গল্প: ছোঁয়ার শিহরণ পর্ব- ০৬

0
2219

গল্প: ছোঁয়ার শিহরণ পর্ব- ০৬
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

ছোঁয়া বাসায় এসেছে মাত্র । আসতেই হিয়া বলল তাকে এক কাপ কোল্ড কফি বানিয়ে দিতে। স্কুল থেকে এসেছে তাই তার খুব টায়ার্ড লাগছে। নিজের হাত দিয়ে গায়ে বাতাস করতে করতে আদেশ দিলো সে ছোঁয়াকে। তার ভাবখানা এমন যেন ছোঁয়া এতক্ষণ বাসাতে আরাম কেদারায় বসে বসে মশা মাছি মারছিল। এতক্ষণ তো আরাম করছিস! আর কত! এমনই মনে হলো হিয়ার চেহারার অভিব্যক্তিতে।

ছোঁয়া তার ছোট্ট রুমটাতে নিজের ব্যাগ রেখে কাপড় না পাল্টিয়েই কফি বানাতে চলে গেল । হিয়া আদেশ দিতে দিতেই অহনা হুড়মুড় করে সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নামতে নামতে চিৎকার করে বলল,’ এই ছোঁয়া, আমাকে এক গ্লাস লাচ্ছি দিয়ে যা। সাথে বরফ কুচি দিবি ।খুব ক্লান্ত লাগছে।’

ছোঁয়া, হিয়া আর অহনা তিনজনই মাত্র স্কুল থেকে আসলো। কিন্তু ছোঁয়াকে স্কুল থেকে এসেই তার দুই সৎ বোনের নানা আবদার মেটাতে হয়। বয়সে অহনা আর হিয়া ছোট হলেও তারা আপু বলে ছোঁয়াকে সম্বোধন করে না। বরং তাকে দিয়ে পূরণ করে নানান ফরমায়েশ। এটা হলো তার বাবা মারা যাওয়ার পরের সময়গুলোর এক নিত্যকার চিত্র। আর ফাহমিদা বেগম এই অভ্যাস নিজের মেয়েদের মধ্যে গড়ে তুলেছেন। তবুও ছোঁয়া নির্বিকার । সব বুঝেও যেন বুঝে না। কারণ বুঝার ভাণ করলেই তো প্রতিবাদ করতে হবে। আর প্রতিবাদ করলে তার মাথার উপর থেকে যদি থাকার ছাদটুকুও হারিয়ে যায় । তবে কী হবে! এই এত এত ভয় শঙ্কা মনের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে আছে।

ছোঁয়া কোল্ড কফি বানানো শেষে হিয়াকে দিতে বাসার দ্বিতীয় ফ্লোরে গেল। তারপর লাচ্ছি বানিয়ে অহনাকে দিতে যেতেই সে রেগেমেগে একেবারে আগুন হয়ে গেল। উত্তেজিত কণ্ঠে বলল,’এত দেরি হলো কেনো? সেই কবে বলেছি !’

ছোঁয়া অহনার কণ্ঠ শুনে একটু ঘাবড়ে গেল। তার মনটা সুপ্ত প্রতিবাদের আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে দিচ্ছে । কিন্তু ছোঁয়া তারপরেও নির্বিকার । সে কয়েক বার চোখের পলক ফেলল। তারপর ত্রস্ত পায়ে হেঁটে চলে গেল।

ফাহমিদা বেগম বাইরে গিয়েছিলেন নিজ কাজে । নানান পার্টি করেই তার দিন কাটে। পুরুষ বন্ধুর সংখ্যাও নেহাত কম নয়! যাদের সঙ্গে উঠা বসা করতে গিয়ে বাসায় সময় দেয়া রীতিমতো কঠিন হয়ে যায় তার জন্য। ছোঁয়ার বাসার সমস্ত দায়িত্ব দেখার পেছনে এটাও একটা কারণ। তবে ফাহমিদা বেগম বাসায় থাকলেও যে ছোঁয়া রেহাই পেত তা ভাববার কোনো কারণ নেই। কারণ তিনি রান্নাঘরে যেতে অস্বস্তি বোধ করেন। তার মেক আপ, ফেসিয়াল, মেনিকিউর, পেডিকিউর এসব করতে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পার্লারে দিতে হয় প্রতিমাসে। তাছাড়া বাৎসরিকভাবে লাম্প সাম( এককালীন প্রদানকৃত অর্থ) পে করতে হয়। এখন তিনি যদি রান্না করেন তবে তো তার স্কিন ডার্ক হয়ে যাবে, ফেসিয়াল নষ্ট হয়ে যাবে। আর এত কষ্ট করে যে হাত ও পায়ের যত্ন নেয়া হয় তাও হয়ে যাবে ভণ্ডুল । তিনি এটা কখনোই মেনে নিতেন পারবেন না। এটা তার পক্ষে সম্ভব নয়। রূপচর্চা তার জন্য সবকিছুর উর্ধ্বে!
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


বাড়িতে পা রাখতেই মেয়ের চিৎকার শুনে তার প্রাণোচ্ছল মনখানা বিষাদময় হয়ে গেল। তিনি ভেবেছিলেন রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়েই একটু হালকা ঘুম দিবেন। তাতে মাথাটা হালকা তো হতোই মনটাও হয়ে যেত ফুরফুরে। কিন্তু তার সমস্ত পরিকল্পনা বোধহয় ভণ্ডুল হতে চলেছে।
তিনি মনে মনে ধরেই নিলেন নিশ্চয়ই ছোঁয়া কিছু একটা করেছে। নিশ্চয়ই তার মেয়েদের কোনো আবদার পূরণ করেনি মহারানী! যদি এটা ছোঁয়ার কাজ হয়ে থাকে তবে তার নিজের জন্য গৃহিত পরিকল্পনা নিশ্চিতরূপে ভণ্ডুল হয়ে যাবে । তবে এর মাশুল ছোঁয়াকেই দিতে হবে!
সে ভাবনা মনের দরজায় করাঘাত করতেই তার চোখ মুখে এসে বিরাজ করল একরাশ বিরক্তি । মেজাজ গিল বিগড়ে। তিনি দ্রুত বেগে প্রবেশ করলেন ঘরে। ততক্ষণে অহনা চিৎকার চেঁচামেচি বন্ধ করে দিয়েছে। সে ড্রয়িং রুমের সোফায় রাজকীয় বৈঠকে আয়েশ করে চুমুক দিচ্ছে কাঁচের গ্লাসে আর ড্রয়িং রুমের এলইডি টিভিতে ইংলিশ মুভি দেখছে। ফাহমিদা বেগম অহনার কাছে এসে তার কাঁধে নিজের হাত রেখে বললেন,’কী হয়েছে, অহনা?’

অহনা ঠোঁট খানিক উল্টে অভিযোগের সুরে বলল,
‘আম্মু, আর বলো না । ছোঁয়া আস্ত একটা কাজ চোর। শুধু আরাম করতে চায় সে। সেই কবে বলেছি এক গ্লাস লাচ্ছি দিতে। এই মাত্র দিয়ে গেল। তার উপর বরফ কুচি দিয়েছে ফকিন্নির মতো! ভাবতে পার কী বাড় বেড়েছে মেয়েটা!’

ফাহমিদা বেগম রেগেমেগে আগুন হয়ে গেলেন। যেন এহেন কাজ করে সে মাহাপরাধ করেছে। দণ্ড যেন আবশ্যিক। তিনি তেড়ে গেলেন ছোঁয়ার রুমে । ছোঁয়া ফ্রেশ হয়ে মাত্র একটু শরীর এলিয়ে দিয়েছিল বিছানায় । কিন্তু ফাহমিদা বেগমকে দেখে সে আবার উঠে বসল। যদিও তার শরীর বড্ড অবসাদগ্রস্ত, ক্লিষ্ট আর ভারাক্রান্ত হয়ে আছে।

ফাহমিদা বেগম উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,’কি আরাম করা হচ্ছে মহারানীর?’

ছোঁয়া আমতা আমতা করে বলল,’ মাত্র শুয়েছিলাম ।’

‘এখন কোনো আরাম করা চলবে না। তোর এত বড় স্পর্ধা হয়ে গেছে যে তুই আমার মেয়েদেরকে অপেক্ষা করাস!’ ফাহমিদা বেগম রাগান্বিত কণ্ঠে হিসহিসিয়ে বললেন।

ছোঁয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তার দিকে । তার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে । আর কত? আর কত সহ্য করবে তুমি ছোঁয়া? তার মন তাকে অবিরত এই প্রশ্ন করে চলেছে। তারই প্রতিক্রিয়া স্বরূপ সে বলল,’কোথায় অপেক্ষা করিয়েছি? যা বলেছে তা তো বানিয়ে দিয়েছি।’

ফাহমিদা বেগম এবার এসে ছোঁয়ার চুলের গোছা ধরে চোখ মুখ কুঁচকে চেঁচিয়ে বললেন,
‘আমার মুখে মুখে কথা। তোর আরাম আমি বার করতেছি দাঁড়া ।’

এই বলে ফাহমিদা বেগম ছোঁয়াকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন ড্রয়িং রুমে। সেখানে উঁচু এক স্থানে চাবুক রাখা আছে। তিনি সেই চাবুকটা অপর হাতটা দিয়ে নিলেন।

অহনা এই দৃশ্য দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠল। ছোঁয়া তখনো চিৎকার করছিল,’আমাকে ছেড়ে দেন। আমি আর এমন করব না।’

কিন্তু তার সেই চিৎকার বোধহয় কারো কর্ণকুহরে পৌছে তার কানের পর্দাকে প্রকম্পিত করার জোর রাখে না! হলে হয়তো এই মা-বাবা মরা মেয়েটার এই বেহাল দশা হতো না। ছোঁয়ার চিৎকার শুনে হিয়া নিচে নেমে এলো। ছোঁয়াকে মারতে দেখে সে বড় বোন অহনার পাশের সোফায় গিয়ে আরাম করে বসল।

তারপর সেই চাবুকটা একে একে তার সমস্ত ঘা এর চিহ্ন এঁকে দিয়ে গেলো ছোঁয়ার শরীরে। ছোঁয়া ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল। চিৎকার দিল। যেই চিৎকারের ভাষা হয়তো ব্যথিত কোনো হৃদয় তার সমস্তটা দিয়ে হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হতো। তবে ছোঁয়াদের বাড়িতে এমন কোনো হৃদয়ের অস্তিত্ব নেই, নেই এমন কোনো মানব যে একবারের জন্য হলেও বলবে–মেয়েটাকে আর মেরো না–ও মরে যাবে তো!

ছোঁয়ার আর্তনাদ দুটি মানুষের মাঝে আন্দের খোরাক যুগিয়েছে । তারা সমানে হেসে যাচ্ছে। নিজেদের মাঝে বলাবলি করছে–এবার বুঝুক মজা।

আহা ! কী নিষ্ঠুর পৃথিবী! কী নিষ্ঠুর কিছু মানব হৃদয়! এদের হৃদয় বোধহয় পাথরে গড়া,নয়তো কঠিন কোনো ধাতুর প্রলেপ দিয়ে দেয়া হয়েছে সেই হৃদপিন্ডের উপর!

চলবে…..ইন শা

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে