ওয়াদা ১৯

0
2576

ওয়াদা ১৯
তারপর আমরা গাড়িতে উঠে আবার তন্নিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রায় দেড় ঘন্টা পর পৌছালাম। গাড়িটা তন্নিদের বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই কোথা থেকে একদল বাচ্চা এসে গাড়িটা ঘিরে দাড়ালো। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। কিছু মধ্য বয়স্ক মহিলারাও এসেছে। সবাই আমার দিকে কেমন করে তাকিয়ে আছে আর নিজেদের মধ্য আলোচনা করছে। না এটা আলোচনা নয় এরা সবাই আমায় নিয়ে সমালোচনা করছে সেটা এদের দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আমায় দেখে এমন করার কোনো কারণ খুজে পাচ্ছি না। তন্নি আর ওর পরিবারের সবাই এসেছে। আমি সবার সাথে কুশল বিনিময় করে তন্নির রুমে গেলাম। আমায় নাকি এই কটাদিন ওর সাথেই থাকতে হবে। আমরা দু’জন কিছুক্ষন গল্প করতেই তন্নির মা এলো আমাদের খাবার খেতে ডাকতে।
-নাশু চল সবাই ওয়েট করছে।(তন্নি)
-হ্যা। কিন্তু অনেক জার্নি করে এসেছি একটু ফ্রেশ হয়ে খেলে ভালো হতো।
-আচ্ছা ঠিক আছে। তুই তাহলে ফ্রেশ হয়ে নিচে আয়। আমি মাকে বলছি।(বলেই চলে গেলো)
যাহ বাবা চলে গলো। ওয়াশরুমটা কোনদিকে সেটাইতো বললো না। আমাদের বাসায়তো প্রতিটা রুমের সাথে ওয়াশরুম আছে। কিন্তু এখানেতো নেই। আমি এখন কোথায় খুজবো। জামা কাপড় নিয়ে রুম থেকে বেরোলাম। দুই তলার এই বাড়িটা অনেক বড় আর অনেক পুরনো। অনেকটা জমিদার বাড়ি যেমনটা হয় তেমন। এতো সময় খেয়াল করিনি। বাড়িটা কেমন ভূতুরে টাইপের। আমি রুম থেকে বেরিয়ে কোন দিকে যাবো বুঝতে পারছিনা। ডান দিকে একটা গলি আর বাম দিকে একটা। দুটো গলিই একি রকম দেখতে। আমি ডান দিকে হাটছি ওয়াশরুম খোজার জন্য। শুনেছি তন্নির বাবা কাকারা নাকি অনেক রাগী আর ভয়ঙ্কর। সারাদিন নাকি মারামারি এইসব নিয়েই থাকে। বাড়িটাও ঠিক তেমনি। ওদের কাজের সাথে বাড়িটা খুব মানায়। আমি যত সামনে যাচ্ছি পরিবেশটা তত ঠান্ডা হয়ে আসছে। আমার একটু ভয় করতে লাগলো। আমি পেছন দিকে ঘুরলাম ফিরে যাবো বলে কিন্তু তাকিয়ে দেখলাম দুটো গলি। আমি কোন গলি দিয়ে এসেছি বুঝতেই পারছি না। দুটো গলিই দেখতে একি রকম। গোলক ধাদার মধ্য পরে গেলাম। আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে আর ভয় করছে। এ আমি কোথায় এসে পরলাম। হঠাৎ করেই মাথার উপর দিয়ে সাদা কি যেন একটা উড়ে গেলো আর আমি ভয়ে পেছন দিকে দৌড়াতে গিয়ে কার সাথে যেন ধাক্কা খেলাম। তাকিয়ে দেখলাম মেঘ। সঙ্গে সঙ্গে ওকে জড়িয়ে ধরে কান্না করে দিলাম।
-কি হয়েছে কাদছো কেন?
-(কেদেই চলেছি)
-আরে কি হয়েছে কাদছো কেন। বলবেতো কাদছো কেন?
-(কেদেই চলেছি)
-আচ্ছা একটা কথা বলতো আমায় দেখলেই কি তোমার কান্না পাই। যখনি আমার সামনে আসো তখনি কাদো। কি হয়েছে টা কি?
-ভূ,,,,ত।
-ভূত? কোথায় ভূত?
-ওখানে।(পেছন দিকে হাত দিয়ে দেখালাম)
-আচ্ছা ছাড়ো আমি দেখছি।
-না না না না প্লিজ আমায় ছেড়ে যাবেন না। প্লিজ যাবেন না।(বলে আরো শক্ত করে ধরলাম)
-না ছাড়লে বুঝবো কি করে তুমি কি দেখছ।
-না আমি আপনায় যেতে দিবো না। প্লিজ আমায় ছেড়ে যাবেন না।
-ওকে। আমি তোমায় ছেড়ে কোথায় যাচ্ছি না। কিন্তু আমায়তো ছাড়ো।
-না ছাড়বো না।
-ওকে। ছাড়তে হবে না। এবার বলতো তুমি কি দেখছ।
-আমি ওয়াশরুম এ যাবো বলে তন্নির রুম থেকে বেরিয়ে হাটতে লাগলাম। অনেকটা পথ আসার পরও যখন পেলাম না তখন পেছন দিকে তাকালাম কিন্তু দেখলাম দুটো গলি। আমি যখন এসেছিলাম তখন ওই গলিটা ছিলো না হঠাৎ করেই ওই গলিটা কোথা থেকে চলে আসলো। আর তারপর আমার মাথার উপর দিয়ে সাদা কি একটা উড়ে গেলো। এ বাড়িতে নিশ্চয় ভূত আছে।
-বুঝলাম। তারমানে তুমি ওই পাখিটা দেখে ভয় পেয়ছ।
-কোন পাখি?(ওকে ছেড়ে দিয়ে)
-একটু আগে তোমার মাথার উপর দিয়ে যেটা গেলো ওইটা পাখি ছিলো।
-ওটা পাখি ছিলো।
-হুম।
-আপনি কি ভাবে জানলেন।
-এই যে গলিটা দিয়ে আমি আসলাম এই গলিটা সোজা সিড়ি পর্যন্ত গিয়েছে। আমি ছাদে গিয়েছিলাম। ছাদ থেকে আসার সময় চিলেকোঠার ঘরটা খুলেছিলাম দেখবো বলে তখনি পাখিটা বেরিয়ে এদিকে আসলো।
-ওহ্। আর আমিতো ভূত ভেবে ভয়ই পেয়ে গেছিলাম।
-তোমার মাথায় যে কিছু নেই সেটা আমি জানি।
-মানে কি?(একটু চোখ রাঙিয়ে)
-তুমি আমায় চোখ রাঙাচ্ছো?
-না না। তা নয়।
-তুমি ওয়াশরুমে যাবে?
-হুম।(মাথা নিচু করে)
-চলো।
তারপর ওর পিছন পিছন গেলাম। তন্নির রুমের পাশেই ওয়াশরুম মানে বাম পাশে। আর আমিতো ডান পাশে গিয়েছিলাম। ইস যদি এইপাশে আসতাম তাহলে এতো কিছু হতো না।
-শোন?
-বলুন।
-এই বাড়িটা অনেক পুরনো। কিন্তু ভয়ের কিছু নেই। আর হ্যা এইসব ভূত বলে কিছু হয় না। বুঝেছ?
-হুম।
-আর একটা কথা এখানে যতদিন আছো সব সময় মাথায় কাপড় দিয়ে থাকবা। ধীরে ধীরে আর নরম ভাবে কথা বলবা। ভদ্রভাবে চলবা। আংকেল কিন্তু খুব রাগি তাই ওনার সামনে কথা বলার আগে ভেবে চিন্তে কথা বলবা। ওকে?
-(মাথা নেড়ে হ্যা বললাম)
-মাথা নাড়াচ্ছো কেন? মুখ নেই? কথা বলতে পারো না?
-ঠিক আছে। আপনি যেমনটা বলেছেন তেমনটাই করবো।
আংকেলের সামনে না হয় ভেবে কথা বলবো। কিন্তু মাথায় কাপড় দেওয়া, ধীরে কথা বলা এইসবের কি প্রয়োজন।(মনে মনে)
-প্রয়োজন আছে।(মেঘ)
-কি?
-এইসব কিছুর প্রয়োজন আছে। এটা তোমার শহর নয় এটা গ্রাম। এখানকার মানুষ এমন খোলোমেলা থাকা ভালো চোখে দেখে না।
-খোলা মেলা মানে। আমি যথেষ্ট ভদ্র পোষাক পরি আর যথেষ্ট ভদ্র ভাবেই থাকি।
-জানি। কিন্তু আরো ভদ্র হয়ে থাকবে।
এমন কিছু করোনা যাতে সবাই তোমায় খারাপ বলে। প্লিজ।(অনেক নরম সুরে বললেন)
-আচ্ছা ঠিক আছে।
-কি রে তুই এখনো ফ্রেশ হসনি?(তন্নি)
-কি করে হবো। তুইতো ওয়াশরুমটা কোনদিকে সেটা না বলেই চলে গেলি। আর আমি সারা বাড়ি খুজেও পায়নি। পরে উনি এসে দেখিয়ে দিলেন।
-ওহ্। সরি সরি। আসলে আমার খেয়াল ছিলো না। পরে মনে পড়েছিলো কিন্তু ভাবলাম আমার রুমের পাশেই যেহেতু আছে তাই খুজে পেতে কোনো প্রবলেম হবে না।
-তন্নি মা রা কোথায়?(মেঘ)
-আন্টিরা সবাই নিচে আছে। সবার খাওয়া শেষ। তোকে মা ডাকছে খেতে।
-যাচ্ছি।(বলেই উনি চলে গেলেন)
-নাশু তুইও যা ফ্রেশ হয়ে আয়। আমি আমার রুমেই আছি। না হলে পরে যদি আবার নিচে যাওয়ার সিড়ি খুজে না পাস।
-ঠিক আছে।
বলে আমি ওয়াশরুমে গেলাম। অনেকটা জার্নি করার ফলে শরীর কেমন লাগছিলো তাই একে বারে গোসল করে নিলাম। গোসল করে জামাকাপড় বারান্দাতেই শুকাতে দিয়ে নিচে এলাম। খাবার টেবিলে গিয়ে দেখি মেঘ খাচ্ছে। আমি আর তন্নিও বসে গেলাম। টেবিলটা অনেক বড়। প্রায় ষোল জন বসতে পারে এমন। আমি আর তন্নি পাশাপাশি বসলাম। তন্নির মা মানে আন্টি আমাদের খেতে দিলেন আমরা খাওয়া শুরু করলাম। খেতে খেতে মেঘ আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। বুঝতে পারলাম না কেন হাসলো। খাওয়া শেষে যখন উঠতে যাবো তখন মাথা থেকে ওড়নাটা পরে গেলো। তখন বুজলাম ও আমায় মাথায় কাপড় দিয়ে থাকতে বলেছিলো বলে আমি মাথায় কাপড় দিয়েছি সেজন্য ওর ভালো লেগেছে তাই হেসেছে। উঠে আমরা মা রা যেখানে বসে আছে সেখানে গেলাম। সবাই মিলে গল্প করছে। আমি আর তন্নি সেখানে যাওয়ার পর আমাদের বসতে দিলো। অনেক মহিলারাও আছে। তারা আমার খুব প্রসংশা করলো। আমি শহরের মেয়ে হয়েও এতো নরম ভাবে কথা বলছি, মাথায় কাপড় দিয়ে আছি, সবার সাথে মিশে কথা বলছি, মনে কোনো অহংকার নেই আরো অনেক কথা বলছে। মাকেও দেখলাম মা খুব খুশি হয়েছে। এবার আমারও খুব ভালো লেগেছে। এর আগেও আমায় অনেকে অনেক প্রসংশা করেছে যেমন, দেখতে সেই লাগছে, পুরাই ঝাক্কাস, হট এইসব শুনে খুশি হতাম কিন্তু এমন ভালোলাগা কাজ করতো না মনের মধ্য। সত্যি আমরা যদি একটু ভদ্র ভাবে চলি তাহলে সবাই কত ভালো ভাবে। এমনিতেও আমি আজকালকার মেয়েদের মতো মডার্ন ড্রেস পরিনা। তারপরেও আজকের পর থেকে আরও ভালোভাবে চলবো। থ্যাংক ইউ মেঘ তোমার জন্যই আজ এই অনূভুতিটা ফিল করলাম। সবাই মিলে অনেকক্ষন গল্প করলাম। এইভাবেই দু’দিন কেটে গেল। এই দুদিনে অনেক কিছু জানলাম, শিখলাম আর বুঝলামও। এখানে না আসলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেত। কাল তন্নির গায়ে হলুদ। জয়ারা সবাই ঠিক করেছে ওরা আজ বিকালেই আসবে। আমিতো খুব খুশি। শুভও আসবে আর এই সুযোগে মায়ের সাথে শুভর পরিচয় করিয়ে দিবো। সকাল থেকে ওয়েট করছি কিন্তু সময় যেন কাটছেই না। বিকাল ৪টায় ওদের গাড়ি এলো। আমি তাড়াতাড়ি করে নিচে গেলাম আর ওদের গাড়ির সামনে গিয়ে দাড়ালাম। ওরা সবাই তন্নির বাড়ির লোকের সাথে কথা বলে উপরে এলো। বাড়িটা দেখে ওরাও বেশ অবাক হয়েছে। আমি আর শুভ পাশাপাশি হাটছি। ওরা সাবই ফ্রেশ হলে সবাই মিলে বিকালের নাস্তা করলাম। সন্ধ্যার দিকে সবাই মিলে ছাদে গেলাম। এবাড়িতে আসার পর এটাই আমার প্রথম ছাদে উঠা। ছাদটা অনেক বড়। আমাদের বাসার ছাদের থেকে দ্বিগুণ বড়। আমরা সবাই ছাদে পাটি পেড়ে বসলাম। গ্রামে বেতে বোনা পাটির খুব চল। আমি আর শুভ পাশাপাশি বসলাম। আমরা সবাই মিলে আড্ডা দিচ্ছিলাম। আস্তে আস্তে রাত বাড়তে থাকলো। জোৎস্না রাত। শুভ আমার অনেকটা কাছে বসে আছে। এর আগে কখনো ওর এতো কাছে বসিনি। একটু পর ও আমার হাতটা ধরলো। এই প্রথমবার শুভ আমার হাত ধরেছে। আমার ভালো লাগার কথা কিন্তু আমার খুব ভয় করছে। যদি কেউ দেখে ফেলে। ও আমার গা ঘেসে বসলো এবার আর হাতটা খুব শক্ত করে চেপে ধরলো। আর আমার ভয়টা আরো বাড়তে লাগলো। আমি যত হাতটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছি ও ততো আমার হাতটা শক্ত করে ধরছে।
-কি হচ্ছেটা কি শুভ?(আমি ফিস ফিস করে ওকে বললাম)
-কেন কি হচ্ছে?
-হাতটা ছাড়ো শুভ।
-কেন তোমার ভালো লাগছে না?
-সেটা নয় শুভ। যদি কেউ দেখে ফেলে তাহলে কি হবে বুঝতে পারছো?
-কি হবে? কিচ্ছু হবে না। আর কেউ দেখবে না। আর দেখলেই বা কি আমি কাউকে ভয় পাই নাকি।
-তাই কাউকে ভয় পাও না তাই না?
-হুম কাউকে না।
-মা কে বলে দিবো যে তুমি তার মেয়ের হাত ধরেছো?
-বলো। আমিও বলবো আমি আমার বউয়ের হাত ধরেছি তাতে আপনার কি শ্বাশুরি মা?
-বলার সাহস আছেতো?
-সাহস কি দেখাবো?
-না থাক। এতো সাহস দেখাতে হবে না।
-ওকে দেখাচ্ছি না। কিন্তু প্লিজ হাত ছাড়তে বলোনা। সারা জীবন তোমার এই হাতটা ধরে থাকতে চাই।
-সত্যিই কি সারা জীবন থাকবে তুমি আমার পাশে?
-এই তোমার হাত ধরে তোমায় ওয়াদা করছি সারা জীবন তোমার পাশে থাকবো। সারা জীবন শুধু তোমায় ভালোবাসবো।
-আমিও তোমায় ওয়,,,,,,
-নাহ্
-কি না?
-তোমায় ওয়াদা করতে হবে না।
-কেন?
-কারণ আমি জানি নাশু তুমি শুধু আমায় ভালোবাসো। তোমার মনের সবটা জুড়ে শুধুমাত্র আমি আছি। কেউ চাইলেও সেখানে নিজের জায়গা করে নিতে পারবে না। যা কিছু হয়ে যাক না কেন তুমি আমায় কখনো ছেড়ে যাবে না। এইটুকু বিশ্বাস তেমার প্রতি আমার আছে।(শুভ)
সত্যি শুভর মতো কাউকে নিজের জীবন সঙ্গী হিসাবে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। সবার কপালে জোটে না। আমি সত্যি খুব ভাগ্যবতী শুভ তোমার মতো কাউকে নিজের জীবনে পেয়ে।(মনে মনে)
-ওই কি ভাবছো?
-আই লাভ ইউ শুভ।
-আই লাভ ইউ টু।
হঠাৎ করেই সবাই দাড়িয়ে গেলো। সবার দাড়ানো দেখে আমিও উঠে দাড়ালাম। সবাই একসাথে বললো।
-শাফিন স্যার আপনি এখানে?
ও এবার সবার উঠে দাড়ানোর কারণটা বুঝলাম। দুপুরে মেঘ বাইরে গিয়েছিলো ওরা আসার পর থেকে একবারও দেখা হয়নি। তাছাড়া নিয়নরা কেউ জানে না শাফিন স্যার মানে মেঘ এখানে। তাই ওরা একটু চমকে গেছে।
চলবে,,,

#মেহজাবিন_নাশরাহ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here