথা মনে পড়ছে। বিল্ডিংয়ের নিচের ফ্ল্যাটে ফরহাদ ভাইয়া থাকেন। তিনি মাসের মধ্যে অন্তত একবার তার সব কাজিনকে বাসায় আসতে বলেন। সবাই এলে আমিও তাদের সাথে যোগ দিতাম। খুব মজা হতো। ফরহাদ ভাইয়া গান গাইত। তার গানের কথা আমার মনে পড়ছে।’
‘আমার গান আসে না। তবে চেষ্টা করতে পারি।’
সে গলা খাঁকার দিয়ে ঠিক করে নিচ্ছে। আমি এই লোকটির দিকে হা করে চেয়ে রইলাম। সে বেসুরা গলায় কয়েক লাইন গাইল।
আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন।
দিল ওহি মেরা ফাস গেয়ি..
বিনোদ বেণির জরিন ফিতায়
আন্ধা ইশক মেরা কাস গেয়ি..
‘ভালো লাগছে?’
‘হ্যাঁ।’
সে সুরেলা কণ্ঠে গাইতে না জানলেও যে চেষ্টাটি করছে, তার জন্য আমার সত্যিই খুব ভালো লাগছে। সে পুরোটা গেয়ে শোনাচ্ছে। আর ওইদিকে আস্তে আস্তে রাতটি কেটে যাচ্ছে। সেই সাথে আমার পুরনো সময়ের কথা মনে পড়ছে।
কাছে কোথাও গান বাজছে। একজন নয় যেন বেশ কয়েকজন গান গাইছে। আমি কৌতূহল নিয়ে দৌড়ে বেলকনিতে গেলাম। হ্যাঁ, তারাই। মাসের মধ্যে একবার ফরহাদ ভাইয়ার কাজিনরা একত্রিত হয় এবং এই আসর জমে।
আমি দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে নামতে লাগলাম। এই বাসাটির তিনটি তলা। এই বিল্ডিংটা হচ্ছে বড়বাবার, বাবারই চাচাতো এক ভাই। সেই সূত্রে তাঁর নিকট আত্মীয় হিসেবে আমরা দ্বিতীয় তলায় থাকছি। আমাদের আগের বাসার কথা আমার মনেই নেই। বড়বাবার পরিবার কিন্তু খুব বড়। উপরের তলায় এবং নিচের তলায় আলাদাভাবে তারা থাকে। উপরের তলা সবসময় নীরব থাকায় কেউ আছে বলে মনে হয় না। অপরদিকে নিচের তলা একটু বেশিই জাঁকজমকপূর্ণ বলে মনে হয়। নিচে ফরহাদ ভাইয়া থাকেন, আমার জীবনে দেখা প্রথম রসিক লোক।
প্রতি মাসের শেষে তার কাজিনরা এখানে চলে আসে। তারা জমিয়ে আড্ডা দেয়। ফরহাদ ভাইয়া গিটার হাতে নিয়ে বাজান, আর অন্যরা তার গানের সাথে সুর মেলায়। কখনওবা ফরহাদ ভাইয়া দিয়ে বসে জীবনের জ্ঞান। তিনি আমার খুব পছন্দের।
আমি নিচে এলে রুবী ভাবি বলল, ‘আরে অনন্যা যে! এদিকে এসো। তোমার কথাই বলছিলাম। এতক্ষণ ছিলে কোথায়?’
‘পড়ছিলাম। আপনারা সবাই এসেছেন জানলে কবেই না চলে আসতাম!’
‘দেখ, তোমার ভাইয়ার আরেকটা কাজিন এসেছে। সেও তোমার মতো এইবার কলেজে সেকেন্ড ইয়ারে উঠেছে। ওর নাম সাথী।’
ফরহাদ ভাইয়া কবিতার লাইনের মতো করে বলল, ‘আমাদের সাথী এবং অনন্যা, তারা খুকী আর রইল না।’
সবাই হেসে উঠল।
ভাইয়া বলল, ‘মাহিনকে যে দেখছি না? বাসায় কি আছে?’
‘হ্যাঁ, ভাইয়া বাসায় আছে। আজকাল বোধহয় বেশি পড়ালেখা করছে।’
‘আই নো, ও একজন ভালো ছাত্র। কিন্তু সবসময় পড়ালেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকা ঠিক নয়। তুমি ওকে একটু বুঝালে খুব ভালো হয়।’
‘ও কবে আমার কথা শুনেছে যে এখন শুনবে? ও নিজের মর্জিরই মালিক। মাঝে মাঝে আমাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে বললেও সে নিয়ে যায় না। দিনের বেলায় কলেজ করে। বাকিটা সময় নিজের ঘরেই সে থাকে। এই ওর জীবন।’
‘দৈনন্দিন জীবনের কাজের ফাঁকে নিজের জন্য সামান্যটুকুও সময় বের করাটা খুব জরুরি সিস্টার। স্টাডির পেছনে ছুটতে গেলে জীবন কখন অর্থহীন ভাবেই শেষ হয়ে যাবে তা টের পাওয়া যাবে না। জীবনে মানুষের অনেককিছুই করা লাগে। কাউকে হাসানো কিংবা কারও সাথে হাসা, কারও জন্য স্মরণীয় কিছু করে যাওয়া এই ধরনের নানা এক্টিভিটির মাধ্যমেই তো আমাদের মানুষ হওয়ার বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় এবং মনুষ্যত্ব দেখানোর সুযোগ হয়ে থাকে।’
আমার চিন্তাভাবনা এর বিপরীত নয়। জীবন দু’ধরনের হয়ে থাকে। একটি আত্মার প্রয়োজনে, আরেকটি শরীরের প্রয়োজনে। শরীরকে নিয়ে ভাবার মতো স্বার্থপরতা সবাই করে। আমি এর ঊর্ধ্বে নই। তবে আত্মার প্রয়োজনে নিজেকে সবসময় সক্রিয় রাখতে চেষ্টা করি। তাইতো কেবল পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞানে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পছন্দ করি না। পছন্দ করি না, কয়েকটা নাম্বার দিয়ে ক্লাসমেটদের সাথে প্রতিযোগিতা করতে। আর সবসময় মধ্যমে থেকে উপভোগ করার মজাই আলাদা।
ফরহাদ ভাইয়া এতো সুন্দর একটি গান শুরু করলেন যে, মুহূর্তেই আমার চিন্তাভাবনার পাহাড় ধূলিসাৎ হয়ে গেল।
এই মন তোমাকে দিলাম
এই প্রেম তোমাকে দিলাম…
তুমি চোখের আড়াল হও
কাছে কি বা দূরে রও..
মনে রেখ, আমিও ছিলাম…
আমি চোখ বন্ধ করে শুনতে লাগলাম। তারা কি জানে আমার মাঝে কেমন এক বন্যা বয়ে যাচ্ছে?
বেশ কিছুক্ষণ পর ভাইয়া নিচে এসে বলে গেল, এই অনু, ছোট মা খেতে ডাকছে। আমি বাসার দিকেই চললাম। এমন সময় সাথী নামের মেয়েটি আমাকে ডাকল। নিশ্চয় কিছু বলবে।
সে বলল, ‘আমি ফরহাদ ভাইয়ার কাছে তোমার কথা শুনেছিলাম। সেই হিসেবে তোমার সম্বন্ধে আগে থেকেই জানি। তোমার কথা ভাবলে খুব খারাপ লাগে। তোমার মা..’
‘যা হওয়ার তা হয়েছে। হয়তোবা এটি একটি ভালো দিক যে, এখন থেকে আমার পথ আমি নির্ধারণ করব।’
আমি আর কিছু না বলে উপরে উঠে এলাম। কেউ আমাকে অসহায় মনে করুক। তা আমার পছন্দ নয়।
সকালে আমি ঘুম থেকে উঠলাম দেয়াল থেকে মাথা তোলে। তুষারকে কোনোদিকে দেখতে পেলাম না। উঠে দোয়ারের কাছে গিয়ে দেখলাম, তুষার মাটিতে ঘুমোচ্ছে!
(চলবে..!)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে