3 C
New York
Sunday, December 8, 2019
Home প্রতিযোগিতা কাছে_আসার_গল্প

কাছে_আসার_গল্প

কাছে_আসার_গল্প

অনামিকা_ইসলাম_অন্তরা

আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু শুভ্র। সেই স্কুল লাইফ থেকেই ওর সাথে আমার পরিচয়। তারপর কলেজ। কলেজ জীবন একসাথে কাটানোর পর ভর্তি হলাম ভার্সিটিতে। সেখানেও একসাথে। ওর প্রতি আগে থেকেই দুর্বল ছিলাম আমি। ভার্সিটিতে এসে একটু বেশীই ঝুঁকে পড়ি। সেখানে ক্লাসের চেয়ে আড্ডায় হতো বেশী। সেই আড্ডার মধ্যমণি ছিল ‘ও’। ভার্সিটির সবচেয়ে সুদর্শন এবং মেধাবী ছেলে ছিল শুভ্র। মেয়েদের একটা বিশাল লাইন সবসময় ওর পিছনে লেগেই লাগতো। আমি দুর থেকে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখতাম। মেয়েরা হাসাহাসি করে ওর উপর ঢলে পড়ত। সহ্য হতো না আমার। আবার মুখ ফুটে বলতেও পারতাম না। কেননা, ওর সাথে আমার ঘনিষ্ঠতা হলেও আন্তরিকতা হয়নি তখনো।

আমাদের ডিপার্টমেন্টে ছেলেদের লিডার ছিল ‘ও’ আর মেয়েদের ছিলাম আমি। স্যার একদিন আমাদের দুই লিডারের নাম্বার ব্ল্যাকবোর্ডে লিখে দিলেন বাকি ছেলে-মেয়েদের যোগাযোগ করার সুবিধার্থে। আমি সে সুযোগটা কাজে লাগালাম। ওর ফোন নাম্বারটা আমি টুকে নিলাম নোট খাতায়। গ্রীষ্মের ছুটি দিয়েছিল। পড়ন্ত এক বিকেলে আমি ওর নাম্বারে কল দেই। শুরুটা সেখান থেকেই। তরপর খুব ভালো একটা বন্ধুত্ব হয় আমাদের।

ভার্সিটি লাইফ শেষ হয়। একেকজন একেকদিকে চলে যায়। কিন্তু আমাদের বন্ধন অটুট থাকে। বছর দু’য়েক আগে ও মহিলা কলেজে বাংলার প্রভাষক হিসেবে জয়েন করে। ওর বিয়ের জন্য পাত্রী দেখার শুরুটা হয় তখন থেকেই। টানা দু’বছর ধরে অসংখ্য পাত্রী দেখেছে ওর ফ্যামিলি মেম্বার’রা। অবশেষে কিছুদিন আগে ওরা ওদের মনের মতো পাত্রীর সন্ধান পায়। খুব তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়েই দু’পক্ষের বোঝাপড়া হয়ে যায়। রাত পোহালেই ওদের আংটিবদল হবে। অনেক বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। আমার পরিবারের সবার’ই অনুষ্ঠানে থাকা বাধ্যতামূলক জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আব্বা মা অবশ্য বিকেলেই চলে গেছে ঐ বাড়িতে। ঘন্টা খানেক আগে বড় আপু অফিস থেকে আসে। ওরাও চলে গেছে। আমাকে সেধেছিল। যাইনি। নিজে থেকেই বাড়ির প্রহরী হিসেবে রয়ে গেলাম।

রাত্রি ১১টা বেজে ১৭মিনিট__
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেছি অনেকক্ষণ। কিন্তু নিদ্রাদেবী কিছুতেই ধরা দিলো না। আর পারছিলাম না। ডায়েরী হাতে নিয়ে আবারো বসলাম। কি লিখা যায় ভাবতেই মনে হলো কবিতাকে ছুটি দিয়েছি বেশ ক’বছর হলো। আজ বরং একটা কবিতা’য় লিখা যাক। মুখ দিয়ে কলমের ঢাকনা খুলে লিখতে শুরু করলাম-

“তোমাকে হারিয়ে ফেলেছি ভেবে মন খারাপের দোলনায় দোল খেয়েছি সকাল থেকে সন্ধ্যা। পড়ার টেবিলে অবহেলায় খুলে রাখা বইয়ের কালো অক্ষর ঝাপসা হয়েছে কতবার!

মাথার নিচে রাখা বালিশ ভিঁজে গেছে নিরব কান্নায়…

তারপর আবার একদিন মন দোয়ারে দাঁড়িয়ে তুমি! ঠোঁটের কোণে হাসি লুকিয়ে জানতে চাইলাম– “আবার এসেছো?”

তুমি অবাক হয়ে বললে–
“কেন, আর কোথায় বা যাবো…!”

লিখা শেষে কবিতাটা পড়ে নিলাম একবার। নিজের কবিতা পড়ে নিজেরই হাসি পাচ্ছে ভিষন। ‘এও কি সম্ভব? হারানো মানুষরা আদৌ কি ফিরে আসে?’
ভাবছিলাম আরো অনেক কিছুই। ফোনটা বেজে উঠল তখনি। ডায়েরীটা বন্ধ করে ফোন রিসিভ করলাম-
” হ্যাঁ, বল…”
– নতুন নাম্বার দিয়ে ফোন করেছি। তবুও চিনে গেছিস?(শুভ্র)
— তুই ছাড়া যে কেউ নেই আমার। তাইতো চিনে নিতে অসুবিধে হয় না…!
– কি বললি?
— বলছি কি করছিস? এত রাত্রে কল কেন দিলি? ঘুমাবি কখন?
– আরে ঘুমিয়েই ছিলাম। তারপর কি যে এক বাজে স্বপ্ন দেখছি। হুট করে জেগে গেছি। ভাবলাম, তোর কিছু হলো না তো!
— বোকা ছেলে! স্বপ্ন তো স্বপ্নই। এর জন্য এত টেনশনের কি আছে?
– এই! সত্যি করে বল। তুই ভালো আছিস তো?
— হ্যাঁরে, হ্যাঁ। আমি অনেক ভালো আছি।
– কিছু লুকাচ্ছিস না তো?
— আরে গাধা না। তুই বৃথা টেনশন করছিস।
– আচ্ছা, রাতে খেয়েছিস?
— শুভ্র অনেক রাত হয়েছে। তুই ঘুমা।
– তুই ঘুমাইবি না?
— হ্যাঁ, আমিও ঘুমাবো। তুই এখন ঘুমা প্লিজ…
– আচ্ছা, রাখছি। বাই।

কল কেটে দেয় শুভ্র। চোখের জল বাঁধ মানছিল না। হু, হু করে কেঁদে দিলাম। ভিতরে যন্ত্রণা হচ্ছে প্রচুর। মনে হচ্ছে কেউ যেন হাতুড়ি দিয়ে দুরমুশ পিটাচ্ছে। লাইটটা অফ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু ঘুম চোখে ধরা দিল না। অন্ধকারে বিছানায় উঠে বসলাম। হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে আছি। চোখের জলে হাঁটু ভিঁজে একাকার হয়ে গেছে। ফোনটা বেজে উঠল আবারো। শুভ্র ফোন দিয়েছে। রিসিভ করে কানে ধরলাম-
” কি হলো? ফোন কেন ধরছিস না? সেই কখন থেকে ফোন দিচ্ছি?”

কান্না লুকিয়ে কন্ঠ’টা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলামঃ-
– ইয়ে, মানে, আসলে…
— আসলে কি?
– ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম।
— ওহ, আচ্ছা।
– ঘুমাসনি এখনো?
— তোদের বাসার নিচে দাঁড়িয়ে আছি।
– কিহ?
— হ্যাঁ। আসবি?

ফোন কানে দ্রুত বারান্দায় গেলাম। নিচে তাকাতেই দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে ‘ও’। ‘তুই দাঁড়া, আমি আসছি’ বলেই দৌঁড় দিয়ে নিচে নামলাম।
– এত রাত্রে না আসলেও পারতি…!
— এখানে দাঁড় করিয়ে রাখবি?
– আয়। ভেতরে আয়….

ও গেইটের ভেতরে ঢুকলে তালা না লাগিয়েই দোতলায় রুমের দিকে এগুতে লাগলাম। ও আমার পিছু পিছু হাঁটছে-
” বস….”
– তোদের বাড়িটা অনেক সুন্দর।
— Tnq u…
– আচ্ছা, তুই ভালো আছিস তো?
— শুভ্র, এই পানিটুকু তুই খেয়ে নে।
– ………..
— এবার বল। কি এমন স্বপ্ন দেখছিস যার জন্য তোকে এখানে ছুটে আসতে হলো?
– তুই ভালো আছিস তো…
— বার বার একই প্রশ্ন করবি না তো…!
– আমি তোকে ছুঁয়ে দেখতে পারি?
— এসব কি পাগলামী হচ্ছে শুভ্র?
– আমি না খুব বাজে স্বপ্ন দেখছি।
— কি স্বপ্ন? বল শুনি…
– বলবো। তার আগে আমায় ছুঁয়ে কথা দে আমার একটা প্রশ্নের সত্যি উত্তর দিবি।
— কথা দিলাম। এই আমি তোকে ছুঁয়ে কথা দিলাম তোর সমস্ত প্রশ্নের ঠিকঠাক এবং সত্যি উত্তর দেবো।
– ভালোবাসিস কাউকে?

ঘাবড়ে গেলাম আমি। বসা থেকে উঠে দাঁড়ালাম। ও বসা থেকেই জানায়-
” আমায় ছুঁয়ে কথা দিয়েছিস কিন্তু….”
– হু,
— এবার বল। ভালোবাসিস কাউকে?
– হু, বাসতাম।
— বাসতিস? এখন বাসিস না?
– কাল ও অন্যজনের হয়ে যাবে।
— কিহ? কিসব বলছিস তুই? কে সেই ছেলে? বাড়ি কোথায়?
– আমাদের বাসার সবাই ও বাড়িতেই আছে। দাওয়াত দিয়েছে কি না…
— এই মেয়ে! পাগল হয়ে গেলি নাকি তুই?
– পাগলই বটে। ওর প্রেমে পাগল।
— ওকে, ফাইন। এটা বল, নাম কি ছেলের?
– শুভ্র….

শুভ্র ফিরে তাকায় আমার দিকে। আমার জলে ভেঁজা চোখ দুটি যেন ওকে কিছু বলছে। ও গভীর ধ্যানে আমার সেই চোখের দিকে তাকিয়ে দৃষ্টির ভাষা বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছে। মিনিট তিনেক পর উঠে দাঁড়ায়। প্রতিধ্বনিত হয় একটি ছোট্ট শব্দ- ” আসি…..”

ও চলে যায়। কান্নায় ভেঙে পড়ি আমি। টেবিলে মাথা রেখে ছোট বাচ্চাদের মতো হাউমাউ করে কাঁদছি আমি…

এদিকে শুভ্র গেইট থেকে বাহির হতেই একটি যুবক ছুটে আসে ওর কাছে। হাপাতে হাপাতে লোকটি শুভ্রর সাহায্য চায়। তারপরের কথোপকথনঃ-
– কি সমস্যা ভাইয়া?
— ভাই প্লিজ আমাকে কয়টা টাকা দিন।
– কেন? আর কিসের টাকা দেবো আমি আপনাকে?
— আমার গার্লফ্রেন্ড বিষ খেয়ে মারা গেছে। পুলিশ আমাকে খুঁজছে। আমার এখন পালাতে হবে?
– কিকিকি বলছেন এসব? আপনি খুনি?
— আমি খুন করিনি। ওর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। আজ বিকেলে আমায় দেখা করার জন্য ডেকেছিল। আমি দেখা করতে গেলে ওকে বুঝাই- ‘দেখো লিপি! যা হওয়ার তাতো হয়ে গেছে। বাবা মা যেহেতু বিয়ে ঠিক করেছেন। সেহেতু তুমি বিয়েটা করে নাও। আর তাছাড়া আমি বেকার। তোমাকে বিয়ে করে খাওয়াবো কি…?’
– তারপর?
— অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে চলে আসি আমি।
– তখনই ও বিষ খায়।
— কেউ দেখেনি/টের পায়নি?
– নাহ। ও ঐ স্থানে বসে বিষ খেয়েছে, যে নির্জন স্থানে আমাদের শেষ কথা হয়।
— মারা গেছে?
– হ্যাঁ…
— নিন। (২০০০টাকা বাড়িয়ে দিয়ে)
– অশেষ কৃতজ্ঞতা ভাইয়া।
— সাবধানে থাকবেন।
– আল-বিদা।

দেখতে দেখতে লোকটি দুরে কোথাও মিলিয়ে যায়। পিছু হটে শুভ্র। তালা’টা লাগানো হয়নি, গেইট’টা তখনো খুলা ছিল। দু’তলার ১ম রুম অতিক্রম করে ভিতর রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় শুভ্র। দরজার সামনে কারো উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা তুলে তাকালাম আমি। ভেঁজা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে শুভ্র। ঠোঁটের কোণের হাসি লুকিয়ে জানতে চাইলাম-
” আবার এসেছিস?”

রুমের ভেতরে চলে আসলো ও। টেবিল ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি। পরম নিবিড়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে নিল ও আমাকে। তারপর অনেকটা কবিতার মতই অবাক করা কন্ঠে বলল-
” কেন, আর কোথায় বা যাবো…!”

  1. #কাছে_আসার_গল্প
    #অনামিকা_ইসলাম_অন্তরা
অনামিকা ইসলাম অন্তরা
অনামিকা ইসলাম অন্তরাhttps://www.facebook.com/anamikaislam.antora.9
" আমিই শুধু রইনু বাকি। যা ছিল তা গেল চলে,রইল যা তা কেবল ফাঁকি।।"

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Lists of writers

Sultana Toma
200 POSTS0 COMMENTS
Maria Kabir
159 POSTS1 COMMENTS
Jubaida Sobti
126 POSTS0 COMMENTS
Rabeya Sultana Nipa
117 POSTS0 COMMENTS
Jannatul Ferdaus
64 POSTS0 COMMENTS
Jannatul Ferdous
48 POSTS1 COMMENTS
মিম
42 POSTS0 COMMENTS
Tabassum Riana
21 POSTS0 COMMENTS
AL Mohammad Sourav
15 POSTS0 COMMENTS
Shahazadi Humasha
12 POSTS0 COMMENTS
Abdullah Al Ador Mamun
11 POSTS0 COMMENTS
Tamanna
10 POSTS0 COMMENTS
Farzana Akter
8 POSTS0 COMMENTS
Umme Nipa
7 POSTS0 COMMENTS
Sadiya Afrin
7 POSTS0 COMMENTS
Nilufar_Nijhum Nijhum
4 POSTS0 COMMENTS
Tamanna Khan
4 POSTS0 COMMENTS
Shahriar Shuvro Sabbir
3 POSTS0 COMMENTS
Maruf Sabbir
3 POSTS0 COMMENTS
Joy Khan
2 POSTS0 COMMENTS

Most Popular

বা‌লিকা বধূ ৫ম পর্বঃ-শেষ পর্ব

বা‌লিকা বধূ ৫ম পর্বঃ-শেষ পর্ব #লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী____) ----------তনয়‌াঃ আজ থে‌কে আমি মুক্ত মা! আয়াত না‌মের...

বা‌লিকা বধূ ৪র্থ পর্বঃ

বা‌লিকা বধূ ৪র্থ পর্বঃ #লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী_____) --------আয়াতঃ প্লিজ তনয়া ব‌লো কি হ‌য়ে‌ছে? প্লিজ-----? তনয়াঃ আয়াত আজ পর্যন্ত...

বা‌লিকা বধূ ৩য় পর্ব

বা‌লিকা বধূ ৩য় পর্ব #লেখ‌াঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী____) ---------তনয়ার ঘুমোন্ত মুখটার দি‌কে তা‌কি‌য়ে দেখ‌তে দেখ‌তে ওখা‌নেই ঘু‌মি‌য়ে...

বা‌লিকা বধূ ২য় পর্বঃ

বা‌লিকা বধূ ২য় পর্বঃ লেখাঃ_শার‌মিন_আক্তার_(#সাথী_____) ---------তনয়া ঘুমা‌চ্ছে আর আয়াত তা‌কি‌য়ে আছে তনয়ার...

Latest Posts

More