ওয়াদা ৩৯

0
3141

ওয়াদা
৩৯
উনি চান আমি যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে তার মেয়েকে বিয়ে করি। আমি আগে জানতাম না আমার আর মেঘপরীর বিয়েটা ছোট বেলা থেকেই ঠিক করা। আংকেল সেদিন আমায় সবকিছু বলেন। যখন জানতে পেরেছিলাম আমার মেঘপরীর সাথে আমার বিয়ে তখন আমি আর অরুপ রুমেই ছিলাম। ফোনটা কাটার পর আমি অরুপকে কোলে তুলে ডান্স করেছিলাম। খুশিতে আমার চোখ বেয়ে পানি পরছিলো। অরুপ শয়তানটা আমাদের সব ফ্রেন্ডদের আমার বিয়ের ব্যাপারটা বলে দিয়েছিলো। সেদিনই সবাই মিলে আমার পকেট ফাকা করেছিলো। যদিও ওরা সবাই ভার্সিটি লাইফের প্রথম থেকেই জানতো আমি মেঘপরীকে ভালোবাসি কিন্তু বিয়ের কথা শুনে ওদের সবাইকে খাওয়াতে হয়েছিলো। আমি সব সময় অরুপদের সাথে আমার মেঘপরীর গল্প করতাম। এক কথা বার বার বলতাম। আমার মেঘপরী এমন, ওর এটা পছন্দ এটা অপছন্দ। আমি সবসময় ওর প্রিয় রঙের জামা কাপড় পরতাম। অরুপরা এটা নিয়ে খুব মজা করতো। ওদের আমি বলে দিয়েছিলাম আমার মেঘপরীকে যেন ভুল করেও কেউ মেঘপরী না বলে সবাই ওকে ভাবী বলবে। তাই যখনই মেঘপরীকে নিয়ে কথা হতো সবাই ভাবী বলতো কিন্তু অরুপ মাঝে মাঝে ফাজলামি করে মেঘপরী বলতো আর আমার হাতে মারও খেত। আমি শুধু দিন গুনতাম কবে আমার পরীক্ষাটা শেষ হবে আর আমি দেশে ফিরে আমার মেঘপরীকে নিজের করে নিবো। সময় যেন কাটছিলোই না। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন জানতে পারি আংকেল আর নেই। সেদিন বার বার আংকেলর বলা কথাগুলো মনে পরছিলো। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না আংকেল আর নেই। উনি নিজের হাতে মেঘপরীকে আমার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। নিজেকে খুব বেশি অসহায় লাগছিলো এটা ভেবে আমার মেঘপরীর এমন কষ্টের সময় যখন ওর সব থেকে বেশি আমাকে প্রয়োজন তখনই আমি ওর পাশে থাকতে পারলাম না। আমার মেঘপরীটা যে অনেক বেশি ইমোশোনাল ও কিভাবে নিজেকে সামলাবে, কিভাবে মেনে নিবে এই ঘটনাটা সব সময় এই টেনশন হতো। আমি না পারছিলাম ওখানে থাকতে আর না পারছিলাম দেশে ফিরতে কারণ পরীক্ষার মাত্র কয়েক মাস বাকি ছিলো। আর মেঘপরীর তখন সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হয়েছিলো। ওকে নিয়ে সব সময় টেনশনে থাকতাম। কিন্তু আমি যার জন্য সারাটাক্ষণ টেনশন করে মরছিলাম, যার কথা প্রতিক্ষণে ভাবছিলাম তখন সে অন্য কারোর সাথে নিজের দুঃখটা ভাগ করে নিজের মনটাকে হালকা করায় ব্যস্ত ছিলো। আমার স্কুল ফ্রেন্ড রাতুলের বোন মেঘপরীর কলেজেই পড়তো। ওই রাতুলকে বলে আমার মেঘপরী নাকি শুভ নামের একটা ছেলের সাথে প্রেম করে আর ওই ছেলেটার জন্য মেঘপরী তার বেস্ট ফ্রেন্ড তন্নির গায়ে হাত তুলেছে। রাতুল আমার মেঘপরীকে চিনতো আর জানতোও আমি ওকে ভালোবাসি। তাই ও আমায় সবকিছু বলে। যখন ও আমায় কথা গুলো বলেছিলো তখন আমি ওকে খুব বকেছিলাম কারণ আমি ওইসব বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। জানো যখন শুনেছিলাম আমার মেঘপরী আর আমার নেই তখন আমার পুরো দুনিয়াটাই ওলটপালট হয়ে গেছিলো। আমার ভালোবাসা, আমার সব স্বপ্ন, আমার অস্বিত্ত্ব সব কিছু এক নিমিষেই যেন মিথ্যে হয়ে গেছিলো। পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায়। জীবনে প্রথম চিৎকার করে কেঁদেছিলাম আমি। কোন স্বান্তনাতেই সেদিন মন মানছিলো না। বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি যেন আমার প্রাণ ভোমর টাকেই হারিয়ে ফেলেছি। অরুপকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কেঁদেছিলাম সেদিন। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছিলো। বেচে থাকার কোন কারণ খুজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু সেদিন অরুপ আমার পাশে ছিলো। ও আমাকে সামলে নিয়েছিলো। ওর জন্যই আমি সব কিছু মেনে নিয়েছিলাম কারণ ও আমায় বুঝিয়েছিলো যে মেঘপরী যেটাতে সুখী থাকে আমায় ওকে সেটা করতে দেওয়া উচিত। ওর ভালোবাসা পাওয়ার থেকে ওর ভালো থাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমিও তাই করেছিলাম আমার মনের কথাগুলো মনেই রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওর সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দি। কারণ ওর সাথে কথা বললে আমি দুর্বল হয়ে পরতাম। আমি ওর প্রতি আর দুর্বল হতে চাইনি তাই বাধ্য হয়ে ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দি। ওর সাথে কথা না বলে থাকতে খুব কষ্ট হতো কিন্তু তাও নিজেকে সামলে নিতাম। আস্তে আস্তে আমার পরীক্ষাও শেষ হয়ে যায়। পরীক্ষা শেষের কয়েকদিন পরেই অরুপ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে কারণ রাত্রির ওর সাথে ছাড়া আরও একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো। রাত্রি আমাদেরই ফ্রেন্ড ছিলো। অরুপ আর রাত্রির সম্পর্কটা শুরু হয় আমরা সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরপরই। অরুপ রাত্রিকে পাগলের মতো ভালোবাসতো কিন্তু রাত্রি টাকার লোভে পরে অরুপকে ছেড়ে চলে যায়। রেজাল্ট বেরোনোর সাথে সাথেই অরুপকে নিয়ে দেশে ফিরে আসি। দেশে আসার পর থেকেই মেঘপরীর সাথে কথা বলতাম না। ও কথা বলতে আসলেই ওকে বকাবাকি করতাম। কারণ ওর সাথে আগের মতো মিলামিশা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। ও সামনে আসলে আমি দুর্বল হয়ে পরতাম, খুব কষ্ট হতো, বার বার মনে পরতো ও আমার নয় অন্য কারোর তাই ওর সাথে বাজে ব্যবহার করতাম যাতে ও নিজে থেকেই আমার কাছ থেকে দুরে থাকে। কিন্তু যখন জানতে পারলাম শুভ নামের ছেলেটি আসলে একজন ঠক, ও মেঘপরীকে ভালোবাসে না বিশ্বাস করো খুব রাগ হয়েছিলো যে ও আমার মেঘপরীর সাথে ছলনা করেছে কিন্তু স্বার্থপরের মতো আবার খুশিও হয়েছিলাম সেদিন মেঘপরীকে নিজের করে পাওয়ার আর একটা সুযোগ পেয়ে। শুভর সব সত্যি সামনে এনে মেঘপরীর ভুলটা ভাঙিয়ে দিয়েছিলাম। আমার মেঘপরীটাও আস্তে আস্তে সব ভুলে আমায় ভালোবাসতে শুরু করলো। কিন্তু মাথা মোটা মেঘপরীটা ভাবলো আমি রাত্রিকে ভালোবাসি। রাত্রি নিজের ভুল বুঝতে পেরে অরুপের কাছে ফিরে আসতে চাইছিলো। অরুপের সাথে এই দুই বছর লন্ডনে পরিচিত হওয়া কোনো ফ্রেন্ডের সাথে যোগাযোগ ছিলো শুধুমাত্রর আমার সাথে ছাড়া। কেউ ওর ঠিকানা, ফোন নাম্বার জানতো না। তাই রাত্রি আমার কাছে এসেছিলো অরুপের ঠিকানা জানতে। আমি ওর উপর খুব রেগেছিলাম তাই ও যতবার আমার কাছে এসেছে যতবারই ওকে অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছি। সেদিন রাতে আমি আর মেঘপরী যখন ছাদে বসে কফি খাচ্ছিলাম তখন রাত্রি কল করে বলে যে অরুপের সাথে ওর দেখা হয়েছে আর অরুপ জ্ঞান হারিয়ে। সেজন্য আমি তাড়াতাড়ি অরুপের কাছে চলে যায়। অরুপের জ্ঞান ফিরলে রাত্রি অরুপের কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চাই অরুপও রাত্রিকে ক্ষমা করে দেয়। আর সেদিন রাতেই ওদের বিয়ের ডেট ফাইনাল করে বাড়ি ফিরি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর শাশুড়ি মা বলেলে তার মেয়ে নাকি আমায় ভালোবাসে আর ও ভাবছে আমি নাকি রাত্রিকে ভালোবাসি। আমি যে মেঘপরীকে ভালোবাসতাম সেটা সবাই জানতো বা বুঝতে পেরেছিলো শুধু মাত্র মেঘপরী ছাড়া। শাশুড়ি মার কাছ থেকে এটা শুনে যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম সেটা আর নাই বা বললাম। তবে আমায় এতোদিন ধরে কষ্ট দেওয়ার জন্য ভাবলাম তারও একটু কষ্ট পাওয়া উচিত। তাই বাড়ি ফিরে ইচ্ছা করেই ‘আমার স্বপ্ন যে সত্যি হলো আজ’ গানটা গাইতে লাগলাম। যদিও গানটার কথাটা সত্যি ছিলো। আমার স্বপ্ন সেদিন সত্যি হয়েছিলো আমি আমার মেঘপরীর ভালোবাসা পেয়েছিলাম।। শরীরটা কেমন লাগছিলো তাই গোসল করেছিলাম আর আমার উনি একটু বেশিই বুঝেছিলেন আমি নাকি রাত্রির সাথে ওনার ভাষায় যেটাকে আকাম কুকাম বলে সেটা করে এসেছি। ওকে এইভাবে জ্বালাতে আর দোটানায় রাখতে, ওরর এমন রাগ করা সবকিছু খুব ইনজয় করছিলাম। ওর রাগগুলো প্রতিনিয়ত আমায় বুঝিয়ে দিচ্ছিলো ও আমায় কতটা ভালোবাসে। কিন্তু সেদিন রাতে সব অভিমান, রাগ ভুলে ওকে আপন করে নি। সেদিনন রাতে আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়। কিন্তু সকালে রাত্রির মেসেজ দেখে উনি আবার আমায় ভুল বোঝেন। রাত্রি সেদিন ওর বিয়ের লেহেঙ্গা চেন্জ করারার জন্য ফোন করেছিলো কারণ ওর লেহেঙ্গাটা আমি আর অরুপ গিয়ে কিনেছিলাম। অরুপই পছন্দ করেছিলো কিন্তু ড্রেসটাই একটু প্রবলেম ছিলো অরুপ যেতে পারবে না তাই আমায় ডেকেছিলো। কিন্তু আমার বউটা ভাবলো আমি দুজনের সাথেই সম্পর্ক রাখছি। আমি ওকে ব্যবহার করছি তাই সারাদিন আমার কাছ থেকে দুরে দুরে থেকেছে। আমি রাত্রির কথা ওকে বলতে চাইছিলাম কিন্তু ও সুযোগই দেয়নি কিছু বলার। ভাবলাম বিয়ে বাড়িতে গিয় বউ হিসাবে রাত্রিকে দেখলে ও চমকে যাবে আর ওর সব ভুল ভেঙে যাবে। কিন্তু আমার পাগলী বউটা রাত্রিকে দেখে জ্ঞানটাই হারিয়ে ফেললো। হা হা হা। আচ্ছা দাড়াও তোমায় কিছু দেখায়।(বলে ও উঠে আলমারি খুলে একটা বক্স নিয়ে আসলো) আমায় বললো বক্সটা খুলতে। আমি বক্সটা খুললাম। বক্সের মধ্যে আমার আর মেঘের ছোট বেলা থেকে শুরু করে ওর লন্ডন যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক ছবি আছে, আমার ছোটবেলার একটা জামা আছে, চুরি আছে, চুলের ক্লিপ আছে, একটা খাতাও আছে খাতাটা আমার ছোট বেলার। এই খাতাটাতেই ও আমায় প্রথম অ, আ, ক, খ, A, B, C, D লেখা শিখিয়ে ছিলো, প্রথম কলমটাও আছে। এমন আরো অনেক কিছু আছে। এতোগুলো বছর ধরে ও আমার জিনিস গুলো এইভাবে যন্ত করে তুলে রেখেছে আমি ভাবতেই পারছিনা। এতোটা ভালোবাসে আমায় ও।(হঠাৎ করেই ও আমায় জড়িয়ে ধরে বলতে উনি চান আমি যেন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে তার মেয়েকে বিয়ে করি। আমি আগে জানতাম না আমার আর মেঘপরীর বিয়েটা ছোট বেলা থেকেই ঠিক করা। আংকেল সেদিন আমায় সবকিছু বলেন। যখন জানতে পেরেছিলাম আমার মেঘপরীর সাথে আমার বিয়ে তখন আমি আর অরুপ রুমেই ছিলাম। ফোনটা কাটার পর আমি অরুপকে কোলে তুলে ডান্স করেছিলাম। খুশিতে আমার চোখ বেয়ে পানি পরছিলো। অরুপ শয়তানটা আমাদের সব ফ্রেন্ডদের আমার বিয়ের ব্যাপারটা বলে দিয়েছিলো। সেদিনই সবাই মিলে আমার পকেট ফাকা করেছিলো। যদিও ওরা সবাই ভার্সিটি লাইফের প্রথম থেকেই জানতো আমি মেঘপরীকে ভালোবাসি কিন্তু বিয়ের কথা শুনে ওদের সবাইকে খাওয়াতে হয়েছিলো। আমি সব সময় অরুপদের সাথে আমার মেঘপরীর গল্প করতাম। এক কথা বার বার বলতাম। আমার মেঘপরী এমন, ওর এটা পছন্দ এটা অপছন্দ। আমি সবসময় ওর প্রিয় রঙের জামা কাপড় পরতাম। অরুপরা এটা নিয়ে খুব মজা করতো। ওদের আমি বলে দিয়েছিলাম আমার মেঘপরীকে যেন ভুল করেও কেউ মেঘপরী না বলে সবাই ওকে ভাবী বলবে। তাই যখনই মেঘপরীকে নিয়ে কথা হতো সবাই ভাবী বলতো কিন্তু অরুপ মাঝে মাঝে ফাজলামি করে মেঘপরী বলতো আর আমার হাতে মারও খেত। আমি শুধু দিন গুনতাম কবে আমার পরীক্ষাটা শেষ হবে আর আমি দেশে ফিরে আমার মেঘপরীকে নিজের করে নিবো। সময় যেন কাটছিলোই না। কিন্তু হঠাৎ করেই একদিন জানতে পারি আংকেল আর নেই। সেদিন বার বার আংকেলর বলা কথাগুলো মনে পরছিলো। আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না আংকেল আর নেই। উনি নিজের হাতে মেঘপরীকে আমার হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। নিজেকে খুব বেশি অসহায় লাগছিলো এটা ভেবে আমার মেঘপরীর এমন কষ্টের সময় যখন ওর সব থেকে বেশি আমাকে প্রয়োজন তখনই আমি ওর পাশে থাকতে পারলাম না। আমার মেঘপরীটা যে অনেক বেশি ইমোশোনাল ও কিভাবে নিজেকে সামলাবে, কিভাবে মেনে নিবে এই ঘটনাটা সব সময় এই টেনশন হতো। আমি না পারছিলাম ওখানে থাকতে আর না পারছিলাম দেশে ফিরতে কারণ পরীক্ষার মাত্র কয়েক মাস বাকি ছিলো। আর মেঘপরীর তখন সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা শেষ হয়েছিলো। ওকে নিয়ে সব সময় টেনশনে থাকতাম। কিন্তু আমি যার জন্য সারাটাক্ষণ টেনশন করে মরছিলাম, যার কথা প্রতিক্ষণে ভাবছিলাম তখন সে অন্য কারোর সাথে নিজের দুঃখটা ভাগ করে নিজের মনটাকে হালকা করায় ব্যস্ত ছিলো। আমার স্কুল ফ্রেন্ড রাতুলের বোন মেঘপরীর কলেজেই পড়তো। ওই রাতুলকে বলে আমার মেঘপরী নাকি শুভ নামের একটা ছেলের সাথে প্রেম করে আর ওই ছেলেটার জন্য মেঘপরী তার বেস্ট ফ্রেন্ড তন্নির গায়ে হাত তুলেছে। রাতুল আমার মেঘপরীকে চিনতো আর জানতোও আমি ওকে ভালোবাসি। তাই ও আমায় সবকিছু বলে। যখন ও আমায় কথা গুলো বলেছিলো তখন আমি ওকে খুব বকেছিলাম কারণ আমি ওইসব বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। জানো যখন শুনেছিলাম আমার মেঘপরী আর আমার নেই তখন আমার পুরো দুনিয়াটাই ওলটপালট হয়ে গেছিলো। আমার ভালোবাসা, আমার সব স্বপ্ন, আমার অস্বিত্ত্ব সব কিছু এক নিমিষেই যেন মিথ্যে হয়ে গেছিলো। পাগল হয়ে গেছিলাম প্রায়। জীবনে প্রথম চিৎকার করে কেঁদেছিলাম আমি। কোন স্বান্তনাতেই সেদিন মন মানছিলো না। বুকটা ফেটে যাচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো আমি যেন আমার প্রাণ ভোমর টাকেই হারিয়ে ফেলেছি। অরুপকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মতো কেঁদেছিলাম সেদিন। নিজেকে শেষ করে দিতে ইচ্ছা করছিলো। বেচে থাকার কোন কারণ খুজে পাচ্ছিলাম না। কিন্তু সেদিন অরুপ আমার পাশে ছিলো। ও আমাকে সামলে নিয়েছিলো। ওর জন্যই আমি সব কিছু মেনে নিয়েছিলাম কারণ ও আমায় বুঝিয়েছিলো যে মেঘপরী যেটাতে সুখী থাকে আমায় ওকে সেটা করতে দেওয়া উচিত। ওর ভালোবাসা পাওয়ার থেকে ওর ভালো থাকাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত। আমিও তাই করেছিলাম আমার মনের কথাগুলো মনেই রেখে দিয়েছিলাম। কিন্তু ওর সাথে সমস্ত যোগাযোগ বন্ধ করে দি। কারণ ওর সাথে কথা বললে আমি দুর্বল হয়ে পরতাম। আমি ওর প্রতি আর দুর্বল হতে চাইনি তাই বাধ্য হয়ে ওর সাথে কথা বলা বন্ধ করে দি। ওর সাথে কথা না বলে থাকতে খুব কষ্ট হতো কিন্তু তাও নিজেকে সামলে নিতাম। আস্তে আস্তে আমার পরীক্ষাও শেষ হয়ে যায়। পরীক্ষা শেষের কয়েকদিন পরেই অরুপ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে কারণ রাত্রির ওর সাথে ছাড়া আরও একটা ছেলের সাথে সম্পর্ক ছিলো। রাত্রি আমাদেরই ফ্রেন্ড ছিলো। অরুপ আর রাত্রির সম্পর্কটা শুরু হয় আমরা সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পরপরই। অরুপ রাত্রিকে পাগলের মতো ভালোবাসতো কিন্তু রাত্রি টাকার লোভে পরে অরুপকে ছেড়ে চলে যায়। রেজাল্ট বেরোনোর সাথে সাথেই অরুপকে নিয়ে দেশে ফিরে আসি। দেশে আসার পর থেকেই মেঘপরীর সাথে কথা বলতাম না। ও কথা বলতে আসলেই ওকে বকাবাকি করতাম। কারণ ওর সাথে আগের মতো মিলামিশা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। ও সামনে আসলে আমি দুর্বল হয়ে পরতাম, খুব কষ্ট হতো, বার বার মনে পরতো ও আমার নয় অন্য কারোর তাই ওর সাথে বাজে ব্যবহার করতাম যাতে ও নিজে থেকেই আমার কাছ থেকে দুরে থাকে। কিন্তু যখন জানতে পারলাম শুভ নামের ছেলেটি আসলে একজন ঠক, ও মেঘপরীকে ভালোবাসে না বিশ্বাস করো খুব রাগ হয়েছিলো যে ও আমার মেঘপরীর সাথে ছলনা করেছে কিন্তু স্বার্থপরের মতো আবার খুশিও হয়েছিলাম সেদিন মেঘপরীকে নিজের করে পাওয়ার আর একটা সুযোগ পেয়ে। শুভর সব সত্যি সামনে এনে মেঘপরীর ভুলটা ভাঙিয়ে দিয়েছিলাম। আমার মেঘপরীটাও আস্তে আস্তে সব ভুলে আমায় ভালোবাসতে শুরু করলো। কিন্তু মাথা মোটা মেঘপরীটা ভাবলো আমি রাত্রিকে ভালোবাসি। রাত্রি নিজের ভুল বুঝতে পেরে অরুপের কাছে ফিরে আসতে চাইছিলো। অরুপের সাথে এই দুই বছর লন্ডনে পরিচিত হওয়া কোনো ফ্রেন্ডের সাথে যোগাযোগ ছিলো শুধুমাত্রর আমার সাথে ছাড়া। কেউ ওর ঠিকানা, ফোন নাম্বার জানতো না। তাই রাত্রি আমার কাছে এসেছিলো অরুপের ঠিকানা জানতে। আমি ওর উপর খুব রেগেছিলাম তাই ও যতবার আমার কাছে এসেছে যতবারই ওকে অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছি। সেদিন রাতে আমি আর মেঘপরী যখন ছাদে বসে কফি খাচ্ছিলাম তখন রাত্রি কল করে বলে যে অরুপের সাথে ওর দেখা হয়েছে আর অরুপ জ্ঞান হারিয়ে। সেজন্য আমি তাড়াতাড়ি অরুপের কাছে চলে যায়। অরুপের জ্ঞান ফিরলে রাত্রি অরুপের কাছে হাত জোর করে ক্ষমা চাই অরুপও রাত্রিকে ক্ষমা করে দেয়। আর সেদিন রাতেই ওদের বিয়ের ডেট ফাইনাল করে বাড়ি ফিরি। কিন্তু বাড়ি ফেরার পর শাশুড়ি মা বলেলে তার মেয়ে নাকি আমায় ভালোবাসে আর ও ভাবছে আমি নাকি রাত্রিকে ভালোবাসি। আমি যে মেঘপরীকে ভালোবাসতাম সেটা সবাই জানতো বা বুঝতে পেরেছিলো শুধু মাত্র মেঘপরী ছাড়া। শাশুড়ি মার কাছ থেকে এটা শুনে যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছিলাম সেটা আর নাই বা বললাম। তবে আমায় এতোদিন ধরে কষ্ট দেওয়ার জন্য ভাবলাম তারও একটু কষ্ট পাওয়া উচিত। তাই বাড়ি ফিরে ইচ্ছা করেই ‘আমার স্বপ্ন যে সত্যি হলো আজ’ গানটা গাইতে লাগলাম। যদিও গানটার কথাটা সত্যি ছিলো। আমার স্বপ্ন সেদিন সত্যি হয়েছিলো আমি আমার মেঘপরীর ভালোবাসা পেয়েছিলাম।। শরীরটা কেমন লাগছিলো তাই গোসল করেছিলাম আর আমার উনি একটু বেশিই বুঝেছিলেন আমি নাকি রাত্রির সাথে ওনার ভাষায় যেটাকে আকাম কুকাম বলে সেটা করে এসেছি। ওকে এইভাবে জ্বালাতে আর দোটানায় রাখতে, ওরর এমন রাগ করা সবকিছু খুব ইনজয় করছিলাম। ওর রাগগুলো প্রতিনিয়ত আমায় বুঝিয়ে দিচ্ছিলো ও আমায় কতটা ভালোবাসে। কিন্তু সেদিন রাতে সব অভিমান, রাগ ভুলে ওকে আপন করে নি। সেদিনন রাতে আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পায়। কিন্তু সকালে রাত্রির মেসেজ দেখে উনি আবার আমায় ভুল বোঝেন। রাত্রি সেদিন ওর বিয়ের লেহেঙ্গা চেন্জ করারার জন্য ফোন করেছিলো কারণ ওর লেহেঙ্গাটা আমি আর অরুপ গিয়ে কিনেছিলাম। অরুপই পছন্দ করেছিলো কিন্তু ড্রেসটাই একটু প্রবলেম ছিলো অরুপ যেতে পারবে না তাই আমায় ডেকেছিলো। কিন্তু আমার বউটা ভাবলো আমি দুজনের সাথেই সম্পর্ক রাখছি। আমি ওকে ব্যবহার করছি তাই সারাদিন আমার কাছ থেকে দুরে দুরে থেকেছে। আমি রাত্রির কথা ওকে বলতে চাইছিলাম কিন্তু ও সুযোগই দেয়নি কিছু বলার। ভাবলাম বিয়ে বাড়িতে গিয় বউ হিসাবে রাত্রিকে দেখলে ও চমকে যাবে আর ওর সব ভুল ভেঙে যাবে। কিন্তু আমার পাগলী বউটা রাত্রিকে দেখে জ্ঞানটাই হারিয়ে ফেললো। হা হা হা। আচ্ছা দাড়াও তোমায় কিছু দেখায়।(বলে ও উঠে আলমারি খুলে একটা বক্স নিয়ে আসলো) আমায় বললো বক্সটা খুলতে। আমি বক্সটা খুললাম। বক্সের মধ্যে আমার আর মেঘের ছোট বেলা থেকে শুরু করে ওর লন্ডন যাওয়ার আগ পর্যন্ত অনেক ছবি আছে, আমার ছোটবেলার একটা জামা আছে, চুরি আছে, চুলের ক্লিপ আছে, একটা খাতাও আছে খাতাটা আমার ছোট বেলার। এই খাতাটাতেই ও আমায় প্রথম অ, আ, ক, খ, A, B, C, D লেখা শিখিয়ে ছিলো, প্রথম কলমটাও আছে। এমন আরো অনেক কিছু আছে। এতোগুলো বছর ধরে ও আমার জিনিস গুলো এইভাবে যন্ত করে তুলে রেখেছে আমি ভাবতেই পারছিনা। এতোটা ভালোবাসে আমায় ও।(হঠাৎ করেই ও আমায় জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলো)
