গল্প: ছোঁয়ার শিহরণ পর্ব: ০৪

0
2299

গল্প: ছোঁয়ার শিহরণ পর্ব: ০৪
লেখনীতে: ফাতিমা আক্তার অদ্রি

শিহরণ নিজ রুমের পড়ার টেবিলের সামনে বসে আছে। হাতে একটা কলম। ফাউন্টেন পেন। তার ড্যাডি গিফ্ট করেছিল তার থার্টিনথ বার্থডে তে। অবশ্য সাথে আরো অনেক কিছুই দিয়েছিল। তবে কলমটা বেশি স্পেশাল। তার ড্যাডি সিঙ্গাপুর থেকে এনেছিল কলমটা। আজ টেবিলের ড্রয়ার ঘাটতে গিয়ে সে এটা খুঁজে পেয়েছে। কলমটা দিয়ে সে এক কি দু’বার লিখেছিল। পরে আবার রেখে দিয়েছিল। কেন রেখে দিয়েছে সে নিজেও বুঝতে পারেনি তখন। হয়তো স্মৃতি হিসেবে! কে জানে। তবে শিহরণ তার ড্যাডির দেয়া সবগুলো উপহার স্বযত্নে রেখে দিয়েছে ।

উপহার খুব দামি হোক বা না হোক—তাতে শিহরণের কিচ্ছু যাই আসে না। মূল্য দিয়ে সে বিচার করা শেখেনি। উপহারদাতার মানসিকতা ও ভালোবাসা দিয়ে বিচার করতে শিখেছে সে। তার মাম্মি আর ড্যাডি অন্ততপক্ষে তাই শিখেয়েছে। তাই তার ড্যাডির দেয়া মূল্যবান কলমটি একটু নেড়েচেড়ে দেখে সে আবার টেবিলের ড্রয়ারে রেখে দিলো। কলমটা রাখতে গিয়ে একটা খানিক চকচকে জিনিস তার নজর কাড়ল। সে চকিতে ড্রয়ারটা আরো প্রশস্ত করে খুলে জিনিসটা দেখার চেষ্টা করলো। এটা হলো একটা লকেট। যেটা সে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল। অনেক আগের ঘটনা এটা। সে তখন বোধহয় ক্লাস সেভেন কি এইটে পড়ত।

সেদিন শিহরণ ডাইনিং টেবিলে বসে ছিল। তার মাম্মি নাশতা রেডি করছিল । কিন্তু শিহরণের খুব খিদে পেয়েছিল । তাই সে টেবিলের উপর রাখা ডেজার্টের বক্সটা খুলে সেখান থেকেই খেতে শুরু করেছিল। বক্সের ভিতর উজ্জ্বল চকচকে কিছু একটা দেখতে পেয়ে সে খাওয়া থামিয়ে বক্সটা পুনরায় দেখার জন্য নিতে’ই সে বক্সের ভিতর একটা লকেট পেয়েছিল। সে তৎক্ষনাত তার মাম্মিকে প্রশ্ন করেছিল,’মাম্মি, ইজ দিস বক্স ফ্রম দ্যাট লিটল গার্ল?’

‘হুয়াই ইউ ওয়ান্ট টু নো দ্যাট , ডিয়ার?’ শিহরণের মাম্মি সাবিহা সাবরিন প্রশ্ন করেছিল।
এখনই জয়েন করুন আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে।
আর নিজের লেখা গল্প- কবিতা -পোস্ট করে অথবা অন্যের লেখা পড়ে গঠনমূলক সমালোচনা করে প্রতি মাসে জিতে নিন নগদ টাকা এবং বই সামগ্রী উপহার।
শুধুমাত্র আপনার লেখা মানসম্মত গল্প/কবিতাগুলোই আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হবে। এবং সেই সাথে আপনাদের জন্য থাকছে আকর্ষণীয় পুরষ্কার।

গল্পপোকার এবারের আয়োজন
ধারাবাহিক গল্প প্রতিযোগিতা

◆লেখক ৬ জন পাবে ৫০০ টাকা করে মোট ৩০০০ টাকা
◆পাঠক ২ জন পাবে ৫০০ টাকা করে ১০০০ টাকা।

আমাদের গল্প পোকা ফেসবুক গ্রুপে জয়েন করার জন্য এই লিংকে ক্লিক করুন: https://www.facebook.com/groups/golpopoka/?ref=share


শিহরণ জানত তার মাম্মি কখনোই সোজা-সাপটা উত্তর দেয় না। কেন? কী কারণে? কার জন্য? কোথায়? কীভাবে? সকল প্রকার ডব্লিউ এইচ কোয়েশ্চন করেই দম নেয়। আর শিহরণকে করে দেয় নাস্তানাবুদ! তাই সে এই ব্যাপারটার প্রতি তার আগ্রহ তুঙ্গে থাকা সত্ত্বেও এমন ভাণ করেছিল যেনো তার এই বিষয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সে বলেছিল,’মাম্মি, ইটস নট দ্যাট টেস্টি হুয়িচ ইউ হ্যাভ বা(ট) বিফোর।’

শিহরণের মাম্মি যেনো এই কথা মানতেই পারছিল না। তিনি বলেছিলেন,’নো মাই চাইল্ড। ইটস অলসো ফ্রম দ্যাট লিটল গার্ল ।’

শিহরণ লকেটের কথা তার মাম্মিকে বলেনি সেদিন। সে ধরেই নিয়েছে লকেটটা তার মাম্মি যেই মেয়ে থেকে ডেজার্ট কিনে সেই মেয়েটার। তখন সে লকেটটা নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল। লকেটটা দেখতে যেমন ইউনিক ডিজাইনের তেমনি খুব দামিও মনে হয়েছিল শিহরণের । কোনো এক অজানা কারণে সে সেই লকেট নিজের কাছেই রেখে দিয়েছিল। আজ অনেক বছর পর আবার সেই লকেটটা তার সামনে এলো। হঠাৎ তার মনে হলো সে যদি ফিরিয়ে দিতে পারত লকেটটা। নিশ্চয়ই মেয়েটা খুব কষ্ট পেয়েছিল! শিহরণ মনে মনে নিজেকে তিরস্কার করল । সে কেন যে লকেটটা নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল? খুব অন্যায় করেছে সে! খুব অন্যায়!

তাই শিহরণ ভাবলো যে সে সবসময় লকেটটা নিজের কাছে রাখবে। যদি সেই মেয়েটাকে খুঁজে পায় কখনো তবে তাকে তার জিনিস ফেরত দিবে। যদিও তার চান্স খুব কম। সে কি জনে জনে গিয়ে জিজ্ঞেস করবে–আপনার কি কোনো লকেট হারিয়েছে? ওপস্! শিহরণ যে খুব অদ্ভুত ভাবনাতে মশগুল হয়ে গেলো। এমনটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।

দেখা যাক! যদি সম্ভব হয় তবে সে অবশ্যই ফেরত দেবে।

এই মেয়েটার সাথে তার মাম্মির পরিচয় বহু পুরনো। প্রায় তিন-চার বছর তো হবেই। মাম্মি চেয়েছিল মেয়েটিকে হেল্প করতে। কিন্তু মেয়েটি এমন কোনো হেল্প নিতে প্রস্তুত নয়। সে বলে বিনা পরিশ্রমে সে কোনো কিছু পেতে চায় না। শিহরণ ভেবে কূল পায় না এত্ত পিচ্চি মেয়ে হয়েও এভাবে কথা বলতে পারে! আর এভাবে কারো কাছ থেকে সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও সেই পিচ্চি মেয়ে কি না সেই সাহায্য এই বলে ঠুকরে দেয়– যে সে বিনা পরিশ্রমে কোনো কিছু পেতে চায় না! শিহরণের সেই থেকে এই পিচ্চিটার প্রতি সুপ্ত আগ্রহ। তবে কখনো মনে হয়নি যে সে এই পিচ্চিকে দেখবে বা কথা বলবে।

আর এখন পিচ্চিটার লকেটটাও তার কাছে। সে ভাবছে এটা নিশ্চয়ই তার মায়ের হবে। আমাকে যে করেই হোক মেয়েটাকে খুঁজে বের করে তার জিনিস তাকি ফেরত দিতে হবে।

ছোঁয়া স্কুলে পেছনের বেঞ্চে বসেছে। তার হাতে গোনা কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবী আছে। সংখ্যায় খুব কম। তবে তাকে খুব ভালোবাসে। ছোঁয়ার নিজেকে নিস্তেজ লাগছে । গত দুটো সপ্তাহ ধরে তার ঘুম কম হচ্ছে। হয়তো সেই কারণেই এমন লাগছে। সে শিহরণের উপর প্রচণ্ড রাগ করেছে। প্রচণ্ড! একেবারে পাহাড়সম রাগ। তারপরেও তাকে কিছু বলছে না। ছোঁয়ার মনে হচ্ছে শিহরণের সাথে কথা বলা মানেই একটা ঝগড়া অবশ্যম্ভাবী । কিন্তু তার দেহে বা গলায় সেই জোর নেই। তাই সে সিটে বসে আছে। তার বন্ধুরা এখনো কেউ আসেনি। সে একা একাই বসে আছে। হঠাৎ তার মনে হলো সে অধেকদিন যাবৎ নিজের ডায়েরি লিখছে না। লেখার সময়’ই পাচ্ছে না। যে ধকল যাচ্ছে তার উপর দিয়ে । তারপরেও ছোঁয়া নিজেকে প্রবোধ দেই এই বলে যে আর মাত্র তো একটা বছর । তারপর সমস্ত ঝঞ্ঝাট শেষ! তার উপর সামনেই পড়বে সামার ভ্যাকেশন। সামার ভ্যাকেশনে ইচ্ছেমতো ঘুরাঘুরি করবে। ইচ্ছেমতো যা খুশি তাই করবে । তাকে বাধা দেবার তখন কেউ থাকবে না। যে মানুষটি বাধা দিবে আর যে দু’জন মানুষ নালিশ দিবে তারা তো চলে যাবে দূরে কোথাও বেড়াতে। তাকে সাথে তো নিয়ে যাবে না। তাকে ঘর দেখাশুনা করার দায়িত্ব দিবে। দায়িত্বের হেরফের হলেই শেষ । ছোঁয়ার আস্ত রাখবে না তার সৎ মা!

ছোঁয়া ডায়েরি বের করে লিখছে। আজ তার ডায়েরিতে স্থান পাচ্ছে সমস্ত রাগ, দুঃখ, যন্ত্রণা আর অভিযোগ। কিছু মানুষের জীবনে অভিযোগ করার মানুষটিও থাকে না! খুব অসহায় মনে হয় নিজেকে তখন। কিছু কথা থাকে যা শুধু একজনকেই বলা যায় । কিন্তু সেই একজন ও থাকে না কিছু অভাগা মানুষের কাছে! তখন নিজেকে পৃথিবীর সব থেকে অসহায় মানুষ বলে মনে হয়। আর বুকটা কেমন যেনো মোচড় দিয়ে ওঠে । মনে হয়ে কষ্ট সামাল দিতে হৃদপিন্ড পাউন্ড করতে থাকে। তাই হয়তো এমন অনুভূতি হয়।

অতল বসেছে ছোঁয়ার ঠিক তিন বেঞ্চ সামনে। সে বারবার বিভিন্ন ছলে তাকাচ্ছে ছোঁয়ার দিকে। অতলের পাশে আজ শিহরণ বসেছে। যদিও সে অতলের পাশে খুব একটা বসে না। খুব কমই বসা হয়। তবুও আজ বসেছে। শিহরণের বন্ধু মহলের একজন অতল। কিন্তু অতল হচ্ছে সেই বন্ধুমহল থেকে পিছিয়ে পড়া একজন। শিহরণের বন্ধুমহলে একনিষ্ঠ বন্ধু বলতে তারা পাঁচ জন। যারা অন্য ছাত্রছাত্রীদের খুব একটা পাত্তা দেয় না। বরং তারা সুযোগ পেলেই তাদের সাথে মাঝে মাঝে প্রভাব খাটায়। অতল এসবের ধার ধারে না। তার সবার সাথে কম-বেশি ভালো সম্পর্ক । সবাই কম বেশি তাকে পছন্দ করে। আর শিহরণকেও সবাই পছন্দ করে তবে সে একটু কম কথা বলার পর্যায়ে। কারণ সে তার বন্ধুমহলে সব সময় থাকলেও তাদের অনাচারে থাকে না। মাঝেমধ্যে আবার ওদের নিষেধও করে তবে তারা তার কথা তখন পাত্তাই দেয় না।

অতল পিছন ফিরে দেখলো ছোঁয়াকে বড্ড বিষণ্ণ দেখাচ্ছে । চুলগুলো এলোমেলো , অবিন্যস্ত । মুখটা ফ্যাকাশে। ঠিক যেন কাঠ ফাটা রোদ্দুরে কোনো একটি দিনের বিষণ্ণ দুপুর নয়তো একলা একাকী কোনো রাত! তবে ছোঁয়া লিখছে। অতল ভাবলো ছোঁয়া কী এমন লিখছে? তাকে প্রায় সময় এমন লেখালেখি করতে দেখা যায় । তবে লেখার সময় একেক সময় একেক রকম অভিব্যক্তি দেখা যায় তার মুখে। আর এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে কারো উপর প্রচণ্ড বিরক্ত আর ডায়েরিতে লেখার মাধ্যমে তার সমস্ত বিরক্তি , রাগ, অভিমান ঢেলে দিচ্ছে তাতে। অতল মনে মনে ভাবছে ডায়েরির আত্মকথন,’আহ, ব্যথা পাচ্ছি এবার আমায় রেহাই দাও।’

শিহরণ অতলের মাথায় গাট্টা মেরে বলল,’পিছনে কি দেখিস বার বার? সামনে দেখ।’

অতল নির্বিকারভাবে বলল,’ছোঁয়াকে।’

শিহরণের হঠাৎ কেমন যেন অদ্ভুত অনুভূতি হলো । সে ঘাড় ঘুরিয়ে ছোঁয়াকে দেখল। তার মনের মধ্যে একটু খারাপ লাগা উঁকি দিলো। তবে অতলের ড্যাবড্যাব চোখ ছোঁয়ার দিকে তাক করা দেখে আবার প্রচণ্ড বিরক্তিতে ছেয়ে গেলো তার মনের আকাশ।

চলবে…ইন শা আল্লাহ্

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে