“জ্যোৎস্নার ছল”পর্ব ১৪.

0
629

“জ্যোৎস্নার ছল”পর্ব ১৪.

আজ একমাস পাঁচ দিন। মাছ ধরার দিনটির কথা আমার মনে পড়ছে। মনে পড়ছে কীভাবে আমার ধাক্কা খেয়ে তুষার পানিতে পড়ে গিয়েছিল। তুষার কাজে যায়নি। সকালেই জিজ্ঞেস করেছিল, এখন কোথায় যাবে? সোজা বাসায়?
‘যাব একদিকে।’
‘আমার অনুরোধ, তুমি স্বপ্নার বাসায় যাবে। তার তো তেমন দোষ ছিল না। তুমি যেমন ওর ফ্রেন্ড, ঠিক তেমনই সে নাহিদের বোন। তার ভয়েই হয়তো স্বপ্না কখনও তোমার প্রতি নাহিদের ভালো লাগার কথা বলেনি। আর নাহিদকে ক্ষমা করে দাও। নাহিদ যদিও তোমাকে পায়নি বলে তোমার বিপক্ষে গিয়েছে। অনেকেই আছে পাহাড় সমতুল্য ভুল করে একসময় উপলব্ধির রাস্তা দিয়ে প্রায়শ্চিত্তের দ্বারে পৌঁছে। এমন লোককে ক্ষমা করে দেওয়া উচিত।’
সে চুপ হয়ে গেল। আমাকে কেনে দেওয়া বইগুলো সে লাগেজে রেখে দিয়ে, লাগেজটি আনার সময়ের তুলনায় আরও ভারী করে দিয়েছে। সে আরও কিছু জিনিস তাতে রেখেছে। শোপিজের মতো মাটির পুতুল, কলসি, সে কিনা মেলার পরদিন গুটিয়ে ফেলা দোকান থেকে কিনেছিল। আমাকে তার কেনে দেওয়া একমাত্র ওই দামি লাল শাড়িটিই প্যাক করেছে। সে বলছে বাকিগুলো কিনা খুব সস্তা। আমার তা মনে হয় না। সে ওসব আলনার নিচের ড্রয়ারে ভাঁজ করে রেখেছে, ঠিক প্রথমদিনের মতো। আমার আরসি-এর অ্যালবাম সে সযত্নে একদিকে রেখেছে।
আমি কোনো কাজ করছিলাম না। সেই করতে নিষেধ করেছে। তার প্রায় হয়ে যাওয়ার পর দরজায় টোকা পড়ল। আমি ঘোমটা তুলে দিলাম। এক লোক এসেছে। আমি থাকা সত্ত্বেও তুষার তাকে ভেতরে ঢোকাল।
লোকটির শরীরের বেশ কয়েকদিকে ব্যান্ডেজ। মুখের একদিক তো ফুলেই থেকেছে। চিকন নাকটি দেখে তাকে চেনা লাগছে। ওয়াজেদ ভাই। তুষার আমার চেয়েও বেশি হকচকিয়ে গেছে।
‘কীভাবে হয়েছে এসব?’
‘এমনিই। ভাবী, কেমন আছেন?’
‘এইতো আছি।’
‘একটু পানি দেবেন?’
‘অবশ্যই।’
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share

আমি পানি এনে দিলাম।
‘ভাবী আজ কোথাও যাচ্ছেন নাকি?’
‘হ্যাঁ।’
‘অনন্যা,’ তুষার বলল, ‘একটু শরীফের বাসায় যাও। আসমা ভাবীকে দেখে আসো।’
তার ইঙ্গিতে বুঝলাম, ওয়াজেদ ভাইকে আমার যাওয়ার সম্বন্ধে তার জবাবদিহিতা করতে হবে। আমি বেরিয়ে গেলাম। আসমা ভাবির কাছে গেলাম না। আমার পছন্দের জায়গা, নদীর পাড়ে গেলাম। ওখানে গিয়ে ঘাসের উপর বসে দীর্ঘ এক শ্বাস ফেলি।
দূরেই সেই গাছটি। কল্পনা করতে লাগলাম, শরীফ ভাই আর তুষার গাছের উপর বসে আছে। কিছুদূরেই ডাক্তারের চেম্বার। ওখানের কথা মনে পড়তেই আমি মৃদু হাসলাম। তুষার ভোলার মতো লোক নয়। তাকে ভুলব না। হয়তো এইজন্যই আমি তাকে আর কখনও দেখা দেবো না। সে হয়তো অন্য কোনো অনন্যাকে আশ্রয় দেবে। হয়তোবা কালো অভদ্র একটি মেয়েকে ভালোবাসা দেবে। সে কি কখনও তাকে বলবে, আমার আগের বউ খুব স্বার্থপর ছিল? নাকি সে বলবে অনন্যার মতো মেয়ে আমাকে ডিজার্ভ করে না। ভালোই হয়েছে, সে নিজের জীবনকে ফিরে পেয়েছে।
এই নদীর ঢেউয়ে কিন্তু জীবনের মতো অনেক ধাঁধাঁ। এই ধাঁধাঁ তরঙ্গের মাধ্যমে এক কণা থেকে অন্য এক কণায় রূপ বদল করে সঞ্চারিত হয়ে বয়ে দূরে কোথাও চলে যায়। আমিও হয়তোবা এভাবে দূরে কোথাও চলে যাব।
তুষার এলো। কিছুক্ষণ আমার পাশে বসে থেকে বলল, ‘যাওয়ার সময় হয়েছে। পিছু ফিরে তাকালে মায়া লেগে যেতে পারে। তখন এই নদী এই গ্রাম্য সবুজ পরিবেশকে ভুলতে পারবে না।’
‘ঠিকই বলেছ। চলো।’
‘আমার অনেক কাজ আছে। আমি যেতে পারব না। ওয়াজেদ তোমায় নিয়ে যাবে।’
‘সে কী, তুমি নিয়ে যাবে না?’
‘ওয়াজেদ তো ওইদিকেই যাচ্ছে।’
‘এতটা আবেগহীন হওয়াও কিন্তু ঠিক না। তুমি এতদিন আমার একটা বন্ধুর চেয়ে কম ছিলে না।’
সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ওয়াজেদ দাঁড়িয়ে আছে। এসময় বাস আসবে।’
‘এটিই শেষ কথা? ঠিক আছে। তোমার সাথে আমার কোনো কথা নেই।’
সে কিছু বলল না। ঘুরে হাঁটা ধরেছে। আমার বলতে ইচ্ছে হচ্ছে, দাঁড়াও। আমরা দু’জন এটুকু পথ একে অন্যের হাত ধরে যাই। কোন অভিমানে ওই আবেগহীন লোকটিকে আমার কিছু বলা হলো না।
আমাকে ওয়াজেদ ভাই স্বপ্নার বাসার সামনে দিয়ে গেল। বাসার সামনের বেঞ্চটিতে স্বপ্নার মা বসেছিলেন। আমাকে দেখে তিনি জড়িয়ে ধরলেন। আমি ভেতরে গেলাম। স্বপ্না আমাকে দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না, আমি কখনও ফিরে আসব।
‘কেমন আছিস স্বপ্না?’
‘ভালো। তুই কেমন আছিস?’
‘ভালো।’
‘ভাইয়া যে মিথ্যা বলেছিল, তার জন্য সরি রে।’
‘ইটস ওকে।’
‘এই একমাস কোথায় ছিলি?’
‘ছিলাম একটি জায়গায়। রঙধনু কেমন চলছে?’
‘যেমনটা চলা উচিত।’
‘লাগেজ দেখে কিছু মনে করিস না। এইমাত্র একটি জায়গা থেকে এসেছি। তোর এখানে দুই-চারটি দিন থাকব। সমস্যা হবে না তো?
‘আরে এটা বলার কোনো বিষয় নাকি? তুই যখন ইচ্ছা যতদিন ইচ্ছা থাকতে পারবি।’
নাহিদ ভাই কোনোকিছু বললেন না। রাতে স্বপ্নার বিছানায় শুলাম। অনেকদিন পর ভিন্ন একটি বিছানায়। মনে হচ্ছে, যেকোনো সময় তুষার পানি খেতে আসবে। কিন্তু সস এখানে নেই। দীর্ঘ একটি শ্বাস ফেলে স্বপ্নাকে জড়িয়ে ধরলাম। তাহলে আমার বিয়ের ব্যাপারটি কেউ জানে না। আমি না জানালে জানবেই বা কী করে?
সাদিকের বাসায়ও সে ব্যতীত কেউ আমার সম্বন্ধে জানে না। আর সাদিক পরোয়া করছে না। সে আমাকে নিয়ে দিব্যি কথা বলতে লাগল, যেন যে মাসটি কাটিয়ে এলাম সেটি নিছক একটিমাত্র সেকেন্ড ছিল।
সে আমাকে বলল, ‘আমার কিন্তু অনেক অনেক ছবি তোমাকে দিতে হবে অনু। তুমি যে অ্যালবামটি নিয়ে গেলে। সব ছবিই জমা রয়ে গেছে। আগামীবার ওটা সাথে করে নিয়ে আসবে। কী হলো ? কিছু বলছ না কেন?’
‘কী? হ্যাঁ, কী বলছিলে?’
‘তোমার মনোযোগ এখানে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘তোমাকে ওই ছেলেটি শাসন করেনি তো?’
‘শাসন করবে কেন? সে অন্য ধাঁচের স্বামী ছিল। সে তোমার আমার সম্বন্ধেও জানত।’
‘তাই নাকি? ইন্টারেস্টিং। তাই ভালো।’ কিন্তু তার মুখে কোনো ভাবান্তর দেখা যায়নি। আমি বেশ কিছুক্ষণ নীরব রইলাম।
‘কী হয়েছে? কারও কথা মনে পড়ছে?’
আমি ঘুরে তার দিকে তাকালাম। কিন্তু না, ওগুলো একজোড়া ভোলা চোখ। আমার মন চাইছে, সাদিক তুষারের নকল করুক। আর আমি তুষারের চেষ্টা দেখে মনে মনে হাসি।
আমার সারাটা দুপুর খুব খারাপ ভাবে কাটল। কিছুই ভালো লাগছে না। আমি কী চাই তাও আমার জানা নেই। বই পড়তে নিলাম, সেই বইগুলো পড়তে ইচ্ছে হচ্ছে না। সিগারেটের গন্ধ নাকে এলে তো আমার গা গুলিয়ে যায়।
তৃতীয় রাতে স্বপ্না জিজ্ঞেস করল, ‘তোকে ঠিক নিভু নিভু আলোর মতো লাগছে। কী হয়েছে বল তো।’
‘জানি না।’
আমি স্বপ্নাকে জড়িয়ে ধরলাম। আমার কখনও এতটা কষ্ট হয়নি, এমনকি বিয়ে হয়ে যাওয়ার সময়ও। আমি জানি না কেন ওকে জড়িয়ে ধরেছি। কেন ওকে ধরে কাঁদছি। জানি না, আমি কোথায় ছিলাম তা স্বপ্না বারবার জিজ্ঞেস করার পরও কেন জবাব দিতে পারিনি। কেবল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। আমার মনটা অজ্ঞাত একটি কারণে ছটফট করছে।
স্বপ্না আচমকা বলল, ‘সাদিককে বিয়ে করতে ইচ্ছে না হলে করিস না।’
‘কী বলছিস তুই?’
‘এটাই ঠিক। আমি কালকে উনাকে এখানে আসতে বলব। তোর কাছে কোনোদিকে যাওয়া লাগবে না।’
স্বপ্না নামের মেয়েটিকে দেখতে দেখতে আমার চোখের পাতা ক্রমশ ভারী হয়ে এলো। আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সে পরদিন সকালে সাদিককে সত্যিই নিয়ে এসেছে। আমি একগাদা জড়তা ও সঙ্কোচ নিয়ে বাসার সামনের বেঞ্চটিতে ওর পাশে বসলাম।
‘তোমার চোখগুলো ফুলে কেন রয়েছে অনু?’
‘এমনিই।’
‘কালরাত ঘুম হয়নি?’
‘হয়েছে।’
‘তুমি ঠিক আছ তো? তোমার গলার স্বরও অদ্ভুত হয়ে গেছে।’
আমি ম্লান হাসলাম।
‘দেখ, মাকে আমাদের বিয়ের কথা বলেছি। এখন থেকে সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘কিছু ঠিক হবে না। যাকে দেখলে আমার সব ঠিক থাকে, সে এখানে নেই। তাই কিছু ঠিক নেই।’
‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’
‘সাদিক, আমার বিয়ে করতে ইচ্ছে হচ্ছে না।’
‘হোয়াট? তুমি ওই গুণ্ডা বদমাইশটাকে পছন্দ করো তাই না?’
আমি তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।
‘কী? কিছু জানো না? তোমার ছোট মা তোমাকে কিছু বলেনি? তুমি ঠিকই শুনেছ। ও কোনো ভদ্র বংশের ছেলে না। বাপ যেমন, ব্যাটাও তেমন। তুমি ভালো করেই জানো, আমার চেনা-জানা লোকের লিস্ট কতদূর পর্যন্ত প্রসারিত। আমি তুষারকে চিনতাম। গুণ্ডা একটা, পশু একটা। তাকে যারা চেনে, তারা কেউ তার সাথে চোখে চোখ রাখতে পারে না। তাকে বাঘের মতো ভয় পায়। সে তার গ্রুপের লোকগুলোর সাথে মিলে নির্দোষ মানুষকে এমনভাবে পেটায়, যেন কোনো বস্তাকে কেউ নির্লিপ্তভাবে পেটাচ্ছে। তোমার বিয়ের রাতে তোমাকে নিতে গিয়ে দেখেছিলাম লোকটিকে। সে আর তার বন্ধুকে দেখে আমি চিনতে দেরি হয়নি। কিন্তু আমি পরোয়া করিনি। এমন একটা লোকের সাথে তোমার বিয়ে হচ্ছে দেখে আমি ছেলেটির উপর ক্ষেপে উঠেছিলাম। মুখ ফসকে সব কথাই বলে দিয়েছি। সে শান্ত ভঙ্গিতে বলেছে, এমনটা হলে ও তোমাকে আমার কাছে সঠিক সময় ফিরিয়ে দেবে। ওর বন্ধুও আমাকে অনেক বুঝানোর পর আমি তাদের ছেড়ে দিয়েছি। নইলে সে তুষার হোক, যেই হোক, আমার উপস্থিতিতে তোমার বিয়ে হতে দিতাম না। সে আমাকে কথা দিয়েছিল, তোমাকে যেমন নিয়েছে, তেমনই ফিরিয়ে দেবে।’
আমি চুপ করে রইলাম।
সে শান্ত হয়ে বলল, ‘তখন একটু বেশি আবেগী হয়ে পড়েছিলাম অনু। ভালোই করেছ সেদিন তুমি আমার কাছে না এসে। তোমাকে আমি কোথায় রাখতাম? চাচু থাকতে তিনি আমাকে বাসায় ঢোকাতেন না। মা-বাবা ঢোকালেও চাচু আমাদের সবাইকে বের করে দিতেন। জায়গাটির মূল্য বাবা কিছু কিছু করে চাচুকে শোধ করছিলেন। সবই ভেস্তে যেত। বাবার এখন জায়গাটি কেনা হয়েছে। তোমাকে আমি শীঘ্রই আপন করে নিয়ে যাব।’
আমি অদূরে চেয়ে রইলাম। তুষারের আড়চোখে তাকানোটা আমার চোখের সামনে ভাসছে। এই লোক খারাপ হতে পারে না। আমার মন মানতে চায় না। পরক্ষণে আমি দেখতে লাগলাম, তুষার ওই বাঁকা নাকের কালো লোকটিকে কীভাবে নির্দয় হয়ে পেটাচ্ছে। আমি এরকম এক লোককে ভালোবাসতে পারি না। আমার চারিদিকটা ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি যাকে সাদিকের চেয়েও বেশি ভালোবেসে ফেলেছি সে এমনটা হতে পারে না। আজ সঙ্কোচ ছাড়াই সাদিকের কাঁধে মাথা রাখলাম।
(চলবে…)
লেখা: ফারিয়া কাউছার

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here