-কেউ একজন বলেছিলো মেয়েদের সিক্স সেন্স নাকি খুব স্ট্রং হয় তারা নাকি অনেক দুর থেকেও বুঝতে পারে কোন ছেলে তাকে ভালোবাসে তাহলে আমার মেঘপরী আমার ভালোবাসাটা বুঝতে পারলো না কেন? সব সময় ওর পাশাপাশি থাকার পরও ও আমার ভালোবাসাটা বোঝেনি কেন? আমার বুকে মাথা রেখেও আমার ভালোবাসাটা বোঝেনি কেন? আমার সাথে এক বিছানায় থেকেও কেন আমার ভালোবাসা বুঝতে পারেনি ও? আমার ভালোসায় কি কোন খাদ ছিলো বা আছে? আমি কি ওকে ততটা ভালোবাসতে পারিনি যতটা ওর দরকার? ও আমার ভালোবাসা কেন বুঝতে পারে না বলতে পারো? কেন এখনো আমায় সন্দেহ করে? কেন বুঝতে পারেনা আমি ওকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসি, ওর খুশির জন্য আমি সবকিছু করতে পারি। কেন বোঝেনা ও কেন?(বলতে বলতে কেঁদে দিলো)
আমিও কাঁদছি কি বলবো বা কি বলা উচিত আমি জানি না। কেউ আমায় সেই ছোট্ট বেলা থেকে এতটা ভালোবাসে আর আমি তার এতো কাছে থেকেও বুঝতে পারলাম না। কেন বুঝতে পারলাম না আমি? কেন বুঝিনি ওর ভালোবাসা। যদি বুঝতাম তাহলে ওকে এতো কষ্ট পেতে হতো না আর আমার জীবনে শুভও আসতো না আমাকে এতো কষ্টও পেতে হতো না। আমাদের জীবনটা একদম অন্য রকম হতো।(কাঁদতে কাঁদতে এইগুলা ভাবছি)
-এই মেঘপরী তুমি এভাবে কাঁদছো কেন?(আমায় ছেড়ে দিয়ে বললো)
আমি আবার ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম খুব কাঁদলাম। আমি এতোটা বোকা? এতটাই বোকা যে ওর এতো ভালোবাসা বুঝতেই পারি নি।
-এটাতে তোমার কোন দোষ নেই।(মেঘ)
-সব আমার দোষ, আমিই তোমার ভালোবাসাটা বুঝতে পারিনি, যদি একটুও বুঝতাম তাহলে তোমায় এতো কষ্ট পেতে হতো না।(কেঁদে কেঁদে বললাম)
-বলছি না তোমার দোষ না।
-আমারই দোষ।
-তোমার কোন দোষ নেই।
-বলছিতো সব আমার দোষ। আমিই তোমার ভালোবাসা বুঝতে পারিনি।
-হ্যা কিন্তু সেটাতে তোমার দোষ কোথায় বলো? আল্লাহ যদি তোমার মাথায় গোবর পুরে তৈরি করে তাতে তো তোমার কোন দোষ নেই না?(মেঘ মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বললো)
আমি ওকে ছেড়ে দিয়ে ওর দিকে রাগি চোখে তাকালাম।
-আমার মাথায় গোবর পোরা?
-হ্যা। তোমার কি কোন সন্দেহ আছে এটা নিয়ে? আমার কিন্তু নেই। আর তুমি খুব ভালো করেই জানো শাফিন এহসান মেঘ এর ধারণা কখনো ভুল হয় না।(একটু ভাব নিয়ে)
চলবে,,,

#মেহজাবিন_নাশরাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here